সুমন সরকার
পড়াশুনা প্রেসিডেন্সী কলেজে স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে । বর্তমানে আইএসআই , কলকাতায় ডক্টরেট করছেন । ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালিখি শুরু । যেভাবে গীটার বাজিয়ে গান গাইতে ভালো লাগে , সেভাবে লিখতে ভালো লাগে , তাই লেখেন । লিখেছেন রম্যগদ্যের দুটো বই- 'লাকি থারটিন' , 'ফাউ' ।

 ‘শিয়ালদা যাবে ?’

– তারক পাল , রথতলায় একটা ট্যাক্সি দাঁড় করালো । ট্যাক্সিচালক তারক পাল আজ নিজে ট্যাক্সি চড়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে , আজ জামাই ষষ্ঠী ! ট্যাক্সিওয়ালা বলল – ‘যাবো না ।’ যদিও ট্যাক্সির গায়ে লেখা ছিল – ‘ নো রিফিউজাল ।’   

‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির একটা গান মনে পড়ছে । গানে অনুপ ঘোষালের সাথে গলা মিলিয়েছিলেন রবি ঘোষ । অনুপ ঘোষাল গাইছেন – ‘মোরা দুজনাই রাজার জামাই’ , আর রবি ঘোষ রিপিট করছেন একটা শব্দ – ‘জামাই’ । রাজার ছেলে , রাজার মেয়ে , রাজার পিসি সবকিছুই নিঃসন্দেহে রাজকীয় । কিন্তু রাজার জামাই ! ব্যাপারই আলাদা ।

‘জামাই-ষষ্ঠী’ সম্পর্কে সব বাঙালিদের ধারনা আছে , কাজেই সেটা সম্পর্কে আলোচনার প্রয়োজন নেই । বুঝতেই পারছেন এর পেছনে নিশ্চয় কোনো পৌরাণিক গাঁজাখুরি গপ্পো আছে । বাঙালিদের জীবনে মানেই জি-বাংলা , আর জি-বাংলা মানেই তো গল্প । যদিও গল্পবাজির এই ট্র্যাডিশন জি বাংলার জন্মের কয়েকশো বছর আগে থেকে চলে আসছে । এ ধরনের গল্পে আবার গুলের আধিক্য থাকায় একে ‘গুলপো’ বললে নিঃসন্দেহে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না । যেহেতু এই সব রদ্দি গল্প কোনো পুরুষ লিখেছিল , তাই পুরুষরা নিজেদের কেতা দেখাবার রাস্তা প্রশস্ত করে রেখেছিল । আবার মেয়েরা লিখলেও মুশকিল । ‘শেষের কবিতা’য় অমিত রায় বলেছেন – ‘দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ঙ্কর’ । দিনকাল খারাপ ! এসব কথা বললে যাদবপুরে পোস্টার , ফেসবুকে ব্যারিকেড এমন অনেক কিছুই হয়ে যেতে পারে । কাজেই , কাজের কথায় আসছি । আসল গপ্পো হল সব মানুষই চায় , একটু কেতা । মানে বছরের অন্তত একদিন কয়েকজন মিলে তাঁকে বেশ তোয়াজ করবে , খাতির করবে , সেলসম্যান হলেও সে নিজেকে শাহেনশাহ ভাবতে পারবে । ‘জামাই-ষষ্ঠী’ এমনই একটা আয়োজন । আরে কথায় আছে না – ‘জামাই আদর’ ! তবে আর একটা ব্যাপার ভেবে দেখার মতন । বাঙালিদের সবেতেই খাওয়া চাই । জন্মালে খাওয়া , বিয়ে হলে খাওয়া , বাচ্চা হবার আগে খাওয়া , বিয়ে ঠিক হলে খাওয়া , এমনকি মরে গেলেও খাওয়া । শুধু ডিভোর্সে খাওয়াটা চালু হয়নি , কারন ডিভোর্স সাহেবি আমদানি । বাঙালিরা নানান ধর্ম-আচার-বিচারের গপ্পো ফেঁদে স্রেফ ভুরি-ভোজের অজুহাত তৈরি করেছে । ‘জামাই-ষষ্ঠী’ এর ব্যাতিক্রম নয় ।   

আরও পড়ুন:  পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে গোপনে রাখা আছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হৃদয় ?

