শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য
নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তন ছাত্র। অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা। কলেজ ম্যাগাজিন থেকে লেখালিখির হাতেখড়ি। আমেরিকা অথবা ভারত ভ্রমনের অভিজ্ঞতা ঝুলিতে থাকলেও ভালোবাসেন কলকাতাকে। বর্তমানে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রুপে কর্মরত।

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ‘আগন্তুক’-এর সেই সিনটার কথা মনে আছে ? বাচ্চা ছেলেটির ইনোসেন্ট ডায়ালগ। আরিব্বাস জাল দাদু! ব্যাপারটা অনেকটা সেরকমই। এবার ডাক্তার। জাল ডাক্তার।

ফেসবুকে শেয়ার করা ভিডিওয় দেখলাম এক ঘোড়েল সাংবাদিকের খপ্পরে পড়ে জাল ডাক্তার হ্যা-না-মানে করছেন। যতই তিনি তোতলান সাংবাদিক ততই সাঁড়াশি চেপে ধরেন।

— আপনি এম বি বি এস পাশ করা ডাক্তার?

— না , মানে (ঢোক গিলে) ওই ডাক্তারের মতো আর কি।

— মতো মানে?

— মানে ওই ধরুন, রাস্তায় কাউকে দেখে বললেন একদম শ্যামলের মতো। সে তো আর শ্যামল নয়। শ্যামলের মতো।

— এম বি বি এস লিখেছেন কেন ?

—এম বি বি এস না।  অলটারনেটিভ মেডিসিন।

— কোত্থেকে পাশ করেছেন?

— সেকি আর মনে থাকে। কত দিন আগের ব্যাপার। ভুলে গেছি।

—বোর্ডে লিখে রেখেছেন স্ত্রীরোগ এবং বন্ধ্যাত্ব নিরাময় করেন। কীভাবে বন্ধ্যাত্ব সারান?

— ওষুধ দি তো।

— কী ওষুধ?

— ওই সিরাপ টিরাপ খাওয়াই।

— সিরাপ! সিরাপ খেলে বাচ্চা হয়? মজা পেয়েছেন?

— ওটা স্পেশাল সিরাপ। ওটা খেলে মানে বাচ্চা সৃষ্টি করার জন্য শরীরে একটা ইয়ে আসে আর কি।

সিরাপ স্পেশালিষ্ট এই ডাক্তারের ভিডিও এখানেই শেষ। এমন ভিডিও একটু হাতড়ালেই  পাওয়া যাবে। আরেকজন ‘শ্যামলের মতো’ ডাক্তারের দিকে মন দেওয়া যাক। আলিপুরদুয়ারের খুশিনাথ তালুকদার খুশিমনে সরকারি ডাক্তার হিসেবে মাসিক পঞ্চাশ হাজার টাকা গুনেছেন। ডেথ সার্টিফিকেট ইঞ্জেকশান সবই দিচ্ছেন সরকারি ছাপে। সি আই ডি ভাগ্যিস হানা দিল। জিজ্ঞেস  করা হল এম বি বি এসের ফুল ফর্ম কী ? তিনি ঘোমটা মাথায় নতুন বৌয়ের মত মিনমিন করে বললেন , মাস্টার অফ ব্যাচেলার ব্যাচেলার অফ সায়েন্স।

এবার যার কথা বলব তার পাণ্ডিত্যের কাছে খুশিনাথ তালুকদার নেহাতই শিশু।তিনি এক মহানুভব কেমব্রিজ ফেরত ডাক্তার। পাউণ্ডের মায়া ছেড়ে মেচেদায় চেম্বার খুলেছেন। সার্টিফিকেট বলছে তিনি পশু চিকিৎসক। প্রশ্ন করা হল , এই যে এতো গরু ছাগল কুকুর বেড়াল পায়রা ফড়িং , সেসব ছেড়ে মানুষ কেন ?

আরও পড়ুন:  হানিমুন

উত্তরে এলো , তাতে কী! এখন তো মানুষগুলান  সব পশুর মতোই হইছে। যাকে তাকে কামড়াই দিছে। পশুর ওষুধেই তো কাজ হবে।লয় কি?

— তাহলে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি, এম ডি এসব ভুয়ো ডিগ্রি লিখেছেন কেন?

