কালবৈশাখি ঝড়ের কাঁচা আম

    0
    6844
    প্রচেত গুপ্ত
    জন্ম : ১৪ অক্টোবর, কলকাতায়, ১৯৬২ সালে | কলকাতার গায়ে বেড়ে ওঠে শহরতলি বাঙুর এভিনিউতে স্কুলের পড়াশোনা, বড় হওয়া | স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে লেখালেখির নেশা | প্রথম লেখা মাত্র ১২ বছর বয়সে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় | তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখা চলতে থাকে | গোড়ার দিকে ছোটদের জন্য লেখাতেই বিশেষ ঝোঁক ছিল | স্কুল শেষ হলে স্কটিশ চার্চ কলেজ | এরপরই একটা দুটো করে বড়দের জন্য লেখার শুরু | অর্থনীতিতে স্নাতক হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়া | বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত | প্রথম উপন্যাস 'আমার যা আছে' প্রকাশিত হয় আনন্দলোক পত্রিকায়, ২০০৪ সালের পূজাবার্ষিকীতে |
    story by Pracheta Gupta

    মধু কাঁদছে। জোরে কাঁদছে না, ফিচ্ ফিচ্ করে কাঁদছে। আশপাশের কেউ বুঝতে পারছে না, আমি পারছি।

    মধু কাঁদছে আর মাঝেমাঝে টাই দিয়ে চোখ মুছছে। আমি রুমাল, রেঁস্তোরার ন্যাপকিন, শাড়ির আঁচল, ওড়না, জামার হাতা দিয়ে চোখ মোছার ঘটনা জানি। টাই দিয়ে চোখ মোছার ঘটনা এই প্রথম দেখছি। অবশ্যই এটা একটা কঠিন কাজ। মধু সেই কঠিন কাজ করছে।

    মধু আমার স্কুলের বন্ধু। ভাল নাম মধুসূদন। সেই মধু এখন আমার সামনে বসে আছে। আমরা বসে আছি গলির মুখের ‘ভাত-মাছের’ হোটেলে। আমরা একটা কোণ দেখে চেয়ার টেবিলে বসেছি। এই দিকটা নিরিবিলি। এখন সবে সকাল ন’টা, সাড়ে ন’টা বাজে। এখন আমার ভাত খাবার সময় নয়। যারা চাকরি বাকরি করে, রোজগারপাতির জন্য সারা দিন ধান্দা করে তারা এই সময়টায় ভাত খায়। এর কোনওটার মধ্যেই আমি নেই। না করি চাকরি, না আমার রোজগারপাতির ধান্দা আছে। যোগ্যতাও নেই। এই সময়টায় ভাতের বদলে আমি খাই গড়াগড়ি। আমার ঘরের পায়া ভাঙা তক্তাপোষে গড়াগড়ি। আহা! গোটা দুনিয়া যখন কাজের জন্য পড়িমরি করে ছুটছে, হোঁচট খাচ্ছে, ল্যাং মারছে, কনুই দিয়ে গুঁতোচ্ছে তখন নিশ্চিন্তে, নিরাপদে তক্তাপোষে গড়াগড়ি দেবার মতো আরাম আর কীসে আছে? নিজেকে রাজার মতো মনে হয়। সিংহাসনে বসা রাজা নয়, তক্তাপোষে শোয়া রাজা। সিংহাসনে বসা রাজা হবার জন্য বাপ-ঠাকুর্দার জোর লাগে, লোক ঠকানো লাগে, যুদ্ধ লাগে, লোভ লাগে, সোনা দানা লাগে। তক্তাপোষে শোওয়া রাজা হবার জন্য শুধু মন লাগে।

    কিন্তু আজ আমি সকাল সকাল ভাত খেয়ে নিচ্ছি। তার কারণ কী?

