নীহারুল ইসলাম
জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে (। শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। এযাবৎ তিন শতাধিক গল্পের রচয়িতা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক “ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পগ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত “সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান “উত্তর বাংলা পদক” প্রাপ্তি (২০১১)।

আব্বা, একটু আগে তোমার ছোট মেয়ে নীলু ফোন করে জিজ্ঞেস করছিল, ঈদে সবাই বাড়ি এসেছে কিনা? সবাই বলতে এখন শুধু বড়দা আর ছোটদা, তোমার মতো ওরা দু’জনই শুধু বাইরে থাকে। মেজদা তো আর আজকাল তেমন বাড়ির বাইরে কোথাও বের হয় না। আব্বা, তুমি ঠিকই বলতে, তুমি ছাড়া সে একদিনও বাড়ির বাইরে টিকতে পারবে না। সত্যিই টিকতে পারেনি। মেজদাটা না কেমন হয়ে যাচ্ছে যেন! দিনকে দিন বড্ড ঘরকুনো হয়ে পড়ছে। অবশ্য বড়দা আর ছোটদা সেই দূর দেশে তোমার দেখানো পথেই বাণিজ্য করছে। খুব সুনামের সঙ্গেই করছে। ওদের নিষ্ঠা ও শ্রমের সঙ্গে তোমার নাম জড়িয়ে আছে যে! 

যাই হোক, আমি নীলুকে বললাম, ‘হ্যাঁ রে হ্যাঁ- সবাই এসেছে। বাড়ি একবারে গমগম করছে। তুই এলে কী যে ভাল লাগত!’ কিন্তু, তুমি যে আসোনি! এ কথাটা বলতে পারলাম না। অবশ্য সে জানে তুমি যেখানে গেছ সেখান থেকে ফিরে আসা যায় না। কেউ আর ফিরে আসে না। আসতে পারে না। কিংবা হয়ত আসতে চায় না। তাই হয়ত সেও তোমার কথা আলাদা করে আর জানতে চায়নি। আর আমি যদি আগ বাড়িয়ে তোমার না আসার কথা বলতাম, তোমার ছোট মেয়ে নীলু হয়ত হাউ হাউ করে কাঁদত! তোমার সেটা ভাল লাগত না। জানো আব্বা- তুমি যেমন ওকে কাঁদাতে চাইতে না, আমিও ওকে কাঁদাতে চাই না …

এই পর্যন্ত লিখে আমার নিজেরই চোখ কেমন ছলছল করে উঠল। যদিও চোখ মুছে আমি আবার লিখতে শুরু করলামঃ

