বিবাহ আবিষ্কারের আগে থেকেই পৃথিবীতে পরস্ত্রী কিলাররা আছে এবং গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়, বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত হওয়ার পরও তারা মেজাজের মাথায় সগৌরবে বিরাজ করবে। পরস্ত্রী কিলাররা সাধারণত যেটা করে থাকে সে সম্পর্কে সকলের মত জানি না তবে বিশুদ্ধতাবাদী পুরুষরা দেখেছি কাজটাকে প্রবল আক্রোশের চোখে দেখে থাকে কারণ পরস্ত্রীর প্রতি তলে তলে, হাড়ে-মজ্জায় তাদের প্রবল আকর্ষণ থাকলেও যেহেতু তারা জন্মেছে ক্যাবলামদন হয়ে, তাই টার্গেট হাসিল করার টেকনিকটাই জানে না। আর জানে না বলেই না পাওয়ার যন্ত্রণায় তারা এক একজন ফিলোজফার বনে যায়, সমাজশুদ্ধি, দেশশুদ্ধি, চরিত্রগঠনের ওপর লেকচার মেরে বেড়ায় কিন্তু বাড়ি ফিরেই পরের কামিনীলাভ না করার দুঃখে ঘরের কামিনীর ওপর ঝাল ঝেড়ে সাকসেসফুলি নিজের ও প্রতিবেশীর সংসারের শান্তির বারোটা বাজাতে থাকে।

টার্গেট হাসিল না করার মহতী ব্যর্থতা থেকে তারা ইয়ারদোস্তদের সঙ্গে আর একটা কাজ মন দিয়ে করে থাকে, সেটি হল খুল্লামখুল্লা পরস্ত্রী চর্চা। এই চর্চার জন্য তারা মদের আড্ডা এবং অফিসের টিফিন টাইমটাই সাধারনত প্রেফার করে। পরস্ত্রী চর্চার দু’টো সেশন – প্রথম সেশনে আলোচ্য বিষয় থাকে পরস্ত্রীর ভাইট্যাল স্ট্যাটিকটিক্স, গোদা বাংলায় তার দেহবল্লরীর বিভিন্ন উপাদেয় উপাদানের ওজন, মাপ এবং ভেদশক্তি সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করে তারা তাদের সুপ্ত বাসনা চরিতার্থ করে, দ্বিতীয় সেশনে  কাটাছেঁড়া করে অথবা ঊর্বর কল্পনার পাঁচফোড়নে সাঁতলে পরস্ত্রীর চরিত্রের সুবিধাজনক বিনির্মাণ করে বিমল আনন্দ লাভ করে। তাই পরস্ত্রীহীন মরুময় জীবনে মরুদ্যান বলতে এই দু’টোই তাদের, বার-রেস্তোরাঁ আর অফিসের ক্যান্টিন।

এই সব নিরুপায় বিশুদ্ধতাবাদীদের আর একটি সচল মরূদ্যান আছে। তাদের নাম ভোলাবাবু হতে পারে, পাঁচু বাবু হতে পারে, এমনকী, হালের অনিকেশবাবু হতেও বাধা নেই। এই অনিকেশবাবুরা এক একজন বঙ্গবিখ্যাত পরস্ত্রীসেবী তথা বউদিজীবী। শাস্ত্রে আছে পরনারী মাতৃবৎ, এঁদের কাছেও মাতৃবৎ, তবে নিজের সন্তানের মাতৃবৎ। এরা সদর্পে সর্বত্র বিচরণ করে এবং সগর্বে ও প্রকাশ্যে পরস্ত্রীবাসের বিস্তারিত বিবরণদান করে পরস্ত্রী-বুভুক্ষু হৃদয়ে কিছুটা হলেও শান্তির প্রলেপ দিয়ে থাকে। কেউ যদি মুচকি হেসে একে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো বলেন তবে তাদের তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই।

এই রকম এক একটা অনিকেশবাবু সব অফিসেই থাকেন, কাজের ফাঁকে সময় পেলেই ক্যাবলা মদনরা ছুটে যায় তার সিটে, গুছিয়ে বসে বলে, ‘বলো অনিকেশ আর কী ঘটনা ঘটালে এর মধ্যে? নতুন কোনও বউদিকে ফাঁসালে নাকি?’

