দাদুর একটা হিসেবের খেরো-খাতা ছিল। লাল শালুর মলাট, লম্বা লম্বা পাতা, ভাঁজ করা। সন্ধেবেলায় হ্যারিকেনের আলোয় বসে সারা দিনের খরচাপাতির হিসেব টুকে রাখতেন দাদু। কাঁপা-কাঁপা হাতে উডপেনসিলে লেখা গোটা-গোটা সেই সব অক্ষরমালা দেখেই বাংলা বর্ণ ও সংখ্যার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। যেখানে আটকাত, দাদুই বলে দিতেন। যুক্তাক্ষর, কিংবা অজানা শব্দের মানে।

          দাদু বলতেন, “পড়ো তো দেখি। জোরে জোরে রিডিং পড়ো।”

          আমি হোঁচট খেতে খেতে পড়তাম। “তিরিশে চৈত্র। কাঁচা বাজার বাবদ খরচ দু টাকা ষাট পয়সা। কার্তিক মোড়লের কাছে ঘুঁটের দাম বাকী আট আনা। খবরের কাগজ বিক্রি বাবদ আয় পঁচাত্তর নয়া পয়সা।”

          ওই খেরোর খাতাতেই সেই একরত্তি বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, পাতার ওপর তারিখ লেখা— ১লা বৈশাখ।

          চেঁচিয়ে পড়লাম, “একলা বৈশাখ।”

          “একলা নয়, দাদু। পয়লা, ওকে বলে পয়লা বৈশাখ। মানে, এক নম্বর দিন।”

                                                  #                                      #

‘একলা বৈশাখ’ কথাটা কিন্তু আমার বালক-মনে অন্য একটা ছবি তৈরি করে দিয়েছিল। এখনও সেই অনুভব তাড়া করে ফেরে। বৈশাখ সত্যিই কেমন একলা,  না? তীব্র, রুখু, রাগি, তপ্ত একটা মাস! যাকে কেউ পছন্দ করে না, যার কোনও বন্ধু নেই, কোপন স্বভাব যাকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে সকলের কাছ থেকে, আর সেই ক্রোধে সে আরও বেশি করে আগুন ছোটায় নাকমুখ দিয়ে। ‘ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল, / তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল…’

          সেই মাস শুরু হচ্ছে। তারিখটাতেও নিঃসঙ্গতার ছায়া?

          একলা বৈশাখ। কথাটা ভাবায় আমাকে। অন্যদিক দিয়ে যদি দেখি, একটু বড় করে ভাবি— দেখতে পাব, পুরো বাংলা ক্যালেন্ডারটাই তো আজ একলা। একঘরে, নির্বাসিত, ত্যক্ত। খোদ বাঙালির ঘরেই তার ঠাঁই নেই বলতে গেলে। বাঙালি তার নিজস্ব সত্তা খুইয়ে আজ গর্বিত আন্তর্জাতিক। কেবল পেশাদার পুরোহিত আর উপবাস-পরায়ণা বিধবা— এরা ছাড়া বাংলা তারিখ মনে রাখে অন্য কেউ? ‘আজ বাংলা ক্যালেন্ডারের কত তারিখ?’— প্রশ্নটা এখন জামাই-ঠকানোর মশকরা। হায়, বাঙালি মহাপুরুষদের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন পালন করে বাংলা-মাধ্যম ইশকুলগুলো— সেও ইংরাজি তারিখ মেনে! বারোই জানুয়ারি বিবেকানন্দ, তেইশে জানুয়ারি নেতাজি, ছাব্বিশে সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগর। এগারোই আগস্ট শহিদ দিবস, ক্ষুদিরামের ফাঁসি। বাংলা তারিখ কেই বা জানে? বুকলিস্টের পিছনে ছুটির তালিকা, সেখানে হরেক সম্প্রদায়ের উৎসব— বাঙালির, শিখের, ইংরেজের —সব্বার উদযাপনের তারিখেই ইংরাজি ক্যালেন্ডারের হিসেব। দুর্গাপুজো অক্টোবরে, যেমন গুরু নানক নভেম্বরে, কিংবা বড়দিন ডিসেম্বরে— এতেই কাজ চলে যায়, বাঙালি ছাত্র আলাদা করে জানতেও চায় না দুর্গাপুজোর বাংলা তারিখ। বাঙালি মুসলমানদের পরবেও বাংলা মাস নিঃসম্পর্কিত। সবচেয়ে বিস্ময়— বাংলা ভাষার জন্য সালাম-বরকতেরা শহিদ হলেন যে-তারিখে, সেই তারিখটা পর্যন্ত বাংলা মাস দিয়ে মনে রাখিনি আমরা! শুধু একা রবিঠাকুর জন্ম-মৃত্যু দুটি দরজাতেই বাংলা ক্যালেন্ডার ঝুলিয়ে রেখেছেন।

