এক চিরহরিৎ গাছের খোঁজে

    3
    6232
    রুচিরা মন্ডল
    রুচিরা মন্ডল বেথুন কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্রী। পেশায় তথ্য প্রযুক্তি কিন্তু লেখায় নেশা। উড়ালপুলে দীর্ঘ দিন লিখছেন গল্প। একসময় চিন দেশেও ছিলেন। বর্তমান বসবাস ব্যাঙ্গালুরু শহরে।
    Bengali story by Ruchira mandal

    সম্পর্ক ব্যাপারটা অনেকটা গাছের মতো। ঠিক পরিমাণ মাটি, জল, হাওয়া, আলো আর উষ্ণতা পেলে তবে সে অঙ্কুরিত হয়। তারপরেও সারা জীবন তার চাহিদাগুলোর পর্যাপ্ত জোগান দিয়ে প্রতিপালন করে যেতে হয় তাকে। কোন উপকরন ঠিক কতটা পরিমানে পেলে গাছ হাসবে, খেলবে, নিজের আনন্দে বড় হবে সে সমীকরন বড় জটিল ও আপেক্ষিক। বদলানো সময়ের বেহিসেবী ঘটনার ছন্দে তা বদলে যায় যখন তখন। বড় অভিমানী, বড় সংবেদনশীল সে। একটা কিছুর অভাব পড়লেই হল। ফুল আসবে না, ফল ধরবে না, অথবা শুধু শুকিয়েই মরে যাবে। কিছুদিন পরে গাছের আর কোন চিহ্নই থাকবে না কোথাও। বড়জোর শুধু ফসিল পড়ে থাকবে তার অস্তিত্বের নিদর্শন হিসেবে।

    অরুনিমা জানে সেই সব ফসিলের গায়ে লেগে থাকা অন্ধকার কী অসম্ভব গাঢ়। আর ঐ চিহ্নহীন মৃত গাছেদের শূন্যতা কি ভয়ংকর বরফ শীতল। এক একদিন যেদিন আজকের মতো দিনের বেলাও অন্ধকার করে থাকে আকাশ। ঘন কুয়াশারা ঘরের দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে পড়ে তার শরীরে, তার চেতনায়। তখন অরুনিমা তার কুয়াশাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে যেদিকে তাকায় চোখে পড়ে শুধু বিপর্যয়ের চিহ্ন। চারিদিকে ভাঙ্গাচোরা কিছু গাছ। দূরে দাঁড়ানো গুটি কয়েক পর্নমোচী গাছের পাতাহীন আবছা অবয়ব। ধূ ধূ মরুভূমির নিঃসঙ্গতা গ্রাস করে ওকে। মনের সমস্ত অলিগলি ঘুরে ও খুঁজতে থাকে একটা সুস্থ সবল পাতা ভরা চিরহরিৎ বৃক্ষের আদুরে ছায়া, যার নিচে বসে জিরিয়ে নিতে পারে কিছু পল।

    কিছুই পায়না। মাঝখান থেকে দেখা হয়ে যায় তার সঙ্গে। বিনা মেঘে টাপুর-টুপুর বৃষ্টির মতো তার উপস্থিতি। অপ্রস্তুত অবস্থায় আপাদমস্তক ভিজিয়ে নাকাল করাই তার কাজ। এড়াতে চাইলেও এড়ানো যায় না তাকে। সে যে তার মনেরই ছায়া মন। উদ্বিগ্ন গলায় ওকে জিজ্ঞাসা করে, কি খুঁজছিস এখানে?

    – আমার বাড়ি। হারিয়ে ফেলেছি যেন কোথায়।

    – কেন? তোর বাড়িতেই তো এখন আছিস। এই বেজিং-এ।

    – এ তো আমার বাড়ি নয়। এই বাড়ি আমার ছোট মেয়ে দোয়েল, দীপক আর ওদের ছেলেমেয়ে রিয়া আর রোহণের। এ বাড়ি ছেড়ে আমি আজ নয় কাল চলেই যাব।

    – কোথায় যাবি?

    – জানি না।

    – তোর বড় মেয়ে দোলনের বাড়ি যেতে পারিস। সিঙ্গাপুরে। ওটাও তো তোর নিজের বাড়ি।

    – ওটা তো দোলন, মানস আর ওদের ছেলে সোহমের বাড়ি। ওটা আমার বাড়ি হবে কি করে?

    – তাহলে তোর বাড়ি কি ক্যালিফোর্নিয়ায়? যেখানে তোর ছেলে দর্পন থাকে।

    – না না, আমি তো সেখানে একবার শুধু বেড়াতে গিয়েছিলাম। সে কোনদিন সেখানে যেতেও বলে না আমায়।

    – তাহলে তোর বালিগঞ্জের বাড়িতে যা..যেখানে স্বামী সন্তান নিয়ে বহুকাল কাটিয়েছিস তুই। সে বাড়ির প্রতিটা জিনিষ তো তোরই পছন্দে বানানো।

    – ওটা আমার স্বামী দেবাঞ্জনের বাড়ি। ও বাড়িতে থাকার আমার ষোল আনা হক তো আছে। কিন্তু ওখানে থাকলে আমি হাঁপিয়ে যাই। মনের আরাম পাই না।

    – তাহলে উল্টোডাঙ্গার সেই ফ্ল্যাটটা যেটা দোলন তোকে কিনে দিয়েছিল। সেটা তো একান্তই তোর নিজের।

    – সে বাড়ি শুধু নামেই আমার। যে বাড়ির শুধু ভাড়ার টাকাটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক, সে বাড়িকে কি আমার বলা যায়?

    – তাহলে কোথায় তোর নিজের বাড়ি?

    – জানিনা কোথায়। তবে কোথাও নিশ্চয় আছে। যেখানে যাওয়ার কথা ভাবলেই আলো হয়ে যাবে মনটা। যেখানে আমি সব মুখোশ খুলে ফেলে দিন কাটাতে পারব।

    – তেমন বাড়ি কি হয় কোথাও?

    – হয় হয়। সে বাড়ি আমি একদিন ঠিক খুঁজে পাবো। দেখে নিস।

    ‘আন্টি, ব্রেকফাস্ট।’ কাজের মেয়ে বেইবেই সকালে জলখাবারের প্লেটটা ধরিয়ে দিয়ে ঘরে আলো জ্বালিয়ে দেয়। অরুনিমা ফিরে আসে বাস্তবে, তার আলোকজ্জ্বল সুখী বর্তমানে। খাবার নিয়ে লিভিং রুমে আসে। সোফার গদিতে নিমজ্জ্বিত করে নিজেকে।  বাংলো প্যাটার্নের এই বাড়িটা খুব ভাল পেয়েছে দোয়েল। শহরের কেন্দ্র থেকে একটু দূরে। পলিউশান কম। রাস্তায় হাঁটতে বেরোলেই মন ভালো হয়ে যায়। সারি দিয়ে একই রকম বাংলো বাড়ি। সুন্দর সাজানো, গোছানো, পরিষ্কার। লোকজনের ভীড় নেই। কমিউনিটির নিজস্ব ক্লাব আছে। সেখানে সবরকম বিনোদনের ও শরীরচর্চার আয়োজন। এছাড়াও শপিং মল, ওষুধের দোকান, রেস্টুরেন্ট সবই হাতের কাছে। চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকে সব। নতুন দেশে এসেও জীবনযাপনের কোন অসুবিধে নেই।

     

    অবশ্য অসুবিধে কবেই বা ছিল। যা ছিল সব তো সে তেরো চোদ্দ বছর আগে বালিগঞ্জের বাড়িতে ফেলে রেখে এসেছিল। তিন ছেলেমেয়েই তখন মোটামুটি স্বাবলম্বী। দোলন বিয়ে করে মানসের সঙ্গে সেটল করল সিঙ্গাপুরে। প্লেনে করে উড়িয়ে নিয়ে গেল মাকে। চাকরি ছেড়ে দিল অরুনিমা। তারপর ভারতবর্ষ ছেড়ে পরিচিত-পরিজন  ছেড়ে যেন জেট গতিতে রাজার হালে কেটে গেছে দিন। এয়ারহোস্টেস দোলনের মা হওয়ার সুবাদে ওর সঙ্গে অনেক দেশ বিদেশ ঘুরেছে সে। তারপর সোহম জন্মালো। চাকরি ছেড়ে মাস্টার্স পড়তে শুরু করল দোলন। অরুনিমা সেই সময় সোহমকে দেখাশোনার পুরো দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল। সোহম যখন বছর তিনেকের তখন দোয়েল আর দীপক নতুন চাকরি নিয়ে মেলবোর্নে এলো। দু মাসের রোহণকে দেখাশোনা করার জন্যে অরুনিমা চলে এলো দোয়েলের কাছে। সেই থেকে ওর সঙ্গেই আছে। ইতিমধ্যে দোয়েলের মেয়ে রিয়া জন্মেছে। নাতি-নাতনী-মেয়ে-জামাই নিয়ে ভরা সংসারে তার হৈ হৈ করে কোথা দিয়ে কেটে গেছে বছরের পর বছর।

     

    মাস ছয়েক হল দোয়েল নতুন চাকরি নিয়ে বেজিং এসেছে। এরকম দীর্ঘ শীতের শহরে অরুনিমা আগে কখনো থাকে নি। শীত সেই যে অক্টোবর মাস থেকে জাঁকিয়ে বসেছে, যেতে চাইছে না কিছুতেই। চীনা নতুন বছর এসে গেল। অসংখ্য শব্দবাজি পুড়িয়ে, শহরকে আলোকসজ্জায় সাজিয়ে, সব দোকানে বর্ষশেষের সেল দিয়ে, টানা সাতদিনের ছুটি খেয়ে শেষ হয়ে গেল বসন্তোৎসব। তাও বসন্তের চিহ্ন মাত্র নেই কোথাও। বাইরে তাকালেই চোখে পড়ে বরফ-শীতল রাজ্য। সেখানে মৃত্যুর মতো গভীর নিঃস্তব্ধতা। অথচ নিজের বুকের ভেতরে অসংখ্য কথার আলোড়ন। টাপুর-টুপুর মনের ক্লান্তিহীন কথপোকথন কখনো থামে না সেখানে। নিজের সঙ্গে নিজে কত কথা বলা যায়? মাঝে মাঝে মনে হয় ও বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে নামার পথে চলেছে তার জীবন। বেলা গড়িয়ে গেলে ছায়ারা তো দীর্ঘই হতে থাকে। কে জানে কোনদিন সে ছায়া দীর্ঘ হতে হতে তার কায়াকে ছাপিয়ে যাবে আর ঘেঁটে দেবে তার এতদিনের সাজানো সুখের রাজ্যপাট। তারপর মৃত্যু এসে নিঃস্তব্ধ করে দেবে ওর মনের টাপুর-টুপুর আওয়াজ। তার আগে একবার নিজের ঘরে ফিরতে চায় সে। কিন্তু ঘর মানে তো শুধু চার দেওয়ালের বন্ধন বা মাথার ওপর একটা ছাদ নয়। ঘর মানে এক চিরহরিৎ সম্পর্ক।

     

    ছোটবেলায় মা বাবা নামক চিরহরিৎ বটবৃক্ষের তলায় কি আনন্দেই না কেটে গেছে দিনগুলো। অরুনিমা আর দেবাঞ্জনের মাঝে তারা রোপণ করেছিল একটা বীজ। আশা ছিল ভবিষ্যতে সে বীজ থেকে জন্ম নেবে আর এক চিরহরিৎ বৃক্ষ। সে গাছ বৃক্ষে পরিণত হওয়ার আগেই ভেঙ্গে পড়ে। অরুনিমাকে সে ভাঙ্গন তেমন করে ভাবায় নি। কিন্তু মা-বাবা যেদিন পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিল তখন খুব জোর ধাক্কা খেয়েছিল সে। শিকড়হীনতার যন্ত্রনা অনুভব করেছিল। নির্ভার, বন্ধনহীন, উড়ন্ত এক পাখির মতো লেগেছিল নিজেকে, যার বসার জন্যে কোন গাছ নেই কোথাও। উপলব্ধি করেছিল মানুষ যতই বন্ধন থেকে বেরোনার স্বপ্ন দেখুক, আসলে সে বন্ধনের মধ্যেই নিরাপত্তা চায়। সে আঁকড়ে ধরেছিল ছেলেমেয়েদের। ওরাও তাদের ডাল-পাতা-ফুল-ফল নিয়ে ওকে ঘিরে রেখেছিল। খুব কঠিন ছিল সে দিনগুলো। কিন্তু আজ সব কঠিন রাস্তা পেরিয়ে জীবন যখন মসৃণ ভাবে ছুটছে তখন কেন যে মাঝে মাঝেই এত শীত করে তার! মনে হয় অসংখ্য পর্নমোচী গিরগিটি সম্পর্কের জটিল জঙ্গলে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। এক সম্পর্ক থেকে আর সম্পর্কের কাছে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত সে। কবে শেষ হবে এই ধূসর বিষন্ন শীতকাল?

    অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একদিন বসন্ত পদার্পন করে শহরে। সকালে উঠে জানলায় দাঁড়িয়েই অরুনিমার চোখে পড়ে তার চরণচিহ্ন। ছোটবেলায় পড়া সহজপাঠের লাইনগুলো গুনগুনিয়ে ওঠে মনের মধ্যে। ‘কাল ছিল ডাল খালি। / আজ ফুলে যায় ভ’রে। / বল দেখি তুই মালী / হয় সে কেমন ক’রে।’ ঠিক দুদিন আগেও বাড়ির গেটের সামনের চেরী গাছটা পাতাহীন ডালসর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজ কেমন গোলাপী কুঁড়িতে ভরে গেছে সারা গাছ। কি সুখী সুখী লাগছে গাছটাকে। চনমনে কমবয়সী কিশোরীর মত উচ্ছল, উজ্জ্বল। ঠিক ওরকমই রঙে ভরা ছিল তার কিশোরীবেলাটাও। চার ভাইবোন, পিঠোপিঠি, বন্ধুর মতো বড় হয়েছে। মার সেলাই মেসিন ছিল। পূজো, জন্মদিন আর পয়লা বৈশাখে নতুন জামা পেত ওরা। বাবার সঙ্গে গিয়ে নিজে পছন্দ করে কাপড় কিনে আনত মা। তারপর দিন নেই রাত নেই সময় পেলেই বসে যেত সেলাই মেশিনে। আর ওরা দুই বোনে নানা অজুহাতে ঘুরঘুর করত মায়ের সেলাই মেসিনের আশেপাশে। অবাক হয়ে দেখত মা কেমন ম্যাজিকের মতো কাপড় কেটে, সেলাই করে জামা প্যান্ট বানাচ্ছে।

     

    বাবার ছিল বদলির চাকরি। চার পাঁচ বছর ছাড়াই সমস্ত সংসার বাক্সে বেঁধে-ছেঁদে ওরা চলে যেত নতুন জায়গায়। মায়ের একটুও ভালো লাগত না এভাবে যাযাবরের মতো এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে। বাবার বদলির অর্ডার এলেই তাই মায়ের মুখটা গম্ভীর হয়ে যেত। গুনগুন গান গাওয়া বন্ধ। রুমালে ফুল তোলা বন্ধ। খাওয়ার টেবিলে তরকারির সংখ্যা কম। ওরা অবশ্য সে সব বিশেষ গুরুত্ব দিত না। মা সবাইকে একটা করে বাক্স দিয়ে বলত, এখানে নিজেদের জিনিষ সব গুছিয়ে নাও। দেখতে দেখতে চলে আসত সেই দিনটা। ট্রেনে চেপে বসত। দেখতে দেখতে মাঠ, বন, পাহাড়, নদী, গ্রাম, শহর পেরিয়ে ছুটে চলেতো ওরা। জানলার রডে মুখ ঠেকিয়ে নির্নীমেষ দেখত ভারতবর্ষকে। বাবা চিনিয়ে দিত জায়গাগুলো, ইতিহাসের গল্প শোনাতো। মা সময় মতো জুগিয়ে যেত খাবার। আজও দিনগুলো চোখের সামনে ভাসে। তারপর নতুন বাড়িতে পৌঁছেই কে কোন ঘরে থাকবে সে নিয়ে শুরু হয়ে যেত জল্পনা-কল্পনা। সবার আগে দখল করতে হবে নিজের পছন্দের ঘরটা। সাজাতে হবে মনের মতো করে ।

     

    একঝলক চোখ বুলিয়ে নেয় ঘরটায়। দেওয়াল ঘেঁষে পাশাপাশি বইয়ের আর জামাকাপড়ের আলমারি। তারপাশে একটা ছোট টেবিলে তার সেলাই মেশিন। অন্যদিকে খাট। খাটের পাশের টেবিলে ফুলদানি, চশমা, গল্পের বই, তার প্রেসারের ওষুধ, আরো নানান টুকিটাকি। সবই পরিপাটি করে সাজানো। শুধু বিছানার চাদরটা খুব নিস্প্রভ। জানলার পর্দাগুলোও মানাচ্ছে না। বাইরে এমন বসন্তের উদ্দাম খুশি খুশি সাজ। ঘরের আবহাওয়াটা সে তুলনায় বড় গুরু গম্ভীর। নাহ আজই বদলাতে হবে। কাজের মেয়েটিকে ডাক দেয়।

    – বেইবেই। উওমেন ছুই ছুই। মাই তুংসি।

    চলো আমরা বাজারে যাই। বেইবেই-এর সঙ্গে এরকম ভাঙ্গা ভাঙ্গা চীনা বলে অরুনিমা আর না পারলে গ্রামারহীন ইংরেজী। বেইবেই তার শুদ্ধ চীনার সঙ্গে মিশিয়ে দেয় অশুদ্ধ ইংরেজী। বাকিটা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। এভাবে কথা বলেই দুজনে পরস্পরের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয় দিব্যি। সম্পর্কের গাছ বড় হতে থাকে আপন খেয়ালে।

     

    বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করতেই নাকে এসে লাগে গন্ধটা। সব রকম ফুলের গন্ধ মিশে খুব মিষ্টি একটা সুবাস ছড়িয়েছে হাওয়ায়। রঙ লেগেছে শহরে। চেরী, পীচ, জুঁই, এপ্রিকট, ম্যাগনোলিয়া আরও নাম না জানা সব গাছগুলোয় সাদা, বেগুনি, হলুদ, গোলাপী কুঁড়ি এসেছে। ঘাসগুলো সবুজ হচ্ছে। গাছের ডালের কালচে রং-এ সবুজের ঔজ্জ্বল্য। শুরু হয়ে গেছে গাছে গাছে জল দেওয়া। মনটা খুশি খুশি লাগে। মাছ মাংসের বাজারের দিকে ঢুকলো না আজ। ফ্রিজে এখনো অনেকটা চিকেন আছে। টাটকা ফল, সব্জী কেনা শেষ হতে ঢুঁ মারে ছিটকাপড়ের দোকানটায়। হাল্কা হলুদের ওপর ছোট ছোট নানা রঙের ফুলের ছিটকাপড়টা বেশ চোখে লাগল। আলাদা আলাদা শেডে কিনে নিল দু’তিন খানা পিস। বিছানায় ওপর বেশ মানাবে। পর্দার জন্যেও বেশ উজ্জ্বল রঙের চাইনীজ ফ্লোরাল প্রিন্টের কাপড় কিনল কয়েক মিটার। সারা দুপুর ধরে সেলাই মেসিনে বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, জানলার পর্দা বানাল। নিজের আর দোয়েলের ঘরের সব সাজ বদলে দিল। এতক্ষনে মনে হল বসন্ত ঘরের ভেতরেও পদার্পন করেছে।

    বিকেল হতেই স্কুল থেকে ফিরে পড়ে রিয়া, রোহণ। রোহণকে রোজ সন্ধ্যেবেলা একটু পড়তে বসায় অরুনিমা। কদিন আগে দোয়েল অভিযোগ করেছে ও নাকি রোহণকে পড়াশোনার জন্যে অকারনে বেশি চাপ দিচ্ছে। অরুনিমা বলার চেষ্টা করেছিল, ‘তোদের অত চাপ দিয়ে ধরেবেঁধে পড়াশোনা করিয়েছিলাম বলেই না তোরা এই জায়গায় পৌঁছেছিস আজ!’ ঝাঁঝালো উত্তর ফিরে এসেছিল, ‘না হলেও পৌঁছতাম। ছোটবেলায় তুমি আমাদের ফার্স্ট হতে হবে বলে যা মানসিক চাপ তৈরী করতে! ফার্স্ট হতে গিয়ে জীবনের সব ছোট ছোট আনন্দগুলো মিস করেছি।’ অরুনিমা তর্কে যায় নি। ওরা যা বলবে সেটাই শেষ কথা। দেবাঞ্জনের যে গুনটা সব থেকে বেশি অপছন্দ করত সে, ঠিক সেই গুনটাই তার সব কটা ছেলেমেয়েদের মধ্যে খুব বেশী করে উপস্থিত। তার শিক্ষা কোথাও কাজে লাগে নি।

     

    আজও অফিস থেকে ফিরতে বেশ রাত হয় দোয়েলের। খেতে বসতেই রোহণ মায়ের গায়ে পড়তে শুরু করে

    – মা। জানো আজ স্কুলে একটা খুব ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেছে।

    – পরে শুনবো। এখন খুব টায়ার্ড আমি। যাও গিয়ে দিদার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ো।

    – তাড়াতাড়ি বলে দিই?

    – কাল শুনবো।

    রোহণ মুখ ব্যাজার করে চলে যায় দিদার ঘরে। অরুনিমা তাড়াতাড়ি নাতির পেছন পেছন যায়। দোয়েল গম্ভীর ভাবে বলে – ওকে একা যেতে দাও।

    – কাঁদছে ছেলেটা। একটু শুনেই নে না তার গল্পটা।

    – কাঁদুক। গল্প শোনার সময় কি আজকেই শেষ হয়ে গেল নাকি?

    খাওয়া শেষ করে শোওয়ার ঘরে ঢোকে দোয়েল। তখনই নজর পড়ে পর্দাটার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে যেন ফেটে পড়ে

    – সারাদিন কি তোমার আর কোন কাজ নেই? এই সব বানিয়ে পয়সা নষ্ট করো। সস্তার কাপড় দিয়ে পর্দা বানাতে ইচ্ছে করে বানাও। কিন্তু নিজের ঘরে লাগাবে। আমার ঘরে এসব যেন না ঢোকে।

    – সস্তা তো কি হয়েছে? দেখতে কেমন সুন্দর বল। তুই শুধু সব পয়সা দিয়ে বিচার করিস।

    – গাধার মতো পছন্দ নাহলে এটা কারো সুন্দর লাগে? এমন ফুলপাতা ছাপা পর্দা বস্তিবাড়িতেও কেউ লাগাবে না।

     

    ‘গাধা’ কথাটা খট করে কানে লাগে অরুনিমার। টাপুর টুপুর মন ভেংচে ওঠে বিশ্রী ভাবে – আবার তুই গাধাতে পরিণত হয়েছিস! তবে যে তুই নিজেকে পক্ষীরাজ ঘোড়া ভাবতিস।

    মাথার মধ্যে পুরোন দিনের অজস্র ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে চলে। সে ভুলতে পারে না তার গাধা-জন্মকে।

     

    তিনটে ছেলেমেয়েই তখন খুব ছোট ছোট। তাদের সামলে সংসার করতে গিয়ে অরুনিমা নাজেহাল, বিপর্যস্ত। সারাদিন সংসারে মুখ বুজে কাজ করে যেত সে। নিজের মতামত প্রকাশ করতে গেলেই অসংখ্য বিষাক্ত কথার তীর ঝাঁকে ঝাঁকে এসে আছড়ে পড়ত। একটা শাড়ী ছিঁড়ে পরার অযোগ্য না হয়ে গেলে দেবাঞ্জন নতুন কিনে দিতো না। একটা গল্পের বই কিনতে চাইলে এমন ভাবে তাকাতো যেন কোন নিষিদ্ধ বস্তু চেয়ে ফেলেছে সে। কোন সিনেমা দেখা নেই, কোথাও বেড়াতে যাওয়া নেই, কোন প্রেমালাপ নেই, কোন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প গুজব নেই। সারাদিন শুধু রাঁধো, খাও, ঘর গুছোও, বাসন মাজো, জামা কাপড় কাচো, ছেলেমেয়ে সামলাও। বিনা মাইনের কাজের লোকেরও বুঝি এর থেকে ভালো স্ট্যাটাস থাকে। রোজ রোজ দেবাঞ্জনের দেশের বাড়ি থেকে লোক আসত। শহরে কোন দরকার থাকলেই সবাই এসে ঘর দখল করে জমিয়ে বসে যাবে। মুখ বুজে তাদের সেবা করে যেতে হবে।

     

    তার জীবন থেকে তখন চিরতরে বিদায় হয়েছিল বসন্ত। গ্রীষ্ম এসেছিল তার প্রচন্ড দাবদাহ নিয়ে। দিন-রাত মুখ বন্ধ করেই কাটিয়ে দিত অরুনিমা। টাপুর-টুপুর মন সেই দুঃখেও তাকে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতো।

    – তোর জন্মই হয়েছে গাধা লগ্নে। এত কষ্টই পাস যদি এরকম স্বামীর সঙ্গে ঘর করিস কেন?

    – বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে সাহসে কুলায় না। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?

    – বাবা মা তো এখনো বেঁচে আছেন। তারা কি মেয়েকে ফেলে দেবেন?

    – ফেলে দেবে না। কিন্তু ও বাড়িও তো আর আমার বাড়ি নেই। আমার ঘরটা দখল করে নিয়েছে বড়দার মেয়েরা। এখানে তবু আমার একটা নিজস্ব ঘর আছে।

    – তাই বল। তুই তোর নিজের ঘর ছেড়ে কোথাও যেতে চাস না। তাহলে কেন রাগ করিস লোকটার ওপর?

    – সে কি আর সাধে করি? মহাপুরুষ লগ্নে জন্ম গ্রহন করা মানুষের সঙ্গে গাধা লগ্নে জন্মগ্রহন করা মানুষকে যদি সংসার করতে হয়। তেলে জলে কোনদিন মিশ খায়?

     

    দেবাঞ্জন ছিল কলেজের প্রফেসার। যেমন উচ্চশিক্ষিত তেমনই কাজের মানুষ। গান্ধীজি তার জীবনের আদর্শ। খুব সাধারন ভাবে জীবন যাপন করা ও উচ্চ মার্গের চিন্তা ভাবনা করা তার মহৎ অভ্যাস। তিনি যাহা বলেন ধ্রুব সত্য বলেন, সত্য বই অর্ধ সত্যও বলেন না। ওনার কথা শেষ হওয়ার পর কোন কমা বা সেমিকোলন থাকত না। একেবারে ফুল স্টপ। এরপরে আর কোন কথা হতে পারে না। এরকম একজন মানুষকে মহাপুরুষ ছাড়া আর কি-ই বা ভাবা যায়। সারা লিভিং রুমটা দখল করে সকালে বিকেলে এক ব্যাচ করে ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী পড়াতো। কতবার অরুনিমা বলেছে অন্য কোথাও ঘর ভাড়া নিয়ে টিউশান করতে। গ্রাহ্য করত না। এপাশে কোন ছাত্রের সঙ্গে অরুনিমা দুটো হেসে কথা বললেই তার চরিত্র নিয়ে নোংরা সন্দেহ করত।

     

    কিন্তু গাধা-জন্ম তো সে একদিন কাটিয়ে উঠেছিল। এই যে এত বছর সে মেয়েদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়ে। এই যে এত সুখ, প্রাচুর্য্য আর আনন্দে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। এ তো তার পক্ষীরাজ জন্মই। বালিগঞ্জের বাড়ি থেকে যেদিন বেরিয়ে এলো সেদিন সে যেন মুক্ত হয়েছিল কোন দেবতার অভিশাপ থেকে। তার জীবনের সব থেকে প্রিয় সম্পর্কগুলোর উষ্ণতায় তার মন থেকে মুছে গিয়েছিল পুরোন সব ক্ষত। শরৎকালের মতো নির্মল ছিল দিনগুলো। সুখ পদ্মপাতায় জল একথা বিশ্বাস করে না অরুনিমা। এক সময় তার জীবনে সুখের পরশ ছিল না। তারপর সুখ যখন এসেছে সমুদ্রের মতো আদিগন্ত ভরিয়ে সারা পৃথিবীকে জানান দিয়ে এসেছে। ছেলেমেয়েরা সবাই আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। দোলন ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়, দোয়েল এক কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার, ছেলে ডক্টরেট পেয়েছে গতবছর। সবাই শারিরীক ভাবে সুস্থ। একটা জীবন থেকে মানুষ এর থেকে বেশি আর কি চাইতে পারে?

    আসতে আসতে বেজিং-এ গরম পড়ল। ছোট ছোট মরশুমি ফুলে সেজে উঠলো রাস্তা, পার্ক। রং-বেরঙের জামাকাপড়ে ছোট বড় সব বয়সের মানুষে ভরে উঠেল পার্ক, খেলার মাঠ, দোকান, বাজার। নীল আকাশের বুকে বিচিত্র আকারের অসংখ্য ঘুড়ির মেলা। উৎসব উৎসব ভাব চারিদিকে। অরুনিমা আনেকটা সময় বাড়ির বাইরে কাটায়। বাড়িতে ঢুকলেই বড় নিঃসঙ্গ লাগে। যে কটা বাংলা আর হিন্দী সিনেমা স্টকে আছে তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কতবার যে দেখে। বাংলা বই পায়না। গল্পের বইএর নেশায় গাদা গাদা ইংরেজী নভেল পড়ে চলে। ছিটকাপড় কিনে সেলাই মেসিনে কিছু না কিছু বানানো ছিল তার নেশা। কিন্তু দোয়েলের সঙ্গে রাগারাগির পর সেটাও বন্ধ করে দিয়েছে।

     

    দড়াম করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হয়। দোয়েল অফিস বেরিয়ে গেল। মা আসছি, এইটুকু কথাও তো বলে যেতে পারত। এত কম কথা বলে দোয়েল! সারা সপ্তাহে কুড়ি-তিরিশটা বাক্য কি একটা সম্পর্ক রক্ষা করার জন্যে পর্যাপ্ত? মাঝে মাঝে মনে হয় মা আর মেয়ের মধ্যে এক সমুদ্র দূরত্ব তৈরী হয়েছে। যেন আলাদা আলাদা দ্বীপে বসবাস করে তারা। কেউ কাউকে চেনেনা, জানেনা। মাটি, জল, হাওয়া আছে। কিন্তু কোন আলো নেই কোথাও। কেউ কারো মন দেখতে পায়না। নাকি দেখতে চায় না? তাদের সম্পর্ককে অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে।

    টাপুর-টুপুর কথা বলে ওর ছায়ামন

    – মা-মেয়ের সম্পর্ক কোনদিন মরে যেতে পারে না। রক্তের টান।

    – তাই ফসিলটা পড়ে থাকবে হয়তো।

    – কিন্তু সম্পর্ক রক্ষার দায় কি তার একার? তুইই বা কটা কথা বলিস তার সঙ্গে?

    – দশটা কথা বললে একটা সংক্ষিপ্ত উত্তর আসে। তাই আমিও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি।

    – একবার জিজ্ঞাসা করতে তো পারিস কেন ও তোর সঙ্গে কথা বলে না।

    – জিজ্ঞাসা করতে সংকোচ হয়।

    – সংকোচ হয় নাকি ভয় পাস? কিছু কঠিন কথা বলে বসে যদি।

    – মাঝে মাঝে বড় ক্যাটক্যাট করে কথা বলে দোয়েল। ঠিক ওর বাবার মতো। তখন ওকে সহ্য করতে পারি না আমি। শুধু মেয়ে বলে বরদাস্ত করে চলি।

    – বরদাস্ত করিস নাকি তোর আর কোথাও যাওয়ার নেই তাই মেনে নিতে বাধ্য হোস।

    – দোলন রোজ ডাকছে। ইচ্ছে করলেই চলে যেতে পারি সিঙ্গাপুরে। আমার কি থাকার জায়গার অভাব!

    – যা না দেখি কেমন পারিস।

    – চলে যেতাম। কিন্তু দোয়েল সবে নতুন চাকরিতে ঢুকেছে। ছেলেমেয়েকে শুধু কাজের লোকের ভরসায় বাড়িতে রেখে অফিস গেলে ও কাজে মন দিতে পারবে না। ওর কেরিয়ারে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।

    – এই ভাবে থাকলে তুই সত্যিই বোবা হয়ে যাবি একদিন।

    – কেন? এই তো বেশ কথা বলছি তোর সঙ্গে।

    – একটা রক্ত মাংসের সঙ্গী চাই তোর। মনের মতো সঙ্গী হবে সঙ্গীতের মতো। সেই সঙ্গীতে থাকবে ভালোবাসার সুর। যে সুর সুরার মতো নেশা ধরাবে মনে।

     

    অরুনিমা চোখ বন্ধ করে। প্রথমেই মনে পড়ে মাকে। মাকে ছাড়া ও এক মুহূর্ত জীবনও কল্পনা করতে পারত না। অথচ মার কথা আজ মনেই পড়ে না তেমন। মা মারা গেছে প্রায় তিরিশ বছর হয়ে গেল। সময় কি রকম ভুলিয়ে দেয় সম্পর্ককে। বাবা সেই তুলনায় অনেক বছর বেঁচে ছিল। হয়তো সেই জন্যেই বাবা এখনো বুকের মধ্যে অনেকটা জায়গা জুড়ে বসবাস করে। বাবাকে শেষ দেখাটাও দেখতে পায়নি সে। মাত্র একমাসের জন্যে অসুস্থ বাবাকে দেখতে গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল বাবা আর বেশিদিন নেই। তাও দোয়েল এমন জোরজার করল যে বাবাকে ফেলে ফিরে এলো ও। দোয়েলের ছেলে রেখে অফিস যেতে অসুবিধে হচ্ছিল। মেয়ের এই সামান্য অসুবিধেটা সেদিন অসুস্থ বাবার কাছে থাকার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল অরুনিমার। সম্পর্ক ব্যাপারটা এতটাই আপেক্ষিক!

     

    দোয়েলের মেজাজ বেশ ভালো যাচ্ছে কদিন। নতুন ড্রেস কিনেছে বেশ কয়েকটা। কাল ওর জন্মদিন। অনেক রকম রান্না করে খাওয়াতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু এবারেও জন্মদিনে সে নিশ্চয় কোন বড় রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যাবে সবাইকে। কি করবে কিছুই মুখ ফুটে বলবে না আগে থেকে। বেইবেই অরুনিমার পাশে এসে বসে। আসতে আসতে বলে, দোয়েলের জন্মদিনে কি রান্না করবে? বাজার করতে যাবে না?

    – ও হয়তো কাল বাইরে কোথাও খেতে নিয়ে যাবে সবাইকে।

    – তাহলে আজই রান্না করে খাইয়ে দাও।

    – যদি রেগে যায় এত রান্না দেখে!

    – রাগবে আবার তার ভালোও লাগবে। দেখো আমার ছেলেমেয়েদের। ওদের সংগে আমি কতটুকু থেকেছি। ওদের ভালো খেতে পরতে দেওয়ার জন্যে পনেরো বছর ধরে আমি লোকের বাড়ি কাজ করছি। ফোন করলেই সবার শুধু টাকার কথা, আমি যেন টাকাটা পাঠিয়ে দিই। কদিন আগে বড় ছেলের জন্মদিন গেল। আমি বই কেনার টাকা পাঠালাম। সেখান থেকে সাতশ ইউয়ান বন্ধুদের খাইয়ে খরচ করেছে। এই ভাবে কেউ পয়সা নষ্ট করে? তুমি মন খারাপ করো না মা। ওরা সবাই এরকমই। তা বলে ওরা ভালোবাসে না এমনও নয়। চলো বাজার করে আনি।

     

    দুজনে ব্যাগ ভরে বাজার করে আনে। সারা দুপুর ধরে অনেক যত্ন নিয়ে দোয়েলের সব পছন্দের খাবার রান্না করে – ফ্রাইড রাইস, চিকেন বাটার মশালা, লাউ চিংড়ি, মাছের মুড়ো দিয়ে ডাল, চিংড়ি মাছ, পমফ্রেট মাছ ভাজা। গোল গোল করে আলু কেটে ছাঁকা তেলে ভাজে। বেগুন কেটে রেডি করে রাখে। দোয়েল অফিস থেকে ফিরলেই গরম গরম বেগুনী করে দেবে। জন্মদিনের দিন শুধু একটু পায়েস বানালেই চলবে।

    সন্ধ্যে হতে না হতেই দোয়েলের ফোন আসে।

    – আমি আজ বাড়ি ফিরব না। দীপক আজ মেলবোর্ণ থেকে আসছে। আমি ওকে এয়ারর্পোট থেকে রিসিভ করে নিয়ে সানিয়াতে একটা রিসোর্টে ছুটি কাটাতে চলে যাব। দিন তিনেক পরে থেকে ফিরব।

     

    একবার মা কথাটা উচ্চারন করল না। ছেলেমেয়েকে যে রেখে চলে গেল ফূর্তি করতে একবারও তাদের কথা পর্যন্ত তুলল না!

