গ্রেফতার

    0
    180
    কৌশিক সেন
    দীর্ঘদিন আমেরিকাবাসী। পেশায় ডাক্তার। কিন্তু বাংলা সাহিত্য চর্চায় নিজেকে ব্যাস্ত রাখেন। দেশ ও বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত গল্প ও উপন্যাস লেখেন।

    ‘স্যার আজকে একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবেন? ছেলেটাকে স্কুল থেকে তোলার আগে একবার হাসপাতাল থেকে ঘুরে আসব। ওর শরীরটা আবার খারাপ হয়েছে।’ টেবিলের ওপর সাদা চাদরটা ঠিক করতে করতে কথাগুলো বলেছে অরুণা। ওর গলার আওয়াজ সবসময়েই খুব নিচু, চোখের দৃষ্টিও কদাচিৎ মাটি থেকে ওপরে ওঠে। ডা. শুভেন্দু মিত্র কথাটা শুনে একটু থমকালেন।

    অরুণার স্বামী সুজিত যে হাসপাতালে ভর্তি আছে শুভেন্দু তা ভালই জানেন। কিন্তু ক্লিনিক শেষ হবার আগে অরুণাকে যেতে দেওয়া মুশকিল। পলিক্লিনিক বন্ধ হবার সময় হয়েছে তবু এখনও গোটাকতক পেশেন্ট দেখা বাকি। দারোয়ান, ল্যাবের লোক আর রিসেপশনিস্টকে বাদ দিলে আপাতত এখানে নার্স বলতে শুধুমাত্র অরুণা আর জয়িতা। পাশের ঘরে ডা. চৌধুরী এখনও রোগী দেখছেন, অরুণার চলে যাওয়া মানে জয়িতাকে দুটো জায়গা একলা সামলাতে হবে।

    ‘ডা. চৌধুরীর এটাই শেষ পেশেন্ট, আমাদেরও আর মাত্র দুজন বাকি, জয়িতাদি বলেছে কোনও অসুবিধা হবে না।’ অরুণার গলাটা কেঁপে গেল, চোখের দৃষ্টি এক পলকের জন্য ওপরে উঠে শুভেন্দুর চোখ ছুঁয়ে মাটির দিকে নেমে গেল আবার। ও বুঝতে পেরেছে শুভেন্দু সম্ভবত না বলবেন। সুজিত অবুঝের মতো বারে বারে ফোন করছে, অথচ ছেলেটাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই আবার কাজে ছুটতে হবে অরুণাকে, ছুটি হতে হতে রাত দশটা। সপ্তাহে তিনদিন সন্ধ্যাবেলা আরেকটা ক্লিনিকে কাজ করে অরুণা। সুজিত লিউকোমিয়ার রোগী, অনেকদিন রেমিশনে থাকার পর কিছুদিন আগে রিল্যাপ্স করেছে। সংসার চালানো, চিকিৎসা আর ছেলের স্কুলের খরচ, সবই মোটামুটি অরুণার ওপর।

    ‘ঠিক আছে তুমি যাও। জয়িতাকে বলে দাও ওর হয়ে গেলে যেন এদিকে চলে আসে।’ শুভেন্দু একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন। কাজের জায়গায় এরকম অনিয়ম ওঁর একেবারেই পছন্দ নয় কিন্তু অরুণাকে না বলাও কঠিন। ‘অনেক ধন্যবাদ স্যার।’ আবার একঝলক ওঁর দিকে তাকিয়ে প্রায় দৌড়েই বেরিয়ে গেল অরুণা। শুভেন্দুর মনে হল ওই এক পলকের চাউনিটা যেন সেই পুরানো দিনের মিক্সচারের মতন, অনেকটা স্বস্তির মধ্যে দুফোঁটা কান্না আর কয়েক আউন্স কৃতজ্ঞতা মেশানো। হঠাৎ যেন অকারণেই একটা ক্লান্তিবোধ এসে চেপে ধরল শুভেন্দুকে, চেয়ারে হেলান দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। একটুকরো হালকা নীলের ওপর সরু মোটা অনেকগুলো তার হিজিবিজি কেটেছে, সেখানে চড়াইপাখিদের জটলা। পুজোর মাত্র এক মাস বাকি।

    ‘স্যার আসতে পারি?’ জয়িতা পরের পেশেন্টকে নিয়ে এসেছে। পরিচিত পেশেন্ট, বছর পঁয়তাল্লিশ বয়েস, অঢেল টাকাপয়সা কিন্তু ভদ্রলোকের সমস্যার শেষ নেই। সপ্তাহের মধ্যে কম করে একদিন উনি বিভিন্ন স্পেশালিটির ডাক্তার, হোমিওপ্যাথ, কবিরাজ, জ্যোতিষী কিংবা সাধুবাবার চেম্বারে হাজিরা দেন, একবার ঘরে ঢুকলে কম করে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ধাক্কা।

    নতুন প্রেসক্রিপশন দিয়ে ভদ্রলোককে বিদায় করার পর সত্যিই ক্লান্তি লাগতে শুরু করল শুভেন্দুর। এক একটা দিন যেন আর শেষ হতেই চায় না।

    দরজায় টোকা পড়েছে আবার, আশা করা যায় আজকের মতন এটাই শেষ কেস। শুভেন্দু ঠিক করে ফেললেন বাড়ি ফিরেই সুপ্রিয়াকে বলে দেবেন, ‘তোমার কথাই রইল চল এই সপ্তাহেই আমেরিকার টিকিট কাটি।’ সুপ্রিয়া আর শুভেন্দুর একমাত্র মেয়ে সুমি ওরফে সমর্পিতা থাকে ভার্জিনিয়ায়, ওদের ওখানে বিরাট করে পুজো হয়। মেয়ের বিয়ের পর প্রতি বছর লম্বা ছুটি কাটানোর ডাক এসেছে, নানা ছুতোয় এড়িয়ে গেছেন শুভেন্দু। আসলে উনি প্র্যাকটিস ছেড়ে কোথাও যেতে চান না, এই নিয়ে মেয়ে আর মা, দুজনেই বেশ একটু রেগে আছে।

    ‘কী কষ্ট আপনার?

    পেশেন্ট ঢুকেছে। কাগজে চোখ বুলিয়ে অভ্যাসমতন প্রথম প্রশ্নটা করেছেন শুভেন্দু। ঝানু ডাক্তারদের মগজের মধ্যে একজন অদৃশ্য পার্সোনাল সেক্রেটারি বসে থাকে, রোগী কথা বলতে শুরু করলেই দরকারি তথ্যগুলোকে সে রেকর্ড করে নেয়। এই সময়ে মনের পিছনে অন্যান্য চিন্তারাও ঘুরে বেড়ায় কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু যায় আসে না। তথ্যগুলো একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে ক্রমশ একটা পরিচিত ধাঁধার অবয়ব ফুটে ওঠে, যেখান থেকে আসল পরীক্ষার পালা শুরু।

    এই মুহূর্তে ওঁর সামনে রোগীর চেয়ারে বসে একটি অল্পবয়সি মেয়ে, তার সঙ্গে এসেছেন আরও একজন বয়স্ক মহিলা। তিনি নিজের পরিচয় দিলেন রোগীর মা বলে। মেয়েটির অনেকদিন ধরে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, তার সঙ্গে বমি-বমি ভাব। শুভেন্দু ওকে পরীক্ষার জন্য টেবিলে শুয়ে পড়তে বললেন। জয়িতাকে ডাকার জন্য বার দুয়েক ঘণ্টা বাজানো হয়েছে কিন্তু এখনও কোনও উত্তর নেই।

    মেয়েটি কেমন যেন নার্ভাস, কথা বলছে অন্যদিক তাকিয়ে। পঁচিশ বছর বয়স, সুন্দর ছিপছিপে চেহারা, পরনে হালফ্যাশানের জিনস আর টপ, ডাক্তারের কাছে আসার জন্য একটু যেন বেশিই সাজগোজ করেছে। ওর সঙ্গে কয়েকটা কথা বলেই শুভেন্দুর সন্দেহ হল যে মেয়েটি বুকে ব্যথা আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে এসেছে ঠিকই কিন্তু ওর আসল রোগটা অন্যখানে। পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এদিকে জয়িতার পাত্তা নেই।

    তবে এক্ষেত্রে রোগী একা নয়, সঙ্গে আরেকজন বয়স্ক মহিলা আছেন, বোকার মতন আর কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়? পাঁচ মিনিটের তো ব্যাপার।

    ‘শুয়ে পড়ুন আপনাকে পরীক্ষা করে দেখতে হবে।’ শুভেন্দু অন্যমনস্কভাবে বললেন। উনি তখন ঘুণাক্ষরেও জানতেন না যে ক্লিনিকে অতি ব্যবহৃত এই বাক্যটি মুখ থেকে বেরোবার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় ওঁর জীবনটা টিনের ভেতরে ঝালমুড়ির মতন ওলটপালট হয়ে যাবে। অথচ ঠিক ওই মুহূর্তে উনি মগজের দ্বিতীয় চ্যানেল খুলে সপরিবার আমেরিকায় বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন।

    আমরা যাকে স্বাভাবিক জীবন বলি তা আসলে প্রত্যাশিত ঘটনার একটা রুটিন প্রবাহ। সেই প্রবাহে গা ভাসিয়ে আমরা প্রায়ই স্রোতের তলায় ডুবোপাহাড়ের মতন অনির্দেশ আর বিপজ্জনক সম্ভাবনাগুলোর কথা ভুলে থাকি। অপ্রত্যাশিত আঘাতে কারও জীবন যখন হঠাৎ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তখন আমরা চোখ কপালে তুলে খুব জোর অবাক হই। এটা যেন নেহাৎ অবিচার, যেন স্রোতের নীচে ডুবোপাহাড়গুলোর অস্তিত্বই ছিল না কোনওদিন। আমাদের এই সম্মিলিত আত্মপ্রবঞ্চনাই হয়তো সামাজিক সুখের চাবিকাঠি, তাই তাকে অক্ষয় করে রাখার জন্য হরেক রকমের ইন্সিওরেন্স কিনে চলেছে মানুষ। শুভেন্দু জানতেন যে ডাক্তারের জীবন মাত্রেই এক পা সাপের গর্তে ঢুকিয়ে রাখা তবুও সর্পাঘাতের যন্ত্রণা ওঁকে এক প্রবল মানসিক পক্ষাঘাতের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল সেদিন, ভেবেচিন্তে কাজ করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছিলেন উনি।

    চিৎকারটা শুনতে পেয়েই প্রথম ছুটে এসেছিল জয়িতা, তারপর একে একে ক্লিনিকের বাকি সকলে।

    ‘একী? আপনি এভাবে আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন? মতলব কী আপনার?’

    ‘ভেবেছেন কী আপনি? ডাক্তারি করার ছুতোয় একটা মেয়েকে মলেস্ট করে পার পেয়ে যাবেন!’

