ছন্দসী বন্দ্যোপাধ্যায়
ছন্দসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম বারাণসীতে। শৈশব ও ছাত্র জীবন কাটে ইলাহাবাদে। বিবাহের পর স্বামীর হাত ধরে অস্ট্রেলিয়া ঢলে আসেন। সেই থেকে অস্ট্রেলিয়া বাসী। তাঁর রচিত সম্প্রতিতম উপন্যাস "অভিযান", "ছায়া পরিসর" ও "মায়াজাল"। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কয়েকটি ছোটগল্পের ইংরেজি অনুবাদ এবং তাঁর নিজের লেখা একুশটি গল্প নিয়ে "নির্বাচিত গল্প" নামে একটি সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে।

শীতের ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যা। সেই সন্ধ্যাতেও অরূণ নির্ভেজাল স্কচ হুইস্কি পান করছিল জেরেমির স্টুডিওতে বসে। সবে ষাট বছরে উপনীত অরূণের আজকাল আনন্দই বলো, প্রেরণাই বলো অথবা উত্তেজনাই বলো – সব কিছুর উৎস ধরে থাকে স্কচের বোতল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে চলে আসে জেরেমির স্টুডিওতে এবং মেঝের ওপর পাতা একটা চাদরের ওপর জাঁকিয়ে বসে পড়ে স্কচের নতুন বোতল খুলে। স্টুডিও ঘরের মধ্যে এক কোণে রাখা ‘বার’ ফ্রিজটা খুলে বরফ বার করে এনে রাখে কাঁচের জগে। একটু একটু করে স্কচের গেলাসে ফেলে নেয় বরফকুচি।

আপাদমস্তক স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা বিশাল স্টুডিওটা। অরূণ যেখানে বসে আছে তার উল্টো দিকে মস্ত একটা আয়না দেয়ালের ওপর গাঁথা। মেঝে থেকে ঘরের সীলিং অবধি সেই আয়নার প্রসার।

কিছুদিন আগে অবধি এই স্টুডিওতে ওই আয়নার সুমুখে ভরতনাট্যম্‌ আর ওড়িশি নাচ অভ্যাস করত অরূণের নৃত্য আকাদেমির ছাত্রীরা। কাঠের মেঝের ওপর পাতা থাকত তিব্বতি কার্পেট। একটা ছোট কঞ্চি নিয়ে ছাত্রীদের মুখোমুখি বসে অরূণ তাল দিত। ক্লাসিকল গান গাইত উদাত্ত কন্ঠে। আবার নাচিয়েদের দ্রুত থেকে দ্রুততর পদসঞ্চালনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, নাট্টভঙ্গম বাজিয়ে ‘বোল’ উচ্চারণ করত।

* * *

শালিনী পাঁচ বছর বয়সে ভর্ত্তি হয়েছিল অরূণের নাচের স্কুলে। বয়সে অরূণের থেকে আঠারো বছরের ছোট কিন্তু তাও – অরূণের সহকর্মিনী হবার পাশে ওর সহধর্মিনী হবার স্বপ্নও ছিল তার। বহুকালের স্বপ্ন। কিছু বছর আগে সেই স্বপ্নের আভাস একদিন পেয়েছিল অরূণও। এবং নিজের প্রতি শালিনীর দুর্বলতাকে পুরো দস্তুর ব্যবহারও করে চলেছিল সেই থেকে।

অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরে ভারতীয় নৃত্য অ্যাকাডেমির গোড়াপত্তন তখন সবে বছর খানেক আগে করেছে অরূণ। সে ২৫-২৬ বছরের টগ্‌বগে যুবক তখন। বুকে উদ্দাম আকাংখা, দু’চোখে আকাশ ছোঁয়া আদর্শকে মাটিতে এনে নামাবার আগ্রহ এবং সারা দেহ জুড়ে বিদ্যুতের গতি। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অস্ট্রেলিয়াতে নানা ভাষা এবং সাংস্কৃতিক বৈষম্য নিয়ে রিসর্চ করে পি.এইচ.ডি. অর্জন করেছিল অরূণ। অরূণ থাই-চাইনীজ মা এবং বাঙালি পিতার সন্তান। জন্মেছিল মলেশিয়ার বটরওয়র্থ শহরে। শিল্পানুরাগী পিতা খুব ছোটবেলা থেকে ক্লাসিকল ভারতীয় নাচ এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতে উৎসাহিত করেছিল অরূণকে। পরবর্তীকালে পড়াশোনার পাশে অরূণ নাচ-গানও চালিয়ে গিয়েছে পুরোদমে। সে স্কুলে এবং পরবর্ত্তীকালে মেলবোর্ন ইউনিভর্সিটিতে ছুটি হলেই চলে যেত ভারতে। সেখানে পুরী এবং মাদ্রাজে গিয়ে বিখ্যাত শিল্পীদের কাছে শিখত ওড়িশি আর ভারতনাট্যম্‌। নৃত্য-সঙ্গীত শিল্পের প্রতি অরূণের অদম্য উৎসাহ, অনুরাগ এবং নৈপুণ্য মুগ্ধ করত ওর শিক্ষকদের। জন্ম, প্রতিপালন, শিক্ষাদীক্ষা – সবই যার বিদেশে, এমন একটা দোআঁশলা ছেলেকে ভারতীয় ঐতিহ্যপূর্ণ শিল্প কী করে অমন গভীর বন্ধনে বেঁধেছে, বুঝতে পারতেন না তাঁরা। অবশেষে বলতেন “পূর্বজন্মের প্রারব্ধ। গতজন্মে ব্যাটা নিশ্চয়ই কোন ভারতীয় নাটগুরুর চ্যালা ছিল। সেই সব সংস্কার যাবে কোথায়!

অতঃপর সমস্ত ইচ্ছাশক্তি সঞ্চয় করে নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নাচের জগতে। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল ভরতনাট্যম্‌ এবং ওড়িশির পায়ে। ব্রিসবেন শহরে খুলেছিল প্রথম ভারতীয় নাচের স্কুল ইন্ডিয়ন ডান্স্‌ অ্যাকাডেমি। পাঁচ থেকে দশ বছরের ছাত্রীদের নিয়ে আরম্ভ হয়েছিল অরূণের নতুন অভিযান। এবং বছরখানেকের মধ্যে ভারতীয় তরুণীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অরূণের স্কুলে এসে যোগ দিয়েছিল বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ন, অ্যামেরিকন এবং চাইনীজ অস্ট্রেলিয় যুবতীরা। পাঁচ বছরের শালিনীও তখনি স্কুলে ভর্ত্তি হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়াবাসী ব্রিটিশ শিল্পী জেরেমি থর্পের সঙ্গে দেখাও হয়েছিল সেই সময়টাতেই। একটা ছবি প্রদর্শনীতে গিয়েছিল অরূণ। জেরেমির কয়েকটা পেন্টিং সাজানো ছিল কিছুটা জায়গা জুড়ে। পেন্টিংগুলোর মধ্যে প্রাচীন ভারতীয়, নেপালি এবং তিব্বতের প্রভাব দেখতে পেয়েছিল অরূণ। ঘুরে ঘুরে দেখছিল সে।

–  হ্যালো, আই অ্যাম জেরেমি থর্প”।

চম্‌কের তাকিয়েছিল সে। চোখাচোখি হতে, জেরেমি এগিয়ে এসে করমর্দন করে শুধিয়েছিল, “অ্যান্ড ইউ”?

–  আই অ্যাম অরূণ।

হাসিমুখে ওর দিকে চেয়েছিল জেরেমি।

–  আই অ্যাম সো ইম্‌প্রেস্‌ড্‌ উইথ ইওর পেন্টিংস্‌”, অরূণ বলেছিল, “তোমার এই পেন্টিংগুলোয় প্রাচ্যের প্রভাব প্রাঞ্জল। মনে হচ্ছে ভারত, নেপাল, তিব্বত, সব দেশে তুমি সময় কাটিয়েছ। ওখানকার অন্তনির্হিত আত্মাকে মনেপ্রাণে অনুভব করেছ”।

–  ভেরি ট্রু,” জেরেমি বলেছিল, “আমার সর্বসত্ত্বার মাঝে বিরাজ করছে বৌদ্ধধর্ম। ভারতে, নেপালে আর তিব্বতে যৌবনের বহু বচ্ছর কাটিয়েছি আমি”।

আরও পড়ুন:  ইয়াকুবমামার ভারতবর্ষ

* * *

প্রথম আলাপটা প্রগাঢ় হতে দেরী হয়নি অতঃপর। বয়সের অনেকখানি ব্যবধান সত্ত্বেও। সমমনস্ক দুটি শিল্পীর ক্ষেত্রে যা স্বাভাবিক। জেরেমি আর অরূণের সম্পর্কটা গুর-শিষ্যের সম্পর্কে এসে দাঁড়িয়েছিল।

