জমিদার

    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    জন্ম ১৯৩৬ | ছেলেবেলা কেটেছে ছোটনাগপুরে | পড়াশোনা রসায়ন নিয়ে | ১৯৮১তে পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার |
    Feature by Sanjib Chattopadhyay

    জমিদার, জমিদার বলি, জমিদার শব্দের অর্থটা একবার দেখি। জীবনে অনেক জমিদার দেখেছি। এখনও দেখছি। জমিদার শব্দের অর্থ-ভূস্বামী, শষ্যক্ষেত্রাদির(এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তিরও) উপরিস্থ মালিক(বাড়ির বা বস্তির জমিদার)। তবে! জমি থাকলেই জমিদার থাকবে। জমিদার হওয়ার পদ্ধতিটা পাল্টেছে। আধুনিক হয়েছে। প্রথমে পুরো একটা দেশ সাংবিধানিক কায়দায় দখল করতে হবে। সে যেখানে আছে, যা যেখানে আছে, যেমন আছে থাক না। যেমন হরেনবাবুর মুদিখানা, তিনতলা বাড়ি, পাঁচ কাটা জমি। কিছুটা পিতার কিছুটা নিজের চেষ্টায়। নিমাই ঘোষ বোতল ধরলে, ঘোড়া খেললে। গড়ের মাঠ হয়ে গেল। হরেনের বাবা বললে, লড়ে যা বাঙালির বাচ্চা। ঘোড়া ছোটা, বোতল বাড়া।আমি আছি রে! টাকায় টাকা সুদ। মার সই, নে টাকা। চলে যা রেসের মাঠে ‘ভাইস রয়েজ কাপ’। ঘটি বাটি গয়নাগাঁটি সব গেল। স্ত্রী গেলেন টিবিতে।ছেলে গেল কেপমারিতে।মেয়ে গেল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে। হরেনের বাবা ডিগ্রি হাতে ঢুকল বাড়িতে। নিমাই ঘোষ ভাঙা হারমোনিয়ামটা গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে এল। হরেনের বাবা বললে, যেখানেই থাকিস ভাল থাকিস। আসল ব্যপারটা কি জানিস নিমাই, তোর বাপের পাপ। বিধবার সম্পত্তি ফাঁকি মেরে নিয়েছিল। তোর জেঠি বেনারসে ভিক্ষে করত। নিমাইয়ের শেষ যে’কটা টাকা ছিল তাই দিয়ে খানিকটা কতো দড়ি কিনল। বাকিটা খুব সহজ। ঘড়ির পেণ্ডুলাম। ঝুলে খাও। সময় স্থির পেণ্ডুলামও স্থির। খড়ের ঘর। হারমোনিয়ামটা বসে আছে। তার ওপর বৃন্দাবনের মাসির বেড়ালটা। মহিলার তেমন সুনাম ছিল না। লপচপিয়ে, শরীর দুলিয়ে বুড়োদের আসরে কীর্তন গাইত। এক বুড়ো-কাত্তিক ফাঁদে পড়েছিল। নাতনীর বিয়ের বাইশ ভরি সোনারগয়না হাপিস করে জেলে গেল। লোকে বললে, বাপটাকে জেলে দিলি? ছেলে বললে, ‘পাপের বেতন মৃত্যু’

    হুগলী জেলার দেরেপুর গ্রাম। জমিদার রামানন্দ রায়। শ্রীরামকৃষ্ণের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় ডেকে বললেন, ‘এই যে সত্যবাদী ব্রাহ্মণ, আসন গ্রহণ করুন। সবাই জানে আপনি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, তা আমার একটা কাজ যে করতে হবে।’ খ্যতি আর সুখ্যাতি দুটিতেই মানুষ সমান প্রচার পায়, যেমন কৃষ্ণ কংস কম্বিনেশন, রাম-রাবণ। রামানন্দ রায়কে বলা হত ‘কলির কংস’। ১৮১৪ সালের মানুষ। পাঁচালিকার লিখছেন –

           ‘তাই তো বলি কলির কংস রায়জমিদার শা-এ
    রাজা বলিস কিসের জোরে পুড়িয়ে প্রজা মেরে?
    ঘটিবাটি সবই নিত রাজার নায়েব শা।
    বাঁশের চেয়ে কঞ্চির দড় পেয়েদা গোমস্তা।
    সুযোগ বুঝে রাজার লোকে আগুন দিতে চালে।
    ভিটে ছেড়ে উঠত প্রজা রাজার গোয়ালশালে।।
    অমনি নায়েব আসত ছুটে লেঠেল নিয়ে সাথে।
    রাজার জমায় উঠত সে ভুঁই মালিক বসত পথে।।
    গুরু পুরুত কাউকে রেহাই দেয়নি রায় বংশ।
    সেই পাপেতেই হল রাজা সবংশে ধ্বংস।।

    রামানন্দ  রায়ের সেরেস্তায়  শ্রীরামকৃষ্ণ পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়(শ্রীরামকৃষ্ণ তখনও গদাধর নামে পৃথিবীতে প্রবেশ করেননি)।

    রমানন্দ বললেন, ‘চাটুজ্যেমশাই আমার যে একটা উপকার করতে হবে।’

    ‘বলুন মহাশয়, কী উপকার?’