    ‘এত বড় সাহস আপনার! আমারই সামনে আমার মেয়ের অপমান! পুলিশে যাব, জেল খাটাব আপনাকে!’

    ঘরের মধ্যে বেশ একটা নাটকীয় দৃশ্য। অল্পবয়সি মেয়েটি ফুলে ফুলে কাঁদছে, বয়স্ক ভদ্রমহিলাটি ওকে জড়িয়ে ধরে তারস্বরে চিৎকার করছেন। মেয়েটির কোমরের রুপালি রঙের বেল্টটা খোলা, জিনসের প্যান্ট আলগা হয়ে খানিকটা নেমে এসেছে। শুভেন্দুর ফর্সা মুখ টকটকে লাল, চোখের দৃষ্টি উদভ্রান্ত, উনি মহিলাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন কিন্তু ওঁর একটা কথাও শোনা যাচ্ছে না।

    ‘আপনারা বসুন, প্লিজ এত উত্তেজিত হবেন না। নিশ্চয়ই কিছু একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, পেশেন্টকে কেউ ইচ্ছে করে অপমান করেনি।’ ডক্টর রথীন চৌধুরী এগিয়ে এসে অবস্থা সামাল দেবার চেষ্টা করলেন কিন্তু ফল হল উল্টো। আগুনে যেন ঘিয়ের ছিটে পড়ল।

    ‘আপনি কী করে জানলেন কী হয়েছে? আমি যদি বলি যে আপনারা প্রত্যেকে এক একটা আস্ত ক্রিমিন্যাল, এই হাসপাতালগুলো শুধু অসুস্থ লোকের টাকা চুষে নেবার কারখানা? আপনি জানেন কী করা হয়েছে আমার মেয়ের ওপর? ভেবেছেন যে ক্ষমতা আছে বলে মানুষের সঙ্গে যেমন খুশি দুর্ব্যবহার করবেন, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নেবেন আর তারা মুখ বুজে সহ্য করে যাবে?’ মহিলা এবার ডক্টর চৌধুরীর দিকে তেড়ে এলেন। এর মধ্যে ঘরের বাইরে একটা ছোটখাটো ভিড় জমা হয়ে গেছে। সালিশির চেষ্টা ওখানেই শেষ, ডক্টর চৌধুরী বেগতিক দেখে পিছু হটে গেলেন। এতক্ষণ পরে শুভেন্দুর মুখ থেকেও একটা চিৎকার বেরিয়ে এল।

    ‘মিথ্যে কথা বলছেন আপনারা! আপনাকে কেউ অপমান করেনি, রুটিন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছিল। আপনারা উন্মাদ। বেরোন! বেরিয়ে যান আমার ক্লিনিক থেকে।’

    ‘আমার সঙ্গে নোংরামি করে আবার আমারই ওপরে চিৎকার করছেন! শুনে রাখুন, আমরা এখান থেকে সোজা থানায় যাচ্ছি। আপনাদের মতো দুশ্চরিত্র বদমাশদের কী করে শায়েস্তা করতে হয় আমাদের জানা আছে।’ কান্না থামিয়ে অল্পবয়সি মেয়েটি ফুঁসে উঠেছে এবার। কেউ কিছু বোঝার আগেই জামাকাপড় ঠিক করে নিয়ে নিয়ে, চোখ মুছে গটগট করে ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে গেল ওরা।

    শুভেন্দু দরদর করে ঘামছেন, মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলেন প্রায়, জয়িতা ওঁকে কোনওরকমে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল।

    ‘হোয়াট ননসেন্স ইজ দিস! আই ওয়াজ সিমপ্লি একজামিনিং হার একজ্যাক্টলি অ্যাজ আই অলওয়েজ ডু। ওর মা তো আগাগোড়াই সামনে ছিল। জয়িতা ব্যস্ত ছিল তাই ভাবলাম কাজটা সেরে ফেলি। মানে এইরকম তো আগেও কতবার করেছি।’ বিড়বিড় করে কথাটা শেষ করতে পারলেন না শুভেন্দু, তার আগেই হাঁপ ধরে গেল।

    ‘আমার আসতে দেরি হয়েছিল। আই অ্যাম সো সরি।’ জয়িতা কাঁচুমাচু গলায় বলল।

    ‘জয়িতা আমার সঙ্গে একটা প্রসিডিওর শেষ করেই আসছিল। আপনি যদি আর একটু অপেক্ষা করতেন তাহলে এই কাণ্ডটা অ্যাভয়েড করা যেত। হাজার হোক, ইয়ং ফিমেল পেশেন্ট, আজকাল কাউকে বিশ্বাস করা যায় না শুভেন্দুদা।’ ডক্টর চৌধুরীর গলায় সহানুভূতির সঙ্গে খানিকটা অস্বস্তি আর বিরক্তিও যেন মিশে আছে। শুভেন্দু বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে ঘরের চারদিকে তাকালেন। সকলে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে, সেই দৃষ্টিগুলোর মধ্যে দুর্বোধ্য ভাবের লুকোচুরি। এরা কি সবাই শুভেন্দুকে অপরাধী ভাবছে নাকি? ভাবছে এই পড়ন্ত বিকেলের আলোয় কোনও এক অদ্ভুত ম্যাজিকে ওদের চেনা ও সম্মানিত ডাক্তারের ভেতর থেকে দুর্গন্ধী এক গুহামানব বেরিয়ে এসেছে হঠাৎ। কথাটা ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠল শুভেন্দুর, মনে হল ঘরের মধ্যে যথেষ্ট বাতাস নেই।

    ‘স্যার আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? আমি ম্যাডামকে ফোন করে দেব?’ নজরুল এগিয়ে এসে ওঁকে ধরে ফেলল এবার। নজরুল শুভেন্দুর বহুকালের বিশ্বস্ত ড্রাইভার, ঠিক এই সময়টা সাহেবের ব্যাগটা নিয়ে যাবার জন্য ও ক্লিনিকে হাজির হয়।

    ‘না না, আমি ঠিক আছি। বাড়ি চল। যতসব ছোটলোকের কারবার।’

    জোর করে নিজেকে টেনে ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে এলেন শুভেন্দু। সবক’টা চোখ ওঁকে অনুসরণ করছে, উনি কাদায় পড়ে যাওয়া মানুষের মতন জলের কাছে যেতে চাইছেন। শুভেন্দু বুঝতে পারলেন ওঁর হাঁটু দুটোর মধ্যে থলথলে জেলির তাল, বুকের মধ্যে ঢাক বাজছে, জিভের ওপর চেপে বসেছে মরুভূমি। এক মিনিটের মধ্যে কী থেকে কী হয়ে গেল! অবাক কাণ্ড এটাই যে আজকের দিনটা শুরু হয়েছিল ঠিক আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতন।

    ডক্টর চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি অবধি এসেছেন, ওঁর মুখচোখে চিন্তার ছাপ।

    ‘শুভেন্দুদা আমার মনে হচ্ছে এই পার্টি আরও গোলমাল পাকাবে। আজকাল আইন কানুন খুব কড়া, আপনি বরং আগে থেকে কোনও ল’ইয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাখুন। আমার পরিচিত একজন আছে, ফোন নাম্বারটা এখনই নিয়ে নিন।’

    নম্বরটা ফোনে নোট করে নিয়ে পিছনের সিটে এলিয়ে পড়লেন শুভেন্দু। সেই মুহূর্তে উনি উটপাখি হয়ে যেতে চাইলেন। কলকাতার রাস্তায় অসংখ্য চলমান ছবিরা ঝড়ের মধ্যে খড়কুটোর মতন উড়তে থাকল ওঁর চারপাশ দিয়ে। শ্বাসকষ্টটা থেকে থেকে ফিরে আসছে, অপমান আর রাগ একসঙ্গে মিশে পাখা ঝাপটাচ্ছে মাথার ওপর। কেন আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে পারলেন না! মাত্র পাঁচ মিনিট। সারা জীবন তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে অনেকবার বিপদে পড়েছেন, তাও যদি কিছুতেই শিক্ষা হয়!

    ‘স্যার একজন আপনাকে চাইছেন, খুব জরুরি নাকি বাত।’

    নজরুল ওর ফোনটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ওর নম্বরে আবার কে কল করল এই সময়?

     

    ড্রইংরুমে সোফার ওপর বসে শুভেন্দুর মনে হল ঘটনাটা এমন কিছু না, উনিই বোধহয় ওভার রিঅ্যাক্ট করেছেন। চারদিকের পরিচিত জিনিসপত্র, হুইস্কির হালকা গন্ধ আর টেলিভিশনে চেনা সিরিয়ালের হাসিমুখ, সব মিলিয়ে কোথা থেকে একটা আরামদায়ক আশ্বাসে ভরে উঠল ক্লান্ত মাথাটা। দূর ছাই কী আর হবে! আরে কত লোকই তো হুমকি দেয়, তারপরে মাথা ঠান্ডা হলে আর ঝামেলা নিতে চায় না। তাছাড়া শুধু একজনের মুখের কথার কতই বা ওজন আছে!

    ‘শুনছ? মেয়ে আসছে, মেয়ে কী বলে জানো? বাবার কাছে তো পেশেন্টরাই ছেলে মেয়ের চেয়ে বেশি, তাদের ছেড়ে কোথাও যাবে না। কী আর করি, এবছরটাও সেই আমাকেই আসতে হবে তাহলে।’

    শোবার ঘর থেকে সুপ্রিয়া বেরিয়ে এসেছেন, তাঁর সঙ্গে এক ঝলক সুগন্ধ। সুপ্রিয়ার মনমেজাজ খুবই ভাল কারণ অনেকবার না না করে শেষ অবধি মেয়ে-জামাই আসতে রাজি হয়েছে, আজকেই কনফার্ম করল।

    পেশেন্টরা ছেলে মেয়ের চেয়ে বেশি? মাথার ভেতর কোথাও একটা গিয়ে ধাক্কা মারল কথাটা, অস্বস্তি কাটাতে নড়েচড়ে বসলেন শুভেন্দু। এই কথাটা উনি মাঝেমধ্যেই বলে থাকেন, আজ মনে হল এত বড় মিথ্যা কথা আর হয় না। আসলে এটা বেচাকেনার সম্পর্ক, আর পাঁচটা ব্যবসার মতন এখানেও ক্রেতা আর বিক্রেতার মধ্যে রেষারেষি আর অবিশ্বাস, বাইরে মাপা বিনয় কিন্তু ভিতরে ভিতরে বিদ্বেষের ছুরি শানানো। একটা সময় ছিল যখন ডাক্তারবাবুরা মাচার ওপরে থাকতেন, ম্যালপ্র্যাক্টিস কথাটার মানেও কেউ জানত না। এখন পাবলিক সবকিছুর জন্য ডাক্তারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ভাবটা যেন ডাক্তার মাত্রেই রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষা নিয়ে সমাজ কল্যাণের কাজে নামা উচিৎ। ঠিক যেমন একসময় পরিবারে শাশুড়িদের আপারহ্যান্ড ছিল, এখন তাঁরা কোণঠাসা, বউরা সুদে আসলে সব জুলুম ফেরত দিচ্ছে।

