বাংলালাইভ রেটিং -

ছবিটা দেখতে বসে কিছুক্ষণ পর থেকেই আমার হতভম্ব হওয়ার শুরু। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যেন। সত্যি সত্যি এরকম ভাবে তৈরি হয়েছে ছবিটা? মোটামুটি যত্ন নিয়ে লেখা স্ক্রিপ্ট, সুন্দর করে সাজানো এই যে একের পর এক সিকোয়েন্স। আর সেখানে কিনা এই লেভেলের গোঁজামিল দেওয়া আছে?

না জেনে-শুনে ‘ভুল’ হয়ে যাওয়ার কেস তো এটা হতেই পারে না, ভাই। দেখে শুনে তো মনে হচ্ছিল, ছবিটা যেমন পেশাদারি যত্ন নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে বানানো হয়েছে, ছবির মধ্যে পুরে দেওয়া গোঁজামিলটাও সে রকম যত্ন করেই তৈরি।

সে জন্যে বোধহয় ডিরেক্টরকে দোষ দেওয়াটাও ঠিক হবে না আদৌ। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ভদ্রলোকের সামনে সবসময় যেন অদৃশ্য একটা লক্ষণরেখা ছিলই। যে রিয়্যালিস্টিক ঘটনা নিয়ে ছবি করতে নেমেছ ঠিক আছে, কিন্তু হ্যাঁ, তাই বলে বাড়াবাড়ি করে ফেল না যেন। তোমার গল্প, তোমার ক্যামেরা কিংবা ভিস্যুয়াল যেন এই গণ্ডীর বাইরে না যায় কখনও।

গোঁজামিলটা ঠিক কী, সেটা লেখার আগে ছবির গল্পের একটু আভাস দিয়ে রাখি।

উত্তর প্রদেশের মথুরা জেলায় মন্দগাঁও নামে এক গ্রাম। সেই গ্রামের সাইকেল বিক্রেতা কেশবের (অক্ষয় কুমার) বাড়ি বিয়ে হয়ে আসার পরেই বাজ পড়লো নতুন বৌ জয়ার (ভূমি পেড়নেকর) মাথায়। কেন বলুন তো? আরে, এখানে এসে ও টয়লেট করবে কোথায়, ওর শ্বশুরবাড়িতে কোথাও কোন টয়লেট নেই তো!

তাহলে গ্রামের লোকে টয়লেট করতে যায়টা কোথায়?

বরের সঙ্গে দাপাদাপি করে ফুলশয্যা কাটিয়ে সবে ভোরবেলার দিকে ঘুমটা গাঢ় হয়েছে একটু। ভোর চারটে বাজে, সূর্যের আলো ফুটতে তখনও একটু বাকি। জানলা ঠকঠকিয়ে ওকে ডেকে তুলে দিল গাঁয়ের মেয়ে-বৌদের দল।

কেন? কেন আবার। অন্ধকার থাকতে থাকতে দূরে কোথাও একটা গিয়ে মলত্যাগ করে আসার জন্যে দল বেঁধে সবাই তৈরি। এক হাতে হ্যারিকেন আর অন্য হাতে জলের ঘটি মানে ‘লোটা’ নিয়ে অন্ধকারে মাইল-মাইল হাঁটা। তারপর লজ্জা-শরম ভুলে কাপড় উঠিয়ে ঝোপের মধ্যে বসা। আজ থেকে এই ডেলি প্র্যাকটিসে তো রপ্ত হতে হবে নতুন বৌটিকেও, নাকি?

কিন্তু বাপের বাড়িতে ছোট্টবেলা থেকে টয়লেট ইউজ করে বড় হয়েছে যে জয়া, সে হঠাৎ করে লজ্জা শরম ধুয়ে সবার সামনে বসে এসব করবে কী করে?

ঠিক এই পয়েন্ট থেকেই ছবির চরম সংঘাত শুরু। জয়া চায় বাপের বাড়ির মতো তার শ্বশুরবাড়িতেও টয়লেট হোক আলাদা। কিন্তু মুশকিল হল, এই মহা-আন্দোলনে ওর পাশে ও খুব একটা আর কাউকে পায় না। গ্রামের বাকিরা উলটে বলতে চায়, এতদিন যদি এমনি করেই কাটতে পারে, ফালতু ফালতু টয়লেট বানিয়ে নিজের বাড়ি নোংরা করার দরকার আছে কোন?

