বাংলালাইভ রেটিং -

কলকাতায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতো ডিরেক্টর তো বরাবরই সংখ্যায় খুব কম। এমন ডিরেক্টর, যাঁর ঝুলিতে কিছু না হলেও এক ডজন জাতীয় পুরস্কার আছে। ভেনিস, বার্লিন, লোকার্নো থেকে পাওয়া অন্য সব অ্যাওয়ার্ডের কথা ছেড়েই দিলাম না হয়।

এমন ডিরেক্টর, যাঁর একেকটা ছবি দেখে মনে হবে, এটা আসলে ছবি, না কবিতা? ‘লাল দরজা’ (১৯৯৭) ছবিতে সেই লাল পিঁপড়ে নিয়ে শটগুলোর কথা ভাবুন। কিংবা ‘চরাচর’ (১৯৯৩) ছবিতে সেই পাখিতে মানুষে ভালবাসাবাসি খেলা। এরকম তো একটা-দুটো নয়, অগুন্তি ছড়িয়ে আছে সব সিনেমাতেই প্রায়। দেখতে গিয়ে দম বন্ধ করে ভাবতে হবে, বাংলা ছবির ডিওপি’রাও তাহলে এমন সব ইমেজারি ক্যামেরার তুলিতে ধরতে পারে?

শুধু কি তাই? বুদ্ধদেব তো এমন ডিরেক্টর, যাঁর ছবি দেখে মনে হবে, যাক বাবা তাহলে ইন্ডাস্ট্রিতে এমন লোকও আছে, যে এখনও সিনেমাকে সিনেমা বলেই ভাবে। টক ঝাল মিষ্টি দেওয়া ভেলপুরির প্যাকেট বলে নয়।

এই বুদ্ধদেবের নতুন ছবি ‘টোপ’ দেখতে গিয়ে শিরশির করে গায়ে কাঁটা দিতে থাকে যেন। সেই কবে কোন কালে লিখে রেখে যাওয়া নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোট গল্প লুকিয়ে ছিল বইয়ের পাতার কোণে। সেটার থেকে এমন একটা ছবির জন্ম হতে পারে, ভাবতে পেরেছিল কেউ?

ভয়ংকর নিষ্ঠুর এক রাজার গল্প এটা। যার রাজত্ব এখন বলতে গেলে চুলোর দোরে গেছে। থাকার মধ্যে আছে শুধু বাঘ শিকার করে বেড়ানোর গর্ব। তা সেই শিকারও আবার এমনি এমনি হয় না কিন্তু। তার জন্যে টোপের এলাহি আয়োজন করতে হয়। সিনেমার বেশিরভাগ সময় জুড়ে এই সিনেমায় ‘টোপ’ হিসেবে বনের মধ্যে মোষ বেঁধে রাখা ছিল। কিন্তু মুশকিল হল, মোষের মাংস খাওয়ার লোভে বাঘ সে তল্লাটে পা রাখে না আদৌ। তার আরও নরম মাংস চাই।

বাইরের অতিথিদের সামনে রাজার সম্মান তখন যায়-যায় যেন প্রায়। নিজের চোখে না দেখলে তাঁদের কেউ তো মানতেই চাইছে না, এই জঙ্গলে বাঘ-টাঘ আদৌ আর বাকি আছে বলে। রাজার কাছে মান বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ তখন দুটো। এক, আস্ত একটা বাঘ এনে খাড়া করে দেওয়া ওই সকলের সামনে। আর দুই, তারপর সেটাকে মেরে দেখিয়ে দেওয়া, এই দ্যাখো এই আমি হলাম রাজা, আর এই হল গিয়ে আমার এই বন্দুকটার জোর।

রাজা বুঝতে পারেন, এই বাজি জিততে গেলে বাঘকে এবার দ্যাখাতে হবে নরম কচি মেয়ে মানুষের মাংস খাওয়ার লোভ।

কী কেস, ভাবুন একবার শুধু!