–  তুমি সত্যিই কি ভারতের প্রাচীন নৃত্য এবং সঙ্গীতের সমুদ্রে ডুব দিতে চাও, অরূণ? ডুবুরির মত সাঁতার কেটে পৌঁছতে চাও সমুদ্রের তলায়? মুক্তো ছেঁকে নিয়ে আসতে চাও?” একদিন জেরেমি জিজ্ঞেস করেছিল অরূণকে।

–  অবশ্যই। ভারতের প্রাচীন এবং পবিত্র নৃত্যশিল্পের উপাসক আমি। হিন্দু দেবদেবীরা আমার রিসর্চের বিষয়। দশ মহাবিদ্যাকে আমি উপলব্ধি করতে চাই। নাচের মাধ্যমে দশমহাবিদ্যার দর্শনকে আমি পাশ্চাত্য জগতের কাছে মেলে ধরতে চাই।‌”

–  ফ্যান্টাস্টিক। অস্ট্রেলিয়ার নৃত্যশিল্প জগতে একদিন তুমি সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। দেখে নিও”। জেরেমি বলেছিল।

হয়েছিলও তাই। তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ অরূণের সুপুরুষ চেহারা, বাগ্মিতা, নৃত্য এবং সঙ্গীত-নৈপুণ্য আর সেই সঙ্গে হিন্দু সংস্কৃতির গভীর জ্ঞান কয়েক বছরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার আর্টজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল ওকে।

তারপর ব্রিসবেনের শহরতলিতে একটা বিশাল বাগান সমেত পুরনো বাড়ি কিনে জেরেমির পরামর্শ এবং নিজের রুচির সঙ্গে মিলমিশ করে সংস্কার করিয়ে নিল অরূণ। বাগানে অসংখ্য নেটিভ গাছপালা – ওয়াট্‌ল্‌, জ্যাকারান্ডা, উইপিং উইলো, ফেঞ্জিপানি, জবা, কৃষ্ণচূড়া। বছরে আট-নয় মাস ধরে ফুল ফুটিয়ে তারা অরূণের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।

বাড়ির নীচতলা ভেঙ্গেচুরে মস্ত একটা আয়নায় ঘেরা, কাঁচের ঘর তৈরি হল। তৈরি হল গাছপালার তলায় বাড়তি একটা বাংলো। নির্মিত হল অরূণের অতিথি আপ্যায়নের প্রশস্ত জায়গার সঙ্গে মাঝারি সাইজের একটা রান্নাঘর, খাবার ঘর আর ভাঁড়ার। আর ওপরতলায় রইল তিনটি শোবার ঘর জুড়ে অরূণের থাকা, পড়াশোনা আর নানা আকার, নানা আকৃতি এবং নানা বর্ণের ঠাকুর-দেবতাদের ঘর।

দেখেশুনে জেরেমিও খুব খুশি। উদ্যোগ নিয়ে অরূণের নাচের শোগুলোয় মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব নিল সে। উপহার দিল ওর পেন্ট করা, একাধিক বিশাল ব্যাকড্রপ।

ক্রমশঃ অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ এবং দক্ষিণপ্রাচ্য এশিয়া জুড়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল অরূণের নৃত্য আকাদেমির। ওর নাচের ট্রুপ নিরন্তর আমন্ত্রিত হতে থাকল দেশে-বিদেশে।

তারপর একদিন –

সে রাতে ব্রিসবেন আর্ট সেন্টরে ষোল বছরের শালিনীর ওড়িশি নাচের মঞ্চ-প্রবেশের অনুষ্ঠান। এলাহি ব্যাপার। হাজার খানেক আমন্ত্রিত নরনারীকে তিন ঘন্টা ধরে অনবদ্য নাচ দেখিয়ে মুগ্ধ করে রেখেছিল শালিনী।

পাঁচ জন ম্যুজিশিয়নের পাশে বসে শালিনীর পদসঞ্চালনের সঙ্গে তাল দিতে দিতে অরূণেরও মনে হয়েছিল ওর স্কুলের অসংখ্য ছাত্রীদের মধ্যে শালিনীই যেন তার গুরজীর মত নাচের আধ্যাত্ম উপলব্ধি করেছে অন্তরে। নাচের প্রতিটি তাল, ছন্দ, তরঙ্গ ওর সর্বাঙ্গে তুলছে অপার্থিব আলোড়ন।

