বাংলালাইভ রেটিং -

দক্ষিণী ফিল্ম রিমেক করার সোজা সাপটা একটা প্রসেস রয়েছে আমাদের টালিগঞ্জে। রাইট্‌স কেনার চক্কর শেষ হয়ে গেলে ডিরেক্টরকে ধরে হাতে গুঁজে দেওয়া হয় সাউথ ছবির ডিভিডি। ডিভিডি-তে ইংরেজি সাবটাইটেল দেওয়া থাকে বলে, ছবি দেখে গল্প কিংবা ডায়ালগ বুঝতে কোথাও অসুবিধে হয় না কোন।

পাশাপাশি ডিভিডি-র কপি দিয়ে দেওয়া হয় বাঙালি রাইটারের হাতেও। আর সেটা হাতে পেয়ে দেরি না করে সেও ঝটাপট নামিয়ে ফেলে সব ডায়ালগের মুখরোচক বাংলা মিক্স। এর মধ্যে ডিরেক্টরেরও দ্যাখা আর মাপা হয়ে গেছে ছবিটা। ব্যাস, তাহলে আর প্রোডাকশন প্ল্যান করায় দেরিটা কীসের?

ও হ্যাঁ, শুট শুরুর আগে ডিরেক্টরকে নাক-কান মলে অলিখিত একটা মুচলেকাও দিয়ে রাখতে হয় কিন্তু।

কী সেটা?

আর যাই করো না কেন, সাউথ ফিল্মের গল্প কিংবা স্ক্রিপ্টের ওপর নিজের কোন ক্রিয়েটিভিটি যেন দ্যাখাতে যাওয়ার ভুল না করেন তিনি। অরিজিনালে যেমন যেমন আছে, কপিতেও যেন ঠিক তেমন তেমন হয়। বাজেটে ফিট করছে না বলে কোন সিন শুট করতে পারলে না, সেটা ঠিক আছে। ওখানটা না হয় গল্পে একটু ছ্যাঁদা রয়ে যাবে, বাংলা পাবলিককে গেলানোর জন্যে ওটুকু দেওয়াই ঢের। কিন্তু তাই বলে কোন জায়গায় নিজে থেকে কেরামতি দেখিয়ে গল্প কিংবা স্ক্রিপ্ট ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে যেন লোকাল ট্যালেন্টের দল!

প্রোডিউসারের পয়সা নিয়ে ওসব পেঁয়াজি মারতে গেলেই চরম সব কেস। অদৃশ্য শক্তি এসে হাত এমন তুবড়ে দেবে যে, এই সিনেমাটা তো দূরের কথা, এই ইন্ডাস্ট্রিতে জীবনে আর কোন সিনেমায় হাত লাগাতে হবে না।

কিছুদিন আগে অবধিও এসব শুনে মনে হত যে, এই শাসন-টাসন খুব অবমাননাকর বলে! ক্রিয়েটিভ একটা লোককে তুই ছবি বানাতে ডেকেছিস, এরপর লোকটাকে দিয়ে ভাড়া করা জেরক্স মেশিনের কাজ করানোটা কি ঠিক? আরে, তাঁকে কাজ করতে দে হাত খুলে, তবে না তাঁর প্রতিভা বিকাশ হবে।

প্রথম এই ধারণাটা চোট খেয়েছিল বাঙালি ডিরেক্টরের তৈরি ছবি ‘তিন’ (২০১৬) দেখতে গিয়ে। টান-টান একটা কোরিয়ান থ্রিলারের সাড়ে তেরোটা বাজিয়ে এ কোন অখাদ্য ছবি তৈরি হল, শুনি? রিমেক করতে গিয়ে ক্রিয়েটিভিটি দ্যাখানোর আর জায়গা পেলি না বাপ? মূল গল্পের পুরোটা যে সুন্দরী মেয়েটাকে নিয়ে, কপি ছবিতে সেটার পুরো ঘণ্ট পাকিয়ে সেই মহিলাকে তিয়াত্তর বছরের বুড়ো হাবড়া পুরুষ বানালি ভাই?