           এই একঘরে-হয়ে-থাকা বাংলা বছরের চারটি তারিখ বাঙালি এখন অবধি চেষ্টা করেও ভুলতে পারেনি। পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ— রবিঠাকুরের দৌলতে। আর আছে চড়ক, মনে রাখতে পারে গ্রামের দিকে কেউ কেউ— বছরের শেষ তারিখ— চৈত্রের তিরিশ/একতিরিশ। এবং, হ্যাঁ, ওই একলা বৈশাখ। একলা ক্যালেন্ডারের একলা দারোয়ান।

           বেশ জোর দিয়েই ভবিষ্যৎবাণী করে দেওয়া যায়, আর ক’বছরের মধ্যে চড়ক আর পয়লা বৈশাখও দ্রুত বিস্মৃতি-ধুলোতে ঢেকে যাবে। এখনই, বহু ইংরাজি-মাধ্যম স্কুল বাংলা নববর্ষে ছুটি দেয় না। যারা আগে দিত, তারাও বন্ধ করছে কেউ কেউ। বাঙালির ইংলিশ-মিডিয়াম বাচ্চারা একটাই হ্যাপি নিউ ইয়ার জানতে-জানতে বড় হচ্ছে— সেটা জানুয়ারিতে। থার্টি-ফার্স্ট ডিসেম্বরের পার্ক স্ট্রিটে বর্ষবিদায়ের নৈশ হুল্লোড় সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানে, কিন্তু চড়ক বলে কোনও বিষয় ওদের জেনারেল অ্যাওয়ারনেসের মধ্যে নেই। একতিরিশে চৈত্র বিকেলে স্কুলবাস থেকে নেমে যথারীতি টিউটোরিয়াল চলে যায় কিংবা কম্পিউটারে বসে পড়ে—  পরের দিন ফের খেয়েদেয়ে টাই এঁটে বেরিয়ে যায়। শহর-শহরতলির বাক্সবাড়ির বাচ্চাদের কথা ছেড়েই দিলাম, যেভাবে গ্রামেও হু হু করে প্রোমোটারের পেটে চলে যাচ্ছে ফাঁকা জমি আর মাঠ— সেখানকার শিশুদের কাছেও চড়ক-গাজন শব্দগুলো দ্রুত অপরিচিত হয়ে আসছে। এদের ঠিক আগের প্রজন্মও, চৈত্রশেষের রাতে কর্পোরেট আপিস থেকে ফিরে পরের দিন ভোরে বহুজাতিক পুঁজির খিদমত খাটতে চলে যান আবার। এরই মাঝে যে একটা বাংলা ক্যালেন্ডার ফুরিয়ে আর একটা শুরু হয় চুপিসাড়ে—  একান্তভাবে বাঙালির এই বৎসরান্ত বা বর্ষারম্ভ নব্য বঙ্গসন্তানদের কাছে কোনও তাৎপর্যই  রাখে না। এদের মধ্যে জনাকয়েক ব্যতিক্রমী অবিশ্যি পয়লা-বোশেখের সকালে বন্ধু/বন্ধুনীদের কাছে ‘হ্যাপি বেঙ্গলি নিউ ইয়ার’ অথবা রোমান হরফেই ‘সুভা নাভাভার্সা’ মেসেজ পাঠিয়ে বাংলার সঙ্গে নাড়ির টান প্রমাণ করে ছাড়েন।

                                              #                                    #

এই অবধি পড়ে অনেকেই ভুরু দুটি কুঁচকে ভাবছেন, ‘আপনিই বা কবে কী এমন  রমরমা দেখেছেন পয়লা বোশেখের, মশাই? আপনার বয়েস জানি না আমরা? এমন দেখাচ্ছেন যেন হুতোমের সঙ্গে হুইস্কি খেয়ে এসেছেন!’

