স্কুলে পড়েছেন বৈদিক সভ্যতার সপ্ত ঋষির নামে আকাশে জ্বলজ্বল করে সপ্তর্ষিমণ্ডল | আকাশপাঠের পাশাপাশি আসুন একবার খোঁজার চেষ্টা করি সেই সাত ঋষিকে |

হিন্দু পুরাণের নানা উৎসে সাত ঋষির নাম পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে | তবে সবথেকে বেশি স্থানে যাঁদের নাম রয়েছে তাঁদের কথাই বলব | সেই সাত ঋষি হলেন ভৃগু‚ অত্রি‚ অঙ্গীরা‚ বশিষ্ঠ‚ পুলস্ত্য‚ পুলহ ও ক্রতু |

এই পর্বে পুলস্ত্যর কথা |

জগতে সাদার পাশাপাশি কালো‚ আলোর পাশাপাশি অন্ধকারেরও কি প্রয়োজন আছে নইলে সৃষ্টিরহস্যে ভালর সঙ্গে খারাপেরও স্থান থাকবে কেন !

হিন্দুশাস্ত্রও কিন্তু এই তত্ত্বে বিশ্বাসী | এই প্রসঙ্গে বলি‚ দৈত্য-রাক্ষস-অসুর এসব অশুভ শক্তি হলেও এদের উৎস পৃথক | একের থেকে অন্যের সূক্ষ্ম পার্থক্যও আছে | সে নিয়ে অন্য একদিন বলা যাবে | আজ শুধু এটুকু বলছি‚ মহা ঋষি কাশ্যপের স্ত্রী ছিলেন দক্ষ প্রজাপতি-কন্যা দিতি | তাঁর পুত্ররা ছিলেন দৈত্য | তখনও মাতৃপরিচয় বহন করতেন বংশধররা | দিতি ও তাঁর পুত্ররা ছিলেন ইন্দ্র-বিরোধী | তাই শাস্ত্রে দৈত্যরা হয়ে গেল খারাপ |

ফিরে আসি সপ্তর্ষি প্রসঙ্গে | তাঁদের মধ্যে ঋষি পুলস্ত্যর স্ত্রী ছিলেন কর্দম ঋষি-কন্যা হবির্ভূ | তাঁদের দুই পুত্র | অগস্ত্য ও বিশ্বশ্রবা | দুজনেই ঋষি |

ঋষি বিশ্বশ্রবা বিবাহ করলেন ইলাবিদ্যাকে | তাঁদের পুত্র হলেন কুবের | তিনি তো স্বর্ণলঙ্কা বানিয়ে সেখানে নৃপতি হয়ে বসলেন | এদিকে বিশ্বশ্রবার উপর নজর পড়ল কৈকেশী বা কেকশীর | আগে যে বললাম দিতির কথা | তিনি এবং কৈকেশী দুজনেই মরুৎ বংশীয়া | কৈকেশীর বাবা ছিলেন দৈত্য সুমালি | মা‚ গন্ধর্ব কন্যা কেতুমতী |

কৈকেশী রূপ-লাস্য-বিভঙ্গে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করলেন ঋষি বিশ্বশ্রবাকে | তিনি প্রথমা স্ত্রী ও পুত্রকে ত্যাগ করে চলে এলেন কৈকেশীর কাছে | জন্ম হল তাঁদের তিন পুত্র রাবণ‚ কুম্ভকর্ণ‚ বিভীষণ ও এক কন্যা শূর্পনখার | এবং অভাবিত ভাবে তাঁরা কেউ আর্য ঋষিপুত্র হলেন না ! তাঁদের পরিচয় হল রাক্ষস বলে | অর্থাৎ বৈদিক যুগে তখনও ফল্গুধারার মতো বহমান ছিল মাতৃতন্ত্র | ফলে‚ পিতা একই ব্যক্তি হলেও জন্মদাত্রীর জন্য কুবের হয়ে গেলেন দেবতা | আর রাবণ-কুম্ভকর্ণ-বিভীষণ-শূর্পনখা রাক্ষস-রাক্ষসী |