সিনেমায় চরম নিষ্ঠুর ওই সিনটা যেন চোখের ওপর দুম করে একটা ধাক্কার মতো লাগে। একটু আগে ফ্রেমজুড়ে চোখ জুড়নো সিনারি ছিল, সেই বিশাল দিগন্তরেখা খোলা, আর তার মাঝখানে পড়ে থাকা পায়ের পাতা ভেজানো চওড়া একটা নদী। সিনেমার ফ্রেম থেকে সে সব এখন এক নিমেষে হাওয়া। উলটে অদ্ভুত একটা লালচে আলো ফ্রেমে, মনে হচ্ছিল ঠিক যেন রহস্যময় কসাইখানার আলো। এই সিনেই ফ্রেমের ওপর থেকে একটু একটু করে নেমে আসছে দড়ি দিয়ে বাঁধা মেয়েটা। বাঘের খাবার হবে বলে। মুখ বেঁধে রাখা আছে বলে তার চিৎকার করার উপায় নেই কোন। হাত-পাগুলোও দড়ি দিয়ে সব আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। মনে হতে পারে, মেয়ে তো নয়, মাংসের তাল দিয়ে তৈরি ‘টোপ’ যেন ওটা জাস্ট।

কলের গান বাজিয়ে খোলা প্রান্তরে নাচ… ঠিক যেন সো-ক্ল্‌ড শিল্পী লোকের মিথ্যে মিথ্যে ভড়ং

অথচ ছবিটা তো শুরুই হয়েছিল খোলা এক প্রান্তরেতে চোঙা লাগানো গ্রামোফোনে ‘বল বল বল সবে’ গান আর তার সঙ্গে এই রাজামশাইয়ের বেশ স্যুইট একটা নাচ দিয়ে। তার মানে ওরকম আকুল নাচ নাচতে পারেন যে রাজা, ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লভে মার্কা গানের লাইন শুনে যাঁর আবেগের কোন সীমা থাকে না প্রায়, নিজের লক্ষ্য পূরণ করার সময় সেই তিনিই আবার এত নিষ্ঠুর হয়ে যান?

এই সিনটা দ্যাখার পর মনে হল, গোটা সিনেমাটা কি আসলে এক শিল্পীকে তুমুল সমালোচনা করার জন্যে তৈরি? এমন এক শিল্পী, যিনি ঘরে বলুন, জঙ্গলে বলুন, শিল্পসাধনার কদর করেন খুব। কিন্তু নিজের লক্ষ্যে শিকার করার সময় সেই তিনিই আবার খুন-খারাপি হিংস্র!

ইন্ডাস্ট্রির মানী গুণী অন্যরা কী বলছে, এই ফাঁকে সেটাও একটু শুনুন। থার্টি প্লাস একজনকে বলতে শুনলাম, ছবিটা নাকি আসলে সেই ফ্যাসিবাদের স্টোরি। ‘টোপ’ দিয়ে বাঘ শিকার করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফ্যাসিবাদের ছায়া। প্রায় সেভেনটি প্লাস আরেকজনের মতে, এটা আসলে এই সময়ের ভারতবর্ষের রাজনৈতিক হাল। ফ্রেমগুলোকে ডিকোড করলেই রাজনৈতিক নেতাদের সব স্বরূপগুলো চিনতে পারা যাবে। আর এখনও তিরিশ পেরোয় নি এমন একজনের মতে, এটা আবার সিনেমা হয়েছে নাকি? ওই বুদ্ধদেব নামে লোকটা না পারে গল্প অ্যাডপ্ট করতে আর না পারে ডায়ালগ লিখতে কোন। আরে ভাই, লোকটা ফাইনালি রিটায়ার করবে কবে?

আরও পড়ুন:  সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ত্রী মন্নতার ছোট পোশাক পরা ছবি দেখে ক্ষুব্ধ সঞ্জয় দত্ত

কিন্তু আমার কেন এই কথাগুলো মনে না এসে মনে পুরো অন্য কথা এলো? কেন মনে হল এটা আসলে এক শিল্পীর চরম একটা সমালোচনা বলে? সেইটে জানতে চাইলে ফ্ল্যাশ ব্যাক করে পিছিয়ে চলুন চৌত্রিশ বছর আগে।

তাহলে এক শিল্পীর গোপন এক কলঙ্ক-কথা দেখতে পাবেন আপনি। আর ঠিক ধরেছেন, সেই শিল্পী আবার আর কেউ নন, এই বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-ই স্বয়ং!

