সময়

    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    জন্ম ১৯৫০, পূর্ববঙ্গের পাবনা জেলায় |কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে মাস্টার্স| ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ,মহাভারত এবং পুরান বিশেষজ্ঞ |
    Samay The Article On Time

    বেশ বুড়ো হয়ে যাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে। আমার চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যেই— ওই যখন চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে, ওই চালশের পরেই যখন চশমা নিলাম— সেই চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যেই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, মনে মনে কিছুতেই আমি বুড়ো হব না। হ্যাঁ, এটা মানতে কোনও অসুবিধে নেই যে, মানুষের দেহপ্রস্থে পরিণতিক অবক্ষীয়মান স্পর্শটুকু লাগবেই। সেখানে তো যম-দেবতার নোটিশ পড়বে সেই অসামান্য লোক-কথার কেতায়। সেই যে একজন চল্লিশেই মরতে বসেছিল বলে যমের ওপর রাগ করে গালাগাল দিচ্ছিল। যম বললেন— তোমার সময় হয়েছে, তাই নিতে এসেছি, এত বকবক করছ কেন। চল্লিশ বলল— ইয়ার্কি পেয়েছ! মর্ত্যলোকে তবু কিছু নিয়ম-কানুন আছে, জজ-সাহেবের বিচার আছে, তোমাদের স্বর্গে তো তাও নেই। সেখানে শুধু গুন্ডামি চলে; নইলে এই ভাবে এই বয়সে কোনও ভদ্রলোক আমাকে শেষ করে দিতে পারে? যম বলছেন— সেই বিচার হয়ে গেছে বলেই তো তোমায় নিতে এসেছি। লোকটি বলল— চোপ। এখানে একটা সামান্য চাকরি থেকে বরখাস্ত করলেও এক মাসের মিনিমাম নোটিশ দিতে হয়। একদিন স্কুল ছুটি হলেও আগে থেকে নোটিশ দিতে হয়। এমনকী ওঠে শমন! তোমার নিজের নামেই আমাদের আদালতে একটা বস্তু আছে— মানে, আদালতে জজ্‌-সাহেব তোমাকে যদি একবার দেখা করতে বলে, তবে শমন আসে বাড়িতে। বলে যায়, অমুক দিন যেতে হবে। তুমি মর্ত্যে এসেছ আমায় নিতে, তা নোটিশ দিবে না একটা! বললে, আর চলে যাব। অত সোজা নয়।

    স্বর্গলোকে বিচারাধীনতার এমন অভিযোগ শুনে যম একেবারে ঘাবড়ে গেলেন। তো-তো করে বললেন— আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি ঠিক কী ধরণের ‘নোটিশ চাও বলো তো? লোকটি বলল— আমার ছেলেটা এখনও মানুষ হয়নি, মেয়েটার বিয়ে হয়নি, আর বউটা তো এখলও ডাগরই রয়ে গেছে, আর তুমি এই বেলাতেই নিতে এলে আমাকে বিনি-নোটিশে। এ সব চলবেনে এখানে। এখেনে আইন-কানুন আছে এখনও। যমরাজ এ সব তর্ক-যুক্তি শুনে একটু বিব্রতই হলেন। বললেন— আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুমি থাকো আরও কিছু দিন এই পৃথিবীতে। যা করবার করে নাও। লোকটি যামের মুখ থেকে ছাড়া পেয়ে থমকে পেন্নাম করে বলল— বাঁচালেন প্রভু, ছেলে মেয়ে রেখে যা আতান্তরে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যাই হোক পরে যখনই আপনি আসবেন, নোটিশ দিয়ে আসবেন, নইলে এখানকার আইনে আপনার জান কয়লা হয়ে যাবে। যমরাজ আচ্ছা-আচ্ছা বলে চলে গেলেন।

