(ভাবলিখন : তন্ময় দত্তগুপ্ত)

 

মানুষের জীবন বড় বিচিত্র । শৈশব থেকে জীবনের শেষ প্রান্ত স্মৃতি দিয়ে ঘেরা । জীবন এক অর্থে স্মৃতির সমষ্টি । সেই স্মৃতির সমুদ্রে ডুব দিলে জেগে ওঠে কতো ঘটনা । শিল্পী স্মৃতির পরিব্রাজক । তাই সেই স্মৃতির পাখায় ভেসে ভেসে উড়ে যাই দূর দিগন্তে । এই ভাসমান জীবন ভেলায় ভেসে চলাকে কী বলে?একে তো বলতেই পারি স্মৃতির ভ্রমণ । আমার বয়স তখন দশ বছর । প্রতি বছর বাবা মা ভাই বোনের সঙ্গে  বেড়িয়ে পড়তাম ভ্রমণের নেশায় । একবার আমরা গিয়েছিলাম লক্ষ্ণৌ । আমার এখনকার বিলাস বহুল জীবনের সঙ্গে তখনকার জীবনের কোনও তুলনাই চলে না।স্মৃতির কুয়াশা সরিয়ে আজও আমি দেখতে পাই লক্ষ্ণৌর সেই সাহেব বাংলো বাড়ি । ইংরেজ আমলের তৈরি সেই বাড়ি । যেখানে আমরা উঠেছিলাম । সামনে ছিল বাগান । ফুটেছিল ফুল । চোখ মেলে তাকালেই শুধু রং । প্রকৃতি যেন আস্ত একটা রঙের ডালি । শুধু জীবনের তুলি ডোবালে মনের ক্যানভাসে ফুটে ওঠে কতো রকমের বিমূর্ত ছবি । মাঝে মধ্যেই মুখোমুখি হই সেই সমস্ত ছবির । বাংলো বাড়ির সামনেই একটা বড় গেট । তারপর ইটের রাস্তা । সেখান থেকে নেমে গেছে একটা ঢালু মাঠ । সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘোড়ার দল । সেই মাঠে মা ঘোড়ার সঙ্গে একটা শিশু সাদা ঘোড়া আসত । শিশু ঘোড়া আর মা ঘোড়ার চলন আমি অবাক চোখে দেখেছিলাম । পরে বুঝেছিলাম মাতৃত্বের হয় না কোনও জাত ধর্ম বা বর্ণ । মাতৃত্ব ইউনিভার্সাল বা সর্বজনীন । প্রচণ্ড রকমের একটা ইচ্ছে হলো মনের মধ্যে । যদি ঘোড়াটা আমার খেলার সঙ্গী হয় তাহলে বেশ মজা হবে । কিন্তু ঘোড়াটা আমার কথা শুনবে কেন?ও তো আমার ভাষা জানে না । এই ভাবতে ভাবতে কেটে গেলো বেশ কিছু দিন । একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যা দেখলাম তাকে কী বলে বর্ণনা করব!ঠিক যেন মেঘ না চাইতেই জলের মতো । দেখি আমাদের বাংলো বাড়ির বাগানে সেই ধবধবে ছোট্ট সাদা ঘোড়া । বাংলো বাড়ির গেটের ধারে যে শিউলি গাছ,সেই শিউলি গাছের সামনে দাঁড়িয়ে নীচের কোনও ঘাস পাতা খাচ্ছিল ওই অশ্বশাবক । একটা রূপকথার স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমি । আমি এক মনে ভাবি —যদি কোনওভাবে গেট বন্ধ করতে পারি তাহলে চিরকালের মতো ঘোড়াটা আমার হয়ে থাকবে । হয়ে থাকবে আমার খেলার সঙ্গী । বাবাকে বললাম । বাবা রাজী হলেন না কিছুতেই । শেষে চুপিসাড়ে যেই গেট বন্ধ করতে যাবো,অমনি অশ্বশাবক দ্রুত গতিতে ছুটে পালাল । আমার স্বপ্নটুকু গেলো উড়ে । একটু বড় হবার পর বুঝতে পেরেছিলাম শিশু ঘোড়াকে আটক করলে ও কোনওদিন আমার হতো না । কারণ কারোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে জোর কোরে কাছে পাওয়া যায় না । আর সেই ছোট্ট ঘোড়া আমার কাছে থাকলেও নিজের মাকে মিস করত । কথায় আছে না ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন । তাই হয়তো আমার হাতে কোনও অমঙ্গল হয়নি ।