মনের কথা লিখে হালকা হওয়া যায়। আব্বা, এটা আমি তোমার কাছে শিখেছি। আমি দেখতাম কোনও ব্যাপারে কষ্ট পেলে তুমি ডায়েরি লিখতে। ডায়েরি লিখে তুমি তোমার মনের কষ্ট লাঘব করতে। তোমার সেইসব ডায়েরি এখনও আমার সংরক্ষণে আছে। কখনও কখনও আমি সেগুলি খুলে পড়ি। পড়ি বলেই দেখ, আমিও কেমন তোমার মতো ডায়েরি লিখতে শিখে গেছি। আর কেমন চুপি চুপি নিজের কান্নাটাও চেপে যেতে শিখেছি। যাক গে সেকথা! তুমি হয়ত ভাবছ আমরা তোমায় ভুলে আছি! আমরা তোমাকে আর স্মরণ করি না! সম্ভব হলে এসে দেখে যাও আব্বা, এই তো আজ সন্ধ্যা থেকে কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আমরা তোমাকে নিয়েই মেতে ছিলাম। শুধু তোমার কথা হচ্ছিল! তুমি কী খেতে ভালবাসতে? তুমি কী পরতে ভালবাসতে? তুমি কী করতে ভালবাসতে? আমাদের এসব কথার মাঝে তুমি না থেকেও যেন আমাদের সঙ্গেই ছিলে। বড়দা, মেজদা, ছোটদা আর আমি একটার পর একটা তোমার গল্প বলে যাচ্ছিলাম! তার মধ্যেই নীলুর ফোন। আমিই তার সঙ্গে কথা বলছিলাম, সেই ফাঁকে যে যার ঘরে চলে গেছে। অবশ্য ওদের যাওয়াটাই স্বাভাবিক। রাত অনেক হয়ে গেছিল। তাছাড়া ওদের স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। তার ওপর কাল আবার ঈদ। খুশির পরব। খুব ভোর ভোর ওদের আবার ঘুম থেকে উঠতে হবে। যদিও আমার ওসবের বালাই নেই। যখন ইচ্ছে ঘুম থেকে উঠব। মন চাইলে ঈদ্গাহায় গিয়ে ঈদের নামাজ পড়ব। না চাইলে পড়ব না, নিজের বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেব সকালটা। কিংবা চলে যাব পদ্মার পাড়ে। বসে থাকব অনেকক্ষণ। পদ্মার পানিতে ক্ষণে ক্ষণে পৃথিবীর রঙ কীভাবে বদলে যায়, দেখব। আমার এই উদাসীন স্বভাবের জন্যে তুমি খুব রাগ করতে আব্বা। কিন্তু তুমি তো জানো, আমার যে ওসব ভাল লাগে না। আর যে জিনিস ভাল লাগে না, তা অনর্থক করতে যাব কেন বল? তুমিই তো বলতে অবিশ্বাস থেকে কিছু করা পাপেরই নামান্তর। তাহলে আমি সেই পাপ করি কী করে?

আরও পড়ুন:  ইয়াকুবমামার ভারতবর্ষ

জানো আব্বা, আমি তোমার সবচেয়ে ছোট সন্তান তবু যখন আরও ছোট ছিলাম তোমার পথ চেয়ে চেয়ে এই ঈদের আগের রাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম! যখন ঘুম ভাঙত, নীলুকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে যেতাম তোমার ঘরের দরজায়। সেখানে তোমার পায়ের চটিজোড়া প্রমাণ দিত যে তুমি বাড়ি ফিরেছ। আহা, কী যে আনন্দ হতো! আমাদের জন্য তুমি কী কী এনেছো জানার কৌতুহলে আমি আর নীলু তোমার ঘরের দরজায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কেমন যেন একটা ভয় ভয় ভাব কাজ করত আমাদের মনে। কিন্তু ওই যে আমার কৌতূহল! আমরা যে তোমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি, তুমি ঠিক টের পেয়ে যেতে। দরজা খুলে আমাকে আর নীলুকে দেখে ঘুম ঘুম চোখে মিটমিট হাসতে। তোমার দুই হাতে ধরা থাকত ঈদের বাজার ভর্তি দু’টি চটের ব্যাগ। মা আগে থেকেই বারান্দায় পাটি বিছিয়ে রাখতেন। তুমি ব্যাগ দু’টি নিয়ে গিয়ে বসতে সেখানে। তারপর এক এক করে বের করতে আমাদের জন্য নিয়ে আসা নতুন জামাকাপড়, চটিজুতো, সুর্মা, আঁতর, সাবান- আরও কত কী! যার যেটা ডেকে ডেকে তুমি সবার হাতে হাতে দিয়ে বলতে, ‘কী রে, পছন্দ হয়েছে তো?’ আমরা কেউ কিছু বলতাম না। কিন্তু আমাদের খুশি খুশি মুখ দেখে তুমি ঠিক টের পেয়ে যেতে তোমার আনা জিনিস আমাদের পছন্দ হয়েছে। শুধু মায়ের পছন্দ হতো না। মা বলতেন, ‘এটা এরকম হলে ভালো হতো!’ ‘ওটা ওরকম হলে ভাল হতো!’ ‘এটার রঙ ভালো না!’ ‘ওটার ডিজাইনটা কেমন!’ তুমি কিছু বলতে না, মায়ের কথা শুনে হাসতে শুধু। ওই হাসির কারণে তুমি মানুষটাকে আমরা ভয় পাওয়ার বদলে ভালবাসতে শিখেছিলাম আব্বা। এমনই ভালবাসা যে, তুমি যখন বাইরে বাণিজ্যে যেতে, তোমার যাতে কোনও বিপদ না ঘটে সেই প্রার্থনায় আমাদের দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটে যেত।

