রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
তাঁর কর্মজীবন শুরু ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে স্কটিশ চার্চ কলেজে | তারপর তিনি আজকাল সংবাদপত্রে যুক্ত হন সহকারী সম্পাদক রূপে | সেখান থেকে সহকারী সম্পাদক রূপে আনন্দবাজার পত্রিকায় | বর্তমানে তিনি যুক্ত সংবাদ প্রতিদিন-এর সঙ্গে | তবে এখন তাঁর প্রধান পরিচয় সাহিত্যিক হিসেবে | তাঁর বেস্টসেলার বইগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাণসখা বিবেকানন্দ ( দু খণ্ড)‚ কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট‚ রবি ও সে ‚ আমি রবি ঠাকুরের বউ‚ রবি ও রাণুর আদরের দাগ‚ নায়ক রবি ( ১ ম খণ্ড)‚ দ্বারকানাথ থেকে রবীন্দ্রনাথ; ঠাকুরবাড়ির গোপনকথা‚ প্লাতা নদীর ধারে; রবীন্দ্র-ওকাম্পোর প্রণয়কথা | সম্প্রতি ‘রাধা ও রবি’, ‘স্বামী’-সহ একাধিক সংগ্রহে সমাদৃত হয়েছে তাঁর ভাষ্যপাঠ |

শনিবার সেই দিন  | বাইশে শ্রাবণ  | ৭৬ তম প্রয়াণবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি কবিগুরুর প্রতি  | কেমন ছিল তাঁর জীবনের শেষ কটি দিন  ? সেই দিনগুলো ফিরে দেখতে দূরবীনে চোখ রাখলেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়  | প্রথম পর্ব…

 

১৯৩৫ এর ২৮ শে জানুয়ারি |
রবীন্দ্রনাথ আর মাত্র ছ বছর বাঁচবেন |
শরীর দ্রুত ভেঙে পড়ছে তাঁর |
তিনি বুঝতে পারছেন‚বিদায়ের দিন আর বেশি দূরে নয় |
বিকেলবেলা শান্তিনিকেতনের কঙ্করকুঞ্জে হিমঝুরি গাছ্গুলোর তলায় পায়চারি করছেন রবীন্দ্রনাথ |
বিকেল ক্রমে ঢলে পড়ছে |
ডুবছে সূর্য |
রবীন্দ্রনাথ দেখলেন ‚ সূর্যাস্তের আলো এসে পড়ল গাছগুলির মাথায় |
পাশে রয়েছেন রানী চন্দ |
রবীন্দ্রনাথ রানীকে বললেন‚ পাতা ঝরবার সময় এল | সব পাতাই হলদে টসটসে হয়ে আছে | আমারই মতো ঝরে পড়বার আগে অস্তরবির রশ্মি পড়েছে | যৌবনের চাইতে এর বাহার কি কোনও অংশে কম ?
রানী চন্দ এ-কথা শুনে ভাবলেন ‚ রবীন্দ্রনাথ কিছুতেই হার মানবেন না যৌবনের কাছে |
একটু পরেই রানীকে বললেন রবীন্দ্রনাথ ‚ ঝরা পাতাও বাগান ও গাছের একটি অঙ্গ | আশ্চর্য হই যখন লোক তা পছন্দ করে না | শুকনো পাতা ঝাঁট দিয়ে বাগান পরিষ্কার রাখে | শুকনো পাতারও একটা অন্য ভাষা আছে |

১৯৩৮ এর ১৬ – ই জানুয়ারি |
রানীকে বললেন রবীন্দ্রনাথ ‚ পা অচল‚ কানে দোষ‚ চোখ ক্ষয়ে আসছে‚ আর বেঁচে থেকে লাভ কী বল ? ছুটি‚ ছুটি চাই | কবে যে ছুটি পাব জানিনে | কাজ করেছি তো ঢের | এবার চাই পূর্ণ বিশ্রাম |
চুয়াত্তর বছরের রবীন্দ্রনাথের রসবোধ  কিন্তু কানায়-কানায় |