    রাত্রে দোলন ফোন করে মনের গুমোট ভাবটা আরো বাড়িয়ে দেয়।

    – মা এইবার তুমি আমার কাছে এসে থাকো। কতদিন আর বোনের ঘর সামলাবে।

    – যাবো রে। এইখানে দীপক ফিরে এলেই আমার দায়িত্ব শেষ।

    শোনা মাত্র ঝাঁঝিয়ে ওঠে দোলন, কতদিন থেকে সেই একই কথা শুনে আসছি মা। রোহণ দু’বছর হলেই চলে আসবে, রিয়া বড় হলে চলে আসবে। এখন তোমার নতুন অজুহাত দীপক এখানে নেই। কত প্ল্যান করে রেখেছিলাম তুমি আমার কাছে এলে আমি দ্বিতীয় সন্তানের কথা ভাবব। তুমি এলেনা বলে সোহমের একটা ভাইবোন হল না।

     

    অভিযোগের তির সব তার দিকে। অরুনিমা চুপ করে থাকে।

    দোলনের কথা থেমে থাকে না।

    – মা জানো আমার তোমাকে কতো দরকার। তুমি আমার কতখানি বন্ধু তুমি জানো।

    অরুনিমা জানে সেই ছোটবেলা থেকে ‘মা’-এর থেকে বেশি ও দোলনের ‘বন্ধু’। হেন কথা নেই যা ও মাকে বলে না।  দোয়েল মায়ের জন্যে যা করে তার বেশিরভাগটাই দায়িত্ব বলে করে। দরকার ছাড়া কোনদিন মায়ের সঙ্গে একটা অতিরিক্ত কথাও বলে না সে। কিন্তু মা দোলনের অস্তিত্বর অংশ-বিশেষ। প্রতিদিন মাকে ফোন করে অন্ততঃ আধঘন্টা কথা বলা তার চাই-ই-চাই।

    – দোয়েল কোনদিন বলেছে ওর তোমাকে দরকার?

    – বলেনি। কিন্তু আমি জানি আমাকে ওর দরকার। তুই তো ম্যানেজ করে নিচ্ছিস।

    – তুমি আসলে ওকে আমার থেকে বেশি ভালোবাসো। তাই ও মুখ ফুটে না বললেও ওর দরকার আছে ভেবে নিয়ে তুমি ওর কাছে থেকে যাও। আর আমি এতবার তোমাকে দরকার বলে ডাকাডাকি করলেও তুমি এখানে আসনা।

    – আমি তোদের কাউকে কম ভালোবাসি না।

    – মনে আছে তোমার ছোটবেলায় কিরকম ছিঁচকাদুনে ছিল ও? দিদির পুতুলটা আমার পুতুলের থেকে ভালো দেখতে – এই কথাটাকেই প্যানপ্যান করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে যেত সারা বিকেল আর ফুসফুস করে কেঁদে যেত। তারপর আমি রেগে গিয়ে নিজের পুতুলটা ওকে দিয়ে দিলে ওর মুখে হাসি ফুটতো। ও খুব হিংশুটে মা, ও চায় না আমার কাছে তুমি থাকো। তাই তোমাকে আটকে রাখার জন্যে একটার পর একটা ফন্দী এঁটে চলেছে।

    – আমি অত জটিল করে ভাবতে পারিনা।

    – যে বার আমার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে গেল, তোমায় জরুরি তলব পাঠালাম। তুমি এসে এক সপ্তাহ থাকতে না থাকতেই অফিসের ভীষন দরকারি কাজে ওরও বাইরে যাওয়ার দরকার হয়ে পড়ল। ও জানতো এটা শুনলেই তুমি রিয়া রোহণের জন্যে এত উতলা হয়ে পড়বে যে চলে যাবে ওখানে। আমি এতবার বারণ করা স্বত্ত্বেও তুমি ছুটলে ঠিক। গিয়ে দেখলে দোয়েলের যাওয়াটা ক্যান্সেল হয়ে গেছে।পলিটিক্সটা খুব ভালো জানে ও।

     

    দোয়েল সত্যিই এরকম। মনে মনে কি প্ল্যান করছে কেউ বোঝে না। মাঝে মাঝেই তার সামনেই  বন্ধুদের নানা কথা বলে। সেগুলো যে সে মাকে শোনানোর জন্যেই বলছে তা বুঝতে অসুবিধা হয়না। একদিন বলছিল মাকে আর বেইবেইকে সে তার হাতের তালুর রেখার মতো চেনে। মা-এর মতো খারাপ ম্যানেজার সে কোনদিন দেখেনি। কখন কড়া হতে হয়, কখন নকল আবেগ দেখাতে হয়, কখন পলিটিক্স করতে হয় কিচ্ছু বোঝে না মা।

     

    – মা, জানো আমি আবার পি এইচ ডি করতে শুরু করেছি। এটা না থাকলে ক্যারিয়ারটা ঠিক এগোচ্ছে না। এপাশে সোহমের স্কুলের এত পড়াশোনা। টাইম ম্যানেজ করতে অসুবিধে হচ্ছে। তুমি এখানে এলে ওর লেখাপড়াটা দেখতে পারতে।

    – সোহমের পড়াশোনা নিয়ে ভাবিসনা। ও তো ক্লাসে ফার্স্ট হয়।

    – কিন্তু পড়াশোনা না করলে তো আর ফার্স্ট হবে না।

    – সেকেন্ড হবে। তাহলেও কিছু খারাপ হবে নাকি সোহম?

    – খারাপ হবে না। কিন্তু সোহম সেকেন্ড হলে মনে হয় আমিই সেকেন্ড হয়েছি। এমন মন খারাপ হয়ে থাকে। জীবনের সব জায়গায় ফার্স্ট হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে খুব স্ট্রেস হয় আমার।

     

    ছুটি কাটিয়ে দোয়েল দীপককে সংগে নিয়ে বাড়ি ফেরে। দুজনেরই মুখ গম্ভীর। সারাদিন দুজনে ঘরে বসে দরজা বন্ধ করে ঝগড়া করে যায়। শেষে থাকতে না পেরে অরুনিমা দীপককে জিজ্ঞাসা করে

    – সিরিয়াস কিছু না মাসিমা। দোয়েলের ইচ্ছে আমি চাকরি ছেড়ে এখানে চলে আসি। আমি বলেছি সম্ভব নয়।

     

    দীপক কোনদিন ওকে মা বলে ডাকে নি। তাতে কিছু মনে করেনা অবশ্য অরুনিমা। মা বলে ভাবতে না পারলে মা বলে না ডাকাই ভালো। ওর সঙ্গে দীপকের সম্পর্ক একটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে সবসময়।

    – বছর খানেক পরে অন্ততঃ চলে এসো। রিয়া রোহণ বাবাকে একটুও পায়না।

    – কেন পায়না? দোয়েলকে কি আমি বলেছিলাম এখানে আসতে? আমরা মেলবোর্নে তো দিব্যি সবাই একসাথে ছিলাম। ওকে কোম্পানীর সিইও হতে হবে। তাই চলে এলো এখানে। আমায় যখন একাই থাকতে হবে তখন মেলবোর্ন বা লন্ডন আমার কাছে কোন তফাৎ নেই। লন্ডনে ভালো চাকরির অফার পেয়েছি। তাই চলে যাব ঠিক করেছি। এতে আমার দোষ কোথায় বলুন?

    তার মানে ওর বেজিং আসা অনিশ্চিত কালের জন্যে পিছিয়ে গেল। অরুনিমা চুপ করে থাকে।

    ফুঁসে ওঠে দোয়েল, বেজিং-এ চাকরি তুমি পেয়েছিলে। তোমার পছন্দ হয়নি তাই তুমি আসনি।

    – হ্যাঁ হয়নি। আমি যে পজিশানে ছিলাম তার থেকে নিচু পজিশান পেলে কেন আমি চাকরি বদলাবো?

    – পরিবারের সঙ্গে একসংগে থাকার জন্যে বদলাবে।

    – তুমি ভালো পজিশান পেয়েছ বলে ছেলেমেয়েকে নিয়ে অন্য দেশে চলে আসতে পেরেছিলে। তখন তো পরিবারের কথা ভাবোনি!

    – কাউকে না কাউকে তো স্যাক্রিফাইস করতেই হবে। সবসময় তো মেয়েরাই করে। এক্ষেত্রে না হয় তুমিই করলে। আসলে তোমাকেও সিইও হতে হবে।

    – বাজে কথা বলো না। প্রথমে চাকরি ভালো পেয়ে কে চলে এসেছে? তুমি। আমার হাতে তখনও অনেক অফার ছিল। আমি নিইনি। আমি আলাদা থাকতে চাইনি। তুমিই আলাদা হয়ে গেছ। এখন আমাকে স্যাক্রিফাইস করতে বলছ। কেন করব আমি? তুমি আবার কাল অন্য জায়গায় যাবে। আমি কি আবার পেছন পেছন যাব?

    – ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব কি আমার একার?

    – ইচ্ছে না করলে বল, আমি ওদের দুজনকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। তোমার থেকে অনেক ভালো ভাবে আমি মানুষ করব ওদের। এখানে তো সারা দিন রাত তুমি অফিসেই পড়ে থাকো। কতটুকু সময় দাও ওদের?

    – মা বাবা ছোটবেলায় আমার জন্যে কিচ্ছু করেনি। তাও কি আমি মানুষ হয়নি? মানুষ হওয়ার হলে ঠিক হবে। সারাক্ষন পেছনে পড়ে থাকার কোন দরকার নেই।

    – এখন তো মাসিমা রোহণের হোমওয়ার্ক দেখে দেয়। তুমি জানোও না স্কুলে কি পড়াচ্ছে। মাসিমা এখানে না থাকলে দেখবো কি রকম রিপোর্ট আসে স্কুল থেকে, কেমন তুমি সব ম্যানেজ করো তখন।

    – মা একেবারে কত পড়াশোনা দেখে উলটে যাচ্ছে। সারাদিন বসে বসে সিনেমা দেখছে আর সস্তার ছিটকাপড়ের পর্দা বানাচ্ছে।

    অরুনিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দেবাঞ্জনের স্পষ্ট ছায়া দেখতে পায় দোয়েলের কথার টোনে। ঘোড়া বানাতে গিয়ে যেন সিংহ বানিয়ে ফেলেছে সে। দোয়েল নিজেকে বনের রাজা মনে করে। চারপাশে সবাইকে ওর কথা শুনে চলতে হবে। না হলেই খেয়ে ফেলবে ওর কথার কামড়ে। তাও দীপককে ম্যানেজ করতে পারে না। সেও যে ব্যাঘ্র-লগ্নে জন্মেছে। বাঘ-সিংহের লড়াই চলবে এদের আজীবন। মাঝখান থেকে কষ্ট পাবে ছেলেমেয়ে দুটো।

     

    অরুনিমা একদিন ঠান্ডা মাথায় বোঝানোর চেষ্টা করে, তোরা এভাবে রাতদিন ঝগড়া করলে ছেলেমেয়ে দুটোর ওপর কি এফেক্ট হয় ভেবে দেখেছিস?

    – তুমি আর বাবা যখন ঝগড়া করতে কোনদিন ভাবতে আমাদের কথা? আমরা অনেক ভদ্র ভাবে কথা বলি। তোমাদের মতো বাড়ি মাথায় করিনা। সে কি অশান্তি বাড়িতে। তাই চাকরি পেয়েই ঘর ভাড়া নিয়ে আলাদা উঠে গিয়েছিলাম আমি। না হলে আমার কেরিয়ারটারই বারোটা বেজে যেত।

    – যদি এত বুঝিস তাহলে ঝগড়া করিস কেন?