তোমার কি মনে আছে আব্বা, প্রথামতো একবার ঈদের আগের দিন তুমি বাড়ি ফিরতে পারনি? প্রচন্ড বৃষ্টিতে রাজ্যে সেবার ভয়াবহ বন্যা! প্রায় সব রকম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ট্রেন বন্ধ। বাস বন্ধ। আমরা উৎকণ্ঠায় রাত কাটাচ্ছি। মা শুধু কাঁদছেন। বড়দা, মেজদা, ছোটদাকে নিয়ে বিদেশবিভুঁইয়ে তুমি কেমন আছ? কী করছ? এসব কথা ভেবে ভেবে মা কাঁদছেন। মায়ের কান্না দেখে আমি কাঁদছি, নীলু কাঁদছে। পাড়াপড়শিরা এসে মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। তাদের কথায় মা সান্ত্বনা পাচ্ছেন না, অঝোরে শুধুই কেঁদে যাচ্ছেন। যেভাবে বৃষ্টিধারার বিরাম নেই, মায়ের কান্নারও বিরাম নেই। ওভাবেই রাত ভোর হয়ে গেছিল। আর সেই ভোরে নতুন সূর্যের মতো তুমি তোমার তিন সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলে একটা ভাঙা নৌকায় চড়ে। আশ্চর্য, তবু আমাদের জন্য ঈদের বাজার আনতে ভুল হয়নি তোমার। ওরকম দুর্যোগেও সঙ্গে এনেছিলে ঈদের বাজার ভর্তি দু-দু’টি চটের ব্যাগ। তিন সন্তান সহ তোমাকে পেয়ে মা মনে-প্রাণে স্বস্তি পেয়েছিলেন। আর আমরা পেয়েছিলাম শান্তি, তোমার আনা ঈদের নতুন জামাকাপড় পেয়ে …।    

  • ‘তোমার মা কেমন আছেন ছোট্টু?’
আরও পড়ুন:  বাঙালির চুমু চর্চা

এমন প্রশ্নে ডায়েরী লিখতে লিখতে আমি চমকে উঠি। কে জিজ্ঞেস করল এমন কথা? আব্বা, তুমিই কি জিজ্ঞেস করলে? তাই তো মা কেমন আছেন? সেই সন্ধ্যার পর তো আর মাকে দেখিনি! এমনকী, সন্ধ্যার পর আমরা সবাই যখন একসঙ্গে বসে গল্প করছিলাম, আমাদের সঙ্গে মা ছিলেন না। তাহলে কি মা এখনও রান্না ঘরেই আছেন? লাচ্ছাসেমাই, ক্ষীরপায়েস, লুচিপুরি রান্না করছেন? হবেও বা! এসব দিনে মা ভালমন্দ রান্না করতে খুব ভালবাসেন। সকাল হতে না হতেই তাঁর সেই রান্না প্রতিবেশীদের বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে যায়। আমরা সব ভাইবোন মিলে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।   

মায়ের খোঁজে আমি ডায়েরি লেখা ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। প্রথমে রান্নাঘরে যাই। কিন্তু মা সেখানে নেই। তাহলে? এ বারান্দা ও বারান্দা ঘুরে দেখি, সব শূন্য। বাথরুমেও আলো জ্বলছে না, তার মানে মা সেখানেও নেই। এমনকী, মায়ের ঘরেও মা নেই। মায়ের বিছানায় শুধু মায়ের আদরের বিড়ালটা বসে আছে। মায়ের ঘর পাহারা দিচ্ছে। মা কি তাহলে ছাদে গেছেন?