এই নিয়ে সিনের পর সিন জুড়ে তুমুল বিতণ্ডা, চরম নাটক। জয়ার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল যে একটা মাত্র লোক, সে হল ওর বর কেশব। গলার শির ফুলিয়ে মাঝে মাঝে বক্তৃতা দিতে শুনছিলাম ওঁকে যে, পথের ধারে গাঁয়ের মেয়ে-বৌরা এরকম কাপড় খুলে বসলে তাদের লজ্জা শরম থাকবে কোথায়?

ছবির সবচেয়ে বড় গোঁজামিলটাও ঠিক এখানেই লুকিয়ে। গ্রামদেশের টয়লেট সমস্যা নিয়ে এমন একটা ছবি। সেখানে পুরো ছবিটা জুড়ে শুধু মেয়েদের টয়লেট করার ইস্যু? দেখেশুনে মনে হচ্ছিল, ছেলেদের শরীর বোধহয় এমন স্টাইলে তৈরি যে তাদের টয়লেট করার দরকারই হয় না কোন!

পথের ধারের কাঁচা নর্দমায় হাঁটু গেড়ে বসে ছেলেরা মুত্রত্যাগ করছে, এরকম দৃশ্য ছবিতে বেশ কয়েকবার আছে। কিন্তু ছেলেরা মলত্যাগ করছে কোথায়, সেটা নিয়ে ১৬১ মিনিটের ঢাউস ছবিটা মুখে প্রায় সেলোটেপ দিয়ে চুপ!

তুমুল একটা ঝগড়ার সিনে জয়াকে এক লাইন বলতে শুনেছি, ‘মর্দ তো ঘর কে পিছে বয়েঠ যাতে হ্যায়’। এটা শুনতে পেয়ে তো আরও হাঁ হয়ে গেছি আমি! কারণ ‘বার্ডস আই’ ভিউতে পুরো জনপদটাকে তো বেশ কয়েকবার দেখতে পেয়েছি ছবিতে! সেখানে যা দেখছি, গোটা মহল্লাতে যে গায়ে গায়ে থাকা অগুন্তি ঘরবাড়ি! সেখানে ওইভাবে ‘ঘর কে পিছে’ মলত্যাগ করার জায়গা কোথায় স্যর? তাও আবার একদিন দু’দিন তো নয়, বছরের পর বছর ধরে টানা!

আরও পড়ুন:  সেলফি তুলতে উৎসাহী ফ্যানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন জয়া বচ্চন

চরম ক্ষিপ্ত বৌ জয়াকে যখন শান্ত করতে চাইছে কেশব, তখন ওকে এটাও কয়েকবার বলতে গিয়েছে যে, গ্রামের আর সব মেয়ে-বৌরা যা করে তুমিও সেটাই মেনে নিয়ে নাও প্লিজ। আশ্চর্যের কাণ্ড হল, এরকম সব সিনগুলোতে একবারও মুখ ফস্কে নিজের উদাহরণ কিন্তু দ্যায় না কখনও কেশব। একবারও এটা বলে না যে ও নিজে মলত্যাগ করতে যায় কোথায়।

নারী পুরুষ উভয়ের টয়লেট নিয়ে পোস্টার তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল সিনেমা এ বিষয়ে প্রায় চুপ!

রাগের ঝাঁজে ওর বৌ রান্নাঘরের বাসনগুলো মাটিতে আছড়ে আছড়ে ফ্যালে। কিন্তু সেই বৌকেও তো একবারও ঝাঁজিয়ে বলে উঠতে দেখি না যে, তুমি কোথায় গিয়ে টয়লেট করো বল তো? তখন তোমারই বা লজ্জা শরম কোথায় থাকে গো?