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর

bara-imambara-lucknowঐতিহাসিক জায়গা লক্ষ্ণৌ । লক্ষ্ণৌর ইমামবাড়া দেখেছিলাম । কী অসাধারণ স্থাপত্য । এখন স্মৃতির সাহায্যে সেই ইমামবাড়াকে দেখি । তখন বুঝি এক অনন্য স্থাপত্যের সম্মুখীন হয়েছিলাম আমরা । লক্ষ্ণৌর বিখ্যাত মনুমেন্ট এই ইমামবাড়া । প্রতি বছর মুসলিমরা এখানে মহরমের মাধ্যমে উৎসব পালন করে । এই ইমামবাড়া নবাবী স্থাপত্যের প্রথম যুগে স্থাপিত । এর কিছু স্থাপত্যের মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় উপাদান । অত ছোটবেলায় ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ইতিহাস ছুঁয়ে ফেলেছিলাম । আজ বুঝি । বুঝি বেশ ভালো ভাবেই । অজ্ঞাতে অজান্তে কত কিছুই ছুঁয়ে যায় মনের গভীরে ।

ছেলেবেলায় রেলগাড়ি চেপে যখন যেতাম দূর দূরান্তে,তখন যাত্রা পথের মধ্যে ভেসে উঠত অদ্ভুত কাব্যময়তা । জ্যোৎস্না আলো এসে পড়ত ট্রেনের কামরায় । ট্রেন চলত কু-ঝিক-ঝিক । কঠোর লোহা-লক্করের দুলুনিতে জন্ম নিত এক অদৃশ্য ছন্দ । রেলগাড়ির চলে যাওয়া । মনে হয় রেলগাড়ি যেন ছিল পুরুষের মতো প্রবল কঠোর । কিন্তু জ্যোৎস্না আলোর স্পর্শে সে এতোটাই আপ্লুত যে কঠোরতার মাঝে বেড়িয়ে পড়ছে তার রোমান্টিক মন । ঘন কালো রজনীও আলোকিত হচ্ছে । প্রকৃতি দু’চোখ মেলে দেখছে কঠোর আর কোমলের মিলন । জড় বস্তুর মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে বিপূল প্রাণশক্তি । আমি মনে করি না শুধু স্পটে গিয়েই ভ্রমণের স্বাদ উপভোগ করা যায় । সন্ধিৎসু মন থাকলে যাত্রাপথেও পাওয়া যেতে পারে ভ্রমণের আস্বাদ । এই ভ্রমণের স্মৃতিমেদুরতা উঠে এসেছে আমারই লেখা একটা কবিতায় ।

