সম্পাদকীয়

    0
    338
    গৌতম দত্ত
    জন্ম ১৯৫৯ | ইংরাজি ও বাংলা দুই ভাষায় লেখেন।প্রকাশিত পাঁচটি কবিতার বই | 'বরফে হলুদ ফুল'-এর জন্য ২০০৫ সালে পেয়েছেন জসীমউদ্দিন পুরস্কার | ২০০৮ সালে সুধীন্দ্রনাথ পুরস্কার "গৃহযুদ্ধের দলিল" কাব্যগ্রন্থের জন্য। ভাষানগর পুরস্কার ২০১৭ সাল। তাঁরই প্রচেষ্টার ফসল 'উড়ালপুল' |

    উড়ালপুলের পা তখনও টলমল করছে, বয়স মাত্র দুই। পেট থেকে বেরিয়েই এমন টানা দৌড় দিয়েছিল যে সে একটু পরেই হাঁফিয়ে সাইড লাইনে বসে গেল। ওই যাকে বলে অভিজ্ঞতার অভাব। একশো পঁচিশটা দেশের হাজার তিরিশেক পাঠকের কাছে ক্ষমা চাই, না-বলেকয়ে বাই বাই করার জন্য। উড়ালপুল বাংলা ভাষাকে পৌঁছে দিতে চায় ভিন্ন ভাষাভাষি পাঠকের কাছে, ও নিয়ে আসতে চায় অন্য দেশের জীবনযাপনকে বাঙালি পাঠকের কাছে। ইতিমধ্যে অনেক বাংলা ওয়েবজিন তৈরি হয়েছে। এই যানজট, ভিড়ের মধ্যে উড়ালপুল আমাদের বাংলা ভাষা, শিল্প, সাহিত্যকে নিয়ে বেঁচে থাকার এক স্বপ্ন। আমার ক্ষুদ্র জীবনে নিজে কতটা লেখক হতে পারলাম তার জন্য নয়, আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি এত মানুষের ভালবাসা পাবার জন্য। উড়ালপুলের প্রথম দিন থেকে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নিজে ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছেন উড়ালপুলে। কর্নেল (Cornell University) বিশ্ববিদ্যালয়ে উড়ালপুলের হয়ে নিয়েছেন ‘লেখার কারিগরী ক্লাস’। পৃথিবীর যে দেশেই গেছেন, লোকজনকে বলেছেন উড়ালপুলের কথা।

    বাংলার প্রধান কবি-লেখকদের প্রায় সবাই নিজেদের উজাড় করে লিখেছেন উড়ালপুলে। যোগেন চৌধুরী, পরিতোষ সেনের আঁকা ছবি ভরিয়েছে প্রচ্ছদ। আবার আমেরিকা, মেক্সিকো, লাতিন আমেরিকা, গ্রিস, প্যালেস্তাইন-এর কবি-লেখকেরা নিজেদের লেখা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন উড়ালপুলকে। আমেরিকার পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক জুনো দিয়াজ, কবি ইউসেফ কমুনিইয়াকা-সহ অসংখ্য কবি-লেখক সামিল হয়েছেন আমাদের উড়ালপুলে।মল্লিকা আর জয়দেব বিদায় নিয়েছেন একেবারে অকালে! আমি কি ভুলতে পারি মল্লিকার কেমো নিতে নিতে বইমেলার ধুলো মেখে উড়ালপুলের জন্য কবিতা পাঠ। কী করে ভুলি রাত-জাগা (কলকাতা) জয়দেবের সঙ্গে কত জি-মেলে চ্যাট, অরকুট! জয়দেব বড় অভিমানী ছিল। হঠাৎ খুঁজে পাই জয়দেবের পাঠানো একটি অপ্রকাশিত কবিতা। সবাই উড়ালপুলকে ভালবেসে নিজেদের উজাড় করে লেখা দিয়েছেন। আর এখানেই উড়ালপুল ম্যাগাজিন যানজট-ভিড়ের মধ্যে একেবারে অন্যরকম, অনন্য।

