প্রতিচ্ছবি

    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    ১৯৩০-এ মুর্শিদাবাদে জন্ম‚ মৃত্যু ২০১২| ১৯৯৪-এ 'অলীক মানুষ'-এর জন্য পয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার | লিখেছেন ১৫০'রও বেশি উপন্যাস ও ৩০০'রও বেশি ছোট গল্প |
    Syed Mustafa Siraj story

    যতক্ষণ না ফাঁড়ি থেকে ওনারা কেউ আসেন, পবনকে এই টুলে বসে থাকতেই হবে। সে চৌকিদার। তার পরনে নীল উর্দি। কোমরে পেতলের মোহর-আঁটা চামটি। মাথায় নীল পাগড়ি। হাতে লাঠি। সে গম্ভীর। ‘ডিবটিতে’ সে গম্ভীর থাকে। থাকতে হয়। সে রাজার লোক। রাজপ্রতিনিধি।

    ডাইনিতলার ছায়া হেলেছে পুবে, গাঁয়ের দিকে। এ ছায়া মহান বটের। এ ছায়া যখন বৃকোদর মোড়লের টিনের চালের মটকা ছোঁবে, তখনই ডাইনিতলার মাঠে সন্ধ্যার সব চিত্রলিপি পড়ার জন্য হাজার হাজার বছরের খেলছে। পবনের চোখে চতুর্দিকে এইসব নির্দোষ সরলতা। এই রোদ্দুর, এই আনমনা হাওয়া, এই নিরিবিলি হয়ে ওঠা মাঠ।

    অথচ ডাইনিতলা এখন ভেতরে-ভেতরে অন্যরকম। পবন মুখ তুললেই আবার কষ্ট পাবে। ভড়কে যাবে। বাজপড়া ডালটার ঠিক নীচেই ছড়ালো সবল একটা তাজা ডালে নয়ান ঢাকি ঝুলছে। সেই নয়ান—যার পালক সাজানো ঢাকে রেলগাড়ি বাজত। কালবোশেখির মেঘ ডাকত। মাঝে মাঝে যার তুখোড় ঢাক রসিকতায় ফেটে পড়ত—

    নাক ড্যাঙা ড্যাং ড্যাডং ড্যাং

    তোর ঠ্যাং তোর বাবার ঠ্যাং

    গুড় তাক গুড় তাক গুড় তাক

    এই ছুঁড়িটার রঙ্গ ঢাক

    গা ঢাক আর বুক ঢাক

    গুড় তাক তাক তাক তাক…।

    সেই নয়ান জিভ বের করে ঝুলছে ন্যাংটোপটাং। হুঁ, একেই বলে ন্যাংটোপটাং, যেমনকিনা চিৎপটাং, কেউ চিৎপাত হয়ে পড়লে।পায়ের তলায় তার ঐতিহ্যপূর্ণ পুরনো ঢাক কাৎ হয়ে পড়ে আছে। আহা, মাটিতে ঢাক ফেলে আজ ঢাকি উড়ল। এই গাছের পুরোন বাসিন্দা ডাইনিটার সঙ্গে শূন্যে পাড়ি জমাল কামরূপ-কামিখ্যের দেশে—যে দেশ থেকে বাপ-পিতামোর যুগে ডাইনিটা উড়ে এসেছিল।

    পবন চৌকিদার এইসব ভাবছে। প্রথমদিকে ভিড় জমেছিল ক্রমশ সরে গেছে। ওই বীভৎস দৃশ্য কেউ দেখতে চায় না। এখন শুধু পবনের ভাগ্য—তার ‘ডিবটি।’ পাঁচ টাকা মাইনের ‘রাজার লক’ পবন। তাকে তো থাকতেই হবে।যতক্ষণ ফাঁড়ির ওনারা না আসেন।

    …হুঁ, তাহলে নয়ান কোনও রকমে উদ্ধার হল। পবনের পার নেই।পবনরে, তোর পার নেই। সক্কালে দু’মুঠো পাতার সঙ্গে গেলাস দুই তাড়ি খেয়েছে সে। ওই শেষ যাওয়া। বৃকোদর মোড়লের বাড়ি থেকে মুড়ি আসবে সেই প্রতীক্ষায় বেলা পড়ে এল। ভুলে গেছে—আহা, গেরস্থ মানুষ! কতদিকে মন দিতে হয় ওনাদের।ওদিকে পবনের বউ গেছে তিনটে কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে কাকমুণ্ডির লঙ্গরখানায়। দেশে ফের আকাল নেমেছে। প্রচণ্ড খরা! আগের বর্ষায় বাণ হয়েছিল ভয়ংকর। তারপর এই খরা। গেরস্থেরা ধানের মড়াই পাহারা দিচ্ছে। বৃকোদর মোড়লের দোষ নেই। পবন আবার মুখ তুলে নয়ানের মড়াটা দেখতে থাকে। দেখে-দেখে চোখের ধারটা ক্ষয়ে গেছে। আর তত খারাপ লাগে না। বরং মনে হয়, মরেই বেঁচে গেছে নয়ান ঢাকি।