train-at-nightকবিতার নাম ‘রাতের রেলগাড়ি’ । ‘রাতের রেলগাড়ি/বাঙ্কের শায়িত আশ্রয়, রাত গভীর/নিস্প্রদীপ কামরায় নীরবতা ভাঙা ঝিক ঝিক/ঘুম ঘুম চোখে শুধু নিস্ফল চেয়ে থাকা/কিছু আগে থেমেছিল ট্রেন ক্ষণেকের তরে/কোনও এক স্টেশনে/যাত্রী ওঠে নামা/কুলিদের নীচু গলায় আনাগোনা/বাক্স প্যাটরার মৃদু ঠোকাঠুকি/দরজা বন্ধ…/আবার ঝিক ঝিক/আবার দুলুনি/চলে রেলগাড়ি নিজের ছন্দে/নতুনত্বের স্পর্শহীন একঘেয়ে গোঙানী/বিন বিন কান্নার শব্দে তন্দ্রা কাটে/নীচে বসে তুমি একা…/দুলে দুলে আধো অন্ধকারে সেই দেখা প্রথম/জানলার ধারে জ্যোৎস্নাস্নাতা কে তুমি বিরহিনী!/টিকলো নাকে বিন্দু বিচ্ছুরিত হীরের নাকছাবি/বক্ষের ওড়নি দিয়ে ঢাকা পেলব দেহবল্লরী/চোখের জলের ধারা বাধনহারা কে,কে তুমি রহস্যময়ী?/কোথা থেকে শুরু তোমার/কোথায় হবে শেষ/রাত যায় রহস্যভেদের আনাড়ী স্বরক্ষেপে/সকাল হলো,ভোরের আলো ধাক্কা দিয়ে বলে/তন্দ্রা ছুটে দিনের আকাশ মুচকি হেসে ভাসে/চোখ ফেরাতেই শূন্য সিটে হন্যে হয়ে ফেরা/কোথায় গেলো রাতজাগানী/ঝিকির ঝিকির শব্দ বলে— শুকতারাকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও কোনও ইস্টিশনে নেমে গেছে স্নিগ্ধা যামিনী/তোমার স্নিগ্ধা যামিনী’।

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর

north-bengalবয়েস বাড়ল । আমি এলাম ছবির জগতে । তখন শুটিং-এর প্রয়োজনে যেতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় । বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে । আমার পরিচালিত ‘ফিরিয়ে দাও’ আর ‘ভয়’ ছবির শুটিং হয়েছিল উত্তরবঙ্গে । উত্তরবঙ্গ আমার ভালো লাগে । ওখানকার মানুষের আকার আকৃতি একটু অন্যরকম হয় । গোর্খা,নেপালীরা ভারতীয় হয়েও তথাকথিত ভারতীয়দের মতো নয় । একটু বিদেশী বিদেশী ব্যাপার রয়েছে । সমুদ্রের তুলনায় পাহাড় আমার প্রিয় । পাহাড়ের নিজস্ব একটা উচ্চতা আছে । সেই উচ্চতায় দাঁড়ালে দৃষ্টি চলে যায় দূর দিগন্তে । সমুদ্রের ধার আমার অত ভালো লাগে না । কারণ সমুদ্রের মধ্যে থাকেনা কোনও রহস্যময়তা । শুধু একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি — ঢেউয়ের ভেঙে পড়া আর আদিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি । আর তারপর?তারপর সমুদ্র আর আকাশ দুজনেই ছুঁয়ে ফেলেছে একে অপরকে । এ দৃশ্য ভালো হলেও বেশিক্ষণ এর সঙ্গে থাকা যায় না । কিন্তু পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে উন্মোচিত নতুন রহস্য । উত্তরবঙ্গের বহু জায়গায় গিয়েছি । গরুমারা,কালিংপং,কার্শিয়াং,দার্জিলিং,মংপু,গ্যাংটক,পেলিং । পেলিং অসাধারণ লেগেছে । কিছুদিন আগে আবার গিয়েছিলাম । পেলিং-এর সেই সৌন্দর্য এখনও আছে । জায়গাটা ফাঁকা । গ্যাংটকের মতো অত ঘিঞ্জি নয় । আর গিয়েছিলাম ছাঙ্গু লেকে । কুড়ি বছর আগের ছাঙ্গু লেক বদলে গেছে । ছোট ছোট রেস্টুরেন্ট হয়ে জায়গাটার বিউটি আর আগের মতো নেই । হয়ত জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে এমন অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছি আমরা ।

