উন্মেষ পর্ব

একটা খেজুর গাছ সাধারণত এক বছর অন্তর রসের জন্য বাছাই করা হয় | এই ব্যবধান যত বেশি হবে তা যেমন গাছের স্বাস্থ্য তেমনই ভবিষ্যত রস নিষ্কাশনের জন্য শুভ | তবে, এই ‘ব্যবধান’ ফ্যাক্টরটির পাশাপাশি বাছাই করার সময় গাছের বর্তমান স্বাস্থ্যের দিকটিও সমান গুরুত্ব পেয়ে বিবেচিত হয়ে থাকে | যেমন বাজ পড়ে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ বা পঙ্গু গাছ কখনই রসমারার জন্য নির্বাচন করা হয় না | রসের গুণমান ও পরিমাণ – দু’য়ের সঙ্গেই এ বিষয়টি সরাসরি জড়িত |

প্রসঙ্গত স্বল্প ব্যবধানে বা ন্যুনতম ফারাক না রেখে গাছ বাঁধার জন্য অনেক সময় সম্ভাবনাময় গাছেরও অকালমৃত্যু হচ্ছে | কেউবা অকালে বুড়িয়ে যাচ্ছে | নিছক রস যোগানোর দাস হয়ে পড়ছে | গ্রাস করছে অকালবার্ধক্য | ক্রমবর্ধমান গুড়ের চাহিদাই এজন্য মূলত দায়ী |

গাছ কাটতে যাবার আড়ালে থাকে লম্বা প্রস্তুতি পর্ব |

গাছকাটার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ বিবিধ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম শিউলি রাখে চোঙার মধ্যে | এটা চোঙাকৃতি বা বালতি-ব্যাগের মতো দেখতে | এটা তৈরি হয় বাঁশ আর খেজুর গাছের সরপা দিয়ে | অনেকে খেজুর বা নারকেল পাতা বা বেত দিয়েও তৈরি করেন চোঙা | দড়ি দিয়ে এটা বাঁধা থাকে পিঠে | অনেকে দড়ি বা কাছি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে নেন কোমরের একপাশে | অন্যপাশে দড়িতে লাগানো থাকে ‘এস’ আকৃতির একটা লোহার আংটা | এটা থেকে ঝোলানো থাকে একটা হাঁড়ি যা বাঁধা হবে গাছে |

রসের হাঁড়ি বা ভাঁড় পরিষ্কার জল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া হয় | পরের দিকে একাধিকবার ভালো করে ধুলেও ভাঁড়ের গায়ে লেগে থাকা আগের দিনের রসের গন্ধ যেতে চায় না | এছাড়া নানা সূত্রে ভাঁড়ে থাকা জীবানু ও ব্যাকটেরিয়া তাড়াতে হয় | এজন্য ভাঁড়গুলো মুখোমুখি দু’সারিতে সাজিয়ে তাদের মাঝে বিচালি গুঁজে দেয় শিউলি বা তার সহযোগী (এই ভূমিকায় সাধারনত থাকে শিউলির ছেলে)| কেউ কেউ হাঁড়ির চারপাশ মুড়ে দেন বিচালি দিয়ে | তারপর আগুন ধরিয়ে দেওয়া বিচালিতে |

আশ্বিনের ১৫/২০ তারিখ থেকেই (স্থানভেদে কার্তিক-অগ্রহায়ন মাসে) গাছ কাটতে বা ঝুরতে (যেদিকে হাঁড়ি ঝোলানো হবে তার আশেপাশের খেজুর পাতা-সরপা ছেঁটে ফেলা সহ গাছে ওঠার পথটুকু সাফসুতরো করা) শুরু করে দেন শিউলিরা | বয়েসে নবীন বা আগে অনেকবার কাটা হয়েছে এমন গাছ একেবারে মরসুমের শুরুতেই না কেটে এক-আধ মাস পরে কাটা হয় | এটা হলো গাছ বাঁচিয়ে ফল খাওয়ার মতো |

আরও পড়ুন:  লেডি চ্যাটারলিজ লাভার বনাম পোস্টমাস্টার

সলতে পাকানো পর্বে তৈরি চোঙাসহ গাছে চড়ে শিউলি | কোমরে থাকে একটা শক্ত মোটা দড়ি | এর ঘর্ষণজনিত আঘাত ও জ্বলুনি থেকে বাঁচতে শিউলি কোমরে পেঁচিয়ে নেন একটা পাটের বস্তা | এই দড়ির সাহায্যে শিউলি নিজেকে আটকে রাখে গাছের সঙ্গে | অর্থাত্ গাছ ও গাছির মধ্যে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে উভয়কে একটা বন্ধনীর মধ্যে নেওয়া | শিউলি তার দু’পা গাছের সঙ্গে ঠেকিয়ে নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দেন বন্ধনীর দড়ির ওপর | দেখলে মনে হবে শূন্যে হেলান দিয়ে আছে শিউলি |

daf6e5f3fe956d04f061d244efc5321c-1গাছ কাটার দু’চারদিন পর থেকে শুরু হয় গাছ চাঁছা |এই চাঁছার কাজটা করা হয় অর্ধচন্দ্রাকার কাস্তে বা হাঁসুয়া অথবা তীক্ষ্ণ ধারালো দা দিয়ে | এছাড়াও দরকার মতো কাজে লাগে খুঁচি, খুরপা, খুরনি, কাতারী, কাটার, বিভিন্নরকমের দা ইত্যাদি |