    কারণ দুটো, মধু এবং কাঁচা আমের চাটনি।

    আজ সকালে ঘুম ভাঙল কাঁচা আমের স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নটা ছিল অদ্ভুত। আমি একটা আমবাগানের ভিতর দিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে যাচ্ছি। আমবাগানের পাহারাদার পোস্টে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি। গাছে এখন থরে থরে কাঁচা আম। এই আম পেকে টুসটুসে হওয়া পর্যন্ত লাঠি হাতে বাগান পাহারা দিতে হবে। সেই কারণে লোক চাই। সকালে সেজেগুজে বেরিয়েছি। হাতে ফাইল। পায়ে শ্যু। ইন্টারভিউ খুবই কঠিন হবে বলে শোনা যাচ্ছে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন দুঁদে অধ্যাপক থাকছেন। তাঁরা এমন প্রশ্ন করবেন যে ক্যান্ডিডেটের হাঁড়ির হাল হয়ে যাবে। নাকের জলে চোখের জলে করে ছাড়বেন। ইতিমধ্যে কানাঘুষোয় দু’-চারটে প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসে গোরার চোখের রং কী ছিল? দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের চরিত্র বিমলার হাইট কত? মহাবিজ্ঞানী নিউটন সাহেব থার্ড ল তৈরির দিন কী দিয়ে ডিনার করেছিলেন? মহাকাশযানের রং নীল হয় না কেন? নীল আকাশে হারিয়ে যাবে বলে? এ সব শোনার পর থেকে আমার টেনশন হচ্ছে। স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে আমি চিন্তিত ভাবে হাঁটছি। হঠাৎ শুনি বাচ্চা ছেলের গলা।

    ‘অ্যাই, অ্যাই গাধা সাগর কোথায় যাচ্ছিস?’

    মুখ তুলে দেখি, হাফপ্যান্ট, স্যান্ডো গেঞ্জি পরা দশ-এগারো বছরের ছেলে। আমগাছের ডালে বসে কাঁচা আম চিবোচ্ছে আর পা দোলাচ্ছে। আমি তাকাতেই চোখ টিপল।

    আমি রেগে গিয়ে বললাম, ‘চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি। গাধা বলছ কেন?’

    ছেলেটা ফিচ্ করে হেসে বলল, ‘গাধা বলব না তো কী বলব? ওই চাকরি তুই পাবি ভেবেছিস?’

    আমি বললাম, ‘কেন! আমি তো হেভি খেটেছি। পাব না কেন?’

    ছেলেটা কাঁচা আমে কচ্ করে কামড় দিয়ে বলল, ‘ক্যান্ডিডেটদের মধ্যে চেনাজানা আছে।’

    আমি বললাম, ‘চেনাজানা মানে! কাদের চেনাজানা?’

    ছেলে বলল, ‘যারা ইন্টারভিউ নেবে তাদের চেনাজানা। তিন জনের মোট সাত জন চেনাজানা ক্যান্ডিডেট আছে। প্রাইভেট ছাত্র, শালা, ভাগ্নে, ভায়রাভাই, নিজের ভাইপো, খুড়তুতো ভাইপো, মেজোমামা। ওদের নিজেদের মধ্যেই খানিক পরে বিরাট ঝামেলা লেগে যাবে। মারপিটও হতে পারে। লেখাপড়ার লোক তো, লাঠিসোসোঁটা দিয়ে মারপিট হবে না। মোটা বই ছুড়ে মারপিট হবে। পেনের খোঁচাও চলবে। ও সব গোলমালের মধ্যে গিয়ে তোর লাভ কী? তুই বরং গাছে উঠে আয়। এসে আমার সঙ্গে কাঁচা আম খা।’

    আমি আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, ফাইল ফেলে, জুতো খুলে স্বপ্নের মধ্যেই সর্ সর্ করে গাছে উঠে পড়লাম। উঠে দেখি, আরে, এ তো সাগর! ছোটবেলার সাগর। দারুণ মজা তো! তার পর বড়বেলার সাগর আর ছোটবেলার সাগর গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে মহানন্দে আম খেতে লাগলাম। আহা! কাঁচা আমের কী টেস্ট!

