কুড়ি সপ্তাহ।

স্ন্যাপচ্যাটে তাঁর ছবির তলায় লেখা ছিল মাত্র দুটি শব্দ। আর তাতেই তুমুল আলোড়ন সোশ্যাল মিডিয়ার ভুবনে। ছবিটা অবশ্য বেশিক্ষণ রাখেননি সেরেনা উইলিয়ামস। কিছুক্ষণ পরেই ডিলিট করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। সেরেনা কি অন্তঃসত্ত্বা? এই প্রশ্নের ঢেউ আছড়ে পড়েছে টেনিস দুনিয়ার কেন্দ্রে। শুরু হয়ে গেছে হিসেব নিকেশ। কুড়ি সপ্তাহ! তার মানে জানুয়ারিতে যখন দিদি ভেনাসকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতলেন তখনই তিনি গর্ভবতী? সেই অবস্থাতেই কোর্টে নামলেন এবং জিতলেন!

এরপর যখন সেরেনা স্বীকার করে নিলেন খবরটা সত্যি, তখন ক্রীড়াপ্রেমীদের বিস্ময় যেন আর বাঁধ মানছিল না। এও সম্ভব! ওই শারীরিক অবস্থায় কোর্টে নামা এবং জেতা! তাও যে সে টুর্নামেন্ট নয়, একেবারে গ্র্যান্ড স্ল্যাম! এ যে অবিশ্বাস্য।

কী করে এত মনের জোর পেলেন সেরেনা? আসুন শোনা যাক কী বলছেন টেনিস সম্রাজ্ঞী। ‘অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ঠিক দু-সপ্তাহ আগে জানতে পারি আমি অন্তঃসত্ত্বা। স্বাভাবিক ভাবেই দারুণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। বুঝতেই পারছিলাম না কী করব। গর্ভধারণের প্রথম বারোটা সপ্তাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থায় কোর্টে নামাটা ঠিক হবে কিনা, সেই সংশয় আমাকে ঘিরে ধরছিল। কিন্তু শেষমেশ নিজেকে বোঝালাম এই সব অতিরিক্ত আবেগকে পাত্তা দেওয়া যাবে না। নিজের ফোকাস ঠিক রাখতে হবে।’

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের আগে নিজের মনের ভেতর চলতে থাকা সেই অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা জানিয়েছেন সেরেনা। জানিয়েছেন, কীভাবে ঠান্ডা মাথায় ফোকাস ধরে রেখে টুর্নামেন্টটা খেলেছিলেন তিনি। আর জিতেছিলেন জীবনের ২৩তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম। কিংবদন্তি স্টেফি গ্রাফকে টপকে গিয়ে স্পর্শ করেছিলেন নতুন নজির। তৈরি হয়েছিল নতুন ইতিহাস।

একজন চ্যাম্পিয়ন কোন জায়গায় বাকিদের থেকে আলাদা হয়ে যান, সেটা আরও একবার স্পষ্ট হল। পেশাদার ক্রীড়াজগতে বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড়ই আসেন। প্রতিভার মাপকাঠিতে তাঁরা অনেকেই তুল্যমূল্য। কিন্তু সেই প্রতিভার সঙ্গে যোগ হয় আরও কিছু উপাদান, যা শেষ পর্যন্ত একজন চ্যাম্পিয়নকে সকলের থেকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যায়। সেই উপাদানের অন্যতম হল দৃঢ় মজবুত এক বিশ্বাস। যেটার ভিত তাঁদের মনের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। শারীরিক বা মানসিক যে কোনও প্রতিকূলতার মধ্যে সেই বিশ্বাস একটা পজিটিভ তরঙ্গ ছড়িয়ে দেয়, যাই হোক না কেন। তুমি পারবে। পারবেই। আপাতদৃষ্টিতে গর্ভে সন্তান এসে যাওয়ার পরেও কোর্টে নামার মধ্যে একটা নিষ্ঠুরতার ছায়া অনেকে হয়তো দেখবেন। কিন্তু একজন চ্যাম্পিয়ন আসলে অন্য ধাতুতে গড়া। আমি জিতব আর আমার গর্ভস্থ সন্তানেরও কোনও ক্ষতি হবে না—নিশ্চিতভাবেই সেরেনা নিজের মনের মধ্যে এই প্রতিজ্ঞাকে একেবারে মজবুত রূপ দিয়েছিলেন। আর তারপর সেটাকে সত্যি প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন।

আরও পড়ুন:  প্রসেনজিৎ আমার সঙ্গে প্রচুর পলিটিক্স করেছেন : অভিষেক চ্যাটার্জী

আসলে এইভাবেই তৈরি হয় রূপকথা। ২৩তম গ্র্যান্ড স্ল্যামের ম্যাজিক-সাফল্যের সঙ্গে গর্ভধারণের ঘটনাটা জুড়ে গিয়ে সেরেনাকে করে তুলেছে একজন সুপার উওম্যান। অবশ্য তিনি তো বরাবরই তাই। জেতার আগ্রাসী খিদে আর অনমনীয় জেদ কোর্টের মধ্যে বহু আগেই তাঁকে লার্জার দ্যান লাইফ একটা পরিচিতি দিয়েছে।