ক্যামেরা কখনও কেশব বা আর কোন পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে তাদের মলত্যাগের মোমেন্ট ক্যাপচার করে না আদৌ।

যা মনে হচ্ছিল, ছেলেরা বোধহয় ভিনগ্রহ থেকে আসা অদ্ভুত সব জীব। এরকম জীব, যাদের শুধু পেচ্ছাপ করলেই চলে।

ফুলশয্যার ঠিক পরের দিন সকাল। বরের চাপাচাপিতে গাঁয়ের আর মেয়ে-বৌদের সঙ্গে দূরের মাঠে গেলেও শৌচ না করেই ফেরত আসে জয়া। এই যে সারাদিন টয়লেট না করে সেটা চেপে বসে থাকা, এরপর সেটা নিয়ে কী তুমুল ব্ল্যাক কমেডি হতে পারতো, সেইটে ভাবুন একবার। বর বলুন কিংবা বুড়ো শ্বশুরমশাই বলুন, সবার জীবন নর্মাল আর বিন্দাস হয়ে আছে। একলা বৌয়ের শুধু হাল্কা হওয়ার সুযোগ নেই, দাঁতে দাঁত চিপে তাকে ঘরের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে টানা। এই লেভেলের সিচুয়েশন নিয়ে অন-স্ক্রিন যে কতটা রগড় হতে পারে, ‘পিকু’ (২০১৫) দেখে থাকলে সেটা আঁচ করতে পারেন নিশ্চয় আপনি। কিন্তু এ ছবিতে কোথায় সে সব দাদা?

উলটে এই দিনটা যেন ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করে কাটিয়ে দিয়ে পরের দিন সকালবেলায় পৌঁছে গেল স্টোরি।

আমারও তখন প্রায় দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকার অবস্থা। ভাবছি, টয়লেট না করে আর কতদিন টিকতে পারে হিন্দি ছবির হিরোইন। যাই হোক, টানা চব্বিশ ঘণ্টার বেশি চেপেচুপে বসে থাকার পর দ্বিতীয় দিন সকালবেলায় গ্রাম প্রধানের বাড়ি গিয়ে চুপি চুপি দেখি ‘হাল্কা’ হয়ে এল মেয়েটা।

দেখতে দেখতেই মনে হচ্ছিল, ছেলেদেরও যে মলত্যাগ করতে হয়, আর গ্রামে-গঞ্জের পুং জনতা যে হাগু করতে দিব্যি সেই মাঠে গিয়েই বসে, জ্বলজ্যান্ত এই সত্যি ভিস্যুয়াল ছবিটা এভাবে জাস্ট চেপে গেল কেন। ছবির শেষদিকে একটা গানের মধ্যে দু’সেকেন্ডের বারোয়ারি একটা শট আছে যে অজানা-অচেনা পুরুষকুল লোটা হাতে মাঠে-ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই টুকু ঝলক ছাড়া ২ ঘণ্টা ৪১ মিনিটের বাকি ছবিটা ছেলেদের ব্যাপার নিয়ে একটা শব্দ করে নি! আর এর সম্ভাব্য কারণ মনে হচ্ছিল এটাই, যে ছবিতে সাইন করার আগে ওটাই বোধহয় ছিল স্বয়ং অক্ষয় কুমারের শর্ত। আরে ভাই বলিউডের স্টার বলে কথা, জীবনে ইমেজ বলে একটা ব্যাপার আছে তো, নাকি? সেই লোককে লোটা হাতে মাঠে গিয়ে বসতে দ্যাখালে, সিনেমায় কী হবে না হবে ছাড়ুন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে টিটকিরির চোটে আর টিকতে পারবে লোকটা?

তাই বোধহয় ছবির স্ক্রিপ্ট থেকে ছেলেদের কিংবা স্টারেদের মলত্যাগের আগা-মাথা সব ছেঁটে-ছুঁটে পুরো সাফ!

বলিউডের গেম প্যাটার্নটা বুঝুন। হিরো হচ্ছে ভগবানের মতো। এক চুল এদিক থেকে ওদিক হবে না তার। সে কখনও হাগু করতে পারে? কিন্তু হিরোইন? ধুস, তাকে নিয়ে তো যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নেওয়া যায়! তার ওপর এই ভূমি পেড়নেকর না কী, সে তো বলতে গেলে নতুন মেয়েই প্রায়, এর আগে করেছে একটা মোটে ছবি। দাও দাও ওকে রাস্তার ধারে হাগু করতে বসিয়ে।

একটা শব্দও বাড়িয়ে লিখছি না। ফুলশয্যার ঠিক দু’দিন পরের কথা। বরকে সঙ্গে নিয়ে সত্যি সত্যি সূর্য ওঠার আগে সেই মাঠে গিয়েই বসতে হল জয়াকে।

আরও পড়ুন:  জেনে নিন কীভাবে সেলিব্রেট করা হলো শাহিদ-মীরার মেয়ে মিশার প্রথম জন্মদিন