ধারণাটার চোট খাওয়া সেই সেবার থেকে শুরু আর এবার কফিনে লাস্ট পেরেকটা মেরে দিল যেন এই ‘টিউবলাইট’ এসে। ছবি দেখে উঠে বলতে ইচ্ছে করছে, অফিসিয়াল রিমেক বানাতে গিয়ে ফের কোন জঘন্য খিচুড়ি হল এটা?

সাধে কি আর এপাড়ার প্রোডিউসাররা রিমেক ছবির গল্পটাকে চেঞ্জ করতে দ্যায় না মোটে!

আর সেই গুরুজনদের তত্ত্বাবধানে আমাদের রবি কিনাগিও তো ঢের বেশি ভাল রিমেক বানায় এই ‘টিউবলাইট’-এর থেকে! 

ছোট্ট শিশুর মনে জাদুকর বেন ঈগল-এর প্রভাব ছিল কেমন, সেটা এই পোস্টার থেকে স্পষ্ট

অফিসিয়াল রিমেক কিনা, তাই মূল ছবিটার নাম এতদিনে সবাই জেনে ফেলেছেন শিওর। ২০১৫ সালের ছবি, ‘লিটল বয়’ নাম। তবে এটা কেউ জানেন কিনা জানি না যে, মূল ছবিতে এরকম হাফ-বুড়ো এক হিরোর কচি নাদান খোকা সেজে রং তামাশা করার ব্যাপারগুলো আদৌ কিন্তু নেই।

থাকবে কেন, বলুন? মূল ছবির গল্পটা তো সত্যি একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে, যার বয়স মোটে আট। তার প্রবলেম হল, লম্বায় সে বাড়ছে না আর আদৌ। গাঁয়ের সব লোক তাকে তাই ‘লিটল বয়’ বলেই ডাকে।

কী মিষ্টি যে সেই খুদেটাকে দেখতে, ছবিটা না দেখলে বুঝতে পারবেন না আপনি। যখন ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদে, বা সোহাগ করে বাপের সঙ্গে, কী ভালোই যে লাগে! অবস্থা বুঝুন, এরকম একটা ক্যারেক্টারকে পালটে দিয়ে কবীর খান সেখানে এনে ফেললেন ফিফটি প্লাস এজের দামড়া একটা হিরো! এর আগে এতগুলো সিনেমা বানিয়েছেন, প্লাস ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন বেশ কয়েকটা, একবারও মনে হল না, মাঝবয়সী হুমদো লোকটাকে কাঁদতে দেখলে আর যাই হোক লোকের মধ্যে ওই ‘আহারে’ বলে দরদটা উথলে ওঠার চান্স একটুও মোটে নেই!

আরও পড়ুন:  ‘বাপি দাদু কলকাতায়, অন্য বউ-এর কাছে থাকে...’!? - প্রথম পক্ষের নাতনি অরিনার চোখে সলিল চৌধুরী

‘লিটল বয়’ ছবিটাও কিন্তু সেই দুটো ভাইয়েরই গল্প। ছোট্ট আট বছরের খুদেটা ছাড়াও আছে ওর একটা বেশ বড় সাইজের দাদা। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হয়ে গেছে তুমুল আর সেই দাদাটা এমন স্বার্থপর যে কিচ্ছুতে যেতে চাইল না যুদ্ধে। এদিকে এরকম একটা রুল ছিল তখন বোধহয় যে ফ্যামিলিতে সমর্থ পুরুষ থাকলে তাঁকে যেতেই হবে যুদ্ধে। তাই সেই স্বার্থপর দাদার বদলে অগত্যা মাঝবয়সী বাবাটাকেই যুদ্ধে যেতে হল।

