ধরতাইঃ ছিন্নমস্তা রেস ২০১৬ হইহই করে শেষ হয়। অম্বা, রম্ভা, কিস্বে আর কম্‌বা তখনো সাফল্যের শিহরণে কম্পমান।

 পুরুষ উদ্যোগ

দর্শকের ভীড়ের মধ্যে লাফাইও ছিল। ছিল ওর দুই বন্ধু ঝাঁপাই আর কাঁপাই। উৎসাহ আর উত্তেজনা আর হাততালি সবেতেই দিব্যি ছিল! কিন্তু রেস শেষ হতেই পাড়ার চায়ের দোকানে ঠেকবাজি করতে করতে ঝাঁপাই-কাঁপাই গলগলিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিল। লাফাই সবে অম্বাদের পিঠ চাপড়াতে যাচ্ছিল, এমন সময় পান পরাগ ইস্টাইলে থুতু ফেলে দেবব্রত বিশ্বাস মার্কা খাদে গলা নামিয়ে কাঁপাই শুরু করল… লজ্জা করে না!

লাফাই তাড়াতাড়ি (পুরুষালি প্রতিবর্তক্রিয়াবশতঃ) দেখে নেয় চেন খোলা কি না। যত পৌরুষ তো সালা গলার চেনে, হাতের চেনে আর প্যান্টের চেনে! …নিশ্চিন্ত হয়ে টাক ঝাঁকিয়ে প্রতি-আক্রমণে যায়… কেন ভাই, কিসে্‌র লজ্জা বল তো!

দেখতে পেলি না অম্বারা কেমন করে দেখিয়ে দিল! ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে নাকের ডগা দিয়ে বাইক হাঁকিয়ে দিল! থানার ওসি থেকে শুরু করে স্‌ব্বোজিতকে অবধি স্টেজে তুলে দিল! মিডিয়া, নারীবাদি মাইলেজ, ঝালমুড়ি কি ছিল না! আর আমরা! কাঁপাইয়ের গলা চড়েও চড়ে না।

– ভ্যারেন্ডা ভাজছি! সালা; ছেলে হয়ে মেয়েদের বাইকের পেছনে বসে গুলি ফোলাচ্ছি!! ঝাঁপাই প্রথমেই সি শার্প।

– কেন, তাতে তোর সমস্যাটা কি? ওদের মনে হয়েছে, করতে চেয়েছে…, করেছে… মিটে গেল! এতে খামোখা আমার-তোর লজ্জ্বা পাবার কি আছে মাথার ওপর দিয়ে গেল ভাই! লাফাই বলে।

– সবই কি আর  ভিনিভিডিভিসি হয়! কাঁপাই বলে।

– ছেলে মেয়ে সমান হয়ে গেল বাইক চালালেই? এতদিন কার প্রয়োজন, সংস্কৃতি, ইসে, সব জলাঞ্জলি? ওরা সালা আরাম্‌সে প্যান্ট পরে নেয়। আমরা প্যান্টও ছাড়তে পারি না, শাড়িও পড়তে পারি না। ঝাঁপাই বলে।

– পরে দেখলেই পারিস! দুল দিয়ে শুরু কর! লাফাই চালিয়ে যায়।

– না না আমাদেরও কিছু করতে হবে। ঝাঁপাই গায়ে মাখে না লাফাইয়ের কথা।

– কি করবি? মানে, এখন কিছু করছিস না?

– না না, ও তা বলেনি লাফাই…, কাঁপাই বলে, অন্য কিছু … রবীন্দ্রনাথ বলেছেন উপার্জনের বিনিময় ছাড়া যে কাজ মানুষ করে তাই দিয়েই মানুষ…

– তুই তো দেখছি অপ্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের গুদাম! কবে কোথায় এসব বলেছে রে?