    সুপ্রিয়া খুব উৎসাহের সঙ্গে নানা প্ল্যান করে চলেছেন, শুভেন্দুর এখন দুই রকম ভাবের নৌকায় পা দিয়ে টলমলে অবস্থা। এক এক সময় মনে হচ্ছে মনের আকাশ বেশ পরিষ্কার, সবকিছু যেমন তেমন আছে, এই নিয়ে আলোচনার কোনও দরকার নেই। আবার এক এক সময় সেই আকাশেই বৈশাখী মেঘের আনাগোনা, তার মধ্যে নিঃসীম আতঙ্কের শিহরন বিদ্যুতের মতন ঝলসে উঠছে। এরই মধ্যে টেলিফোনে মা আর মেয়ের কথা শুরু হয়ে গেল, টুকরো টুকরো হাসি ছিটকে আসছে ডাইনিং রুম থেকে।

    ‘সুপু এক মিনিট ফোনটা ছেড়ে এদিকে শুনে যাও।’ অনেক চেষ্টা করে মিনমিনে গলায় একবার ডাকলেন শুভেন্দু কিন্তু সুপ্রিয়া পাত্তাও দিলেন না। ওদিকে এখন প্রচুর দরকারি আলোচনা হচ্ছে  বেড়াতে যাওয়া হবে প্রি না পোস্ট পুজো, বীচে না পাহাড়ে।

    শুভেন্দু হতাশ হয়ে মাথা নাড়ালেন। কিছুতেই উনি এই পারিবারিক খুশির মুহূর্তটা নষ্ট করে, সুপ্রিয়াকে ডেকে আজকের এই ঘিনঘিনে নোংরা ঘটনাটার কথা খুলে বলতে পারবেন না। বলা মানেই তো একগাদা প্রশ্ন, অশান্তি, কথা কাটাকাটি আর দোষারোপ। প্রথম প্রশ্নই হবে কেন উনি অরুণাকে সময়ের আগে ছুটি দিলেন, যার কোনও সন্তোষজনক উত্তর নেই। এই নিয়ে গত সপ্তাহেই যা একখানা কাণ্ড হয়ে গেল!

    ‘কাল সকালে আবার একটা তাজা দিন শুরু হবে, রোদ্দুরে কুয়াশার মতন মিলিয়ে যাবে অহেতুক সব সন্দেহ, দোষারোপ আর ভুল বোঝাবুঝি’, হুইস্কির গ্লাসে ডুব দিতে দিতে শুভেন্দু ভাবলেন, ‘শুধু রাতটা কোনওরকমে কাটিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা।’

    কলিংবেলটা যখন বেজে উঠল তখন ওঁরা সদ্য রাতের খাবার খেতে বসেছেন। শুভেন্দুর বেশ একটু নেশা হয়েছে, টেবিলের ওপর গরম রুটি, মুসুরির ডাল আর আলু কপির তরকারিও ঠিকঠাক হাজির। দুজনেই আজকাল স্বাস্থ্যের কারণে একবেলা নিরামিষ খান। সুপ্রিয়া রোজকার মতন টেবিলে বসতে বসতে শুভেন্দুর অতিরিক্ত মদ্যপান নিয়ে একপ্রস্থ অসন্তোষ জানাতে শুরু করেছিলেন, ঠিক সেই সময় বেলের আওয়াজ।

    ‘অ্যাতো রাত্রে কে এল আবার। পারমিশন না নিয়ে ওপরে এলই বা কী করে!’ অবাক হয়ে দরজার দিকে এগোলেন সুপ্রিয়া। শুভেন্দু তার আগেই প্রায় দৌড় দিয়ে দরজাটা খুলেছেন।

    ‘পুলিশ স্টেশন থেকে আসছি। আমি ইন্সপেক্টর রমিতা চৌধুরী। আপনি কি ডক্টর শুভেন্দু মিত্র?’

    ‘ইয়েস।’ ভূতের গলায় শুভেন্দু বললেন।

    ‘মাপ করবেন কিন্তু আপনার নামে ওয়ারেন্ট আছে। আপনাকে আমাদের সাথে থানায় আসতে হবে। আমরা অপেক্ষা করছি, আপনি ডিনার খেয়ে তৈরি হয়ে নিন।’

    ওয়ারেন্টের কাগজটা যিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি একজন প্রায় মধ্যবয়সি, সুশ্রী এবং ছিপছিপে চেহারার ভদ্রমহিলা। সাধারণ একটা শার্ট আর ফুলপ্যান্ট পরে এসেছেন। চুল ছোট করে কাটা, একটু লম্বাটে মুখ, ভুরু আর চোয়ালের গঠনে পুরুষালি কাঠিন্যের ছোঁয়া কিন্তু সব কিছুর ওপরে একটা আলাদা সৌষ্ঠব রয়েছে। ভদ্রমহিলার সঙ্গে ইউনিফর্ম পরা আরও কয়েকজন।

    ‘থানায় যেতে হবে? ওয়ারেন্ট! তার মানে? শুভ এরা কী বলছে? কীসের জন্য ওয়ারেন্ট?’

    ‘ম্যাডাম আস্তে। চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করলে কি আপনার কিছু সুবিধা হবে? এক মহিলা পেশেন্ট ডক্টর মিত্রর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছেন, এই সব ক্ষেত্রে আজকাল অভিযুক্তকে সাথে সাথে অ্যারেস্ট করাই নিয়ম। দয়া করে ওয়ারেন্টটা পড়ে দেখুন, আজকেরই বিকেলের ঘটনা, মনে হচ্ছে উনি আপনাকে জানানোর সময় পাননি।’ রমিতা চৌধুরীর গলায় ধমকের সঙ্গে চাপা সহানুভূতির আভাস।

    ‘জানানোর সময় পাননি! এই রকম একটা কথা জানানোর সময় পাননি! আপনারা কিছু ভুল করছেন না তো? শুভ তুমি আমাকে কিছু বলনি কেন?’ সুপ্রিয়ার হাহাকার থামানো যাচ্ছে না। শুভেন্দু পাথর হয়ে গেছেন, শুধু হাতের আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে।

    ‘ম্যাডাম আপনি এই রকম করলে আমরা ফোর্স ইউজ করতে বাধ্য হব। ডক্টর মিত্র, আপনি নিজেকে ডিফেন্ড করার পুরো সুযোগ পাবেন, আপনাকে আজ রাত্রে কেউ জেরাও করবে না কিন্তু আমাদের সঙ্গে আসতে আপনাকে হবেই। আনফরচুনেটলি ইউ আর অ্যাকিউজড অফ আ নন-বেইলেবল অফেন্স।’

    ‘মেয়েটা মিথ্যে কথা বলছে। যে কেউ গিয়ে একজন ভদ্রলোকের নামে যা ইচ্ছে বলে দিলেই পুলিশ এসে তাকে তুলে নিয়ে যাবে? কিছু প্রমাণ করা দূরে থাক ইনভেস্টিগেট করারও প্রয়োজন নেই? এই রকম জুলুম কোনও সভ্য দেশে সম্ভব?’ শুভেন্দু জড়ানো গলায় বলে উঠলেন। চোখের সামনে সমস্ত ঘরটা দুলছে, ইউনিফর্ম পরা অচেনা মানুষদের মুখগুলো ঝাপসা, শুধু সুপ্রিয়ার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন শুভেন্দু। সেই মুখের মধ্যে লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, সন্দেহ, অবিশ্বাস, বিভ্রান্তি সব একসঙ্গে মিলে দাউদাউ করে জ্বলছে।

    ‘মাপ করবেন কিন্তু আপনি বোধহয় খবরের কাগজ পড়ারও সময় পান না। উই হ্যাভ আ কালচার অফ অ্যাবিউজ ইন দিস কান্ট্রি। এই সভ্য দেশের ভদ্রলোকেরা খেলাচ্ছলে মেয়েদের হ্যারাস করেন প্রতিদিন। বাড়াবাড়ি বা খুনখারাপি কিছু একটা হলে তখন সকলের বিবেক মোমবাতি হাতে খাড়া হয়ে যায়। সব দোষ ল-এনফোর্সমেন্টের, যেন পাবলিক অ্যাটিচিউড বদলানোর আগে আইন বদলে দিলেই সবাই নিরাপদ হয়ে যাবে। মাঝখান দিয়ে পুলিশের ওপর দু’দিক থেকে চাপ, সেই বা কী করে বলুন। নিন, অনেক হয়েছে এবার চলুন, যা বলবার কোর্টে বলবেন।’ রমিতার গলায় এইবার একটা কঠিন ব্যঙ্গের ছোঁয়া। শুভেন্দু বুঝলেন আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

    ‘সুপু, আই অ্যাম প্রফাউন্ডলি সরি যে তোমাকে এই হিউমিলিয়েশন ফেস করতে হল। পরে আমি সব এক্সপ্লেইন করব, রাইট নাউ তুমি সঞ্জন আর উজ্জ্বলকে ফোন কর, আর নিজের মনে ভরসা রাখ। সব ঠিক হয়ে যাবে কারণ আই অ্যাম নট গিলটি অফ এনিথিং। আমি আসছি।’

    টলমলে পা দুটোকে মনের জোরে শক্ত করে লিফটের দিকে এগোলেন শুভেন্দু। উজ্জ্বল ওঁর ভাগ্নে, অধ্যাপনার সঙ্গে রাজনীতিও করে, বাল্যবন্ধু সঞ্জন বড় মাপের সরকারি আমলা।

    লক আপে গিয়ে অবশ্য বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না শুভেন্দু। প্রথমে বমি হতে শুরু করল তারপর বুকে অসহ্য ব্যথা আর শ্বাসকষ্ট। রমিতা চৌধুরী নজর রেখেছিলেন, ঠিক সময়ে হাসপাতালে পাঠানো হল শুভেন্দুকে। দেখা গেল খুব অল্পের জন্য উনি একটা হার্ট অ্যাটাকের হাত থেকে বেঁচে গেছেন।

    পরের দিন সকালবেলা খবরটা বোমার মতন ফেটে পড়ল সারা কলকাতায়। শুভেন্দু নামকরা ডাক্তার, তাঁর বন্ধুমহলে কেষ্টুবিষ্টু লোকের অভাব নেই। সুশীল সমাজে ছি ছি পড়ে গেল, ডাক্তাররা রীতিমতন সভা করে প্রতিবাদ জানালেন। একজন সম্মানিত আর বয়স্ক নাগরিকের ওপর শুধুমাত্র একটা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে সারা রাত পুলিশি অত্যাচার হল, অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁর জামিন হল না। এই রকম ড্রাকোনিয়ান আইন কোনও গণতান্ত্রিক দেশে কী করে থাকতে পারে? কেউ বলল দেশের সব জায়গায় মেয়ে অপরাধীদের গ্যাং তৈরি হয়ে গেছে, তারা এইসব আইনের সুযোগ নিয়ে নির্দোষ লোকেদের ব্ল্যাকমেইল করে বেড়াচ্ছে। কেউ বলল ডাক্তারদের ওপর পাবলিকের এইরকম প্রতিশোধমূলক মানসিকতার জন্যই চিকিৎসার খরচ হু হু করে বাড়ছে, এরপর সর্দি বা পেটখারাপ হলেও রোগীর হাতে গায়ে হাত লাগানোর আগে সিটি স্ক্যান করানো হবে।