    – কেন ঝগড়া করি বোঝ না? তোমার চরিত্রের ঐ অসুখ আমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। কিছুতেই নিচু হতে পারি না। সব কিছুতেই নিজের ভেতরে একটা কাল্পনিক যুদ্ধ খাড়া করে ফেলি আমি। আর সেই যুদ্ধে জেতার জন্যে মরিয়া হয়ে লড়তে থাকি। এমনকি জন্মদিনে কি গিফট দেবো ভাবতে গিয়েও আমি ভেবে ফেলি আর কে কি দেবে, তাদের থেকে ভালো দিতে হবে আমায়।

     

    অরুনিমা ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। তবে যে ও ভাবতো দোয়েলের সব বদগুন তার বাবার থেকে পাওয়া। হ্যাঁ, ও ঝগড়া করত দেবাঞ্জনের সঙ্গে। ঝগড়া না করে কোন উপায় কি ছিল সেদিন? গাধার জীবন থেকে মুক্তি পাওয়াটা সেদিন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। নিজেকে সে জোর করে পালটে ফেলে যুদ্ধের ঘোড়ার ভূমিকায় নেমে পড়েছিল। ছেলেমেয়েদেরকে জাত ঘোড়া বানাতে হবে। ওরাই টানবে ওর যুদ্ধের রথ। প্রথমেই দেবাঞ্জনের সঙ্গে বাকবিতন্ডা করে ছেলেমেয়েদের সব নামী স্কুলে ভর্তি করালো। স্কুলের মাইনে দিতে কার্পন্য করেনি দেবাঞ্জন। কিন্তু তাদের সাজপোশাক চোখে লাগত অরুনিমার। ওরা হীনমন্যতায় ভুগবে না তো? দেবাঞ্জনের মতো এমন হাড়কৃপন মানুষ সে জন্মে দেখেনি। এত টাকা মাইনে পেত। টিউশান পড়িয়েও রোজগার কম করত না। তারওপর পাঠ্যপুস্তক লেখার রয়ালটি। কিন্তু বাড়ির লোকেরা যেমন ভিখারি ছিল তেমন ভিখারিই রয়ে যেত। সামনের পার্কে বেরোলেই দেখতে পেত বাচ্চাদের গায়ে নতুন পোষাক, হাতে রকমারি খেলনা। খুব লোভ হত। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু একথা ভুলে গিয়ে দেবাঞ্জনের কাছে টাকা চেয়ে ফেলত। দেবাঞ্জন অরুনিমাকে ‘ভোগবাদী’ বলে গালাগালি দিত। অরুনিমাও ‘দুর্ভোগবাদী’ বলে পালটা গালাগালি দিত তাকে। দেব না-ই বা কেন? সেই তো তার সব দুর্ভোগের জন্যে দায়ী।

     

    শেষে নিজেই একটা চাকরির চেষ্টা শুরু করে সে। মহাপুরুষ কি চোখে দেখবেন ও কি কি বাণী দেবেন সেই নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু দেবাঞ্জন আপত্তি করেনি। উপরন্তু তার নাম রেফার করেছিল নানা জায়গায়। তার রেফারেন্সেই চাকরিটা জুটে গিয়েছিল তাড়াতাড়ি। চাকরি করে আর্থিক স্বাধীনতা বেড়েছিল। বেড়েছিল ছেলেমেয়েদের সাজপোশাকের ঘটা, খেলনা, গল্পের বই। খুব সামান্য হলেও জমে যাচ্ছিল তার ব্যাংকের পাসবই-এ। মহাপুরুষ ততোদিনে বুঝে গেছে তার বাণীর তোয়াক্কা কেউ করেনা। তাও মাঝে মাঝে ওয়ার্নিং দিত–আমোদ-আহ্লাদটা একটু কমানো হোক। কিন্তু যেটা সে আমোদ ভাবত সেটা বাকিদের কাছে মানসিক, সামাজিক কারনে নিতান্ত প্রয়োজনীয় ছিল। সেটা তাকে বোঝাতে গেলেই লেগে যেত ঝগড়া।

     

    ছেলেমেয়েদের সবাইকে রেডি করে স্কুলে পাঠিয়ে, দেবাঞ্জনের  জামা কাপড় খাবার রেডি করে অরুনিমা নিজে স্নান করে খেয়ে সেজেগুজে যেই বেরোতে যেত তখনই দেবাঞ্জন বলত, আমাকে এক কাপ চা করে দিয়ে যাও।

    অরুনিমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেত, নিজে করে নিতে পারছ না? সকালে উঠে থেকে তো ঠুকে বসে আছ। চারবার অলরেডি চা খাওয়া হয়ে গেছে। আর একবার না খেলে চলছে না?

    কথার উত্তরে কথা বলতে শিখেছিল সে। যুদ্ধে হেরে যাবে না কিছুতেই।

     

    দোলনের আগেই দোয়েল চাকরিতে জয়েন করলো। অরুনিমার স্বপ্ন পূরনের প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু তখনও তার যুদ্ধ শেষ হয়নি। শুরু থেকেই দোয়েলের কাজের খুব চাপ থাকত। তাই রোজ বাড়ি ফিরতে রাত হত। এই নিয়ে দেবাঞ্জনের  সঙ্গে ঝামেলা লেগেই থাকত।

    – শুধু তোমার আস্কারাতেই দোয়েলের এত বাড় বেড়েছে।

    – আস্কারার কি আছে? তার কাজের জন্যে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে তুমি চেঁচামিচি করবে সে সহ্য করবে কেন। সে কি এখনো ছোট আছে?

    – কী এমন চাকরি করে যে রোজ রোজ বাড়ি ফিরতে দেরি হবে?

    – তোমার মতো সরকারি মাস্টারির চাকরি নয় তার। দিনকাল বদলাচ্ছে। তোমার সন্দেহ বাতিক মন মেয়েকেও রেহাই দেবে না?

    – মেয়েটা এত ভালো পড়াশোনায়। মাস্টার ডিগ্রীটা করতে পারল না? গ্রাজুয়েশন করেই চাকরিতে ঢুকে গেল। একবার আমার সঙ্গে আলোচনা করার দরকার পর্যন্ত মনে করল না।

     

    দোয়েল শুধু শুনতো। কোন উত্তর দিতো না। একদিন চুপচাপ অফিসের কাছাকাছি একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করল। উইকেন্ডেও বেশিরভাগ সময় বাড়ি আসত না। দেবাঞ্জন রাগে গজগজ করত। বিশেষ কিছুই করার ছিল না তার। তখন তার সব আশা-ভরসা গিয়ে জড়ো হল দোলনের ওপর। সে তখন এমএ পড়ে। কিন্তু জানত না দোলন ভেতরে ভেতরে আরো কত বড় প্ল্যান করে চলেছে। এমএ শেষ করার আগেই এয়ার হোস্টেসের ট্রেনিং করতে ঢুকে গেল। জানত বাবা মেনে নেবে না, কিছু আর্থিক সাহায্যও করবে না। মা-কে ধরল ট্রেনিং-এর খরচা জোগানের জন্যে। অরুনিমা তার জমানো টাকা বেশিরভাগটা তুলে নিলো, গয়না বেচে দিল কিছু। দোলনের হাতে যেদিন টাকাটা তুলে দিয়েছিল তার মুখটা অদ্ভুত উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল।

    – মা, আমার টাকা জমলে আমি তোমায় একটা ফ্ল্যাট কিনে দেবো। বাবার সঙ্গে আর ঝগড়া করতে হবে না। ইচ্ছে করলেই আলাদা থাকতে পারবে।

     

    পরে যখন জানতে পেরেছিল দেবাঞ্জন তখন এক কুরুক্ষেত্র বেঁধেছিল বাড়িতে। দোলন এয়ারহোস্টেস হয়ে একটু স্টেবল হতেই একটা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছিল ওকে। সেই ফ্ল্যাটটার ভাড়ার টাকা জমা হত ওর একাউন্টে। এই সময় দোয়েলও হঠাৎ চাকরি ছেড়ে ম্যানেজমেন্ট পড়তে শুরু করল। দোলন সেই শুনে বলল,

    দেখলে, মা দেখলে। যেই দেখল দিদি বেশ দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অমনি হিংসেয় জ্বলেপুড়ে গেল। ওকেও ম্যানেজমেন্ট করতে হবে, বিদেশ যেতে হবে। ঐ চাকরি করে তো আর বিদেশ যাওয়া যায়না।

    অরুনিমা আনন্দ পেয়েছিল দোয়েলের এই সিদ্ধান্তে। এমনকি দেবাঞ্জনও খুশি হয়েছিল। যদিও তা প্রকাশ করে নি।

     

    দোয়েল আর দোলন বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হতো। দর্পন ফার্স্ট না হলেও পড়াশোনায় খারাপ ছিল না। ওকে দোলন আর্থিক দিক থেকে অনেক সাহায্য করেছিল। সে-ও হঠাৎ করে আমেরিকা চলে গেল। ওখানে কিছু কাজ করে পয়সা রোজগার করতো, সঙ্গে পড়াশোনাো করত। কি কাজ করত কোনদিনও বলেনি অরুনিমাকে। দেবাঞ্জন কোন ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে খুশি হয়নি প্রথমে। ছেলেমেয়েরাও বাবাকে কোন কথা খুলে বলতো না। একা অরুনিমা সবার ইচ্ছেকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করে গেছে বরাবর। অরুনিমা নিজের হয়ে ঝগড়া করত, ছেলেমেয়েদের হয়ে ঝগড়া করত। প্রতিবাদ করা তো ঘোড়ার জন্মগত অধিকার। কিছু অপছন্দ হলেই সে তার খুরে শব্দ তুলত খটাখট। কেউ পিঠে চেপে বসে তাকে বশ স্বীকার করানোর চেষ্টা করলেই সে খিঁচিয়ে উঠতো।

    শুধু তার টাপুর-টুপুর মন মাঝে মাঝেই ফিসফিসিয়ে উঠতো, সব আছে তাও কিসের এতো অসন্তোষ? অরুনিমা একটু থমকে দাঁড়াতো হঠাৎ। শুনতে পেত তার ভেতরে আর একজন হিসহিসে গলায় বলছে, আমি জিততে চাই যুদ্ধে।

    – কিসের যুদ্ধ? কার সঙ্গে যুদ্ধ?

    – দেবাঞ্জনের সঙ্গে। দেখিয়ে দিতে চাই আমি তাকে ছাড়াও বাঁচতে পারি।

    – তোর মনে হয় এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় তুই জিতবি?

    – যে কোন মূল্যে আমি জিতব। আমার ছেলেমেয়েরা সবাই অনেক বড় হবে একদিন।তখন আমি ওদের কাছেই থাকব। কোনদিন এ বাড়িতে আসব না। এই লোকটার ছায়া মাড়াতে চাই না আমি।

     

    ঝগড়া বা প্রতিবাদ করাতেও কি কোন নেশা থাকে? বা অহমিকা? কাল্পনিক এক যুদ্ধে জিতে যাওয়ার আনন্দ। জিততে জিততে গর্বে বেলুনের মতো ফুলে যেত সে। আকাশে বিচরণ করতে করতে নিচের দিকে তাকাতে ভুলে যেত। ভুলে যেত জিততে গিয়ে কি হারাচ্ছে। পরস্পরের পিঠের ওপর সারাক্ষণ গরম নিঃশ্বাস ফেলত দুজনে। বাড়ির হাওয়া সব সময় গরম থাকতো। সেই গরম হাওয়ায় গাছের সব পাতা যে শুকিয়ে ঝলসে যাচ্ছে তা দেখেও না দেখার ভান করে নিঃস্পৃহ থেকেছে দুজনেই। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

     

    দোয়েল আর দীপকও কি সেই একই খেলা খেলে চলেছে?

