‘আমার বারোটা বছর ফিরিয়ে দাও’—-অন স্ক্রিন উত্তমকুমার-সহ অন্যান্য জাঁদরেল অভিনেতার মুখের উপর এই কথাগুলো বলার জন্য দরকার ছিল তাঁর মতো একজন অভিনেতাই | নইলে চিত্রনাট্যকারের কলম এত উর্বর হতো কিনা সন্দেহ | তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপ ভাবমূর্তির সঙ্গে ছবির মতো কোমল নাম খানিক বেমানান | ভারিক্কি নাম একটি আছে বটে | শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস | উত্তর কলকাতার বনেদী পরিবারের পুত্রসন্তানদের নাম যেমন হয় আর কী ! সুদর্শন ছেলেকে মা আদর করে ডাকতেন ছবি বলে | সেই নামকেই শাশ্বত ফ্রেমবন্দি করে গেছেন তিনি | শুধু অভিনেতা নন‚ ছবি বিশ্বাস নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান |

জন্ম ১৯০০ সালের ১২ জুলাই | আষাঢ়ের বৃষ্টিভেজা ব্রিটিশ কলকাতায় | বাবা ভূপতিনাথ বিশ্বাস ছিলেন অত্যন্ত ধনী | সেইসঙ্গে হাতখোলা মেজাজের সাবেক কলকাতাবাসী | ঐতিহ্যের সূত্র ধরে ছবি পেয়েছিলেন বনেদীয়ানা‚ দিলদরিয়া মেজাজ আর সংস্কৃতির প্রতি নিবিড় টান |

তাঁর যখন মাত্র দশ মাস বয়স মৃত্যু হয়েছিল মায়ের | তাই হয়তো মাকে পেতে মায়ের দেওয়া নামটাই আঁকড়ে ধরেছিলেন | শৈশবে এতটাই ফুটফুটে ছিলেন‚ আদর করতেন সবাই |

একদিন ছোট্ট ছবিকে দেখলেন তাঁর বাবা ভূপতিনাথ দে বিশ্বাসের আপিসের ব্রিটিশ মালিক আলেকজান্ডার সাহেব আর তাঁর স্ত্রী | মা হারা শিশুকে দেখে খুব মায়া পড়ে গেল | তাঁরা দত্তক নিতে চাইলেন | ভূপতিনাথ পরে গেলেন দোটানায় | একদিকে আপিসের বড়কর্তা | অন্যদিকে অপত্যস্নেহ | কী করবেন !

সমাধান করলেন শিশুপুত্রের দিদিমা | জামাইয়ের সামনে রুখে দাঁড়িয়ে বললেন কিছুতেই ছবিকে দত্তক দেওয়া হবে না | রয়ে গেলেন ছবি তাঁর নিজের পরিবারেই | 

হিন্দু স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ভর্তি হয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে | ততদিনে মনের মধ্যে আসন পেতে বসে পড়েছে অভিনয়ের পোকা | চলে গেলেন বিদ্যাসাগর কলেজে | যাতে পড়াশোনার পাশাপাশি সমান তালে চলে অভিনয়ও | 

নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ী ছিলেন তাঁর আদর্শ | কলকাতার থিয়েটার পাড়ায় প্রতিভাবান মুখ হয়ে উঠলেন ছবি | নদের নিমাই‚ ষোড়শী‚ সীতা‚ কেদার রায়‚ শাহজাহান-এর মতো নাটকে তাঁর অভিনয় আলোড়ন ফেলল নাট্যমোদীদের মনে |

মাঝে অভিনয় ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন বীমা কোম্পানির চাকরিতে | চেষ্টা করে দেখেন পাটের ব্যবসাও | কিন্তু পোষায়নি | সব ছেড়ে ফিরে আসনে অভিনয়ের টানে | ১৯৩৬ সালে প্রথম ছবি অন্নপূর্ণার মন্দির | পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তী | এরপর হারানিধি‚ চোখের বালি‚ শর্মিষ্ঠা‚ চাণক্য‚ নর্তকী‚ অশোক‚ বিদ্যাসাগর‚ বাংলা ছবি ক্রমশ ছবিময় | ঢুলি‚ ওরা থাকে ওধারে‚ ছেলে কার‚ ত্রিযামা‚ সদানন্দের মেলা-য় তাঁর অনবদ্য অভিনয় ভোলার নয় | নায়ক নায়িকাকে ছাপিয়ে ভাস্বর হয়ে থাকত তাঁর মতো চরিত্রাভিনেতার উজ্জ্বল উপস্থিতিতে | 