ব্যাস! একলা হয়ে পড়লো গপ্পের নায়ক সেই আট বছরের খুদে। কারণ তার বাবাই তো ছিল তার এই পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের মিষ্টি ফ্রেন্ড।

এখন এরকম একটা গল্পের অফিসিয়াল রিমেক করতে গিয়ে কেউ কোন আক্কেলে বাবার ক্যারেক্টারটা প্রায় ভ্যানিশ করে দ্যায় আর ভাইয়ের রোল আর দাদার রোলটাকে এলোমেলো করে বসে, কে জানে।

একে তো অ্যাডাপটেশন নয়, নির্বুদ্ধিতা বলে!

সলমন খান প্রোডিউসার যখন, কে জানে আহাম্মকিটা হয়তো ওঁর থেকেই শুরু। কিন্তু কবীর খানের কি একবারও আক্কেল হল না এটা বলার যে, আপনি যতই বলিউডের ‘ভাই’ হয়ে বসুন না কেন আর যতই এটা-ওটা দুষ্টুমি করেও আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যান না কেন – এই গল্পটায় আপনাকে আর আপনার ভাই সোহেল খানকে একদম মানাবে না কিন্তু, স্যর!

কী হতো যদি সলমনকে সোজাসাপটা এই কথাগুলো বলেই দিতেন কবীর? এর আগে ‘এক থা টাইগার’ (২০১২) কিংবা ‘বজরঙ্গী ভাইজান’-এর (২০১৫) মতো ছবি বানিয়েছেন যিনি, বলিউডে তাঁর ভাত মারা যেত বুঝি?

‘লিটল বয়’ ছবিতে অসহায় প্রায় প্রৌঢ় বাবাকে দেখে চোখে জল চলে আসতে পারে আপনার। আর এখানে? এখানেও বাবার ক্যারেক্টার একটা রয়েছে বটে, তবে মাফ করবেন, সেটা আসলে মানুষ নাকি জন্তু, খুব কম পরিসরে সেটাই যে বুঝতে দিলেন না কবীর। ছবির শুরুতে দ্যাখান হচ্ছে কোন এক বছর দশেরার এক রাত। যেদিন রাতে গলা অবধি মদ খেয়ে টলমল করছে লোকটি, আর তাই ভদ্রলোককে বন্ধ দরজার বাইরে না ফেলে দয়া করে নিজের ঘরে নিজের বিছানায় শোয়ার চান্স দিচ্ছে তার বৌ।

ছবির প্রথম টিজার পোস্টার ছিল এটা। তখনও কেউ ভাবতে পারে নি যে এমন ভাবে ডুবে যাবে ছবিটি।

ব্যাস, অমনি সেক্স হয়ে যাচ্ছে আর ন’মাস পরে জন্ম হচ্ছে এই ছবিতে ভাইয়ের ক্যারেক্টারটার। এবার সেই ক্যারেক্টারের নাম রাখতেও হিসেব শুনুন কত! রামায়ণের রেফারেন্স এখানে পাবলিক ভাল খায়, হিসেবে তো ছিল সেটাই! কিন্তু মুসলিম হিরোকে দিয়ে ‘রাম’ নামের কোন চরিত্রে অভিনয় করানো যায় কখনও, পাগল? শেষ অবধি ভেবেচিন্তে সলমন খানের ক্যারেক্টারটার নাম হল তাই লক্সমন। লক্সমন সিং বিস্ত। ভেবে দেখুন এই নামকরণ পুরো সেই সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না কেস!

আর সেদিন সেই দশেরার রাতে মাল খেয়ে চুর হয়ে সেক্স করার পর যে বাচ্চাটার জন্ম হল, লক্সমনের সেই ভাইয়ের নাম দেওয়া হল ভরত।

বড় হওয়ার পর ওই লক্সমন হয়ে গেল সলমন খান আর ভরত হয়ে গেল তার ভাই সোহেল খান। বুদ্ধিতে ঢ্যাঁড়শ বলে ছোট্ট থেকেই লক্সমনকে সবাই নাকি টিউবলাইট বলেই ডাকে!