আরও পড়ুন:  সুতানটীর মেছুয়াবাজার কী করে হয়ে উঠল নবজাগরণের কেন্দ্র

          আচ্ছা, তবে একটু তো ঝাঁপি খুলে দেখাই। তা ধরুন সাড়ে তিন দশক আগের অখ্যাত গ্রামের এক বোকাসোকা নাবালকের পয়লা বৈশাখের স্মৃতি। দু-চারটি ভাঙা আয়নার টুকরো। 

          ধর্মাবতার, যাহা বলিব সত্য বলিব। আমার ছোটবেলায় কিন্তু ফার্স্ট জানুয়ারির তেমন কোনও অভিঘাত টের পাইনি। আমাদের টিভি ছিল না, কেব্‌ল চ্যানেল ছিল না, নেট ছিল না, দুনিয়া ছিল অতি সংকীর্ণ। পার্ক স্ট্রিটের বর্ষশেষের আলোকমালা আর গুয়াতেমালার উপজাতিদের জীবনযাত্রা, আমাদের অন্ধ অজ্ঞতার কাছে কাছে সমান সুদূর ছিল। আমরা যা-কিছু উদযাপন সব পয়লা বৈশাখেই করতাম, আমাদের নতুন বছর শুরুর দিন ছিল ওই একটাই। যেমন চড়কের মেলা আর গাজনের গান দিয়ে বছর শেষ হত, তেমনই পয়লা বোশেখ দিয়ে পরের বছর শুরু। হ্যাপি নিউ ইয়ার নয়, শুভ নববর্ষ। আমরা গেঁয়ো ভেতো বাঙালি ছিলাম, আন্তর্জাতিক হতে পারিনি।

          মন্দিরে পুজো দিয়ে আসতেন ঠাকুমা প্রতি পয়লা বৈশাখের সকালে। বলতেন, বচ্ছরকার দিন। তখন বাঙালিগৃহে পয়লা বৈশাখের পর্ব-উদযাপনে প্রায় ধর্মীয় পবিত্রতার আবহ ছিল। আমাদের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারেও ওই তারিখ ছিল রেড-লেটার ডে, এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। অনেকগুলো লক্ষণ ছিল, যাতে করে তারিখটার মহাগুরুত্ব টের পেতাম। ওই তারিখ উপলক্ষে বাড়ির বাচ্চাদের নতুন জামা হত। সেই যুগে আমাদের মতো অভাবী সংসারে নতুন জামা হওয়ার মানেটা যে ঠিক কতখানি, সেটা আজ নিজের ছেলেকেই বোঝাতে পারব না— কারণ তার উঠতে-বসতে নতুন জামা হয়। দ্বিতীয়, ওইদিন দুপুরে মাংস রান্না হত। এই সংক্ষিপ্ত তথ্যটুকুর তাৎপর্যও এ-জমানার কাউকে বোঝানো মুশকিল, কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় এ-সবই ছিল মহার্ঘ উদযাপনের অভিজ্ঞান। আর, যাহার উপরে নাই— সেই চূড়ান্ততম আর অভ্রান্ততম ঘটনাটি ছিল :  সেদিন পড়ার ছুটি। সা-রা-দি-ন পড়া নেই! ভাবা যায়!! আমার বাল্য-শৈশবে, বাড়িতে বিয়ে-পৈতে লাগলেও অন্তত একবেলা পড়তে বসার চাপ আসতই। দুর্গাপুজো-কালীপুজো ছাড়া পড়ার ছুটি দিতে পারে এমন পরমোৎসব আমার ছোটবেলায় আর একটিই ছিল— ওই পয়লা বৈশাখ। 