‘জামাই-ষষ্ঠী’ এনজয় করতে গেলে আপনাকে প্রথমেই জামাই হতে হবে,মানে বিয়ে করতে হবে । লিভ-ইন সম্পর্কে ‘জামাই-ষষ্ঠী’হয় না । আর ঘর-জামাই হলে ‘জামাই-ষষ্ঠী’ বিশেষ জমে না যদিও । রবিবারের জায়গায় হয়তো বুধবার পাঁঠার মাংস হল,চালটা আর একটু সরু , চাটনিতে উদাস টমেটমের সাথে চঞ্চল আমসত্ব যোগ হল এইটুকুই ! বিয়ের প্রথম দিকে ‘জামাই-ষষ্ঠী’ ধুম-ধাম করে হয় । এখন আবার ফেসবুক , ইনসটাগ্রাম জমানা । মানুষ যা করে ছবি তুলে রাখে । কারন , আমি কি করছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয় । আমার সেই জিনিসটা করার ছবি দেখে অন্যরা কি ভাবছে , কি  ফিস-ফাস-বেফাস করছে , কটা কমেট-স্মাইলি সাপলাই দিচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ । আমরা অবজেক্ট অপেক্ষা তাঁর ইমেজ কিমবা রিফ্লেকশনের দিকে ঝুঁকছি বেশী । বিয়ের আগে ছবি , বিয়ের সময় ছবি , বিয়ের পর ছবি । শুধুমাত্র বিয়ে সংক্রান্ত ছবি দেখে , আপলোড করে , লাইক-কমেন্টের হিসেব করেই দাম্পত্যের অনেকটা সময় ফাউ সুখ নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় । জামাই ষষ্ঠীতেও ছবি মাস্ট । থালার চারিদিকে গোল করে সাজানো নানান পদ উপচে পড়া বাটি সহ সেলফি লে লে । বিয়ের ফার্স্ট ইয়ার , চিল ইয়ার ! তারপর আসতে আসতে ধুম-ধাম থেকে ‘ধাম’বাদ যায় । ধুম-১ , ধুম-২  এরকম সিকোয়েল চলতে চলতে ‘জামাই-ষষ্ঠী’র আয়োজনের ধুম,ধোঁয়া হয়ে হারিয়ে যায়,ধুম-১ ছবির জন আব্রাহামের বাইকের মতন । ততদিনে বিয়েটাও তেতো হয়ে গেছে,এক পরকীয়া তো বনতি হ্যায় ! তাছাড়া এখন ডিভোর্সের মহামারি ! বিয়ের তিন মাসের মধ্যে ডিভোর্স,এসব আগে সিনেমায় হত এখন বাস্তবে ভূরি ভূরি উদাহরণ । ফলে,ডিভোর্স হওয়া বেচারা জামাইটিকে,সেই দিনে, ফ্রাসটু নামক উপাদেয় ও সর্বশ্রেষ্ঠ মদের চাট সহ ,মদ্যপান করতে করতে জামাই বন্ধুদের ফেসবুক ছবি লাইক করেই দিন কাটিয়ে দিতে হয় ।