কাঁধ নাচিয়ে চোখ নাচিয়ে উত্তর ছাড়ে অনিকেশ, ‘কী ভাবেন আমাকে? আমার স্টক কখনও ফাঁকা যায় না মদনদা, এবারে যাকে তুলেছি সলিড জিনিস, খেলুড়ে নাম্বার ওয়ান, বরটা ঢ্যাঁড়স মাল- পারবে কেন সামলাতে? গল্প জমে ক্ষীর দাদা।’

আরও পড়ুন:  বেডরুম

মদনবাবু উৎসাহের চোটে চেয়ার টেনে বকের মতো গলাটা বাড়িয়ে দেয়, ‘শুনি শুনি।’

সঙ্গে সঙ্গে বেঁকে বসে অনিকেশ, ‘ফ্রি-মাগনা অনেক গল্প শুনিয়েছি মদনদা, আর হবে না, এবার ট্যাক্স দিতে হবে।’

আবার ট্যাক্স কেন রে বাবা! মদনবাবু মুষড়ে পড়ে। এতদিন তো ব্যাটা বেশ সমাজসেবা করছিলে, পরস্ত্রীকে অধিকার, হ্যান্ডেল ও ইউজ করার নানান বিস্তারিত তারিকা খুঁটিনাটি বর্ণনা সহ উপস্থিত করে তার মতো ছাগলের তৃতীয় ছানাদের আনন্দেই রেখেছিল, রসেবশেই রেখেছিল, হঠাৎ এমন মতলব কেন?

জিজ্ঞেস করাতে সে যা জানাল মদনবাবু তো নড়েচড়ে বসল। যে বউদিকে সে বধ করেছে তার বরটা ঢ্যাঁড়স হলে কী হবে, তার একটা পাজির পাঝাড়া ননদ আছে, সব সময় তার চোখ ঘুরছে, সেদিন দুষ্টুমি করার সময় আর একটু হলে হাতেনাতে ধরা পড়ে যাচ্ছিল, তাই সে আর রিস্ক নিতে রাজি নয়, বউদিকে নিয়ে মদনবাবুর বাড়িতে এসেই উঠতে চায়। সেখানেই লীলাশয্যা রচনা করতে চায়। মাঝে মাঝে জাস্ট এক ঘণ্টার একটা করে স্লট পেলেই তার হয়ে যাবে।

‘সে কী! আ-আমার বাড়িতে মানে? তোমার বউদি মেরে পাট করে দেবে’। বলেই তাড়াতাড়ি মদনবাবু সংশোধনী আনল, ‘তোমার ওই বউদি নয়, আমার বউ, মানে তোমার বউদিদির কথা বলছি’।

অনিকেশ বেজার হল, ‘এই জন্যেই আপনার নাম মদন। আরে বউদি কি সব সময় ঘরে সেঁটে বসে থাকে? শপিং টপিং করতে যায় তো? বাপের বাড়ি যায় তো? তখন খবর দেবেন, টুক করে নিয়ে চলে যাব টুকটুকি বউদিকে’।                                                                                                                    

টুকটুকি! আহা নামটা কী লোভনীয়! বুকটা হু হু করে উঠল, দুঃখিত ভাবে মাথা নেড়ে মদনবাবু বলল, ‘ভেরি স্যরি অনিকেশ, আমার বউ মানে তোমার বউদিদি ঘর ছেড়ে নড়ার নামই করে না, সারাদিন টিভি খুলে হয় দাদাগিরি নয় দিদিগিরি, নয় শাশুড়িগিরি, নয় জামাইগিরি নিয়েই বসে আছে। প্রায় রোজই পোড়া রান্না খেতে হয়, গ্যাসও মাসে চারবার করে বদলাতে হয়, নো চান্স ভাই’।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৬)