    তার পর অনেক দিন হয়ে গেল। সেই মরণোন্মুখে লোকটির ছেলে মানুষ হয়ে গেল। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। বউ বুড়ো হয়ে গেল। যমরাজ একবার লোকটিকে মৃদু মৃত্যুশঙ্কার ধাক্কা দিয়েছিলেন বলে লোকটিকে একটু বেশিই বাঁচার সুযোগ দিলেন। লোকটার এখন বয়েস হয়ে গেছে। কিন্তু বুড়ো বয়সেও তার এটা মনে হচ্ছে না যে, তার সব কাজ শেষ, কর্তব্য শেষ, এ বার মরলেই হয়। বরঞ্চ সাধারণ একটা ত্যাগবুদ্ধিতেও এটা মনে হয় না যে, এই পৃথিবীতে যতটা না সফল হয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি মরীচিকা-সমুদ্রের জল পান করেছি আমরা। যত কাজ আরম্ভ করে শেষ করেছি, তার চেয়ে  অনেক বেশি বার আরম্ভগুলো যাত্রারম্ভেই শেষ হয়ে গেছে। অনেকটা ছোট পশুর মতো— পনেরো বার চেষ্টা করার পরে একবার শিকার ধরতে পারে সমারম্ভাঃ ভগ্নাঃ কতি ন কতিবারাংসভব পশো। কিন্তু আশ্চর্য, এই যে লোকটার কথা বলছিলাম, এ রকম মানুষ তো অনেক আছে, এমনকি দু’-চার বার যমের ধাক্কা খাওয়া লোকেরও অভাব নেই পৃথিবীতে। কিন্তু তবু যেই না একটু ঠিক হল, অমনিই শতধা ছিন্ন আশাগুলি আবার তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকে।

    লিখেছেন কবি ভার্তৃহরি— মুখে কপালে বলিরেখার শেষ নেই। চুল পেকে শনের মতো হয়ে গেল। সমস্ত গায়ের সন্ধি-গ্রন্থি ঢিলে হয়ে গেল। কিন্তু মনের মধ্যে যুবতী হয়ে রইল যেটা, সেটা হল তৃষ্ণা, আশা, আরও আরও পাবার ইচ্ছে। তার জরা নেই, গ্যাঁটে ব্যথা নেই, সে তরুনীতরা হয়ে ওঠে বৃদ্ধ বয়েসেও— গাত্রাণি শিথিলায়ন্তে তৃষ্ণৈকা তরুণায়তে। আমাদের মতো সেই যমের ধাক্কা-খাওয়া লোকটাও কিন্তু এই ভাবেই ‘আশপাশ-শতৈ র্বদ্ধঃ’ অবস্থাতেই বসে ছিল। অবশেষে যমরাজ এলেন এবং মিষ্টি মুখেই বললেন— এ বার তো যেতে হবে! নাকি! এ বার সেই বুড়ো লোকটি বলল— সে কী কথা! আমার তো কিছু কাজ বাকি আছে এখনও। ভেবেছিলাম, তুমি নোটিশ দেবে। আমি কাজ সেরে নেব। আর তোমাকে আগেই আমি বলেছিলাম— বিনি নোটিশে কোনও কাজ হবে না এখেনে। এ তোমার ছন্নছাড়া দেবলোক নয় যে, যা ইচ্ছে তাই করা যাবে। তুমি যাও এ বার, নোটিশের জোগাড় করো। তোমাদের দেবলোকের একদিন মানে মনুষ্য-দিন-মানে অনেকগুলি বছর। তোমাদের মানে দু’-চার ঘণ্টা দিলেই আমার কাজ চলে যাবে।