আমরা দেখলাম, ঝোপের মধ্যে কাপড় তুলে জয়া বসে পড়ার পরেই আসল গোলমালটার শুরু। ওর মুখে হঠাৎ এসে পড়ে একটা মোটরবাইকের হেডলাইটের আলো। কার মোটরবাইক, জানেন? জয়ার শ্বশুরমশাই! পথের ধারে ঝোপের মধ্যে বৌমাকে বসে মলত্যাগ করতে দেখে সেই বুড়ো মানুষটা চমকে যান এমন যে বাইক উলটে পড়ে অ্যাক্সিডেন্ট বাঁধিয়ে বসেন সটান।

ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে, অত দূরে ওই মাঠের মধ্যে শ্বশুরমশাই বাইক নিয়ে গিয়েছিলেন কেন, তার কোন ব্যাখ্যা কিন্তু ছবির মধ্যে নেই। তিনিও কি শৌচ করতে গেছিলেন? কিন্তু জয়ার জবানিতেই না এটা শোনানো হয়েছে, যে ছেলেদের দূরে মাঠের মধ্যে যেতে হয় না, তারা ঘরের পেছনেই যেটুকু করার সেটা সামলে নিতে পারে!

পেশাদারি যত্ন নিয়ে তৈরি ছবি ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যেও এরকম বিরাট বিরাট ফাঁক!

ওই সিনটার কথা ভাবুন। বৌকে টয়লেট করিয়ে আনার জন্যে স্টেশনে দাঁড়ানো এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছে কেশব। ট্রেন নাকি সেখানে পাক্কা সাত মিনিট দাঁড়ায়। তা ওই সাত মিনিটে ট্রেনে উঠে টয়লেট কি সেরে আসা যাবে না নাকি?

বাস্তবের সেই প্রিয়াঙ্কা ভারতী, টয়লেট না থাকায় প্রতিবাদ করে যিনি ছেড়ে এসেছিলেন শ্বশুরঘর!

আইডিয়া তো মন্দ ছিল না, কিন্তু স্ক্রিনে এটা দ্যাখাতে গিয়ে ফের গণ্ডগোল হয়ে গেল হিসেবে। বৌকে ট্রেনে তুলে কোথায় নিজে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে টয়লেটের গেট, তার বদলে ওমা, কেশব বাইক নিয়ে সোজা পৌঁছে গেছে কার একটা বাড়িতে যেন কী একটা কাজ সেরে আসার জন্য!

এটা বাড়াবাড়ি না, বলুন?

নাটকে আরও রং চড়াতে এরপর কী দ্যাখান হচ্ছে, শুনুন। জয়া যখন ট্রেনের টয়লেটের ভেতরে, তখন ট্রেনের লোকজন এত মাল এনে জড়ো করছে সেই টয়লেটের দরজার সামনে, যে টয়লেট সেরে আর দরজা খুলে বেরতে পারছে না জয়া!

আর ট্রেন দিয়েছে ছেড়ে!

আপনি বলুন, এটা হয় কখনও, দাদা? ট্রেনের টয়লেটের দরজার সামনে যত মালই ডাঁই করুন না কেন, সে জন্য টয়লেটের দরজা খুলতে পারবেন না, এটা দ্যাখানটাই তো মস্ত বড় ভুল! ভারতে ট্রেনের টয়লেটের দরজা তো ভেতর দিকে খোলে। বাইরে ঠাসাঠাসি মাল থাকলেও সেই দরজা খুলতে অসুবিধে হবে কেন?

জোড়াতালি দেওয়া গোঁজামিলগুলো ধরতে পারছেন এবার? অবশ্য এরকম সব সিন না দ্যাখালে মাখো-মাখো সিনগুলো সব জমবে কী করে ভাই?

