ছুটকি দিদির বিয়ে

    যশোধরা রায়চৌধুরী
    কলকাতার বাসিন্দা | নব্বই দশকের কবি | কৃতি ছাত্রী | সরকারি আধিকারিক | একাধিক পুরস্কারপ্রাপ্ত | উল্লেখ্যোগ্য গ্রন্থের নাম পিশাচিনী কাব্য (১৯৯৮)‚ আবার প্রথম থেকে পড়ো (২০০১)‚ মেয়েদের প্রজাতন্ত্র (২০০৫) | কবিতাগদ্যে মননশীল্‚ গল্পেও স্বচ্ছন্দ |
    Yashodhara Roy Chowdhury story online

    তোর মনে আছে ছুটকি দিদি, তোর বিয়েটা কী সুন্দরভাবে হয়েছিল? এত হৈ হৈ করে আমাদের বাড়িতে আর কোনও বিয়ে হয়নি রে। সে অর্থে তোর বিয়েটাই আমাদের ভাইবোনেদের মধ্যে একমাত্র জমজমাট বিয়ে। তার পর থেকেই সব যেন কেমন পালটে গেল, ম্যাটম্যাটে হয়ে গেল রে।

    তোর বিয়েতে, ছুটকি দিদি, আমরা সবাই খুব কাজ করেছিলাম। মজাও করেছিলাম। সত্যি বলতে কি, তোর বিয়েতে যে ভাবে ইনভলভড ছিলাম আমি, সে রকম আর কখনও হইনি। এমন কি নিজের বিয়েতেও না।

    আমার বিয়েটা একদম আমার মনমত ভাবে হল না জানিস তো, ছুটকি দিদি? কী রকম যেন ক্যাচাল হয়ে গেল শেষটা। আসলে আমারই ভুল। আমারই আরও বেশি দিন অপেক্ষা করা উচিত ছিল। উচিত ছিল বড়মামু, মেজমামু, সেজমামু সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে লবিইং করা। সবাইকে আমার পক্ষে নিয়ে আসা।

    তা না করে আমি শুধু আমজাদের সঙ্গে প্রেম করতেই ব্যস্ত রইলাম, নিজে নিজে গিয়ে নোটিশ দিয়ে এলাম রেজিস্ট্রি অফিসে আর প্রায় সবাইকে লুকিয়ে মা নমো নমো করেই আমার বিয়েটা দিয়ে দিল। প্রথমে মেনেই নিতে পারেনি, কিন্তু শেষটা মেনে নিল, তাতেই বা কী হল। বাড়ির সেই জমাটি পারিবারিক বিয়ে-বিয়ে মুড হলই না। কোথা দিয়ে চলে গেল একটা মওকা। তোরা কেউ তো আসতেই পারলি না। অবিশ্যি তুই কী করেই বা দিল্লি থেকে আসতিস, তোদের দিকের কেউই এল না রে। মা-ই তো ডাকল না। ভয় পেল, ভাবল লোকে কী বলবে।

    একে তো এত দেরিতে আমার বিয়ে হল। তার ওপর এ রকম অন্য ধর্মের পাত্র। ঘটা করে বলবে কী। যেন আমার হাতে আমাদের পরিবারের সবার মুখ ম্লান হবার মতো একটা কাজ হয়ে গেছে।

    মায়ের তো আসলে আমাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। আমি পড়াশোনায় ভাল হব, চাকরি করব। একটাই মেয়ে। এ যাবৎ সে সব আশা আমি পূরণও করে এসেছি আগাগোড়াই। এখন কেন যে, এত দেরি করেও একটা ভাল পাত্র পেলাম না। জোগাড় করে দিলাম না মাকে, একটা গর্ব করে বলার মতো জামাই। মা তো আমার কাছে এত দিন যা চেয়েছে সব পেয়েছে। এ বার পেল না বলে এত রাগ?

