প্রিয়তমাষু,

আজ বিকেলে পুষ্করিণীর পশ্চিম প্রান্তে কাঁঠাল গাছের পিছনে ঠিক বিকেল ৪ টার সময় উপস্থিত থাকিও, আমি প্রাচীরগাত্রের অপর পার হইতে তিনবার ঘুঘুর ডাক ডাকিব, শুনিলেই তুমি শূন্যে একটি পাথর ছুঁড়িয়া জানান দিও, আমি বুঝিতে পারিব, তুমি হাজির হইয়াছ, প্রাচীর ডিঙাইয়া আমিও হাজির হইয়া যাইব। দেখো, খুব সাবধানে পল্টুর হাত দিয়া এই পত্র পাঠাইতেছি। কাকপক্ষীটিও যেন এ বার্তা জানিতে না পারে। জ্যাঠামশাই হালে ঈষৎ সন্দিহান হইয়াছেন, তাই বাহিরমহলে যাওয়া আমার একপ্রকার নিষেধ, বলিতে পারো। তবুও দরোয়ান শামসের সিংকে নগদ পাঁচ টাকা বখশিস দিয়া হাত করিয়াছি। বিকেলের মুখে খিড়কির দরওয়াজা দিয়া বাহির হইয়া যাইবো। অধিক কি বলি ! হে প্রানাধিকা, তোমার অধরোষ্ঠে শতসহস্র চুম্বন। তোমার করকমলে লজ্জারুণ সূর্যের মত কবোষ্ণ ও রক্তিম করপীড়ণ। তোমার …..থাক, অলমিতি বিস্তারেন, বাকি সাক্ষাতে।

ইতি,

তোমার প্রণয়াকাঙ্খী ভজগোবিন্দ

আহা, এমন দিন আমাদেরও আসিল।এমন অলৌকিক রক্তিম ফেব্রুয়ারির বিকেল সত্যই ছিল বাঙালির আস্তিনে। যৌবন সরসী নীরে, ধড়ফড় অফিসফেরত সাড়ে পাঁচ আনা ট্রামের ভিড়ে, হেদুয়ায়, কলেজ স্ট্রিট কিংবা কলুটোলায় বিকেলের মুখে ফড়ফড়িয়ে একটা প্রগলভ হাওয়া বইতো এ শহরের অলিগলি, চৌমাথা, পিচরাস্তা ও চিলেকোঠার ছাদ ঘিরে। আবীরগন্ধে মহুল মাতাল একটা গোলাপি আভার বসন্তপূর্ণিমার নষ্টচন্দ্র চাঁদ বেহায়ার মতো ভেসে উঠতো সন্ধ্যের পশ্চিমাস্য আকাশপটে। প্রণয়ীরা পরস্পরকে চিঠিচাপাটি দিয়ে আহ্বান করতেন বিকেলের দিকে। জোড়ায় জোড়ায় পানসি ভেসে যেত উদাসী হাওয়ার বাবুঘাটে, আনন্দসাম্পানে, ময়দানে, লেনে, বাইলেনে, ভিক্টরিয়ায়। কলকাতা সেদিন অবধিও কল্লোলিনী ছিল, কিন্তু আজকের মত তিলোত্তমা হয়নি।

প্রেমের দিনক্ষণ নিয়ে ভাবিত ছিলেন না কেউই। ভাদ্র মাসে যেমতি সারমেয়, তেমনটি তো মানুষের নয়, তাই সেদিন অবধিও হরমোন অপেক্ষা মনই বেশি প্রেফারেবল ছিল প্রেমের উদ্গাতা দেবতার যৌবনোদ্গমে। বছরের কোন সময়ে কার তনুমনে ও দেহে যুগপৎ, কখন তীর বিঁধে এফোঁড় ওফোঁড় করবে তা দেবা নো জানন্তি, কুতো মনুষ্যঃ। তাই ভ্যালেন্টাইন কি বস্তু আমদানি না হলেও, প্রেম ছিল সম্বৎসরের ক্যালেন্ডারে, শুধু ফেব্রুয়ারির কুক্ষিগত এক হপ্তার নয়।