    যমরাজ বললেন— ওরে মূর্খ! অনেকক্ষণ বাতেলা শুনছি। আমি কিন্তু নোটিশ দিচ্ছি বহু দিন ধরে, তুমি দেখলাম কিছুই খেয়াল করলে না। লোকটি বলল, কোথায় নোটিশ, কিসের নোটিশ, আমি কিছুই পাইনি। যম এ বার হেসে বললেন— মুখ্যু মর্ত্যবাসী। দেবলোকের নোটিশ কী তোমাদের মতো কাগজ ধরানো নাকি। শোনো তা হলে— যে দিন মেয়ের বিয়ে দিলে, তাঁর দু’মাস আগে তোমার সামনের দুটো দাঁত পড়ে গেল। তুমি নকল দাঁত বাঁধিয়ে মেয়ের বিয়ে সামাল দিলে বটে, তবে ওটা একটা নোটিশ ছিল। অথচ দাঁত বাঁধানোর তাঁড়নায় তোমার খেয়ালই হল না যে, এটা একটা নোটিশ। তার পর পঞ্চান্নয় তোমার চুলগুলো সাদা হয়ে গেল সব। কিন্তু তোমার একবারও খেয়াল হল না যে, তোমার মাথার ওপর যমরাজের নোটিশ পড়েছে। তুই কী করলে, তুমি চুলে কালো কলপ করে আমার নোটিশ মুছে দিলে। একবার নয় পনেরো কুড়ি দিন পর পর চুলের সাদা রং বেরিয়ে পড়ে, তুমি সেই পার্মানেন্ট নোটিশ বারবার ঢেকে দিয়েছ। তুই নিজে ভাবার চেষ্টা করলে— এগুলি কিছুই নয়, একটু বয়স হলে এ রকম হয়ই। কিন্তু মনে মনে তুমি বুঝতে পারছিলে বলেই আমার নোটিশ অগ্রাহ্য করেছ বারবার। এর পর যে দিন রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে পা ভাঙলে, সে দিনও তোমার বোধ হল না যে, সময় ঘনিয়ে আসছে। খুব তো বলেছিলে যে, বউটা এখনও ডাগর আছে, তোমার ভোগের ইচ্ছে দূর হয়নি, তাই সময় দরকার; তা এখন তাঁর কী অবস্থা, আর ভোগ করার ক্ষমতা আছে, না ইচ্ছে আছে?

    যমের মুখে বারবার মুখ ঝামটা খেয়ে লোকটি এ বার থতমত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল— দেবতার নোটিশ এই ভাবেই পড়ে, এই ভাবেই নেমে আসে পরলোকের সাবধান-বাণী। লোকটি বলল— হ্যাঁ, মানছি তোমার কথা। নোটিশ এ ভাবে পড়েছে বটে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমার ভোগের ইচ্ছে এখনও যায়নি, বিশেষত এই অল্পবয়সী ছেলেমেয়েগুলোকে যে ভাবে নির্ভাবনায় ইচ্ছাপূরণ করতে দেখেছি, তাতে আমার ভোগের ইচ্ছেটা আরও বেড়ে গেছে। যম বললেন— সেটা কী আর আমি লক্ষ্য করিনি ভেবেছ। তুমি আজকাল গা-দ্যাখানো পাঞ্জাবী পড়ে বাজারে যাচ্ছ। বলি, কোন গা দ্যাখাচ্ছ, কাকে দেখাচ্ছ। তোমার বউ আরও স্নো-পাউডার মাখছে, বারবার ভাঙা দেওয়ালে চুনকাম করছে, তুমি ভাবছ— তাঁকে ভাল দেখাচ্ছে, না? তোমাকে খুব রুস্তম দেখাচ্ছে? বুঝলে না, তোমারও ওই একই অবস্থা। লোকটা বলল, হ্যাঁ, আমার শরীরটা বুড়ো হয়েছে বটে, কিন্তু মনটা এখনও বুড়িয়ে যায়নি, যমরাজ! তাই এখনও পাঞ্জাবীটা এমন কাপড়ের কিনছি, যাতে মনে হয় পরেছি কী পরিনি। যমরাজ বললেন— ওরে দুষ্টু বুড়ো! এমন পাঞ্জাবীটা মনকে তরুণ রাখার লক্ষণ, নাকি নিজেকে শারীরিক ভাবে বুড়ো না দেখাবার লক্ষণ।

    বুড়োর কথা এ বার বন্ধই হয়ে গেল। যমরাজ আর ছাড়লেন না, নিয়ে চললেন বুড়োকে পরের জগৎ দেখানোর জন্য। আমি এই কথোপকথন থেকে কিঞ্চিৎ শিক্ষা নিয়েছি। সেই যে আমি চশমা নেবার সময় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম— শরীর বুড়োয় তো বুড়িয়ে যাক, কিন্তু মনটাকে বুড়ো হতে দেব না। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, আমাকে এই বয়সেও তাজা মনে রমনীয় চিন্তা করতে হবে। আসলে জীবনটাকে একটু দার্শনিক ভাবেই বোঝা দরকার। আখির ইয়ে ওয়াক্ত কেয়া হ্যায়? ইয়ে কেয়া হ্যায় আখির? মু সাল্‌ সাল্‌ গুজর্‌ রহা হ্যায়। ইয়ে য্যায়সে গুজরা অবতক কাঁহা থা? কঁহি তো হোগা।