অভিজ্ঞ শিউলির মতে, চাঁছার কাজ করা উচিত সূর্য ডোবার অব্যবহিত পরে | দিনের শেষবেলায় | কিন্তু নানাবিধ কাজের চাপে বাস্তবে সব গাছের ক্ষেত্রে এ নিয়মরক্ষা সম্ভব হয় না | শীতের বেলা বড্ড ছোট | সেই ভোরবেলা থেকে সারা সকালটা কেটে যায় গাছ থেকে রস নামানো থেকে শুরু করে গুড় তৈরির তদারকিতে | বিকেলে হাট নয়তো বাজার | দোকান/আড়তে গুড় পৌঁছে দেওয়া বা বেচতে হবে | তার আগেই সারতে হবে গাছ কাটা বা চাঁছার কাজ | শিউলিরা তাই দুপুরের খাবারটা কোনরকমে নাকেমুখে গুঁজেই বেরিয়ে পড়েন |

যেখান থেকে গাছের পাতাগুলো বেরিয়েছে ঠিক তার নিচের অংশে, গাছের একদিকে কমবেশি এক থেকে তিন বর্গফুট জায়গার ছাল ছাড়ানো হয় | এতে গাছের ভেতরকার একটা সাদা অংশ বেরিয়ে আসবে | নুনছাল ওঠা রসালো মাংস | নিচের দিকটা চাঁছার পর ইংরেজি ‘ভি’ আকৃতির মতো দেখতে লাগে | এভাবে চাঁছা জায়গাটা শুকোতে সময় লাগে ৩/৪ দিন | তারপর চাঁছা জায়গায় গভীর করে ড্রেন কাটা হয় |

8376133687_6373373bcb_mএই চাঁছার ধরনে কিছু কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় | কোথাও গাছ কাটার পর সেখানে মানুষের চোখের আদলে দুটো চোখ-এর মতো তৈরি করা হয় | পর পর দু’দিন সেই চোখের ওপর অত্যন্ত ধারালো দা দিয়ে চাঁছে শিউলি | এবার সেই চোখগুলো বাঁশের সুঁচালো একটা কাঠির সাহায্যে ভলো করে ঘষা হয় | এতে রস বেরোনোর রাস্তাটা খোলে ভালো |

আরও পড়ুন:  শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সমীপে...

ধরণ যাই হোক, চাঁছার কাজটা করতে হয় অত্যন্ত সতর্কভাবে | কারণ ঠিক মতন চাঁছা না হলে রসের পরিমাণ ও স্বাদে হেরফের হবেই | এমনকী বেশি খোঁচাখুঁচি করলে দেহ রাখতে পারে গাছ |

রস গড়িয়ে পড়ার জন্য কাটা অংশে ‘ভি’ কোণায় কিংবা চোখের মতো অংশে লাগানো হয় কল বা খিলি বা কাঠি | স্থানভেদে একে ট্যালা বা খিলও বলা হয় | শিউলির ভাষায় এই কাজকে বলা হয় কল (বা কোনো সমার্থক শব্দ) লাগানো বা পরানো | বস্তুত চার থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি বেড়ের বাঁশের অংশকে লম্বালম্বিভাবে চিরলে দু’খানা কাঠি পাওয়া যায় | বাঁশের এই নলীই হলো কল বা খিলি | তলতা বা তলদা বাঁশ একাজে বিশেষ উপযোগী |

কাঠির মাঝের ঢালু অংশ বেয়ে চুঁইয়ে আসে খেজুর গাছের রস, তরল অনুরাগ বা আসক্তি | এ যেন গাছের রসভারে কম্পিত দশা | খিলিরও একই অবস্থা | ভাবতে ভালো লাগে চন্ডীদাসকে, “রসভারে দুঁহু থরথর কাঁপই” | কাঠি লাগানো অবস্থায় থাকবে তিন/চার দিন | জায়গাটা শুকনোর পর রস আসার সময় হলে গাছ ঘেমে ওঠে | তখন গাছে খিলি বা কাঠির মুখে লাগাতে হয় থিলি বা পাতলা মেটে হাঁড়ি | এ হলো গাছের রস জর্জর অবস্থা | গাছ দিচ্ছে, খিলি নিচ্ছে | “পুলকে পুরয়ে অঙ্গ” |

প্রসঙ্গত বিকল্প চাঁছার ক্ষেত্রে বাঁশের সুঁচালো কাঠিটি দিয়ে ঘষার অবব্যহিত পরেই থিলি লাগিয়ে দেওয়া হয় রস সংগ্রহের জন্য |

