অভাবী সংসারে মাত্র ১৪ বছরেই চুকেছে স্কুলের পাঠ | শ্রমিক‚ মজুর‚ ঝালাই নানা রকমের কাজ করে সংসারকে দাঁড় করিয়ে বিয়ে করতে দেরি হয়ে গেছিল | অন্তত পাড়াগাঁয়ের তুলনায় দেরি তো বটেই | কোয়ম্বাত্তুরের অরুণাচলম মুরুগণন্থম বিয়ে করেছিলেন ৩৬ বছর বয়সে‚ ১৯৯৮ সালে |

বিয়ের পরে তাঁর জগৎ তখন শুধু বৌকে ঘিরে আবর্তিত হয় | একদিন দেখলেন তাঁর কাছ থেকে কী যেন একটা লুকোচ্ছে স্ত্রী শান্তি | জোর করে কেড়ে নিয়ে দেখেন শান্তির হাতে একটা নোংরা ন্যাকড়া | এত নোংরা‚ ওটা দিয়ে অরুণের স্কুটার মুছতেও ইচ্ছে করবে না |

অবাক হয়ে জানতে চাইলেন শান্তি কী করবে ওটা দিয়ে ! কুণ্ঠিত উত্তর এল‚ ওটা আসলে ওইসব দিনের জন্য | বুঝতে পেরে যেন আকাশ থেকে পড়লেন অরুণ | রজঃস্বলা অবস্থায় এই জিনিস ব্যবহার করে তাঁর স্ত্রী ! শুনলেন‚ নামী কোম্পানির স্যানিটরি ন্যাপকিন কিনলে টান পড়বে সংসারে |

অরুণ জেনে বিস্মিত হলেন তাঁর গ্রামের কোনও মহিলাই ব্যবহার করে না স্যানিটরি প্যাড | প্রতি মাসে রক্তাক্ত হওয়ার দিনগুলোয় তাঁদের ভরসা বাতিল ন্যাকড়া‚ কাগজ | সেটাও না জুটলে ছাই বা বালি বা কাঠের গুঁড়ো | রক্তমাখা নোংরা কাপড়ও ধুতে হয়‚ শোকাতে হয় সবার আড়ালে |

সব জেনে অরুণাচলমের রোখ চেপে গেল | কিছু একটা করতেই হবে | দোকান থেকে কিনলেন স্যানিটরি প্যাড | দেখলেন‚ সামান্য তুলো আর কাপড়ের ওই জিনিস বেচে সংস্থাগুলো মুনাফা করছে ৪০ গুণ |

তাঁতির ছেলে অরুণাচলম নিজেই বাড়িতে বানালেন প্যাড | বৌকে বললেন ব্যবহার করতে | ননদকে দিতে | গ্রামে মহিলাদের মধ্যে বিলোতে |

ও হরি ! বৌ এত কী করবেন ! তিনি তো স্বামীর কাছ থেকে হাত পেতে ওসব নিতেই লজ্জা পান | গ্রামের কোনও মহিলাই উৎসাহী হলেন না ওসব ব্যবহার করে ফিডব্যাক জানাতে |

শেষে অরুণাচলম ঠিক করলেন নিজেই ব্যবহার করবেন | ছোটবেলার এক বন্ধুর ছিল মাংসর দোকান | সেখান থেকে নিতেন ছাগলের রক্ত | একটা ফুটবলকে বানালেন ব্লাডার | দুটো ছিদ্র করলেন সেখানে | তাতে ভরলেন রক্ত | সেই রক্ত ভর্তি ব্লাডার কোমর থেকে ঝুলিয়ে দু পায়ের মাঝে রাখতেন অরুণাচলম | উপরে আবরণ হিসেবে তাঁর তৈরি প্যাড | তার উপরে সাদা ধুতি পরা লুঙ্গির মতো করে |

এইভাবে দিনভর থাকতেন অরুণ | সব কাজ করতেন | চাপ পড়ত ব্লাডারে | দেখতেন কতটা রক্ত কতক্ষণ ধরে শুষতে পারছে তাঁর তৈরি প্যাড | ওই ব্লাডারটাকে অরুণাচলম মনে করতেন তাঁর নিজেরই দেহের ব্লাডার | যাতে একাত্ম হতে পারেন মেয়েদের সমস্যার সঙ্গে | গ্রামের পুকুরে সবার সামনে কাচতেন রক্তাক্ত ধুতি |

সবাই ধরে নিল প্রেতাত্মা ভর করেছে | একঘরে হতে হল | পাগলামি ছাড়াতে না পেরে বাপের বাড়ি চলে গেলেন স্ত্রী | বোনের বিয়ে হয়ে গেছিল | ঘর ছাড়লেন বিধবা মা | এতেও হল না | বিদ্রূপ আর কটূক্তিতে গ্রাম ছাড়তে হল অরুণাচলমকে |