    আমি যে ভেবেছিলাম, চশমা নিয়েও আমি পা মেলাব এই চলমান নতুন জীবনের সঙ্গে, অন্তত মনে মনে থাকব নতুন, মেনে নেব নতুনের ইস্তেহার। কিন্তু দেখলাম, সেটা হয় না। পা তো মেলাতে পারিই না, কেননা নব্য যুবকের দ্রুতপদী চরণ-চারণার তুলনায় আমার পদচারণা ধীর, অচঞ্চল এবং শারীরিক ব্যতিপাত যাতে না ঘটে, সেই কারণেই দৃঢ়। যদি বলি ঠিক আছে শরীর চলুক তার আপন চালে, আমার মন চলুক এই শত শত তরুণ-তরুণীর মনোবাক্য-বুদ্ধি-অহংকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেখলাম, সে চলার মধ্যেও একটা ভালর সঙ্গে আরেকটা ভাল মেলে না, প্রাচীন পঁচিশ বছর আগের ভালর সঙ্গে এখনকার চলমান ভালটা মিলছে না। আসলে ভালর সংজ্ঞাটা নির্ধারণ করার অধিকার আমাদের কারও হাতে নেই, সময় বা কালই বোধ হয় সেই দার্শনিক অধিকারী যে সময় এবং সয়ান্তরের ভালটাকে পর্যায়ক্রমে নির্ধারণ করে চলে। কিন্তু সে নির্ধারণ, আমাদেরই পর্যায়কালের নির্ধারণ সময় দাঁড়িয়ে আছে স্থির রক সাক্ষী-চৈতন্যের মতো আঁখির ইয়ে ওয়াক্ত্‌ কেয়া হ্যায়? কাঁহা সে আয়া, কিধার গয়া হ্যায়? ইয়ে কব্‌সে কবতককা শিলশিলা হ্যায়? ইয়ে ওয়াক্ত কেয়া হ্যায় আঁখির?

    এই তো সে দিনই কলেজে টিচার্স রুমে আমার কাছে কতগুলি ছেলেমেয়ে এসেছিল কথা বলার জন্য। চার ফুট দূরে নবনীতা ঘোষ বসে ছিলেন। বছর পঁয়ত্রিশের মহিলা। খুব স্মার্ট, শেপড্‌ অ্যান্ড ইকুইপড, ওড়না পরেন না। শুনি নাকি ক্লাসে পড়ানও ভাল। তিনি হঠাৎ বাইরে থেকে আনা এক প্লেট চিকেন কষা টোস্ট-সহ খেতে আরম্ভ করলেন। ছাত্রছাত্রীরা দেখছে, কথাও বলছে, পিছনের একজনকে মুখ চেপে একটু হাসতেও দেখলাম। আমি ভাবলাম, যা কিছুই হচ্ছে অন্য রকম, তা এই নবনীতার জন্যই হচ্ছে। এর কিছু দিন পরে দেখলাম, মহিলাদের মধ্যে পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশের কয়েক জন, যাঁদের শাড়ি ছাড়া দেখিনি কখনও, তাঁরাও নবনীতার অনুবৃত্তিতে সালোয়ার-কামিজ পরে কলেজে আসতে আরম্ভ করলেন। তাতে তাঁদের শারীরিক বিকলতা-বৈগুণ্য, যা হঠাৎ চোখে ধরা পড়ত না, তাও বেশ বোঝা যেতে লাগল এবং তার সঙ্গে রইল শাড়ি পড়েননি বলে এক সর্বাঙ্গীন সংস্কারিক জড়তা, যা নবনীতার তুলনায় বিপ্রতীপ। এই অবস্থায় একদিন যখন পঞ্চাশের সীমন্তিনী ভদ্র আমার সঙ্গে কথা বলছেন, তখন তাঁকে খুব অপ্রতিভ এবং জড়োসড়ো লাগছিল। শেষ পর্যন্ত আমি তুলেই ফেললাম কথাটা, আসলে কর্মস্থলেও এই কথা তুলবার মতো মান্যতা আমাদের দুই তরফেই ছিল।