    ধামাচাপা পড়ে গেল আমার বিয়ে। যাকগে, আজকে তো আমার বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে না। হচ্ছে তোর বিয়ে নিয়ে। কথায় কথায় অন্য দিকে ঘুরে যাচ্ছিলাম। সুখ তো আসলে প্ল্যান করে আনা যায় না। তোর মতো সাধারণ পড়াশুনোর মেয়ে, কেবল সৌন্দর্যের জোরে…

    উফ্। এত কালো মন হয়েছে আমার। ছাড়। গল্পটাই বলি।

    তোর বিয়েটা এখনও আমার স্মৃতিতে বেশ ঝলমলে হয়ে আছে, বুঝলি তো? দিব্যি লাগে ওই ক’টা দিনের কথা ভাবলে। আমাদের সদ্য বড় হওয়া ওই এক্সাইটিং বয়স। ভাইবোনেদের মধ্যে প্রথম বিয়ে।

    হৈচৈ, চেঁচামেচি। কখনও, সখনও ঝগড়াও। কিন্তু তবু, সেটাও তো বিয়ে নিয়েই। আবার বাড়ির সবাই কতটা কাছাকাছি এল। মেজমামি, সেজমামি, ছোটমামি সবাই এল। খুব জমেছিল।

    তপু দাদার বিয়েটা তার পর পরই হয়েছিল। কিন্তু সে বিয়েতে ওই জাঁকজমক কই হল। আমি অবিশ্যি তখন চাকরির ডাকে বাইরে। অ্যাটেন্ডই করতে পারলাম না। তাও তোর ভাইয়ের বিয়েতে তোর থেকে অন্তত দশ ভাগের এক ভাগ মজা হয়েছিল। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আমি।

    তোর বিয়ের প্রথম স্মৃতিটা আমার মনে আসছে, সেটা হল তোর রেজিস্ট্রেশনের দিনটা। তোরা ঠিক করলি, মানে তুই আর অনীকদা, যে আগে রেজিস্ট্রেশনটা করে নিবি। সইসাবুদ করার পর, দিন পনেরো বাদে আবার অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে হবে। মা আমাকে জানাল, বড়মামু মা-কে ডেটটা জানিয়েছে। মা বলল, ছুটকির তো মা নেই, আমিই ওর বড় পিসি। মাতৃস্থানীয়া। ওই দিন সকাল-সকাল যাব। ওকে সাজাব। সইয়ের বিয়ে তো কী হয়েছে। এটাই তো আসল বিয়ে। আর ওই পুরুত ডেকে বিয়ের দিন দেখবি কাজের অকাজের লোক অনেক জুড়ে গেছে। আজ কেউ থাকবে না। দাদা শুধু আমাকে বলেছে, আর ছোটনকে।

    আমরা গেলাম, আমি আর মা। তোদের বাড়িটা তখন সল্টলেকের এমন একটা জায়গায়, যেখানে অনেক দূর দূর যে দিকে দু’চোখ যায়, কিচ্ছু নেই। এ পাশে তিনটে প্লট ফাঁকা। কাশফুল ফোটে। শেয়াল ডাকে।

    অন্য দিকে একেবারে বড় একটা পার্ক। বড় বড় ঘাস।

    ওই ফাঁকা অঞ্চলে ট্যাক্সি যেতে চায় না, গেলে অনেক টাকা চায়, বাড়তি। তার ওপর নম্বর ধরে বাড়ি খোঁজা। কখনও একবারে ঠিক বাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়, বল?

    অনেক খেটেখুটে আমরা যখন পৌঁছলাম, ততক্ষণে বেলা গড়িয়ে গেছে। সাড়ে এগারোটা বাজে। তোদের বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই দেখি, তুই আর বড়মামু কোথায় যেন বেরোচ্ছিস। আমি লাফিয়ে উঠলাম, অ্যাই, এখন কোথায় যাচ্ছিস তোরা? বড়মামুর যা স্বভাব, গম্ভীর তিতকুটে মুখ করে বলল, আর বলিস না অলি, এক্ষুনি ওর মনে হয়েছে চুল বাঁধতে হবে দোকানে। নইলে নাকি বিয়ে হয় না। হন্তদন্ত বড়মামু গিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিল। থুরথুরে বুড়ো গাড়িটা খক খক করে কাশছিল। মামুর সেই অ্যান্টিক পিস। হালকা সবুজ রঙের স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড।

    আমি মাকে ও বাড়ির তত্ত্বাবধানের কাজে বসিয়ে দিয়ে তোর সঙ্গে ঝুলে পড়লাম। মা যেমন ভেবেছিল তেমনটা হয়নি, মায়ের বাছা বাছা এক-এক ভাইয়ের বউ, মেজ সেজ ছোটমামি সবাই এসে, জাঁকিয়ে বসেছে। মা ঠিক নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে পারল না দেখে বেশ মজা পেয়েই সুরুৎ করে কেটে পড়ার তালে ছিলাম। তোর সঙ্গে যাওয়াতে দিব্যি আনন্দ হল। দেখি তোর চুলবাঁধাটা কেমন হয়।

