বাংলালাইভ রেটিং -

কর্পোরেট অফিসে চাকরি করে মেয়েটা, দেখতে বেশ ভালো। বয়স হবে ত্রিশের কোঠার শেষের দিকে প্রায়। সেদিন দেখি, গুনগুন ক’রে বিলাপ করছে বসে। ‘আরে আগে থেকে বুঝবো কী করে বল্‌? এই সেক্স বিয়ে এইসব ব্যাপার তো আসলে একটা ট্র্যাপের মত, না? একটা বয়সে তো খুব এগুলো ইচ্ছে করতো করতে। সবার যেমন হয়। সবাই করছে, আমি করবো না, বল্‌? লোভে পড়ে বিয়ে-ফিয়ে সেরে নিলাম ঝটাঝট। এখন বাচ্চা হয়ে গেছে, ছোট বাচ্চা, খুব ন্যাগিং, সেটার কথা যত ভাবি, পাগল-পাগল লাগে। আমার বাকি জীবনটা কি এখন থেকে শুধু ওটাকে মানুষ করতে যাবে? জীবনে কত কিছুর শখ ছিল রে, সব ফেলে রেখে এখন কর্পোরেটে গম পেষাই হও, আর বাড়ি ফিরে বাচ্চা পালতে থাকো! হ্যাঁ, ঠিক বলছি – বিয়ে, সেক্স এগুলো তো সব আসলে এক একটা ট্র্যাপ! আগে বুঝতে পারতাম না, এখন বুঝতে পারি ক্লিয়ার। তবে বুঝে কী হবে, আমি নিজেই তো আটকেছি সেই ট্র্যাপে!’

যাকে বলছিল কথাগুলো, সে ততক্ষণে মুচকি মুচকি হাসছে। কিন্তু এদিকে ওই মেয়েটার চোখে তখন প্রায় জল এসে যায় বলে!

কাট টু আসুন ‘ট্র্যাপড’ ছবিতে সোজা।

ছবির শুরুতে নুরি নামের সেই মেয়েটা (অভিনয়ে গীতাঞ্জলী থাপা) তার বয়ফ্রেন্ড কাম কলিগ শৌরিয়াকে (রাজকুমার রাও) প্রায় প্রচ্ছন্ন একটা হুমকি দেওয়ার স্টাইলে বলছে, আর কি বলো, আমার কিন্তু বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এবার, ‘দো মাহিনে মে শাদি হ্যায় মেরি’, অমনি যেন চকিতে আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি আগের প্যারাগ্রাফে লিখে আসা ওই মেয়েটার মুখ। মনে হচ্ছে, আবার যেন বিয়ে কিংবা সেক্স করার ব্যাপারটাকে গাজর করে ঝুলিয়ে রেখে কাউকে একটা ট্র্যাপে ফ্যালার ছক। ফারাক বলতে সেবার ওই মেয়েটা গিয়ে ফেঁসেছিল, আর এবার এই ছেলেটা, মানে শৌরিয়ার পালা।

ডিরেক্টর বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে নিজেও একদম এই লাইনেই কিছু একটা ভেবে থাকবেন বোধহয়। কারণ নুরি ওই কথাটা বলার পরেই ব্ল্যাক স্ক্রিনের ওপর সাদা হরফে প্রায় একটা দৈব কমেন্টারির ঢংয়ে তিনি জুড়ে দিয়েছেন ছবির টাইটেলখানা – ‘ট্র্যাপড’। অবশ্য চাইলে এটা মামুলিভাবে নিছক ছবির নাম দেখানো হচ্ছে বলেও ভাবতে পারেন আপনি। কিম্বা এইভাবেও ইন্টারপ্রেট করতে পারেন যে, মেয়েটার মুখে যেই কথাটা উচ্চারিত হল, অমনি ছেলেটার ‘ট্র্যাপড’ হওয়ারও শুরু! আর তাই টাইটেল দিয়ে সেই সেটাকেই আলাদা করে দাগিয়ে দেওয়া হল!