    বললাম— এই পোশাকে তুমি কিন্তু অস্বস্তি বোধ করছ। এটাতে তুমি অভ্যস্তও নও।তুমি কিন্তু অনুকরণ করে নিজের এই অস্বস্তি ডেকে এনেছ নিজেই। সীমন্তিনী বলল— দেখুন, এই পোশাকে সুবিধে অনেক বেশি। তা ছাড়া… তা ছাড়া… আমি বললাম— তা হলে অনেক আগে থেকেই এই সুবিধেগুলো তুমি নিতে পারতে। সীমন্তিনী আরও কিছু বলার আগেই আমি দেখলাম নবনীতা এগিয়ে আসছে। আমি একটু সংবৃত হলাম। কিন্তু নবনীতা যথেষ্টই স্মার্ট, সে হেসে বলল— আমি জানি, কী ব্যাপারে আপনি কথা বলছেন। আসলে কী জনেন— আরম্ভটা সবাই করতে পারে না, সেটা একজনকেই করতে হয়। কিন্তু ব্যাপারটা ওঁদের মনেও ছিল। আমি বললাম কেমনে ব্যাটা পেরেছে সেটা জানতে। তুমি ওঁদের মনের কথা জানতে পেরেছিলে এখানে আসার আগে থেকেই। তুমি কী মনে কর— শুধুমাত্র সুবিধে! আর কিছু নয়, পুষ্পে কীট-সম আর কিছু নেই এখানে? এই যে শত শত মধ্যবিত্ত মহিলাকে— রোগা, কালো, ভাঙা, নুলো, মোটা, যসা, এত মহিলাকে আমি শুধু পুরীর সমুদ্র-সৈকতে প্রথম বার সালোয়ার-কামিজ পরতে দেখেছি এবং সৈকতবাস শেষ হতেই ট্রেনের মধ্যে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখেছি পরের দিন থেকে শাড়িতে বিস্রংসিত হতে হবে বলে সে কি সুবিধের জন্য, আর কিছু নয়? নবনীতা বলল— আর যাহা আছে তাহা কহিবার নহে সখী!

    আর যাহা আছে, সেটা নবনীতা উচ্চারণ করতে না চাইলেও আমি জানি। বিদেশি গবেষকরা জানিয়েছেন যে তাঁদের অন্তত দর্শন এবং গবেষণায় যৌবনের ধর্মটাই একটা বেখেয়ালি অযান্ত্রিক মন তৈরি করে দেয় মেয়েদের। এত যে লো-কাট জিনস, পুশ আপ ব্রা, কিংবা এত যে উঁচিয়ে চলা, উদ্দাম বিভঙ্গ— এগুলো কোনওটাই নাকি ভীষণ সচেতন কোনও প্রয়াস নয়, ছেলেদের দেখানোর জন্য তা নয়, বরঞ্চ নিজেকে আর্কষণীয় করে তোলার জন্য এ হল তার অন্তর্গত উর্বরতার প্রয়াস। আমি জীবনের অনন্ত শিক্ষনীয়তা থেকে এই তত্ত্ব স্বীকার করি এবং মেনেও নিই। হয়তো বা নবনীতাও এই কথাই বলতে চেয়েছিল আধুনিকতার সাম্রাজ্য বিছিয়ে। আমারও এই আধুনিক তত্ত্বে আপত্তি নেই, কেননা এই তত্ত্ব প্রাচীনতম এক আধুনিকতার। ট্র্যাডিশনয়ের মধ্যেও শতেক রমনী ছিলেন— তাঁদেরও এই উর্বরতা ছিল এবং আমাদের মতো পুরুষরাও সেটা জানতেন। আসলে রমনীর উর্বরতার মতো এক সহজন্য কারণের কার্য যেটা, তার ফল তো সুদূর-প্রসারী। মনে আছে মহাভারতে পাণ্ডবজননী কুন্তীর সেই কৌতূহলী আচরণের কথা। দুর্বাসার বরদান তো এক নিমিত্তমাত্র যা রমনীর এই সহজাত উর্বরতাকে ‘সাপোর্ট’ করে, ‘জাস্টিফাই’ করে। যেন তিনি বরদান করেছিলেন বলেই কুন্তী এক অজানা পুরুষকে আহ্বান করার সাহস পেলেন; হোন না তিনি দেবতা, কিন্তু তিনি সে দিন মানুষের আচরণেই কুন্তীকে তাঁর উর্বরতার প্রসঙ্গই স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন তোমার সংকোচের কোনও কারণই নেই তত। এই দ্যাখো, কন্যা শব্দটাই এসেছে কম ধাতু থেকে, অর্থাৎ কিনা যে কোনও পুরুষকেই সে কামনা করতে পারে। এই প্রসঙ্গেই আজকের ভাবুকদের থেকেও আধুনিক কথাটা এসেছে সূর্যের মতো এক দেবতার মুখে। তিনি বলেছেন— তোমার শরীর-মনের ওপর তোমারই অধিকার শুধু, তোমার মা, বাবা, তোমার গুরুস্থানীয়রাও কেউ তোমার ইচ্ছের ব্যাপারে মতামত দিতে পারেন না— ন তে পিতা ন তে মাতা গুরবো বা শুচিস্মিতে।

