(ভাবলিখন : তন্ময় দত্তগুপ্ত)

আমার জীবনের প্রথম ভ্রমণ বেনারস । এখন স্মৃতি ঝাপসা । ফিকে হয়ে যাওয়া স্মৃতির এখনও কিছু মনে আছে । আসলে এমন কিছু ঘটনা থাকে,যা জীবনের শেষ প্রান্তেও মনের মাঝে দীপ জ্বেলে যায় । আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়তাম । স্কুলে সকলের সঙ্গে গিয়েছিলাম বেনারসে । সেখানে ছিল বড় মাঠ । আমরা প্যারেড করতাম । ক্যাম্প ফায়ারে নাটকও করেছিলাম । সকলের ভালো লেগেছিল । আমি সারনাথের মন্দির,কাশী বিশ্বনাথের মন্দির এবং মণিকর্ণিকার ঘাটে গিয়েছিলাম । সেই প্রথম মুক্ত স্বাধীনতার স্বাদ । আমার পরবর্তী জীবনে এই মুক্ত স্বাধীনতা প্রভাব ফেলেছিল । বাইরে যাওয়ার  আরো অভিজ্ঞতা আমার আছে । জার্মানির কথা আমি কোনও দিনই ভুলব না । নাটকের স্কলারশিপ নিয়ে আমি ওই দেশে গিয়েছিলাম । ইউরোপ দেশের সৌন্দর্য এবং জার্মান জাতির পরিচ্ছন্নতা আমার জীবনকে পালটে দিয়েছিল । এটা ১৯৮৮ সালের ঘটনা । আকাশবাণীতে আমি পাঁচবার জাতীয় পুরস্কার পাই । তারই দক্ষিণা স্বরূপ ভারত সরকার আমার নাম নমিনেট করেন । জার্মান গভর্ণমেন্ট আমার সিভি দেখে আমাকে সিলেক্ট করেন । সেই সুবাদেই আমার বিদেশ ভ্রমণ । বিদেশে গিয়ে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল । একজন মানুষের মধ্যে যদি খুব গুণ থাকে এবং সে যদি সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যায়,তাহলে তাকে দাবিয়ে রাখতে চায় অন্য সবাই । এই প্রবণতা দেখা যায় আমাদের দেশে । বিদেশে কিন্তু সবাই সবাইকে উৎসাহিত করে । বিদেশে দীর্ঘদিন আমি কোলোন,হামবুর্গ,মিউনিখ এবং বার্লিনের মতো শহরে ঘুরেছিলাম । আমি ইস্ট জার্মানি গিয়েছি । ওখানে নাটক দেখেছি । দুই জার্মানির পাঁচিল তখনও ভাঙে নি । ওখানে ব্রেখটেরর নাটক,লিবন ডান্স কোম্পানির সৃজনশীল নৃত্য,ফিলারমোনিক থিয়েটার দেখেছি । মঞ্চে পারফরমেন্স চলছে আর তার সঙ্গে চলছে নির্বাক সিনেমা । সামনে বসেছে অর্কেস্ট্রার দল । তারা বাজনা বাজাচ্ছে ।

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর

আকাশবাণীর এই শিক্ষামূলক ভ্রমণ আমার জীবনে অনেক কাজে এসেছিল । আরো কিছু ঘটনার কথা বলব । জার্মানির মিউনিখে শুধু বরফ । হাঁটু পর্যন্ত বরফ আর বরফ । এই বরফ দিয়ে আর্ট স্কুলের ছেলেরা বরফের ভাল্লুক বানিয়েছে । বানিয়েছে বরফের জলহস্তি । বরফকে নিয়ে এমন শৈল্পিক ভাবনা আমাদের দেশে দেখিনি । মিউনিখের পরে আমি বলব বার্লিনের কথা ।

বার্লিন শহরের প্রশস্ত পথের সঙ্গে নিউ দিল্লির রাস্তার একটা মিল রয়েছে । পূর্ব বার্লিন দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন দেখেছিলাম বার্লিন অনসম্বল । সারা পৃথিবীর নাটকের তীর্থক্ষেত্র এই বার্লিন অনসম্বল । বার্লিন অনসম্বলকে আমি, আমার স্ত্রী প্রণাম করেছিলাম । বিদেশে আমি ব্রেখটের ‘মাদার কারেজ’ নাটক দেখেছি । জার্মান ভাষায় যার নাম ‘ডাই মুঠার’ । বিদেশী থিয়েটারে অভিনয় স্টাইলের এমন আর্টিস্টিক ইকনোমিকাল প্রয়োগ এক কথায় অনবদ্য । যৌবন থেকে বার্ধক্য—বয়সের এই বিবর্তন এক অভিনেত্রীর অভিনয়ে উজ্জ্বল । কিন্তু কী আশ্চর্য ! ওই অভিনেত্রীর মেকআপে বিশেষ পরিবর্তন ছিল না । বয়স এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চলন গতির পরিবর্তন হয় । সেই কারণেই অভিনেত্রী তার হাঁটার লয় বদলেছিল । দ্রুত থেকে ওই ধীর গমন-গতি,আসলে এক বয়স থেকে অন্য বয়সের রূপান্তর । তার বয়সের বিবর্তন এতোটাই অসামান্য যে না দেখলে বোঝানো যাবে না । গোটা মঞ্চ ঘাস দিয়ে ঢাকা । যেন একটা মাঠ ।

আবার আমেরিকার লসএ্যাঞ্জেলেসের ব্রেভারলি হিলসে সোফিয়া লোরেনের মতো বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রীরা থাকেন । হলিউডের কথা আজো আমার মনে পড়ে । আমরা ট্রেনে বিভিন্ন  জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় দেখি আলফ্রেড হিচককের বাড়ি । আমি স্তম্ভিত, এইখানে আলফ্রেড হিচকক থাকেন!