আরও পড়ুন:  গোরুর মুখের খবর

আসলে প্রেম নিয়ে, চুমু নিয়ে, গোলাপ নিয়ে, খোলাখুলি উৎসবের রোশনাই জ্বালাবার প্রয়োজন পড়েনি তখনও। প্রেম স্বাভাবিক ছিল বটে, কিন্তু উদযাপন করে “ওরে, প্রেম বলে আমাদের ডিকশনারিতে একটি শব্দ আছে!” সেটা তারস্বরে প্রচার করার মতো বেয়াক্কেলে আর নির্লজ্জ মানুষ হয়ে যায়নি। প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে সমর্থ ছেলেরা ও মেয়েরা নিজ নিজ প্রেমের মৌসমে প্রায় অধোবদনে লজ্জারাঙা চিত্তে, গাছের পাতা ছিঁড়ে, ময়দানের ঘাস উৎপাটন করে, ধুতির খুঁট ও শাড়ির আঁচল যুগপৎ আঙুলে জড়িয়ে, বিড়বিড় ওষ্ঠে মা, কিংবা ঘনিষ্ট দিদি, অথবা বৌদিদির কাছে জানাতো ,…” আমার না, ইয়ে, মানে ও বাড়ির সীমাকে খুব ভালো লাগে” ইত্যাদি । প্রতিটি বাড়িতে যুপকাষ্ঠের মতো এক একজন জ্যাঠামশাই থাকতেন, যারা চল্লিশেই হয়ে উঠতেন যৌবন অতিক্রান্ত ও পারিবারিক শুচিতার সংস্কৃতির ডাকসাইটে রকমের একনিষ্ঠ ধারক ও বাহক। চুমু-টুমু নিয়ে কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি রকমের হ্যাহ্যা হিহি প্রগলভতা তাঁদের যারপরনাই রকম অপছন্দ। সেই ছেলেবেলায় দেখেছি এমনকি কাকিমাসুলভ বা বৌদিদিগোত্ৰীয়া কেউ শিশুজ্ঞানে ভালোবেসে তার অধরোষ্ঠ আমার গালে চেপে ধরলেও, রাঙ্গাজেঠামশাই ব্যাপক ভাবেই ক্ষুব্ধ হতেন এবং তোয়ালে দিয়ে গাল মুছতে মুছতে গজগজ করতেন , সেই ব্যক্তিটির অবিমৃষ্যকারিতায়।