           আমাদের বাড়ির কাছাকাছি ছিল মস্ত ফুটবল মাঠ, সেখানে খুদে বাচ্চাদের নিয়ে গোটা চৈত্রমাস ধরে বিকেলবেলায়  ড্রিল প্যারেড ব্যায়ামের মহড়া দিতেন জনাকয় শিশুপ্রেমী ও উৎসাহী যুবক, ‘চিলড্রেন্‌স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ নামক সংস্থা তৈরি করেছিলেন তাঁরা। সেই দাদা/কাকুদের তত্ত্বাবধানে পয়লা বৈশাখের ভোরে বেরত জমজমাট প্রভাতফেরী। গ্রামের পথ দিয়ে ব্যান্ড বাজিয়ে কুঁচোকাঁচাদের দীর্ঘ লাইন পরিচালনা করে নিয়ে যেতেন তাঁরা, অনাত্মীয় হয়েও পরম স্নেহে-শাসনে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে পরিক্রমা-শেষে শোভাযাত্রাকে আবার ফিরিয়ে আনতেন মাঠে। পথের দুপাশে ভিড় করে সেই মিছিল দেখত পাড়া-বেপাড়ার মানুষ। বিকেলে ওই মাঠেই শুরু হত দলবদ্ধ ড্রিল ও ব্যায়াম-প্রদর্শনী। সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাচ, গান, নাটক। আমাদের শান্ত নিস্তরঙ্গ গ্রামে পয়লা বৈশাখে চিলড্রেন্সের ওই দু-বেলার উদযাপন ছিল এক মেজর ইভেন্ট। ‘বচ্ছরকার দিন’ উৎসবের আমেজে গমগম করত। সন্ধেবেলা লোক ভেঙে পড়ত মাঠে, দূরদূরান্ত থেকে দেখতে আসত বউ-ঝি’রা।

           এই পয়লা বৈশাখের উৎসবটি এখনও হয়। তিন দশক আগেকার সেই জৌলুস নেই আর, উজ্জ্বলতর বিনোদনে অভ্যস্ত আধুনিক প্রজন্মের কাছে সেই তুমুল সাড়া হয়তো আর জাগানোও সম্ভব নয় পুরাতনগন্ধী এই সব কর্মকাণ্ড দিয়ে। তবু, কিছু ক্যাজুয়াল দর্শক জড়ো হয়েই যায়। হকাররা ঘোরাফেরা করে, গ্রীষ্মসন্ধ্যার মিঠে বাতাসে হালকা একটা মেলা-মেলা ভাব। সন্ধেবেলা ছেলেকে নিয়ে যখন দেখতে যাই মাঠে, শুনতে পাই আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে কচি গলার গান হচ্ছে। ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।’ ভারি অদ্ভুত লাগে, দমকা হাওয়া যেন পতপত করে পাতা উল্টিয়ে নিয়ে চলে যায়, পঁয়তিরিশ বছর পিছিয়ে যাই মুহূর্তের মধ্যে। সেই গান, নববর্ষের স্বাগত-সঙ্গীত— আমাদের ছোটবেলাতেও এই মঞ্চে শুনেছি কত! বছরের পর বছর, এক্কেবারে পয়লা বৈশাখের বাঁধা আইটেম, এ-গানটা হবেই হবে একবার। আর, সঙ্গে সঙ্গে চলকে উঠবে আমাদের শৈশব।

          ‘যাক পুরাতন স্মৃতি,/ যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক/ এসো এসো, হে বৈশাখ…’

                                       #                                   #

পয়লা বৈশাখের সঙ্গে আর-একটা বাল্যস্মৃতি অবধারিতভাবে জড়িয়ে থাকবেই অনেকের, বিশেষত গ্রাম-মফস্‌সলে যাদের ছোটবেলা কেটেছে। সেটা হল দোকানে-দোকানে হালখাতার নেমন্তন্ন। বিশেষত, বয়স্ক মানুষদের মধ্যে তো একটা প্রতিযোগিতাই চলত, কে কত বেশি দোকান ‘কভার’ করতে পারে!