সেই শিল্পী, নিজের লক্ষ্য পূরণে যিনি করতে পারেন সব!

জানেন কি না, জানি না। বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালকের প্রথম হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পেছনে আজকের এই বুদ্ধদেবেরও ভূমিকা ছিল কিছু। বানিয়ে বানিয়ে লিখছি না আমি এসব। খুলুন প্লিজ বিজয়া রায়ের লেখা সেই বহু-আলোচিত ‘আমাদের কথা’ বই।

পৃষ্ঠা ৪৫৫। সত্যজিতের স্ত্রী সেখানে কী লিখছেন, দেখুন!

‘ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে ফেলোশিপ নেবার আমন্ত্রণ এসেছে মানিকের কয়েকদিন আগে।… ওঁর যাবার কথা ৩ অক্টোবর (১৯৮৩)। সোমবার। এবার যা হল তা ভাগ্যের পরিহাস ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

আমাদের কথা

শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ওঁকে ফোন করে জানালেন যে, ওঁদের বিশেষ দরকারে ওঁর একটা ইন্টারভিউ ওঁরা নিতে চান। মানিক বললেন যে, ওঁর যাবার আগে কিছু কাজ সারার আছে, কাজেই পনের মিনিটের বেশি সময় দিতে পারবেন না। ওরা তাতেই রাজি হয়ে গেল।

শনিবার সকাল দশটা নাগাদ পরিচালক বুদ্ধদেব এবং ওরা এসে গেল। সঙ্গে, যিনি ওঁকে প্রশ্ন করবেন তিনিও।

দশটা থেকে চারিদিক ঘর বন্ধ করে, পাখা না চালিয়ে কড়া আলোয় ওঁর ইন্টারভিউ আরম্ভ হল। প্রথমে আমি ঘরে যাই নি। এক ঘণ্টা হবার পর একবার উঁকি মারলাম। দেখলাম তখনও সমানে প্রশ্ন-উত্তর চলেছে। মাঝে ঘেমে নেয়ে অস্থির হয়ে আর না পেরে উনি বুদ্ধদেবকে বললেন (পরে ওঁর কাছে শুনেছিলাম), “তুমি এতদিন পরিচালকের কাজ করছ, কিন্তু এখন যে কেউ ডিরেক্ট লাইট দেয় না, সব রিফ্লেক্টেড লাইট ব্যবহার করে, তাও জানো না? দেখছ না আমি কী রকম ঘামছি?” তারপর থেকে অবশ্য মানিকের কথা অনুযায়ী রিফ্লেক্টেড লাইটই ব্যবহার করেছিল। কিন্তু উনি যখন ঘরে ফিরে এলেন তখন এত ঘামছিলেন যে, আমি একটু ভয়ই পেয়ে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল। এত দেরি কেন?” বললেন, “আর বোলো না, পনেরো মিনিটের নাম করে তিন ঘণ্টা নিল। কোনও মানে হয়! তারপর এই গরমের মধ্যে পাখা, দরজা জানালা বন্ধ করে। এত ঘেমে গেছি, আবার চান করতে হবে। তারপর খেয়ে বের হব।” কয়েকটা কেনাকাটা বাকি ছিল, তাই।

চান করে, খেয়ে উনি বের হলেন। ওরা কিন্তু তখনও কাজ করছে। খাতা, বইপত্রর শুটিং চলছিল।

