বাঙালি নাকি একটা বয়সে খানিক কাব্যি করেই। স্বভাবেই করে ফেলে। আবার তাকে কেউ শুধরে দেয়, কবি কবি ভাব / ছন্দের অভাব। এই দেখুন কেমন ভাব-অভাব মিলল। অন্ত্যমিল থাকতেই হয়। না হলে কবিতা কীসের? গরিষ্ঠ শিক্ষিত বাঙালি আজও অন্ত্যমিল ছাড়া কবিতাকে হয় পানসে নয় হিজিবিজি ভাবে। সহজ ছন্দে এবং চমৎকার অন্ত্যমিলের জুটিতে জমে যায় কবিতা, জনপ্রিয় হয়। চাই কি তাতে সুর দিয়ে গান বাঁধাও হয়। সে এক ভারি মোলায়েম ব্যাপার। এখানে সে কথা হচ্ছে না।

বলছি শুধু বাঙালিই নয়, অন্য ভাষাভাষীও। অনেক উদাহরণ এই লেখায় থাকবে, যাকে “হিন্দি কভিতায়েঁ” না বলা গেলেও ভাষাটা হিন্দিই। বাংলার সঙ্গে সঙ্গেই থাকবে। ব্যাপারটা কী হচ্ছে বলুন তো? বাংলার সঙ্গে হিন্দি কবিতা নিয়ে ভজকট… না না, সহজে বলি, গাড়ি। 

গাড়ির জগৎ আর কবিতার মধ্যে কোনও রেখা টেনে সম্পর্কে বাঁধা যায়? গাড়ি মানে আমি বলছি ওই কেতা দেখানো আমার হোন্ডা সিটি তো তাহার স্করপিও আর উহার পাজেরো নয় কিন্তু। বাণিজ্যিক গাড়ি, পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী। চলতি কথায় ‘গাড়ির লাইন’। এই গাড়ির লাইনের কাঠখোট্টা পরিবেশে  কবিতা কোথায়!

গাড়ির লাইনে কর্মচারী আর মালিকদের মধ্যে আয়ের ফারাক যেমনই থাকুক না কেন, সম্পর্কটা হয়ে যায় বন্ধুর মতো, সমান সমান। একসঙ্গে মাল টানা থেকে খেস্তাখিস্তি থেকে ঘরোয়া কোনও অনুষ্ঠান, আবার খুচখাচ কিছু বিগড়োলে ড্রাইভিং কেবিন থেকে গদির সিট কভারটা খুলে রাস্তায় ফেলে তাতে শুয়ে গাড়ির নীচে ঢুকে যাওয়া — সবই চলে পাশাপাশি। মালিক, ড্রাইভার বা খালাসি — সব বরাবর।

সেই সুযোগে দাঁত ফোটায় আমাদের অলংকরণ শিল্পী। হয়তো তাঁর উচ্চাশা মুক্তি পায় এখানেই। নিজের মনের কথা ভাবের কোটরে চুবিয়ে বা সাম্প্রতিক ইস্যুতে রাঙিয়ে লিখে দিলে মালিক বা ড্রাইভার খুশিই হবে। জনগণের সামনে গাড়িখানা বের হবে দুটো ভালো কথা নিয়ে, বেশ একটা শিক্ষে শিক্ষে ভাব যেন চারিদিকে। কেউ চোখ রাঙিয়ে বলবে না, কবিত্ব হচ্ছে! ঘুচিয়ে দেব ওসব। 

আর যা হয়। চলতি জীবন থেকেই উঠে আসে অসামান্য কিছু কথা। যেমন খুচরো পয়সার বড় টানাটানি দিকে দিকে, এদিকে যাত্রীবাহী সব থেকে ছোট গাড়ি অটো। তার ভাড়াও ছোট। সবাই যদি তাকে বড় নোট ধরায় তো মুশকিল। আসান করতে সে লিখে দেয় গাড়ির পিছনে – খুচরো দেবেন / প্রণাম নেবেন । কোনও আংরি ইয়ংম্যান আবার আরেকটু ঠোঁটকাটা – খুচরো না থাকলে ফোটো / এটা অটো । রাস্তার লাখো বড় মেজ গাড়ির ভিড়ে হারিয়ে যেতে যেতে খড়কুটো ধরে ফেলে কেউ, সবিনয়ে জানায় – আমার নাম টোটো / আমি সবার ছোট । আবার বুক ঠুকে একটু অহঙ্কারও দেখায় কোনও তেমন পাকা হাতের ড্রাইভার – দম হ্যায় তো পাস কর / বরনা বরদাস্ত কর কিংবা আর পাল্লা / দিবি শাল্লা? ওভারটেকিং নিয়ে যত কথা আর কী! আবার অহঙ্কার শুধু পাকা হাতেই নেই, আছে উপার্জনে, আচ্ছা কামাইয়ে। বদলে যায় পঙক্তিগুলো – দেখবি আর জ্বলবি / লুচির মতো ফুলবি । আছে আরও, একই সিঁদুর সবাই পরে / কপাল গুণে ঝিলিক মারে