১৯৩৫ এর ১৬ই জুন রবীন্দ্রনাথ চন্দননগরে |
এখানেই তো তেইশ বছর বয়েসে তাঁর নতুন বউঠান কাদম্বরীর সঙ্গে কাটিয়ে ছিলেন দীর্ঘ ছুটি | বৃদ্ধ বয়েসে যেন নিজেরই খোঁজে চন্দননগরে ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ |
বললেন রানী চন্দ-কে : এই দ্যাখ না কেন‚ আমাদের কালে যদি বউঠানদের ইনস্টিটিউশনটা না থাকত ‚ তবে কী উপায় হত আমাদের ভেবে দ্যাখ দেখি | আমাদের কালে অন্য মেয়েরা সব কোথায় ছিল ? বাড়ির বাইরে কোনও মেয়েদের সঙ্গে মিশবার আমাদের উপায় ছিল না | মেয়ে বলে জানতুম ওই বউঠানদের | ভালবাসা ‚ মান-অভিমান‚ দুষ্টুমি ‚ যা কিছু বল ‚ ওই বউঠানদের সঙ্গেই ছিল সব | মনে পড়ে আমার নতুন বউঠানকে | কিন্তু মজা দ্যাখ ‚ যারা মরে যায় তাদের আর বয়েস বাড়ে না | আমি বুড়ো হয়ে গেলুম‚ কিন্তু নতুন বউঠান ‚ তাঁর আর বয়েস হল না |
আর একদিন রানীকে বললেন রবীন্দ্রনাথ : আমাদের দেশে বউদি সম্পর্কটি বড়ো মধুর | এমনটি আর কোনও দেশে নেই | মনে পড়ে আমার নতুন বউঠানের কথা—-খুব ভালবাসতুম তাঁকে‚ তিনিও আমাকে খুব ভালবাসতেন | এই ভালবাসায় নতুন বউঠান বাঙালি মেয়েদের সঙ্গে আমার প্রাণের তার বেঁধে দিয়ে গেছেন | আমার সকল আবদারের এই একটি স্থান ছিল—-নতুন বউঠান | কত আবদার করেছি‚ কত যত্ন ভালবাসা পেয়েছি |

এ-কথাগুলি বলেছেন একেবারে প্রান্তিক রবীন্দ্রনাথ | তিনি সব মায়া কাটিয়ে উঠেছেন | কিন্তু নতুন বৌঠানের মায়ার বন্ধন ঝরে যায়নি তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত |
রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৪ – এর ৩রা সেপ্টেম্বর রানীকে বলছেন : আমি এসে গেছি একেবারে এপারে | আর ওরা সব ওপারে | ওদের ইচ্ছে আছে‚ সখ আছে‚ সমস্তই আছে | আমার সঙ্গে সে-সবের খাপ খাবে কেন ? এখন আমি যদি ওদের আঁকড়ে ধরি‚ সেটা ওদের কাছে বন্ধন স্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে | তাই অনেক সময় মনকে জোর করে ওদের কাছ থেকে সরিয়ে নিই | মায়া কাটাই | আর ভাল লাগে না আমার | অল্পেতেই মন পড়ে শ্রান্ত হয়ে | লেখা আর এগোয় না | এত ক্লান্তি লাগে আজকাল লিখতে |

এখন ইচ্ছে করে সংসারের সমস্ত ঝঞ্ঝাট ছেড়ে দিয়ে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর বানিয়ে তাতে দিন কাটাই | সামনের লতাবিতানে বসি‚ তাতে একটি মাধবীলতা বেয়ে উঠবে‚ ভ্রমর গুনগুন করবে‚ সেই আলোছায়ার মধ্যে বসে চারিদিকের প্রকৃতির সব শোভা দেখি | আর যখন ইচ্ছে হবে নিজের খেয়ালে ছবি আঁকব | এমনি করে যে-কয়েকটা দিন বেঁচে আছি‚ কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে |

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি পেলেন এই স্বপ্নের বাস্তব তাঁর একেবারে শেষ জীবনে ?

রবীন্দ্রনাথের মুখেই শোনা যাক : আজকাল এত আস্তে আস্তে লিখি‚ কিছুতেই আর এগোতে চায় না | অল্পেতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি | ছবি আঁকতেও তাই | কবে যে ছুটি পাব ? কবে আমায় সবাই বলবে যে‚ আর চাইনে তোমার কাছ থেকে কিছু‚ এবার তোমার ছুটি | এই আবার একটা লিখছি | হয়তো কিছু টাকা পাব | টাকা‚ টাকা —-অভাব আর মেটে না কিছুতেই !

