আসুন চোখ রাখি অষ্টাদশ শতকের বঙ্গদেশে | একবার মনে করি সেকালের কোটিপতি বঙ্গপুরুষদের‚ যাঁদের কাছে হাত পাতত ব্রিটিশরাও |  (দ্বিতীয় পর্ব)

নন্দরাম সেন :

ডেপুটি কালেক্টর পদে কর্মরত এই ক্ষমতাবান ব্যক্তি পরিচিত ছিলেন ব্ল্যাক জমিনদার হিসেবে | তবে তাঁর অতীত সবসময় মসৃণ নয় | ১৭০০ সালে তিনি খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পান | ১৭০৭ সালে তহবিল তছরূপের দায়ে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় | পরে আবার দায়িত্ব পান | কিন্তু একই অভিযোগ ওঠে | সাজা এড়াতে তিনি গা ঢাকা দেন হুগলিতে | সেখানেই তাঁকে গ্রেফতার করে কারাবন্দি করা হয় |
নামের পাশে এত কালিমাতেও ম্রিয়মাণ হয়নি সমাজে তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তি | সাবেক কলকাতার আর এক ধনী গোবিন্দরাম মিত্রের নাতি রাধারচরণ মিত্রের বিরুদ্ধে একবার নথি জাল করার অভিযোগ ওঠে | পরিণামে মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁর | এই শাস্তি রদ করার জন্য ৯৫ জন গণ্যমান্য ব্যক্তি স্বাক্ষর করেন | তাঁদের ভিতর নন্দরাম সেন ছিলেন অন্যতম |

নকু ধর :

বিত্তবান লক্ষ্মীনারায়ণ ধরের ডাকনাম ছিল নকু ধর | হুগলির আদি সপ্তগ্রাম থেকে এসে কলকাতায় বসত গড়েছিলেন তাঁরা | রবার্ট ক্লাইভ নিয়মিত টাকা ধার নিতেন নকু ধরের কাছ থেকে | অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধে ইংরেজদের ৯০ লক্ষ টাকা ধার দিয়েছিলেন নকু | নকুর এক কর্মী ছিলেন নবকৃষ্ণ দেব | পার্সি-সহ একাধিক ভাষা জানতেন | তাঁকে নকু নিয়ে যান ক্লাইভের কাজে | সাহেবের মুন্সি হিসেবে কাজ শুরু করে নবকৃষ্ণ হন তাঁর দেওয়ান | বাকিটা ইতিহাস | এই নবকৃষ্ণ দেবের হাতেই গোড়াপত্তন হয় শোভাবাজার রাজপরিবারের |

মাথুর সেন : তিনি ছিলেন পোদ্দার বা ব্যাঙ্কার | তাঁর আয়ের মূল উৎস ছিল নীলচাষ | ১৮২৪-২৬ সালে অ্যাংলো-বর্মা যুদ্ধে ব্রিটিশদের তিনি তখনকার দিনে ধার দিয়েছিলেন ১৬ লক্ষ টাকা | ১৮০৫ সালে ৩ লক্ষ টাকা খরচ করে নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে মাথুর বানান প্রাসাদের মতো বাড়ি | রাজভবনের অনুকরণে তৈরি সে বাড়িতে ছিল চারটি ফটক | ব্রিটিশরা অবশ্য ভালভাবে নেয়নি তাঁর এই পদক্ষেপ | তাদের নির্দেশে একটা ফটক চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয় |

গৌরী সেন :

তাঁর আদিপুরুষরা ছিলেন হুগলির বাসিন্দা | ১৭৩২ সালে সেন পরিবার চলে আসে কলকাতায় | গৌরী সেনের ভাগ্য ফেরে অনেকটাই কপালজোরে | তিনি কাজ করতেন বৈষ্ণব চরণ শেঠের কাছে | তাঁর নামে ৭ নৌকো জিঙ্ক কেনেন বৈষ্ণবচরণ | পরে বিক্রির সময় দেখা যায় ওগুলো জিঙ্ক নয় | আসলে রুপো | কিন্তু বৈষ্ণবচরণ ছিলেন খুব সৎ | যেহেতু গৌরীর নামে কেনা‚ তিনি বিক্রির পুরো টাকা দিয়ে দেন গৌরীকে | এতেই ধনী হয়ে যান গৌরী | সৎ এই ব্যক্তি অকাতরে অর্থ দান করতেন | বিশেষ করে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের যথাসম্ভব দান করতেন | এমনকী‚ যাচাই করে দেখতেনও না দানপ্রার্থীর সত্যি অর্থের প্রয়োজন আছে কি না | সেই থেকেই শুরু প্রবাদ‚ লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন |

হরি ঘোষ :

কলকাতার চিৎপুরে আদি বাসিন্দাদের মধ্যে ছিলেন মনোহর সেন | একসময় তিনি চলে যান কলকাতার বাড়ি ছেড়ে | তাঁর বংশধর শ্রীহরি ঘোষ ফিরে আসেন কলকাতায় | একাধিক ভাষা জানার দরুন মুঘল দরবারে কাজ করে বহু অর্থ আয় করেন তিনি | অবসরের পরে বাড়ি করেন কলকাতার যে রাস্তায়‚ সেটি এখন পরিচিত হরি ঘোষ স্ট্রিট নামে | লোকমুখে শ্রীহরি হয়ে যান হরি | তাঁর বাড়িতে শুধু পরিবারের সদস্য নন‚ থাকতেন আত্মীয় পরিজন মিলিয়ে অনেকে | এমনকী বহিরাগত‚ ভবঘুরে‚ আর্ত‚ দুঃখী‚ সবাই আশ্রয় পেতেন হরি ঘোষের বাড়িতে | গৃহস্থ যেমন যত্ন নেয় তার গরুর‚ হরি ঘোষও নাকি সেরকম যত্ন নিতেন সব আশ্রিতের | তিনি যা খেতেন সেই খাবার খেতেন বাড়ির সব আশ্রিত | তাই‚ তাঁর বাড়ি হয়ে যায় হরি ঘোষের গোয়াল | যা অংশ হয়ে ওঠে বাংলা প্রবাদের | তবে শেষ জীবনে হরি প্রতারিত হন কাছের লোকের কাছে | তাঁর সম্পত্তি বাধা পড়ে | কলকাতার সব ছেড়ে হরি ঘোষ চলে যান কাশী | সেখানেই থাকেন আমৃত্যু | কাশীতে ১৮০৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয় | শোনা যায়‚ মৃত্যুর আগে হরি ঘোষ বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন গাঙ্গুলি পরিবারকে |

( সমাপ্ত )

আরও পড়ুন:  কন্যা-দিবসে আত্মজাকে সমর্পণের পথে এক ধাপ এগোলেন মুকেশ অম্বানি

NO COMMENTS