    কিন্তু এইসব প্রতিবাদের আড়ালে একটা বেশ চড়া ফিসফিসও শোনা যেতে লাগল নানা জায়গায়। লোকে বলল ক্ষমতা আর সুযোগ একজায়গায় হলে যৌন হয়রানির পরিবেশ তৈরি হয়, ডাক্তাররা কেন ব্যতিক্রম হবেন! সব জেনেশুনে ডাক্তারবাবু ফিমেল অ্যাটেন্ডেন্ট ছাড়া মহিলা পেশেন্টকে দেখলেনই বা কেন? ফেমিনিস্টরা বললেন যে কড়া আইন ছাড়া ভারতীয় পুরুষদের ধর্ষকামীতা রোগ সারাবার কোনও দাওয়াই নেই। এক্ষেত্রে সব ঘটনা না জেনে মেয়েটিকে যা নয় তাই বলা হচ্ছে, হামেশাই এইরকম হয় বল মেয়েরা বাধ্য হয়ে অত্যাচার সহ্য করে। আবার অনেকেই বলল যে এই বিশেষ ঘটনাটা বাড়াবাড়ি হয়েছে ঠিকই তবে ডাক্তারবাবুরা তাঁদের নিজেদের দোষেই পাবলিকের সহানুভূতি হারিয়েছেন আজকাল।

    শুভেন্দু অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জামিন পেয়েছেন, উনি আপাতত বাড়িতে, কিন্তু শরির, মন দু’দিক দিয়েই রীতিমত জখম অবস্থায়। পইপই করে বারণ করা সত্ত্বেও সুপ্রিয়া সব কথা মেয়েকে খুলে বলেছেন।

    ‘মেয়ে বড় হয়েছে ওর কাছে এখন আর কিছুই লুকোতে পারব না।’ সুপ্রিয়ার সাফ কথা, ‘তোমার এই লুকিয়ে রাখার টেন্ডেন্সি থেকেই এত বড় একটা বিপদ হল।’

    ‘এ অনেকটা কাশ্মীর সমস্যার মতন।’ বিড়বিড় করে বললেন শুভেন্দু, ‘অশান্তি কমানোর জন্য আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া, আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অশান্তি।’

    সুপু আর সুমি দুজনেই এখন বাইরে, উকিলের অফিসেই হবে হয়তো। মা আর মেয়ে এই বিপদে শক্ত হাতে হাল ধরেছে, শুভেন্দুই বরং ধসে গেছেন এক্কেবারে। গভীর একটা অবসাদের মধ্যে ওঁর দিনগুলো কাটছে। কেউ ওঁকে ভুলেও একটা শক্ত কথা বলছে না, শুশ্রূষা চলছে ঘড়ির কাঁটা মেনে, কিন্তু সবকিছুই যেন সুপার মার্কেট থেকে আনা ঠান্ডা খাবারের প্যাকেট। এমনকী সুমিও একবারের জন্যেও সোজাসুজি ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি, ঘটনাটা নিয়ে সবরকম আলোচনা এড়িয়ে গেছে। এখন ওসব কথা বলে উত্তেজনা বাড়িয়ে নাকি লাভ নেই। মেয়ের মুখে সেই পুরনো ঝলমলে হাসিটা এক পলকের জন্যেও দেখেননি শুভেন্দু, তার জায়গা নিয়ে বসেছে এক অদ্ভুত অচেনা দুর্বোধ্যতা। শুভেন্দু অনেকবার বিষয়টাকে তরল করে দিতে চেয়েছেন। আজকাল মহিলাদের যখন তখন সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের ইস্যু তুলে বাড়াবাড়ি করার কথা উঠেছিল একবার। সেই মুহূর্তে সুমি খর দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল বাবার দিকে।

    ‘হোয়াট ডু ইউ নো অ্যাবাউট সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, বাবা? এভার ফেসড ইট? আস্ক মি, আই ডিড।’

    ব্যস, বোমাটা ফেলে দিয়েই আলোচনার শেষ। ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সুমি।

    ফোনটা বাজছে। যান্ত্রিকভাবে তুলে হ্যালো বললেন শুভেন্দু। অরুণার ফোন।

    ‘স্যার আপনি ভাল আছেন তো? আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই স্যার। আপনি এত বড় একটা উপকার করলেন। আমি বুঝতে পারিনি। আমি যে কী করে—’

    অন্যমনস্ক না থাকলে শুভেন্দু বুঝতেন যে অরুণা কাঁদছে।

    ‘পুরো টাকাটাই আপনি মাপ করে দিয়েছেন। আমি জানতাম না। আমার ফ্যামিলিটা পথে বসার হাত থেকে বাঁচল। আর আমি? আমার অপরাধের শেষ নেই স্যার, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’ কান্নার মধ্যে বাকি কথাগুলো ডুবে গেল।

    ব্যাপারটা বুঝতে পেরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন শুভেন্দু। অরুণার স্বামী সুজিত যে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি ছিল, শুভেন্দুরা শুধু সেখানকার ডাক্তার নন, পার্টনারও। টাকাপয়সার ব্যাপারটা অবশ্য সুপ্রিয়াই দেখাশুনো করেন। কেমোথেরাপি দেবার পরে সেপসিস হয়ে গেছিল সুজিতের, ভর্তি থাকতে হয়েছিল প্রায় দু’সপ্তাহ। বিরাট অঙ্কের একটা বিল হাতে নিয়ে সেদিন ওঁর কাছে হাজির হয়েছিল অরুণা।

    ‘স্যার আপনি কি কিছু করতে পারবেন? সেভিংসের পুরোটাই চলে যাবে না হলে। কিছুটা মাপ করে দিলে নাহয় বাকিটা আস্তে আস্তে শোধ করে দেব।’

    অস্বস্তি বোধ করেছিলেন শুভেন্দু। প্রিয়জনের চিকিৎসায় মানুষ সবসময় তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত খরচ করার চেষ্টা করে কেন? ওই সময়টায় সবাই অযৌক্তিক আর বেপরোয়া হয়ে ওঠে, ভাগ্যের সঙ্গে জুয়াখেলায় নামতে চায়। কাঠখোট্টা তথ্য আর বিজ্ঞানের বদলে যাদুকর আর ফেরিওয়ালাদের বানানো একটা বিশ্বাসের রাজত্বে বাস করতে চায় তারা তখন। শুভেন্দু অপেক্ষাকৃত সস্তা একটা হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু তখন অরুণা জেদ ধরল ও নতুন হাসপাতালেই সুজিতকে ভর্তি করবে।

    মানুষের মধ্যে বসা থাকা এই আশঙ্কিত জুয়াড়িকে নিয়েই কি হেলথ ইন্ডাস্ট্রির কারবার নয়? মনে মনে ভেবেছিলেন শুভেন্দু। আমরাও সামনে এই আগুনে হাওয়া দিয়ে চলেছি, সারা পৃথিবীতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে চিকিৎসার খরচ। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণ, নৈরাশ্য, ক্লান্তি আর ক্রোধ। জীবনের মুহূর্তগুলো বেড়ে চলেছে রম্যতায় নয়, আশা আনন্দ বা উপলব্ধিতে নয়, ভিখারির থালায় ছুড়ে দেওয়া অচল পয়সার মতন বেড়ে চলেছে শুধুই সংখ্যায়।

    কাগজপত্রগুলো নিয়ে অরুণার দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছিলেন শুভেন্দু। সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য আর যৌবনের উত্তাপে উজ্জ্বল এক নারী। একহাতে চেয়ারের ওপর ভর দেওয়ার অসহায় ভঙ্গি আর দু’চোখের বিহ্বল দৃষ্টি যেন ওর আকর্ষণীয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আচ্ছা, ভালনারেবিলিটি কথাটার বাংলা কী? ভরদুপুরে কাজের সময় মগজে এইসব বিদ্ঘুটে চিন্তার ঘোড়দৌড় কেমন যেন অস্বস্তিকর। অকারণেই রাগ হয়ে গেল শুভেন্দুর, উনি জানেন আইন মেনে এই বিলটা মকুব করা যাবে না, সুপ্রিয়া এই সব ব্যাপারে খুব কড়া।

    ‘তোমাকে তো বলেছিলাম ওকে এই হাসপাতালে ভর্তি কোরো না। আমাদের এটা নতুন ভেঞ্চার, এখন এই সব ইররেগুলারিটি একেবারেই সম্ভব নয়। ডাক্তারের ফি আর ওষুধের দাম বাদ দিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু বেড চার্জটা তোমাদের দিতে হবে।’ নিজের গলার বিরক্তির পরিমাণোটা দেখে নিজেই একটু অবাক হয়ে গেছিলেন শুভেন্দু। ‘স্যার, বেড চার্জই এক লাখের ওপর। আমি বলেছিলাম আই-সি-ইউতে অতদিন থাকার দরকার নেই আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, জেনারেল বেডে দিয়ে দিন, কিন্তু ওঁরা শুনলেন না। তাছাড়া এত ল্যাবরেটরি চার্জ, এতগুলো স্ক্যান।’

    ‘আশ্চর্য, তুমি কি আমাকে ডাক্তারিও শেখাবে ঠিক করেছ! যা প্রয়োজন তাই তো করতে হবে, তোমার ক্ষেত্রে সেটা অন্যরকম কী করে হবে? তাছাড়া তুমি তো পাশাপাশি চাকরিও চালিয়ে যাচ্ছ, সারাদিন রোগীর পাশে বসে থাকার সময় আছে তোমার?’ শুভেন্দু রাগ দেখাচ্ছেন আর ওঁর মনের মধ্যে একটা আদ্যিকালের ঝোলানো খাঁচায় বুড়ো পাখিটা ছটফট করছে। হয়তো মৃত্যুর আগে ও একবার খোলা আকাশে উড়তে চায়।

    অরুণা এবার বিপজ্জনকভাবে কাছে এগিয়ে এল। মেয়েটা কি পায়ে ধরবে নাকি? ওর চোখমুখের চেহারা কেমন যেন অস্বাভাবিক, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে মানুষ এইভাবে তাকাতে পারে না।

    ‘স্যার আমার ছেলেটা আছে, ওর ভবিষ্যতের কথা আমাকে ভাবতে হবে। এই টাকাটা চলে গেলে আমার সেভিংস বলে একটা পয়সাও থাকবে না। আপনি জানেন ও রিল্যাপ্স করেছে, সেরে ওঠার আশা নেই বললেই হয়। কিন্তু যতদিন আছে আমি তো ওকে ফেলে দিতে পারব না। আমি যেভাবে পারি এই টাকা শোধ করে দেব। শুধু এই মুহূর্তে একটু সাহায্য চাইছি।’

    এখনও মনের মধ্যে ভালনারেবিলিটি কথাটার বাংলা খুঁজে চলেছেন শুভেন্দু, ওঁর চোখের সামনে কতগুলো অদ্ভুত জ্যামিতিক রেখা। মেয়েদের শরীরে এই বিদ্রোহী রেখাগুলি কোথা থেকে এল কী জানে? অবশ্যই এগুলো দয়াময় ঈশ্বরের ঈপ্সিত ছিল না, তাঁরই কোনও অবাধ্য দেবদূত অসীম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে নিবিড়তম ভালোবাসা মিশিয়ে ওগুলো খোদাই করে দিয়েছিল আদিম প্রোটোপ্লাজমের অন্তরাত্মায়। সেই থেকে গণ্ডগোল লেগেই আছে।

    ‘সরি অরুণা আমার পক্ষে এই মুহূর্তে কিছু কমিট করা সম্ভব নয়।’ অস্বভাবিক গলায় কথাগুলো বলে উঠে চলে গিয়েছিলেন শুভেন্দু সেদিন।

    কিন্তু অরুণা আজকে এসব কী বলছে? সেদিনের ঘটনাটার সঙ্গে ওর সময়ের আগে ছুটি নেওয়ার সম্পর্কটা তো নেহাতই কাকতালীয়। তাহলে ও নিজেকে এতখানি দায়ী করছে কীভাবে?