‘তা হলে আমারও নো চান্স। এখন থেকে আমি আমার সব গল্প বড়বাবুকে গিয়ে বলব, বড়বাবু ব্যাচেলর লোক, আপনার থেকেও ভাল এনজয় করবে, চড়চড় করে আমার প্রোমোশন হয়ে যাবে’।

মদনবাবু ভেঙে পড়ে, ‘সেটা কী ঠিক হবে অনিকেশ? আমি তোমার কতকালের বিশ্বস্ত ও বাধ্য শ্রোতা, এই ভাবে আমাকে ডিপ্রাইভ করবে? তোমার থেকে বড় হয়েও জীবনে কোনও বউদির ধারেকাছে ভিড়তে পারলাম না, তার জন্যে কোথায় সহানুভূতি দেখিয়ে একটার জায়গায় চারটে বউদির গল্প বলে আমার বুকের ব্যথা জুড়িয়ে দেবে, তা নয় একেবারে ত্যাজ্যদাদা করে দিচ্ছ ভাই?’

অনিকেশ বলল, ‘আরে তার জন্যেই আপনার বাড়িতে শেলটার চাইছি, যে করে হোক বউদিকে রাজি করান। আপনি না পারেন ছেড়ে দিন, আমি যাই।

মদনবাবুর খটকা লাগল, ‘তুমি যাবে?’

‘আমি গেলেই কেশ সাল্টে দেব। বউদিরা এমনিতেই খুব ভালো হয়, চট করে পটে যায়। দু’বার বউদি-বউদি করে ঢলে পড়লেই হল। ফুলে ফুলে ঢোলে ঢোলে। হ-হা-হা-’

মদনবাবুর ভুরু হাওড়া ব্রিজ হয়ে গেল, ‘তুমি কী চাও বলো তো?’

‘আরে বলাটা আমার ওপরেই ছাড়ুন না! বলুন কোন সময় গেলে বউদি কমপারেটিভলি ফ্রি থাকেন? আপনি অফিসে বেরিয়ে গেলে? ঠিক আছে তখনই যাব।’

খটকা পরিষ্কার হয়ে গেল মদনবাবুর, ‘কীইই?’

‘কী কী করবেন না তো! আপনি তো আগেই হাত তুলে দিয়েছেন, হাতকাটা জগন্নাথ, ছেড়ে দিন আমাকে, আমি একাই যাব। বুঝবে না মানে? এমন সুন্দর বউদি, দেখবেন ঠিক বুঝিয়ে সুজিয়ে লাইনে এনে ফেলব। তার পর কত গল্প চান দেখবেন আপনি।’

‘আমি?’

‘আপনি নয় তো কি বড়বাবু? আরে আপনার দুঃখ বুঝি বলেই বলছি।’ বলতে বলতে উঠেই পড়ল অনিকেশ, ‘আপনি চট করে বউদিকে একটা ফোন লাগিয়ে দিন মদনদা, বলুন আমি যাচ্ছি।’

টান টান গার্টার হঠাৎ ছিঁড়ে গেলে যেমন হয় মদনবাবুও ছিটকে উঠে অনিকেশের জামা টেনে ধরল, ‘আমার বাড়িটা তোমার লিস্ট থেকে বাদ দাও ভাই। বড়দাদাকে এটুকু দয়া করো। আমার ঘাট হয়েছে, এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি সিনিয়র হয়ে শিং ভেঙে জুনিয়রের দলে নাম লেখানো উচিত হয়নি আমার, আর তোমার কাছে গল্প শুনতে চাইব না, কস্মিনকালেও নয়। আমায় খ্যামা দাও ভাই।’

‘তা হলে তো মিটেই গেল। খেল খতম পয়সা হজম।’ অনিকেশ কাঁধ নাচিয়ে বসে পড়ল, তার পর পকেট থেকে ঝটসে মোবাইল বের করে বলল, ‘যান নিজের রাস্তা নিজে দেখে নিন, কেটে পড়ুন মদনদা! এখন আমি জমিয়ে প্রেমালাপ করব, আপনি তো শেলটার দেবেন না, তাই ফোনেই একটু নেড়েঘেঁটে দেখি সোনামণিদের।’