মেট্রো শহরে খান তিনেক ছেলের সঙ্গে একটা ফ্ল্যাটে মেস বানিয়ে থাকে। চাকরি বলতে বারোয়ারি কল সেন্টারে জব। বিয়ে করে বৌকে ছেলে তুলবে কোথায় এনে? ঠিক এই জায়গাটাতেই জমিয়ে চাপ দ্যায় সেই নুরি। ‘হয় আলাদা ফ্ল্যাট দ্যাখো, নইলে আমার আশা ছাড়ো।’ সিমপ্যাথি বা কমপ্যাশনের বালাই নেই কো কোন। ওয়েট করবে আর কিছু দিন প্লিজ? কী বলছেন, পাগল নাকি দাদা!

নুরির সঙ্গে এই ফ্ল্যাট কেনার ব্যাপার নিয়ে শৌরিয়ার যে ডিলিংসগুলো চলে, তাতে মনে হয় এটা বিলকুল কোন ক্লায়েন্ট মিটিং যেন! যে বেশি দর পারবে দিতে, শ্রীমতী নুরি তার। আর নুরির দিক থেকে ভাবতে গেলে সেটা তো অন্যায্যও না কিছু। নুরি যা জিনিষ, মাখো-মাখো সেক্সি একটা মেয়ে, কমপিটিশনের হার্ড বাজারে এমন একটা মেয়ের সঙ্গে ফ্ল্যাট হতে গেলে নিজের একটা ফ্ল্যাট না থাকলে চলে?

এই মেয়েটিকে পাওয়ার জন্যেই ক্ষেপে উঠেছিল শৌরিয়া

নুরি যখন এইভাবে নিজের দাম চড়িয়ে দিচ্ছে ক্রমে, তখন থেকেই শৌরিয়ার হাঁকপাঁকানি, ছটফট করা, পাগল-পাগল ভাব। ক্রমে ক্রমে চিন্তাশক্তি ফেল মেরে গেল ওর! বাজারের সেরা জিনিষ ফসকে যাচ্ছে, বুঝতে পারার পর যেটা হয় ঠিক!

আরও পড়ুন:  ডিভোর্সের এক বছর যেতে না যেতেই ফের বিয়ে করে ফেললেন করিশ্মার প্রাক্তন স্বামী

বুঝতে পারছি তখন যে করে হোক ওর একটা ফ্ল্যাট চাই ভাই ফ্ল্যাট। একদৃষ্টে তখন ওর মুখটা দেখছি আমি। সত্যি, সেক্স করার জৈব টানে কি খুনখারাপি জোর!

কিন্তু গোড়ায় হেডলাইনেই লিখে দিয়েছি যেটা। বা ফার্স্ট প্যারাগ্রাফে সেই মেয়ের বিলাপে বারবার করে বলে দেওয়া আছে যেটা। সেক্স কিংবা বিয়ের জন্যে শরীরের ভেতর থেকে আকুল-আকুল টান আসবে ঠিকই, কিন্তু সেটার জন্যে হঠাৎ করে মাথা-টাথা যেন খারাপ করো না প্লিজ। মনে রেখো, সেটার থেকেই কিন্তু তোমার সর্বনাশের শুরু!

ঠিক যেমন শৌরিয়া নামে ওই ছেলেটার হল! মেয়েটা তো তার দর হেঁকে দিয়েই খালাস, ছেলেটার হাতে তো এদিকে বলতে গেলে ফুটো পয়সাও নেই! করবে কী ব্যাটা তবে? মাস পুরোনোর আগে তো নতুন করে টাকা আসারও চান্স নেই আর কোন। ফ্ল্যাটের খোঁজে ওর তখন বলতে গেলে প্রায় ভিখিরি-ভিখিরি দশা। আর বাকি দুনিয়াও হয়েছে ঠিক তেমন। হাতে ক্যাশ-ট্যাশ কিছু নেই শুনলেই হ্যাট হ্যাট করে ভাগিয়ে দিচ্ছে ওকে।