    তোর রেজিস্ট্রার আসবে বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। ঘড়ির কাঁটা বারোটার দিকে চলেছে। দুপুরের খাওয়া টাওয়া কিছুই হয়নি। তাও, গাড়ি যখন বিউটি পার্লারে থামল, মনে হল, অনেক সময় আছে।

    ওরা তোকে খোঁপা বেঁধে দিল। তোর এমনিই অনেক চুল। ওরা তার সঙ্গে একটা বড় ট্যাসেলও দিল। এই লম্বা একটা বিনুনি বানিয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে পুরনো দিনের মতো খোঁপা করল। তার পর খোঁপার মধ্যে ছোট-ছোট পিনে মুক্তোর পুঁতি বসাল। সারা খোঁপা জুড়ে অন্ধকার আকাশে তারার মতো ফুটে রইল পুঁতির মুক্তোরা।

    এরই মধ্যে আমি তোকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করেছিলাম, কী রে, ছুটকি দিদি, তোর বিয়ের শাড়িটা কী রঙের।

    তুই চাপা গলায় বলেছিলি, মেরুন।

    চুল বাঁধছিল তাই ঘাড় নাড়তে পারছিলি না।

    স্থিরভাবে আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে বললি, আমি এখনও দেখিনি। অনীক নিয়ে আসবে। ওই কিনেছে, দিল্লিতে।

    আচ্ছা ছুটকি দিদি, অনীকদা তোর থেকে যেন কত বছরের ছোট? তিন, না চার? এখন আর কেউ ও সব নিয়ে আলোচনা করে না। এখন সবাই অনীকদার ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার আর দিল্লিতে বাড়ি-গাড়ি হাঁকানোটাই মনে রাখে। তখন কিন্তু মেজমামি ছোটমামিরাই অনীকদার সঙ্গে তোর এই বয়সের ডিফারেন্সটা নিয়ে কীই না বলেছিল!

    আরে, আমরা তো তখন যে পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাই, আত্মীয়দের মধ্যে সেই একই আলোচনা। ছুটকি একটা ছেলেকে পছন্দ করেছে অবশেষে, অনেকগুলো বয়ফ্রেন্ডের পর। বিয়ে করবে, কিন্তু সে ছেলে ছুটকির হাঁটুর বয়সী।

    একবার নীপুদার সঙ্গে দেখা কোনও একটা নেমন্তন্নে। ওই যে মায়েদের সেই কী একটা আত্মীয় হয় না, বোধ হয় আগ্রার ছোট পিসিমার হল্যান্ড প্রবাসী নাতি! সম্পর্কে আমাদের দাদা হয়, আসলে বাবার বয়সী হলেও আশ্চর্য হব না।

    তো সেই নীপুদা কলকাতায় এসে, গেট টুগেদারের মধ্যে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে বলল, এই অলি, শোন শোন, ছুটকি কাকে বিয়ে করেছে রে?

    আমি তখন এ সব নিয়ে কথা বলতে ভালবাসি না। নাকের ডগায় চশমা এঁটে শুধু গাঁকগাঁক করে পড়াশুনো করে চলেছি। খুব নিস্পৃহ ভাবে বললাম, অনীকদা, দারুণ পড়াশুনোয়।

    যেন পড়াশুনোর দিকে কথা ঘুরিয়ে দিলে ও সব চুকে যাবে।

    নীপুদা চোখ নাচিয়ে বলল, তা বিয়েটা করছে কবে শুনি?

    আমি তো সাবধান হয়ে গেছি। বললাম, ডেট ঠিক হয়নি এখনও। বেফাঁস কিছু বলে দিলে আবার তুই আমাকে দু’হাতে কাটবি।

    পাশে কে যেন একটা ছিল, তাকে ডেকে নীপুদা হেসে-হেসে বলল, আমি তো শুনলাম ছেলেটা হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করলেই বিয়ে হবে। এখনও অ্যাডাল্ট হয়নি তাই করতে পারছে না।

    ওদের কথাবার্তার বৃত্ত থেকে পালিয়ে বাঁচলাম। কিন্তু আমার তখন তোর ওপরেই খুব রাগ হচ্ছে। তুই তো নিজেই এ সব শুনে মতিস্থির করতে পারিস না। সেই যে, তোদের বিয়ের মাস ছয়েক আগে, হঠাৎ বেঁকে বসলি। আমাকে আর মন্টিকে ডেকে পাঠালি তোদের বাড়িতে। কী যেন একটা জরুরি আলোচনা আছে।