—ভুয়ো লয়। ওগুলান তো আমার রিয়েল অভিজ্ঞতা।যখন কেম্বিজে ছিলাম সেত ভইল্লুকের সদ্দি কাশি সারাইছি। রেড পাণ্ডার ইউরিনাল পবলেম কাটাইছি।

— আপনার মাথার ঠিক আছে? আপনার তো ট্রিটমেন্ট দরকার।

— আরে শোনেন শোনেন। ইউটুবে সব দেখিছি। জিও সিম লাগাইছি। এখন তো সব ফিরিতে দেখা যায়। ফসসা মোটা মহিলা সারাদিন এসিতে থাকে। উহার সর্দি আমি সেত ভইল্লুকের ওষুধে কাটাইছি। বিশ্বাস লা হয় আপনার শরীলের দু চারটে সমস্যার কথা বলেন । আমি সারাই দিব। আপনার চাল চলন দেখে মনে হইছে যে শুয়োরের ওষুধে ঠিক কাজ হবে। ফুল গেরান্টি।

এর পর সেই সাংবাদিক মেজাজ খুইয়ে কিছু আনপ্রফেশনাল কথা বলে ফেলেন। একচিমটে ঝাল তক্কাতক্কিও হয়।তাই এর বেশি আর কিছু জানা যায় নি।

আসলে ব্যাপারটা কিন্তু খুব সহজ। কোনও এক বিশেষ তাগিদে যেমন জাল নোট, জাল ভোট এবং জাল রাজনৈতিক জোট তৈরি হয় তেমনই অভাব খিদে এইসব তুচ্ছ কারণে জাল ডাক্তার সমাজ প্রডিউস করে। মতিঝিল কলেজ থেকে পাসকোর্সে ইতিহাস পড়ে আপনাকে কে চাকরি দেবে বলুন। ঝকঝকে এম বি এ, চকচকে এম সি এ আর তকতকে বি টেক পর্যন্ত চাকরি না পেয়ে দিনরাত বসে থেকে বাতের রুগি হয়ে গেল।অতএব ছেন্তাই চুরি ডাকাতি বাদ দিয়ে ভাঁওতাবাজির এই যুগে তাদের জন্য একটাই রাস্তা খোলা।সিরাপ স্পেশালিষ্ট গাইনো কিমবা ভেট টার্নড এম ডি। কারণ তারা হাড়ে হাড়ে জানেন আমাদের  সবার নামের পেছনে বিশ্বাস না থাকলেও ডাক্তারের পেছনে আমাদের মেন্টাল ইনভেস্টমেন্ট বিশ্বাসের পুঁজিতে টইটম্বুর।

যেমন ধরা যাক ডক্টর এস কে মুখার্জি। সোনারপুরের একটি প্রাইভেট নারসিংহোম আলো করে বসেন। ব্যাকব্রাশ করা চুল। কাছে গিয়ে বসলে দামী সেন্ট নাকে আদর ছেটায় । তিনি যখন ব্যারিটোনে বলেন যে আপনার লোয়ার এসোফেগাল স্ফীঙটারে  প্রেসারটা একটু হাইপো টেনসিভ কিংবা আপনার ছেলের সেকয়েস্ট্রাটেড লিম্ফ্যাটিক ভেসেলস থেকে  ভেনাস  সিস্টেমের  ড্রেনেজটা ঠিকমতো কাজ করছে না তখন কি আপনার মাথায় আসে এই ডাক্তার আসলে উচ্চমাধ্যমিক পাস্। দশ হাজার খরচা করে মেডিকাল ল্যাঙ্গুয়েজ উইথ স্পোকেন ইংলিশের ক্র্যাশ কোর্স করেছেন। আসল নাম তপন গাঁতাইত। আসতেই পারে না। ডাক্তারবাবুর এমনই জাদু। খস খস করে লিখে দিলেন খান আষ্টেক টেস্ট। আপনার তিনটে , ছেলের পাঁচটা। আপনি এখন কোথায় যাবেন ? এফ এই আর করতে? হতেই পারে না । আপনি যাবেন অশোক ল্যাবরেটরি।হাজার দশের রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে ফিরে আসবেন ধুকপুক বুকে। ডাক্তার রিপোর্টগুলোকে এমনভাবে দেখবেন যেন রাতবিরেতে ক্লাবের আড্ডায় টোয়েন্টি নাইনের তাস বিলোচ্ছেন।এদিকে আপনার ফুসফুস কিনতু ফর্দাফাঁই । আপনার আতুপুতু ছেলের স্টোমাক তিলে তিলে টাংস্টেন হয়ে যাচ্ছে।তাতে ডাক্তারের কী!নারসিংহোমের কী যায়! এই আশ্চর্য সমাজের কী!তপন গাঁতাইত কমিশনটা তো পেলেন। উচ্চশিরে ভয়শূন্য চিত্তে ভণ্ডামির খেলায় আরেকটা দিন উৎরলেন।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৬)

    এবার সত্যিকারের ডাক্তারদের কথায় আসা যাক। এই ডাক্তারবাবুরা টেকনিক্যালি জাল নন। জয়েন্টে ভালো র‍্যাঙ্ক আছে।ভালো রেসাল্ট করে মায়ের হাতে রসগোল্লা খাওয়ার ছবিও আছে ফ্যামিলি অ্যাল্বামে। ধামাকা ফ্ল্যাট আছে। জার্মান গাড়ি। হৃষ্টপুষ্ট দুটি সন্তানও আছে। তাহলে হসপিটালে আমাদের করুন মুখ দেখে সঠিক ডায়াগনসিস করতে ডাক্তারবাবুর মূল্যবোধে কেন ঢিলেমি আসে? বেশি বিল করানোর তাগিদে তাদের গোপনে কেন লালা ঝরে? এরা কি তাহলে জাল নন?