রক্ষাকর্তা হয়ে শেষে একটা দালাল এলো। ওকে হদিশ দিল আনকোরা নতুন একটা ফ্ল্যাটের। মাল্টিস্টোরিড এক বিল্ডিংয়ে প্রায় একেবারে ওপর তলার ফ্ল্যাট। তবে গোটা বিল্ডিংয়ে নাকি আর একটা ফ্ল্যাটেও জনমানুষ নেই! থাকার মধ্যে একেবারে সেই গ্রাউন্ড ফ্লোরে বুড়ো একটা ওয়াচম্যান আছে মোটে।

বেশ চলছিল এই অবধি, এবার কিন্তু প্লটে একটা ধাক্কা লাগলো এসে। মনে হল, গল্পের এই জায়গাটা যেন বড্ড বেশি পলকা! মেয়েটাকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে ওই শৌরিয়ার মগজ কি তাহলে এক্কেবারেই অচল? না হলে এমন একটা ত্রিশ-চল্লিশতলার ফাঁকা বিল্ডিংয়ে একলা থাকতে গিয়ে ন্যাচারাল যে রিয়্যাকশনগুলো আসে, সেগুলোর একটাও ওর মধ্যে কোথাও দ্যাখা গেল না কেন?

ওর একবারও মনে হল না যে একবার কথা বলে আসি নিচের সেই ওয়াচম্যানের সঙ্গে? যে ভাই, ডেলি পাম্প চালানোর আর জল আসবার বন্দোবস্ত কেমন? ওর একবারও মনে হল না এটা, যে পাওয়ার অফ হওয়ার পরে আদৌ মনে করে কেউ জেনারেটরটা অন করে তো ভাই?

একলা ফ্ল্যাটে বন্দী হয়ে রবিনসন ক্রুসোর মতো যুদ্ধ

রাক্ষসের মতো বিশাল পুরীতে একলা থাকার নামে এই কথাগুলোই তো প্রথম দফায় মনে আসার কথা। আর এ তো একেবারে নভিস ছেলে না, যে এসব কিছু বুঝতে শেখে নি আদৌ! অ্যাদ্দিন মেট্রো সিটির শেয়ার্‌ড ফ্ল্যাটে থাকতে থাকতে এসব আদব তো তার রপ্ত হওয়ারই কথা!

নাকি শাদি আর সেক্স আর মাখন একটা বডির স্বপ্ন এসে সব এমন করে ঘুলিয়ে দিল যে, এসব কিছু তলিয়ে ভাবার ক্ষমতা আদৌ ওই ছেলেটার নেই? আর তাই নতুন ফার্নিশ্‌ড ফ্ল্যাটে ঢুকে ও চেক করলো না কিছু, দ্যাখা করলো না ওয়াচম্যানের সঙ্গে, নিজে জাস্ট আয়েস করে লম্বা হয়ে গেল!

সিনেমার গলতি বলতে যেটা, সেটা এই প্লটের ঠিক এইখানেতেই আছে।

আচ্ছা ও না হয় নিজের থেকে ওয়াচম্যানের সঙ্গে কথা বলতে যায় নি কোন। কিন্তু ওকেও কি যাওয়া-আসার সময় সেই ওয়াচম্যানের নজরে পড়ে নি মোটে? ছবির পরের দিকে দেখছি সেই ওয়াচম্যান তো সদর দোরে দিবারাত্রই থাকে! আর ভদ্রলোককে বলতে শুনি নিজের মুখে যে এই গোটা বাড়িতে উনি ছাড়া নাকি আর একটা লোকও নেই!

সেই গার্ড লোকটার চোখ এড়িয়ে শৌরিয়া এন্ট্রি নিলোটা কী করে, ভাই? তর্কের খাতিরে যদি ধরি, সেই দিন সেই গার্ড লোকটার ছুটি। শুনশান বাড়ি তো তাহলে বন্ধ থাকার কথা!

হিসেব মিলছে না যে মোটে!