    তোদের পেয়ারা গাছের ডাল ঝুঁকে পড়া ছাতে, দারুণ সুন্দর একটা বিকেলে, তুই আমাদের সামনে ঘোষণা করলি, তুই অনীকদাকে বিয়ে করছিস না।

    কেন? আমরা চেঁচিয়ে উঠলাম।

    তুই বললি, আমি খুব কনফিউজড। বললি, আমার মনে হচ্ছে, আমি অনীককে দমবন্ধ করে দিচ্ছি। ওর পৃথিবীটা অনেক বড় হত। ওর হরাইজনটা এখনও বাড়ছে, ও এখনও অনেক দূর যাবে। আমাকে বিয়ে করলে ওর জীবনটা একটা জায়গায় আটকে যাবে মনে হচ্ছে। আমি ওর কেরিয়ারের পথে ব্লক হতে চাই না। আমি ওকে দিল্লি পাঠিয়েছি, এ বার ও বিদেশেও যাবে। এক্ষুনি বিয়ে করলে ওর কেরিয়ার ডুমড হয়ে যাবে।

    আমরা মাথা নাড়লাম, যেন মেনে নিচ্ছি তোর কথা। আসলে খারাপ লাগছিল। তোর ফিলিংটা বুঝতে পারছিলাম। সে দিন সারা কলকাতার আকাশে বর্ষা-বিকেলের ম্লান অদ্ভুত হলুদ আলো ফুটেছিল। অনীকদার কথা ভেবে আমার গলার কাছটা ব্যথা-ব্যথা করছিল। তুই বলছিলি, কিন্তু আমার তো বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। আমি তো আর অপেক্ষা করতে পারি না। আমি ভাবছিলাম তপনকেই বিয়ে করে ফেলি। ও-ও তো আমার প্রতি ডিভোটেড। বলেছে। অনীকের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেলে ও নাকি সারাজীবন আনম্যারেড থাকবে।

    ছুটকি দিদি, তোর চোখ দিয়ে টপ করে জল পড়ল। তোর দেখাদেখি মন্টিও একটু কাঁদল। আমিও চোখ মুছলাম।

    তোর ফিলিং বুঝতে পারছি রে ছুটকি দিদি। তবে এত ছেলে তোর প্রতি ডিভোটেড, এটা জেনে যে একটু খারাপও লাগছে না, তাও নয়। কী করা যায় বলত?

    এই দোনামোনাটা তো আসলে তোর অনীকদার প্রতি গভীর প্রেমেরই লক্ষণ, আমি নিজেকে বিশ্বাস করাতে চাইছি। তবু, কেন যেন মনে হচ্ছে আসলে এই যে এক মাস হল অনীকদা দিল্লি গিয়ে নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে, এই কারণে ওর সঙ্গে তোর পাত্তা কেটে গেছে। ও বোধ হয় তোকে ফোনটোন করছে না।

    এস টি ডি-তে ফোন করলে খুব পয়সা খরচা হয়। কিন্তু ওকে আমার জানাতেই হবে। তুই এ সব উল্টোপাল্টা ভাবছিস।

    আর এই সুযোগে, ফাঁকে তালে, তপন নামে ওই ধেড়ে দাগি মেয়েবাজটা আবার তোর জীবনে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে।

    ছুটকি দিদি, তুইও কেমন রে। কোনও কথা পেটে রাখতে পারিস না। ঘটনাটা আমাদের সিক্রেট রাখতে বললি। কেউ যেন না জানে, অনীকদা যেন একেবারেই না জানে। তার পর নিজেই বোকার মতো ছোটমামি মেজমামিকে বলে দিলি। আর এদের তো আমরা কম চিনি না। অবশ্য শুধু মামিদের দোষ দিয়েই বা কী হবে। গোটা মিত্তির পরিবারটাই তো এ রকম। কারওরই আর জানতে বাকি থাকল না, মা খুব ছি ছি করল। ছুটকিটা যেন কী। একবার এ ছেলে, একবার ও ছেলে। দেখতে ভাল বলে নিজেকে ধরায় সরা জ্ঞান করে, নাকি?