    ‘স্যার শুনতে পাচ্ছেন? আমি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম। আমি অপরাধী। আমাকে ক্ষমা করুন স্যার।’

    শুভেন্দু ফোন রেখে দিয়েছেন সুতরাং উনি আপাতত কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। সেদিন উনি যে কেন অ্যাকাউন্টেন্ট দে সাহেবকে ডেকে ওই চার্জগুলো ডিলিট করেছিলেন তা উনি নিজেও ঠিক জানেন না। ধরা যে পড়বেনই এ বিষয়েও ওঁর কোনওই সন্দেহ ছিল না। ওঁর মনে পড়ে যাচ্ছিল টলস্টয়ের একটা ছোটগল্পের প্রথম লাইন। গল্পটার নাম ক্রয়েৎজার সোনাটা, যদিও লাইনটা বাইবেল থেকে নেওয়া।

    ‘But I say to you that everyone who looks at a woman with lustful intent has already committed adultery with her in his heart (Matthew 5:28)

     

    ফুটপাথে পুজোর ভিড় ফেটে পড়েছে, গাড়িদেরও শুঁয়োপোকার গতি। সুমি এতক্ষণ তন্ময় হয়ে রাস্তা দেখছিল, হঠাৎ একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে পিছিয়ে বসল সিটের ওপর। ললিত পাশে বসেই নাক ডাকাচ্ছে কিন্তু সুমির বাঁহাতটা ওর মুঠোর মধ্যে ধরা। নিজের অজান্তেই হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েছে সুমি।

    ‘কী হয়েছে?’ হাই তুলে উঠে বসল ললিত। হতচ্ছাড়া জেট ল্যাগ কখন এসে হাজির হয় ঠিক নেই।

    ‘না না তুমি ঘুমোও। সামনের ওই মোটর সাইকেলের লোকটা এমন অসভ্য ভঙ্গি করল!’ সুমি সামলে নিয়েছে।

    ‘তাই নাকি? নজরুল ভাই উসকো পিছা কর!’

    ‘কেন? পিছা করে কী করবে?’ সুমি অবাক, নজরুল কিন্তু বিনা বাক্যব্যয়ে মোটর বাইকের পিছু নিয়েছে।

    ‘কেন, ওকে বাইক থেকে নামিয়ে মারব! এত বড় সাহস যে তোমার সঙ্গে অসভ্যতা করে!’ ললিত বেশ শান্ত গলায় বলল। ললিত হরিয়ানার ছেলে, তার ওপর আমেরিকান ফুটবল খেলে বড় হয়েছে। ছয় ফুট লম্বা নিয়মিত জিমে যাওয়া পেটানো চেহারা, বাইক আরোহীটিকে ও অনায়াসেই ধোলাই দিতে পারে।

    ‘আর ইউ ক্রেইজি! এমনিতেই বিপদের শেষ নেই তুমি তার মধ্যে কলকাতার রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে মস্তানি করতে চাও! নজরুলদা প্লিজ ওর কথা শুনো না, বাড়ি চল।’ সুমি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠেছে।

    ‘না মানে গতবার গোয়াতে সেই আধপাগলা লোকটা তোমার হাত ধরেছিল বলে তুমি পুরো হাফ ডে রাগ করে ছিল তাই ভাবলাম এবার আগেভাগেই পিটিয়ে দিই।’ ললিত সিরিয়াস গলায় বলল। যারা ওকে চেনে তারা ওর এইরকম উৎকট সেন্স অফ হিউমারের সঙ্গে ভালই পরিচিত। হাসি আর রাগ একসঙ্গে পেয়ে গেল সুমির, জোরে জোরে চিমটি কাটতে শুরু করল ললিতের হাতে। ওকে ব্যথা দিতে গেলে চিমটি বা কামড় ছাড়া উপায় নেই, মারলে খামোকা নিজের হাতেই লাগবে।

    ‘ইয়ার্কি মারা হচ্ছে! আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারো না ইনসেন্সিটিভ ব্রুট কোথাকার!’

    ‘কী মুশকিল! তোমরা কখন কী চাও তাই তো বোঝা মুশকিল। সেবার যখন বলেছিলাম যেতে দাও লোকটা পাগল হলেও মানুষ তো, তোমায় দেখে একটু মাথা ঘুরে গেছিল। তুমি সাপের মতন ফোঁস করে বললে বউয়ের বেইজ্জতি দেখে যারা সঙের মতন দাঁড়িয়ে থাকে তারা দিনরাত্তির লোহা ভেঁজে সময় নষ্ট করে কেন?’

    ‘ঠিকই তো বলেছিলাম।’ হেসে বলল সুমি।

    ‘তাহলেই দেখ। তুমি এমন ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রফেশন্যাল মেয়ে, পুরুষের চেয়ে কোনও অংশে কম যাও না। অথচ কোথাকার একটা স্টুপিড বাইকওয়ালা এক লহমায় তোমার শান্তি নষ্ট করে দিতে পারে।’

    ‘কেন তোমরা মেয়েদের অপমান না করে পারো না? তোমরা ছেলেরা একসাথে হওয়া মানেই সেক্সুয়ালি এক্সপ্লিসিট জোকস, সেইগুলোই সোশ্যাল মিডিয়ার অর্ধেক জুড়ে আছে, আর বাকি অর্ধেক বিবাহিত পুরুষের দীর্ঘশ্বাস। আহা, বিয়ে করে কী ভুলটাই হয়ে আছে, এখন থেকে একটা মেয়ের কথা শুনে চলতে হবে বাকি জীবন। অসহ্য! আমি মাঝে মাঝে ভাবি ছেলেরা কি ন্যাচারালি রেপিস্ট?’

    ‘একশো বার। আর মেয়েরা ন্যাচারালি সাইরেন। এক কাজ কর,মেক আপ আর্টিস্ট ডেকে কয়েকদিন ওই সুন্দর মুখটা কুচ্ছিত বানিয়ে ক্যাম্পাসে যেতে শুরু কর। লোকে মুখ ঘুরিয়ে নিলে কেমন লাগে দেখ। অবশ্য কোমরে একটা তোয়ালেও জড়িয়ে নিতে হবে কারণ তুমি পেছন থেকেও বেজায় অ্যাট্রাক্টিভ।’ গম্ভীর গলায় ললিত বলল, কিন্তু পুরো কথা শেষ করবার আগেই ওর হাতের ওপর আবার প্রাণপণে চিমটি কেটে ধরেছে সুমি।

    ‘হ্যাভ সাম মিনিমাম সেন্স ললিত। এখানে আরেকজন মানুষ আছে যে আমায় কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে।’

    ‘ইয়ার্কি নয়, ভাল করে ভেবে দেখো এই জেনারেশনের মেয়েদের মধ্যে একটা অ্যাম্বিভ্যালেন্স আছে। গতবার তোমাদের বেঙ্গলি ক্লাবের প্রোগ্রামে টেগোরের সেই ড্যান্স ড্রামাটা করেছিলে না! ওই মণিপুরি প্রিন্সেসের অবস্থা তোমাদের সবার। সেটা কারও দোষ না, আইডিয়া যত তাড়াতাড়ি বদলে যায়, মানুষের স্বভাব তত তাড়াতাড়ি বদলায় না। অবশ্য আমি আর কী বুঝি! আমি তো একটা মাথামোটা, মিসোগাইনিস্ট জাঠের বাচ্চা।’

    ললিত একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনমিক্সের অধ্যাপক, কাজেই শেষ কথাটা ব্যঙ্গ না বিনয় বোঝা কঠিন। সুমি এবার খামচানো বন্ধ করে প্রায় অজান্তেই জায়গাটায় হাত বুলিয়ে দিল। ইস, লাল হয়ে গেছে, ছড়েও গেছে একটু, তবু বসে বসে হাসছে ছেলেটা।

    ‘নজরুলদা, কোথাও একটা দাঁড় করাবে। একটুখানি হাঁটব।’

    ‘জরুর দিদিমণি। এইখানে তুমি আর সাহেব হর রবিবার দৌড়াতে আসতে।’ নজরুল খুব খুশি হয়েছে মনে হল। জায়গাটা রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়াম, এখন বিকেলের আলোয় হাজার মানুষের আনাগোনায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। পুজোর আগে দিদি এসেছে তাও বাড়িতে কারও মুখে হাসি নেই, এটা নজরুল আর সহ্য করতে পারছে না।

    ওরা নিঃশব্দে হেঁটে চলল প্রায় দশ মিনিট। ললিত জানে কখন চুপ করে থাকতে হয়।

    ‘লেগেছে?’

    ‘একটু জ্বালা করছে। হট অ্যান্ড সুইট।’

    ‘সরি। রাগ হয়ে গেছিল।’

    ‘ভাগ্যিস। ক’দিন এমন ডিপ্রেসড ছিলে যে আমার সঙ্গে ঝগড়া করতেও ভুলে গেছিলে।’

    হঠাৎ প্রায় শব্দ করে কেঁদে উঠল সুমি।

    ‘ললিত ইজ ইট অ্যাট অল পসিবল যে বাবা! আমার বাবা?’