    ঘুম ভেঙে গেল দরজার খটখটানিতে। খুব বিরক্তি নিয়ে তক্তাপোষ ছেড়ে দরজা খুললাম। দেখি, মধু। মধুসূদন দত্ত। কোট প্যান্ট, টাই পরে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বেটা নিশ্চয় অফিস যাচ্ছে। টাইয়ের রংটা কাঁচা আমের মতো সবুজ।

    ‘খুব বিপদে পড়েছি সাগর। আমাকে বাঁচা।’

    আমি আড়মোড়া ভেঙে বললাম, ‘ভিতরে আয়।’

    মধুর বিপদের কথা শুনলাম। হাই তোলা বিপদ। যে বিপদের কথা শুনলে হাই ওঠে তাকে বলে ‘হাই তোলা বিপদ’। এই ধরনের বিপদের নিয়ম হল যার হয় সে ভাবে, গভীর সমুদ্রে পড়েছি। আর যে শোনে তার মনে হয়, কোনও ব্যাপারই নয়। আর একপ্রস্ত ঘুমিয়ে নেওয়া যায়।

    মধু আমার হাত চেপে ধরে বলল, ‘আমাকে বাঁচা ভাই। আমি মরে যাব।’

    আমি হাই তুলে বললাম, ‘সেটাই ভাল। তুই বরং মরেই যা। সুইসাইড কর। কী ভাবে করবি? গলায় দড়ি দিবি? একটা শুভ দিন দেখে ঝুলে পড়।’

    মধু বসেছে আমার ঘরের একমাত্র মোড়ায়। কোটপ্যান্ট টাই পরা ঝকঝকে যুবককে কঞ্চি উঁচিয়ে থাকা ভাঙা মোড়ায় চমৎকার মানিয়েছে। ইস্ একটা ক্যামেরাওলা মোবাইল ফোন থাকলে হত, ছবি তুলে রাখতাম। ছবির ক্যাপশন হত ‘কোটপ্যান্ট মধু ও ভাঙা মোড়া’। মধু মাথা নামিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘এ কথা সবাইকে বলা যায় না। হাসবে। ছেলেমানুষী বলবে। বলবে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বলবে ধেড়ে বয়সে এ সব কী! আমি জানি, শুধু তুই বলবি না। বিশ্বাস কর সাগর, তিন দিন ঘুমোতে পারিনি। একমাত্র তুই কিছু একটা করতে পারিস সাগর। প্লিজ ঠাট্টা করিস না।’

    আমি সিরিয়াস মুখ করে বললাম, ‘ঠাট্টা করব কেন? প্রেমে প্রত্যাখ্যান কোনও ঠাট্টা করবার মতো ঘটনা হল? এই ব্যাপারে সব থেকে বেশি অভিজ্ঞতা আছে আমার। তোকে তো একজন ল্যাং দিয়েছে। আমাকে সব মেয়ে ছেড়ে পালায়। বেকার, অলস, বাজেবকা ছেলের সঙ্গে কোনও মেয়ে থাকবে? আমি হলাম প্রত্যাখ্যান সম্রাট। কতবার ভেবেছি সুইসাইড করব। ঝামেলা একেবারে চুকিয়ে ফেলব। সুইসাইড করবার মুখে গিয়ে আবার কোনও মেয়ের প্রেমে পড়ে গেছি। মনে হয়েছে, জীবন কী সুন্দর!’