    আমি অবিশ্যি মনে মনে চাইছিলাম, অনীকদা টুক করে এই ফাঁকে কলকাতায় চলে আসুক। তোর ওপর রেগে গিয়ে চিঠিও লিখে ফেললাম অনীকদাকে। তুই নিজেই গোপনীয়তার শর্ত মানিসনি, আমিই বা মানব কেন? চিঠি পেয়েই অনীকদা প্রায় কাঁদো-কাঁদো মুখে দৌড়ে এল।

    পরে অবশ্য সেই চিঠি নিয়ে তুই অনেক জলঘোলা করেছিলি। কিন্তু তার সঙ্গে তোর বিয়ের দিনের গপ্পোটার কোনও সম্বন্ধ নেই। আমি একটু কাব্যি করে চিঠি লিখতে ভালইবাসতাম। অনীকদাকেও একটু একটু বাসতাম, ওই বয়সে আমরা সবাই সবাইকে বেশ বেশি বেশিই ভালবাসতাম। তো, এ সব তো হতেই পারে। তা ছাড়া অনীকদা তো বয়সে আমার সমবয়সীই। তোর সম্পর্কের নিরিখে ওকে দাদা বলি। নইলে ও আমার বন্ধু হত।

    যাকগে, পরে তুই আমার নামে যে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা বলেছিলি, সে সব আমি মনেটনে রাখিনি। তোকে কবেই ক্ষমা করে দিয়েছি।

    ফিরে আসি রেজিস্ট্রেশনের দিনে। তার পর তো আমরা, মানে আমি আর বড়মামু, তোর চুল বাঁধিয়ে বাড়ি ফিরছি। পেটের মধ্যে চোঁ চোঁ করছে। শুনেছি ইলিশ মাছের ঝোল আর ভাত আছে দুপুরে। কখন যে খাব!

    তোর মাথায় বিশাল এক খোঁপা। ভালো করে মাথাটা সিটে হেলিয়েও রাখতে পারছিস না। ঘাড়-পিঠ ব্যথা করছে নিশ্চয় এতক্ষণে। একঠায়ে বসে।

    বড়মামু ঘাবড়ে গিয়ে ঘ্যাঁস করে গাড়ি থামল, রাস্তার ডান দিকে ঘেঁষে।

    তুই বললি, ইশ, একদম ভুলে গেছিলাম, আমার নবারুণদাকে তো বলাই হয়নি বিয়ের কথা।

    বড়মামু আঁতকে উঠল, সেটা আবার কে?

    উফ্ বাবা কিচ্ছু মনে থাকে না তোমার, সেই যে আমার সঙ্গে তবলা বাজিয়েছিল পুজোয় ব্লকের প্রোগ্রামে যে বার গান গাইলাম। ওই তো, ওই যে ছাতে রঙিন ছাতা লাগানো দোতলা বাড়িটা… এ দিক দিয়ে যাচ্ছি যখন, বলেই যাই।

    কারওর কোনও অপেক্ষা না করে তুই ঝড়ের বেগে ওই বিশাল খোঁপা নিয়ে নেমে গেলি গাড়ি থেকে।

    গেট খুলে তোর নবারুণদার বাড়ির দরজায় বেল টিপলি।

    স্পষ্ট দেখলাম ম্যাক্সিতে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা। ইনি কে? নবারুণদার মা, বৌদি, না বৌ?

    দূর থেকে কিচ্ছু বুঝলাম না। তুই কথা বলছিলি দরজায় দাঁড়িয়েই, বোধ হয় নিজের বিয়ের কথাটাই বলছিলি। আমি আর মামু রাস্তার এ পার থেকে ওই দরজার দিকে তাকিয়ে আছি একঠায়। তুই হাত পা নেড়ে কী সব বলছিস। বেশ কয়েক মিনিট কেটে গেল।

    আচ্ছা কোনও মানে হয়? বড়মামুর মুখে মেঘ জমেছে। দেড়টা বাজে।

    নবারুণদার সঙ্গে তোর কী সম্পর্ক জানি না, মহিলা বেশ খুশিই হয়েছেন, মনে হল।

    দুটোর সময় আমরা বাড়িতে ইন করলাম। পথে তোর কিছু কসমেটিকস কেনার কথাও মনে পড়ছিল। সে বারে আমি আর তোকে একা ছাড়িনি। তোর পেছন পেছন দোকানে ঢুকেছিলাম। ল্যাকমে আর রেভলনের লিপস্টিক কিনলি। কয়েকটা আইশ্যাডো, আইলাইনার, নেলপালিশও কিনলি। সঙ্গে সঙ্গে অনীকদার শেভিং সেট আর আফটার শেভও।