১৯৩৫ এর ১ লা ফেব্রুয়ারি |

সন্ধেবেলা |

সারাদিন লেখালেখির পর বড় ক্লান্ত রবীন্দ্রনাথ | ইজিচেয়ারে পা লম্বা করে মেলে গা এলিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন |

রানী বসে কাছেই |

রানীকে বললেন রবীন্দ্রনাথ : মরতে আমার দুঃখ নেই | নিজের জীবনের জন্যে একটুও ভাবিনে | কারো মনেও এতটুকু দুঃখ হবে না | কেবল ভাবি — এই যে পৃথিবীকে আমি এত ভালবেসেছি‚ এই তার গাছপালা আলো ছায়া—- বলতে বলতে রবীন্দ্রনাথের গলার স্বর ভারী হয়ে এল‚ কথা শেষ করতে পারলেন না |  

১৯৪০ – এর সেপ্টেম্বর |

রবীন্দ্রনাথ আর মাত্র এগারো মাস পৃথিবীতে থাকবেন |

তিনি কিছুদিন আগে শেষ করেছেন তাঁর বিখ্যাত গল্প ল্যাবরেটরি |

তিনি এখন কালিম্পঙে |

আজ ২৪শে সেপ্টেম্বর |

তিনি শেষ করেছেন এক চমকে দেবার মতো কবিতা :

  উদ্দাম হইয়া উঠে শুধু ধ্বনি শুধু ভঙ্গি তার |
  মনে মনে দেখিতেছি সারাবেলা ধরি
  দলে দলে শব্দ ছোটে অর্থ ছিন্ন করি —
  আকাশে আকাশ যেন বাজে
  আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে |

পরের দিন মধ্যরাত :
রবীন্দ্রনাথের শোবার ঘরে আলো জ্বলছে !
এখনো জেগে আছেন তিনি? পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকলেন |
কেমন আছেন ? প্রশ্ন করলেন রাবীন্দ্রনাথকে |
—- বউমা‚ ভাল না‚ এ-কথা বলে আরেকটা বায়োকেমিক ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ |

পরের দিন‚ অর্থাৎ ২৬শে সেপ্টেম্বর‚ বেলা সাতটা |
রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে লেখবার ঘরে এসে বসলেন |
হাতে কবিতার খাতা |

লিখছেন প্রতিমা দেবী : বুঝলুম এখন একটু ভালো আছেন | পায়ের ওপর মোটা কম্বল ঢাকা দিয়ে  দিলুম | কবিতার খাতা নিয়ে লিখতে লাগলেন | এই সময় এক পেয়ালা গরম কফিও খেলেন | প্রতিমা দেবী জিগ্যেস করলেন‚ একবার ডাক্তারকে ডাকাই ? ডাক্তার একেবারেই পছন্দ করতেন না | আজ কিন্তু কোনও আপত্তি করলেন না | এলেন ডাক্তার গোপালবাবু | বললেন‚ ও কিছু নয়‚ একটু ওষুধ খেলেই কমে যাবে | হজমের গোলমাল মাত্র |

ডাক্তারবাবু চলে গেলেন |
রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতার খবর পেয়ে মংপু থেকে কালিম্পঙে এসে পৌঁছলেন মৈত্রেয়ী দেবী | মৈত্রেয়ীকে দেখে রবীন্দ্রনাথের অসুস্থভাব যেন মিলিয়ে গেল | তিন – চারটে কবিতা পড়ে শোনালেন |
তারপর তাঁর নতুন লেখা গল্প ল্যাবরেটরি মৈত্রেয়ী দেবীর হাতে দিয়ে বললেন‚ বড়ই ইচ্ছে ছিল আমি নিজেই পাণ্ডুলিপি থেকে তোমাদের পড়ে শোনাই | কিন্তু সে আর আমার দ্বারা হল না | পড়ে নিয়ো | একথা বলে ওষুধ খেয়ে রবীন্দ্রনাথ খাটে গিয়ে শুলেন | পাশের ঘরে খাবার আয়োজন | মৈত্রেয়ী আর প্রতিমা সেই ঘরে |

হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের ঘর থেকে কাজের লোক কানাইয়ের চিৎকার |
ছুটে গেলেন প্রতিমা আর মৈত্রেয়ী |
রবীন্দ্রনাথের মুখ লাল |
চেতনা আচ্ছন্ন |
কাউকে চিনতে পারছেন না |
আবার ডাক্তার এলেন | তিনিও বুঝতে পারলেন না |
সন্ধের সময় এখানকার হাসপাতালের ডাক্তারকে নিয়ে আসবেন বলে চলে গেলেন |
হাসপাতালের ডাক্তারকে নিয়ে গোপালবাবু এলেন সন্ধ্যাবেলা |
হাসপাতালের ডাক্তার ভাল করে পরীক্ষা করে বললেন‚ কিডনির অসুখ‚ ইউরিমিয়া |
নতুন ডাক্তারকে রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হল !
তিনি মৈত্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে বললেন‚ডাক্তার ভাল মানুষ !
পরের দিন দুপুর বারোটা | রবীন্দ্রনাথ আবার অচেতন | রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ অনেক দূরে‚ যোগাযোগের বাইরেই বলা যায়‚আজকের বাংলাদেশের পতিসর গ্রামে তিনি |
তাঁকে খবর দেওয়ার চেষ্টা করা হল |
আর ব্যবস্থা হল দার্জিলিং থেকে ডাক্তার আনবার |
কলকাতাতেও ফোন করা হল | দার্জিলিং থেকে ডাক্তার এলেন রাত আটটায় |
লম্বা-চওড়া এক সাহেব ডাক্তার |
হার্ট পরীক্ষা করার জন্য রবীন্দ্রনাথের পাঞ্জাবির বোতাম খুললেন ডাক্তার |
সেই শেষবেলাকার রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীর দেখে ইংরেজ ডাক্তার বললেন‚‘What a body Dr. Tagore has!’