…ঘণ্টাখানেক বাদে ফোন এল – ভীষ্মর গলা – বললেন, “এক্ষুনি গোপার বাড়ি চলে এসো, মানিকের শরীর ভাল নয়।” … দশ মিনিটের মধ্যে গোপার বাড়ি পৌঁছে গেলাম।… ভীষ্ম এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে বললেন, “মানিকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। ওকে শুইয়ে ঘুমের ওষুধ দিয়েছি।… বেলভিউ নার্সিংহোমে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বলেছি। ওকে যত শিগগির সম্ভব নার্সিং হোমে নিয়ে যেতে হবে। বাড়িতে চিকিৎসা চলবে না।…”  

ভয়ে আমার বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল। মানিকের হার্ট অ্যাটাক – এ তো আমি কল্পনাও করতে পারি নি।…

ওঁকে তো সোজা আই. সি. ইউ.তে নিয়ে যাওয়া হল।… রাত বারোটা অবধি আমরা নার্সিং হোম-এ বসে রইলাম। শেষে ডা. বক্সী বললেন যে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আরেকটা অ্যাটাক হলেও হতে পারে।… বেলভিউতে দু-তিন জনকে গাড়ি নিয়ে নিচে থাকতে হবে। কখন কী দরকার হয় বলা যায় না।

বারোটার পর বাড়ি ফিরে দেখি ল্যান্ডিং-এ তীব্র আলো জ্বালিয়ে তখনও শুটিং চলছে। মানিকের খাতাপত্র বার করে কাজ হচ্ছে। দেখে সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। যাদের জন্য এই সর্বনাশ হল, তাদের কোনও তাপ-উত্তাপ দেখলাম না। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই বাঁ দিকে মানিকের ঘরের দরজা খোলা ছিল। বুদ্ধদেব এসে জিজ্ঞেস করল, “মানিকদা কেমন আছেন?” জিজ্ঞেস করতে হয় বলে করল, আমিও কোনও রকমে ‘ভাল না’ বলেই মানিকের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে গেলাম।’

আরও পড়ুন:  জন্মদিনেই বা তার পরের দিন তিনি হয়ে উঠলেন ঘাতক...গর্জে উঠল পিস্তল...উচিত শাস্তি বিশ্বাসঘাতক সহযোদ্ধাকে

বিজয়া রায় যা যা লিখেছিলেন, হুবহু এখানে তুলে দিলাম পুরোটাই। এতটা পড়ে, কী মনে হল, বলুন?

রাজাবাহাদুরের ভূমিকায় সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়কে যেন নিজের প্রতিরূপ ভেবেই বেছে নিয়েছিলেন পরিচালক

‘টোপ’ সিনেমার রাজাবাহাদুর শঙ্কর সিং দেও-কে (অভিনয়ে সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়) যত দেখছি, তত মনে হচ্ছিল, ওটা যেন স্বয়ং পরিচালক দাশগুপ্তের নিজের প্রতিরূপ বলে। মনে হচ্ছিল বাহাত্তর বছর বয়সে পৌঁছে একটা লোক যখন ছবি বানিয়ে যেতে পারে একের পর এক, তখন তার মধ্যে অদ্ভুত কেয়ার-ফ্রি সাহসও এসে যায় একটা। যে, অনেক হল, এবার সমালোচনায় বিদ্ধ করি নিজেকেও। ভাল-খারাপ মিশিয়েই তো একটা মানুষ হয়। ভালটা তো দুনিয়ার লোকে জানে। এবার খারাপ সেঁচেও মণিকণা তুলে সিনেমা বানানো যাক।

তাই আর যে যেভাবে এই সিনেমার ব্যাখ্যা করতে চাক, করুক। আমার কাছে এই সিনেমা যেন খুঁড়ে খুঁড়ে দেখিয়ে দেওয়া সো-কল্‌ড এক শিল্পী লোকের পাস্ট, আর তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারগুলো।

ফেলে আসা দূর-জীবনে লুকনো কিছু অন্ধকার তো পোলানস্কিরও আছে। বার্তোলুচিরও আছে। চর্চা না হয় হলোই তা নিয়ে, কী এসে যায় তাতে? আলো এবং আঁধার, দুই মিলিয়েই তো পূর্ণ একটা লোক!

আর নিজের জীবন মন্থন করে সিনেমা তো ঋত্বিক থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণ অবধি, বানিয়ে গেছেন সবাই!