    তারপর সে চমকায়।ও কী! নয়ান হাসছে। নয়ান ঢাকি কেন হাসছে? সে হাসছে।সেই ঝুলন্ত জিভটাও গুটিয়ে নিয়েছে। মুখে আহারতৃপ্ত মানুষের শান্তি ঝলমল করছে। আর সেই ঝলমলানি নিয়ে নয়ানঢাকি তাকিয়ে আছে পবন চৌকিদারের দিকে।

    নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না পবন। এদিক-ওদিক দেখে নেয়। কোথাও কোনও জনমানুষ নেই।ভয়ে তার দম আটকে যায়। ঊরু  অবশ হয়ে ওঠে। সে বোবা-ধরা গলায় চেঁচিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। পালিয়ে যেতে চায়।

    কিন্তু পোড়াকপাল, তার যে হাত পা বাঁধা। সে চৌকিদার। নয়ানকে আগলানো তার ‘ডিবটি।’ ফাঁড়ির ওনারা কেউ এসে তাকে না দেখলেই বিপদ। নতুন দারোগা যা রাগি মানুষ!

    পবন নিজেকে আঠা মাখিয়ে টুলে আটকায়। ফের ভয়ে-ভয়ে মুখ তোলে। হুঁ, ব্যাপারটা সত্যি। নয়ন ঢাকি হাসছে। পবন আঁতকে উঠে লাঠিটা হাতে নেয়। কিন্তু তার মতলব টের পেয়ে গেছে নয়ান। সে ঝুলতে ঝুলতে বলে, কী হে পবন? মজাটা টের পাচ্ছনা তো? পাবে—যদি ওই ঢাকটা পায়ের তলায় বসিয়ে দাও। সব বলব।

    পবন গম্ভীর চৌকিদারী ভংগিতে বলে, বাজে বকো না। যেমন ঝুলছ, ঝুলে থাকো। নইলে আমার চাকরি যাবে। দারোগাবাবু এসে পড়বেন এক্ষুনি। এসে তোমাকে ঝুলতে না দেখলে ভাববেন, আমি চালাকি করে ওনাকে হয়রান করলাম। তখন কে সামলাবে ওনাকে?

    নয়ন ঠোঁট চেটে বলে, বিড়ি-টিড়ি আছে?

    না। পবন বাঁকা মুখে বলে। একটা বিড়ির দাম দু’পয়সা। মরা মানুষ বিড়ি খাবে? জ্যান্ত মানুষ পায় না তো মরা। বাজে বকো না। চুপচাপ ঝোলো।

    পবন হে!

    উঁ?

    জানতে ইচ্ছে করে না কেন গলায় গামছা বেঁধে ঝুলে পড়লাম?

    জানি বৈকি।ঢাক বেচতে গিয়ে ছিলে কান্দির বাজারে। বিক্রি হল না। আজকাল ঢাকের কদর নেই। তাই হাপিত্যেশ করে ফিরে এলে। গাঁয়ে ঢোকার মুখে মনের দুঃখে ডাইনিতলায় ঢাক রেখে ঝুলে পড়লে। ব্যস ব্যস।সব জানি।

     

    হুঁ। এটুকু সব নয় হে।আরও আছে। ইচ্ছে করছে তোমার পাশে গিয়ে বসি। ঢাকটা পায়ের তলায় দাও না ভাই।

    উঁহু। বেআইনি হবে।

    ভাই পবন হে! কতদিন পাশপাশি বসে কত সুখ-দুঃখের কথা কয়েছি দুই বন্ধুতে। মনে পড়ে না?