    কিন্তু এই সূর্যের মতো-মতো স্বাধীনতা— স্ব-অধীনতা মেয়েদের— এটা কী সেকালের পিতামাতারা মানতে পেয়েছেন, না এ কালের পিতামাতারা পারছেন। কেননা রমনীয় এই সহজ স্বাধীন উর্বরতা ধারণ করবে যে পুরুষ, তার সংযম না থাকাটাও তারও একান্ত স্বাধীন উর্বরতা। কারণ পুরুষ-মানুষ স্বভাবতই বড় ভঙ্গুর, স্বভাবতই বড় উত্তেজনা-প্রবণ। এই উত্তেজনার রাশ টেনে ধরার জন্য যে পরিশীলন, যে সংযমাভ্যাস দরকার, সেই অভ্যাসও কার্যকাল উপস্থিত হলে কার্যকরী হয় না বলেই আমাদের মতো বুড়োর শেষ পর্যন্ত জ্ঞান দেবার রাস্তা বেছে নেয়— আখির এ ওয়াক্ত কেয়া হ্যায়? কঁহি তো হোগা। আসলে এই দু’পক্ষের উর্বরতার দ্বন্দ্ব শেষ হবার কোনও উপায় দেখি না, এখানে আমাদের মতো বুড়োদের অবস্থাটা সেই দুই জুয়াড়ি ভাইয়ের মায়ের মতো— যেমনটা কৃষ্ণ বলেছিলেন মহাভারতে। দুই ভাই দু’জনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জুয়ো খেলতে বসেছে। তখন মা ভাবেন— আমি চাই আমার বড় ছেলে জিতুক, কিন্তু ছোটটাও যেন কিছুতেই না হারে।

    তার মানে, এই বুড়ো বয়সে আমি বড় আধুনিকতার হয়েও আমি কিন্তু সমস্যার কোনও সুমীমাংসা করতে পারি না। কেননা মহাকাল কতগুলি চিরসত্য কোলে নিয়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, মাঝখান দিয়ে আমার চোখে চশমা এসে জানান দেয়— সত্য বস্তুটাকে তুমি কিন্তু তোমার কালের চলমানতা দিয়ে বিচার করছ, অথচ তোমার কালের চলমানতা তোমার কালেই স্থির হয়ে গেছে। সেখানে জায়গা নিয়েছে অন্য এক চলমান স্থির। সেই কবি খুব ভাল লিখেছিলেন কথাটা বলেছিলেন একটা চলতি গাড়ি থেকে আমি দেখছিলাম— অনন্ত বৃক্ষরাজি পাশ দিয়ে সরে সরে যাচ্ছে, অথচ সব চেয়ে বড় সত্য তো এই যে সমস্ত গাছই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এতে প্রমাণ হয়— সব ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, আমিই চলছি শুধু, চলতে চলতে ফুরোচ্ছি—

    মগর হাকিকত্‌মে পেড় আপনি জগা খারি হ্যায়,
    সারি মারিয়া কাতার আপনি জগা খারি হো,
    ইয়ে ওয়াক্ত সাকিড় হো আউর হম হি গুজর রহে হো,
    সফরমে হাম হ্যায়, গুজর্‌তে হাম হ্যায়,
    জিসে সমঝতে হ্যায় গুজরতা হ্যায়, উয়ো থমা হুয়া হ্যায়।
    আখির ইয়ে ওয়াক্ত কেয়া হ্যায়, কেয়া হ্যায় আখির।