    সুনীলদার জন্মদিন, ৭ই সেপ্টেম্বর। প্রায় চার বছর হয়ে গেল সুনীলদার মৃত্যুর পর।

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ ১৯৮৬ সালে নিউইয়র্কের “মিউসিয়াম অফ মডার্ন আর্ট”-এ আমেরিকায় ভারতীয় কবিতা উৎসবে।সুনীলদা ও নবনীতা দেবসেন ১৯৮৬ সালের দেশ পত্রিকায় এই নিয়ে লিখেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে কৌতুক করে লিখেছিলেন “ গৌতম দত্ত’র সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় রীতিমত নাটকীয় ভাবে। ১৯৮৬ সাল, ভারত সরকারের একটি সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছি আমেরিকায়, সে বছর সে দেশে ‘ভারত উৎসব চলছে। আমি উঠেছি নিউইয়র্কের এক হোটেলে।একা একা ছটফট করছি, এমন সময় নিচের রিসেপশন থেকে আমাকে জানানো হলো, কয়েকজন যুবক আমার সাক্ষাৎপার্থী। আমি দেখা করতে রাজি কি না। আমি সাগ্রহে অনুমতি দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম, খানিকবাদেই আমার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালো, তিনজন যুবক। বয়সে বেশ তরুন, তিনজনই বেশ সুঠাম ও সুদর্শন।আমি তাদের অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে এসে নাম জিজ্ঞেস করতেই, তাদের একজন সহাস্যে বললে, আমরা তিনজনই গৌতম”।

    নবপর্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে সুনীলদাই আমাকে জড়িয়ে দেন। প্রতিভাসের বীজেশ সাহা দায়িত্ব মাথায় নিয়ে পরম উৎসাহে কৃত্তিবাস প্রকাশনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বীজেশ ও আমার উৎসাহে বছরে কৃত্তিবাসের চারটি সংখ্যা প্রকাশিত হলো। এর জন্য সুনীলদা আমাকে ভালবেসে কম বকাবকি করেননি। সুনীলদা আমার লেখার জন্য কৃত্তিবাসের দরজা হাট করে খুলে দিয়েছিলেন।ঘন ঘন ফোন করে লেখার জন্য তাগিদা দিতেন। ২৫-পাতা ৩০-পাতার লেখা কোন অসুবিধে নেই, ছাপার উপযুক্ত লেখা হলেই হলো। সুনীলদা ও কৃত্তিবাস আমাকে ভালবাসার চাদরে মুড়ে দিল। দেশ-পত্রিকার পূজা সংখ্যায় লিখলেন(কলম্বিয়া সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগদানের গল্পে সুনীলদার ভীষণ শরীর খারাপ হয়)-“ জানি এসময় খবর পেলে বস্টন থেকে পুপলু ও নিউজার্সি থেকে গৌতম ছুটে আসবে”। মানুষটি আমাকে এত দিয়েছেন, ঋণে আমার পিঠ বেঁকে গেছে। শেষ দেখার সময় বলেছিলেন— ‘দুটো কথা আছে’।

    এক— উড়ালপুল আবার শুরু করো। দুই— কৃত্তিবাসের পরিচালনায় সক্রিয় আংশগ্রহণ করো। বলেছিলেন, ‘আমি, বাদল, দিব্যেন্দু, অসীম— সবাই আজ আছি কাল নেই। তাই আমি চাই, তুমি ও আরও দু’-তিন জন তরুণদের হাতে কৃত্তিবাসকে তুলে দিতে। আমরা তো চিরকাল থাকব না।’ সুনীলদা নেই, আমি এই কথাটা ভাবতেই পারি না। তাই পাশ কাটিয়ে ফিরে এসেছিলাম আমেরিকায়। আর এখন সেই কৃত্তিবাস বদলে গেছে। ভাল বা খারাপের কথা নয়, পিনাকী ঠাকুরের প্রাথমিক বাছাইয়ের পরে প্রতিটি লেখা সুনীলদা নিজে পড়তেন, বানান দেখতেন, দরকার মতন সংশোধন করতেন। একজন তরুণ কবির সেটাই ছিল সেরা পাওয়া, সেরা আনন্দ যে, তার লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়বেন; আর যদি ছাপা হয় সে কৃত্তিবাস বুকে নিয়ে পাগলের মতন বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে দেখাবে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। আমি নিজেকে কৃত্তিবাস-এর কবি মনে করি। সুনীলদার প্রেরণায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। আর কোথাও লেখা পাঠাবার কোন তাগিদই ছিল না। কৃত্তিবাসই সুনীল আর সুনীলই কৃত্তিবাস।