এখানেও কতকটা যেন তেমন কিছুই হল!

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের লিখে যাওয়া গল্পটাকে প্রায় তছনছ করে নিজের মতো নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছেন তিনি। মূল গল্পটায় বলার মতো নারী চরিত্র তো ছিলই না কেউ তেমন। এখানে চার-চারজন নারীর ওপরেই গোটা গল্পের ভর।

স্ত্রী সোহিনী আর পাওলি দামের সঙ্গে শুটিংয়ে মগ্ন পরিচালক

এঁদের মধ্যে একজন হলেন, বানজারা এক নারী (অভিনয়ে পাওলি দাম), মেয়েকে দিয়ে মাদারির খেল দেখিয়ে আয় করাটা যাঁর পেশা। আরেকজনের পরিচয় হল, ডকুমেন্টারি ফিল্ম ডিরেক্টর নীলা (মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায়), সারান্ডার জঙ্গলে যে হাজির হয়েছে শুটিং করবে বলে। আর এরপর আছে, রাজামশাইয়ের যুবতী স্ত্রী কিংবা সঙ্গিনী সেই রেখা (অনন্যা চট্টোপাধ্যায়), যাঁর শরীর জুড়ে সেক্স হাঙ্গার চাপা। আর সবার ওপরে আছে বানজারা কিশোরী সেই মুন্নি (অভিনয়ে কাজল নামে সত্যি এক যাযাবর-কন্যা), যাকে শেষ অবধি সত্যি সত্যি রাজামশাইয়ের শিকার খেলার ‘টোপ’ হয়ে উঠতে হয়।

মূল ছোটগল্পটায় তো কথক নিজে আর সেই রাজামশাই ছাড়া খুব একটা বিশেষ কেউ নেই। চারপাশের এই সমাজ আর সামাজিক সব সিস্টেম নিয়ে কী চাপা শ্লেষ সেখানে, বাবা!

এত যুগ পরে সেখান থেকে সিনেমা করতে গিয়ে বুদ্ধদেব ওই গল্পটাতেই জুড়ে দিলেন আরও অজস্র সব ভাঁজ। যত বেশি পরত খুলে ঢুকতে যাবেন ওতে, তত যেন আগুন এসে ছ্যাঁকা দিয়ে যাবে গায়ে।

যেমন ধরুন সুতীব্র যৌন খিদের আঁচ! রাজামশাইয়ের বয়স হয়েছে, কম বয়সী বৌয়ের খিদে মিটিয়ে উঠতে পারেন কখনও, পাগল? এদিকে শরীরের খিদে চাপতে চাপতে রেখা’র তো প্রায় পাগল হওয়ার দশা। প্রায় পোড়ো আর ফাটা দেওয়ালের রাজবাড়িটার একটা ঘরের এক কোণে বসে পুরুষ্টু সব কলা খেয়ে যায় সে। রাজামশাই হাঁক পাড়লেও সাড়া দেওয়ার দরকার নেই তার। আর এরপর রাজামশাই নিজেই যখন তার ঘর অবধি হেঁটে আসবেন ক্রোধে? রাগে স্ফুরিত নয়নে বলেই যখন বসেন যে, ‘সমানে কলা খাচ্ছে আর কলাগাছের মতো গতর করছে… শালী ধামসি!’

কী হয় তখন, জানেন?

রাজামশাইয়ের ঘরে অতৃপ্ত নারী রেখা

‘তোকে আমি কী করতে পারি জানিস?’ সক্রোধে বলা এই কথার জবাবে এমন খিলখিলিয়ে হাসবে তখন রেখা, যে মনে হবে যেন ভেঙে গেল একশো কাচের চুড়ি। আর বোঝার মন থাকলে ওই হাসিটা থেকেই বুঝতে পারবেন যে, রাজামশাইয়ের গুমোর থাকুক যতই, সত্যি সত্যি বিশেষ কিছু ‘করা’র কোন ক্ষমতা নেই আর!