    মধু বলল, ‘ঠাট্টা বন্ধ কর। কিছু একটা কর। কলিকে গিয়ে বোঝা।’

    আমি বললাম, ‘কী বোঝাব! ওই মেয়েকে তো আমি চিনিই না! একবার দু’-বার দেখা হয়েছে। তাও সে সব সময় তুই পাশে লেপ্টে ছিলি। হাদা প্রেমিকরা যেমন থাকে। একা যে দুটো কথা বলে মেয়েটাকে বুঝব সে চান্সও দিসনি।’

    মধু বলল, ‘আমি কিছু জানি না। তোকে বোঝাতেই হবে।’

    আমি বললাম, ‘লেখাপড়া জানা, বুদ্ধিমতী, আধুনিক মেয়ে, তার ওপরে অমন ডাকসাইটে সুন্দরী। প্রেমের ব্যাপারে সে অন্য লোকের কথা শুনবে কেন? সে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভেবেচিন্তেই নিয়েছে।’

    মধু বলল, ‘কিছুই ভেবেচিন্তে নেয়নি। রাগের মাথায় নিয়েছে। তুই ম্যাজিক জানিস সাগর। হয় কে নয় করতে পারিস।’

    আমি অন্যমনস্ক ভাবে বললাম, ‘হয়কে নয় করা যায়, নয়কে কি আর হয় করা যায়? কলি জানিয়ে দিয়েছে, তোর সঙ্গে আর প্রেম নয়, সেটাকে কী ভাবে হয় করব? আচ্ছা, মধু তোদের ঝগড়া কী নিয়ে?’

    মধু একটু চুপ করে থেকে, টাইয়ের ডগা খুঁটতে খুঁটতে ভারী গলায় বলল, ‘খুবই সামান্য বিষয়। সে দিন কলির সঙ্গে সিনেমা দেখে বেরিয়ে দেখি, হলের বাইরে তীর্থানি দাঁড়িয়ে আছে।’

    আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, ‘তীর্থানিটা কে?’

    মধু বলল, ‘আমার সঙ্গে ম্যানেজমেন্ট পড়ত। চমৎকার মেয়ে। খুব মজা করতে পারে। চারটে বছর একেবারে জমিয়ে রেখেছিল সবাইকে। অনেক দিন পরে ওকে দেখে আমি হইহই করে উঠলাম। আইসক্রিম খাওয়ালাম। তার পর গাড়িতে রাসবিহারী মোড় পর্যন্ত লিফট দিলাম। দু’জনে খুব গল্প করলাম। সেকেন্ড সেমিস্টারের পর ওদের বারাসাতের বাগানে গিয়ে কেমন জমজমাট পিকনিক হয়েছিল তাই নিয়ে খুব একচোট হাসাহাসি হল। তীর্থানি বলল, ম্যাঢু, মনে আছে, আমগাছে দোলনা বেঁধে আমি আর তুই কেমন দুলেছিলাম? আমি বললাম, মনে নেই আবার? দোলনার দড়ি ছিঁড়ে হুড়মুড়িয়ে পড়লাম। তীর্থানি বলল, একেবারে আমার ঘাড়ের ওপর পড়েছিলি। আমরা দু’জনে খুব হাসতে লাগলাম।’

    মধু চুপ করে গেল। আমি বললাম, ‘তার পর কী হল?’

    মধু মুখ তুলে ছলছল চোখে বলল, ‘কী আর হবে? আমরা যত হাসছিলাম, আমার পাশে বসে কলি তত মুখ গম্ভীর করছিল। সেটাই খেয়াল করিনি। খেয়াল হল পর দিন। পর দিন কলিকে ফোন করতে সে বলে দিল, আমার সঙ্গে তার আর কোনও সম্পর্ক নেই। এ বার থেকে আমি যেন তীর্থানি নামের বদ, গায়ে পড়া, হ্যা হ্যা করা মেয়েটার সঙ্গেই থাকি। মাঝেমাঝেই তাদের বারাসাতের বাগানে গিয়ে পিকনিক করি। আমগাছে দোলনা টাঙিয়ে দুলি এবং দড়ি ছিঁড়ে এর ওর ঘাড়ে পড়ি। আমাকে সেটাই মানাবে। ঘাড়ে পড়া প্রেমই আমার জন্য উপযুক্ত। সুতরাং গুড বাই। পর পর সাত দিন ফোন ধরেনি কলি। অফিসে গেলে দেখা করছে না। বাড়িতে গেলে মাথা ধরেছে বলে ড্রইং রুম থেকে বিদায় করছে। আমি মারা যাব সাগর… আমি কলিকে ছাড়া মারা যাব…।’