এরপর জাস্ট এক লাইন সলমন খানের ভয়েস ওভার আর আপনি শুনে ফেললেন ওদের বাপ-মা দুজনের মরে যাওয়ার ইনফর্মেশন। আমি তো এই অবধি দেখেই থ! স্ক্রিপ্ট ঘাঁটবি মানে এতটা ঘাঁটবি যে, অরিজিনাল ছবির অন্যতম প্রধান দুটো ক্যারেক্টার মানে ওই ‘লিটল বয়’-এর মা আর বাবা ছবি ঠিক করে শুরুর আগেই জাস্ট ফক্কা হয়ে যাবে! নেশার চোটে সেক্স করে বাচ্চা পয়দা করার চেয়ে বেশি গল্পে যাদের আর কোন রোলই নেই!

যদি ভুল করে আমার মতো ‘টিউবলাইট’ দেখতে যাওয়ার আগে ‘লিটল বয়’ দেখে ফেলে থাকেন, দেখবেন, এই সময়েই কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে হবে হঠাৎ!

আরও শুনুন। মূল ছবিতে আট বছরের খুদের জীবনে বড় একটা তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল ‘বেন ঈগল দ্য ম্যাজিশিয়ান’-এর কমিক বই আর টুকরো মুভি স্ট্রিপগুলো। তাই সত্যি যখন ওদের শহরে সেই ‘বেন ঈগল’ নামের কেউ ম্যাজিক দ্যাখাতে এলো, পুঁচকে’র জন্যে তো সেটা তখন প্রায় স্বপ্ন বোধহয় সত্যি হল গোছের মোমেন্ট! সেই শো-তে আবার বাকি আর সব্বাইকে ছেড়ে তাকেই কিনা স্টেজের ওপর ডেকে ওঠাল সেই বেন ঈগল নামের জাদুকর! আর খুদেটা প্রায় ব্যোমকে গিয়ে দেখতে পেল বেন ঈগল-এর সামনে স্রেফ ইচ্ছেশক্তি দিয়ে কী ভাবে নড়ান গেল ইয়া বড় কাচের একটা বোতল!

আরও পড়ুন:  নাচেন ভালো‚ সলমনের পরিবর্তে তাই নতুন ছবিতে বরুণ ধাওয়ান?

সে যে কী পবিত্র ইনোসেন্স আর রূপকথা ঠেসে দেওয়া ছিল এই সিনে, সেটা না দেখলে বুঝতে পারবেন না আপনি।

কবীর খানের হিন্দি ছবিতে এই পুরো ব্যাপারটার দফা-রফা হয়ে শেষ! আগে থেকে কোথাও কোন রেফারেন্স নেই, হঠাৎ করে গোগো পাশা (শাহরুখের গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স) নামে এক ম্যাজিশিয়ান নাকি কুমায়ুন-এর জগতপুরে জাদু দ্যাখাতে হাজির! জন্মে কখনও তার নাম শোনে নি আগে, অথচ তার ডাকে স্টেজে উঠে মুগ্ধ হচ্ছে লোকে – এটা আট বছরের বাচ্চা করলে হজম হতো তাও। কিন্তু হাফ সেঞ্চুরি বয়স হল, এমন একটা লোককে এই আদ্যাখলাপনা করতে দেখলে মিটিমিটি হাসি আসবে না ভাই, বলুন?