    ‘না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওঁকে ফাঁসানো হয়েছে। আমি দিল্লির ছেলে, এসব ব্যাপারে আমার ভুল হয় না।’ ললিত স্পষ্ট গলায় বলল, ‘আমার অবশ্য কয়েকটা অবজার্ভেশান আছে।’

    ‘কী অবজার্ভেশান?’ চোখ মুছে একদৃষ্টিতে ললিতের দিকে তাকিয়ে আছে সুমি। ওর মুখে বিপন্নতার মেঘের ওপর ভরসার আলো।

    ‘এক নম্বর, তোমার বাবার সেন্স অফ এনটাইটেলমেন্ট। দুই নম্বর ওঁর কথাবার্তায় একটা ইভেসিভ প্যাটার্ন। আমার মনে হয় এই দুটো জিনিস ওঁর বিপদ বাড়াতে পারে, নাহলে এটা একেবারেই ফালতু কেস।’

    ‘একটু বুঝিয়ে বলবে প্রফেসর সাহেব?’

    ‘উনি মনে করেন কলকাতা শহরের একজন বড় ডাক্তার হিসেবে ওঁর প্রাপ্য সুবিধাগুলো কোনওদিন বদলাতে পারে না, পেশাদারি ব্যবহারের যে চেহারাটা উনি চেনেন, সেটা একদম পাথরে খোদাই করা। পরিবর্তন ওঁর কাছে একটা নোংরা শব্দ। রোগীদের কাছেও উনি একইরকম ব্যবহার আশা করেন। নিজের কাজের জন্য কারও কাছে কৈফিয়ত দেওয়া উনি এড়িয়ে চলতে চান, বিশেষ করে তোমার মায়ের কাছে। নেহাত চাপে পড়লে একটা ভাসা ভাসা অর্ধসত্য হাজির করেন, যা অনেক সময় হাস্যকর। এটা আমি বিয়ের সময় থেকেই লক্ষ করছি। প্রতিদিনের জীবনে এটা কিউট হতে পারে, কিন্তু আইনের চোখে এর নাম মিথ্যাচার। আমার মনে হয় না তুমি ছাড়া এই কথাগুলো ওঁকে কেউ বোঝাতে পারবে।’

    ‘আমি কিছুতেই বাবার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পারছি না ললিত। বাবার চোখের দিকেই তাকাতে পারছি না।’ সুমির চোখ আবার ছলছল করে উঠেছে।

    ‘তোমার মনে হচ্ছে তুমি মন্দিরে জুতো পরে ঢুকে পড়েছ। কিন্তু পবিত্রতা একটা রিলেটিভ কথা সুমি, আমরা সকলেই কোনও না কোনও দিক থেকে অপবিত্র। মানুষের অপরাধপ্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করাই সমাজের উদ্দেশ্য, কিন্তু সমাজ থাকলে অপরাধ ঘটবেই। ধরে নাও আমার খুব খিদে পেয়েছে, তোমার হাতে একটা পাকা ফল আছে, যেটা আমি খেতে চাই কিন্তু তোমার দেবার ইচ্ছা নেই। এক্ষেত্রে আমি লোভ সংবরণ করে চলে যেতে পারি, ভদ্রভাবে চাইতে পারি, অন্য কিছুর সঙ্গে ফলটা বদলাবদলি করার প্রস্তাব দিতে পারি অথবা জোর করে ফলটা কেড়ে নিতে পারি। এই সবগুলোই সময়বিশেষে লজিক্যাল আচরণ, যদিও তাদের রিঅ্যাকশনগুলো আলাদা, সমাজ সেখানে নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। যে সমাজে ডিসিপ্লিন যত বেশি, সেখানে অপরাধের চেহারা ততই সূক্ষ্ম। ক্রুড অপরাধ দেখলে আমরা শিউরে উঠি, সূক্ষ্ম অপরাধ দেখেও দেখি না। সত্যি কথাটা এই যে ক্রাইম ইজ আ বাই প্রডাক্ট অফ কনশাসনেস, অপরাধ জিনিসটা মানুষেরই স্বভাব তাই অপরাধীও অমানুষ নয়। বাবার সঙ্গে কথা বল সুমি।’

    ‘বলব।’ নরম গলায় বলল সমর্পিতা, ‘আমার একটা কনফেশন আছে, জানো! প্রায় ভুলেই গেছিলাম, এই ঘটনার পরে আবার নতুন করে ডিস্টার্ব করতে শুরু করেছে। শুনবে?’

    ওরা এবার একটা বেঞ্চির ওপর বসে পড়েছে। একটু দূরে জলের ওপর ঝুঁকে থাকা এই গাছটা সুমির ছোটবেলা থেকে চেনা। এত বছর ধরে ও একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, চুপ করে শুনে যাচ্ছে কোটি হৃদয়ের গুঞ্জন। পরের জন্মে নির্ঘাত মহাকবি হবে ব্যাটা।

    ‘বাবার মাস্টারমশাই ছিলেন এই শহরের এক বিখ্যাত ফিজিশিয়ান, সবাই তাঁকে এখনও একডাকে চেনে। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে বাবা যখন প্র্যাকটিস শুরু করেছে সেই সময় খুব সাহায্য করেছিলেন উনি। শুধু পেশেন্ট পাঠানোই নয়, ক্লাবে আর পার্টিতে নিয়ে যাওয়া, লোকের সঙ্গে পরিচয় করানো, এই সবেতেই ওনার হাত ছিল। দিনের বেলা উনি খুব মৃদুভাষী আর সজ্জন মানুষ, শুধু বাবা নয়, আরও অনেককে অনেকভাবে সাহায্য করতেন। সন্ধ্যাবেলা কয়েক পেগ পেটে গেলে তখন একেবারে আলাদা মানুষ। সেই ভদ্রলোক একদিন কলকাতার এইক বিখ্যাত ক্লাবে কী একটা পার্টি চলার সময় বিচ্ছিরিভাবে আমার গায়ে হাত দিলেন, আমার বয়েস তখন তের। সপ্তাহখানেক পরে আরেকটা সুযোগে হয়তো উনি পরের ধাপটায় যাবার চেষ্টা করতেন, কিন্তু কপালগুণে মা সেদিন সজাগ ছিল। মা নির্ঘাত আগের দিনই বুঝতে পেরেছিল চক্করটা, তাই সেই থেকেই চোখে চোখে রেখেছিল আমাকে।’

    ‘চেনা গল্প। প্রিভিলেজের সুযোগ নিয়ে প্রেডেশন।’ সুমির হাতটা নিজের হাতের মধ্যে আস্তে আস্তে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে ললিত। মাংসল আর কঠিন পুরুষালি হাত অথচ কী অসম্ভব স্নেহময়, অনেকটা ওর নামের মতন। ‘মনে আছে বাবা আর মায়ের মধ্যে তুলকালাম ঝগড়া হয়েছিল এই নিয়ে। মা ওই লোকটার সঙ্গে সমস্ত রকমের সম্পর্ক এককথায় বন্ধ করে দিতে বলেছিল। বাবা বোধহয় মিনমিন করেছিল একটু, তার উত্তরে মা একটা কথা বলেছিল, ইন ফ্যাক্ট শী কোটেড সামওয়ান ইউ মেন। ইউ ফিলথি ডার্টি পিগস। ইউ আর অল দি সেম। অল অফ ইউ। পিগস পিগস!’

    ‘সমারসেট মম।’ ললিত গজগজে গলায় বলল, ‘কে জানে ওই থেকেই তোমরা পুরুষজাতি আর শূকরজাতিকে একসাথে মিলিয়ে এম-সি-পি বলতে শুরু করেছ কিনা।’

    ‘কথাটা শুনে রক্ত হিম হয়ে গেছিল সেই ছোটবেলায়, অনেকদিন অবধি তার জের চলেছিল। আজ এতদিন বাদে আমি যখন নিজেকে সত্যিই বেশ সিকিওরড আর কনফিডেন্ট মনে করতে শুরু করেছিলাম ঠিক তখনই, এই কাণ্ডটার পরে সেই ভয়টা আবার মাথার মধ্যে ফণা তুলছে।’ সুমির মনে হল কথাটা বেরিয়ে গিয়ে একদম হালকা হয়ে গেল বুকের ভেতরটা।

    ‘এটা স্টিরিওটাইপিং সুমি। ছেলেরা ধর্ষক, মেয়েরা ভিকটিম, বাঙালিরা কবি, গুজরাতিরা ব্যবসায়ী, মুসলমানরা সন্ত্রাসবাদী, আমেরিকানরা যুদ্ধবাজ, পাঞ্জাবিরা বোকা— এইরকম চিন্তা থেকেই বিগট্রি তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের এইরকম একীকরণ করার স্বভাব বলেই পৃথিবীতে বিচারের নামে এতরকমের অবিচার চালু আছে। এইজন্য বাচ্চা ছেলেরা ফিদাইন হয়, মানুষের গলা কেটে তার ভিডিও ইউটিউবে পোস্ট করে। সবাই চটজলদি সুবিচারের খোঁজে চলেছে, ভুলে গেছে যে বিচার একটা ডায়ালেক্টিক্যাল পদ্ধতি, তার জন্য সময় লাগে। সব রকম স্টিরিওটাইপের মধ্যেই খানিকটা সত্যি আছে যা অনেকটা মিথ্যেকে আড়াল করে রাখে। মানুষ অতসব বাছাবাছির মধ্যে যেতে চায় না, ব্যক্তিকে খুঁজে না পেয়ে সমষ্টিকেই কাঠগড়ায় তোলে।’ ললিতের গলায় এবার বিরক্তির ছোঁয়া।

    ‘কিন্তু মেয়েদের যে যখন তখন হ্যারাসমেন্ট সহ্য করতে হয় এটা তো সত্যি। তার জন্য যে মানসিক ট্রমা হয় তার প্রতিকার কে করবে ললিত?’ সুমি চিন্তিত গলায় বলল। ভিতরে ভিতরে কিন্তু ওর মনের মেঘ কেটে যেতে শুরু করেছে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা প্রায় গোলপার্কে পৌঁছে গেছে, নজরুলকে বলেছে বাড়ি চলে যেতে। ওদের চারদিকে এখন ঘন হয়ে আসছে সন্ধ্যার কাকলি।

    ‘একমাত্র সময় সবকিছুর প্রতিকার করে। টাইম, দি ফোর্থ ডাইমেনশন! সময়কে একটু দাও সুমি, এত অধৈর্য হয়ো না। আমাদের প্রগতির সঙ্গে হাঁটতে হবে কিন্তু প্রগতিকে জোর করে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। ছেলে, মেয়ে, ব্রাহ্মণ, দলিত, সাদা, কালো, ডাক্তার, পেশেন্ট, এককালে যে যতই সুবিধা নিক আর যার ওপর যতই অবিচার হোক না কেন, চটজলদি টেবিল ঘুরিয়ে দিয়ে তার শোধ তোলা যাবে না। একদলের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে আরেক দলের অধিকার কেড়ে নেওয়া আমি সমর্থন করতে পারি না কারণ এইভাবে শুধু ঘৃণা আর ভ্রষ্টাচারই বাড়ে, রাষ্ট্রের হাতে জুলুম করার ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়। আমি চাই যে সমাজ দায়বদ্ধ হোক, সত্য সামনে আসুক, ক্ষমতাশালীর বিচার হোক কিন্তু সেই কাজগুলো শুধু পুলিশ লাগিয়ে হবে না। সবচেয়ে বড় কথা আমি অপরাধীকে শাস্তি দিয়েও মানুষকে ক্ষমা করতে চাই, কারণ আমি নিজেও কোনও না কোনও দিক থেকে অপরাধী।’