অন্ধকার সিঁড়ি। আলো জ্বালতে ভুলে যাই আমি। পড়িমরি করে সিঁড়ি ভেঙে ছুটি। কী জানি কেন, আমার মন বলে মা হয়ত ছাদে আছেন! আকাশে তাকিয়ে তারার রাজ্যে হয়ত তোমাকে খুঁজছেন!

আমাদের একতলার ছাদ। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়ছে সেই ছাদে। আর ছাদটাকে আমার মনে হচ্ছে যেন একটা তেপান্তরের মাঠ! অথচ চারপাশে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা বহুতল আমাদের এই ছাদটাকে কেমন গায়েব করে রেখেছিল। জানো আব্বা, ইদানিং আমি ছাদে উঠলে খুব অসহায় বোধ করতাম। আকাশ দেখতে পাই না বলে নিজেকে মানুষ ভাবতে পারতাম না। দিগন্ত দেখতে পাই না বলে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত। তাই পারত পক্ষে আমি আর ছাদে উঠতাম না। কিন্তু এখন মায়ের খোঁজে এসে এ কী দেখছি আমি? ছাদটা যেন আমাদের ছাদ নয়, সত্যিকারের একটা তেপান্তরের মাঠ হয়ে বিরাজ করছে। আমার অদ্ভূত লাগছে।

হঠাৎ আমার চোখ পড়ে ছাদের ঠিক মধ্যেখানে। সেখানে একা একজন ঘাড় গুঁজে বসে আছেন। কে বসে আছেন ওভাবে ওখানে? ওভাবে বসেই বা কী করছেন? আমার কৌতূহল হয়। আমি ধীর পায়ে এগিয়ে যাই। আর দেখি আমার মাকে, সামনে একজোড়া চটি আগলে বসে বসে কাঁদছেন। কিন্তু কার চটি আগলে ওভাবে বসে বসে কাঁদছেন তিনি? ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে তোমার পায়ের সেই চটিজোড়ার কথা।

গতবছর ঠিক আজকের দিনে অনেক রাত করে তুমি তোমার কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরেছ। পরের দিন সকাল সকাল সবাইকে নিয়ে বসেছ বারান্দায়। যার জন্য যা যা এনেছ, ডেকে ডেকে তুলে দিচ্ছ তাদের হাতে হাতে। মা বসে আছেন তোমার পাশে। হঠাৎ তোমার বুকে ব্যথা উঠল! তুমি নিজের বুক খামচে ধরে বলে উঠলে, ‘এত গরম লাগছে কেন রে? টেবিল ফ্যানটা নিয়ে আয় তো!’

বড়দা ততক্ষণে বুঝে গেছে আসল ব্যাপারটা। তাড়াতাড়ি তোমাকে সদর হাসপাতাল নিয়ে যাবে বলে তোড়জোড় শুরু করেছে। তুমি বললে, ‘আমার পায়ের চটিজোড়া দে!’ কিন্তু ওই মুহূর্তে কোথায় খুঁজব তোমার চটিজোড়া? তুমি নিজের জন্য এক জোড়া চটি এনেছিলে সেবার। ব্যাগ থেকে বের করে পাশে রেখেছিলে এই বলে, ‘এবার ঈদে আমার জন্য এটা।’ সেই চটিজোড়া এগিয়ে দিলাম তোমার পায়ের কাছে। তুমি তা পায়ে গলিয়েও নিলে। তারপর কী যে হল, তুমি নিজের শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারলে না, এলিয়ে পড়লে বারান্দায় বিছানো পাটিতে। আমরা ধরাধরি করে তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে একটা রিক্সায় চড়িয়ে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। কিন্তু কখন যে তোমার পা থেকে খুলে পড়েছিল ওই চটিজোড়া, আমরা খেয়াল করিনি। তারপর তোমাকে হাসপাতালে একটু সুস্থ দেখে যখন বাড়িতে ফিরছি তখন দেখি তোমার চটিজোড়ার এক পাটি সদর দরজার বাইরে আর একপাটি ভেতরে পড়ে আছে। কী জানি কী মনে করে আমি ওই চটিজোড়া কুড়িয়ে তুলে রেখেছিলাম সিড়িঘরের নীচে। আমার বিশ্বাস ছিল তুমি সুস্থ হয়ে ফিরে এসে আবার ওই চটিজোড়া পরবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তুমি আর ফিরলে না আব্বা, ভর দুপুরে তোমার নিথর লাশ ফিরে এল বাড়িতে। আমাদের ঈদের খুশি কী অদ্ভূত ভাবে শোকে বদলে গেল। কার ওপর যে আমার ভীষণ রাগ হল তৎক্ষণাৎ, আর আমি তুলে রাখা তোমার ওই চটিজোড়া সিড়িঘর থেকে বের করে এই ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম পেছনের জঙ্গলে।