madame-tussads-londonঅনেকক্ষণ দেশের কথা হলো । এবার একটু বিদেশ ভ্রমণের কথা বলি । বিদেশে বহুবার গিয়েছি । যে গেছেন বাইরে সেই শুধু জানেন বাইরের বিউটি । সঠিক কোন সময়ে আজ আর মনে নেই । বেশ কয়েক বছর আগে গিয়ছিলাম লণ্ডনের মাদাম তুসো মিউজিয়ামে । চারদিকে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মোমের মূর্তি । কোথাও অমিতাভ বচ্চন কোথাও সিলাভাষ্টার স্ট্যালোন কোথাও সোয়ারাজেনেগার । আমি ছবি তুলছি । সেই সঙ্গে অনেক মানুষ ছবি তুলছেন । হঠাৎ একদল মানুষ এসে বললেন স্যার আপনার ছবি তুলব । আমি অবাক । একি এনারা বাংলা জানেন!আসলে ওনারা এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে । আমার অভিনীত ছবি দেখেছেন । তাই আমায় চেনেন । ওনারা আমার ছবি তুললেন । আমার একটা অন্যরকম অনুভূতি হলো । ভাবলাম মাদাম তুসোর মোমের পুতুলের মাঝে আমিও হলাম জীবন্ত মূর্তি । বিদেশ ভ্রমণের এই ফিলিংটা আমি চিরকাল আমার মনের সংকলনে সাজিয়ে রাখব । আবার আমেরিকায় যখন গিয়েছিলাম তখন হয়েছিল আর এক অভিজ্ঞতা । নিউইয়র্কের ম্যানহ্যাটন শহর । আমি গাড়িতে । গাড়ি চালাচ্ছেন আমার জামাইবাবু । পাশের সিটে আমি । ফিফথ এ্যাভিনিউতে দাঁড়িয়ে পড়ল আমাদের গাড়ি । সিগন্যালে ছিল না অনুমোদন সঙ্কেত । জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হচ্ছিল সাহেব-মেমরা । আবিষ্কার করলাম এক অদ্ভুত বিষয় । সিগন্যাল সবুজ হলো । সবাই পা ফেললেন এক সঙ্গে । মার্চ করার মতো এগোলেন ওঁরা । যতগুলো মানুষ জেব্রা ক্রসিং পার করল,প্রত্যেকের পা একটি পজিশনে অর্থাৎ প্রত্যেকে একই সঙ্গে ডান পাগুলো বাড়িয়েছে একই মাপে । আমার হাতে ছিল ক্যামেরা । তুললাম ছবি । না দেখলে বোঝানো যাবে না ছবিটার কম্পোজিশান কতোটা অন্যরকম হয়েছিল । ভ্রমণ আমার স্মৃতির তালিকায় এভাবেই ঢুকে পড়ল ।

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর

আজ কলকাতার চারপাশে শুধু ফ্ল্যাট আর ফ্ল্যাট । কিন্তু আমি যে কলকাতা দেখেছিলাম,সেই কলকাতা ছিল একদম অন্যরকম । মুষলধারে বৃষ্টির পর পরিষ্কার দেখাচ্ছিল আমার শৈশবের ঢাকুরিয়াকে । বৃষ্টির ফোঁটা ধুয়ে দিয়েছিল রাস্তার সমস্ত পাঁক । নর্দমার ভেতর স্বচ্ছ জলরাশি । বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি বসে আচ্ছি নর্দমার সামনে । আকাশে তখন উজ্জ্বল আলো । নর্দমার জল ভেঙে ভেসে যাচ্ছে রং বেরঙের কত মাছ । পাশেই একটা বকুলবেলিয়া গাছ । গাছটা রোজ দেখি । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাছটা ধীরে ধীরে বাড়ে । গাছে একদিন ফুল আসে । সেই সময় আমার ছোট্ট শিশুমনে সেটাই ছিল সবচেয়ে কাছের ভ্রমণের বিস্ময় । আজ চতুর্দিকে ইট কাঠ পাথরের জঙ্গলে সবাই যখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত তখন সেই ছোটবেলার ভ্রমণের স্মৃতি আমার মনে ছড়িয়ে দেয় এক আকাশ সবুজ । তাই ভ্রমণ আমার কাছে সবুজের জয়গান আর সবুজের সন্ধান ।

NO COMMENTS