তারপর বললেন‚ টেগোরের ইউরিমিয়া হয়েছে |
রক্তে বিষক্রিয়া শুরু হয়েছে |
আজ রাত্তিরেই অপারেশন করতে হবে |
না হলে উনি বাঁচবেন না |
অসম্ভব ! বললেন প্রতিমা |
ডাক্তার বললেন‚‘You dont know what may happen tomorrow.’

পরের দিন‚২৮শে সেপ্টেম্বর |
কলকাতা থেকে এসে পৌঁছলেন তিন ডাক্তার‚জ্যোতিবাবু‚ অমিয় বাবু‚ সত্যসখা বাবু |
ওঁদের নিয়ে এসেছেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ |
সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কন্যা মীরা দেবীও এসেছেন |
দুপুর বারোটা নাগাদ এলেন আরও তিনজন‚ সুধাকান্ত বাবু‚অনিল বাবু‚সুরেন বাবু |

এসে পৌঁছল রথীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম — তিনি বাবামশায়ের অসুস্থতার খবর পেয়েছেন |
শেষপর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আসা সম্ভব হল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তাঁর নিজের ঘরে |
তখন তাঁর চেতনা সামান্য ফিরেছে |
জিজ্ঞেস করলেন‚ এ কোথায় আমাকে আনলে বউমা ?
প্রতিমা বললেন‚ এ যে আপনার পাথরের ঘর |
রবীন্দ্রনাথ উত্তরে বললেন‚ হ্যাঁ‚ পাথরেরই বটে | কী কঠিন বুক ! একটুও গলে না !
প্রতিমা নীরবে তাকিয়ে রইলেন |

জোড়াসাঁকোর বাড়িতে দু-মাস নিদারুণ অসুখের সঙ্গে লড়াই করলেন রবীন্দ্রনাথ |
প্রকাশিত হল পুজোর আনন্দবাজার |
তাতে বেরিয়েছে রবীন্দ্রনাথের ল্যাবরেটরি গল্পটি !
গল্পটি ছাপার অক্ষরে যেন নতুন করে ফিরে এল তাঁর কাছে !
সে কী আনন্দ তাঁর |

পুজোর পরের ঘটনা |
ডাক্তাররা আবার শুরু করেছেন আলোচনা |
রবীন্দ্রনাথের সার্জারি কি হতে পারে ?
মত দিলেন না বিখ্যাত ডাক্তার স্যর নীলরতন সরকার | অতএব অপারেশন স্থগিত |
ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ ফিরে পেয়েছেন পূর্ণ চেতনা |
তাঁর আচ্ছন্ন ভাবটি কেটে গেছে |
নভেম্বর মাসে শান্তিনিকেতনে ফিরে এলেন তিনি | শান্তিনিকেতনের মুক্ত পরিবেশে তিনি প্রাণিত বোধ করলেন | সেই চৈতন্যময় প্রেরণার কথা জানালেন কবিতায় :

চৈতন্যর পুণ্যস্রোতে
আমার হয়েছে অভিষেক‚
ললাটে দিয়েছে জয়লেখ‚
জানায়েছে অমৃতের আমি অধিকারী
পরম আমির সাথে যুক্ত হতে পারি
বিচিত্র জগতে
প্রবেশ লভিতে পারি আনন্দের পথে |

রবীন্দ্রনাথ ক্রমেই শীর্ণ হচ্ছেন |
তাঁর চোখের স্বাভাবিক উজ্বলতা‚ তাঁর তীক্ষ্ণ‚ তীব্র দৃষ্টি ক্রমে ভরে উঠেছে ক্লান্ত করুণায় !
প্রতিমা দেবী লিখছেন এই শেষ রবীন্দ্রনাথ যেন তপঃক্লিষ্ট ঋষি |
চলেছেন এক আধ্যাত্মিক আলোর সরণি পেরিয়ে মহাপ্রস্থানের পথে |
তিনি নিজেই বলেছেন ‚ আর বড় চুল রাখতে চাইনে |
তাই তাঁর রুপোলি চুল ছেঁটে ছোট করে দেওয়া হয়েছে |
তাঁকে দেখলেই মনে হয়‚ তিনি ঋষি এবং দার্শনিক | কিন্তু তাঁর কথা শুনলেই মনে হয় ‚ তাঁর শেষ পরিচয় তিনি কবি |