সময় সময় কি এই রেখাই এখন পাশের ওই দীঘির মধ্যে মৎস্যকন্যা হয়? নিশুত রাতে সেই দীঘির থেকে তাঁর জন্যে নতুন কোন পুরুষ আসে উঠে? কিংবা শহর থেকে চকচকে আর ডাঁশা ওই নীলা নামের যে মেয়েটা ফিল্ম বানাতে এলো। হঠাৎ করে তার কাছে গিয়ে কোন বিপন্নতায় রাজামশাই বলে, যে এই দুনিয়ায় বাঘই নয় শুধু, তিনি নিজেও এখন এনডেঞ্জার্‌ড স্পিসিস!

আরও পড়ুন:  নিন্দার ঝড় উঠলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় নগ্ন ছবি পোস্ট করায় লজ্জিত নন কাল্কি

গল্পের ভাঁজ যে তীব্র কত, সেটা আরও বুঝবেন, যখন দেখতে পাবেন, এই গল্পটার সঙ্গে বুদ্ধদেব পাঞ্চ করে দিচ্ছেন গজা (অভিনয়ে চন্দন রায় সান্যাল) নামে ঈষৎ খ্যাপাটে এক পোস্টম্যানেরও স্টোরি! বাড়ি বাড়ি চিঠি পোস্ট না করে সে সব চিঠিগুলো নিয়ে উঠে বসে থাকে গাছে। আর তারপর সেই গাছ ভর্তি বাঁদরগুলোকে পড়ে শোনাতে থাকে তার ব্যাগের যত চিঠি!

আপনার করা ‘ফেরা’ (১৯৮৮) ছবিটা আমি ভুলি নি এখনও স্যর! সেখানে বৌ রেপ্‌ড হয়ে যাওয়ার শক নিতে না পেরে সারা দিনরাত গাছের মগডালে চড়ে কাটিয়ে দিত রাসু। আর সেই ‘তাহাদের কথা’ (১৯৯২) ছবি? মানুষের চেয়ে অনেক বেশি শান্তি পেত শিবনাথ গাছেদের কাছে এসে। এই ছবির গজা যেন সেই শিবনাথ বা রাসু’র খুব কাছের কোন লোক! গাছের বাঁদরগুলোর মধ্যে থেকেই একজনকে নিজের নতুন বিয়ে করা বৌ বলে দাবি করে বসে গজা। গজা কি পুরো পাগল হয়ে গেল? নাকি, বিয়ের সিস্টেমটাকে ধরে গজা চুবিয়ে দিল শ্লেষের চৌবাচ্চাতে! না হলে ওই চিঠিগুলো থেকে বেছে বেছে বৌ পালানোর চিঠিগুলোই পড়বে কেন ও, বলুন?

গাছ থেকে নেমে পোস্টম্যান গজা চড়ে বসলো রাজামশাইয়ের জিপে

একটা সময় প্রায় গোটা গ্রামের লোকে সেই গাছের নিচে জড়ো হয়ে যায় এসে। আর গজার মানুষ-বৌটি এসে তো অকথ্য সব খিস্তি দিতে থাকে। আচ্ছা, ওর শরীরেও কি তখন যৌন-তাপ না জুড়োতে পারার ক্রোধ? আর ওই গজা কি তখন এই ধরণের খিদে-টিদের ঊর্ধ্বে?

সিনগুলো একেকটা সব অন্তর্ঘাতের মতো!

এর একটু পরে গাছ থেকে গজাকে সেই আসতেই হয় নেমে। যদিও সেটা অন্য কারণে ঘটে। নামার পর গজাকে ছুটতে হয় অন্য গাছের খোঁজে। আর সবকটা বাঁদরও তখন দৌড় লাগায় ঠিক ওরই পিছু পিছু! গজাকে ছাড়া ওই গাছে আর থাকবে কী করে ওরা?