         আমার দাদু এ-বিষয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন। বিকেল গড়াতে-না-গড়াতেই একখানি ফর্সা ফতুয়া আর ধুতি পরে, সাদা কাপড়ের একটি থলি ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে, দুলকি চালে তিনি বাজার-পরিক্রমায় বেরোতেন। রাতে ফিরতেন যখন, থলি উপচে পড়ত মিষ্টির বাক্স আর ক্যালেন্ডারে। যখন আমি একটু বড় হয়েছি— মানে হাফপেন্টুল ছেড়ে ফুলপেন্টুলের দিকে— এবং তিনি আর-একটু নুয়ে পড়েছেন, মাঝে মাঝে আমাকে সঙ্গে নিতেন দাদু। অন্তত গোটা-পনেরো দোকানে পদার্পণ বাঁধা ছিল তাঁর। কোথাও গম্ভীর করতেন গলা, বেশি বাক্যব্যয় না করে ‘কই হে কী আয়োজন করেছ বের করো দেখি’ বলে ব্যাগ বাড়াতেন। কোথাও আবার মোলায়েম মিষ্টহাস। চেয়ারে আয়েশ করে বসা, কুশলজিজ্ঞাসা, আবহাওয়া মোহনবাগান আম্রিগা সিপিয়েম ঘুরে একথা-সেকথার পর যেন হঠাৎই খেয়াল পড়েছে এমন ছলে ‘এবারের ক্যালেন্ডার কেমন হল’ দেখতে চাইতেন। ফলতঃ একটি করে ক্যালেন্ডার প্রাপ্তি হত সে-সব জায়গাতেও, মিষ্টির বাক্সও বাদ যেত না। পরে বুঝেছি, যেসব জায়গায় সাধারণত সারাবছর তেমন কোনও কেনাকাটা হত না আমাদের, ওই অতিরিক্ত সুভদ্রতা সেই সব দোকানের জন্যই। শুধু বচ্ছরকার দিনের মিষ্টি-ক্যালেণ্ডারটি আদায়ের জন্য আরোপিত কূটনীতি মাত্র। বাঁধা দোকানে অতশত সৌজন্যের দরকার বোধ করতেন না দাদু।

আরও পড়ুন:  চানাওয়ালার ঠেলায় করে শেষকৃত্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেকালের সুন্দরী কপর্দকহীন নায়িকার দেহ

         আমার অবিশ্যি ক্যালেন্ডার বা বাক্স নয়, আলাদা টান ছিল শরবতের ওপর। এক-এক দোকানে এক এক রকমের শরবত— কোথাও দই-বরফকুচি মেশানো, কোথাও গোলাপ-গন্ধ, কোথাও কেওড়া। রস্‌না পাউডার গুলে আম বা লেবু-স্বাদের শরবত তৈরি রাখতেন অনেকে। ‘স্পেশাল গেস্ট’দের জন্য ডাব রাখত কয়েকটি ধনী বিপণি। আর, এক বছর হালখাতার আপ্যায়নে সারা বাজারকে তাক লাগিয়ে নতুন এক ঝাঁ-চকচকে জুয়েলার্স তার অতিথিদের খাওয়াল কাচের বোতলে ভরা গোল্ড স্পট আর থামস আপ! সন্ধের দিকে ভিড় ভেঙে পড়েছিল দোকানে।

         ঠিক তার পরের বছর পয়লা বৈশাখে আমি একা বেরিয়েছিলাম হালখাতা-অভিযানে। চৈত্রমাস থেকেই দাদু শয্যাশায়ী। পয়লা বৈশাখের বিকেলে বিছানায় শুয়ে-শুয়েই দুর্বল গলায় আমাকে রুট-ম্যাপ বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, “গিয়ে বলবি, দাদু পাঠাল। যারা চিনতে পারবে না, বলবি মুখুজ্যে মশায়ের নাতি। আমার শরীর খারাপ, বলিস।”

         সে-বছরের পয়লা বৈশাখ, আমার বড় হয়ে ওঠার একটা ধাপ। দাদুর প্রতিনিধি হয়ে একা দোকানে দোকানে ঘুরে অধিকাংশ জায়গাতেই পেলাম চাপা ঔদাসীন্য, এমনকী বাঁধা দোকানেও। অন্য দোকানগুলির কেউ কেউ ক্যালেন্ডার দিল বটে কিন্তু মিষ্টি দিল না, শরবতও না। ‘ক্যালেন্ডার ফুরিয়ে গেছে গো খোকা’ বলে কাটিয়েও দিল কেউ। আর সেই গয়নার দোকানে যেতে, আমাকে বাইরের চেয়ারে বসিয়ে প্লাস্টিক গ্লাসে ঠান্ডা চিনির জল ধরিয়ে দিল, খেতে খেতে দেখলাম দোকানের ভিতরে দামি অতিথিদের হাতে কাছের বোতলে সোনালি বা লালচে পানীয়। সেই প্রথম, হালখাতা-উৎসবের উদার আপ্যায়নের পিছনে লুকোনো ব্যবসায়িক দিকটা গরম শলার মতো আমার চোখে ঢুকল। বুঝলাম, কিছু বেচাকেনা বা আগাম নগদ প্রাপ্তির আশায় থাকাটাই ব্যবসায়ীদের পক্ষে স্বাভাবিক— দাদু সেই শর্ত পূরণ না করেই দীর্ঘদিন মিষ্টি-ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করে গিয়েছেন, আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই জমা অসন্তোষ ফুটে বেরল— আর বিঁধল এসে আমার গায়ে।