দিদি ভেনাসের প্রতিভাও কম কিছু নয়। কিন্তু বোনের মধ্যেকার এক্স ফ্যাক্টর তাঁর মধ্যে নেই। আর তাই ধীরে ধীরে দিদির ছায়াকে ছাপিয়ে ক্রমশ জয়ীর উচ্চ থেকে উচ্চতর শৃঙ্গে পৌঁছে গিয়েছেন এক বছরের ছোট বোন।  

সতেরো বছর বয়সে জীবনে প্রথমবার বিজয়ী হওয়ার স্বাদ পেয়েছিলেন। জয়ের সেই অনুপম স্বাদ কখনও ভোলেননি সেরেনা। বরং সেই স্বাদের নেশা ক্রমশ ছড়িয়ে গেছে রক্তের গভীরে। প্রতিবার নতুন নতুন সাফল্যে সেদিনের সতেরো বছরের অনুভূতিকেই ফিরে পেতে চান তিনি। তা বলে হারকে মোটেই অস্বীকার করেন না। জানিয়েছেন, ‘হারকে ঘৃণা করি ঠিকই, কিন্তু না হারলে আমি আজ এই জায়গায় আসতেও পারতাম না। হার খুব যন্ত্রণা দেয়। কিন্তু শিক্ষাও দেয়। সেই জন্যেই একবার হারার পরে আমি বহুদিন পর্যন্ত আর হারি না। কারণ হারটা আমাকে জেতার শিক্ষা দিয়ে যায়।’

তিনি অসামান্য শক্তির অধিকারী। ইতালির টায়ার প্রস্তুতকারী সংস্থা পিরেল্লির ক্যালেন্ডারে দেখা গিয়েছিল তাঁর নগ্ন শরীর। শরীরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনমনীয় পেশীশক্তির সেই প্রকাশ এসেছিল প্রকাশ্যে। যে শরীর নিয়ে তিনি একসময় ভেবেছিলেন, ‘আমি এরকম কেন?’ তারপরই নিজেকে বুঝিয়েছিলেন, ‘এই শক্তিশালী শরীরই তো আমাকে গ্রেটেস্ট করে তুলেছে!’

বরাবরের স্পষ্টবাদী সেরেনা জানিয়েছেন, ‘পুরুষ হলে অনেক আগেই আমাকে গ্রেটেস্ট হিসেবে মানা হত।’ হয়তো তাই। নারী হিসেবে অতিরিক্ত লড়াই লড়তে হয়েছে নিজেকে প্রমাণ করতে। কিন্তু তিনি ঘাবড়াননি। শরীরের কৃষ্ণবর্ণ নিয়েও অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। সেইসব অপমানের স্মৃতি নিয়ে সেরেনা বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই শুনেছি আমি দেখতে সুন্দর নই। আমার চামড়ার রং অত্যন্ত কালো। কিন্তু বাবা আমাদের সব সময় বলেছেন ইতিহাসটা ঠিক করে জানতে। ইতিহাস ঠিক করে জানলে ভবিষ্যৎটা সুন্দর হয়।’

আরও পড়ুন:  মন্ত্র পড়ে পুজো-আচ্চা নয়‚ ভক্তদের বাবা লোকনাথ বলেছিলেন তাঁকে ভক্তিভরে ডাকতে

কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে যে অত্যাচার হয়েছে সেটা জানেন সেরেনা। ক্রীতদাস প্রথার বর্বরতা সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে আজও চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তাঁর, ‘যখনই ভাবি কী যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে, যার ভিতর দিয়ে আমরা আজকের এই স্বচ্ছন্দ জীবনটা পেয়েছি, তখন সত্যিই আর অন্য কোনও রং পছন্দ হয় না।’ ওই অত্যাচার সামলেও কালো মানুষেরা জিতে গেছে। সেই জিতে যাওয়ার গল্প তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। ভেতরে ভেতরে বুনে দেয় হার না মানা জেদ আর অধ্যবসায়ের রং মশাল।

লিঙ্গ বৈষম্যই হোক বা বর্ণ বৈষম্য—সমস্ত অবহেলা ও অপমানকে নিজের মোটিভেশনের কাজে লাগিয়েছেন সেরেনা। আর হয়ে উঠেছেন অপ্রতিরোধ্য চ্যাম্পিয়ন। জেতাই যাঁর একমাত্র কাজ।

শরীরে জন্ম নেওয়া প্রাণের বীজকে সন্তর্পণে রেখেও তাই জয়ীর পোডিয়ামে অনায়াসে উঠে পড়েন তিনি। তেইশ আসলে একটা সংখ্যা মাত্র। সেরেনা জানিয়ে দিয়েছেন, মা হওয়ার পরেও কোর্টে ফিরবেন। সতেরো বছর বয়সে জীবনের প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার সেই খিদে তখনও গনগন করে জ্বলতে থাকবে টেনিস সম্রাজ্ঞীর মনের ভিতর।

- Might Interest You

1 COMMENT

  1. খুব ভালো লাগলো পড়ে বিশ্বদীপবাবু, যদিও সেরেনা কে গ্রেটেস্ট মনে করিনা। তবু সেলাম গ্রেট চ্যাম্পিয়নকে।