ওয়াশিংটন ডিসি-তে আমার এক বন্ধু থাকত । নাম অসীম । ওয়াশিংটন ডিসি থেকে গাড়ি করে আমরা একটা অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলাম । আমরা বলতে আমি,অসীম,অসীমের স্ত্রী আর আমার স্ত্রী ঊর্মিমালা । আমাদের গাড়ি চলছে । চারদিকে সবুজ ঘাসের বন । মাঝখানে পরিচ্ছন্ন রাস্তা । সন্ধ্যা নেমে আসছে । সন্ধ্যার বেগুনি আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে । চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে আমি কবিতার এক লাইন বললাম । সঙ্গে সঙ্গে অসীম ধরল পরের লাইন । এই ভাবে একটা গোটা কবিতা আবৃত্ত হলো সেদিনের সোনাঝরা স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় । কবিতাটা ছিল রবি ঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’।‘রেল গাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,/ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন।।/আগে ওকে বারবার দেখেছি লাল রঙের শাড়িতে-/দালিম-ফুলের মতো রাঙা,/আজ পড়েছে কালো রেশমের কাপড়,/আঁচল তুলেছে মাথায়…’।এভাবেই শেষ হয়েছিল সেদিনের কবিতা । অসীম আমেরিকার প্রবাসী । আর আমি এ দেশের  মানুষ । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কবিতা আমাদের মধ্যে সেতু বেঁধে দিল অনেকদিন পরে । এও  প্রকৃতির দান । রাতে আমেরিকার কোনও এক জায়গা থেকে আমি ফিরছি,আলো আঁধারীতে হঠাৎ জেগে উঠল এক মেয়ের মুখ । মনে মনে ভেসে উঠল জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন । মুছে গেলো সমস্ত ভৌগোলিক বেড়াজাল । কবিতার শরীরে ছোঁয়া লাগল আন্তর্জাতিক চেতনার ।

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর

কিছুদিন আগে আমি দার্জিলিং গিয়েছিলাম । সেখানে আমি খুব ভোরে উঠতাম । আমার আগেই উঠে পড়ত আমার এক বন্ধু । আকাশে উঁকি দিত সূর্য । হালকা রোদে আমার বন্ধু দাঁড়িয়েছিল পাইন গাছের নীচে । আমি ধীরে ধীরে তার কাছে এসে বললাম—‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি।/আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী/রঙীন নিমেষ ধূলার দুলাল/পরাণে ছড়ায়ে আবির গুলাল…। দার্জিলিংয়ের শীত, সূর্যের লুকোচুরি — সব মিলিয়ে কবিতাটা অন্য মাত্রা পেল ।

ওখানকার মন ভোলানো সৌন্দর্য এভাবেই আমাকে কবিতাটা বলিয়ে নিল । আমাদের দেশের মধ্যে ত্রিপুরা জায়গাটা খুব ইন্টারেস্টিং । ত্রিপুরা,দেশের পূর্বাঞ্চলের একটা অংশ । যেখানে খুব সুন্দর রাজবাড়ি আছে । সেই রাজবাড়ির রং,স্থাপত্য আমাকে খুব টানে । আবার হায়দ্রাবাদ আমার অত্যন্ত প্রিয় জায়গা । কারণ হায়দ্রাবাদের মধ্যে একটা সিমপ্লিসিটি আছে । জায়গাটা বেশ ঘরোয়া । ওখানে অনেক ঐতিহাসিক জায়গা রয়েছে । আমি গোলকুণ্ডা ফোর্টে গিয়েছি ।  দেখেছি লাইট অ্যাণ্ড শ্যাডো শো । সত্যি অসাধারণ । হায়দ্রাবাদ নিজামের জায়গা । ওখানকার খাবার আমার খুব পছন্দের । রোজার সময় মুসলিমরা যে হালিম খায়,সেটা আমার খেতে খুব ভালো লাগে ।

আমার আরো একটা প্রিয় জায়গা শান্তিনিকেতন । বসন্ত উৎসব দেখে আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ দোলের রং খেলাকে শিল্প সম্মত রূপ দিয়েছেন । শান্তিনিকেতনে একটা রেডিও স্টুডিও ছিল । সেখানে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়,শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার অনেক রঙিন স্মৃতি । রেডিওর অফিসার হিসেবে আমাকে মাসে একবার ওখানে গিয়ে রেকর্ড করতে হতো । ওটা ছিল বিশ্বভারতীর নিজস্ব অনুষ্ঠান । সেই পুরোনো শান্তিনিকেতনের মধ্যে একটা নির্জনতা ছিল । একটা শান্তির পরিবেশ ছিল । আজকের শান্তিনিকেতনের মধ্যে সেটা একটু মিস করি ।

আমার আরো একটা কাছের শহর বেনারস । যেখান আমি গিয়েছিলাম ছোটবেলায় । বড় হয়েও বেনারসে গিয়েছি । বেনারসের মধ্যে একটা ধার্মিক ব্যাপার রয়েছে । কাশী বিশ্বনাথের মন্দিরে একটা পুজো পুজো গন্ধ আছে । সেই গন্ধ আজো আমি খুঁজে পাই । আমি মার্কসবাদী দর্শনের মানুষ হয়েও ঈশ্বরে বিশ্বাসী । এতে আমায় কেউ পরস্পর বিরোধী বললে আমি নত মস্তকে মেনে নেব । আমার মধ্যে এই দুই সত্ত্বাই আছে ।

আরও পড়ুন:  দেওয়ালির মুখে পিঙ্ক সিটি জয়পুর