(ভাবলিখন – তন্ময় দত্তগুপ্ত)

 

ঘুরতে কার না ভালো লাগে।গত বছরই গ্রিস আর টার্কি গিয়েছিলাম।গ্রিসের এথেন্স নগরী আমার বেশ লেগেছে।এথেন্স মানেই প্রত্নতাত্ত্বিক পরিবেশ।পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্যতম এই এথেন্স।এর ঐতিহসিক গুরুত্ব বইয়ে পড়েছি।বইয়ে পড়া আর  চোখে দেখা অভিজ্ঞতার তুলনা চলে না।প্রথমেই বলতে হয় নিউ এ্যক্রোপলিস মিউজিয়ামের কথা।গ্রিক স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সৌন্দর্য এ্যাক্রোপলিসের ভেতর ও বাইরে।দেবী এ্যাথেনার ওপর নির্মিত প্রাচীন ভাস্কর্য প্রায় সকলকেই মুগ্ধ করে।প্রাচীন গ্রিক মাইথোলজি অনুযায়ী এ্যাথেনা হলেন জ্ঞান,যুদ্ধ এবং কারুশিল্পের দেবী।এই এ্যাক্রোপলিস জাদুঘরটি পাঁচ তল বিশিষ্ট।মিউজিয়ামের তিন তলায় রয়েছে পারথেনন গ্যালারি।এই গ্যালারিতে এমন কিছু ভাস্কর্য আছে যা মন্ত্রমুগ্ধকর।দেওয়ালের গায়ে পাথর দিয়ে খোদাই করা কেভ আর্ট বা গুহা শিল্পের মতো কিছু ভাস্কর্য চোখে পড়ে।এখানে রয়েছে  মানুষের শরীরী গঠন এবং বহু পশুর স্কাল্পচার।বিশেষ করে ঘোড়ার ভাস্কর্য।বলা যেতে পারে অশ্ব দলের মূর্তি।

গ্রিসের জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর বা ন্যাশনল আরকিওলজিক্যাল মিউজিয়াম উল্লেখযোগ্য।এই মিউজিয়ামও আমার ভ্রমণ তালিকায় বাদ পড়েনি।এখানে সমকালীন শিল্পীদের নির্মিত প্রতিটি ভাস্কর্যই নতুনত্বের নিদর্শন।এথেন্স শুধু ভাস্কর্যেই ভরপুর নয়।এখানকার প্রাকৃতিক মাধুর্য স্বপ্নের মতো।এথেন্সের ন্যাশনল গার্ডেন যেন সবুজের সমুদ্র।পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের পাশেই এর অবস্থান।এর চারপাশ বৈচিত্রে পরিপূর্ণ।যেমন পাম গাছ তেমনই মন মাতানো পুকুর।যার নাম ডাক পণ্ড।আর আছে বোটানিক্যাল মিউজিয়াম।আমরা ছিলাম প্লাকা ডিস্ট্রিক্টে।গ্রামটা দ্বীপের মতোই সুন্দর।এখানে কয়েকটি ক্যাফে রয়েছে।প্রাচীন গাছ আর সবুজের সমারোহ দেখে মনে হয় কোনও পেন্টিংয়ের ভেতর প্রবেশ করেছি।সত্যি কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।সবুজের তৃষ্ণা তৃষ্ণার ভেতরে আরো ভেতরে ডুবে যেতে চায় মন।

এদেশের খাদ্যও সুস্বাদু।গ্রিসের হাউস ওয়াইন অত্যন্ত জনপ্রিয়।বিফ আর বেগুন দিয়ে ওরা একটা প্রিপারেশন করে।সেখানে পেঁয়াজ,রসুন,লেবু সহকারে ওই খাবার প্রস্তুত করা হয়।ওদের ভাষায় একে মাসাকা বা মৌসাকা বলে।খেতে খুব ভালো লাগে।এছাড়া স্যাণ্ডউইচ চিকেনও পরিচিত খাবার।

গ্রিসের টেম্পল অফ অলিম্পিয়া আমি দেখেছি।এটি জিউস দেবতার মন্দির।এখানে রয়েছে জিউসের মূর্তি।পাশ্চাত্যের এই স্থাপত্য যেন ঐতিহাসিক স্তম্ভ।এথেন্সের সমুদ্রের চারপাশে হাঁটার আনন্দই আলাদা।শান্ত নীল সমুদ্র।দূরে পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় সবুজের হাতছানি।জলের যে এত রকমের চরিত্র হয়,তা আগে জানা ছিল না।এথেন্সে কতো রকমের বিচ দেখা যায়।অগিয়া(Agia),ম্যারিনা(Marina),অ্যাভলাকি(Avlaki),ফালিরন(Faliron),ওরোপস(Oropos),ল্যাগোনিসি (Lagonisi)—আরো কতো।এছাড়া দেখেছি এ্যাপোলোর মন্দির।এ্যাপোলো হলো সঙ্গীত,সত্য এবং আরোগ্যের দেবতা।

