কোথাও দেওর-বৌদির খুনসুটি | তো‚ কোথাও সুন্দরীদের হাতে প্রহার | ভারতের নানা অংশে হোলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এরকম নানা রীতি | অন্যকে রাঙিয়ে তোলা মূল উপলক্ষ হলেও এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে পাল্টে যায় বসন্ত পার্বণের নাম |

বসন্ত বরণে ভারতের বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে অন্যতম বাংলার নবদ্বীপে দোল পূর্ণিমা এবং শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব | আমাদের ঘরের‚ একেবারে বঙ্গজ এই দুই উৎসবকে ছেড়ে নয় চোখ রাখা যাক অন্য রাজ্যে |

দুলান্ডি হোলি :

হরিয়ানার রঙের উৎসবকে ডাকা হয় ‘দুলান্ডি হোলি’ | এদিনটা সেখানে কিন্তু বৌদি আর দেওরের দিন | সারা বছরের চোরাগোপ্তা খুনসুটি যেন বসন্ত উৎসবের তিথিতে শীলমোহর পায় | হোলির রং খেলার মাঝে বৌদি কিন্তু সত্যি সত্যি মারে দেওরকে | ছদ্মকোপের প্রকাশ আর কী |

বৌদির রাগের হাত থেকে বাঁচতে দেওরকে রীতিমতো পালাতে হয় | সারাদিন ধরে মান – অভিমান পর্ব চলার পর বিকেলবেলা দেওর মিষ্টিমুখ করায় বৌদিকে | হরিয়ানার কোথাও কোথাও আবার উপরে ঝোলানো ক্ষীরের হাড়িঁ ভাঙা হয় | মানব পিরামিডের উপর ধাপে ধাপে উঠে | ঠিক যেমন মহরাষ্ট্রে হয় জন্মাষ্টমীতে |

রংপঞ্চমী :

পাচঁদিন ধরে খেলা হয় রং | তাই মহারাষ্ট্রে হোলিকে বলা হয় রংপঞ্চমী | আবার মহারাষ্ট্রের উপকূল অঞ্চলে গেলেই পাল্টে যাবে হোলির নাম | এখানে হোলিকে বলা হয় শিমগা বা শিমগো | মূলত মৎস্যজীবী মানুষজন এই নামে ডাকেন হোলি উৎসবকে |

মহারাষ্ট্রের প্রতিবেশী গোয়াতে এই শিমগা আরও বেশি প্রচলিত | সেখানে কোঙ্কনি সম্প্রদায় মেতে ওঠে রং খেলায় | তারা এমনিতেই হুল্লোড়বাজ | হোলি উপলক্ষে সেই আনন্দ কয়েকশো গুণ বেড়ে যায় | মৎস্যজীবীদের মুখের উপর হাতের তালু রেখে শব্দ করার রীতি এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ |

লাথমার হোলি :

রঙের উৎসবে চুটিয়ে চলবে লাথালাথি | হ্যাঁ‚ এটাও বাস্তব বিচিত্র ভারতবর্ষে | এই লাথি মারার হোলিখেলা হয় শ্রীরাধিকার জন্মস্থান বরসানায় | প্রাচীন রীতি অনুযায়ী আজও হোলির দিন শ্রীকৃষ্ণের গ্রাম নন্দগাঁও থেকে বরসানায় রং খেলতে আসে যুবকরা | কিন্তু রাধিকার গ্রামের মেয়েরা প্রতিশোধ নেয় | রাধিকার উপর কৃষ্ণের সব ‘দুষ্টুমি’র প্রতিশোধ |

বরসানার মেয়েরা ধুন্ধুমার মারতে থাকে নন্দগাঁও-এর ছেলেদের | ছেলেরা মোটা পোষাক পরে আসে ঠিকই | কিন্তু লাথি চড় ভালই বর্ষিত হয় তাদের উপর | কিন্তু রীতি মাফিক নারীবাহিনীর প্রহারের বাধা দেয় না ছেলেরা |

পরের দিন পালা বরসানার ছেলেদের | তারা দল বেঁধে যায় নন্দগাঁওতে | না‚ এবার আর লাথালাথি নয় | এবার তাদেরকে পলাশ ফুলের রং থেকে তৈরি ‘কেসুদো’ দিয়ে অভ্যর্থনা জানায় নন্দগাঁও-এর মেয়েরা | অর্থাৎ‚ লাথালাথির হোলির মধুরেণ সমাপয়েৎ হয় পলাশের রঙে |

হোলা মোহাল্লা :

পাঞ্জাবে আবার হোলির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শরীরচর্চাও | আনন্দপুর সাহিবে হোলির পরদিন থেকে শুরু হয় এই ‘হোলা মোহাল্লা’ | দশম শিখ গুরু গোবিন্দ সিং এই উৎসবের প্রবর্তন করেছিলেন | টানা তিনদিন ধরে চলা এই অনুষ্ঠানে দেখানো হয় নানারকম শারীরিক কসরৎ | এছাড়াও থাকে লঙ্গরখানা | সেখানে রান্না করে খাওয়ানো হয় নরনারায়ণকে | রান্নার জন্য আটা‚ ময়দা‚ চাল‚ সবজি‚ দুধ‚ চিনি যোগান দেয় লাগোয়া গ্রামগুলো | একই পংক্তিতে বসে খাওয়া সারেন সমাজের সব শ্রেণী |

কামান পান্ডিগাই :

তামিলনাড়ুতে বসন্তকে বরণ করে নেওয়া হয় কামদেবের পুজো করে | দোল উৎসবের নাম এখানে ‘কামান পান্ডিগাই’ বা ‘কামাবিলাস’ বা ‘কাম দহনম’ | এই উৎসবের পিছনে আছে পৌরাণিক কাহিনী | সেখানে শিবের তপস্যা ভাঙাতে গিয়ে শিবের তৃতীয় নেত্রের আগুনে ভস্ম হয়ে যান কামদেব | পরে কামদেবের স্ত্রী রতির প্রার্থনায় শিব ফের বাঁচিয়ে তোলেন কামদেবকে |

ভারতের দাক্ষিণাত্যে এই কাহিনী মনে রেখে হোলি উৎসব উৎসর্গ করা হয় কামদেবকে | কারণ এখানে মানুষ বিশ্বাস করে দোলের বা হোলির দিন শিব ফের বাঁচিয়ে তোলেন কামদেবকে | তামিলনাড়ুর মানুষ দোলে কামদেবকে চন্দন বাটা দেন | তাঁর পোড়ার ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য |

ফাগু পূর্ণিমা :

ফাগ বা আবির থেকে ভারতের অনেক জায়গায় দোলপূর্ণিমাকে ডাকা হয় ফাগু পূর্ণিমা নামে বিহারে আবার হোলিকে বলা হয় ফাগওয়া | প্রাদেশিক অনেক ক্যালেন্ডারে ফাল্গুন চৈত্র থেকে শুরু হয় নতুন বছরও |

এ ভাবেই দেশের বিভিন্ন কোণে বিভিন্ন নামে ডাকা হয় বসন্তের রঙের উৎসবকে | তবে গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন‚ সে গন্ধ দেবেই | ঠিক সেরকমই‚ যে নামেই ডাকা হোক না কেন‚ হোলি রঙের উৎসব | প্রেমের পার্বণ | যৌবনের উচ্ছ্বাস | জীর্ণ পুরাতনকে ভাসিয়ে নতুনের আবাহন |

আরও পড়ুন:  আগমনী গান ও তার পট-বদল

NO COMMENTS