স্কুলে পড়েছেন বৈদিক সভ্যতার সপ্ত ঋষির নামে আকাশে জ্বলজ্বল করে সপ্তর্ষিমণ্ডল | আকাশপাঠের পাশাপাশি আসুন একবার খোঁজার চেষ্টা করি সেই সাত ঋষিকে |

হিন্দু পুরাণের নানা উৎসে সাত ঋষির নাম পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে | তবে সবথেকে বেশি স্থানে যাঁদের নাম রয়েছে তাঁদের কথাই বলব | সেই সাত ঋষি হলেন ভৃগু‚ অত্রি‚ অঙ্গীরা‚ বশিষ্ঠ‚ পুলস্ত্য‚ পুলহ ও ক্রতু |

এই পর্বে পুলহর কথা |

ভাগবৎ পুরাণ অনুযায়ী‚ ঋষি পুলহর দুটি জন্ম | প্রথম জন্মে তাঁর স্ত্রী দক্ষকন্যা ক্ষমা | এ জন্মে ঋষির নাম পুলহন বা পুলহ | তাঁদের চার সন্তানসন্ততি | কর্দম‚ অতবৃত‚ সহিষ্ণু ও কন্যা পীবরী | কিন্তু মহাদেবের অভিশাপে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেলেন পুলহ |

পরে অগ্নিদেবের কেশরাশি থেকে আবার জন্ম হল তাঁর | এই জন্মে তাঁর সহধর্মিণী রূপে দেখা যায় কর্দম মুনি-দেবাহূতি কন্যা গতিকে | অর্থাৎ যে কর্দম ছিলেন পুলহর পুত্র‚ তাঁর মেয়েকে বিয়ে করলেন ঋষি | এক দিক দিয়ে পৌত্রী বা নাতনির পাণিগ্রহণ করলেন | পুলহ-গতির তিন পুত্রসন্তান |

ব্রহ্মার মানসসন্তান পুলহর আরও অন্যান্য স্ত্রীও ছিলেন | তাঁদের নাম সেভাবে উল্লিখিত না হলেও আলোচিত হয় তাঁদের সন্তানদের নিয়ে | কারণ পিশাচের মতো ভীষণদর্শন মানব বা সিংহ‚ বাঘের মতো হিংস্র পশুর জন্মও নাকি পুলহর ঔরস থেকেই |

পৌরাণিক উল্লেখে দেখা যায় কিমপুরুষের কথা | ( সংস্কৃত ভাষায় ‘কিম’ শব্দের অর্থ কী | অর্থাৎ এটা কী পুরুষ ? বা কেমন মানুষ ? ) এদের মাথা সিংহের | দেহ মানুষের | বাস ছিল নাকি হিমালয় পর্বতের সন্নিহিত অংশে | বর্ণনা শুনে মনে পড়ে যাচ্ছে মিশরীয় সভ্যতার বিখ্যাত স্ফিংসের কথা | তার মানে‚ আবারও প্রমাণিত হল‚ প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে কতটা সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ছিল | এর আগে ঋষি অঙ্গীরা প্রসঙ্গে বলেছিলাম সুপ্রাচীন পারসিক সভ্যতার কথা | সেখানকার দেবতা জরথ্রুস্টকে অনেক গবেষক বলে থাকেন একজন বৈদিক ঋষি | পারসিক ধর্মগ্রন্থ জেন্দ আবেস্তার সঙ্গে বহু মিল ঋক বেদের | সর্বোপরি‚ দুটি নদীমাতৃক সভ্যতাই আদিতে ছিল অগ্নির উপাসক বা অগ্নিহোত্রী |

যাই হোক‚ ফিরে আসি ঋষি পুলহর প্রসঙ্গে | এই মহা ঋষির সন্তান স্বরূপ যে কিমপুরুষের কথা বলা হয়েছে‚ সেই সিংহ-মানবের ভাস্কর্য কিন্তু একা স্ফিংস নয় | আরও প্রাচীন এক ভাস্কর্য আছে জার্মানির সংগ্রহশালায় |

১৯৩৯ সালে জার্মানির হোহলেনস্টেইন স্টাডেল গুহায় খনন করে আবিষ্কৃত হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগের এক মূর্তি | ৩১ সেন্টিমিটার লম্বা‚ ৫.৬ সেন্টিমিটার চওড়া মূর্তিটার মাথা সিংহের | দেহ মানুষের | অত্যাধুনিক কার্বন ডেটিং বলছে এর বয়স ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার বছর | জার্মান ভাষায় এর নাম লোয়েন মেনশ | ইংরেজিতে লায়ন হিউম্যান | (এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গুহামনাবের করা গুহাচিত্রের কথাও |)

মূর্তিটি তৈরি ম্যামথের দাঁত থেকে | প্রস্তর যুগে কোনও এক গুহামানব সূঁচালো পাথর দিয়ে মৃত ম্যামথের দাঁত কুঁদে কুঁদে বানিয়েছিল ভাস্কর্যটি | যার মস্তকভাগ পশুর মতো | দেহাংশ দু হাত-দু পা বিশিষ্ট মানুষের |

তাহলে কি এরকম জীব সত্যিই ছিল ? নাকি গুহামনাবের কল্পনা ? যে কল্পনা সঞ্চারিত হয়েছিল তাঁর উত্তরপুরুষদের মধ্যে | গুহামানবের হাতে তৈরি মূর্তিই কয়েক হাজার বছর পেরিয়ে এসে নীলনদের পাড়ে হয়ে গেল স্ফিংস | আর সিন্ধু-সরস্বতীর তীরে সেটাই নামাঙ্কিত হল কিমপুরুষ বলে | পরবর্তীকালে এই রূপই হয়ে যায় বিষ্ণুর নৃসিংহ বা নরসিংহ অবতার |

এভাবেই প্রাগৈতিহাসের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ইতিহাস |

এই প্রসঙ্গে :

আরও পড়ুন:  যখন জন্মগত ত্রুটিতে মানুষের শারীরিক যন্ত্রণাবোধ বিলুপ্ত হয়

অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূর গর্ভ থেকে ভেসে আসছে শিশুকণ্ঠে বেদপাঠ ! শুনতে পেলেন ঋষি  http://banglalive.com/the-cold-war-between-sage-vashitha-king-viswamitra/

ব্রহ্মার বীর্য পড়েছিল জ্বলন্ত অঙ্গারে, তার থেকেই আবির্ভূত হলেন অঙ্গীরস বা অঙ্গীরা http://banglalive.com/who-was-sage-angira/

ঋষিপত্নীর সতীত্বের পরীক্ষা নিতে এসে ত্রিদেবকে জন্মাতে হল এই ঋষির পুত্র হয়েই http://banglalive.com/brahma-vishnu-shiva-were-born-as-sons-of-rishi-atri/

তাঁর শাপে ব্রহ্মা নরলোকে পুজো পান না‚ বিষ্ণুকে জন্ম নিতে হয় নানা অবতারে‚ শিব পূজিত হন লিঙ্গরূপে http://banglalive.com/why-is-rishi-bhrigu-famous-in-hindu-mythology/

রাক্ষস বংশের রাবণ-কুম্ভকর্ণ-বিভীষণ-শূর্পনখার বাবা এবং ঠাকুরদা দুজনেই কিনা ছিলেন প্রাজ্ঞ ঋষি http://banglalive.com/this-sage-is-the-grandfather-of-rakshasraj-ravana/

NO COMMENTS