    ঠিক এই সময় আমার মহাভারতের সত্যবতীর কথা মনে পড়ে। সত্যবতী মহাভারতের শ্রেষ্ঠবুদ্ধি নায়িকাদের একজন এবং তিনি প্রবীনতমা। জীবনের অভিজ্ঞতাও তাঁর কম নয়। সেই প্রথম যৌবনসন্ধিতে কন্যা-অবস্থাতেই ঋষি পরাশরের সঙ্গে তাঁর মিলন হয়েছিল। তাঁর সেই কন্যাগর্ভের সন্তান স্বয়ং মহাভারতের কবি দ্বৈপায়ন ব্যাস। পরবর্তীতে তিনি হস্তিনাপুরের রাজবধূ হয়ে এলেন নিজের শর্তে মহারাজ শান্তনুর স্ত্রী হিসাবে। হস্তিনাপুরে যত দিন না ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ-শাসন চালু হয়নি, তত দিন তাঁর ব্যক্তিত্ব অনুসারেই গোটা কৌরবরাজ্য চলেছে। কিন্তু হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে সময় পালটাল, নাকি সময় পালটে দিল সত্যবতীকে।

    সত্যবতী চোখের সামনে দেখলেন— রাজা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নাতি পাণ্ডু রাজ্য ছেড়ে চলে গেলেন। শতশৃঙ্গ পর্বতে তাঁর মৃত্যু হল। তাঁর ছেলেরা রাজবাড়িতে ফিরল, কিন্তু তাঁরা সেই অভিনন্দন পেলেন না, যা পাণ্ডুর স্থলাভিষিক্ত ধৃতরাষ্ট্র দিতে পারতেন। পাণ্ডুর শ্রাদ্ধাবসানে সে দিন আচ্ছন্ন হয়ে বসে ছিলেন সত্যবতী। মায়ের অবস্থা দেখে তাঁর কাছে এলেন পুত্র দ্বৈপায়ন ব্যাস। তিনি বললেন— তোমার সুখে সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, মা! এখন যে সময় আসছে, সে বড় খারাপ সময়— অতিক্রান্ত সুখাঃ কালাঃ পর্য্যুপস্থিত দারুণাঃ। বস্তুত এই সুখের কাল ভীষণ ভাবে আপেক্ষিক এবং বড় বেশি নির্দিষ্ট প্রজন্মনির্ভর। এটাই সত্য যে, পরবর্তী প্রজন্মে যেটা সুখ, আমার প্রজন্মের মধ্যে দেখতে পান না বলেই সময়টাকেই খারাপ বলে ফেলেন। কিন্তু এইটুকু তাঁরা বোঝেন না যে, এই চলমান সময়ের ‘ভাল’টা তাঁদের সময়ের ‘ভাল’ নয়, কেননা আমার বাবার সময়ের ‘ভাল’টা আমার বাবার সময়ের ‘ভাল’ ছিল না।

    দ্বৈপায়ন ব্যাস অসামান্য কবিকল্পে এই কথাটা জানিয়েছেন সত্যবতীকে। বলেছেন— পৃথিবী তার যৌবন হারিয়ে ফেলেছে মা, সামনে যত পাপের দিন আসছে। তুমি আর থেকো না এখানে, তুমি আমার শান্ত আশ্রমে চলো আমার সঙ্গে— শ্বঃ শ্বঃ পাপিষ্ঠদিবসাঃ পৃথিবী গত যৌবনা। আবার সেই কথাটাই আসে— চলতি গাড়িতে থাকলেও গাছ স্থির আছে, অর্থাৎ পৃথিবী যৌবন হারায় না কখনও। সে অনন্ত যৌবনা। আমার গৌরব-কাল যখন পৃথিবীর যৌবনের সঙ্গে একত্তর হয়, সেটাই আমার কাল। কিন্তু আমি চলতে থাকি, চলতে চলতে ফুরোতে থাকি— সফরমে হাম হ্যায়, গুজরতে হাম হ্যায়। জিসে সমঝতে হ্যায় গুজরতা হ্যায়, উয়ো থামা হুয়া হ্যায়।