    আমি খানিকটা চুপ করে ভাবলাম। তার পর মুখ তুলে বললাম, ‘একটা পথ আছে।’

    মধু উত্তেজিত হয়ে আমার হাত চেপে ধরল। বলল, ‘আছে। আমি জানতাম তুই ঠিক একটা পথ পাবি।’

    আমি চোখ নাচিয়ে বললাম, ‘কী খাওয়াবি?’

    মধু মোড়ার কিনারে এসে বসল, ‘যা বলবি, কনটিনেনটাল, ইউরোপিয়ান, চাইনিজ, ইজিপসিয়ান, মোগলাই… যা বলবি সাগর, তুই যা খেতে চাইবি। যদি বলিস অক্টোপাসের ঝোল, তাই খাইয়ে দেব।’

    আমি হেসে বললাম, ‘ও সব কিছু লাগবে না। আমাকে কাঁচা আমের চাটনি খাওয়া। এটা হল কাঁচা আমের সময়। পরশু কালবৈশাখি হয়েছে। বাজারে ঝুড়ি ঝুড়ি কাঁচা আম।’

    মধু এক লাফে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘এটা কোনও ব্যাপারই নয়। এক্ষুনি খাওয়াব। আমার গাড়িতে ওঠ।’ কোনও ব্যাপার না বললে কী হবে? আমের চাটনি পাওয়া অত সহজ হল না। আমার ডাল-ভাতের দোকানে গিয়ে এক বাটি চাটনি অর্ডার দিতে গেলাম, বলল, শুধু চাটনি হবে না। ভাত মাছ নিতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেছি। সেই কারণেই সকাল সকাল ডাল, তরকারি, মাছের ঝোল খেয়ে নিলাম। এখন কাঁচা আমের চাটনি খাচ্ছি। চাটনি সাদা বাটিতে দিয়েছে। ঘোর লাগানো রং। আহা! হালকা সবুজ ডুবো ডুবো রসে, ঘন সবুজ আমের টুকরো ভাসছে। ভাসছে তো না যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে! গন্ধ একই সঙ্গে টক, মিষ্টি এবং ঝাল। আমি একটা আম তুলে মুখে দিলাম। মনে হল, পৃথিবীর সেরা তিনটে খাবারের একটা হল এই আমের চাটনি। এই জিনিস আধখানা চোখ খুলে আধখানা চোখ বুজে খেতে হয়।

    এই রকম একটা সময় সামনে বসে ফিচফিচ করে মধু কাঁদছে। কলির জন্য আবেগে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আমার কী করা উচিত? ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের কোট-টাই পরা একটা ধুমসো ছেলে যদি প্রেমিকা ছেড়ে চলে যাবার জন্য কাঁদে তখন কী করতে হয়? একটাই কাজ। গালে ঠাসিয়ে একটা চড় দিতে হয়। আমিও দেব। ভাবছি কখন দেব? চাটনি মাখা হাতে? নাকি হাত ধুয়ে এসে দেব?

    আমি আবার আমার ভাঙা তক্তাপোষে ফিরে এসেছি। মধুর কাজ হয়ে গেছে। অতি সহজেই হয়েছে। হাই তোলা বিপদের হাই তোলা সমাধান।

    পর দিন এক ঝুড়ি কাঁচা আম নিয়ে (অবশ্যই মধুর পয়সায় কেনা) রিকশা চেপে সোজা চলে গেলাম কলির বাড়ি। আমের ঝুড়ি থাকার কারণে কাজের বালক ছেলেটি অতি উৎসাহের সঙ্গে তার ‘দিদিমনি’কে ডেকে নিয়ে আসে। বারান্দায় কলি এসে থমকে দাঁড়ায়।

    ‘আপনি সাগর না? মধুর সেই অকর্মণ্য সেই?’