     

    এক মাস হয়ে গেল দীপক ফিরে গেছে মেলবোর্ন। সেখান থেকে নতুন কাজ নিয়ে চলে গেছে লন্ডনে, নিজের কর্মক্ষেত্রে। দোয়েল রাগে দিশেহারা। সারাদিন ফোনে বা এস এম এস করে করে ঝগড়া করে চলেছে। অরুনিমার সঙ্গে কথা তো বন্ধই, এমনকি ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও কথা বলছে না বিশেষ। দোয়েলের সঙ্গে অরুনিমার সম্পর্ক আবার সেই সপ্তাহে তিরিশটা বাক্যে এসে পৌঁছেছে। কথাহীন জীবনের শৈত্য সহ্য হয়না, সহ্য হয়না ঝগড়া মারিপিটের গরম জীবনও। পর্নমোচী গাছেদের দূর থেকে দেখতে ভাল লাগে। বসন্তে ফুলে রঙ্গীন, গ্রীষ্মে পাতায় সবুজ, হেমন্তে পাতাদের রঙ বদল, শীতে পাতা ঝরিয়ে নাগা সন্ন্যাসীর সাজ। কিন্তু সে বৈচিত্র্য শুধু দেখতেই ভালো। যে সম্পর্ক প্রতি মরশুমে সাজ বদলায় রং বদলায় সে সম্পর্কের কোন দরকার নেই তার জীবনে। তার চাই একটা চিরহরিৎ বৃক্ষ।

     

    দেবাঞ্জনের ফোন আসে। বেড়াতে আসছে দুই মেয়ের কাছে। বেজিং-এ আগে আসবে। তারপর যাবে সিঙ্গাপুর। দেড়-দু বছরে একবার করে দেবাঞ্জন নিজের পয়সায় নিয়মিত ঘুরে যায় মেয়েদের কাছে। বাবা এলে দোয়েল খুশি কি অখুশি হয় বোঝা যায় না ঠিক। মার্জিত আর নিয়ন্ত্রিত এক রকমের প্রকাশ থাকে আবেগের। দোলন খুশিতে ভেসে যায় কদিন। আবার কোন ব্যপার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তর্কাতর্কি রাগারাগিও করে। কিন্তু অরুনিমার ভেতরে অসহ্য একটা বিরক্তির উদ্রেক হয়। লোকটার জন্যে সামান্য মায়া-মমতাও অনুভব করে না সে। এখানে এলে কিছু না কিছু নিয়ে আলোচনা হবে দুজনের। আলোচনা থেকে ঝগড়া, কথা বন্ধ। মৃত সম্পর্কের ফসিল চিহ্ন চোখের সামনে কর্কশ ভাবে ফুটে উঠবে।

    – মেয়েকে শিখতে বলিস। তুই কি শিখছিস? মেয়ে জামাই যেমন ঝগড়া করে তুইও তেমন ঝগড়া করে যাবি?

    টাপুর-টুপুর কথা বলে ওঠে তার ছায়া মন।

    – থাকতে পারি না। লোকটাকে দেখলেই ভেতরে এমন বিরক্ত লাগতে থাকে যে ওর ভালো কথাও আমি সহ্য করতে পারিনা। তৎক্ষনাৎ একটা বিরুদ্ধ মন্তব্য করে ফেলি।

    – যা বলবে এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বার করে দিবি। ফালতু যুদ্ধ করে শক্তি ক্ষয় করে কি লাভ। যুদ্ধ করে আজকাল জিতিস কোথাও?

    – নাঃ। আমি তো হেরোর দলেই নাম লিখিয়েছি। সবসময় চুপ করে থাকি।

    – তাহলে দেবাঞ্জনের বেলায় পারবি না কেন?

    – আমাকেই হার মানতে হবে সব জায়গায়? সব জায়গায় আমাকেই কম্প্রোমাইজ করতে হবে, নীচু হতে হবে?

     

    দেবাঞ্জন আসার পর যে কারনেই হোক তেমন বিরক্তির উদ্রেক হলনা। যে কথায় যুদ্ধ লাগতে পারে সেখানে চুপ করে রইল সে। এসে একটু থিতু হতেই দেবাঞ্জন অরুনিমাকে বলল, আমাকে শহর দেখানোর দায়িত্ব তোমার। বেজিং-এর মধ্যে যা যা আছে সব ঘুরে ঘুরে দেখতে চাই। ফরবিডেন সিটি, টেম্পল অফ হেভেন, সামার প্যালেস, তিয়েন আন মেন, গ্রেট ওয়াল সব কিছু।

    অরুনিমা এই প্রস্তাবে খুশি হল মনে মনে। এসে থেকে বেজিং-এর কিছু দেখা হয়নি। একে তো শীত পড়ে গেল। তারওপর দোয়েল একেবারেই বেড়াতে যেতে চায়না কোথাও। দোয়েল বলল, বাবা, গাড়ি ভাড়া করে দিচ্ছি একটা। সারাদিন ঘুরে বেড়াও যেখানে ইচ্ছে।

    – না, না। এমন সুন্দর বাস। এত কম ভাড়া। শুধু শুধু গাড়ি চেপে পয়সা নষ্ট করার দরকার নেই। তুই শুধু আমায় কটা বই কিনে দে।

     

    লোকটা কিপটেমি একই রকম বজায় রয়েছে। মেয়ে পয়সা দিলেও খরচ করতে পারবে না। তবে কিছু পড়াশোনা করতে পারে। ইন্টারনেট দেখে বই-এর নামের লিস্ট বানিয়েই এনেছিল। দোয়েল বই কিনে আনার পর সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করল। চীনের রাজনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাস থেকে বেজিং-এর ট্যুর গাইড কিছু বাদ নেই। প্রায় রোজ দুজনে বেরিয়ে পড়ে। বাসে করে ঘুরে বেড়ায় সব জায়গায়। বাসে ওঠা অরুনিমার একেবারেই অভ্যাস নেই। হাঁপিয়ে পড়ে দেবাঞ্জনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘুরতে। তার থেকে এগারো বছরের বড় দেবাঞ্জন। প্রেসার নেই, ডায়োবেটিস নেই, হার্টের সমস্যা নেই, হাঁটু ব্যাথা নেই। অরুনিমার শরীরের অবস্থা একেবারেই ভালো না। ডায়োবেটিস তারওপর হাইপ্রেসার। আজকাল প্রেসারটা খুব ওঠা নামা করছে। দেবাঞ্জন আসার আগে দু’চারদিন তো এমন হয়েছিল বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেনি সারাদিন।

     

    এইবার দেবাঞ্জনের যুদ্ধং দেহী ভাবটা যেন অনেক কম। সেদিন সামার প্যালেস গিয়ে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছে অরুনিমা লেকের ধারে পাথরের বেঞ্চে। দেবাঞ্জনও বসেছে পাশেই। হঠাৎ বলল, অনেক বছর হল অরুনিমা। এইবার বাড়ি চলো।

    – গিয়ে কি করব? তোমার পদসেবা করেই বাকি জীবনটা কাটাবো নাকি?

    – না, আমি তো একাই থাকি। সেবা পাওয়ার অভ্যেস নেই বহুকাল। অনেক দিন মেয়েদের সঙ্গে আছ। এইবার ফিরে চলো নিজের বাড়িতে।

    একটু কি চমকে ওঠে অরুনিমা! নিজের বাড়ি। কিন্তু নিজের বাড়ির কথা ভাবলেই যে আনন্দ গেয়ে ওঠে বুকের ভেতর সে আওয়াজ কই?

    – দোয়েলকে এখানে এভাবে ফেলে রেখে কি করে চলে যাবো? দীপক নেই। রোহণ আর রিয়ার কতটুকু বয়স। ও একা সব সামলাতে পারবে না। ওর কেরিয়ারের খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।

    – ওদের কেরিয়ার ওদেরকেই ভাবতে দাও। কতদিন আর এভাবে গার্ড করে চলবে তুমি?

    – আমি মা হয়েছি। ওদের কিসে সুবিধে হয় দেখব না?

    – তুমি হাতে ধরে হাঁটতে শিখিয়েছ। ওরা এখন ছুটতে শিখে গেছে। পড়ে গেলে উঠে আবার দৌড়বে ঠিক। তুমি এইবার বাড়ি ফিরে চলো।

    – ফিরে গিয়ে সেই তো তোমার সঙ্গে সারাদিন ঝগড়া করব।

    – এখন থেকে তুমি হ্যান্ডেল করবে সব টাকাকড়ি। আমি মাথা ঘামাবো না। তাছাড়া আর কতদিন আমার ওপর রাগ করে থাকবে বলো। অনেক খারাপ কথা বলেছি তোমাকে। কিন্তু কোন কিছু নিয়ে খুব কি জোর জবরদস্তি করেছি তোমার ওপর? যুদ্ধে তো তুমিই জিততে সবসময়।

    – যুদ্ধ না করে কি উপায় ছিল আমার। ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্যে কি পরিশ্রমটাই না করেছি আমি।

    – আমি তো স্বীকার করেছি যে ওদের বড় হওয়ার জন্যে সবটাই তোমারই ক্রেডিট।

    – তুমি হয়তো মনে করো। কিন্তু ওরা কেউ সে কথা মনে করে না আজ। এই সেদিনও দোয়েল শোনালো আমি নাকি কিছুই করিনি ওর জন্যে।

    – ওরা যা ভাবে ভাবুক। তুমি তোমার বিশ্বাস মতো যা করার করেছ। এই বার নিজের বাড়ি চলো। চোদ্দ বছর হয়ে গেল একা আছি। আর কদিনই বা বাঁচবো।

    বুকের মধ্যেটা কেমন করে ওঠে যেন অরুনিমার। এই দিকটা কখনো ভেবে দেখেনি। সত্যিই দেবাঞ্জন বড় একা। দেবাঞ্জনের সঙ্গে দোলনের কাছে কদিন ঘুরে এলেও হত। দোলনও অনেকবার যেতে বলে। কিন্তু দোয়েলকে কি করে বলবে সে কথাটা বুঝে উঠতে পারে না।

     

    দেবাঞ্জন চলে যায় সিঙ্গাপুর। সেখানে মাস খানেক থেকে ও কলকাতা ফিরে যাবে। তার আগেই বলতে হবে। সুযোগ খুঁজতে থাকে অরুনিমা। দোয়েলের বন্ধু হেমার মা বাবা বেজিং বেড়াতে এসেছে। উইকেন্ডে দোয়েল হেমাকে পুরো ফ্যামিলি সমেত ডিনারে ডেকেছিল। সবাই লিভিং রুমে গোল করে বসে আড্ডা মারছে। ছেলেমেয়েরা এক জোট হয়ে খেলছে অন্যঘরে। অরুনিমা আর বেইবেই সামলাচ্ছে রান্না। পুরানো মেজাজে দোয়েলকে দেখে খুব ভালো লাগছিল অরুনিমার। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধিটা এল। এই সময় দোয়েলের কাছে ছুটি চাইলে হয়। সবার সামনে মায়ের ওপর রাগারাগি করতে পারবে না।

    – ভাবছি কদিন দোলনের কাছে ঘুরে আসব। তারপর কলকাতা যাব। তিন বছর হয়ে গেল কলকাতা যাইনি।

    – আমায় বলছ কেন? আমি কি তোমাকে আটকে রেখেছি?

    – তুই কি আমাকে ছাড়া এখানে ম্যানেজ করতে পারবি?

    – না পারার কি আছে। অফিসে দু’শো জনকে ম্যানেজ করছি আর বাড়িতে তিনজনকে ম্যানেজ করতে পারব না? কারো জন্যে কারো কিছু আটকে যায় না।

    – তা জানি। তাও ভাবছিলাম তোর যদি অসুবিধে হয়।

    – দ্যাখো, তোমাকে এখানে আমি বেঁধে রাখিনি। আমার সুবিধে হওয়ার জন্যে তুমি এখানে আছ এরকম মনে হলে তোমার থাকার দরকার নেই। আমি ভেবেছিলাম তুমি নাতি নাতনিদের সঙ্গে থাকলে আনন্দে থাকবে। তোমার যদি সেরকম না মনে হয় তাহলে তুমি চলে যাতে পারো।

    ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না এই মেয়ে। অরুনিমা সরে যায় ওখান থেকে। নিজের ঘরে চলে যাওয়ার সময় শুনতে পায় দোয়েল হেমাকে নিচু স্বরে বলছে – কি রকম পলিটিক্স করল দ্যাখ মা। এতদিন বলতে পারত কথাটা। কিন্তু ঠিক তোরা সবাই আছিস যখন তখন বলল।

    – তুই তো যেতে বলে দিলি মাসিমাকে। কি করে ম্যানেজ করবি একা?

    দোয়েল হাসতে হাসতে খুব কনফিডেন্টলি বলছে, আরে যাবো বললেই তো আর যেতে পারবে না। আমাকে টিকিট কেটে দিতে হবে তবে যেতে পারবে। গিয়ে দুদিন থাকুক। তারপরেই আমি এমন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করবো, সুরসুর করে চলে আসবে এখানে।

     

    অরুনিমা দ্রুতপদে ঘরে ঢুকে যায়। এর পরে ওরা আরো যা কিছু বলবে তা শুনতে চায় না ও। মনস্থির করে এখান থেকে ও চলে যাবেই। কিন্তু টিকিট তো চাই। দোয়েল ওর প্ল্যান মতো মুখ কুলুপ এঁটে রইল দিনের পর দিন। এমন ভাব করে রইল যে অরুনিমা ইচ্ছে করলেও টিকিটের কথা জিগ্যেস করতে পারল না। দেবাঞ্জনই ভালো আছে। মেয়েদের কাছে আসতে ইচ্ছে করলে নিজের পয়সায় টিকিট কেটে ঘুরে যায়। পয়সা না থাকলে আসে না।

     

    হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে কর্কশ স্বরে। দোলন ফোন করেছে। তার কাজের মেয়ে পালিয়েছে। বাবা, ছেলে তার ইউনিভার্সিটি সব নিয়ে খুব ফাঁপরে পড়েছে। মা এক্ষুনি চলে এসো।

    টাপুর-টপুর মন ফিসফিসিয়ে বলে – খুব খুশি লাগছে তোর। তাই না?