আরও পড়ুন:  বাঙালির ফুলশয্যা

বুকের ব্যথা বুকেই চেপে মদনবাবু উঠে গেল নিজের সিটে। তারপর বসে আছে আর চমকে চমকে উঠছে, আড়ে আড়ে দেখছে অনিকেশকে, ব্যাটা প্রেমালাপ করতে করতে টুক করে উঠে ভ্যানিস হয়ে গেল না তো? সোজা গিয়ে তার বাড়িতেই উঠল না তো? এ ব্যাটারা বাঘের জাত, যাকে টার্গেট করে এদিক ওদিক করে ঠিক গিয়ে ধরে। মাথায় উঠল মদনবাবুর কাজ, মাথায় উঠল অফিস, কাউকে কিছু না বলে ডিপারচারটা না মেরেই ছুটল বাড়িতে।

তার পর থেকে সেই যে বাড়িতে বসে আছে আর নড়ে না, বউয়ের পাশে বসে বসে সে-ও এখন মন দিয়ে দাদাগিরি দেখে, দিদিগিরি দেখে, শাশুড়িগিরি দেখে, দুর্গমগিরি দেখতেও তার আপত্তি নেই, একমাত্র আপত্তি অনিকেশে, একটা মোটা হুড়কো সব সময় রেডি করে রেখেছে, ওকে এখানে দেখলেই দমাদ্দম চালিয়ে দেবে, তার পর যা হওয়ার হবে।

কিন্তু মদনবাবুর গৃহিণী তো অতশত জানে না। সে মদনবাবুর ভাবান্তর দেখে মহাখুশি, ঝগড়া-বিবাদ করা দূরে থাক, ভুলে ভুলে মাঝেমাঝে হেসেও ফেলছে, বিনা পুড়িয়ে বিনা ধরিয়ে কী চমৎকার রান্না করছে ভাবা যায় না, সেসব রোজ রোজ তরিবাদি করে খেতে খেতে মদনবাবুর মনটা আজকাল কেমন কেমন করে ওঠে, টের পায় সে-ও গিন্নিকে নতুন করে ভালবাসতে শুরু করেছে, আর যত ভালবাসছে তত দেখছে পরস্ত্রীর প্রতি হ্যাংলামির আর ছোঁকছোঁকানির জলাঞ্জলি হয়ে যাচ্ছে, অনিকেশের ভয়টাও হু হু করে কেটে যাচ্ছে, মনে একটা ডেসপারেট ভাব জাগছে, জোরের সঙ্গে বিশ্বাস করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে, হাজার অনিকেশ এলেও তার বউকে কেউ টলাতে-টসকাতে পারবে না।

দেখতে দেখতে অনেক দিন তো হল, তাই মদনবাবু ভাবছে, কাল থেকে আবার অফিসে জয়েন করবে। অ্যারাইভালটা মেরেই ছুটবে অনিকেশের সিটে, তাকে জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘ভাগ্যিস তোমাদের মত পরস্ত্রী কিলাররা জন্মগ্রহণ করে! তোমাদের আবির্ভাব না হলে কে আমাদের চোখ খোলাত, চোখ ফোটাত? নতুন করে ঘাড়ে ধরে কে-ই বা বুঝিয়ে দিত বাইরের কামিনীর চেয়ে ঘরের কামিনী ঢের ঢের ভাল, ঢের ঢের সেফ। ইন ফ্যাক্ট, আমাদের মতো ক্যাবলা মদনদের মানুষ করে কত বড় পুন্য করো তোমরা, তোমরা নিজেরাই জানো না ভায়া! থ্যাঙ্ক ইউ অনিকেশ, মেনি মেনি থ্যাঙ্কস!’

NO COMMENTS