ছোট্ট করে হলেও জানিয়ে রাখি‚ রাক্ষস শব্দের উৎস | সত্য যুগের শেষে নিদ্রিত ব্রহ্মার নিঃশ্বাস থেকে জন্ম এই ভীষণ প্রজাতির | নিদ্রাভঙ্গ ব্রহ্মা তাদের দেখে ভীত হয়ে চিৎকার করলেন রক্ষ মম | অর্থাৎ আমাকে রক্ষা করো | তার থেকেই ওই ভীষণদর্শন জাতি পরিচিত হলেন রাক্ষস নামে | ব্রহ্মার ত্রাণে বিষ্ণু এসে রাক্ষসদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করলেন মর্ত্যলোকে |

রাক্ষসরাজ হয়ে রাবণ স্বর্ণলঙ্কায় গিয়ে উৎখাত করলেন বিমাতা পুত্র কুবেরকে | রাবণ হয়ে গেলেন লঙ্কাধিপতি | দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানের এই আচরণে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েলন ঋষি বিশ্বশ্রবা | তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী কৈকেশীকে ছেড়ে চলে গেলেন প্রথম স্ত্রীর কাছে চিরতরে | শ্রীলঙ্কায় পুলস্তিপুরা বলে একটি জায়গা আছে | বলা হয়‚ এই নামকরণের উৎস ঋষি পুলস্ত্য |

পরবর্তীকালে রাবণ যখন সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে এলেন‚ মা কৈকেশী নির্দেশ দিয়েছিলেন সীতাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে | কিন্তু মায়ের নিষেধ শোনেননি দাম্ভিক রাবণ | তখন কৈকেশী তাঁর আর এক পুত্র‚ বিতাড়িত বিভীষণকে আজ্ঞা দিলেন রামচন্দ্রকে সাহায্য করতে |

এত অবধি পড়ে কি মনে হচ্ছে মহা ঋষি পুলস্ত্য মানেই শুধু রাক্ষস বংশের উদ্ভব তাহলে বলি ওঁর অন্যান্য অবদানের কথা | বলা হয়‚ মহা প্রজাপতি ব্রহ্মার মুখনিঃসৃত পুরাণ পুলস্ত্যর মাধ্যমে বাহিত হয়েছিল মানবসভ্যতার কাছে | ব্রহ্মার কাছে শুনে সমগ্র বিষ্ণুপুরাণ তিনি বলেছিলেন ঋষি পরাশরকে | তারপর তা প্রসারিত হয় মানবসন্তানের কাছে |

কিন্তু গরুর দুধে একফোঁটা চোণার মতো পুলস্ত্য বললেই প্রতিভাত হয় রাক্ষস বংশের প্রসার | স্তিমিত হয়ে আসে এই ঋষির অন্য অবদান | কিন্তু এটা বিস্মৃত হই‚ চোখের সামনে অন্ধকার না থাকলে আলোর মর্ম উপলব্ধ হয় না |

এই প্রসঙ্গে :

আরও পড়ুন:  পুতিগন্ধময় নোংরা দু হাতে ঘাঁটাই কাজ...তাঁর শুভ্রতায় ম্লান হাজার ওয়াটের আলোও

অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূর গর্ভ থেকে ভেসে আসছে শিশুকণ্ঠে বেদপাঠ ! শুনতে পেলেন ঋষি  http://banglalive.com/the-cold-war-between-sage-vashitha-king-viswamitra/

ব্রহ্মার বীর্য পড়েছিল জ্বলন্ত অঙ্গারে, তার থেকেই আবির্ভূত হলেন অঙ্গীরস বা অঙ্গীরা http://banglalive.com/who-was-sage-angira/

ঋষিপত্নীর সতীত্বের পরীক্ষা নিতে এসে ত্রিদেবকে জন্মাতে হল এই ঋষির পুত্র হয়েই http://banglalive.com/brahma-vishnu-shiva-were-born-as-sons-of-rishi-atri/

তাঁর শাপে ব্রহ্মা নরলোকে পুজো পান না‚ বিষ্ণুকে জন্ম নিতে হয় নানা অবতারে‚ শিব পূজিত হন লিঙ্গরূপে http://banglalive.com/why-is-rishi-bhrigu-famous-in-hindu-mythology/

- Might Interest You

NO COMMENTS