    বাড়ি ফিরেই খেতে বসলাম। দেখলাম সবার খাওয়া হয়ে গেছে। পাতের ও পরে স্তূপীকৃত পেটির খোলস। মানে আমাদের জন্য পড়ে আছে শুধু গাদা। সেজমামি নিজের ছেলেকে বেছে বেছে একের পর এক পেটির মাছ তুলে খাইয়ে গেছে।

    তা যাক। তখন নাকে-মুখে গিলে আমাদের কোনও মতে তোকে রেডি করার কথা।

    কিন্তু অনীকদা কোথায়? অনীকদা? ও এখনও আসেনি কেন? ওর কাছে তো বিয়ের শাড়ি। তোর আসল বিয়ের। সইসাবুদের বিয়ের।

    খাওয়ার পর তোর ঘরে গিয়েই তুই আলমারি খুলে সব নিয়ে বসলি। ভুলে গেছিলি অনীকদার বিয়ের পাঞ্জবির প্যাকেটটা কোথায় রেখেছিস। তোর ওই খোঁজা দেখে আমি বেরিয়ে গেলাম। আর পারছি না।

    মা, মানে তোর পিসি যে ঘরে তুই সইসাবুদ করবি সেখানে ফরাস পাতিয়েছে, রাখিয়েছে ফুলের ঘট। অনেক বাসি রজনীগন্ধা আর মিটমিটে গোলাপগুলো গন্ধ ছড়াচ্ছে। মাঝখানে ছোট ডেস্ক, বোধ হয় তপু দাদার পড়ার টেবিল থেকে তুলে আনা।

    বড়মামু আবার কট্টর বামপন্থী। মা মিনমিন করে বলল, দাদা একটু মালা বদলটদল করাব ভাবছি। বৌদি থাকলে নিশ্চয়ই বাধা দিত না। আমার কাছে অনুরূপা দেবীর এডিট করা মিলনের মন্ত্রমালা বইটা আছে। ওটাতে খুব ভাল ভাল বৈদিক মন্ত্র আছে। অলি তো আবৃত্তি-টাবৃত্তি করে, ওকে দিয়ে দেব বইটা। ও বেছে নিয়ে পড়বে।

    বড়মামু আজকে কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা। অন্য সব টেনশনে এখন এ সব ব্যাপারে মনটন দিতে পারছে না। বলল, ঘোঁৎ ঘোঁৎ। আবার গাড়ি নিয়ে বেরোল। ইতিমধ্যে অনীকদার  পাঞ্জাবি খুঁজে না পাওয়াটা একটা বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা সারদা বস্ত্রালয় থেকে আনতে ছুটল।

    অনীকদা চারটেয় পৌঁছল। টেনশন তখন চরমে পৌঁছেছে। আমি ভাবতে শুরু করে দিয়েছি বয়সের ডিফারেন্সের জন্য অনীকদা বিয়ে থেকে নিশ্চয়ই পিছিয়ে গেছে লাস্ট মোমেন্টে। তুই ওর সঙ্গে দেখা হওয়ামাত্র, টেনশনের বিন্দুমাত্র না দেখিয়ে বলল, হাইই!!! কেমন আছিস!

    ছুটকি দিদি, তুইই পারিস।

    আমি অনীকদার হাত থেকে শাড়ির প্যাকেট ছিনিয়ে নিলাম। তোকে টানতে টানতে শোবার ঘরে নিয়ে গেলাম। শাড়িটা সাউথ ইন্ডিয়ান সিল্ক। বিউটিফুল লাগছিল তোকে ওটা পরানোর পর। আর মেরুনের মধ্যে সরু হলুদ পাড়, জরির দাঁতদাঁত ডিজাইনে, শাড়িটা সিম্পল হলেও খুব এলিগ্যান্ট।

    তার পর তোর চুলে ফুল দেওয়া হল। জুঁইয়ের মালাটা এসেছিল তোদের মালাবদলের জন্য। মায়ের আনানো দুটো গোড়ে রজনীগন্ধার মালার সঙ্গেই।