আরও পড়ুন:  হোলি কব হ্যায় ? কব হ্যায় হোলি ?

দুর্ঘটনার চেতাবনি কত রকম হয় দেখুন – দূর থেকে ভালোবাসো । কখনও তা আবার ইনজিরিতে – ডু নট কিস মাই ব্যাক । বলাকে বলা হল, অন্য জগতের হাতছানিও রইল। কবিতা সেভাবে হল না হয়তো, তাতে কী? এই তো দিচ্ছি – সাবধানে এসো / পিঁড়িতে বসো – এমন করে বললে কোন কঠিন হৃদয় না গলে! ভয়াল রাস্তা থেকে মনে হয় একছুট্টে বাড়ি গিয়ে আগে প্রিয়জনের মুখগুলো দেখি। 

এক চিমটে দার্শনিকতা মিশিয়ে আসে যেগুলো – সুখ স্বপনে / শান্তি শ্মশানে, অথবা যে অ্যাম্বুল্যান্সকে আপনি পথ ছেড়ে দিলেন, দেখলেন তারই পিছনে লিপিবদ্ধ জ্বলজ্বলে – জন্ম থেকেই সেবা করছি! তেলেবেগুনে উঠবেন, সেই সময় চোখে পড়বে পুরনো শ্লোক নতুন বোতলে পরিবেশিত – সৎসঙ্গে স্বর্গবাস / অসৎসঙ্গে পেছনে বাঁশ । বাঁশ খেয়ে যখন কুটো ধরার চেষ্টায় আপনি, হয়তো আরডি-র সুরেলা মায়াজালে আশার আবেদনী সম্মোহনে লেখা আপনার চোখে দেখা দিয়েই ক্রমে মিলিয়ে যেতে লাগল – ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না, ছিঃ । নিজেকে সামলে নিতে শিখে নিন, কারণ যা কিছুই হচ্ছে, উন্মুক্ত রাস্তায়। আগের মতো শান্তি নেই – পরের গাড়িও আপনাকে একা ফেলে চলে গেল, পিছনে রেখে গেল এই কথাগুলি, আপনাকে আরও বেকুব বানিয়ে।

গাড়ির ব্যবসায় রোজের অনেক ঝকমারি লেগেই থাকে। স্পেয়ার পার্টস খারাপ, তেলচুরি, চাকায় হাওয়ার প্রেশার, মাত্রা ছাড়িয়ে লোডিং, মাসিক ঘুষের বন্দোবস্ত, আজ ঝুরো কেস তো কাল বড় কেস, আরও হাজার লাফড়া। এখানে বিশ্বাস আর অবিশ্বাস তেল-নুন-লঙ্কার মতো মিলেমিশে কিছু নিখাদ সিচুয়েশন্যাল পঙক্তির জন্ম দেয় – মালিক কিনলো গাড়ি / ড্রাইভার ছাড়ল বাড়ি । টু-লাইনার থেকে চমৎকার ফোর-লাইনারে উত্তরণ হয় এইভাবে – সোনা দিলাম স্যাকরাকে / গয়না বানিয়ে দিল / গাড়ি দিলাম ড্রাইভারকে / পাগল বানিয়ে দিল

আবার ভিন্নস্বর উঠে আসতে দেখা যায় এমন লাইনে – বুরে নজরওয়ালে তেরা বাচ্চা জিয়ে / বড়া হো কর দেশি দারু পিয়ে অথবা গাড়ি চলে তেলে / চালক দিশি জলে । গাড়ির লাইন এমনই। জড়িত মানুষগুলিও অভাবে ফুর্তিতে বাঁচে।   

আরও পড়ুন:  হোলি কব হ্যায় ? কব হ্যায় হোলি ?