তবে বিয়ে না করলে কি জামাই-আদর পাওয়া যাবে না ! এখন তো পরিবর্তনের জামানা , নিয়ম ভাঙার সময় । এরকমই নিয়ম ভাঙার কথা ভাবত হারু । জন্মাবার পর থেকে বিশেষ কিছু হয়নি তাঁর জীবনে । যাদের নাম হারু হয় তাঁদের জীবনে কিছু হবারও থাকে না । হারু , হিরো হতে পারেনি কোথাও , শুধু হেরো হয়েই থেকে গেছে । হারুকে কেউ সিরিয়াসলি নেয়নি , হারুর হাত থেকে হজমি কেড়ে নিয়েছে কেবল । কেড়ে নেওয়া থামে নি বয়স বাড়লেও । যৌবনে হারুর হাত থেকে প্রেমিকা কেড়ে নিয়েছে রাহুল । হারুর এমনটাই দাবী । যদিও সেই মেয়েটি , প্রেমিকা হিসেবে হারুর হাতে ছিল এমন কোনো প্রামাণ্য নথির হদিশ মেলেনি । তাছাড়া রাহুল নাম হলেই মেয়েরা নাকি পটে যায় , নামের শেষে একটা হুল থাকলেও ! হারু পাড়ার মুনমুনকে ভালোবাসতো । যদিও মুনমুন ( পদবী সেন নয় , পাল ) হারুকে পাত্তা দিতো না । হারুর বিশ্বাস ছিল  একদিন মুনমুন তাঁর ভালোবাসা বুঝতে পারবে । মুনমুন অঙ্ক , গদারের সিনেমা , আমেরিকান রকস্টারদের উচ্চারণ , ক্লাসিক্যাল মিউজিক বুঝলেও হারুর ভালোবাসা বুঝতে পারে নি । হারু ভাবত মুনমুনকে বিয়ে করাটাই হবে তাঁর জীবনের সেরা কাজ । চাকরী খোঁজার প্রয়োজন নেই , কারন বাবার চালু মুদিখানার দোকান । পালবাড়ির জামাই হতে পারলেই যেন , শ্বশুরবাড়ি নামক সাম্রাজ্যে তাঁর ‘রাজ্যাভিষেক’ হবে ! কিন্তু , পালবাড়ি দখল করে ফেলেছে রাহুল । যদিও হারু অনেকদিন ধরে পালবাড়িতে নানান ছুতোয় আনাগোনা করেছে । মুনমুনের মায়ের সাথে ভাব জমিয়েও , দুএকবার গরমের দিনে ম্যাঙ্গো ফ্লেভার রসনা ছাড়া , বিশেষ কোনও লাভ হয় নি । হেবি কঞ্জুস মাল , স্রেফ পাতলা জুস দিয়েই কাজ সাড়ে , ডুস দিলেও পয়সা বার করা যায় না । হারুর বন্ধুরা বাড় খাওয়াতো , কারন ‘বাড়’ খেলে হারু ওঁর বন্ধুদের খাওয়াতো । ওই তো সেদিনও হারু পালবাড়িতে বডি ফেলেছিল সকালের দিকে । কিন্তু , মুনমুনের মা ওঁকে দিয়ে ঠাকুর ঘরের ঝুল পরিষ্কার করিয়েছে , হারু লম্বা বলে । হারুর এতো পরিশ্রম সত্ত্বেও মুনমুনের বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে রাহুলের সাথে । বিয়ের আগেই জামাই ষষ্ঠীর দিনে মুনমুনের মা রাহুলকে পেট ভরে খাইয়েছেন । মুনমুন ছবি আপলোড করেছে ফেসবুকে , অ্যালবামের নাম – ‘প্রি ওয়েডিঙ জামাই  ষষ্ঠী’ । ফেসবুক দেখতে দেখতে হারু সেদিন প্রচুর মদ খেয়েছিল । এর কিছুটা সময় পর বাবা-মায়ের  পছন্দ করা পাত্রী টুম্পার সাথে বিয়ে হয় হারুর । টুম্পা যদিও মেদিনীপুরের মেয়ে নয় , গলফগ্রিনের মেয়ে । গল্পে এখানে হালকা টুইস্ট আছে । বিয়ে হলেও হারুর জামাই ষষ্ঠী হয় নি । টুম্পার বিয়ের দুবছর আগে ওঁর মা হরিদ্বার বেড়াতে গিয়ে দেহ রেখেছিলেন , টুম্পার বাবা খাঁটি কম্যুনিস্ট , ভেজাল সিপিএম । হারু যদিও সুখী জীবন পেয়েছিল টুম্পার সাথে । মুনমুন-রাহুলের জুটি কোনোমতে দাম্পত্য নামক ক্রিজে টিকে আছে , রান-আউট হল বলে ! বিয়ের এক বছর পর থেকেই সম্পর্কটা ঝগড়ার চাঁদমারি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিয়ের প্রথম বছরটাই জামাই ষষ্ঠীতে গেছিলো রাহুল । ওইদিন দুপুরে গানডে-পিণ্ডে গেলার পর , সন্ধ্যায় শ্যালিকার ব্যাটেলিয়ান সহ ফুচকা , রাতে বেলাগাম মদ্যপান । তারপর গন্ত্যব্য অ্যাপোলো হাসপাতাল ।  তীব্র ফুড পয়জনিং এর জন্য ভর্তি হলেও , অ্যাপোলো হাসপাতাল তাঁদের ট্র্যাডিশন অক্ষুণ্ণ রেখে , রাহুলের কিডনি , হার্ট , লিভার , হাঁটু , অণ্ডকোষ , শিরদাঁড়া , ব্রেন সব কিছুর পরীক্ষা করে , তিনদিন রেখে সাড়ে চার লাখ টাকার বিল হাতে ধরিয়ে রাহুলকে ছেড়েছিল । তারপর থেকে জামাই ষষ্ঠীর কথা শুনলেই তাঁর মুখটা কেমন যেন হয়ে যায় !                          

আরও পড়ুন:  'জগ্গা জাসুস'-এর ব্যর্থতার জন্য পরিচালক অনুরাগ বসুকে দায়ী করলেন ঋষি কপূর
Sponsored
loading...

NO COMMENTS