    আজ এ সব লিখতে গিয়ে আমার চোখে জল এসে যাচ্ছে রে, ছুটকি দিদি।

    আমার বিয়েতে এই সব করার জন্য, দেখার জন্য তুই ছিলি না। কেউ ছিল না।ছিল শুধু  আমজাদের বাবা-মা, আমার মা, আর দু’- তিনটি বন্ধু। ছুটকিদিদি, তুই তোর থেকে বয়সে ছোট ওই অনীকদাটাকে অমন ড্যাং ড্যাং করে বিয়ে করতে পারলি! আমি কেন আমজাদকে পারলাম না? আমি তোকে হিংসে করি রে, ছুটকি দিদি। আজ বুঝতে পারলাম।

    অনীকদাকে পেলি। অন্য বয়ফ্রেন্ডরা ফালতু হলে কী হবে। অনীকদা কী দারুণ ইন্টেলেকচুয়াল আর তোর বয়সের ডিফারেন্স ঢাকতেই বোধ হয় এক মুখ দাড়ি গোঁফ। ভীষণ ভারিক্কি একটা ভাব। চোখে হাই পাওয়ার চশমা।

    বিয়ের আসরে এসে অনীকদার মুখে কেমন মিষ্টি নার্ভাস হাসি। আর তোর মুখে, যেন অনেক দিন পর এক বন্ধুকে দেখতে পেয়েছে এমনি একটা আশ্বাসের ভাব। তখনই আমার মনে হয়েছিল, এটাই আসল প্রেম। তোদের যেটা। এই যে, তুই এখন কত শান্ত, নিশ্চিন্ত। সারা সকাল ছুটে বেড়িয়েছিস। কোনও মানে ছিল না তোর কোনও কাজের। এখন তুই কত রিল্যাক্সড। আসলে অনীকদা ছাড়া তুই অসম্পূর্ণ।

    অনীকদা আগের পাঞ্জাবিটা আর পরের পাঞ্জাবিটা দুটোই পরে দেখেছিল ইতিমধ্যে, মা সারদার নতুনটা ভাল, কিন্তু আলমারি হাঁটকে খুঁজে পাওয়া তোর কেনা আগেরটা দারুণ। ওটাই পরল।

    তার পর তো অনীকদাকে তোর কেনা জিনিসগুলো দিলাম। শেভিং সেট,আফটার শেভ। অনীকদা গাম্ভীর্য রাখতে গিয়েও ফিক করে হেসে ফেলল।

    কে কিনেছে শেভিং সেট? নন্দিতা, না? তখনই জানি।

    তাকালাম, চোখ বড় বড় হয়ে গেল। হা হা করে হেসে ফেললাম। অনীকদা দাড়িতে হাত বোলাচ্ছে।

    তুই কী ভুলো! কী প্রচণ্ড ভুলো। আমরা দু’জনেই হাসছিলাম।

    ততক্ষণে ছুটকি দিদি, তোর বিয়ে হয়ে গেছে। সইসাবুদের, আসল বিয়ে।

    তুই, তোর বয়সের তফাৎ আর অনেক প্রচুর বয়ফ্রেন্ডের ইতিহাস, সব সত্ত্বেও। তোরা এখনও বিখ্যাত দম্পতি। খুব সফল দাম্পত্য তোদের, এখনও লোকে তোদের দিল্লির বাড়িতে গিয়ে তোদের দাম্পত্য দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরে আসে।

    আমজাদও গিয়েছিল রে।

    আমার পাঠানো উচিত হয়নি রে ছুটকি দিদি। আমার উচিত হয়নি তোর ওখানে থাকতে বলা।

    যাকগে, আমি তো সব ভুলেই গেছি। আমার বিয়ে, আমার বিয়ে ভাঙা, এ সবের সঙ্গে তোর বিয়ের দিনের দারুণ দারুণ মজার কাণ্ডগুলোর কী যোগ আছে, বল।

    এখন স্মৃতি নিয়েই থাকি। মনে পড়ে যায়, ভাল জিনিস তুই কী ভালবাসতিস। আর সেই রকম ভাল জিনিস জীবনে তুই অনেক পেয়েওছিস। বড়মামা সেই যে তিনটে শাড়ি এনেছিল, ভাল দুটো তুই আর মন্টি পরামর্শ করে নিয়ে নিলি। আমার জন্য ম্যাড়মেড়েটাই পড়ে রইল। নাকি, আমিই পারি না, ভাল চাইতে, ভাল ভাবতে।

    ভাল বাসতে!

    SHARE

    LEAVE A REPLY