ট্রেন ছেড়ে দিল প্রায়, আর বন্ধ টয়লেটের মধ্যে অসহায় ভাবে আটকে পড়ে ছটফট করছে মেয়েটা! লাস্ট মোমেন্টে যখন কোনমতে হাঁচোর-পাঁচোর করে ঠেলে বেরিয়ে আসতে পারলো, ততক্ষণে স্পিড নিয়েছে ট্রেন। ঠিক সেই সময়েই আবার বাইকে ফুল স্পিড মেরে ট্রেনের পাশে এসে পৌঁছেছে ওর বর কেশব। তারপর ট্রেন আর কেশবের বাইকে সে কী রেস! কেশব আবার আবেগের চোটে চোখের সানগ্লাস খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে। চেঁচাতে লাগলো, ‘জয়া চেন টেনে ট্রেন দাঁড় করাও’ বলে। ওদিকে জয়া কিচ্ছু করছে না, সজল চোখে দরজার হাতলটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে স্রেফ। আর ওকে নিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেনটা স্পিড তুলে বেরিয়ে যাচ্ছে জোরে – মেঘ গুরু গুরু লাটকের লেভেলটা ভাবুন একবার দাদা।

খিল্লি করছি না, সত্যি কিন্তু টাচ করে যাবে সিনটা, আর হাগু করতে আসা হিরোইনকে নিয়ে নিরুদ্দেশে ট্রেনটা হারিয়ে যাওয়ার পরেই পর্দায় ফুটে উঠবে ‘ইন্টারভ্যাল’।

এই আবেগে চুবনো ইন্টারভ্যালের ফাঁকে এবার সত্যি একটা রিয়্যালিটির দুনিয়া দেখতে চলুন। সেটাও এই উত্তরপ্রদেশ, সাল ২০১২। জেলা মহারাজগঞ্জের এক গাঁয়ে বিয়ে হয়ে এসেছিল ১৯ বছরের মেয়ে প্রিয়াঙ্কা ভারতী। শ্বশুরঘর করতে এসে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল এইটা দ্যাখার পর যে, সেখানে টয়লেট নেই কোন!

বুঝতে পারছেন তো, হঠাৎ করে কেন ওর কথা পাড়তে গেলাম আমি? ঠিক ধরেছেন, সিনেমাটার ইন্সপিরেশন কিন্তু ওর জীবন থেকেই নেওয়া।

সিনেমায় জয়ার কোন শাশুড়ি-টাশুরি নেই। বাস্তবে কী হয়েছিল, শুনুন। ওই প্রিয়াঙ্কাকে ওর শাশুড়ির থেকেই শুনতে হয়েছিল যে,তিনি রোজ মাঠে গিয়ে বসতে পারলে প্রিয়াঙ্কারও সেটা করতে অসুবিধেটা কোথায়?

আরও পড়ুন:  সাধ ভক্ষণের আচার-অনুষ্ঠান ভুলে এষার সঙ্গে সেলফি তুলতে ব্যস্ত পুরুত‚ চটে গেলেন জয়া বচ্চন

বিয়ে হওয়ার ঠিক দু’দিনের মাথায় শ্বশুরঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতে ফেরত এসেছিল প্রিয়াঙ্কা। ঠিক করেছিল, টয়লেট না তৈরি হলে শ্বশুরঘর আর করতে যাবে না ও। উত্তরপ্রদেশের অজ পাড়া গাঁয়ে এরকম কাণ্ড ঘটানোটা যে কোন লেভেলের দ্রোহ, সেটা যারা জানার, তাঁরা জানেন।

প্রিয়াঙ্কার কথা চাউড় হওয়ার পরে হৈ-চৈ আর কেচ্ছা-চর্চা শুরু। মিডিয়া এই ঘটনা ফোকাসে আনার পর ওর সাহায্যে এগিয়ে আসে ‘সুলভ ইন্টারন্যাশনাল’। টয়লেট গড়ে দিয়ে যায় প্রিয়াঙ্কার বাড়ি। সঙ্গে দু’লক্ষ টাকার ইনাম। ইউনিসেফের তরফে বিজ্ঞাপন তৈরি হয় ব্যতিক্রমী এই কন্যার ভাবনাকে প্রমোট করার জন্য।

তা, দূর গাঁয়ের সেই মেয়ের রিয়্যালিটিকেই দুমড়ে মুচড়ে বলিউডেরএই ছবি। সিনেমা থেকে এখানে অবশ্য ওসব সুলভ-ফুলভ কিংবা ইউনিসেফ হাওয়া। উলটে চমৎকার তড়কা মেরে দেখছি সেট করে দেওয়া আছে দুনিয়ার তাবৎ মশলা।

কী নেই এতে বলুন?

ছবির উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর টুইট শুভেচ্ছা!