    পড়ে হে, পড়ে। একটু চুপ করে থেকে পবন ফের বলে, খালি পেটে কথা বলতে ভাল লাগে না। বড় কষ্ট হয়।

    নয়ান হাসে।ঠিক বলেছ। খালি পেটে থাকার বড় কষ্ট। তাই পেটটা ফেলে রেখে চলে এলাম। এখন আর আমার পেট নেই।

    পবন তাকায় তার দিকে। তাকিয়েই থাকে। আর নয়ান ঢাকি মিটিমিটি হাসতেই থাকে।

    কতক্ষণ পরে পবন এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে। নয়ান বলে কী ভাবছ পবন?

    ওখানে উঠলে কেমন করে নয়ান?

    খুব সোজা। ঢাকের ছাউনির ওপর দাঁড়িয়ে ডালটা ধরলাম। ছেঁড়া বস্তরখানা দিয়ে ফাঁস বানালাম। গলায় পরলাম। তারপর পায়ের ধাক্কায় ঢাকটা সরিয়ে দিলাম।ব্যস!

    কষ্ট হয়নি নয়ান হে? তোমার কষ্ট হয়নি?

    সারাজীবন কষ্টের চেয়ে এ আর কতটুকুন ভাই?

    হুঁ, নয়ান!

    বলো চৌকিদার!

    আমি তাহলে যাই তোমার কাছে?

    এসো, এসো। এখানে পেট নেই, বড় শান্তি।

    তবে যাই। বলে পবন ওঠে। ঢাকটা খাড়া রেখে তার ওপর দাঁড়ায়। নীল পাগুড়ি দিয়ে ফাঁস বানায়। গলায় পরে। ন্যাংটা হল না নয়ানের মতো—সে কিনা রাজার লোক। রাজপ্রতিনিধি। বড় লজ্জার কথা। তারপর…

    দারোগা এসেছে। সেপাইরা এসেছে। বৃকোদর মোড়ল এসেছে।হাসপাতালের চাঁদঘড়ি জমাদার এসেছে। এসে সবাই আবাক।

    আরে আরে! এ তো নয়ান ঢাকি নয়— এ যে পবন চৌকিদার! দারোগা রেগে তম্বি করে। বৃকোদর বলে, তাহলে নয়ান গেল কোথায়?

    সেই সময় আচমকা বেজে উঠেছে নয়ান ঢাকির ঢাক— গুড় গুড় গুড় গুড়— পালকের সাজ দুলছে আর দুলছে। ঝিলিক দিচ্ছে। হাওয়া বাড়ছে। দেখতে দেখতে এসে গেছে কালবোশেখির ঝড়। সন্ধ্যার আকাশ কালো হয়ে যায়। নয়ানের ঢাক বাজতে থাকে দ্বিগুন জোরে। ডাইনিতলা তোলপাড় করে ঢাকের শব্দ ঘোরে ঘূর্নির মতো। আর পবন দুলছে, নাচছে। নাচতে নাচতে বলছে,সাবাস ভাই নয়ান ঢাকি!

    দুলতে দুলতে তার পা দুটো লাথি মারছে জ্যান্ত লোকগুলোকে। পবনের কী মজা! লোকগুলো বোবা-ধরা গলায় চ্যাঁচাচ্ছে পবন হে! পবন চৌকিদার! গাগেরামের লোকেরা মাঠ ভেঙে ছুটে আসছে। হাজার হাজার লোক বলছে। সাবাস পবন! পবন হে!

    পবন নাচছে আর লাথি মারছে। এই নাচ সে বিসর্জনের দিনে নাচত। গান গাইত আর নাচত। নয়ান ঢাকি তার তালে তালে ঢাক বাজাত। এখন মরে গিয়েও প্রাণভরে নাচে পবন।

     

    পবন চৌকিদার! পবন! অ্যাই ব্যাটা পব্‌না!

    চোখে মুখে পবন তাকায়। ডাইনিতলায় অন্ধকার। মাঠের দিক থেকে সন্ধ্যাবেলায় সেই হাওয়াটা এসে ঘুরপাক খাচ্ছে। শনশন তোলপাড় হচ্ছে।

    একটু দূরে দুলতে দুলতে আসছে লন্ঠন। তারপর একঝলক টর্চের আলো এসে ঘেরে পবনকে। পবন টুল থেকে উঠে সেলাম ঠোকে। দারোগা বলেন, লাশ কই?

    পবন হাত তোলে। টর্চের আলো পড়ে। নয়ানই বটে, পবন নয়। নয়ান তেমনি ঝুলছে দেখে পবন মুখ নামায়। বুকে কষ্ট চোখে জল নিয়ে পবন চৌকিদার বৃকোদর মোড়লের মুড়ির প্রতীক্ষা করতে থাকে।

    SHARE

    LEAVE A REPLY