– আমি বলছিলাম কি বলতে চেয়েছেন।

– তুই ঠিক কে? “দেশ” না দীনু ঠাকুর না প্রশান্ত কুমার পাল! লাফাই বলে।

– আমি খেয়াল করাচ্ছিলাম, কাঁপাই কাঁধ ঝাঁকায়, করবি কি না তোদের ব্যাপার।

– না না, করতেই হবে। ঝাঁপাই মাথার বড় বড় চুলে আঙুল চালায়… কিছু একটা… এক্সক্লুসিভ কিছু; যেটা আগে কখনো হয় নি… সামুদ্রিক মাছের রেস্তরাঁ…… রাগপ্রধাণ জীবনমুখী গান….. ন্যাংটো ছেলেদের ফ্যাশান প্যারেড….. বৃদ্ধাশ্রমে সোয়াবিন-সূর্যমুখীর খামার……

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৫)

– প্রডাকশনে যাস না, সার্ভিস ইজ় ফিউচার। কাঁপাই বিশেষজ্ঞের মতামত দেয়! লেবার ইন্টেন্সিভ কাজকর্ম পুরো চায়নার দখলে। ওদের বাড়বাড়ন্ত একটু কমেছে, ইটি তে একটা আর্টিকল দেখলাম; মোদিও খাটাখাটনি করছে; কিন্তু মাথাটাই আসল; আলটিমেট! …… আজো বাংলা যা ভাবে…

– বাংলা মানে আমি-তুই! লাফাই চোখ পাকিয়ে ঠোঁটব্যাদান করে।

– কেন, আমরা কি বাংলার বাইরে?

– কাশী দা, দাও, চা-ই দাও আরেকটা করে…

– আমিও ভাবছিলাম, জানো; আমাদের একটা ছোট পত্রিকাও ছিল, তৃতীয় সংখ্যা অবধি টেনেছিলাম…; এ ভাবে আর চলে না; কাশীদার আবেগি গলা।

– চায়ের সাথে লিটল ম্যাগাজিন! তুমি তো পুরো কফি হাউসের ছাদ উপড়ে চা –ভার্সন করে দিলে! লাফাই বলে।

– এটারই তো পরিশীলিত ভার্সন অক্সফোর্ড পার্ক স্ট্রীটে করছে! দেখেছিস!! আবার সার্ভিস! কাঁপাই রেফারেন্স দেয়।

– একটা কথা বলি কাশী দা; তুমি না চা-টা ভালোই করো। নতুন করে এখন আর লেখালেখির চেষ্টাটা কোরো না। লাফাই বলে।

– আমি জানি আমি কি পারি; তোমায় বলতে হবে না। তাই চা-টাই করি। কিন্তু আমার ইচ্ছেটাতো কাঁপাই বলে দিল, এটা বেশ একটা ওপেন এয়ার কফি হাউস হত, ধরো, বেশী না, এখান থেকে ওই কেকের দোকানের সামনে অটো স্ট্যান্ডটা অবধি, এদিক ওদিক বেঞ্চ পাতা, তোমরা সব বান্ধবী নিয়ে আলোচনা করছ… জানো, লেখালেখির থেকেও আলোচনাটা কত দামী?? সালা পার্টির জন্য…

– বান্ধবীরা ঠিক কি করবে? খাবে না আলোচনা করবে? লাফাই বলে।

– কাশীদা ঠিকই বলেছে। এটাই ট্রেন্ড। দেখিস না, লোকসভা-বিধানসভাতেও মহিলা রাখতে হয় আবার আর্ট গ্যালারিতেও ম্যাছেলে লাগে? কাঁপাই বোঝাতে পারবে ব্যাপারটা।

– কেন সোনা, ও সাংবাদিক বলে সব জানে?

– গুড আইডিয়া কাশী দা! ওদের বাল-ছাল কথায় কান দিও না। কিন্তু তোমাকে সিস্টেমে থেকেই সিস্টেম ভাঙতে হবে। কাঁপাইয়ের গলা আবার খাদে নেমে যায়… তোমাকে অটোঅলাদের থেকে বেশী বিড্‌ করতে হবে। আর যেহেতু দুটোই পার্টির ব্যাপার; তোমাকে পার্টির মাথাকে ধরতে হবে! ব্যক্তি দিয়ে সমষ্টিকে মারতে হবে। এরা আগের পার্টির থেকেও অধম!

– পুরো এন ডি টিভি স্টার আনন্দের হাইব্রিড কাকা আমার! আগের পার্টিটাকেও তো তার আগেরটার থেকে অধম বলেছিলি। লাফাই বলে।

– মহান গণতন্ত্র; ঝাঁপাই বলে; কাঁপাই! এবার জ্ঞান-ডোজ়টা একটু কমালে হয় না?