    – কেন? দোয়েলের কাজের লোক পালিয়েছে। তাতে আমি খুশি হব কেন?

    – তুই এ বাড়ি থেকে পালাতে চেয়েছিলি। একটা পথ পেয়ে গেলি।

    সত্যিই মনের ভেতর একটু ভালোলাগার চোরা স্রোত অস্বীকার করতে পারে না সে। দোয়েলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে দোলন। দোয়েল পরের দিনই প্লেনের টিকিট কেটে দেয়। অরুনিমা উড়ে যায় সিঙ্গাপুর।

    দোলনের কাছে এসে খুব আরাম লাগে মনটা। সোহম, দোলন, মানস সবাই ওকে পেয়ে হৈ হৈ করছে খুব। ও-ও মেতে ওঠে আমোদ আহ্লাদে। মানসের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা বরাবরই খুব কাছের। মানসের আন্তরিকতা, সারল্য ওকে মুগ্ধ করে। বাড়িতে রাত্রি দিন মিউজিক সিস্টেমে গান চলে। দোলন সারাদিন বকবক করে চলে মা বাবার সঙ্গে। রাত্রে বসে বসে ডিভিডিতে মুভি দেখে। কখনো দুপুর বেলা ছোট্ট মেয়ে হয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকে। দেবাঞ্জন আগে বেশ কয়েকবার সিঙ্গাপুর এসেছে বলে কোথাও বেরোয় নি। বাড়িতেই সোহমের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। তারও স্কুলে গরমের ছুটি চলছে। সারাদিন দাদুর সঙ্গে গল্প, নয়তো খেলা। আশ্চর্য এক স্বপ্নের মতো কেটে যেতে থাকে দিনগুলো।

     

    সেদিন মানসের ছুটি ছিল। দোলন ইউনিভার্সিটি গেছে। সোহম ক্যারাটে স্কুলে। সবাই খেতে বসেছে দুপুরে। হঠাৎ মানস বলল, মা, একটা কথা বলছি কিছু মনে কোরো না। দোলনকে আমি বলেছি তোমরা যেন এখানে না আস। দোলনকে একটু চাপে রাখার জন্যে বলেছি। আসলে ও আমার বাবা, মা, দিদি কাউকে এখানে থাকতে দিতে রাজি নয়। আমার দিদি সিঙ্গাপুর আসবে বেড়াতে। কিন্তু হোটেলে থাকবে। ও দেখা করতে পর্যন্ত রাজি হয়নি। কিছু বললেই বলে ডিভোর্স করে সোহম কে নিয়ে চলে যাবে। সেদিন তাই রাগ করে আমিও বলেছি যে আমার বাড়ির লোক এখানে না উঠলে তোমার বাড়ির লোকই বা এসে থাকবে কেন?

    অরুনিমার মাথায় আগুন জ্বলে। মেয়েটা এত নীচে নেমে গেছে? এত স্বার্থপর। নিজের সুখটুকুই শুধু দেখে। আরে তুইও তো ছেলের মা।

     

    দেবাঞ্জন আড়ালে অরুনিমাকে বলে, দোলনকে এসব নিয়ে কিছু বলো না। ওদের সমস্যা ওরা কি ভাবে মেটাবে ওদের ভাবতে দাও।

    • আমি কিছুতেই এই অন্যায় হতে দিতে পারি না। দোয়েল এদিক থেকে কত ভালো। দায়িত্ব নিয়ে বছরে ঠিক একবার দীপকের মা বাবাকে দেখে আসে, ফোনে কি সুন্দর করে কথা বলে।
    • তুমি কি করেছিলে? আমায় বলোনি যে আমার দেশের বাড়ির লোকজন যেন বাড়িতে না আসে। এলে হোটেলে গেস্ট হাউসে রাখবে। লজ্জ্বার মাথা খেয়ে আমি তাদের বাড়িতে আসতে বারণ করে দিই নি?
    • আমার কোন কাজের লোক ছিল না। তিনটে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে আমি হিমশিম খেতাম। এর তো রাত দিনের কাজের লোক আছে। আজ দুদিন না হয় কাজের লোক পালিয়েছে। আবার নতুন একটা এসে যাবে দুদিন পরেই। এত নিচে নেমে গেছে দোলন?
    • কোন মানুষই সব দিক থেকে নিখুঁত হতে পারে না। দোলনকে ওর স্টুডেন্টরা কত ভালোবাসে। বেস্ট টিচার এওয়ার্ড পেয়েছে ও। একটা দিকে তার দুর্বলতাতা থাকতেই পারে।
    • আবার জ্ঞান দিতে আরম্ভ করেছ তুমি। বিরক্ত লাগে এ সব শুনতে।

     

    দোলন বাড়ি ফিরতেই তার এরকম স্বার্থপর ব্যবহার করার কারন জানতে চায় অরুনিমা। দোলনের সোজাসাপ্টা জবাব, ওদের সঙ্গে আমার পোষায় না। তাই আসতে বারন করেছি।

    • ওরা তো সোহমের বাড়ির লোক। সোহমের পিসি। রক্তের সম্পর্ক।
    • সোহমের তাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াক, হোটেলে থাকুক। আমার কোন আপত্তি নেই। আমি তাদের জন্যে কোন ঝামেলা নিতে রাজি নই।
    • সে কথাটা পরিষ্কার জানালেই পারিস ওকে। ব্ল্যাকমেল করছিস কেন?
    • আমি যা চাই তাই মেনে না নিলে আমার সঙ্গে থাকার দরকার নেই। এটা পরিষ্কার জানিয়েছি। তার মধ্যে আবার ব্ল্যাকমেলের কি হল?
    • যত সহজে তুই বলছিস তত সহজে তুই পারবি ওকে ডিভোর্স করতে?
    • পারব। তোমারও উচিত ছিল বাবাকে ডিভোর্স করে দেওয়া। সারাদিন তো ঝগড়া করতে। কোনদিন তোমরা একে অপরকে ভালোবাসনি।
    • তোদের মানুষ করার দায়িত্ব তো ছিল।
    • শুধু দায়িত্ব পালনের জন্যে লোকদেখানো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কি মানে হয়? বাবার সঙ্গে সারা বছরে কদিন থাকো তুমি?

    অদ্ভূত একটা থমথমে পরিবেশ হয়ে যায় বাড়িতে। দেবাঞ্জন আগাগোড়া সব কথোপকথন শুনেও নিশ্চুপ থাকে। অরুনিমা স্বগোতক্তির সুরে বলে, আজ এত বছর পরে আমাকে মেয়ের কাছে কৈফিয়ৎ দিতে হবে আমি তাদের বাবাকে ডিভোর্স করিনি কেন? আশ্চর্য। সেই সময় সেই অবস্থায় আমার মনে হয়েছিল সেটাই যুক্তিযুক্ত।

    • আর ঝগড়া না করাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি?
    • ঝগড়ার বেশিরভাগটাই করেছি তোদের ভালোভাবে মানুষ করার জন্যে।
    • তাতে কি লাভ হয়েছে? আমি শিখেছি আমার জীবনের সব পুরুষকে ডমিনেট করতে। ভাই কি শিখেছে? ও বোধহয় পরিবার নামক কেই বিশ্বাস করে না আর।

    দেবাঞ্জন ফিরে গেছে দেশে। দোলনের কাজের লোকও ফিরে এসে ক্ষমা চেয়ে পুনরায় কাজে বহাল হয়েছে। কাজের লোকের সঙ্গে দোলনের ব্যবহার দেখে আঁতকে ওঠে অরুনিমা। বেইবেই কি ভালো ব্যবহার পায় দোয়েলের বাড়িতে। বাড়ির সবার সঙ্গে সমান স্ট্যাটাস তার। দোলনের কাছে কাজের লোক মানে কাজেরই লোক। সকাল থেকে মেয়েটা কাজ করে যায়। তারওপর পান থেকে চুন খসলেই বকাবকি। রোজ হরেক রকম রান্না। বাড়ির সবার পছন্দ অপছন্দ প্রবল। নুন একটু কম হলে ঝাল একটু বেশি হলে খাবে না। রোজ কতো জামা কাপড় ইস্ত্রী করে সে। কেউ পরতে গিয়ে  পছন্দ না হলে সেটাকে কুঁচকে ছুঁড়ে ফেলে বিছানায়। অর্ডার করে – লিলিবেথ, অমুক জামাটা আয়রন করে দাও। সারাদিন যতক্ষন দোলন আর মানস দুজনে বাড়িতে থাকে ততক্ষন লিলিবেথ এটেনশানের পজিশানে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে কাছাকাছি। অর্ডার করলেই সঙ্গে সঙ্গে তামিল করতে হবে। এই কয় বছরে ওরা এত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে!

     

    একদিন সকালে দেখল সোহমকে ক্যারাটে প্রাক্টিস করাচ্ছে দোলন। সামনেই পরীক্ষা। একটা কাগজের কাট-আউট বানিয়ে লিলিবেথকে সেটা ধরে দাঁড়াতে বলেছে। লিলিবেথ খুব ভয় পাচ্ছে। অরুনিমা বলল

    • এ সবের কি দরকার আছে? ও একা একাই প্র্যাকটিস করুক না।
    • না না, কাট আউটটা না থাকলে ও বুঝতে পারবে না ও ঠিক জায়গায় হাত পা ছুঁড়ছে কিনা।
    • কিন্তু লিলিবেথের তো লেগে যেতে পারে।
    • লাগবে কেন? তুমি যাও এখান থেকে। ঐটুকু ছেলে পা ছুঁড়ছে। লাগলেই বা কত জোরে লাগবে?
    • বয়সের তুলনায় সোহমের চেহারা বড়সড়। লেগে যেতেই পারে।
    • মা, তুমি আমার ছেলের চেহারা নিয়ে এরকম কথা বলবে না। ও একেবারে পারফেক্ট আছে।

    অরুনিমা চলে যায় ঘর থেকে। মিনিট পাঁচেকও যায় না। তার আগেই লিলিবেথের চিৎকার শোনা যায়। হাতে লাথি লেগে কালশীটে পড়ে গেছে। সে আর ধরতে অস্বীকার করেছে। এত কিছুর পরও এই কাজের মেয়ে যে টিকে আছে সেই ভাগ্য। যে কোনদিন নির্ঘাত আবার পালাবে লিলিবেথ।

     

    সপ্তাহান্তে মানসের দিদিদের আসার কথা। দোলনকে রাজী করানোর শেষ চেষ্টা করে অরুনিমা।

    • মানসের দিদিকে এখানে না থাকতে দিলে এই নিয়ে তোর অশান্তি বাঁধবে না মানসের সঙ্গে?
    • বাঁধলে আমি সামলাবো।
    • মানসের ব্যাবসার টাকাতেই তো তোর এত পয়সা। এমন মহারানীর মতো থাকিস তুই।
    • সব ছেড়ে দিয়ে অনায়াসে আমি আবার সাধারন জীবন যাপন করতে পারব মা। তুমি চিন্তা করোনা। তোমাকে যে হাতখরচ দিই সেটা বন্ধ করে দেবো। তোমার শখআহ্লাদ মেটানোর জন্যে আমার কম টাকা খরচ হয় নাকি!
    • কি চেয়েছি আমি তোর কাছে যে এসব শোনাচ্ছিস?
    • যা সত্যি তাই বলছি মা।

     

    অরুনিমা কথা বাড়ায় না। দোলনকে কিছু না বলে সোজাসুজি মানসকে ওর জন্যে কলকাতার টিকিট কেটে দিতে বলে। দেবাঞ্জনকে জানিয়ে দেয় ও নিজের বাড়ি ফিরছে। চিরদিনের মতো। দেবাঞ্জনের গলায় ভালোলাগার আনন্দ টের পায়।