    ‘একটা ফৌজদারি মামলায় আপনাকে আমার পক্ষের সাক্ষী হতে হবে। আপনি সাক্ষ্য দিলে মামলা আমি জিতবই। কারণ সবাই জানে, জীবনে আপনি কখনও মিথ্যা কথা বলেননি। আদালতে আপনার মুখ দিয়ে বেরোলে মিথ্যেটাই সত্য হয়ে যাবে। বুঝলেন ব্যাপারটা। খুব সহজ। যাবেন, দাঁড়াবেন, আমার উকিল যা শিখিয়ে দেবে, বলে বেরিয়ে আসবেন। মিটে গেল মামলা।’

    মামলাটা কী? দেরেপুরের কাছেই তিনটে গ্রাম নিয়ে একটি লাট, ‘লাট নকুঞ্জ’।গ্রাম তিনটির নাম খেঁজুরিবাঁদি, কোকন্দ আর বেতরা। এই লাটের মালিক কলকাতার মিত্র পরিবার। সে যেই মালিক হোক, এই লাট রামানন্দ রায়ের চাই। দুর্গাচরণ মিত্রের পিতার সঙ্গে রামানন্দ রায়ের মারদাঙ্গা। সেকালে লেঠেল ছাড়া জমিদাররা একেবারেই অসহায়। লাটি আর মামলা। মথুরবাবুও পাকা পাকা দণ্ডদর  লেঠেল পুষতেন রসমণির লাট সামলাবার জন্য। হামেশাই খুনোখুনি। দিস্তে দিস্তে মামলা। মথুরবাবুর সবচেয়ে সাংঘাতিক লেঠেলকে পেছন থেকে ছুরি মেরে খতম করেছিল প্রতিপক্ষ ভূস্বামী।

    কলকাতার মিত্ররা বর্ধমানের ফৌজদারি আদলতে রামানন্দকে ফাঁসিয়েছেন। মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে বাঁচাতে হবে। ক্ষুদিরাম স্পষ্ট জবাব দিলেন, ‘কোর্ট-কাছারি, মামলা-মোকদ্দমা, মিথ্যা সাক্ষী আমার আসে না, আমাকে মাপ করবেন।’ রামানন্দ মামলায় হারলেন। মিত্র পরিবারের সঙ্গে অসম্মানজনক মিটমাট হল। এইবার  টার্গেট ক্ষুদিরাম। সত্যবাদী ক্ষুদিরাম! এইবারে তোমার খুদিরাম হবার পালা। দিগন্তে তোমার পরিবারের খুদও জুটবে না। সেই ব্যবস্থা আমি করছি।

    বাংলার দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদাররা কর্নওয়ালিসের কাছে কৃতজ্ঞ। এই লর্ড টিপু সুলতানের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। দাক্ষিণাত্যে কোম্পানির রাজ্য ফলাও করেছিলেন। আর সে সর্বনাশটি করেছিলেন বাংলা আর বিহারে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’র প্রণয়ন। এল ‘দশসালা’ আইন। জমির সমস্ত স্বত্ত্ব জমিদারদের ওপর থাকবে। তারাই মালিক। চাষিরা না খেয়ে ট্যানা পরে, রোদে পুড়ে, জলে ভিজে চাষ করবে। তারা আর তাদের বলদ-প্রায় একই রকম। জমিদারের কাজপ্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে পুরো খাজনা সরকারে জমা দিয়ে আসতে হবে। না পারলেই ‘সূর্যাস্ত আইন’। ড্যাং ড্যাং করে জমিদারি নিলামে চড়ানো হবে। প্রথমে দশবছরের চুক্তি।এরপর বিলেতের অনুমোদন পেলে নির্দিষ্ট খাজনা দিয়ে জমিদার পুরুষানুক্রমে তাঁর জমিদারি ভোগ করতে পারবেন। আর যায় কোথায়! শুরু হল ‘এজ অফ জমিন্দারস’।