           সেই পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে চারটে ক্যালেন্ডার আর দু’খানি বাক্স-সমেত চোপসানো ব্যাগটা  দাদুর বিছানার ওপর বসিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, “আর কখনও হালখাতার দিনে বাজারে বেরোব না। একটা টাকাও না-ঠেকিয়ে মিষ্টি আর ক্যালেন্ডারের জন্যে কাঙালিপনা… পোষায় না। পরের বছর থেকে, যেতে হলে তুমি একা যেও। আমার প্রেস্টিজে লাগে।”

          আমার দাপুটে দাদু চুপ করে ছিলেন কিছুক্ষণ। তার পর একটু ম্লান হাসার চেষ্টা করে বলেছিলেন, “পরের বছর হালখাতায় আর আমি কোথায়?” 

          দাদুর সেই করুণ হাসি এখনও প্রতি পয়লা বৈশাখের রাতে শুনতে পাই।

                                          #                                               #

এখন, অর্ধেক জীবন পেরিয়ে এসে পয়লা বৈশাখের কী ছবি দেখি? কেমন বর্ণ-গন্ধ নিয়ে আসে বাংলা বছরের প্রথম দিন? যাতে বাঙালি এখনও চিনে নিতে পারে পঞ্চদশ শতকের নববর্ষকে?  

          হ্যাঁ, আছে বই কি। বাংলা খবরের কাগজে কয়েকটা পাতা বেশি আসে। পয়লা বৈশাখের রকমারি ক্রোড়পত্র।

          টিভিতে বিভিন্ন চ্যানেলে উপস্থাপকরা স্যুট বা ফর্মাল-ওয়্যারের বদলে ডগডগে রঙের পাঞ্জাবি কিংবা শাড়িতে সেজে বিজাতীয় উচ্চারণভঙ্গিমায় বাংলা ভাষা নিয়ে হরেকরকমবা চালান।

          বিলাসবহুল রেস্তরাঁ নানারকম বাঙালি মেনু হাজির করে ওইদিন। চড়া দাম হাঁকিয়ে গরিব ঠাকুমা-দিদিমাদের হারানো রেসিপির ডিশ অফার করে মেনুতালিকায়। এক-এক পদের জন্য এক-এক গোছা কড়কড়ে নোট। মোচার ঘন্ট, সুক্তো, লাউ-চিংড়ি, ঝিঙ্গে-পোস্ত। গাড়ি হাঁকিয়ে বাঙালিবাবু ডেলিকেসি চেখে আসেন। ফেসবুকে সেলফি পোস্ট করেন— ‘ফীলিং বেঙ্গলী’।

          চোখধাঁধানো বিপণির দরজায় ইংরাজিতে ‘চৈত্র অফার’ লেখা ফেস্টুন সরিয়ে রাতারাতি ‘নববর্ষ বোনাঞ্জা’ বা ‘বৈশাখী ধামাকা’ লেখা চলে আসে। এবং যথারীতি সে-দোকানের অধিকাংশ কর্মী বাংলা ভাষায় সড়গড় হতে পারেন না; ‘পার্ডন?’ বা ‘হিন্দি মে বোলিয়ে’ বলে ভুরু কোঁচকাতে থাকেন, বাকি তিনশো চৌষট্টি দিনের মতোই।

           সে যাই হোক। তবু তো আছে। এখনও তো হারায়নি। পয়লা বৈশাখ বেঁচে আছে। বাঁচতে গেলে বিবর্তিত হতে হয়, কে না জানে? আহা, থাকুক, একটু অদলবদল ঘটিয়েই, অবস্থা-পড়ে-যাওয়া গরিব আত্মীয়ের মতোই থাকুক না হয়। আজকের গ্লোবাল কসমোপলিটান বাঙালি তাকে একেবারে ভুলে না গেলেই হল।

আরও পড়ুন:  এই জন্যই কলকাতার বিরিয়ানিতে আলু থাকে !