    সুমি চুপ করে থাকল এবার। ও দেখছে অতি ক্ষীণ একটা সোনালি আলোর রেখা গাছগাছালির মাথা থেকে কেমন করে মিলিয়ে যায়। ও এই মুহূর্তটার শান্তি আর সান্নিধ্য উপভোগ করবে এখন। বাড়িতে ফিরেই তো আবার সেই অদ্ভুত দম আটকানো পরিবেশ।

     

    বিকেলবেলার ম্যাজিক আলোটা অবশ্য এইখানে ঢুকতে পারে না। গলিটা একেবারে এঁদো আর ঘিঞ্জি, একতলা বাড়ি আর ঝুপড়ির পাশাপাশি বেমক্কা কতগুলো লম্বা লম্বা ফ্ল্যাট উঠে আরও যেন উৎকট আর মলিন দেখায়। একচিলতে ফটপাথের ওপর ডাঁই করা বালি, পাথরকুচি, আবর্জনা, তার মধ্যে দু’একজন সবজি আর মাছ বিক্রেতার নির্বিকার মুখ। লোকজন গাড়ি রিকশা সব একটাই এবড়োখেবড়ো রাস্তার মধ্য দিয়ে যে যার পথ বানিয়ে চলছে। বস্তি থেকে শহরতলির মাঝামাঝি কোথায় একটা যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেছে রূপান্তরকামী এই পাড়াটা। কলিং বেলটা বাজিয়েই অরুণার মনে হল মানুষের বদলে একটা বিশাল পোকা এসে দরজা খুলবে হয়তো।

    সেই মানুষটা এসে দরজা খুলল শেষ অবধি। বছর পঁয়ষট্টির ছোটখাটো চেহারার ময়লা রঙের মানুষ, একটানা অসুখ, অভাব আর বিরক্তির চাপে নুয়ে পড়েছে, অনেকটা পোকারই মতন।

    ‘কেমন আছেন কাকাবাবু?’ অরুণা ঢুকতে ঢুকতে বলল।

    ‘আমি তো ভালই আছি একরকম। প্রাপ্তির অবস্থাই দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। তোমার কাকিমাও ভাল নেই।’

    ‘আর আপনার শরীর? ওষুধগুলো পাচ্ছেন সময় মতো?’

    ‘নাঃ, মাঝে মাঝে বন্ধ যায়। বড্ড দাম, পেরে উঠি না।’ ভদ্রলোক নিরাসক্ত গলায় বললেন, ‘তুমি ওঘরে গিয়ে বোসো, আমি বরং একটু চা বানাই।’

    ‘ব্যস্ত হবেন না কাকাবাবু, চা আমি করে নেব। আপনি বরং এই স্যাম্পেলগুলো রেখে দিন।’ অরুণা ব্যাগ থেকে কতগুলো ওষুধের প্যাকেট বের করেছে এবার। প্যাকেটগুলো বেশ সুন্দর দেখতে, ওষুধ না প্রসাধনদ্রব্য বোঝার উপায় নেই।

    কাকাবাবু ওরফে বিধান সামন্ত তাকিয়েও দেখলেন না কিন্তু পাশের ঘর থেকে ওঁর স্ত্রী মালিনী খুব আগ্রহের সঙ্গে বেরিয়ে এসে ওষুধগুলো তুলে নিলেন। বিধানবাবুকে বাঁচিয়ে রাখাই মালিনীর দিবারাত্রির কাব্য। অল্পবয়েস থেকেই ভদ্রলোক একটা বিরক্তিকর এবং দুরারোগ্য পেটের অসুখে ভুগছেন যার ডাক্তারি নাম ক্রোনস ডিজিজ। গোটাতিনেক সার্জারি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে, তার ওপর এখন পিঠার আর্থারাইটিসের ব্যথায় সারাদিনই কাতর। সিগারেট খাওয়ার জন্য লাংসদুটি গেছে, তার ওপর ডায়াবেটিস। একটা প্রাইভেট কম্পানির অফিসে কেরানির কাজ করতেন, স্বাস্থ্যের কারণে আর্লি রিয়াটারমেন্ট নিতে হয়েছে। ঘর থেকে বাইরে বেরোলেই বিধানবাবুর হয় পেটের যন্ত্রণা নয় হাঁপানি বাড়ে, তাই গত দশ বছর ধরে ওঁর স্ত্রী মালিনী বাড়িটাকেই হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছেন। উনি ছাড়া এই বাড়ির বাকি দুই বাসিন্দা সেই হাসপাতালে পাকাপাকি ভর্তি থাকে, মালিনী তাদের ডাক্তার, নার্স এবং ফার্মাসিস্ট। সীমিত উপার্জনের মধ্যে এই হাসপাতাল চালু রাখতে গিয়ে মালিনী ধীরে ধীরে বদলে গেছেন, এখন স্বাভাবিক জীবনটা ওঁর কাছে ভীতিকর ও অনাবশ্যক। অরুণ জানে, ক্রনিক অসুস্থতা এভাবেই কিছু কিছু মানুষের পুরো অস্তিত্বটাকে অধিকার করে বসে।

    ওদের একমাত্র মেয়ের নাম প্রাপ্তি, অরুণার বাল্য বান্ধবী। প্রাপ্তি ছিল ওদের ক্লাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয়া মেয়েদের মধ্যে একজন, কিন্তু ওর স্বভাবের জন্য অনেকেই ওকে এড়িয়ে চলত। ছোটবেলা থেকেই ও সাংঘাতিক মুডি, এই উৎসাহেই টগবগ করছে তো এই ভিজে ন্যাতার মতন অবসন্ন। অনেকে ভাবত এইসব ওর বাবার অসুখের জন্য কিন্তু বারো ক্লাস নাগাদ ওর উপসর্গগুলো বদলে যেতে শুরু করল। ও নাকি অচেনা গলায় কথা শুনতে পেত, তারা ওকে ভয় দেখাত, নানা রকম অদ্ভুত পরামর্শ দিত। একদিন বিনা প্ররোচনায় ও ক্লাসের একটি ছেলেকে পেন্সিল কাটা ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে বসল। বেশ ভালই জখম হয়েছিল ছেলেটি, সেখান থেকে থানা পুলিশ, মেন্টাল হাসপাতাল, শেষ অবধি পড়াশুনা বন্ধ। একগাদা ওষুধ খেয়ে সারাদিন এই ঘরটায় বসে ঝিমোত মেয়েটা।

    একমাত্র অরুণাই ছিল ওর প্রাণের বন্ধু। বন্ধু বললে কম বলা হবে, সারাক্ষণ অরুণাকে এমনি আঁকড়ে থাকত মেয়েটা, যে এক এক সময় ও হাঁপিয়ে উঠত।

    ‘আচ্ছা, তুই এমন করিস কেন? এই জন্য তো কেউ আমাদের দুজনের কাছে ঘেঁষে না, হাসাহাসি করে। আমার অন্য বন্ধু হলে আমি কি তোকে কম ভালবাসব?’ অরুণা বলত।

    ‘ওরা তোকে আমার কাছ থেকে নিয়ে নেবে। আমি তো পাগল, আমার একা থাকাই নিয়ম।’ ব্যথাহত গলায় বলত প্রাপ্তি, ওর টানা টানা চোখগুলোর মধ্যে একটা অস্বাভাবিক বিষণ্ণতা ভেসে বেড়াত। সব রাগ গলে যেত অরুণার, সহানুভূতির একটা ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যেত ওর আশঙ্কা আর অভিমান। একটু বাদেই আবার ওদের একসঙ্গে ফুচকা খেতে দেখা যেত।

    ‘আচ্ছা শোন, আমার যদি কোনও ছেলেকে খুব পছন্দ হয়ে যায়? মানে এখনও হয়নি, কিন্তু যদি হয় তাহলে তুই তো আমাকে বিয়ে করতে দিবি না নাকি?’ বলেছিল অরুণা।

    ‘ছেলেদের বিশ্বাস করিস না অরু। ওরা শুধু একটাই জিনিস চায়।’ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলত প্রাপ্তি।

    এইসব পুরনো কথা ভাবতে ভাবতেই ঘরে ঢুকল অরুণা। দেওয়ালের কাছাকাছি একটা কোণায় বিছানার ওপরে উবু হয়ে বসে আছে প্রাপ্তি। ওর লক্ষ্যহীন দৃষ্টি চামচিকের মতন সিলিং ফ্যানের চারদিকে ঘুরছে।

    ‘কেমন আছিস?’ নরম গলায় বলল অরুণা।

    ‘ভাল না। ওরা সবসময় আমাকে শাসাচ্ছে। তুই আমাকে ছেড়ে যাবি, তুই কোনওদিন আমার মুখ দেখবি না অরু।’

    ‘আমি কি তাই বলেছি?’ ওর পাশে একটু জায়গা করে বসল অরুণা।

    ‘তাহলে কেন আমাকে হাসপাতালে পাঠাচ্ছিস? জানিস না ওরা রোজ আমাকে নিয়ে কী করে? তোর কি আমার ওপর একটু সহানুভূতিও হয় না অরু?’

    ‘এটা অন্য হাসপাতাল, তোকে ওরা খুব যত্ন করবে। তুই অসুস্থ প্রাপ্তি, তোর চিকিৎসা দরকার। আমি রোজ গিয়ে তোকে দেখে আসব।’

    ‘অফকোর্স তুই আমাকে তাড়াতে পারলে বাঁচবি অরু। তোর কত রকমেরই না ক্ষতি করেছি। আমার জন্য তোর বরের অসুখ হয়েছে, চাকরি গেছে, আরও কী বিপদ হবে ভগবান জানেন। আমি আর এখানে থাকব না কিন্তু হাসপাতালেও যাব না। মরে গেলেই তো সব চেয়ে ভাল হয় কিন্তু তোরা তো আমাকে মরতে দিবি না। মা সারাদিন পাহারা দিয়ে রাখে। আমি জানি মারা যেতে একটুও ব্যথা লাগে না। বাবা আর মা দুজনেই বাঁচবে, তুই তো বাঁচবিই। দেখবি তোর বরের ক্যানসারও সেরে যাবে।’

    ঘরটার মধ্যে আলো ঢোকে না, টিউবলাইটের শীতল আর ফ্যাকাশে আলোর মধ্যে মেয়েটাকে প্রেতিনীর মতন দেখাচ্ছে। ওর একটানা বিড়বিড় করে কথা বলার সঙ্গে হাত আর মুখের মাংসপেশিগুলো নিজের মতন নেচে চলেছে, চোখের দৃষ্টিতে অতলান্ত বিষাদ।

    ‘তোর কিচ্ছু হবে না। আমি তোর ওপর একটুও রাগ করিনি। তুই সবসময় আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে বিপদে পড়িস, আমাকেও বিপদে ফেলিস। বড্ড ভালবাসিস যে আমাকে। আমি জানি না ভাবছিস!’