    তা কেন? সত্যবাদী যুধিষ্ঠির ক্ষুদিরামকে দেরেপুর থেকে ভিটেমাটি চাঁটি করে তাড়াতে হবে। আমার নাম রামানন্দ রায়। আমার হাতেই ‘সূর্যাস্ত আইন’। দু’বছরের খাজনা বাকি আছে। প্রথম বছরে খরা, পরের বছরে অতিবৃষ্টি। রামানন্দ ক্ষুদিরামের সমস্ত কৃষিজমি কেড়ে নিলেন। সূর্যাস্ত আইন। এইবার বসত বাড়ি। বর্ধমানের দেওয়ানি আদালতে ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে ঠুকে দিলেন একটি দেওয়ানি মামলা। ডাহা মিথ্যা অভিযোগ— ক্ষুদিরাম নাকি ছ’মাসের শর্তে দশ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন, শোধ করতে পারেননি। ক্ষুদিরাম আদালতে গেলেন না। রামানন্দ এক তরফা ডিক্রি পেলেন। সর্বহারা ক্ষুদিরাম দেরেপুর ছাড়লেন। সপরিবার কামারপুকুরে বন্ধু সুখলাল গোস্বামীর আশ্রয়ে এলেন। কামারপুকুরের আদি নাম—‘সুখলালগঞ্জ’।

    উপন্যাসিক শরৎচন্দ্র অনেক জমিদার দেখেছেন।তাঁর লেখাতে এই মহামানবেরা বারে বারে এসেছেন। একটি বর্ননা সাংঘাতিক। ‘অত্যাচারী বলিয়া বীজগাঁয়ের জমিদারবংশের চিরদিনই একটা অখ্যাতি আছে। কিন্তু বৎসরখানেক পূর্বে অপুত্রক জমিদারের মৃত্যুতে ভাগিনেয় জীবানন্দ চৌধুরী যেদিন হইতে বাদশাহী লাভ করিয়েছেন, সেদিন হইতে ছোট-বড় সকল প্রজার জীবনই একেবারে দুর্ভর হইয়া উঠিয়াছে।’ এইবার, ‘সেই জীবানান্দ চৌধুরী সম্প্রতি রাজ্যপরিদর্শনচ্ছলে চণ্ডীগড়ে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। গ্রামের মধ্যে একটা সামান্য রকমের কাছারিবাড়ি বরাবরই আছে, কিন্তু বাঁকুড়া জেলার এই অসমতল পাহাড় ঘেঁষা গ্রামখানির স্বাস্থ্য সম্বন্ধে যথেষ্ট সুনাম থাকায় এবং বিশেষতঃ বালুময় বারুইয়ের জল অত্যন্ত রুচিকর বলিয়া এই জীবানন্দেরই মাতামহ রাধামোহনবাবু গ্রামপ্রান্তে নদীতীরে ‘শান্তিকুঞ্জ’ নাম দিয়া একখানি বাংলবাটী প্রস্তুত করাইয়াছিলেন।’

    সেই শান্তিকুঞ্জে জীবানন্দের অধিষ্ঠান। কয়েকদিনের জন্যে। একালের ভাষায় ‘ক্যাম্প’। গোমস্তা এককড়ি নন্দীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কাছারিতে তসিল কত?’ উত্তর— ‘আজ্ঞে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা।’ জীবনানন্দ—‘হাজার পাঁচেক? বেশ, আমি দিন কয়েক আছি, তার মধ্যে হাজার দশেক টাকা চাই।’ (মর্ডান গণতান্ত্রিক জমিদারিতে, ভোট চাই-ভোট।) খাজনা এই হল বাজনা। বেহারি পাইকরা ষোড়শীকে ধরে এনেছে ‘শান্তিকুঞ্জে।’ জীবানন্দ্র ঘর। শরৎচন্দ্রের বর্ণনা (দস্তয়ভস্কিও হার মানবেন), ‘তেমনি আবর্জনা, তেমনি মদের গন্ধ। সাদা, কালো, লম্বা, বেঁটে নানা আকারের শূন্য  মদের বোতল চারিদিকে ছড়ানো। শিয়রের দেয়ালে খান-দুই চকচকে ভোজালি টাঙানো। এক কোণে একটা বন্দুক ঠেস দিয়ে রাখা, হাতের কাছে একটা ভাঙা তেপায়ার উপর একজোড়া পিস্তল, অদূরে ঠিক সুমুখের বারান্দায় কি একটা বন্যপশুর কাঁচা চামড়া ছাদ হইতে ঝুলানো, তাহার বিকট দুর্গন্ধ…শিয়াল মারা হইয়াছে…মেঝেয় পড়িয়া…রক্ত গড়াইয়া কতকটা স্থান রাঙা বিছানায় চাদরের অভাবে বহুমূল্য শাল পাতা… খাটের নীচে একটা রুপার পাত্রে ভুক্তাবশিষ্ট কতকগুলো হাড়গোড়…(দেনা-পাওনা)

    SHARE

    LEAVE A REPLY