আরও পড়ুন:  চুমু

তাহলে সেই চটিজোড়া মা পেলেন কী করে? আমার ফেলে দেওয়াটা কি মা দেখেছিলেন? তারপর সবার অজান্তে তিনি জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে এনে কোথাও লুকিয়ে রেখেছিলেন? হবেও বা! আমি জানি মা যে আজও বিশ্বাস করেন স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেস্ত। কিন্তু এই জীবনে তোমার পা আর কোথায় পাবেন মা? তাই হয়ত তোমার ওই চটিজোড়া কুড়িয়ে এনে যত্ন করে কোথাও লুকিয়ে রেখেছিলেন। এখন সবার আজান্তে বের করে তার নীচেই হয়ত তিনি বেহেস্ত খুঁজে বেড়াচ্ছেন!

না, মাকে আমি কিছু বলি না। আমার আগমন বুঝতেই দিই না। ছাদে তাঁকে একা থাকতে দিয়ে চুপ করে নীচে নেমে আসি। তোমার সেই চটিজোড়া সামনে নিয়ে মা তোমাকে স্মরণ করছেন, তাই করুন তিনি। কাছের মানুষকে কেউই কখনও ভুলতে পারে না। কখনও না কখনও ঠিক স্মরণ করে। যেমন মা তোমাকে স্মরণ করছেন।

আচ্ছা আব্বা, তুমি তো এখন তারার দেশের বাসিন্দা, নীচে তাকিয়ে দেখ না একবার, নিশ্চয় মাকে দেখতে পাবে। মা কেমন ছাদে একলা বসে বসে কাঁদছেন। যদি পার মাকে একটু সান্ত্বনা দাও, যাতে মায়ের ঈদটা ভালভাবে কাটে!

এখানে এখন রাত বারোটা বেজে গেছে। অথচ ঈদের কারণে বাজার খোলা। একটু আগে নীলুর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখছিলাম, রাত বেড়ে চললেও দোকানে দোকানে খরিদ্দারের ভিড়। রাস্তায় লোক চলাচলের বিরাম নেই।

জানো আব্বা, আজকাল আমাদের এই এলাকার অনেকেই তোমার মতোই বহু দূরদূরান্তে বাণিজ্যে যায়। সেই অন্ধ্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, কেরালা! ঈদ মানাতে গত এক সপ্তাহ যাবৎ তারা যে যার নিজের নিজের বাড়িতে ফিরে আসছে। ঠিক যেন পরিযায়ী পাখি! তোমার মতোই সবাই ঈদের কেনাকাটা করে ফিরছে। তাদের হাতে হাতে ব্যাগ ভর্তি ঈদের বাজার। জামাকাপড় থেকে চটিজুতো, সেন্ট, সাবান থেকে সুর্মা, আতর। সেই সঙ্গে ঈদের রেডিমেড খাবারের প্যাকেট পর্যন্ত। তাছাড়াও আরও কত কী! শেষপর্যন্ত কোন জিনিসটা কার কাছে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে উঠবে, কে বলে দিতে পারে বল আব্বা?  

 

Sponsored
loading...

1 COMMENT