সিনটা দেখে দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসে যেন। পশুদের নিয়ে এমন শুটিং তো ইয়ার্কি নয়, ভাই! ছোট্ট একটা কুকুর লাফ মেরে অপু-দুর্গার পিছু নেবে, শুধু এই সিনটা শুট করতে গিয়ে নিজের প্রথম ছবিতে হিমশিম খেয়ে গেছিলেন মানিকবাবু নিজেও। ‘একেই বলে শুটিং’ বইতে সেই অভিজ্ঞতা বিস্তারিত লেখা। আর এখানে এই সিনটায় এতগুলো বাঁদর কি সত্যি সত্যি আপনার দরকার মতো দৌড়ে এলো, স্যর?

নাকি পুরো সিনটাই গ্রাফিক্স দিয়ে সারা?

পুতুল হাতে কাশবনে সত্যিকারের যাযাবরী মেয়ে কাজল… ছবিতে তার নাম হয়েছে মুন্নি। আর একটু পরেই বাঘের মুখের ‘টোপ’ হয়ে যাবে ও।

‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’-এ (২০০২) খুদে একটা বেড়ালের জার্নি দেখাতে গিয়ে কম-বেশি গ্রাফিক্স আপনি ইউজ করেছিলেন, জানি। কিন্তু ছোট্ট সেই শটের সঙ্গে এখানের এই দৌড় শটের তুলনা? এতটা গ্রাফিক্স করতে গেলে তো এখন বিশাল টাকার খরচ? নাকি এটা সত্যি সত্যি রিয়্যাল লাইফ শুট? যদি ওই বুনো বাঁদরগুলো সত্যি হয়ে থাকে, যদি ওদের ওই মরিয়া দৌড় সত্যি হয়ে থাকে, যদি সত্যি ওদের সামনে ক্যামেরা বসিয়ে পিওর সিনেমা শুট করে থাকেন আপনি, তাহলে আপনাকে আমার একটা প্রণাম রইলো দাদা!

কারণ, বাংলায় পিওর সিনেমা যে মরতে বসেছে প্রায়! সিনেমার স্ক্রিনে কবিতা কিংবা পবিত্র ক্রোধ কেউ মিশিয়ে দ্যায় না আর। দীঘির জলের তলায় ক্যামেরা থাকবে, আর সেই জলের মধ্যে রাজসিংহাসন আছড়ে পড়ার আন্ডারওয়াটার শটগুলো দেখে আমরা বুঝবো ঝড় এসে সব পুরনো গুমোর চুরমার করে দিল, এই ইমেজারি আপনি ছাড়া বাংলা ছবিতে আনার দমই বা রয়েছে কার?

হ্যাঁ, আমার কাছে এই ‘টোপ’ তাই মোক্ষম এক মাইল-ফলক যেন। বইয়ের পাতায় লেখা গল্পে কিছুটা নিজের জীবন কিছুটা সবার জীবন মিশিয়ে দিয়ে আশ্চর্য এক শিল্প-সৃজন প্যাটার্ন!

‘টোপ’ রিলিজ করেছিল হাতে গোনা তিন-চারটে হল-এ, সব মিলিয়ে বোধহয় দিনে গোটা পাঁচেক শো। এখন সেকেন্ড উইক চলছে। বাকি সব হল থেকে সাফ হয়ে গিয়ে ছবিটা এখন বেহালার মোটে একটা হল –‘পুষ্পশ্রী’তে আছে।

ভাবছি, বিস্ফোরক এমন একটা ছবির জন্যে ঠিক এই অবহেলাটা প্রাপ্য ছিল কিনা!

3 COMMENTS

  1. গোটা তিরিসেক সহ দর্শক এর সঙ্গে বসে এক PVR এ দেখেছিলাম সিনেমা টা ।বেরোনোর সময় যা যা মন্তব্য কানে আসছিল তাতে পরিষ্কার হোয়ে গেছিলো বাঙ্গালি এক সবজান্তা আঁতেল গোষ্ঠী ।এদের Film Sense কোনদিন তৈরি হবার নয় । আমার কাছেও যা যা অস্পষ্টতা ছিল, তা কেটে গেলো ।এক অসাধারণ সিনেমার এক অসাধারণ রিভিউ।ধন্যবাদ!