যেন খাঁচায় বন্দী পশু… আমরা সবাই আসলে ট্র্যাপ্‌ড

আরেকটা কথা বলুন, যে বিল্ডিংয়ে জনমনিষ্যিই নেই, সেখানে এই একটা লোকের জন্যে আলাদা করে মেন স্যুইচ অন ক’রে দিয়ে লিফট চালালো কে? আর কেউ লিফট না চালালে ওই শৌরিয়া তার তিরিশ তলার ফ্ল্যাটে এসে উঠলো কী করে দাদা?

আরও পড়ুন:  অবৈধ সন্তান আছে আমির খানের!?

গলতির এই জায়গাগুলো ঢাকার জন্য জায়গায় জায়গায় ছবির চলন বলুন, এডিট বলুন, মারকাটারি স্মার্ট। একলা একটা লোককে নিয়ে প্রায় ঝড়ের স্পিডে রুদ্ধশ্বাস ড্রামা! সময় সময় ঘাবড়ে যাবেন এমন, যে দেখতে পাবেন, তলিয়ে কোন লজিক ভাবার সময় অবধি নেই!

অত বড় ফাঁকা বাড়িটায় প্রথম রাতটা ঠিকঠাকই গেল কেটে। যত গেরো বাঁধল সব পরের সকাল থেকে।

টিপটপ সব সাজানো আছে বটে। কিন্তু বাথরুমে তো জল নেই এক ফোঁটা! অগত্যা বোতলে পোরা খাওয়ার জলেই ব্রাশ সেরে নিল ও। টয়লেট করলো কী ভাবে, সেটা অবশ্য এই ছবিতে বিশদে কিছু নেই।

হুড়োতাড়া করে এরপরেই অফিস বেরতে যাওয়ার সিন। আর সেই জলদিবাজির ঠ্যালায় ওকে ঘরের ভেতর রেখেই বাইরে থেকে লক হয়ে গেল সেই নতুন ফ্ল্যাটের দরজা।

দরজার চাবি তখন সেই দরজার বাইরের দিকে ঝুলে!

এখান থেকেই খাতায় কলমে ‘ট্র্যাপড’ নাটকের শুরু। দরজার ওই লক কি আর ধাক্কিয়ে খোলা যায়? তাই ও ওটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো সাঁড়াশি হাতে নিয়ে! স্ক্রিনে যখন এসব হচ্ছে, তখন আমি ভাবছি এগুলো না করে সোজা তোমার সেই মেয়েটাকে ফোন করে হেল্প চাইছ না কেন ভাই?

সেই যার জন্য এই নতুন ফ্ল্যাটের হ্যাঙ্গাম নিলে তুমি?

মুশকিল হল, ফোনেও তো ওর আর চার্জ দেওয়া নেই পুরো! ফোনে কানেক্ট করার চেষ্টা করলো বোধহয় কোন একটা এজেন্সির সঙ্গে। যারা নাকি ওকে দেবে তালা খুলে দেওয়ার অন্য একটা এজেন্সি বা লোকপত্রের খোঁজ। কিন্তু এত কিছু হওয়ার আগেই ফোনের আবার চার্জ চলে গেল পুরো!

ফোনটা চার্জে বসিয়ে এবার ঘরের এসি-টাকেও অন করে দিল ও। আর কাণ্ড দেখুন, সেটার ডানাও একটু খুলেই আস্তে আস্তে গুটিয়ে গেল ফের!

কারণ এবার কারেন্টটাও বিদায় নিল যে! বাকি ছবিটায় এই কারেন্ট আর ফেরত আসবে না আদৌ। এখন, সিকোয়েন্স হিসেবে এই মুহূর্তটা বুকের মধ্যে কেমন যেন হিম ধরিয়ে দ্যায়! কিন্তু ওই যে আগেই লিখেছি, মাথা খাটিয়ে ভাবতে গেলে এটা কিছুতেই বুঝতে পারি না, বেছে বেছে এই সকালবেলায় কারেন্ট অফ হয়ে গেল কেন? বহুতলের এই নিঝুম পুরীর এত উপর তলার টুকরো ফ্ল্যাট তো গত রাতেও কারেন্ট-শূন্য হয়েই থাকার কথা!