পণ্যবাহী গাড়িতে কি “ইন্ডিয়া ইজ গ্রেট” লিখতেই হয়? আমার জানা নেই। কিন্তু চোখে পড়ে প্রায় সবকটিতেই। এরই মাঝে মাথা চাড়া দেয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা – বেটা সে বাপ হয়রান / নেতা সে দেশ হয়রান । এমনকী উঠে আসে কাশ্মীর – কাশ্মীরের K ইন্ডিয়ার I / SS যোগ করে তোমাকে দিতে চাই! গোপনীয়তায় মোড়া হল চুমু, প্রেক্ষিতে রাখা হল কাশ্মীর নিয়ে রাজনৈতিক দোলাচলও। যার মাথা থেকে এমন লেখা বের হয়, সে হয়তো দৈনিকের ক্রোড়পত্রে মুচমুচে কবিতায় পাতা ভরানোর বরাত পায় না। আফশোস!

ব্যবসার পথে ব্যবসাই, সেখানে অন্য সম্পর্ক যেন না এসে দাঁড়ায় মাঝখানে। তাতে ব্যবসাও চলে না, সম্পর্কও টেকে না। সার কথাটুকুই ফুটে ওঠে এই সব ছন্ন ছড়ায় – ব্যবসা গাড়িতে / বন্ধু বাড়িতে এবং আর একটু বিস্তারে, গাড়ি তেলেতে চলে জলে নয় / খাতির বাড়িতে আছে গাড়িতে নয় । কটাং করে না বলে একটু পালিশ দিয়েও পরিবেশন হয় – রাগ কোরো না সোনা / জল বাদে সব কেনা

আবোল তাবোল শুধু সুকুমার রায়ই নন, এ এক ধারা, তা পুষ্ট হয় এমন লাইন চোখে পড়লে – এক ফুল দো মালি / বাবুঘাটে লোডিং গড়িয়ায় খালি । গাড়ি বেশি লাভ করে কম দূরত্বে ঘন ঘন খেপ খাটলে। তা যদি আবার হয় পুরো গাড়ি ভর্তি করা আর ফেলে আসা, তো সোনায় সোহাগা। অর্থাৎ বাবুঘাটে লোডিং আর গড়িয়ায় খালি। কিন্তু এর সঙ্গে এক ফুল দো মালি! তৃতীয় ব্যক্তি কাদের মাঝে ঢুকতে চাইছে? আশ্চর্য!

অনেক কিছু ছুঁয়েও প্রেমে পড়লাম না এ কেমন কথা? প্রেমের কথা শুনি – দূরে থাকলে কি প্রেম হয় / কাছে না এলে / শিশিরে কি ধান হয় / বৃষ্টি না হলে । আহারে বাহারে। আরও সহজ করে বলছে – তুমি হাসলে আমি খুশি । সামান্য রহস্য রেখে বলছে – দেখা হলে, বলে দিও । ব্যস এটুকুই। শিল্পী জেনে গেছে কতটা ছাড়তে হয়, কোথায় থামতে। মানছি অন্ত্যমিল নেই, তা বলে একে কবিতা বলবেন না? প্রেমে পড়ব পড়ব করার পঙক্তিগুলো ছেড়ে আরেকটু ডাগর নধর হয়ে উঠলে প্রেমও পোক্ত হয় – কার্বাইডে পাকে না give me a name / অসময়ে সবাই পাকে, এমনকী প্রেম । আবার প্রেম হয় না শত চেষ্টাতেও এমন নারী পুরুষের দুঃখ ঝরে পড়ে ব্যঙ্গের প্যাকেজিং-এ – নো গার্লফ্রেন্ড / নো টেনশন / নো বয়ফ্রেন্ড / ডোন্ট মেনশন । আবার এই পেয়ারি বাচ্চির কথা শুনুন – টাটা সে ম্যায় চলি কুমারী / মুম্বই মে শৃঙ্গার হুয়া / কলকাত্তা মে সাজি দুলহানিয়া / ড্রাইভার সে মেরা পেয়ার হুয়া । পবিত্র কিশোরীর ডগমগ খুশি ঝাপটা মারে বুকে মুখে। পৃথিবী আজও সুন্দর।  

আরও পড়ুন:  হোলি কব হ্যায় ? কব হ্যায় হোলি ?