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৬)

– এই ক্রাইসিসটা মধ্যবিত্তের সবসময়েই থাকে, তুই বা তোরা নতুন না। ফাঁকটা দেখিয়ে দিলে বলে ফুটো দেখাচ্ছে, তথ্য আর অ্যাপ্লিকেশনের তালমিল করিয়ে দিতে গেলে বলে জ্ঞান দিচ্ছে।

–  হ্যাজাস না, তিন রাউন্ড চা হয়ে গেছে… ঝাঁপাইয়ের পা নিশপিশ করে ঝাঁপানোর জন্য। কিস্বের বাইকের পেছনে স্‌ব্বোজিতের হুলটা ও এখনো ভুলতে পারছে না।

– দাঁড়া, কাঁপাইয়ের থট প্রসেসটা চালু হতে দে! আমাদের বাংলার প্রতিনিধি, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক! লাফাই বলে।

– আওয়াজ দিচ্ছিস দে, কিন্তু আমাদের বেশীর ভাগটাই টট প্রসেস! আমরা শেখানোর বাইরে বেরোতে পারি না।

– ফাটিয়ে দিলি কাকা, লাফাই স্ট্যান্ডিং ওভেশন দেয়; …এই নি—দারুণ উপলব্ধি গুলোর জন্যই তুই কাঁপাই থেকে গেলি, ঝাঁপাই হতে পারলি না! … দারুণ বলেছিস।

– …… শোন, আমরা কাশীদার আইডিয়াটাই প্রোমোট করব। যতই যাই হোক না কেন, মানুষ খাবেই; ভাববেই! …কাঁপাই একবার বাংলা সিরিয়ালের মনসা-মার্কা দৃষ্টিবাণ মেরে নেয় লাফাইকে; তোর দ্বারা এটুকুও হবে না….. ছিনমস্তার ওপর, এই রথতলাতেই। কাশীদা, রেডি হও। ঝাঁপাই !!

-এই ঝাঁপালাম বলে। কাশীদা বলে।

– লাফাই, তোর ক্লায়েন্টদের বলে… খুব সিম্পল ফান্ডা, … কিছু টাকা লাগবে; মেশোমশাইকেও বলতে পারিস…

– হ্যাঁ রে, বেয়ারার চেক নিয়ে বসে আছেন তোর মেসোমশাই! লাফাই টাকে হাত বোলায়।

– একশোটা কাপ, চায়ের সরঞ্জাম, … মেনু কি রাখবে! কাশীদাও ইন অ্যাকশান।

– পুরো ভেজ করবি! খুব খাচ্ছে আজকাল! ঝাঁপাই বলে।

– বাল খাচ্ছে! ওসব ফান্ডাবাজি। তুই খাস? খাবি তো সেই চিল্লি চিকেন আর আন্ডারোল। লাফাই বলে।

– না না, খাওয়াতে হবে… প্রোমোশনটাই সবথেকে জরুরী। কাঁপাই বলে। মার্কেটিং ইজ় আর্ট।

– এটাও কি অপ্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ?

– না, ঠিক মনে পড়ছে না; … আচ্ছা! রবীন্দ্রনাথ সবটা পড়েছিস?

Bangla Romyo Rachona– পাগল নাকি?

– তোরা থামলি? কাজের কথা বল- ছেলেরা সার্ভ করবে না মেয়েরা! ঝাঁপাই বেশ উত্তেজিত বোধ করে।

– আবার কাঁচা কাজ, জেন্ডার বায়াস চলবে না। ওটাও ব্যাকডেটেট। … লাফাই, তুই শুধু প্রজেক্ট ফিসিবিলিটি আর ফিন্যান্সটা দ্যাখ। কাশীদা একজিকিউশন।

– আর তুমি চাঁদু শুধু কনসেপ্ট!! লাফাই আংলি চালিয়ে যায় বটে, কিন্তু আসল কথা ও-ও লাফাবে কি লাফাবে না ঠিক বুঝতে পারে না।

