(ভাবলিখন – তন্ময় দত্তগুপ্ত)

বয়স পাঁচ।ছোটবেলায় গ্রামে রাধার চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম।তখনও ভ্রমণ সাহিত্য বা ভ্রমণ কাহিনির কোনও ধারণা ছিল না।দেশভাগের পর এ দেশে চলে আসি।আমি যখন ক্লাস ফাইভে উঠলাম তখন সাহিত্য আমাকে স্পর্শ করল।সাহিত্য বলতে সে সময়ের সঙ্গী ছিল গোয়েন্দা উপন্যাস।আমি খড়গপু্রে থাকতাম।সেখানে রামনাথ বিশ্বাসের ভ্রমণ গ্রন্থ “আগুনের আলো” আমি উপহার পেয়েছিলাম।গ্রন্থের মূল বিষয় ছিল আফ্রিকার জীবন।

বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণ কাহিনির শাখা খুব অপুষ্ট নয়।এমনকী শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের নাম ছিল “শ্রীকান্তর ভ্রমণ কাহিনী”।বাঙালির মধ্যে ভ্রমণের জিন আছে।তাই সে ভ্রমণপিপাসু।স্কুল ফাইনাল পাশের পর আমি আর আমার তিন বন্ধু শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছিলাম।এটা ১৯৫৪ সালের ঘটনা।শান্তিনিকেতনে প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়,অন্নদাশঙ্কর রায়,পুলিন বিহারী সেন ছিলেন।তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় আমাকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন,সবাই আমাকে রবীন্দ্রনাথ বলে ভুল করে।রবীন্দ্রনাথের বিরাটত্ব তখনও বুঝিনি।আমার বেশ মনে আছে ওখানে তালধ্বজ বলে তাল গাছ নিয়ে একটি ঘর ছিল।মানে ঘরের ভেতর থেকে তালগাছ আকাশমুখী।খুব কৌতূহল নিয়ে সেসব দেখেছি।কিন্তু এগুলোর সাংস্কৃতিক ইতিহাস উপলব্ধি করিনি।পরে রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য কিছুটা বুঝেছি।শান্তিনিকেতনের আশ্রমের মন্দিরে বক্তৃতা দিয়েছি ২০০১ সালে।থেকেছি রতন কুঠিতে।পায়ে হেঁটে  গিয়েছি বহুদূর।

সুনীতি কুমারের “ইউরোপ ভ্রমণ” গ্রন্থ প্রকাশিত ১৯৩৮-এ।ইউরোপের সেই সমস্ত জায়গা আমি দেখেছি।আমি ফ্লোরেন্সে গিয়েছি।রোমে গিয়েছি।প্যারিসে গিয়েছি।জাপানেও গিয়েছি, সেটা অন্নদাশঙ্করের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা জাপানের সাথে মিলবে না। বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে ডিম সেদ্ধ, ভাত বা মাছ  না হলে চলে না।উত্তর ভারতের কুমায়ুন-গাড়োয়াল অঞ্চলে যখন গেছি তখনও দেখেছি বাঙালি মাছ ভাতের হোটেলের সন্ধান করছেন।আমি যেকোন খাদ্য পছন্দ করি।দক্ষিণ ভারতের ইডলি ধোসা,রাজস্থানের বৈচিত্রপূর্ণ নিরামিষ খাদ্য আমার খুব ভালো লাগে।গুজরাটে স্বল্প খরচে উপাদেয় থালি পাওয়া যায়।সেখানে লুচি,নিরামিষ ডাল,নিরামিষ তরকারি,বিন্স থাকে।কেরলে একটা বিয়েবাড়িতে পঞ্চান্ন রকমের নিরামিষ পদ আমাদের দিয়েছিল।আবার কোরিয়াতে আমি ব্যাঙের ঠ্যাঙ ভাজা খেয়েছি।জাপানে কাঁচা মাছ খেয়েছি।সেটা কিন্তু সেদ্ধ মাছ নয়।কাঁচা মাছ ভিনিগারে ডুবিয়ে আদার কুচি সহ সস মিশিয়ে এই পদ তৈরি হয়।জাপানে এই খাবারের নাম সুশি।

আরও পড়ুন:  উজান স্রোতে সাঁতার ! দেবী দুর্গার মুখ দেখেন না মহিষাসুরের বংশধররা

এই তো দু’দিন আগের কথা।আমি আমেরিকা বেড়িয়ে এলাম।প্রায় ৪২ বছর পর আমি আবার আমেরিকায় গেলাম।আমি টুরিস্ট স্পট গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন দেখেছি।শিকাগোতে বেশ কিছুদিন ছিলাম।আগে শিকাগো ইউনিভার্সিটি থেকে আমার বন্ধুর বাড়ির পথে কারখানার ধোঁয়ার অদ্ভুত গন্ধ পেতাম।এখন সে গন্ধ নেই।ওখান থেকে কারখানা স্থানান্তরিত হয়েছে।তার পরিবর্তে সবুজে পরিপূর্ণ।মিচিগানে যে ঘাট দিয়ে যেতাম সেখানে এখন শুধু ফুল।এই যে চারপাশটা বদলাচ্ছে,পরিবেশ বদলাচ্ছে,এগুলো আমার ভালো লাগে।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর মোটা লোক আছে।এতো মোটা যে প্লেনে দুজন পাশাপাশি বসতে পারে না।ওখানে একশো জনের মধ্যে আটষট্টি জনই মোটা।আমার এক বন্ধুর মতে,এটা এখন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের  সমস্যা।আমরা এক সময়ে  মিনিয়াপলিসে  ছিলাম। তখন হেমন্তের পাতা ঝরার সময়।পাতার রংগুলো বদলে যায়।সবুজ থেকে লাল,লাল থেকে হলুদ,হলুদ থেকে গেরুয়া,আবার গেরুয়া থেকে বেগুনি।এটা দেখার মতো।এগুলোকে বলা হয় ফল কালার।একটা বিশাল বনে ভ্যানগগের মতো শিল্পী যেন নানা রকমের তুলির আঁচড় কাটছে।