প্রাইভেট হসপিটালে ডিসকাসের মতো হাত ঘুরিয়ে এরা যে জবরদস্ত জাল ছুঁড়েছেন তাতে চুনো থেকে ঝুনো সব পুটিই ধরা পড়ে।এম ডি , এম এস থেকে এফ আর সি এস সবাই মিলেমিশে জাল ছড়াচ্ছেন। এনারা বেশি কথা বলেন না। হ্যা না এসবেই কাজ সারেন। দুঁদে জেলেদের ফিশি ফিলোসফি বলতে যা বোঝায় আর কি । মানে ধরি মাছ না ছুঁই পানি।এবার শুরু মাছের তেলে মাছ ভাজা।

আমি মুখ বেঁকিয়ে বললাম , এখানে ব্যাথা, সেখানে ব্যাথা। ওরে বাবা, কী ব্যাথা।

ডাক্তারের মুখে কোনো কথা নেই। একটু পেটের ডানদিকটা টিপলেন। বাঁদিকটায় বড়জোড় একটা বুড়ো আঙুলের সফিস্টিকেটেড চাপ। ব্যাস ঐটুকুই। আমি ধন্য হলাম ধন্বন্তরীর হাতের ছোঁয়ায়।

ডাক্তার এবার দিনের সেরা প্রশ্নটি করলেন। কদ্দিন থেকে ব্যাথা?

আমি যেই না উত্তর দিলাম ডাক্তার কিন্তু চট করে ধরে ফেললেন সেই ব্যাথার উৎপত্তির উৎসস্থল। শুধু তাই নয় শরীরের বাকি অঙ্গগুলির সঙ্গে ব্যথার দৈনিক লেনদেন জনিত মারাত্মক সাইড এফেক্টও।ভাবা যায়!ডাক্তার না ভগবান ! ভুললে চলবে।এবার শুরু হল প্রেসক্রিপশন প্যাডে সাইলেন্ট খস খস। হ্যান্ড রাইটিং বোঝার অধিকার ডাক্তাররা শুধুই কম্পাউন্ডারদের দিয়েছেন এবং সেই কম্পাউন্ডার সেই প্রাইভেট হসপিটালের কম্পাউন্ডের মেডিকেল স্টোরেই বসেন। এখানেও কমিশনের দুষ্টুমিষ্টি খেলা আছে সেকথা এখন প্রায় সবাই জানেন।

এদিকে আমার বুক কাঁপছে। ডাক্তারবাবুর উদাসীন হাবভাব দেখে মেনে হচ্ছে ক্যান্সার বা এইডস জাতীয় কিছু একটা হবে। আমি অতীতের কুকর্মের কথা ভাবছি আর ওদিকে আমাকে পাঁচদিন হস্পিটালাইস করে অর্থনৈতিক শোষণের দিনের সাতষষ্টিতম ষড়যন্ত্রের ব্লু প্রিন্ট তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন:  সাত প্যাঁচে বাঁধা

আচ্ছা, সব ডাক্তারই কি এইরকম? মোটেই না। নোবেল মানুষ কি নেই? আলবাত আছে। তারা ছিলেন।তারা থাকবেন। তারা আছেন বলেই একদিন নিশ্চয়ই আসবে যেদিন ক্যান্সারের জন্য হা পিত্যেশ করে আদিত্য বিড়লার হেলথ ইনস্যুরেন্স করতে হবে না।সুলভে সঠিক চিকিৎসার জন্য তুমুল আয়োজন শুরু হবে।

 যাই হোক এবার রচনা গোটাবার আয়োজন।যাবার আগে বলি হাসি ফোটাতে কিন্তু কোনও জালিয়াতি খাটে না।একথা মানি এবং জানি যে এই সময় পাঠকের ঠোঁটের কোণে যদি হাসির ছোঁয়া থাকে সে হাসি কখনই জাল হতে পারে না।

3 COMMENTS

  1. Bah, opurbo lekha.. Practical issue ke niye khub sundor bhabe sajano ekti ramya rachana. Tomar lekha sabsamay besh creative laage.. Good write up. Keep it up.. Looking forward to your next creation.
    All the luck.

  2. Ektu engineer der niyeo lekho na bhai. Majhe modhye bridge venge pore, accident hoy, lok o more. Contractor er sathe kotota commission…ei sob r ki… jani doctorder galmondo ta loke besi khachhe…tobuo romyo rochonay chesta kore dekhte khoti ki…