ততদিনে গুরুগম্ভীর পিতৃতান্ত্রিকতার প্রতিশব্দ হয়ে গেছেন ছবি বিশ্বাস | ঠিক এমন সময়ে ১৯৫৭ সালে মুক্তি পেল তপন সিনহার পরিচালনায় কাবুলিওয়ালা | খোখির নাচে মুগ্ধ রহমত খান জানে না সাবেকিয়ানা বা আভিজাত্য | সে ধাক্কা খায়‚ যখন দীর্ঘ অদর্শনের পরে তার খোখি শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময়ে তাকে চিনতে পারে না | বাঙালি তখন জানত না কাকে বলে ফাদার্স ডে | তাদের কাছে হিং আখরোটের ঝোলা সমেত কাবুলিওয়ালা রহমতই ছিল স্নেহময় বাবা |  

কাবুলিওয়ালার পরেই আবার ছক ভাঙা ছবি | ১৯৫৮ সালে মুক্তি পেল সত্যজিতের জলসাঘর | ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের ঘোলাটে চোখে প্রতিফলিত হয়  ঝাড়লণ্ঠনের নিভন্ত আলো | এর পাশাপাশি ভাবুন শশীবাবুর সংসার | মধ্যবিত্ত বড় পরিবারের কর্তা হয়ে তিনি দাঁড়িয়ে একবারে বিপরীত মেরুবিন্দুতে | কিংবা ধরুন দেবী বা কাঞ্চনজঙ্ঘা | সাবেক অভিজাত বাঙালি বা সাহেবিয়ানায় জারিত‚ ছবি বিশ্বাস দুই জায়গাতেই লড়ে চলেছেন পিতৃতান্ত্রিকতার অমোঘ দ্বন্দ্বের সঙ্গে |

তাঁর ফিল্মোগ্রাফি বলতে গেলে চলে আসে বাংলা ছবির সেরার সেরা প্রায় সব সিনেমাই | সপ্তপদী‚ সাহেব বিবি গোলাম‚ পথে হল দেরি‚ সূর্যতোরণ‚ ক্ষুধিত পাষাণ‚ চুপি চুপি আসে‚ লৌহকপাট‚ শুন বরনারী, দাদাঠাকুরউল্লেখের পরেও রয়ে যায় আরও কত নামী চলচ্চিত্র | তিনি ছিলেন মুষ্টিমেয় সেই অভিনেতাদের মধ্যে একজন‚ যিনি বাংলা ও ইংরেজি দুটি ভাষায় সম দক্ষতায় ডায়ালগ বলতে পারতেন | 

পর্দার বাইরেও ছিলেন দুর্দান্ত দাপুটে | সবসময় পাশে দাঁড়াতেন কুশীলবদের | সেটা ছয়ের দশকের গোড়া | রাধা ফিল্মসের স্টুডিওয় গণ্ডগোল বাধল | খবর পেয়ে গভীর রাতে অসুস্থতা সত্ত্বেও ছুটে এলেন ছবি বিশ্বাস | স্টুডিওর দরজায় হাজির পুলিশ | তিনি ঢুকতে দিলেন না | রাশভারী ব্যক্তিত্ব নিয়ে আড়াল করে দাঁড়ালেন স্টুডিওর দরজা | বললেন‚ তিনি ছবি বিশ্বাস |  তাঁকে গুলি না করে কেউ ভিতরে ঢুকতে পারবে না | সে যাত্রা ফিরে গেল পুলিশ |

১৯৩৬ থেকে ১৯৬২‚ নিরবচ্ছিন্ন ২৬ বছর ধরে খ্যাতির শিখরে থাকা ছবিযুগ আরও দীর্ঘায়িত হতো  | হতে দিল না কলকাতায় এক পথ দুর্ঘটনা | চলে গেলেন ছবি বিশ্বাস | ১৯৬১-র ১১ জুন মাত্র ৬১ বছর বয়সে | জন্মদিনের ঠিক এক মাস আগে | শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবির নন‚ তিনি সমগ্র বাংলা চলচ্চিত্রের রায় বাহাদুর ইন্দ্রনাথ চৌধুরী | ১৯৫৯ সালে সম্মানিত হয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি ভূষণে | কিন্তু রায় বাহাদুর ইন্দ্রনাথ বা জমিদার বিশ্বম্ভর আর কবে ওইসব পুরস্কারের পরোয়া করেছেন ! রুপোর গড়গড়ায় সুখটান দিতে দিতে বাংলা রুপোলি পর্দাকে ফিরিয়ে দিয়ে গেছেন দু হাত ভরে | যার রেশ শুধু বিশ বছর নয়‚ রয়ে গেছে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে |

আরও পড়ুন:  প্রকৃতির জাদু ! মৃত্যু উপত্যকা শুষ্কতম মরুভূমি রাতারাতি হয়ে গেল ফুলের বাগিচা

1 COMMENT

  1. Je dialogue ta diye lekhata suru hoyeche, joto dur mone pore, dialogue ta Shilpi cinema te Kamal Mitra er lip e chilo.