নাচের পর উচ্ছ্বসিত স্তাবকদের কাছ থেকে প্রভূত প্রশংসা কুড়িয়ে গ্রীনরূমে ঢ়ুকে শালিনী দেখেছিল অরূণ একটা চেয়ারে বসে ওর জন্য প্রতীক্ষা করছে।

এগিয়ে গিয়ে অরূণকে প্রণাম করেছিল। শশব্যস্তে উঠে দাঁড়িয়ে অরূণ বলেছিল, “হোয়াট আ ম্যাজিকল ইভনিং ইউ প্রেসেন্টেড টু অস্‌। অজন্তার গুহার কোন এক অপ্সরা এসে বিদ্যুতের গতি সঞ্চালন করেছিল তোমার দুই পায়ে। ওয়েল ডন”।

এরপরের মুহূর্তটার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না অরূণ। হঠাৎ দুই হাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে, মুখে চুম্বন করেছিল শালিনী। ওর বুকে মাথা রেখে বলেছিল, “আই লভ্‌ ইউ”।

ষোল বছরের কিশোরীর প্রেম নিবেদনে অরূণ হেসে, সকৌতূকে বলেছিল, “থ্যাংক ইউ, শালিনী, আই ফীল ফ্ল্যাটর্ড”। তারপর হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলেছিল, “বট্‌ ইট্‌ ইজ গেটিং সো লেট। বাড়ি যেতে হবে না”?

অপ্রস্তুত শালিনী শশব্যস্তে সরে এসেছিল।

কিন্তু বাড়ি ফিরে, বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ জেগে কেটেছিল অরূণের। শালিনীর আপ্লূত আহ্বান সহসা নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল ওকে।

এতগুলো বছর বহু নারীর সংস্পর্শ, ইঙ্গিত, চোখের ভাষায় কামনার আমন্ত্রণ কোনটাই লেশমাত্র বিচলিত করেনি অরূণকে। আজ শালিনীর মত সুন্দরী, তন্বীর আত্ম-নিবেদন, চুম্বন এবং দেহের সঙ্গে লেপ্‌টে যাওয়ার অনুভূতিগুলোও অরূণকে নির্বিকার করে রাখল! এই নিরাসক্তি কি ওর বয়সের এক টগ্‌বগে যুবকের পক্ষে স্বাভাবিক? নাকি অরূণের আজন্ম অর্জিত মূল্যবোধ ওদের গুরু-শিষ্যার দেহাতীত অনুরাগের সীমানাটা লংঘন করতে দিল না? বিভ্রান্ত বোধ করল অরূণ।

তারপর, এক সন্ধ্যায় জেরেমির সঙ্গে নিভৃতে স্কচপান করতে বসে অরূণের দিকে চেয়ে জেরেমি বলেছিল, “কি ব্যাপার? তুমি অন্যমনস্ক কেন”?

–  বল্‌ব? কাউকে বলে দেবে না তো?

–  হোয়াট ডু ইউ মীন”? বলেছিল আহত জেরেমি, “এই কটা বছরেও আমাদের বন্ধুত্ব কি নিঃশর্ত বিশ্বাসের পর্যায়ে আসে নি? এখনো অবিশ্বাস”?

আরও পড়ুন:  ক্যাটরিনা

–  না, ঠিক তা না,” অপ্রস্তুত হয়ে বলেছিল অরূণ।

–  তাহলে?

–  আচ্ছা জেরেমি, যৌবনের শীর্ষে পৌঁছেও আমি কোন নারীর প্রতি আকর্ষণ বোধ করি না কেন? আই মীন, শারীরিক আকর্ষণ?