ছেলেবেলার চুমু ছিল নিতান্ত নিরামিষ। ওতে প্রসাদী ফলের গন্ধ থাকত। বড়জোর জনসন এন্ড জনসনের ক্রিমের খোশবাই আর অনেকটা লাল ঝোল মাখা আধো আধো লবজের মিঠে বুলি।চুমুরও যে আমিষ খাদ্যাখাদ্য হয় সেটা প্রথম বুঝলুম, পিসি, কাকি, মা এদের সাথে ‘সিলসিলা’ ছবি দেখতে গিয়ে। অবোধ কিশোর বিটনুন ও বাদামের দিকে অধিক মনোনিবেশ করে ভুলক্রমে স্ক্রিনে তাকাতেই দেখি শ্রীল শ্রীযুক্ত অমিতাভ বচ্চন “নীলা আসমা” গাইতে গাইতে যেই না সুন্দরী নায়িকা রেখাকে নিয়ে ঘাসবনের গভীরে ডুব দিলেন, অমনি না জানি কোথা থেকে, দুই হতচ্ছাড়া ফুল এসে পর্দা জুড়ে দিল আর আমার মনের গভীরে গভীর উৎকণ্ঠা ও কৌতূহলে এর পরের এপিসোডে ঠিক কি ঘটিল, সেটি জানার দুর্দমনীয় ইচ্ছে আমায় বড় করে দিল অনেকখানি। তারপর অনেক গলা খাঁকারি, অনেক ঢোঁক গেলা, অনেক কাকভোরে কাপড় পাল্টানো ইত্যাদির শারীরবৃত্তিয় রূপান্তরের মাঝখানেই গঙ্গা দিয়ে জল গড়ালো অনেক। ক্লাস ইলেভেন পদাবলী সাহিত্য পড়তে গিয়ে বিলক্ষণ লক্ষ্য করলাম চুমুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যান ও প্রয়োজন। অপাঙ্গে মুচকি হেসে সঙ্গের বান্ধবীটিও কানে কানে কলেজ ফেস্ট এর দিন, সাজঘরের পিছনে দেখা করতে বললে। প্রথম অনুভব করলাম প্রেমের এক রকম ‘রেড লেটার ডে’ হয় বটে। কালিদাস থেকে রেফারেন্স নিয়ে নিয়ে, বাৎস্যায়নের শাস্ত্র, সূত্রগুলি গুলে খেয়ে বাঙালি “চুমু খাবো” বলে উপবাস করা শুরু করলো সেইদিন ইস্তক, প্রেম ” করতে হয়” বলে প্রেম “করা” শুরু করলো। পবিত্র সেন্ট্রাল পার্ক বা মঙ্গল পান্ডে উদ্যানের সান্ধ্যকালীন কৌলিন্য নিয়ে, কারোর মনে প্রশ্ন জাগলো না আর।

আরও পড়ুন:  সাংবাদিক তুমি...।।

সেকালে ভ্যালেনটাইন দেবতার দাপট ছিল না বস্তুত, আমরা সরস্বতীতেই খুশি ছিলুম। পাড়ার, ইশকুলের এবং নিজ নিজ কোচিং সেন্টারের সরস্বতী পুজো বড়জোর বইমেলার মাঠেই বাঙালি বছরভর প্রেমের প্রিলিমিনারি ডোজ পেয়ে যেত সোজাসাপ্টা।সত্তরের দশকের শেষের দিকটায় যখন ক্ষয় ধরলো একান্নবর্তী পরিবারগুলোয়, তখন রোজগার বড় দায়। সাইতিরিশ জনের এক ছাদের নিচে থাকা আর বাঙালির কুলোলো না। হিজ হিজ, হুস হুজ কনসেপ্টের সময়োপোযোগিতা নিয়ে নিঃসন্দিহান হলো সকলে। হাঁড়ি আলাদা আলাদা হল প্রায় প্রতিটি সংসারে।ওয়াটার  প্যুরিফয়ার বেচা, বেচারা সেলসম্যান প্রেমিক’দের ঘুমোবার সময় ছিল না তো চুমোবার দিন দূর অস্ত। তাই পুজো পাব্বনে প্যান্ডেলের অনাচ কানাচ, ছুটির দিনে লাস্ট ট্রিপে পূর্ণ সিনেমার ব্যালকনির কোনের টিকিট আর খুব বেশি হলে পাড়ার মোড়ের বাসন্তি কেবিনে পর্দা ঢাকা কেঠো এনামেলের গন্ধ ওঠা কেবিনে আঙুলে আঙুলে হালকা ছোয়াঁছুই, এই অব্দিই ছিল মোল্লার দৌড়। এই সকল দৌড়ের মাঝে বিজয়িনীরা যারা ছাদনাতলা অবধি পৌঁছলেন তারা তো প্রেমের এপিটোম, আর যারা পারলেন না , তারা মাসখানেক হাফসোল খেয়ে, গালে দাড়ি ও কাঁধে ঝোলা রেখে শরৎ চাটুজ্যেকে প্রমান করার ব্যর্থ চেষ্টা করেও শেষমেশ দেবদাসের মত কেউই মরতে পারলে না এবং কাজে কাজেই পরের ফাল্গুনে বাড়ির মনোনীত পাত্রীটিকে বিবাহ করিয়া, অতঃপর সুখে শান্তিতে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন ।