অনেকে বলছে শাহরুখ নাকি এই একটা সিনেই পুরো ফাটিয়ে দিয়েছে। হবে হয়তো ভাই, আমি তো তেমন কিছু বুঝতে পারলাম না আদৌ। উলটে মনে হল ভদ্রলোককে চেষ্টা করে করতে হচ্ছে রোলটা। মন থেকে সায় ছিল না হয়তো, কিন্তু রিফিউজ করলে সেটাও আবার উটকো একটা নিউজ আইটেম হয়ে দাঁড়াবে বলে, জোর করে অভিনয়টা করতে হচ্ছে যেন। মুখস্থ করা লাইনগুলো আউড়ে দিচ্ছিলেন যখন, একবারও মনে হচ্ছিল না তাতে প্রাণ কিছু আছে বলে।

শাহরুখের বয়সী একটা লোক নেহাত মামুলি একটা বোতল নড়ার খেলা দেখিয়ে মুগ্ধ করছে সলমনের বয়সী কাউকে। আমি কিছু লিখছি না, সিনটা কেমন দাঁড়াতে পারে, নিজেই বরং ভেবে দেখুন সেটা!

খুদে অভিনেতা মাটিন রে ট্যাঙ্গু-কে ছবিতে রাখা হল দর্শকদের মনে সেই ‘বজরঙ্গী’র স্মৃতি উসকে দেওয়ার জন্য

যদি মূল ছবিটার কথা ভুলে গিয়ে এটাকে একটা ইন্ডিভিজুয়াল সিনেমা বলেই ভাবি, তাহলেও ক্যারেক্টারগুলোয় কেমন গণ্ডগোল দেখতে পাবেন, শুনুন। বান্নে চাচা (অভিনয়ে ওম পুরী) নামে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক আছেন ছবিতে, যিনি মনে মনে গান্ধী-অন্ত-প্রাণ! ছবিতে দেখবেন কথায় কথায় গান্ধীর অহিংসা থিওরি নিয়ে এই ভদ্রলোকের উপদেশ দেওয়ার ঘটা! বেশ তো! কিন্তু পুরো ছবি জুড়ে যে ভদ্রলোক এমন ভাব-ভালবাসার জন্যে ‘শান্তি চাই’ মার্কা থিওরি আউড়ে গেলেন, সেই ভদ্রলোক ছবির শুরুর দিকে কোন আক্কেলে ঠেলে-ঠুলে ভরতকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন শুনি?

হ্যাঁ, এই ভদ্রলোকের কথা শুনেই ওই ভরতের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে যাওয়া!

একটা লজিকও শোনা গেছিল এই সময় ভদ্রলোকের মুখে, যে বছর তিনেক যুদ্ধে থাকতে পারলে নাকি তারপর আজীবন ভারত সরকারের পেনসন পাবে ভরত, আর এতে ওর নিজের আর ওর নাদান দাদা লক্সমনের খাই-খরচটা উঠেও যাবে দিব্যি! এখন আপনি বলুন, তাহলে কি ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে, সারা জীবন বসে খাওয়ার বন্দোবস্ত করার জন্যে তিন বছরের জন্যে গান্ধীর ওই অহিংসাগুলো কুলুঙ্গিতে উঠিয়ে রেখে খুন-খারাপি চালিয়ে আসলেও চলে?

বান্নে চাচার ক্যারেক্টার-গ্রাফ বানানো হচ্ছিল যখন, এই বিশাল ঘাপলা তখন নজরে পড়ে নি কারও?

আর হ্যাঁ, ‘লিটল বয়’ থেকে কপি করতে করতে হঠাৎ একটা সিনের জন্যে অন্য একটা যুদ্ধের ছবি থেকে কপি মারতে গেলেন কেন কবীর? নিজের ইমাজিনেশন কি এত কম পড়ে গেছে তাঁর? ভারতীয় সেনাদলে যোগ দিয়ে ভরত যখন চীনের সঙ্গে লড়ছে, তখন চীনে ঘাঁটি দখলের সিকোয়েন্সটা তো পুরো যেন কাঁচা কাঁচা অপটু হাতে মেল গিবসনের লেটেস্ট ছবি ‘হ্যাকশ রিজ’ থেকে ঝাড়া! দেশি-বিদেশি সব ছবিই এখন নেটের দৌলতে এত বেশি হাতের নাগালে যে এরকম ঝাড়াঝাড়ি করার আগে সেই কথাটা ডিরেক্টররা একটু খেয়াল রাখবেন প্লিজ!