          হ্যাঁ, আর এক জায়গায় দিব্যি বেঁচে আছে পয়লা বৈশাখ। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া।

          এখনও বছর-শুরুর দিনে সরগরম থাকে বাঙালি প্রকাশকদের দপ্তর। যদিও সিংহভাগ নতুন বই বইমেলাতেই বেরোয় ইদানিং, তবু এখনও বেশ কিছু গ্রন্থপ্রকাশ পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করেও হয়। সাজো-সাজো রব সকাল থেকেই। দুপুর থেকেই আসতে শুরু করবেন সাহিত্য-জগতের রথী-মহারথীবৃন্দ। সেই হালখাতার দৃশ্য। শরবত বা ডাব কিংবা বোতলের ঠান্ডা পানীয়। মিষ্টি-নোনতায় জলযোগ। মধুর আপ্যায়ন, আড্ডা, কিছু-বা দেনা-পাওনার হিসেবনিকেশও। কলেজ স্ট্রিট এখনও হ্যাপি নিউ ইয়ারের চেয়ে শুভ নববর্ষকে বেশি করে আঁকড়ে আছে। ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যে দীপশিখা।

          আমার অবিশ্যি কলেজ স্ট্রিটের হালখাতার অভিজ্ঞতার ঝুলি অতি দীন। চিরকালের গ্রীষ্মকাতর, অলস ও গ্রাম্য এই আমি, রাজ্য সরকারের দেওয়া ছুটির দিনটা কাটাই বিছানায় এলিয়ে, বই পড়ে, গান শুনে, ঝিমিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সতৃষ্ণ-নয়নে দেখি, আমার উজ্জ্বল উদ্যমী লেখক-বন্ধুরা দাবদাহ উপেক্ষা করে পাবলিশার্স-হপিং করছেন। দেখে, নিজের আলস্যের ওপর করুণা জাগে। গত এক যুগের কলমচি-জীবনে ওই উৎসবের আবহে ও-পাড়ায় পা রেখেছি— মাত্র দু’বার। চারণযোগ্য স্মৃতি বলতে ওই দুটিই। কথাটা উঠেই পড়ল যখন, ওইটুকুই বা বাকি থাকে কেন।

          দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত উপলক্ষ ছিল, মনে পড়ে। একবার, মানে, বলতে গেলে একটিবারই— আমার একটি নতুন বই বেরিয়েছিল পয়লা বৈশাখে, সেই টানে গিয়ে পড়েছিলাম প্রকাশকের আপিসে। জলযোগ-আপ্যায়ন আদি জুটেছিল সবই। অন্যবার? আর-এক স্বনামধন্য প্রকাশকের ঘর থেকে— না, প্রকাশিত বই নয়—  প্রত্যাখ্যাত লেখার পাণ্ডুলিপি ফেরত আনতে যেতে হয়েছিল। বইটা ছাপবেন বলেই আশ্বাস দিয়েছিলেন,  প্রুফ দেখাও শেষ— এমনকী ব্লার্বের ভূমিকা-তথ্যপঞ্জি পর্যন্ত প্রস্তুত, এহেন সময়ে অন্য একটি বিষয়ে সামান্য মতান্তর হয়েছিল সেই কর্তার সঙ্গে এই অধমের। ফলতঃ, তীরের সামনে এসে ভরা তরীর নিমজ্জন। প্রকাশকের চাকরের হাত থেকে সেই পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ পেয়ে বেচারা লেখক চল্লিশ ডিগ্রি গরমে পুড়তে পুড়তে বইপাড়ায় গিয়েছিল যেবার— সেও নির্ভুলভাবেই ছিল এক নববর্ষের উৎসবমুখর মরশুম।     

          বেশ কৌতুককর, না? 

          সে যাক। সব স্মৃতিই অবিমিশ্র সুখের হবে এমন আশা কে-ই বা করে। বচ্ছরকার দিনে অমন কত কী হয়। বিশেষত এ পোড়া বাংলা ভাষায় কলম ধরতে এলে!