একটু গদ্য-কবিতার কথাও হোক। শুনেছিলাম এক কবি-দিদির থেকে। এক মালিক-কাম-ড্রাইভার মেরি নামের কোনও মেয়েকে ভালোবাসত। পরিণতিহীন ভালোবাসা। বুকের চিনচিনানি মেটাতে সে নিজের গাড়িতে ফলাও করে লিখিয়েছিল, আই লাভ মেরি । সে লেখা চোখে পড়ে মেরির বাবা-দাদারা সক্রিয় হয়ে একদিন মাঝরাস্তায় উস্তম কুস্তম দেয় প্রেমিক ড্রাইভারকে। দমে না সে। প্রেম করতে সাহস লাগে ভাই, সাহস। আগের লেখা মুছে সে নতুন বাক্য লেখায় – আমি এখনো একই ধারণা পোষণ করি । 

প্রেমের হাত ধরে আসে সংসার। ক্রমে সং আর সার নিজমূর্তি ধারণ করে। পুড়ে তামাটে হয় সব। একঘেয়েমি থেকে নিস্তার নেই, তবে ওই, ভেবে সুখ – অন্য দিকে মন / চির বৃন্দাবন । হরি হরি। বাংলা সিনেমার একদা জনপ্রিয় নায়কের মুখের কথায় কেউ আবার বলে – বউ শয়তান / মা ভগবান । মা মাগো।

শেষ করি আবার দার্শনিকতায়, একটু কম দেখা, একটু হটকে। প্রবাসী এক দিদি-বন্ধু এনএইচ-৭০ ধরে যেতে যেতে কোনও ভারী গাড়ির পিছনে দেখেছিলেন – মুসাফির হুঁ দোস্ত না মিলা / রাস্তা সির্ফ হমসফর বনকে সাথ দিয়া । এই লেখার কাছে মাথা নত হয়ে আসে। এই গদ্যকার ওপরের প্রতিটি ছোট হরফে সাজানো লেখা নিজের চোখে দেখেনি, অনেক বন্ধু তাকে ইনপুট দিয়েছে, কৃতজ্ঞতা। তবে নিজে একবার এক আশ্চর্য কথা দেখেছিল – যত চব্বো রাত্তির বেলা । এই হেঁয়ালি আজও বোঝা হল না আমার। চব্বো অথবা চব্য তো চিবনোর কথা বলে। তাতে রাত কেন? এ অন্য কিছু। এ এক বাউলের গোপন ইঙ্গিতময়তা, যা ধরি ধরি করেও ধরা দেয়নি। আমার আরেক কবি-বন্ধু মনে করিয়ে দিলেন বর্ষীয়ান কবি রণজিৎ দাশের কবিতার লাইন – হর্ন দিলে চাঁদ ডুবে যাবে

শিরায় শিহরণ বয়ে গেল যেন, তাই না? আর কথা নয়, বরং ওই গাড়ির পিছনে হামেশা দেখতে পাওয়া এক অনন্য গানের লাইন জুড়ে দিই – আবার হবে তো দেখা

শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
শৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক চল্লিশ ছুঁই ছুঁই সাহিত্যপ্রেমী। পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক। জন্ম, বেড়ে ওঠা, ডানা গজানো সবই হাওড়া জেলার মহিয়াড়িতে। পছন্দের ক্ষেত্র মূলত গদ্য। চারপাশে ঘটে চলা, হারিয়ে যাওয়া সময়। তার সঙ্গে মজার মিশেল। এবং অবশ্যই গল্প। এখনো অবধি একমাত্র প্রকাশিত গল্পের বই 'জেড মাইনাস'। পেশাগত ভাবে এক অগ্রণী ইংরাজি প্রকাশনা সংস্থায় যুক্ত।

2 COMMENTS

  1. খুব ভাল লাগলো। ‘চব্বো’ শব্দটির উপর একটু আলোকপাত করি। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কথ্য ভাষায় শব্দটি ‘গোলযোগ’ অর্থ এ ব্যবহৃত হয়।

  2. মুচমুচে লেখা। চানাচুরের মতো। যে কেউ যখন তখন খেতে পারে। তবে চিবাতে হবে কারন বাদাম আছে। পুষ্টিকর লেখা।মনের। সাহিত্যের রম্য বিভাগের আর পাঠকের মগজের। মনে রাখলে গাড়ি চলার পথে মিলিয়ে নিলে খাস্তাস্বাদের ঢেঁকুর আরাম দেবে পুনঃ পুনঃ বার।