সৌরমণ্ডলের গ্রহ ‚ সপ্তাহের দিন‚ দৈত্যকুলের অস্ত্র আচার্য‚ একই অঙ্গে কত রূপ শুক্রের |  সংস্কৃত ভাষায়  শুক্র  শব্দের অর্থ হল স্বচ্ছ‚ পরিষ্কার এবং উজ্জ্বল | একটি পৌরাণিক সূত্র অনুযায়ী‚ শুক্র হলেন ভৃগু এবং তাঁর স্ত্রী খ্যাতির পুত্র |  

ব্রহ্মচর্য পালনের সময়ে অর্থাৎ ছাত্রাবস্থায় শুক্র ছিলেন ঋষি অঙ্গীরা বা অঙ্গীরসের শিষ্য | তাঁর সতীর্থ ছিলেন বৃহস্পতি | গুরু অঙ্গীরার পুত্র | দুজনে একসঙ্গে গুরুগৃহে বসবাস করে অধ্যয়ন করতেন | কিন্তু অঙ্গীরস নিরপেক্ষ হতে পারেননি | পুত্র বৃহস্পতির প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব ছিল | অন্যদিকে শুক্র ছিলেন বৃহস্পতি অপেক্ষা অনেক বেশি প্রতিভাধর | কিন্তু আচার্যের ব্যবহারে আহত হয়ে তিনি গুরুগৃহ পরিবর্তন করেন | চলে যান ঋষি গৌতমের কাছে | কঠোর তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে শুক্র আয়ত্ত করেন সঞ্জীবনী মন্ত্র | মৃতদেহে প্রাণস্পন্দন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম ছিলেন তিনি | 

সতীর্থ বৃহস্পতির সঙ্গে তাঁর বিরোধ কোনওদিন অপসৃত হয়নি | তাই বৃহস্পতি যখন দেবতাদের গুরু হলেন তখন শুক্র চলে গেলেন অসুরদের কাছে | শুক্রাচার্যের পরাক্রমে বারবার অসুরদের কাছে পরাস্ত হতে থাকে দেবতারা | মহাভারতে কথিত‚ নিজেকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন শুক্রাচার্য | এক খণ্ডের জ্ঞান ছিল দেবতাদের জন্য | অপর অংশ অসুরদের জন্য | পিতামহ ভীষ্মকে কূটনীতির শিক্ষাদান করেছিলেন তিনি |

বিষ্ণুর বামন অবতারেও শুক্রাচার্যের উল্লেখ পাওয়া যায় | দৈত্যরাজ বলীর সুখ্যাতিতে স্বর্গে টলমল করছিল ইন্দ্রের আসন | তখন বিষ্ণু অবতীর্ণ হলেন দেবতাদের সাহায্যে | বামন বেশে গেলেন প্রহ্লাদের পৌত্র বলীরাজের কাছে | প্রার্থনা করলেন তিন কদম ভূমি | অর্থাৎ তাঁর তিনটি পদক্ষেপে যতটা ভূমি মাপা যায় ততটা | 

শুক্রাচার্য কিন্তু চিনতে পারলেন ছদ্মবেশী বিষ্ণুকে | তিনি সতর্ক করলেন বলীরাজকে | কিন্তু দানবীর বলীরাজ তো কথা দিয়ে ফেলেছেন | তিনি নিজের বচন থেকে সরলেন না | রাজার এই দর্পে ক্ষুব্ধ হলেন শুক্রাচার্য | তাঁর সামনেই বামনরূপী বিষ্ণু পদাঘাতে বলীরাজকে পাতাললোকে প্রেরণ করলেন |

সঞ্জীবনী মন্ত্রের জন্য শুক্রাচার্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিরাজ করতেন | তাঁর কাছে সেই গুপ্তবিদ্যা শিখতে এলেন বৃহস্পতিপুত্র কচ | শিষ্যের নিবেদিত আচরণ ও ভক্তিতে মুগ্ধ হলেন শুক্রাচার্য | এদিকে তাঁর অপূর্ব সুন্দরী কন্যা দেবযানীর প্রেমে পড়লেন কচ | একে মোটেও ভাল নজরে দেখল না অসুররা | তারা অনুমান করেছিল কেন কচ এসেছেন শুক্রের কাছে |

অসুররা ষড়যন্ত্র করে কচকে বধ করে একাধিকবার | কিন্তু কন্যার অনুরোধে সঞ্জীবনী মন্ত্রে তাঁকে ফের বাঁচিয়ে তোলেন শুক্র | তা দেখে অসুররা করল কী‚ কচকে হত্যা করে দেহের পিষ্ট খণ্ড মিশিয়ে দিল শুক্রের সোমরসে | সেই সোমরস পান করলেন তিনি |

যখন জানতে পারলেন তখন বিলম্ব হয়ে গেছে | কিন্তু কন্যা দেবযানী তো থাকতেই পারবেন না কচ ব্যতীত | শুক্র বুঝলেন আর কিছু করার নেই | সঞ্জীবনী মন্ত্র হাতছাড়া হবেই | বাধ্য হয়ে মন্ত্রপাঠ করলেন তিনি | তা শিখে নিলেন কচও | কারণ তিনি তো তখন শুক্রের দেহেরই অংশ | তিনি শুক্রের পেটের ভিতর থেকে কথা বলে উঠলেন |

আচার্যের নির্দেশমতো তাঁর উদর চিরে বেরিয়ে এলেন শিষ্য কচ | তারপর সঞ্জীবনী মন্ত্র প্রয়োগ করে আবার বাঁচিয়ে তুললেন শুক্রাচার্যকে | এভাবেই সঞ্জীবনী মন্ত্র কচের মাধ্যমে চলে গেল দেবতাদের কাছে | ফলে তাঁরাও অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ের মন্ত্র শিখে গেলেন |

সোমরস পান করার ফলেই সঞ্জীবনী মন্ত্র হাতছাড়া হয় শুক্রাচার্যের | তাই বলা হয় ব্রাহ্মণদের মদ্যপান বা নেশা থেকে বিরত থাকা উচিত | এবং এই প্রসঙ্গেই জ্যোতিষে কথিত‚ শুক্র গ্রহের কুনজর থাকলে সেই জাতক পেটের সমস্যায় ভোগেন | কারণ শিষ্য কচকে গলাধঃকরণ করে কষ্ট পেয়েছিলেন স্বয়ং শুক্রাচার্য |

আরও পড়ুন:  যেখানে কৃষক তার গরু-মোষকেও আদেশ দেয় দেবভাষা সংস্কৃতে !

NO COMMENTS