–  ও এই কথা”! জেরেমি হেসেছিল, “চিন্তা কোরো না। উত্তর একদিন পেয়ে যাবে”।
শালিনীর সঙ্গে অরূণের স্কুলের প্রথম ব্যাচে যে মেয়েরা নাচ শিখতে আরম্ভ করেছিল, পরের দশ-বারো বছরের মধ্যে তাদের সকলের আরেঙ্গেত্রম্‌ অথবা মঞ্চপ্রবেশ হয়ে গেল। স্কুল ছেড়ে তারা অনেকেই চলে গেল। থেকে গেল শালিনী, রূপা আর নীরজা। পড়াশোনার সঙ্গে নাচও চালিয়ে যেতে থাকল তারা। অবশ্য অরূণের স্কুলে ছাত্রীদের সংখ্যা অনবরত বেড়ে চলল। কয়েকটি যুবকও এসে যোগ দিল সেই স্কুলে। কেউ সাউথ আমেরিকান, কেউ চীনে, কেউ স্প্যানিশ আর কেউ ভারতীয়। অরূণের স্কুলে আসার আগে তারা দীর্ঘকাল শিখেছে ব্যালে, ফ্লেমিঙ্গো, ল্যাটিন অ্যামেরিকার নাচ বা কথ্থক। দলে এদের আসায় অরূণের অ্যাকাডেমি পরিবেশিত নাচের অনুষ্ঠানগুলো প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করল। শালিনী বহাল হল স্কুলের ম্যানেজর।

অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটে গেল একটা। অবিবাহিত এবং নিঃসঙ্গ জেরেমি বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে অরূণের আশ্রয়ে চলে এলো পাকাপাকিভাবে। মাস দুয়েকের মধ্যেই বাড়ির পিছনে বিস্তৃত বাগানের একটা অংশ নিয়ে গড়ে উঠল তার নিজস্ব আর্ট স্টুডিও।

* * *

অরূণের জীবনে সেই রাতটা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এত বছর পরেও চিন্তাটা ওর গায়ে শিহরণ তোলে।

দশাবতারের গল্প নিয়ে শো মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। অনেক রাত পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য ওর পড়াশোনাও চলছে তখন পুরো দমে। অরূণের দুই চোখের আনাচেকানাচেও যাতে নিদ্রাদেবী ঘেঁষতে না পারেন, সে ব্যবস্থা করে দিত শালিনী। বাড়ি যাবার আগে মস্ত মগে কড়া, ব্ল্যাক কফি তৈরি করে এনে ওর পড়ার টেবিলের ওপর রেখে বলত, “ঘুমিয়ে পড়ো না যেন”।

হাসত অরূণ। ওকে ভালবেসে নিজের পক্ষপুটে রেখেছে শালিনী। বয়সে এক প্রজন্মের ব্যবধান তাও শালিনী ক্রমশঃ ওর মা, বোন, ভগিনী আর প্রেয়সীর ভূমিকায় চলে আসছে। অবশ্য ওকে প্রেয়সী ভাবটা অরূণের কাছে অসঙ্গত।

সেই রকমই এক গভীর রাতে। কফির মগে মাঝে-মধ্যে চুমুক দিয়ে পড়া চালিয়ে যাচ্ছিল অরূণ। সহসা ওর দুই কাঁধে দুটো বলিষ্ঠ হাতের উষ্ণ স্পর্শ টের পেল। চমকে ফিরে দেখল জেরেমিকে। ওর চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। চোখাচোখি হতে ঝুঁকে নিজের হাত দুটো দিয়ে অরূণের কাঁধ খিম্‌চে ধরল সে। সেই স্পর্শ, ওর তেত্রিশ বছরের জীবনে এই প্রথম – সহস্র স্ফুলিঙ্গের উত্তাপ হয়ে অরূণের দেহ-মন বিহ্বল করল। অবশ চোখে জেরেমির দিকে চেয়ে রইল সে।

–  কি গো ইয়ং ম্যান, কি দেখছ অমন করে”?

জেরেমির প্রশ্ন শুনে সাড় পেয়ে অরূণ বলল, “এত রাতে? ঘুমোও নি এখনো”?

–  কি করে ঘুমোই বলো”? মুখোমুখি দাঁড়াল জেরেমি। মদের নেশা চিন্তা-ভাবনাকে আবিষ্ট করে ফেলছে। বলল, “পূর্ণিমার ফুল মূন দেখেছ আজ রাতের আকাশে? আমার প্রিয়তমের কাছে না এসে কি পারি আমি”?