– আর ছেলে-মেয়ে থাকবেই বস্‌। তুমি একটা জিন্স পরে নিলে আর আমি খানিক ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কেঁদে নিলাম তা হলেই সব সমান হয়ে গেল! একি বাসের লেডিস সিট নাকি, তুলে দিলি আর সব সমান! সেই “দাদা, সোজা হয়ে দাঁড়ান”, “মেয়েদের বসতে দেবার ভদ্রতাটাও নেই” থেকেই যায়। ঝাঁপাইয়ের স্বপ্নে জাগরণে অরকিকের হুলিয়া আর হুল।

আরও পড়ুন:  মশাসুর

– তোদের স্বভাব বদলা। কাঁপাই বলে।

– আর আমি যে একজন নারীবাদি কবিকে হাওড়ার টিকিটের জেনারেল লাইন থেকে স্বামীকে সরিয়ে নিজেকে লেডিজ লাইনে দাঁড়াতে দেখেছি? এও কি তোর বুকনি আর ফলিত বিদ্যার তফাত? লাফাই ফুঁসে ওঠে।

– যতই প্যান্ট পরো মামনি, হিসি করতে …

– এই কাশী দা, তুমি না লিটল ম্যাগাজিন করতে? বিলো দ্য বেল্টও এখন অবসোলিট। বিবেক-কাঁপাই গলা তোলে।

– তোর বাবা অবসোলিট। কে যেন বলে।

– ওসব ছাড় লাফাই, এখন আমাদের এটা করে দেখাতেই হবে। অম্বার দিব্যি, তুই মেসোমশাইকে ফিট কর! ঝাঁপাই থামাতে চেষ্টা করে।

– অম্বা আবার টপকালো কোত্থেকে?

– ছাড়ো লাফাই, তুমি দাদাকে বলো। উনি খুব দিল্‌দরিয়া মানুষ। বৌদি মারা যাবার পর তো…

– বাবা শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গেছেন।

– সেই গেলেন, অ্যাঁ; আর বৌদি কত দুঃখ করতেন…

– তাহলে আজ রাতেই বাজেটটা নামিয়ে ফ্যাল না! কাঁপাই বলে।

– আগে ঠিক কর আমাকে দিয়ে হবে কি হবে না! বারবার পালটি খাস না।

– আমার কাছে অপশন নেই…

– কে আমার পালটিভাই মালিয়া রে!

– ও ভাবে বোলো না লাফাই; কমিউনিস্টরা যদি আজ রাশিয়া কাল রামনবমী করতে পারে তাহলে কাঁপাই তো কোন ছাড়!… কাশী দা ফুট কাটে।

– তোমাদের সঙ্গে কোনো কিছুতেই আমি নেই। কাঁপাই কাশীদার দিকে তাকিয়ে উঠে পরে বেঞ্চি ঠেলে, লাফাই-ঝাঁপাই উলটে পরে আর কি!

– আরে দাঁড়াও, শেষ করতে দাও, কাশীদা টেনে বসায় কাঁপাইকে, সবই তো যৌথ খামারের আশায়, কি বলো কমরেডরা!!

লাফাই-ঝাঁপাই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে জাপানি কায়দায়, আর কাশীদাও বিনয়াবনত! সৌজন্যের ঢে কুচ কুচ দেখতে ছোট্ট ভীড় জমে যায়।

কাঁপাই কোনোরকমে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটা দেয় গটগটিয়ে।

– “যেও না কাঁপাই, এটা আবার একটা ঐতিহাসিক ভুল করছ”, আকাশ বাণী শোনা যায় আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে, “তোমাকেও সিস্টেমে থেকেই সিস্টেমকে ভাঙতে হবে, কাশীদাকে বলছিলে না?  মনু তোমায় ক্ষমা করবেন না”।

 

– কাশীদা, এ মনু কি আমাগো বাপের বাপ মনু? লাফাই আকাশের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞাসা করে।

কাশীদা হাত জোড় করে আকাশের দিকে পেন্নাম করতে করতে উত্তর দেয়, হ মনু।

 

লাফাইতাইলা ফাই (২) –http://banglalive.com/the-story-of-an-unprecedented-bike-race/

লাফাইতাইলা ফাই –http://banglalive.com/the-animated-story-of-an-animated-alpha-male-his-animated-girlfriend-and-animated-surroundings/

NO COMMENTS