    ঠিক এতটা যখন আমি দার্শনিক ভাবে বুঝতে পেরেছি, তখনই আমার বোধ হল, এমন বিচ্ছিরি ভাবে বুড়ো হলে চলবে না কেননা মানুষের যে মনটা চলে, সেই মনের কিন্তু সত্যিই কোনও বুড়োমি নেই। এরই মধ্যে অবশ্য যাঁরা যৌবনকাল থেকেই বৃদ্ধত্বের চর্চা করেন, অত্যল্প কারণেই অবসন্ন বোধ করেন, একাকিত্বকে যাঁরা এক কর্মশেষের অপ্রান্ত পরিণতি বলে গ্রহণ করেছেন, তাঁদের প্রতি আমার কোনও আবেদনও নেই নিবেদনও নেই। মহামতি বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন—

    আমি অন্ত্র-দন্তহীন ত্রিকালের বুড়ার কথা বলিতেছি না— তাঁহারা দ্বিতীয় শৈশবে উপস্থিত। যাঁহারা আর যুবা নাই বলিয়াই বুড়া, আমি তাঁহাদিগের কথা বলিতেছি। যৌবন কর্ম্মের সময় বটে, কিন্তু তখন কাজ ভাল হয় না। একে বুদ্ধি অপরিপক্ক, তাহাতে আবার রাগ দ্বেষ ভোগাসক্তি, এবং স্ত্রীগণের অনুসন্ধানে তাহা সতত হীনপ্রভ; এ জন্য মনুষ্য যৌবনে সচরাচর কার্য্যক্ষম হয় না। যৌবন অতীতে মনুষ্য বহুদর্শী, স্থিরবুদ্ধি, লব্ধপ্রতিষ্ঠ, এবং ভোগাসক্তির অনধীন, এজন্য সেই কার্য্যকারিতার সময়। এই জন্য, আমার পরামর্শ যে বুড়া হইয়াছি বলিয়া, কেহ স্বকার্য্য পরিত্যাগ করিয়া মুনিবৃত্তির ভান করিবে না। বার্ধক্যেও বিষয়চিন্তা করিবে।

    এই ‘বিষয় চিন্তা’ ব্যাপারটা যে জীবনাবধি টাকা জমানো, আর বাড়ি-গাড়ি-সম্পত্তির ভাবনা করা নয়, সেটা বুঝিয়ে দিতে সময় নেননি বঙ্কিম। তিনি বলেছিলেন— পরের জন্য কাজ করার এই সময়। আমি অবশ্য পরহিতের চেয়েও নিজের হিসেব জন্য বেশি চিন্তা করি। আপনি বাঁচলে বাপের নাম। এই জন্য বলছি এ কথা যে শত শত মানুষকে এখন দেখছি— বৃদ্ধত্বের আভাস তাঁদের অকারণে পঙ্গু করে তুলছে, কতগুলি যুবক-যুবতীর মধ্যেও আমি এই নিরুত্তাপ বৃদ্ধত্ব দেখতে পাচ্ছি। এক-একটি অণু-পরিবারে একটি-একটি ছেলে কিংবা মেয়ে। পিতা-মাতার অনন্ত সুনজরে তারা এত শিক্ষিত এত ভাল, এত ভদ্র এবং এত ‘গাণ্ডু’ হয়ে উঠছে যে, একটি মা-বাবাকে দেখলাম— তিনি ছেলেকে প্রেম করিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এমনই কপাল যে, আধারভূতা রমনীটি আমাকে আড়ালে এসে বলল— এটা কী একটা ছেলে? আমি ভাবলাম— সত্যিই তো, এ ছেলে তো কোনও দিন গুলি খেলেনি, কোনও দিন ঘুড়ি ওড়ায়নি, কোনও দিন বাপের পকেট কেটে যৌবনসন্ধিতে হেলেনের নিতম্ব-নৃত্য দেখেনি, কোনও দিন ভুল করেও জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির বউদির সালস্য চুল-আঁচরানোও দেখেনি, এমন দুধু-ভাতু ছেলেকে নিয়ে কোনও রমনী আশ্বস্ত বোধ করবে! বস্তুত বৃদ্ধত্ব তোলা রইল এঁদের জন্য। আর রইল টি.এস.এলিয়ট-এর সেই সাংঘাতিক কথাটা, যা তিনি বোদলেয়ার-এর কথা টেনে বলেছিলেন— So far as we are human, what we do must be either evil or good; so far as we do evil or good, we are human; and it is better in a Way, to do evil than to do nothing: at least we exist.

    SHARE

    LEAVE A REPLY