তবে শুরুতেই যেমন বলেছি তখনো চুমু-টুমুর মত সহজিয়া সাধারণ ব্যাপারের দিনপালন করার মত কোনো উদ্যোগ ঘটেনি এখন সরকার বাহাদুর পর্যন্ত পারলে প্রায় সেমিনার করে প্রেম সংরক্ষণী দিবস পালন করেন, প্রেম এতটাই অভয়ারণ্যে রাখবার মত স্পিসিস হয়ে উঠেছে! চকোলেট ইকুয়াল টু আকুলতা, প্রপোজাল মানেই প্রেমের মায়াজাল, প্রণয়িনী’কে টেডি দিয়েই গদগদ চিত্তের স্টেডি ইজহার ,এমন শিশুবোধ্য থিওরিও আমদানি হয়নি। এখন যেমন বস্তিতে, ওভারব্রিজের নিচে, এজমালি কলোনিতে জায়গায় জায়গায় শিলান্যাস করে রবিঠাকুর বা নেতাজি সুভাষের বিতিকিচ্ছিরি মূর্তি বসিয়ে , সরকারি পক্ষ থেকে দরকারি “লহো প্রণাম” বাড়াবাড়ি রকম দিন পালন হয় তারা আজ নেই বলে, চুম্বন কি বাঙালির জীবনে এতখানি ব্রাত্য হয়ে পড়ল যে দিন পালন করে তার ছবিতে মালা পরিয়ে তাকে স্বরণ করতে হবে ? নাকি এ সবই “আমেরিকার ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও বিশ্বজোড়া বিপননের ভোগবাদী ফাঁদ ?” না, ট্রাম্পের কথা টথা থাক, বরং হ্যাশট্যাগে #হোকচুম্বনে ভোট দিই আমরা। আর আদপে হয়েছেটা কি, এখন মানুষের রেস্ত’তে শেষ তো নেই, তাই জড়াজড়ি দিন জোরাজুরি, অথবা গোলাপ দিবসের প্রলাপ থেকে চকোলেট দিনের শুরুওয়াত সবেতেই বাঙালির “আর কোনো খেদ নাই, নাই কোনো ভাবনা”। আমরা চিরকালই আধুনিক ছিলাম, এখন অত্যাধুনিক হইয়াছি । আমেরিকা ঢিল ছুঁড়লে গড়িয়াহাট পড়তে এখন আর কয়েক আলোকবর্ষ লাগেনা। আমরা বেকার, মুখহীন, বুকহীন প্রজন্ম হতেই পারি, তবুও ফেস ও বুক উভয়েই আমাদের জ্বলজ্বল করিতেছে চোখ মারা প্রোফাইল পিকে সামাজিক দেওয়ালে। পিক মুহু মুহু ডাকিতেছে ও যুগপৎ টুইট করিতেছে ঝিনচ্যাক যৌবনের ঝটকায় ও মটকায়। ফেসবুকের জানলা খুলিলেই প্রণয়ের বান ডাকিতেছে। গতস্য শোচনা নাস্তি। তাই “উত্তিস্থত , জাগ্রত , বরেন্য, নিবধত। ..” জাগো বাঙালি জাগো এবং ভালো মাত্রায় মাউথ ওয়াশ দিয়ে কুলকুচি সেরে চুমু সেবন করো। নিজে খাও এবং অন্যকেও খাওয়ার সুযোগ করে দাও। রাঙা জেঠামশাইরা আর বেঁচে নেই, তাই কুছ পরোয়া নেহি!

আরও পড়ুন:  গোরুর মুখের খবর
- Might Interest You

1 COMMENT

এমন আরো নিবন্ধ