সবকিছুর ওপরে যেটা চোখে পড়ছিল, ভারত সরকারের নির্লজ্জ স্তুতি। ভারত সরকার মানে যে কোন দলের সরকার, সেটা আন্ডারলাইন করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে একবার পরিষ্কার বলেও দেওয়া হয় যে, এখনও পর্যন্ত ঠিক কত বছর শাসন করেছে এই সরকার। সোজাসুজি বলে দেওয়া হয় যে, গত তিন বছর ধরে সরকার তো শুধু দেশের ভাল করতেই চাইছে, দেশের তবু উন্নতি যে কিছু হচ্ছে না, সে জন্যে তো আসলে দেশের জনতা দায়ী! দেশের এই গত তিন বছরের সরকারকে খুশ করার জন্যে আর যেটা করা হয়, পুরো ছবি থেকে ঝেড়ে-পুঁছে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় সংখ্যালঘুদের। যখন মথুরা দোল উৎসব দ্যাখাচ্ছেন, তখন না হয় ক্যামেরার ফ্রেমে শুধু সংখ্যাগুরুদের দ্যাখালেন, দোষের নেই কিছু। কিন্তু যখন লখনৌ দ্যাখাবেন, তখনও পাসিং শটে কোথাও একজন সংখ্যালঘুকেও দ্যাখা যাবে না?

শুধু এটুকুতে যদি যথেষ্ট না হয় ভেবে নিজের মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্যে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে ‘দণ্ডি’ কাটতেও দ্যাখান হয়েছে ছবির হিরোকে। অবশ্য এমনিতেই তার গুণের কোন কমতি নেই – বিয়ের আগে অন্য মেয়ের সঙ্গে ইচ্ছেমতো ফুর্তি লোটা থেকে শুরু করে, নিজের মাঙ্গলিক ‘দোষ’ ঢাকতে বাবার কথামতো সুড়সুড় করে একটা মোষের সঙ্গে সাত পাক ঘুরতে থাকা – কী না করে সে। হেলমেট না পরেই বাইক চালানো, বা রাতের অন্ধকারে কোন একটা শুটিং পার্টির প্রোডাকশন ইউনিটে চুপি চুপি চুরি করতে ঢোকা – এ সব তো বলতে গেলে নস্যি। 

এছাড়াও ছবিতে আছে সানি লিওনের নাচ আর সারা গ্রাম জুড়ে নারী জাগরণ হওয়ার তপ্ত আঁচ!

আর ছবির শেষটায় তো চরম লেভেলে নাটক, স্রেফ টয়লেট না থাকার কারণে যেখানে কেশব আর জয়ার মধ্যে প্রায় ডিভোর্স হওয়ার দশা। কোর্টে বিচারক ফাইনাল রায় প্রায় দিয়েই দিতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তার আগের মুহূর্তে ভারত সরকারের অফিসারদের ডিসিশন হয়ে গেল যে, কাল থেকেই মন্দগাঁওতে টয়লেট গড়ার কাজ শুরু! ব্যাস, ভেঙে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল ওদের দুজনের বিয়ে!

মনে হচ্ছিল, ফাঁসির আসামী মরতে মরতে যেন ফাঁসি রদ হওয়ার ঘোষণা পেল শুনতে!

আবার লিখছি, এগুলোকে খিল্লি বলে ভাববেন না কিন্তু, প্লিজ। খুঁটিয়ে দেখলে ছবির মধ্যে গোঁজামিল আর অসঙ্গতি হাজার খানেক পাবেন। কিন্তু একটা কথা বলুন, এরকম ভুল-চুক ছাড়া কি আর চড়াদাগের ব্লকবাস্টার হয়? আসল কথা তো হল ব্যবসা। এ ছবির ক্ষেত্রে সেটা কী রকম হচ্ছে?

শেষ কয়েক মাসে সলমন বা শাহরুখের ছবি যেখানে একের পর এক মুখ থুবড়ে পড়ছে, সেখানে রিলিজের আট দিনের মাথায় বক্স অফিস ১০০ কোটি পেরিয়ে গেছে ছবি। বলুন তো, এটা কি মুখের কথা নাকি?

আপনি হয়তো মাঠে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না কভু। কিন্তু সংখ্যাগুরু যে ভারতীয় আজও লোটা হাতে মাঠে যেতে বাধ্য হন, তাঁদের জন্য এ ছবি কিন্তু খাপে খাপ হয়ে আছে!

NO COMMENTS