    আমি নরম গলায় বলি, ‘হ্যাঁ কলি।’

    কলি কড়া গলায় বলে, ‘আপনি কী করতে এসেছেন? মধু পাঠিয়েছে?’

    আমি আরও নরম গলায় বলি, ‘কলি মধু পাঠিয়েছি বটে কিন্তু আমাকে পাঠায়নি।’

    সুন্দরী কলি চোখ পাকিয়ে বলল, ‘এতবার কলি কলি করছেন কেন? আপনাকে পাঠায়নি তো কাকে পাঠিয়েছে?’

    আমি এক গাল গা জ্বলানো হেসে বলি, ‘আম পাঠিয়েছে। মধু এই এক ঝুড়ি তোমার জন্য পাঠিয়েছে কলি। তীর্থানির বারাসাতের বাগানের আম। তীর্থানিকে চেনো তো? মধুর পুরনো সহপাঠিনী। খুবই ভাল মেয়ে। খুবই ভাল মেয়ে। খুব হইহুল্লোড় করে। একবার পিকনিকে গিয়ে মধুর সঙ্গে…থাক ও কথা, কাজের কথা বলি। পরশু রাতের কালবৈশাখির ঝড়ে ওদের বাগানের আমগাছ থেকে অনেক কাঁচা আম ঝরে পড়েছে। মধু নিজের হাতে সেগুলো কুড়িয়েছে। আজ সকালে আমার কাছে এসে বলল, যা সাগর ক’টা আম কলিকে দিয়ে আয়। বলিস যেন চাটনি করে খায়। পুড়িয়ে সরবতও করতে পারে। আবার শুকিয়ে রাখলে পরে আচার করতে পারবে। আমি বললাম…’

    আর বলতে পারলাম না। কলি থরথর করে কাঁপছে। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে। বিড়বিড় করে বলল, ‘বেরিয়ে যান বেরিয়ে যান এক্ষুনি… বেরিয়ে যান বলছি…।’

    মেয়েটার মুখ কী সুন্দরই না লাগছে!

    সে দিনই দুপুরে কলি মধুর অফিসে হানা দেয়। অফিস থেকে বাইরে নিয়ে গিয়ে মধুকে গাড়িতে তোলে এবং গাড়িতেই খুব মারধোর করে। কিল, চুলের মুঠি। শুনেছি, মার খেয়ে মধু কান্নাকাটি করেছে। তার পর দু’জনে যায় লং ড্রাইভে। সম্ভবত বারাসতের দিকে কোথাও। সন্ধে নাগাদ কালবৈশাখির ঝড় ওঠে। চার পাশ কালো করে ঝড় ওঠে। গাড়ির কাচ তুলে কলি মধুকে আরেক প্রস্থ মারধোর করে। সেই মারে কিল, চুলের মুঠি সঙ্গে চুমুও ছিল।

     

    আমি এখন আধো ঘুমে। কলি আমাকে মন-ফোনে ধরে। এই ফোনে যন্ত্র লাগে না। মনে মনে কথা বলা যায়।

    কলি ফিসফিস করে বলল, ‘আমি কি আপনাকে একটা ধন্যবাদ দিতে পারি।’

    আমি বললাম, ‘না কলি। আমি ব্যস্ত।’

    কলি অবাক গলায় বলে, ‘আপনি ব্যস্ত! আপনি তো কখনও ব্যস্ত থাকেন না!’

    আমি ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে যেতে বলি, ‘এখন আছে কলি। আমবাগানে পাহারাদারের চাকরি নেব। ইন্টারভিউ আছে। পড়াশোনা করছি।’

    SHARE

    LEAVE A REPLY