    ১০

    ফিরে যাওয়ার আগের দিন দর্পনের সঙ্গে ফোনে কথা হয়।

    • কতদিন দেখা হয়নি তোর সঙ্গে। বাবা এল। এইসময় এখানে ঘুরে যেতে পারতিস।
    • কি করব মা। আমার অতো টাকা নেই যে ইচ্ছে করলেই চলে যাব।
    • আমাদেরও তো কোনদিন যেতে বলিস না! তোর ইচ্ছে করে না আমরা তোর কাছে যাই?
    • ইচ্ছে করলে চলে এসো। তুমি তো জানোই আমি কাউকে কিছু নিয়ে জোর করি না আর কেউ আমাকে কোন ব্যাপারে জোর করুক, তাও ভালো লাগে না।

     

    খুব জানে অরুনিমা। ছোটবেলায় সর্বদা ছেলেমেয়েদের কানের কাছে মন্ত্রের মতো সে আওড়াতো, স্বপ্নের জাদুকাঠি যদি পেতে চাও তো পরীক্ষায় প্রথম হও। দুনিয়ার সব সাফল্য, সব সুখ হাতের মুঠোয় চলে আসবে। দুই মেয়েই সবসময় ভালো রেজাল্ট করত। কিন্তু দর্পন কেয়ার করত না। পরিস্কার বলে দিয়ছিল যে সে এই ইঁদুর দৌড়ে নেই। সে তার মতো চলবে। যখন যেখানে পৌঁছয় পৌঁছবে। আশ্চর্য একগুঁয়ে ছেলে ছিল। তার দুঃখ আনন্দ চাওয়া-পাওয়া কোন কিছু সে কোনদিন ভাগ করেনি বাড়ির কারো সঙ্গে। কারো সঙ্গে তার সম্পর্কের গাছটা কোনদিনই মাটিতে গাঁথেনি। যেন জলজ উদ্ভিদের মতো জলে ভেসে ভেসে চলেছে সর্বদা।

    • হ্যাঁ রে দর্পন বিয়ে করবি না তুই?
    • জানি না। দেখি।
    • বয়স কত হল খেয়াল আছে? গার্ল ফ্রেন্ড আছে। নাকি তাও নেই?

    ওপাশ থেকে কোন পরিষ্কার উত্তর নেই। শুধু একটা হাসির শব্দ। এতবড় ছেলেকে কি জোর করে বিয়ে দেওয়া যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় ছেলেটা কি ‘গে’? কোন বয়ফ্রেন্ড আছে ওর? যদি তা না হয় তাহলে এত বড় ছেলেটার শারীরিক প্রয়োজনের জন্যেও তো একটা গার্লফ্রেন্ডের দরকার হয়। নাকি অনেক মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক আছে কিন্তু মনের যোগ নেই। সেও বুঝি তার মতোই এক চিরহরিৎ সম্পর্কের খোঁজে ঘুরে মরছে এক সম্পর্ক থেকে আর এক সম্পর্কে।

    • আর কতদিন একা থাকবি?
    • সবাই তো একা মা। বাবাকে দেখো। ছেলেমেয়ে নাতি নাতনিরা আছে। তুমি আছ। তাও বাবা একা থাকে।

     

    অরুনিমাকে শোনাচ্ছে? অভিমানে ভরে ওঠে মনটা। সব ওর একার দোষ। সবাই ভাবে তাই। সব ছেলেমেয়েরা তাকে দোষ দেয়। তাদের বড় করার জন্যে সে কি কম ত্যাগ স্বীকার করেছে? কেউ মনে রাখেনি সে সব।

    • আমি কলকাতা ফিরে যাচ্ছি। ওখানেই থাকব এইবার।
    • সত্যি মা? তুমি ফিরে যাচ্ছ দেশে?
    • হ্যাঁ রে। দোলন দোয়েলের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। ওরা এইবার নিজেদের জীবন সামলে নিতে পারবে।
    • তুমি ফিরে গেলে পূজোর সময় দেশে যাব আমি। কতদিন দেশের পূজো দেখিনি।

     

    অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে অরুনিমা। বিছানায় বসে জানলা দিয়ে দেখে বাইরের পৃথিবী। একটু অন্ধকারের জন্যে তৃষ্ণা জাগে মনে। এ শহরে চারিদিকে বড় আলো। আকাশের তারাগুলোও দেখা যায় না। মাঝে মাঝে চারিদিক ঘন অন্ধকার করে দিতে ইচ্ছে করে, যাতে আকাশের তারার মতো ছোট ছোট আলোকজ্জ্বল ঘটনাগুলো নজরে পড়ে। এত বড় বড় চাওয়া-পাওয়া নিয়ে কারবার করতে করতে ছোট ছোট আনন্দ গুলো সব কেমন হারিয়ে গেছে আজ।

     

    ১১

    দোয়েল একদিন ফোন করেছিল। জানিয়েছিল সে প্রোমোশান পাচ্ছে এবং এক সপ্তাহের জন্যে অফিসের কাজে সাংহাই যাচ্ছে। বাড়িতে ছেলেমেয়েরা কদিন বেইবেই-এর কাছেই থাকবে। দীপক আসতে পারছে না। অরুনিমা নিজের আবেগকে সামলে রেখেছে। রিয়া আর রোহণের জন্যে মনটা উতলা হয়ে উঠেছে খুব। তাও নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থেকে খুব কঠিন ভাবে দোয়েলকে জানাতে পেরেছে যে, সে ওর প্রোমশানের খবরে খুব খুশি, কিন্তু সে কলকাতা যাচ্ছে। এর পর প্রত্যাশিত ভাবেই দোয়েল খুব রেগে গেছে। দোলনও মায়ের কলকাতা যাওয়ার সিদ্ধান্তে অখুশি।

     

    অরুনিমার কলকাতায় ফিরতে ভালোলাগছে। ভালোলাগছে দেবাঞ্জনের কাছে ফিরতে। নিজের বাড়িতে ফিরবে সে। কদিন আগেও মনে হয়েছিল তাদের সম্পর্কের গাছটার ফসিল ছাড়া আর কোন চিহ্ন নেই। আজ মনে হচ্ছে এক পশলা বৃষ্টির জলে সেই ফসিলের মধ্যে প্রানের সঞ্চার হয়েছে। ফসিলের গায়ে গজিয়েছে কিছু টাটকা নতুন গাছ। তাদের কচি সবুজ পাতা ভরা ডালপালা তারা মেলে দিয়েছে আকাশের দিকে – আরো আলো, হাওয়া আর উষ্ণতার খোঁজে। অরুনিমা স্বপ্ন দেখে এই চারাগুলো দ্রুত বেড়ে উঠবে, হয়ে উঠবে এক চিরহরিৎ বৃক্ষ।

     

    প্লেনে জানলার ধারের সীটে চুপচাপ বসে থাকে। হঠাৎ ভেতরে টাপুর-টুপুর কথোপকথন শুরু হয়।

    • জীবনটাকে কি রূপকথা ভেবেছিস?
    • রূপকথাই তো জীবন। রূপকথাতে কি শুধু রাজকন্যা-রাজপুত্র-পক্ষীরাজ আর অঢেল ঐশ্বর্য আর সুখ থাকে? সেখানে রাক্ষস, ডাইনী, দুষ্টু সৎ মাও তো থাকে।
    • ‘তারা চিরকাল সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকল’ এই দিয়ে জীবন কোনদিন শেষ হয় না।
    • হয় হয়। ভুলে যাস না আমি আমার নিজের ঘরে ফিরছি এইবার।
    • সে তোর মতামত কে পাত্তা না দিলে মেনে নিতে পারবি?
    • পারব। এখন তো আমার মতামতকে কেউই পাত্তা দেয় না। রাগ করি না তো।
    • দুঃখ তো পাস। দিনের পর দিন দুঃখ জমিয়ে রাখতে পারবি?
    • দুঃখ পাবো না। দেবাঞ্জন আর আমি দুজনেই নিজেদের একটু পাল্টাতে চেষ্টা করব।
    • মেয়েদের সঙ্গে থেকে থেকে তুই খুব আরামপ্রিয় হয়ে উঠেছিস। এয়ার কন্ডিশান ছাড়া তোর চলে না। ট্যাক্সী ছাড়া তুই যাতায়াত করতে পারিস না। দোকানে নতুন কিছু পছন্দ হলেই তোর কিনতে ইচ্ছে করে। টাকা শেষ হলেই তোর ব্যাগে টাকা ভরে দেয় মেয়েরা। টাকা হিসেব করে বাজার করতে পারবি?
    • কত বছর প্রতিটি টাকা গুনে গুনে সংসার করেছি আমি।
    • দেবাঞ্জনের সঙ্গে থাকলে তোর জীবন-যাপনের অভ্যাসে অনেক বদল আসবে। তোর কাঙ্খিত সুখ মিলবে না।
    • স্বস্তি তো মিলবে।
    • সুখের থেকে স্বস্তিকে তুই কোনদিন বড় করে দেখিস নি। তুই চাস অনেক টাকা থাকবে, তুই ইচ্ছে মত কেনাকাটা করতে পারবি,এক গন্ডা কাজের লোক মজুত থাকবে তোর হুকুম তামিল করার জন্য। কোনদিন চেয়েছিলি ঝগড়াঝাটিহীন ভালোবাসার একটা পরিবেশ থাকবে ঘরে?
    • সব মানুষই তো তাই চায়।
    • বরের কাছে যখন এসব পাসনি তখন ছেলেমেয়েদের মধ্যে দিয়ে তা পূরণ করার চেষ্টা করেছিলি। তুই সত্যিই দেবাঞ্জনের কাছে এসে ভালো থাকবি?

    অরুনিমা নিশ্চিত করে হ্যাঁ বলতে পারে না। ভাবে। ভেবেই চলে। কতক্ষন জানেনা। বোধহয় ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্নের মতো দেখে।

    একটা শহর। অসংখ্য বাড়ি, অসংখ্য সাপের মতো রাস্তা, অগুন্তি লোক। অরুনিমা হেঁটে চলেছে। এক রাস্তা থেকে আর এক রাস্তায়। এক গলি থেকে আর এক গলিতে। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না তার বাড়িটা। সব বাড়িই একইরকম। সে হেঁটে চলেছে। এপাশে অন্ধকার হয়ে আসছে। ওর খুব ভয় করছে। কান্না পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গলা দিয়ে কিছুতেই কোন আওয়াজ বেরোচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যাথা হয়ে গেছে। শরীর আর চলছে না। কি জানি কতক্ষন অবিরাম হেঁটেই চলেছে ও। হঠাৎ অরুনিমা পরিষ্কার দেখতে পায় বাড়িটা।

    • চল, চল, ঐ তো আমাদের বাড়ি।
    • হ্যাঁ ঐ তো। দেখ ঠিক খুঁজে পেয়েছি আমাদের বাড়িটা। বলেছিলাম না খুঁজে পাবোই।

     

    তার মন আর ছায়া মন এই প্রথম কোন বিভেদ করলো না নিজেদের মধ্যে। এই প্রথম তারা আমি-তুই ছেড়ে আমরা হয়েছে। অরুনিমা একটুও ইতস্ততঃ করে না। এগিয়ে যায়। কি যে ভালো লাগছে তার। এতদিন পরে সে তার নিজের বাড়ি ফিরেছে। কী এক নিবিড় আকর্ষণ বোধ করে সে। কী এক অপরিসীম মায়ায় সে তাকিয়ে থাকে বাড়িটার দিকে। দরজা খোলা রয়েছে। ফুলপাতা ছাপা কাপড়ের পর্দা উড়ছে দরজায়, জানলায়। এগিয়ে যায় অরুনিমা। আরে ঐ তো তার সব প্রিয়জনেরা উপস্থিত। তার জীবনের সব চিরহরিৎ সম্পর্কগুলো। মা রান্নাঘরে। বাবা চেয়ারে বসে কাগজ পড়ছে। ঠাকুমা জামা কাপড় মিলে দিচ্ছে রোদে। ওকে দেখে সবাই হাসে। নিঃশব্দ অভ্যর্থনা জানায়। খুব নিশ্চিন্ত লাগে আজ। অরুনিমা বিছানায় গিয়ে বসে। আলোয় ভেসে যাচ্ছে ঘর। জানলা দিয়ে কী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। আরামে ঘুমে জড়িয়ে আসছে চোখ। এতদিন পরে সে তার নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরে, নিজের বিছানায়। আজ প্রান ভরে ঘুমাবে সে।।

    SHARE

    3 COMMENTS

    1. অনেকদিন পরে চির হরিৎ বৃক্ষ সেজে উঠছে। এমন করেই চলতে থাকুক লেখনী।

    LEAVE A REPLY