‘লিটল বয়’ ছবিতে ছিল আমেরিকার সঙ্গে জাপানের যুদ্ধ। এই ছবিতে যে সেটা পালটে ভারত-চীন হয়ে গেছে সেটা তো সবাই জানেন। শুধু যেটা জানেন না যে ‘লিটল বয়’তে গ্রামে থাকতে আসা জাপানি পুরুষের ক্যারেক্টারটা ধাঁ করে পালটে গেছে এখানে। জাপানি পুরুষের বদলে সেখানে এক চীনা সুন্দরী হাজির!

আরও পড়ুন:  বিরাটের সঙ্গে বিয়ের পরও কেন অনুষ্কাকে অভিনন্দন জানালেন না দীপিকা!?

প্রথম যখন শুট শুরু হয়েছিল ছবিটার, তখনই শুনতে পাওয়া গেছিল, এই ছবিতে সলমনের নায়িকা নাকি চীনের অভিনেত্রী জু জু! নেটে সার্চ মারলে তখন জু জু-র যে ছবিগুলো বেরচ্ছিল, তার কয়েকটা তো বেশ দম বন্ধ করার মতো! তখন থেকেই মনে হচ্ছিল যে, ছবিতে মহিলার অ্যাপিয়ারেন্সটা কেমন আর এই মহিলাকে সলমনের সঙ্গে কেমিস্ট্রির কোন হিসেবে জুড়তে গেলেন কবীর।

এখন ছবি রিলিজ হওয়ার পর দেখবেন, ও হরি, মহিলা এখানে সংযত ধীর-স্থির এক মা! আর শুধু তো একা তিনিই নন, সঙ্গে আবার মহিলার ছোট্ট একটি ছেলের ক্যারেক্টারও হাজির! আর হ্যাঁ, এই মহিলা এখানে সলমনের নায়িকা না মুণ্ডু। দুজনের কটা কথা হয়েছে, সেটাও তো প্রায় গুনে বলে দেওয়া যায়!

মূল ছবির জাপানি পুরুষটি পালটে গিয়ে সেখানে চীনা মেয়ে করে দেওয়ার কারণ তাহলে কী?

সেটা হল আসলে অনেকগুলো অঙ্ক মেলাতে গিয়ে। এক হচ্ছে, এই মেয়েটির ক্যারেক্টার না থাকলে আস্ত ছবিটা প্রায় মহিলাবর্জিত হয়ে পড়বে, আর এদেশের মেন স্ট্রিম সিনেমায় একটা নায়িকা না থাকলে ছবি কি বাজারে চলবে নাকি? মূল ছবিতে শুরু থেকে শেষ অবধি ছিলেন ‘লিটল বয়’-এর মা, এমনকি তাঁর দিকে দুষ্টু লোকের কু-নজর অবধি ছিল! এখন সে ক্যারেকটার তো কবীর ছেঁটে উড়িয়ে দিয়েছেন আগেই! তাই ভারত-চীন যুদ্ধ দ্যাখাতে চীন থেকে নতুন মেয়ে আমদানি না করে থাকবেন কী করে বলুন।

ছবিতে নায়িকার ভূমিকা এতই কম যে চীন থেকে নামী নায়িকা না এনে এদেশের কোন চাইনিজ এক্সট্রাকে দিয়েই সেই কাজটুকু করিয়ে নেওয়া যেত!

আর সেই মহিলার সঙ্গে ফ্রিতে একটা বাচ্চা রেখে দেওয়া হল বোধহয় স্রেফ ‘বজরঙ্গী ভাইজান’-এর কম্বিনেশনটা এই যাত্রাতেও কাজ ক’রে যায় কিনা, সেটা দ্যাখার জন্যেই।

এভাবে এদিক থেকে দু’ আনা আর ওদিক থেকে আড়াই আনা জুড়ে জুড়ে কি সিনেমা হয়, কবীর?