অরূণ বাক্যহারা। কিন্তু আশ্চর্য, লেশমাত্র বিরক্তি এলো না ওর মনে। যেন মনের অগোচরে জেরেমির এই আমন্ত্রণের অপেক্ষাতেই ছিল ও।

–  কম্‌ অন্‌, ডার্লিং বয়। আমার আর্ট স্টুডিওতে আজ রাতে চাঁদ হাট বসিয়েছে। চলো, দুজনে জড়াজড়ি করে শুই। চাঁদের আলোয় গা ভাসিয়ে দিয়ে।
অতি সন্তর্পনে ওদের প্রণয়-সম্পর্ক গোপন রেখেছিল ওরা। গুরু-শিষ্যের ভাবমূর্তিটাই বজায় রইল বহির্জগতে।

রাজযোটক সংযোগ হয়েছিল দুজনের। পরের অনেকগুলো বছর সাফল্য, খ্যাতির শীর্ষে এনে দাঁড় করিয়েছিল অরূণ আর জেরেমিকে। সাথে স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করেছিল পরস্পরের দেহ ও মনের গভীর সান্নিধ্যে।

তারপর ভাঙন নামল একটু একটু করে। শহরে অরূণের প্রতিষ্ঠিত স্কুলই ছিল প্রথম ভারতীয় ক্লাসিকল নাচের স্কুল। সেই স্কুলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হল এক সময়ে।
এক নতুন ট্রেন্ড চলে এলো আচম্‌কা। বলিউডি নাচ উড়ে এসে জুড়ে বসল শহরে। ভরতনাট্যম্‌ বা ওড়িশি নাচের তুলনায় বলিউডি নাচ খুব সোজা। অরূণের ছাত্রীরা অতএব সোজা পথটাই বেছে নিয়ে ওর স্কুল ছেড়ে চলে গেল। নাচের গ্রূপও ভেঙ্গে গেল অতএব।
ওদিকে দীর্ঘকাল মাত্রাছাড়া সুরাপান জেরেমিকে অসুস্থ করে তুলেছিল। অরূণ আর শালিনীর পরিচর্যা এবং ডাক্তারদের সমস্ত চেষ্টা বিফল করে দিয়ে একদিন সেও চিরবিদায় নিল।

আরও পড়ুন:  ডুগডুগি (পর্ব ১৩)

জেরেমির অগাধ সম্পত্তির উত্তরাধিকার ধনী করে দিল অরূণকে। কিন্তু তাও স্কুলের শোচনীয় অবস্থা এবং জেরেমির চলে যাওয়া, একযোগে গভীর বিষাদ-সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিল ওকে। বেঁচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে সুরার আশ্রয় নিল অরূণও।

* * *

ঘরের মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত প্রসারিত সেই আয়নার ওপর হঠাৎ নিজের প্রতিবিম্বটাকে যেন এই প্রথম দেখল অরূণ। খুব অচেনা। কোথায় সেই সুন্দর, সুপুরুষ নর্তক, স্টেজে যার উপস্থিতি বিমুগ্ধ করে রাখত দর্শকদের; যার বাগ্মীতা চমৎকৃত করত জ্ঞানীগুণীদের? কোথায় সে? আয়নায় যাকে দেখছে, সে বিগতযৌবন, পরাজিত, ক্লান্ত আর অবসন্ন এক অ্যাল্কহলিক। শিউরে দু’চোখ বুজল অরূণ।

দরজায় খুট্‌ ক’রে আওয়াজ হল।

–  কে?” অরূণ চম্‌কে উঠল।

–  আমি, শালিনী।

–  এখানে? এই সময়ে?

–  ডিনর নিয়ে এলাম।

–  কিন্তু কেন?” অরূণের স্বরে বিরক্তি, “রান্নাঘরের ফ্রিজে রেখে দিলেই তো হত”?

–  তোমার প্রিয় দই মাছ, ফুলকপির কোর্মা, মিঠা পুলাও আর রসমালাই এনেছি। জন্মদিন স্পেশল। তোমাকে না খাইয়ে নড়ছি না।

বিস্ফারিত চোখে শালিনীর দিকে চাইল অরূণ।

ততক্ষণে কফি টেবিলটার ওপর খাবার-দাবার গুছিয়ে ফেলেছে শালিনী। খাবার বেড়ে বলল, “চলে এসো”।

খাবারের সুগন্ধে হঠাৎ খিদে পেয়ে গেল অরূণের।

কফি টেবিলের এক দিক ঘেঁসে মেঝের ওপর বসে পড়ে বলল, “আর তুমি”?