সব চলে গেল | কিন্তু নিজের সঙ্কল্প ছাড়লেন না অরুণ | কাজ নিলেন এক অধ্যাপকের বাড়িতে | তাঁর সাহায্যে চিঠি লিখলেন বিভিন্ন সংস্থাকে | ফোনের বিল বেরিয়ে গেল ৭ হাজার টাকা | কিন্তু কেউ জানাল না কীভাবে তৈরি হয় স্যানিটরি প্যাড |

প্রায় দু বছরের চেষ্টায় গাছের চালের মণ্ড থেকে ফাইবার নিয়ে কম খরচে প্যাড বানাতে সক্ষম হলেন অরুণাচলম | কিন্তু শুধু হাতে তো আর হবে না | একটা যন্ত্র একান্ত দরকার |

অনেক ভেবেচিন্তে বানালেন কমদামি যন্ত্র | খরচ মাত্র ৬৫ হাজার টাকা | তাতে তৈরি হল স্যানইটরি ন্যাপকিন | মাদ্রাজ আইআইটি-র মাধ্যমে এই আবিষ্কার গেল জাতীয় প্রতিযোগিতায় | সৃজনশীলতার সেই মঞ্চে ৯৪৩ টি আবিষ্কারের মধ্যে অরুণাচলমের যন্ত্র প্রথম হল | কোয়ম্বাত্তুরের এক কম্পানি রাজি হল তাঁর প্রযুক্তিতে কম দামি প্যাড বানাতে |

লড়াইয়ের সাড়ে পাঁচ বছর পরে ধীরে ধীরে ফিরে পেতে লাগলেন হৃত সম্মান | ফিরে এলেন স্ত্রী | ফিরলেন মা | আবার বসল সংসার |

অরুণ এখন প্যাড বানানোর কম দামি যন্ত্র বানান | দেশের ২৩ টা রাজ্যের গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে গেছে সেই যন্ত্র | তাতে প্যাড বানান মহিলারাই | খুব অল্প দামে‚ বা বেশিরভাগ সময় বিনামূল্যে সেই প্যাড বিলি করা হয় গ্রামে | অরুণাচলমের স্বপ্ন এভাবে মহিলারা একদিকে স্বনির্ভর হবেন | আবার অন্যদিকে স্বাস্থ্য সচেতনতাও বাড়বে |

এছাড়াও অরুণের তৈরি জয়শ্রী ইন্ডাস্ট্রিজ আছে | তাদের তৈরি স্যানিটরি প্যাড কেনে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা | তারপর নানা নামে সেগুলো প্যাকেজিং হয় |

যে অরুণাচলমকে ওঝা দিয়ে ঝাড়ফুঁক করিয়েছিল গ্রামের লোক‚ সেই অরুণ এখন বক্তৃতা করতে যান নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে | হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তৃতা দিয়েছেন এই স্কুলছুট | রাষ্ট্রপতির হাত থেকে গ্রহণ করেছেন পদ্মশ্রী পুরস্কার |

তারপরেও স্ত্রী শান্তি আর একমাত্র মেয়ে প্রীতিকে নিয়ে ছোট্ট সংসারে বেশি বৈভব আসতে দেননি অরুণাচলম | কিনেছেন একটা জিপগাড়ি | এখানে ওখানে যাওয়ার জন্য | মাঝে মাঝে ভুলে যান পিতৃদত্ত নামটাও | কারণ দেশের কাছে যে তিনিপ্যাডম্যান | আর কদিন পরে অক্ষয় কুমারকে দেখা যাবে তাঁর বায়োপিকে নাম ভূমিকায় | অতীতে সাড়া ফেলে দিয়েছিল তাঁকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘The Menstrual Man’ | ২০১৪ সালে টাইম পত্রিকার বিচারে তিনি বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে একজন |

কিন্তু এসব নিয়ে ভাবেন না অরুণাচলম | তাঁর একটাই ধ্যানজ্ঞান‚ কবে দেশের ১০০% মহিলা অভ্যস্ত হবেন স্যানিটরি ন্যাপকিনে | ২০১১ সালেও এই পরিসংখ্যান ছিল মাত্র ১২ % | আমাদের দেশে মেয়েদের শেখানো হয়‚ ঋতুমতী হওয়াটা লজ্জার | কিন্তু সে সময় অপরিচ্ছন্ন থেকে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা যে দেশের জন্য লজ্জার‚ সেটাই কেউ বুঝতে চায় না | কেন এই ভাবের ঘরে চুরি ? উত্তর আর সমাধানের খোঁজে জীবন উৎসর্গ করেছেন অরুণাচলম মুরুগণন্থম |

আরও পড়ুন:  যখন বিয়েকে বাঁচিয়ে তুলে স্বামীকে ফিরে পেতে পরপুরুষের সঙ্গে যৌনসম্ভোগে লিপ্ত হয় নারী

NO COMMENTS