আরও পড়ুন:  হোয়াইট সিটি – উদয়পুর

আন্দামান-নিকোবার আইল্যাণ্ড আমার ভ্রমণের আর এক জায়গা।বেথুন স্কুলে পড়াকালীন যখন আমি ক্লাস ফোরে,তখন গিয়েছিলাম রাজস্থানে।রাজস্থানে পরেও গিয়েছি।থেকেছি ডেসার্ট ক্যাম্পে ।সূর্যের আলো যখন মরুভূমির ওপর,তখন মনে হয় সোনালি বালির জৌলুস।আমার ভীষণ মনে পরে মাউন্ট আবুর কথা।মাউন্ট আবু পাহাড়ের কাছে অনেক মন্দির আছে।আধার দেবী,দিলওয়ারা,দুর্গা,অম্বিকা,শিব মন্দির ইত্যাদি।আমি জয়পুর দেখেছি।জয়পুরে অনেক প্যালেস আছে।তাদের মধ্যে বিখ্যাত হাওয়া মহল।লাল এবং গোলাপী রংয়ের পাথরের এই প্রাসাদ মুঘল স্থাপত্যের অপূর্ব শৈলী।একবার নয় বারবার দেখেও সাধ মেটে না।হাওয়া মহলের ভেতরে রং বেরংয়ের কাচের কাজ।সূর্যকিরণের প্রবেশে স্পষ্ট হয় রঙের বাহার।শুধু রঙের খেলা।কখনও আবার রঙের লুকোচুরি।

সপ্তম আশ্চর্যের কথা শুনেছি বহুবার।কিন্তু জীবন এমন অনেক অত্যাশ্চর্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় যে মনে হয় আগের আশ্চর্যকে অতিক্রম করছে বর্তমান আশ্চর্য।আর একটা বিষয় মনের কোণে বাসা বাধে।মনে হয় জীবনের শেষ কোথায়?সত্যি কি শেষ বলে কিছু আছে?হয়ত সুন্দরের কোনও শেষ নেই।সুন্দরের অন্তহী্ন যাত্রাপথের সামান্য কিছু আমরা এক জীবনে দেখি।বাকিটা বাকি থেকে যায়।জয়পুরে খুব নিরামিষ খাবার খেতে হয়েছে।যেটা একদম ভালো লাগেনি।জয়সলমিরে গিয়ে আমিষ খেয়েছি।

কাছাকাছির মধ্যে মন্দারমণি প্রিয়।পুরীও খুব পছন্দের।সমুদ্র আমার মনে কতোটা জায়গা জুড়ে আছে,সেটা বলে বোঝাতে পারব না।কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যে সকলেই আমরা এক ধরনের মুক্তি খুঁজি।একটু নীরবতার জন্য প্রত্যেকেই  স্তব্ধতার খোঁজ করি।সেই স্তব্ধতার জন্য আমি মাঝে মধ্যেই চলে যাই শান্তিনিকেতনের এক আদিবাসী গ্রামে।আমার পরিচিত বন্ধুর বাসস্থান ওখানে।গ্রামটার নাম বনের পুকুর হাট।আমি এখন একটা উপন্যাস লিখছি।সেই উপন্যাসের অনেকাংশই ওখানে লেখা।একাগ্র চিত্তে লেখার উপযুক্ত পরিবেশ ওটাই।উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রে রয়েছে এক নারী।তার জীবনপথের অভিজ্ঞতাই আমার উপন্যাসের বিষয়বস্তু।না, এখনও লেখা শেষ হয়নি।

কলকাতাও কখন কখনও আমার ভ্রমণ সঙ্গী হয়ে ওঠে।এই শহর আমার চেনা।তবুও বিশেষ কোনও মুহূর্তে আবিষ্কার করি কলকাতার মধ্যে অন্য এক কলকাতাকে।কফি হাউস,ভিক্টোরিয়া,দক্ষিণাপণের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাই।গড়িয়াহাটের রাস্তায় হাঁটতেও খুব ভালো লাগে।কেউ চিনতে পারলে নিজেকে একটু আড়াল করি।আমার মধ্যেও তোঅন্য আমি আছে।সেই আমিকেও খুঁজে পাই।খুঁজে পাই স্বতন্ত্র সান্নিধ্যে।ভিক্টোরিয়ার বৃষ্টি ভেজা ঘাস,গড়িয়াহাটের কালো পিচে বৃষ্টির ফোঁটা আমাকে ভাবিয়ে তোলে।

আরও পড়ুন:  হোয়াইট সিটি – উদয়পুর

এটা কি সত্যি আমার শহর?আমার শহর কেমন স্নান সেরে ওঠে।আমার মনের পুকুরে ভাসতেই থাকে,ভাসতেই থাকে আমার আমি।কানে কানে কেউ কিছু বলে যায়—-

          “বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে

           বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে

           দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।

           দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

          ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

           একটি ধানের শিষের উপর

          একটি শিশির বিন্দু”।

NO COMMENTS