–  এই তো, আমার প্লেটও সাজিয়েছি,” কফি টেবিলের আর এক পাশে, অরূণের মুখোমুখি বসল শালিনী।

–  বাঃ! দারুন রান্না হয়েছে,” পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল অরূণের মুখে।

–  হবেই তো! রোজ তোমার জন্য যা খাবার আনি তা সবই তো হাল্কা-ফুল্‌কা। তেল মশলা কম। আজকের রান্নাটা মোগলাই স্টাইল। জন্মদিনের স্পেশল ট্রীট”।

খাওয়া থামিয়ে শালিনীর দিকে চাইল ও। মায়ের কথা মনে পড়ল সহসা। বলল, “জানো, আমার মায়ের অভিশাপেই আমার এই দশা। মাকে শেষবার যখন দেখতে মলেশিয়া গিয়েছিলাম, বলেছিল তুই এমন অকালকুষ্মান্ড ছেলে হলি আমার! একদিন টের পাবি”।

–  এ কথা বলেছিলেন তিনি!

–  মা বলেছিল, যে তিনটে জরুরি সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি আমার জীবনে, সব কটাই ভুলভাল – আমার পেশা, আমার বাউন্ডুলে জীবন আর আমার জেন্ডর প্রেফরেন্‌স।

–  তোমার জেন্ডর প্রেফরেন্‌স!

–  হ্যাঁ, জেরেমির সঙ্গে আমার নিভৃত সম্পর্কটা মা জানত।

খাওয়া থামিয়ে শালিনী অধোবদনে, নীরবে বসে রইল একটুক্ষণ। ওর দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে অরূণ। চল্লিশ পেরিয়েও, এখনো অপূর্ব সুন্দরী শালিনী। অরূণের স্কুলের সঙ্গে বাধা পড়ে মেয়েটা নিজের জীবনটাকেও স্থায়ীভাবে অন্‌-হোল্ড রেখে দিল!

মুখ তুলল শালিনী। চোখাচোখি হল।

–  শালিনী,” অরূণ বলল, “হয়ত এবার তোমার ল’ প্রফেশনে ফিরে যাওয়া উচিত। বিয়ের কথাও ভাবা উচিত”।

শান্ত দুই চোখে অঙ্গার। শালিনী বলল, “হ্যাঁ, আমি নতুন কেরিয়রে যাই, বিয়েও করে ফেলি – তারপর, তোমাকে দেখবে কে শুনি”?

–  এই কথা? আমার হাউস কীপর আমার দায়িত্ব নেবে। আমার সঙ্গে আর আবদ্ধ থেকো না তুমি।

–  উপদেশটা দিতে একটু দেরি হয়ে গেল না”? তীক্ষ্ণস্বরে বলল শালিনী।

–  শালিনী, আমি তোমার শুভাকাংখী বন্ধু। আজীবন থাকব। কিন্তু এর বেশী আমার কাছ থেকে আশা কোরো না। আমি এখন আ সিংকিঙ্গ সন্‌। অস্তগামী সূর্য।

–  কিন্তু আমার প্রত্যাশার যে অন্ত নেই, মিস্টর সিংকিঙ্গ সন্‌। আর আমার জীবনে সবই তোমাকে ঘিরে। আমি বলছি, জীবনের মোড় তোমার আবার ঘুরবে। এবার আর নাচ নয়। অধ্যয়ন আর অধ্যবসায় দিয়ে প্রাচীন ভারতের শাস্ত্র, শিল্পকলা, দর্শন, ইতিহাসে তোমার গভীর পান্ডিত্য গভীরতর হবে। রিসর্চ করবে। বই লিখবে। অমূল্য সেই পান্ডিত্য ওয়েস্টর্ন ওয়ার্ল্ডের মানুষগুলোর চিন্তা-ভাবনায় বিস্তার পাবে। অ্যাল্‌কোহল নিয়ে বসে বসে মনস্তাপ করার দিন তোমার আজ ফুরোল। অস্তমিত সূর্য আবার উঠবে পরের দিন, ভোরের আকাশে। আমি বলছি”।

আশা আর বিশ্বাসের আলোয় ঝলমল করছে শালিনীর মুখ-চোখ।

অরূণ বিহ্বল হয়ে চেয়ে রইল।

মৃদু হেসে শালিনী আবার বলল, “আর আমি সব সময়ে তোমার পাশে থাকব। তোমার সহকর্মিনী হয়ে। একটু আগেই বললাম না, তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না আমি”?

Sponsored
loading...

1 COMMENT

  1. badda borring . sudhu bhasar khela r golpo expand korar chesta . but main theme kothay . no horror contentsudhu love story