কানে কম শুনছেন রবীন্দ্রনাথ |
তাঁর বোধশক্তিও যেন ক্রমে ক্ষীণ !
কোনও গান শেষ হলে তিনি আজকাল হতাশভাবে বলেন‚ আমার কান সব নোট স্পর্শ করল না !
এসে পড়ল তাঁর জন্মদিন !
প্রকাশিত হল তাঁর জন্মদিনে বইখানি |
সকালে সেই বই তাঁর হাতে দেওয়া হল |
এই বইয়েরই একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন —-

আমি পৃথিবীর কবি‚ যেথা তার যত উঠে ধ্বনি
    আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখুনি |

এই তাঁর শেষ জন্মদিন |
সন্ধেবেলায় রবীন্দ্রনাথকে জন্মদিনের সাজে সাজিয়ে দেওয়া হল |
গরদের শুভ্র ধুতি | উত্তরীয় | গলায় ফুলের মালা | কপালে চন্দন |
সেই রূপ না দেখলে বিশ্বাস হয় না |
ফুটে উঠেছে সেই রূপে তাঁর অন্তরের জ্যোতি |
শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন থেকে থেকে মেয়েরা এল তাদের অন্তরের উপহার নিয়ে | কণ্ঠে তাদের রবীন্দ্রনাথের গান |
তারা সবাই পরেছে বাসন্তী কাপড় |
কাঁদতে কাঁদতে তারা রবীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে সাজিয়ে দিল নিবেদনের ডালা |
তিনি বললেন তাঁর মনের কথা—-সত্যদ্রষ্টা কবি দেখতে পেলেন সত্যকে :

জন্মদিনে মৃত্যুদিনে দোঁহে যবে করে মুখোমুখি
দেখি যেন সে মিলনে
পূর্বাচলে অস্তাচলে
অবসন্ন দিবসের দৃষ্টি বিনিময়—-
সমুজ্জ্বল গৌরবের প্রণত সুন্দর-অবসান |

এল বর্ষা | রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু | আটান্ন বছর বয়েসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন‚ আমার দিন ফুরাল ব্যাকুল বাদল সাঁঝে |
এই বর্ষাই রবীন্দ্রনাথের জীবনে শেষ বর্ষা |
এই বর্ষার পরে আর কোনও বর্ষা তাঁকে কোনওদিন পাবে না !
বর্ষা শুরু হতেই রবীন্দ্রনাথের অসুখ বাড়তে লাগল |
অবসান আর বেশি দূরের পথ নয় |
তাঁর রোজ জ্বর হয় |
তাঁর আঙুল অসাড় |
লিখতে পারেন না আর |
তিনি প্রতিমাকে বললেন‚ মা-মণি‚ আমি ক্রমশ নিভে যাচ্ছি | বুঝতে পারছি‚ এ-ব্যামোর হাত এড়াতে পারব না |
আমার কাজ চুকেছে |
আর কেন এ রোগযন্ত্রণা ভোগ ?
সেই রোগ যন্ত্রণার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ আষাঢ়ের রূপ দেখার জন্যে ব্যাকুল |
তাই তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে উত্তরায়ণের দোতলায় |
এই সময় তাঁর কবিরাজি চিকিৎসা চলছে |
চিকিৎসা করছেন কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ |
এমন সময় একদিন কলকাতা থেকে এলেন ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় | ষাট বছর বয়েসে খ্যাতির তুঙ্গে |
বললেন‚ শ্রাবণ মাসেই অপারেশন হবে !
আর বললেন‚ অপারেশনটা করিয়ে নেওয়াই ভাল‚ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব | সাবধানের মার নেই |
রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন‚ মারেরও সাবধান নেই !

 

আরও পড়ুন:  ঠাকুরের পিছনে দাঁড়ানো রামলাল ভাবছিল...আমার কি গাড়ু-গামছা বওয়া সার হল ?

( আগামী পর্বে সমাপ্য )

( পুনর্মুদ্রিত )

Sponsored
loading...

4 COMMENTS

  1. নিজেকে ধন্য মনে হল প্রতিবেদনটি পড়ার পর।