চিন ভ্রমণের কথা আমার আজও মনে আছে।হংকং বিমানঘাঁটিতে পৌঁছাবার আগে কতোগুলো টু্করো টু্করো স্মৃতি আমার মনে আজও ভেসে ওঠে।সমুদ্র অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগর খানিকটা দৃষ্টি বিভ্রমের খেলা করল আমাদের নিয়ে।উপর থেকে দেখছি ঘন নীল জল।তারপরেই দেখছি বাঁকা রৌদ্ররশ্মির ম্যাজিকে একটু দূরে জল গেছে গাঢ় গোলাপি হয়ে,তার উপরে নৌকা জাহাজ মোটরবোট ভাসছে,যেন ঘন গোলাপি দিগন্তব্যাপী দধি সমুদ্রে ভাসছে খেলনা,এমনকী বোট চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ ও ক্রমশ ছড়িয়ে যাওয়া ঢেউয়ের রেখাও যেন স্থির ও ঘন একটি চেহারা নিচ্ছে,তা যেন ওইভাবেই থাকবে চিরকাল। প্রায় বাইশ বছর আগে ১৯৬৯-তে এ পথ দিয়ে যখন প্রথম যাই তখন মনে হয়েছিল হংকংয়ের বিমানঘাঁটিতে নামতে নামতে প্লেনটা ঝুপ করে সমুদ্রেও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত-এতই কাছে সমুদ্র।বয়সের পরিবর্তনে একটা জিনিস হয় তা আমরা সবাই জানি,দূরত্বের হিসেব বদলে যায়।প্লেন থেকে নামার পর একজন আমাদের “মহারাজা লাউঞ্জের” পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন।এ লাউঞ্জটি এয়ার ইণ্ডিয়ার একার নয়,ক্যানাডিয়ান এয়ারলাইন্সের সঙ্গে ভাগের বন্দোবস্ত রয়েছে।এই লাউঞ্জটিতে মাত্র কয়েক ঘন্টার বিশ্রাম।বিকেল পাঁচটা পঞ্চাশের চায়না এয়ার ওয়াজের ফ্লাইট সিএএইচও ধরতে হবে আমাদের।কাজেই বিশ্রামের বেশি সময় ছিল না।

আরও পড়ুন:  চাঁদ-ধনপতি বণিকের ভদ্রাসনে সন্তান-সন্ততি নিয়ে‚ মহাদেবের কোলে বসে মহাষষ্ঠীতে সোনার নথ পরেন মা দুর্গা

চিনের সরকারের পক্ষে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এসেছিলেন দোভাষী শেই ফে এবং চায়না ইন্টারন্যাশোনাল আর্ট এগজিবিশন এজেন্সির সহসভাপতি এক সদাহাস্যময়ী ভদ্রমহিলা,তার নাম এখন মনে পড়েছে না।চলন্ত গাড়ির জানলা দিয়ে বেইজিং যাওয়ার রাস্তার দিকে চোখ ফেরালাম।দু’পাশে অজস্র গাছ,সার সার হ্যালোজেন আলো,কিন্তু তার বাইরে আর কিছু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।গাছপালা,তারপরে আরও গাছপালা— এইটুকু অনুভব করা যাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত আমরা বেইজিংয়ে উত্তরপূর্ব প্রান্তে শ্রমিক স্টেডিয়াম সরণির শেষ প্রান্তে অবস্থিত কাওলুং হোটেলে।পথে বেইজিংয়ের দৃশ্যাবলি যা চোখে পড়ল তাতে বেশ কিছু বিশাল বাড়ি,হাল ফ্যাশনের স্থাপত্যের প্রাসাদ,অসংখ্য উড়ালপুল সব দেখলাম,কিন্তু কখনও মনে হল না নিউইয়র্ক বা হংকং-এর মতো আকাশের দমবন্ধ হয়ে আছে।দীর্ঘকায় বাড়িগুলো বেশ ছড়ানো ছিটানো।৪ঠা অগাস্ট পৌঁছলাম বেইজিং-এ।তখনও জানতাম না,ওই দিনেই চিনের এক মাত্র সংবাদপত্র-“পিপল্স ডেইলিতে” রবীন্দ্রনাথের কবিতা ছাপা হয়েছে,জন্মদিনের তিন নম্বর কবিতা —“একদা গিয়েছি চিন দেশে,অচেনা যাহারা/ললাটে দিয়েছে চিহ্ন “তুমি আমাদের চেনা”বলে।/খসে পড়ে গিয়েছিল কখন পরের ছদ্মবেশ;/দেখা দিয়েছিল চিহ্ণ তাই অন্তরের নিত্য যে মানুষ;/অভাবিত পরিচয়ে আনন্দের বাঁধ দিল খুলে।/ধরিনু চিনের নাম,/পরিনু চিনের বেশবাস।/একথা বুঝিনু মনে,/যেখানেই বন্ধু পাই/সেখানেই নবজন্ম ঘটে।/আনে সে প্রাণের অপূর্ণতা”।

অন্যের চোখ দিয়েও ভ্রমণের অনুভূতি আমি নিই।স্মৃতিচারণের মধ্যেও ভ্রমণ খুঁজে পাই। বসে থেকেও ভ্রমণ করা যায়।মনসা মথুরাং গচ্ছতি।মনে মনে মথুরা ভ্রমণ হয়।তবে এই  ভ্রমণ আসল ভ্রমণের মতো নয়।

NO COMMENTS