                                              #                                #

ঠাকুমা মন্দিরে পুজো দিতেন পয়লা বৈশাখের দিন। আমাদের দুখিনী বাংলার মন্দিরে আজ পুজো পড়ে কই? আছে ভাঙা ঘরে একলা পড়ে, দুখের বুঝি নাইকো সীমা! ভাষা, জাতি, সত্তা— যে দিক থেকেই দেখি। হিন্দি আর ইংরাজির আগ্রাসী থাবা বাংলার জনজীবন বিনোদন অর্থনীতি শিক্ষা কৃষ্টি মেধা সমস্ত কিছু লুটে নিচ্ছে। ‘বাঙালি’— এই কৌম পরিচয়ে কি আমরা ইদানিং লজ্জিত, সংকুচিত হতেও শুরু করেছি ? পয়লা বৈশাখ এলে এই কথাটা একটু যেন বেশিই ভাবায়। 

          বাংলা ভাষা তথা বাঙালি জাতির এই কোণঠাসা দিনে বাংলা সাহিত্যের দিকেই তো তাকিয়ে আছি। আরও নতুন বই বেরোক পয়লা বৈশাখকে ঘিরে, আরও জমজমাট হোক বইপাড়ার হালখাতা। নতুন নতুন বাংলা পত্রিকা বেরোক এই নববর্ষকে উপলক্ষ করে। নতুন সাহিত্যের জোয়ারই বাঁচাতে পারে বাংলা ভাষাকে। পয়লা বৈশাখ বুড়ো বটগাছের মতো ছায়া দিক নতুন নতুন উদ্যোগকে।

         অনেকেই অনুমান করেন, আগামী দিনে কাগজে-ছাপা পত্রপত্রিকা থাকবে না আর, দ্রুত শুরু হবে ই-ম্যাগাজিনের জমানা। তা বেশ তো। তাতে খেদ নেই কোনও। বরং, যত সহজে ও যত দ্রুত পৃথিবী-জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বঙ্গসন্তানদের  কাছে  বাংলা সাহিত্য ছড়িয়ে পড়তে পারবে— ততই আনন্দের কথা। আর, হার্ড কপির সাবেকি পত্রিকাকে যে ওয়েবজিন এ-ব্যাপারে  দশ গোলে  হারাবে, তাতে তো সন্দেহই নেই। নতুন প্রযুক্তি তো জিততেই এসেছে, তার জয়ধ্বনিতে আমাদেরও কণ্ঠ মিলুক।

         বাংলা লাইভ ডট কম ই-ম্যাগাজিনের সামনেও গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে, এটুকু বলার জন্য জ্যোতিষী হতে হয় না।

          যে শেষ-কথা, বস্তুত আসল-কথাটি বলার জন্যে এত গৌরচন্দ্রিকা, সেটাই এবার বলি। নতুন রূপে ও গরিমায় আত্মপ্রকাশের জন্য এই-যে পয়লা বৈশাখের তারিখটিকে বেছে নিয়েছে বাংলালাইভ ডট কম, এটি বড় ভাল লেগেছে আমার। ভাবনাটুকুই প্রাণ জুড়িয়েছে বড়। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, আমি ঘোর প্রাদেশিক। জগৎজোড়া আন্তর্জালে যার বিচরণ, সেই ই-ম্যাগ’ও যদি বাংলা ক্যালেন্ডার মনে রাখে, আমার প্রাদেশিক আবেগে ঢেউ না উঠে পারে? পত্রিকার নামের মধ্যে আছে আমার প্রিয় মাতৃভাষার নাম। আছে ‘লাইভ’ শব্দটিও। পয়লা বৈশাখের এই বাঙালি নবজাতকের নামের মধ্যেই অনেক আশার ব্যঞ্জনা।  বাংলালাইভ—  শুনলেই মনে ভরসা জাগে। বলতে ইচ্ছে হয়— ‘আছে, আছে, এখনও প্রাণ আছে।’

           এই প্রাণ অনির্বাণ হোক। লং লিভ, বাংলালাইভ। জিন্দাবাদ।

- Might Interest You

1 COMMENT

  1. আপনার লেখাটা ভাষা ভাবনাকে উস্কে দিল । নিরপেক্ষ আত্মবিশ্লেষণ লেখাটার বড় গুণ ।