আরও অনেক প্রশ্ন আছে দাদা! যে বহুতলের কোন ফ্ল্যাটেই একটা লোকও নেই, সেখানে হঠাৎ করে রোজ সকালবেলা কিছুক্ষণ রান্নাঘরের কলে অমন জল এসে যায় কেন? ত্রিশ তলার ওপরে কি এটা টাইম কলের জল? যখন ওই সিনটা হচ্ছে, আমার জাস্ট ফিলিং হচ্ছে এইরকম যে একতলা থেকে কেউ যেন পাম্প চালিয়ে দিয়েছে হঠাৎ। আর তাই ছাদের ট্যাঙ্কে জল এসে গেছে ফ্লো-তে। রান্নাঘরের কল থেকে জল বন্ধ হল মানে সেই ছাদের ট্যাঙ্কে জল-টল সব ফুরিয়ে গেল এবার।

কিন্তু যে বাড়িতে কেউ থাকেই না মোটে, সেই বাড়িতে একতলা থেকে পাম্প ছেড়ে দিয়ে দূর সেই গগনতলে ছাদের ট্যাঙ্ক ভর্তি করবে কে?

বা, যেমন ধরুন সেই সিনটা। ঘর থেকে কিছুতে বেরতে পারছে না বলে বিছানা আর তোষকখানা খোলা বারান্দাতে টেনে এনে আগুন ধরালো ও। যেন সেই রবিনসন ক্রুশোর মতো ব্যাপার, দূর থেকে সেই আগুন দেখে যদি কেউ এসে হেল্প-টেল্প কিছু করে। এখন লজিক দিয়ে ভাবতে গেলেই দুটো খটকা আসছে কী কী জানেন? এক, মশালের অল্প একটু শিখা থেকে বিছানার ম্যাট্রেসে এখানে যত দ্রুত আগুন ধরা দেখানো হল, আসলে কি তা সত্যি সত্যি অত তাড়াতাড়ি ধরে? এক যদি না সেই বিছানাপত্রে আগে থেকেই পেট্রল বা কেরোসিন ঢালা থাকে!

আরও পড়ুন:  হঠাৎ দেখা প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকা বিপাশা ও রাণা দগ্গুবতীর‚ কী হলো তারপর?
ত্রিশ তলার বারান্দায় পোড়া অন্তর্বাস ঝুলিয়ে রেখে কি আর সাহায্যের বার্তা পাঠানো যায়

আর পরের খটকা তো আরও মোক্ষম ভাই! এই আগুন লাগানোর সিন দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, তুই যদি আগুনই লাগাস দোস্ত, তবে সেটা শোয়ার গদিতে না লাগিয়ে ঘরের সেই লক হয়ে যাওয়া সদর দরজায় লাগাচ্ছিস না কেন ভাই? দরজার কাঠ কিছুটা অন্তত পোড়াতে পারলে তারপর সেটা ধ্বসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসা এমন আর কী কথা!

কিন্তু ওই যে বললাম! সিনেমাটা এনজয় করতে হলে এসব কোশ্চেন সব বাড়িতে রাখুন, স্যর! ওসব যুক্তি মেপে হিসেব করতে গেলে তো এ ছবির মজা নেওয়ার ধুমকিই কেটে যাবে!

গুলতিতে টিপ কি এত ভালো যে একটা পায়রাও ফস্কায় না

তখন আপনার মনে হবে যে একবার হিসেব করে দেখি তো দরজা বন্ধ ঘরের মধ্যে ঠিক ক’দিন না খেয়ে-দেয়ে থাকতে হল লোকটাকে। তারপরেও লোকটা কাজে-কম্মে এতটা দম পাচ্ছে কী করে? কিংবা মনে হবে, বারান্দায় পায়রা এসে বসলেই গুলতির অব্যর্থ টিপে সেটাকে কাত করে দেওয়া কি ইয়ার্কির কথা নাকি? যদি ছুঁড়ে দেওয়া অস্ত্র সেই পায়রার গায়ে গিয়ে লাগেও বা কোনমতে! তার চোটেই সেই পায়রা তক্ষুনি অক্কা পাবে নাকি? কিন্তু ওভাবে পায়রাগুলোকে অক্কা পেতে না দ্যাখালে ও সেগুলোকে কেটে-কুটে ঝলসে পুড়িয়ে খাচ্ছে, এই সিনটাই বা হবে কী করে বলুন?