    ওই মানুষটি আমাকে আলো দেখিয়ে চলে গিয়ে নিঃস্ব করে দিলেন। আর লিখতে ভাল লাগেনা। উড়ালপুল-এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেল। প্রকাশ করার প্রতিটা চেষ্টাই যেন দিকশূন্যপুরে চলে যাচ্ছে। এরকম এক সময়ে বাংলা ভাষার এক আদি ও অকৃতিম ওয়েবম্যাগ “বাংলালাইভ” বন্ধুর মতন হাত ধরে মাথার উপর ছাতা ধরল।উড়ালপুল তার নিজস্বতা নিয়েই “বাংলালাইভ”-এ সাহিত্য আসর বসাবে। কলকাতায় উড়ালপুলের সহ-সম্পাদক সিদ্ধার্থ সিংহ ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মহাশ্বেতা দেবী কাঁপা কাঁপা হাতে লিখে দিলেন ছোট গল্প ‘পর্বত’। কী অসম্ভব শক্তিশালী এই মহান লেখিকা! আজ তিনিও আমাদের থেকে বিদায় নিলেন। কবি সুরজিৎ ঘোষ (প্রমা প্রকাশনী) নব্বই সালে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে পরিচয় করাতে। ওনার এক বিখ্যাত পোষ্য ন্যাদসের (গরু) সঙ্গেও আলাপ হয়েছিল। ন্যাদস একেবারে মাছ-মাংস খাওয়া গাভী।মহাশ্বেতা দেবীর ছেলে নবারুনদা তখন প্রমায় নিয়মিত লিখছেন। আর সেই থেকে আমি নবারুনদার একেবারে অন্য স্বাদের বাংলা সাহিত্যের অন্ধ ভক্ত হয়ে উঠলাম।কত কথা মনে ভেসে আসে…।

    ফিরে চল মন নিজ নিকেতনে— অনেকদিন পরে উড়ালপুলে উঠে দেখি চার পাশে সেই এত বস্তি জঞ্জাল। আমি তো বস্তি বাড়িরই ছেলে। রেগে গেলে খিস্তি করি, ভালবাসলে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দৌড়ই। ডাকি দলবল, পতাকা তুলি উড়ালপুলে আবার। এককালে বাংলার লেখকেরা খালি পেটে লিখেছেন, বিদায় নিয়েছেন অকালে। কিন্তু সৃষ্টি করে গেছেন একের পর এক পথের পাঁচালী, পদ্মা নদীর মাঝি, ধূসর পৃথিবী। আনন্দবাজার মুক্তি দিয়েছে খিদে থেকে, কিন্তু বেঁধে ফেলেছে পাতা, অক্ষরের নাম্বারে আর পূজাবার্ষিকীর শক্ত বকলেশে। বিশ্ব সাহিত্যের মাপকাঠিতে বাংলা উপন্যাসের শুরু হয়েছে খরা। বিস্ফোরণ হয়েছে ছোট গল্প ও কবিতায়। বাংলায় এখন এসেছে অনেক নতুন কাগজ, পত্রিকা। একটু নুন ভাত আর RC-র ব্যবস্থা হয়েছে। সুবোধ সরকার, অংশুমান কর, সেবন্তী ঘোষেরা পেয়েছেন কলেজে পড়ানোর কাজ। শ্রীজাত পার হয়েছে কত আর্থিক সমস্যা। সদা হাসিমুখ শ্রীজাত যখন জানাল যে, তাকে আর এ কাগজ ও পত্রিকা থেকে ল্যেওফ হতে হচ্ছে না, গান আর বিজ্ঞাপন থেকে এসেছে আর্থিক স্বনির্ভরতা, তখন মন খুশিতে ভরে গেল। অন্য দিকে মন গেয়ে ওঠে পিনাকী ঠাকুরের ‘একটু ব্যবস্থা হউক’। তাই উড়ালপুলে পাতা-অক্ষরের বাঁধন নেই, বেরোবে না কোনও পূজাবার্ষিকী। আহ্বান জানাই আবুল বাশারের মতন লিখুন এখানে নিজের সেরা লেখা। আমরা খুঁজে পাবো রুচিরা মণ্ডলের মতন প্রতিভাবান নতুন লেখককে। ‘ভাষানগর’ ছড়িয়ে যাক ইস্টিশান থেকে ইস্টিশানে, গ্রামেগঞ্জে বাংলার ঘরে ঘরে। বীজেশ সাহার মতন তৈরি হোক অনেক নতুন প্রকাশকের। আসুক নিত্যনতুন ওকুল, বকুল, সবভুল ম্যাগাজিনও — ওয়েবজিনেরর দল, সেই সময়, এই সময়, দুঃসময় অনেক অনেক নতুন কাগজ। এতে বাংলার ভাল হবে। এই উড়ালপুল মাঝে মাঝে বন্ধ থাকতে পারে কিন্তু ভালবাসার শক্ত ভিতে তৈরী এই উড়ালপুল ভেঙে পড়বে না। আর আমরা মহানগরের ভাষায় বলে উঠব— ‘এত বড় শহর তাতে একটা উড়ালপুলের ঠিক জায়গা হয়ে যাবে’।

    – গৌতম দত্ত

    SHARE

    LEAVE A REPLY