‘বজরঙ্গী’ থেকে সেই ম্যাজিকটা যদি ফিরিয়েই আনতে চাইতেন, তাহলে প্রথমে তো আপনার ছবির গল্পটা ঠিক করে লেখা দরকার ছিল ভাই! বজরঙ্গী ভাইজানের গল্প চিত্রনাট্য লিখেছিলেন কে. ভি. বিজয়েন্দ্রপ্রসাদ, মানে সেই ‘বাহুবলী’ খ্যাত ডিরেক্টর এস. এস. রাজামৌলী’র বাবা। এবারের গল্পটাও তাঁকেই লিখতে দিলেন না কেন?

তিনি লিখলে এটা তো অন্তত হতো না যে পিঠে গুলি খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়বে ভরত আর শেষে যখন খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁকে, তখন ব্যান্ডেজ বাঁধা থাকবে তাঁর মাথায় এবং হাতে!

আপনার দোষ নেই, কবীর। অরিজিনালে যা ছিল, কপি মেরেছেন তাই! অরিজিনালে পিঠে গুলি খাওয়ার শটটা ছিল না, পাকামি মেরে সেটা অ্যাড করে দিয়েছেন এখানে। এরপর অরিজিনালে মাথায় ব্যান্ডেজ ছিল, সেটাকেও কপি পেস্ট বসিয়ে দিয়েছেন, খেয়াল ছিল না যে এ যাত্রা ওই ব্যান্ডেজের জায়গা পালটে বুকে-পিঠে করে নিলেই বেটার হতো বরং!

গোটা ছবি জুড়ে সলমনের মাপের এক হিরো স্রেফ খোকামো করে কাটিয়ে দেবেন, না কোন মারপিট, না নায়িকাকে নিয়ে তুমুল রোমান্স, না কোন দিল-থরথর ড্রামা! তবু কোন অঙ্কে এ ছবি হিট হতে পারে বলে ভেবেছিলেন, বলবেন একটু প্লিজ?

বাবা বলেছিলেন, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প আসলে মজাদার খেলার জায়গা। ১০০০ পয়েন্ট তুলতে পারলে দুর্দান্ত উপহার পাওয়া যাবে।

শুধু বিশ্বাস রেখে উতরে যাওয়ার গল্প সারা পৃথিবী জুড়ে বোধহয় লক্ষ-কোটি আছে! সাপে কাটা স্বামীকে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার বিশ্বাসে সবে-বিয়ে-হওয়া বউ এখানে স্বর্গ অবধি যায়। বা, স্রেফ স্বপ্নে বন্ধু চ্যাংকে দেখে, তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে সুদূর ফ্রান্স থেকে এসে টিনটিন তিব্বতের শৃঙ্গচুড়োয় ওঠে।

‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ (১৯৯৭) বা ‘আ ভেরি লং এনগেজমেন্ট’ও (২০০৪) তো স্রেফ বিশ্বাস করে জীবন-যুদ্ধে জিততে পারার গল্প। আর কটা বলবো, বলুন?

ইন্টারন্যাশনাল ছবি দ্যাখার অভ্যেস আছে, এমন দর্শকের জন্যে তাই আপনার এ ছবিটায় নতুন কিছু নেই। আর শুধু ভারতীয় ছবি দ্যাখেন যাঁরা, তাঁদের আবার মনে হবে, দরকারি মশলাগুলো কোথায়!

‘লিটল বয়’ দেখতে গিয়ে চোখ দুটো ভিজে উঠেছিল প্রায়!

আর ‘টিউবলাইট’ দ্যাখার পর মনে এল ওই শব্দটা – হায়!

NO COMMENTS