ইস, এই সিনগুলো আরও একটু লজিক্যাল হত যদি!

এর মধ্যেও কিছু কিছু দৃশ্য দেখে দম বন্ধ হয় যেন। যেমন জানলার গ্রিলে পা রেখে রেখে ওর একটু একটু করে সেই নিচে নামার সিন। দিনের পর দিন আধপেটা খেয়ে থাকার পর ত্রিশ তলার ওপর থেকে এইভাবে নিচে নামার স্টান্টবাজি কেউ দ্যাখাতে পারে কিনা, সেটা তো অন্য কথা, ভায়া। এখানে যেটা বলার যে এই সিনটা চলার সময় হঠাৎ ক’রে এমন একটা মোমেন্ট আসে, যে হল-এ যে ক’জন লোক ছিল, সবাই প্রায় এক সুরে ‘আঁক’ শব্দ করে আঁতকে ওঠে তখন!

কিন্তু যে মেয়েটাকে তুলবে বলে লাট্টু হয়ে শৌরিয়ার আজ এরকম দশা, শৌরিয়াকে জীবন থেকে হঠাৎ করে ভ্যানিশ হতে দেখে সেই নুরি কী করছে তখন? এই ছবির লাস্ট সিনে সেই উত্তরটাও আছে!

প্রথম ছবি ‘উড়ান’ (২০১০) দিয়েই হাতে-কলমে নিজের সিগনেচার চিনিয়ে ছিলেন তিনি। পরের ছবি ‘লুটেরা’ (২০১৩) ছিল ‘উড়ান’ থেকে টার্ন নিয়ে ঠিক উলটো মুখে হাঁটা! আগেরটা ছিল নিষ্ঠুর সব রিয়্যালিটি দিয়ে ঘেরা। আর পরেরটা হল স্বপ্ন আর রোমান্সে মেশা মায়া।

‘ট্র্যাপ্‌ড’ হল পরিচালকের তিন নম্বর ছবি। ঠিক আগের ছবিতে যে স্বপ্নটা বুনে দিয়েছিলেন উনি, এবার এই ছবিটায় সেটাই যেন মাটিতে আছাড় মেরে ভেঙে ফেললেন জোরে।

বাঁচতে গেলে দরকারে আরশোলা আর পোকা মেরেও খেতে হবে

একেকবার মনে হচ্ছিল, বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানের পুরো ছবিটা যেন ঠিক একটা শক থেরাপির মতো। হিসি খেয়ে সারভাইভ করার সিন, নিজের হাতে বাড়ি মেরে ফেলে কিছুটা থেঁতো করে দেওয়ার সিন। ঠারে-ঠোরে বোঝানো আছে, আরশোলা আর ইঁদুর ধরে খাওয়াটাও খুব একটা আজব কিছু নয়। আর এভাবে যেন বলতে চাইছেন, আমার আগের ছবি ‘লুটেরা’ দেখে ভুল কোর না ভাই, মহানগরের জীবন এখন হিংস্র শ্বাপদ প্রায়, প্রেম ভালবাসা নিয়ে ভুল চক্করে এখানে কখনও ভিড়তে যেও না যেন।

বলতে চাইছেন, আমরা কেউ সুখী দুনিয়ায় নেই, আমরা সবাই আসলে ট্র্যাপ্‌ড!

ফিতে দিয়ে মাপতে গেলে ছবিতে হয়তো এদিক-ওদিক বেশ কিছুটা অসঙ্গতি আছে।

কিন্তু শেষ অবধি এ নির্মাতাকে সাবাশ না বলে থাকি কী করে!

NO COMMENTS