খিলিগুলো সবসময় লাগানো থাকে গাছে | কোনো কারণে খিলি নষ্ট হয়ে গেলে শিউলি ঠোঙ্গা থেকে নতুন খিলি বের করে লাগিয়ে দেয় সেখানে | খিলির ঠিক নিচে গাছের গায়ে তীর্যকভাবে পোঁতা হয় বাঁশের গোঁজ | এটা পেরেকের ভূমিকা পালন করে | এই গোঁজের সঙ্গে দড়ির সাহায্যে আটকে দেওয়া হয় হাঁড়ি |

থিলি লাগানো শুরু হয়ে যায় বেলা চারটে সাড়ে চারটে থেকে | তবে কুলীন গাছের রসের ক্ষেত্রে হাঁড়ি বাঁধতে হবে সূর্যাস্তের পর | ক্ষেত্র বিশেষে রাত এগারোটার পর থিলি বাঁধা হয় গাছে | যখনই রস পড়ার রাস্তাটা পরিষ্কার করার দরকার পড়ে তখনই ধারালো দা দিয়ে আগের চাঁছা জায়গাটা পুনরায় হালকা করে চেঁছে দেওয়া হয় |

আরও পড়ুন:  কাব্যি সওয়ারি – দেখবি আর জ্বলবি লুচির মতো ফুলবি

গাছ ঝুরা হয়ে গেলে শিউলি সে গাছ ছেড়ে চলে যায় অন্য গাছ ঝুরতে | শিউলির সহযোগী বা যোগাড়ে বা ছেলে এসে সদ্য কাটা গাছের গোঁজে আটকে দেয় হাঁড়িটাকে | নতুবা শিউলির খাটনি বাড়ে | গাছে ওঠার সময়ই কোমরে ঝোলানো আংটায় হাঁড়ি ঝুলিয়ে নিতে হয় |

রসের হাঁড়ি নামানো শুরু হয় সাধারণভাবে ভোর সাড়ে চারটে পাঁচটা থেকে | তবে, কুলীন গুড়ের জন্য রসের হাঁড়ি নামাতে হবে ভোর চারটের মধ্যে | রাত থাকতে, পাখিরা জেগে ওঠার আগেই | রসের হাঁড়ি নামানোর সময় গাছি এক হাতে গাছ ধরে টাল রাখে, অন্য হাতে থাকে গাছটার শরীরের রক্তরস | মুহূর্তের এদিক ওদিকে সমূহ বিপদ |

হাঁড়ি নামানোর পরেও রস পড়ায় বিরাম নেই | ঝরতে থাকে সারাদিন | তবে সে রসের মিষ্টত্ব অনেক কম | সুবাসও থাকে না বললেই চলে | এই সময় ছোট ছোট ছেলে ছোকরার দল হাঁড়ির জায়গায় চট কোনো পাত্র বেঁধে দেয় খেলাচ্ছলে | পরে তা হইহই করে খেয়েও ফেলে |শীতের মরসুমে গ্রামের মেঠো  পথে হাঁটার সময় প্রায়ই চোখে পড়ে বাচ্চারা খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে ওপরের দিকে হাঁ মুখ করে | একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে খিলি বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা রস পড়ছে সেই কচি মুখে | কচিকাঁচাদের কাছে  এ এক মজার খেলা |

কার্তিক থেকে মাঘ – এই চার মাস ধরে চলে রস সংগ্রহের পালা | পালাকার, পরিচালক, প্রযোজক, ডিস্ট্রিবিউটর (অংশত) শিউলি | মাঘের শেষ ভাগ থেকেই যেন মিলনের মাঝে আসন্ন বিরহের সুর বেজে ওঠে | রস কমে আসছে | ফাল্গুনে চড়বে না হাঁড়ি | গাছ ও খিলিও যেন বুঝতে পারে, তাদের বিচ্ছেদ আসন্ন | গাছ ঢালবে না রস | খিলির বুকেও শুকিয়ে যাবে রসের ধারা | হাঁড়িতে তখন একরাশ শূন্যতা, হাহাকার | মাঘের শেষদিনে তাই মনে পড়ে, “দুঁহু ক্রোড়ে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া” (চন্ডীদাস)|

এরপর গাছ ও খিলির বিরহ দশা চলতে থাকে শিউলি পুনরায় ঘটকালি না করা পর্যন্ত |

 

চলবে

গত পর্বের লিং – http://banglalive.com/the-tale-of-date-juice-known-as-kejur-ros-in-bengal/

গৌতম কুমার দে
বিশিষ্ট ফিলাটেলিস্ট ও ফ্রিলান্স জার্নালিস্ট | স্প্যানিশ পড়িয়েছেন ভবানীপুর ও উমেশচন্দ্র কলেজ এবং হলদিয়ার এইচ আই টি-তে |ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল ও মেসে যৌনার্থক শব্দ ও স্ল্যাংয়ের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করেছেন | প্রথম বই ‘বাহনলিপি’, সম্পাদিত বই তিনটি | শখ – ফিলাটেলি, ফিলুমেনি, ভ্রমণ, বুক মার্ক, মেনুকার্ড, ইরেজার, ছাদনাতলার ছড়া, পত্র-পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ইত্যাদি সংগ্রহ করা |

NO COMMENTS