    দুই হাতে ওকে জড়িয়ে ধরেছে অরুণা। ওর কাঁধের ওপর দিয়ে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। দরজায় চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে মালিনীও এখন অশ্রুমুখী।

    ‘ভীষণ ভালবাসি তোকে। সব কিছুর চেয়ে বেশি ভালবাসি। তোকে এত ভাল না বাসলে কবে মরে যেতাম!’ আরও কয়েকঘণ্টা বসে যেতে হল অরুণাকে কিন্তু শেষ অবধি হাসপাতালে যেতে রাজি হল প্রাপ্তি। কালকে আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উঠে পড়ল ও।

    বাসটায় মোটামুটি ভিড় কিন্তু বসার জায়গা পেয়ে গেছে অরুণা। বাইপাসে বেশ ট্রাফিক, আনোয়ার শা রোড কানেক্টর থেকে সেই পার্ক সার্কাস অবধি ঢিমেতালে চলবে বাসটা। জানালা দিয়ে গাড়ি আর মানুষের স্রোত দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যায় অরুণা। ওর চিন্তাগুলো যেন বাধাহীন স্রোতের মতন ওর নাক আর কানের ফুটো দিয়ে বয়ে চলেছে, মিশে যাচ্ছে এই বাসের সব আরোহীদের চিন্তার সঙ্গে, জানালা দিয়ে ধোঁয়াশার মতন ঢুকে আসছে হাজার হাজার পথচলতি মানুষের চিন্তাস্রোত, পাক খাচ্ছে, ফেনিয়ে উঠছে, ছোট ছোট ঢেউ তুলছে অরুণার চারপাশে। কী আরাম এই নির্বাক চৈতন্যের স্রোতে গা ডুবিয়ে বসে থাকা!

    প্রতিটি সুন্দর জিনিসের সামনে বসে আছেন শিল্পী, পিছনে লুকিয়ে আছে ধর্ষক। মাঝে মাঝে কে যে কোথায় তাও ঠিক করে বোঝা যায় না। শুভেন্দু যা চায় অরুণাকে বলতে পারেনি, ভিখারির মতন শুধু তাকিয়ে থেকেছে। মুখ ফুটে চাইলে হয়তো এক কথায় দিয়ে দিত অরুণা। কিন্তু আর্থিক কৃপার বদলে সওদা করতেই বাঁধল ওর? নিজেকে অন্য কিছু মনে হল?

    শুভেন্দু ভাল মানুষ। একটু দুর্বলচিত্ত কিন্তু সত্যিকারের ভদ্রলোক। শুভেন্দু অত্যাচারী নয়। শুভেন্দুর মনের মধ্যে শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে, কাছে এসে দাঁড়ালে তার আলো পাওয়া যায়।

    সামনে দাঁড়ানো একটি অল্পবয়সি ছেলে খুব মন দিয়ে টেক্সট করে চলেছে। তার পাশ থেকে আরেক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরেই অরুণার শার্টের ফাঁকে ফোঁকরে উঁকিঝুঁকি মারছেন। কিন্তু ঠিক সামনেই সুবিধাজনক অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকেও ছোকরার দৃষ্টি আদৌ সেই লোভনীয় বিভাজিকার দিকে নেই, সে ব্যাটা টেক্সট করতেই ব্যস্ত। ভদ্রলোকের হতাশ মুখটা দেখে হাসি পেল অরুণার।

    শপিংমলের আলো দেখা যাচ্ছে। সুন্দর সুন্দর নেম ব্র্যান্ডের প্যাকেট হাতে নিয়ে বাসে উঠছে কয়েকজন। ধোঁয়াটে আকাশের গায়ে আলো দিয়ে আঁকা সুন্দর মুখ, সুন্দর শরীর, সুন্দর মুখে ছেনালি, সুন্দর শরীরে কাদা, প্যাকেটের গায়ে নোংরা ছবি, নোংরা ছবির মুখে হাসি, শপিংমলের তলায় চায়ের দোকান, চায়ের দোকানে ড্রাইভারের দঙ্গল, দঙ্গলের মধ্যে সিগারেট, সিগারেটের ধোঁয়ায় নৈরাশ্য, নৈরাশ্যের অন্তরে আক্রোশ। অরুণার মনে হল চারপাশের অনেক মানুষ প্যাকেটে মোড়া আক্রোশ নিয়ে বাড়ি ফিরছে। এরা সবাই মনে মনে ধর্ষিত, শুধু শোধ নেবার সুযোগ খুঁজছে। সুন্দর কুৎসিত হতে চাইছে, কুৎসিত সুন্দর। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেলেটার হাতে কোনও প্যাকেট নেই। এরকম নিশ্চয় আরও মানুষ আছে, যাদের মনে আক্রোশের বদলে ভালবাসা, তারা ধর্ষণ করতে চায় না। কিন্তু এরা সকলেই মিশে আছে এই বিদঘুটে আলো অন্ধকারে, আজব এই বিভ্রান্তির কুয়াশায়, তাদের আলাদা করে চিনবে কেমন করে? সেই জন্যেই তো প্রাপ্তির এই অবস্থা। অজানা জগৎ থেকে ছায়ামূর্তিরা এসে ওকে মানুষ চিনিয়ে দেয়। আমাদেরও ডাকে, আমরা শুনতে পাই না।

    প্রাপ্তির কাছ থেকে নিষ্ঠুর পীড়ন দিয়ে জীবনের প্রথম সুখ কেড়ে নিয়েছিল একজন ডাক্তার। কাকাবাবুকে বিনাপয়সা দেখত, রাত্রে ডাকলে আসত। প্রাপ্তি একজন লেসবিয়ান, এবং স্কিৎসোফ্রেনিক। প্রাপ্তি ভুল দেশে জন্মেছে। প্রাপ্তি অরুণাকে ভালবাসে। প্রাপ্তি মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে ওঠে। প্রাপ্তি হিংসায় অন্ধ হয়ে যায়। প্রাপ্তি ছেলেদের ঘৃণা করে, ডাক্তারদের ঘৃণা করে। কিন্তু প্রাপ্তি কি ষড়যন্ত্র করতে পারে? স্বাভাবিক বুদ্ধি কি প্রাপ্তির আছে?

    একটু পরেই বাড়ি, বালিশে ঠেস দিয়ে সুজিত, সুজিতের দৃষ্টিতে বিষ, সুজিতের কথায় ব্যঙ্গ, সুজিতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্বলের অত্যাচার, সুজিতের নিঃশ্বাসে স্বার্থপর মৃত্যুর গন্ধ।

    বাবান গম্ভীর আর দুর্গম। বাবান ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে। বাবানের হৃদয়ে ইন্টারনেট। বাবান অসময়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। বাবান কাউকে ভালবাসে না।

    অরুণা একা। অরুণা সত্যিই একা। অরুণা অত্যন্ত অনিচ্ছায় একা।

    অরুণা আশাহীন। অরুণা অপরাধী। অরুণা অপরাধী নয়।

     

    ‘গুড মর্নিং। কেমন আছেন এখন?’ রমিতা গুপ্তকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে।

    ‘ভাল। আপনি কেমন?’ একটু হেসে শুভেন্দু বললেন।

    ‘ভাবলাম সুখবরটা নিজেই আপনার কাছে নিয়ে আসি। আপনার বিরুদ্ধে কেসটা তুলে নেওয়া হয়েছে। যিনি অভিযোগ করেছিলেন তিনি নিজেই মানসিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাছাড়া তদন্তে আপনার নির্দোষিতা মোটামুটি প্রমাণিত হয়েছে। মোট কথা আপনি সসম্মানে মুক্ত। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইন এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সামনে এসেছে, আমি নিশ্চিত তার ফলে অনেকেরই উপকার হবে। অতএব কনগ্রাচুলেশনস।’

    খবরটা উকিল মারফৎ আগেই পেয়ে গেছিলেন সুতরাং খুব একটা অবাক হলেন না শুভেন্দু। ওঁর সন্দেহ হচ্ছে ইন্সপেক্টর আজকে শুধু এই বাসি খবর দিতে আসেননি।

    ‘একটা ধন্যবাদ কিন্তু প্রাপ্য আছে আপনার। সেদিন ঠিক সময়ে আমাকে হাসপাতালে না পাঠালে আজ আর এখানে বসে থাকতে হত না।’ শুভেন্দু বললেন।

    ‘প্লিজ ডোন্ট মেনশন। আমাদের দেশে থানা বা লক আপ ভদ্রলোকদের জন্য তৈরি নয়। আসলে আমরা কাস্ট সিস্টেমে বিশ্বাস করি তো, অপরাধীরা হল একটা স্পেশাল কাস্ট, তাদের সহ্য করার ক্ষমতাও অনেক বেশি।’ হেসে কথাটা উড়িয়ে দিলেন রমিতা। ভদ্রমহিলা সত্যিই খুব সপ্রতিভ, অনেকখানি খেয়াল না করলে ওঁর গলার মধ্যে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের সুরটা ধরতে পারা মুশকিল।

    ‘ডক্টর মিত্র আপনার সঙ্গে নার্স অরুণা দাশগুপ্তের সম্পর্ক তো বেশ ভালই, তাই না? ওনার হাজব্যান্ড আপনার হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন। এইরকম অল্পবয়সে ক্যানসার হওয়া সত্যিই খুব আনফরচুনেট ব্যাপার।’

    ‘এই ধরণের লিউকেমিয়া অল্পবয়সেই হয়। সুজিত একসময় আমার পেশেন্ট থাকলেও এখন ও আমাদের অঙ্কোলজিস্ট ডক্টর বিশ্বাসের আন্ডারে আছে।’ শুভেন্দু বললেন।

    ‘ঠিক ঠিক, ভুলেই গিয়েছিলাম। আচ্ছা রিসেন্টলি আপনি মিঃ দাশগুপ্তের চিকিৎসা বাবদ বেশ বড় অঙ্কের একটা হসপিটাল বিল—’

    ‘মাপ করে দিয়েছিলাম। আমরা এমপ্লয়িদের ক্ষেত্রে অনেকসময় এটা করে থাকি। কিন্তু আপনি কি আবার আমাকে জেরা করতে চান নাকি?’ শুভেন্দুর মনে পড়ে গেল ল’ইয়ার পুলিশের সঙ্গে কোনওরকম কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছেন।

    ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না, এই বিষয়ে আমার কৌতূহল নিতান্তই ব্যক্তিগত। আপনার কেস চুকেবুকে গিয়েছে, ওপর মহল থেকেও সেই রকমই নির্দেশ। আমরা কারও বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছি না, ওই মেয়েটিকেও ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এ শুধু আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল।’ রমিতা খুব ক্যাজুয়াল গলায় কথা বলছেন কিন্তু প্রতিটা শব্দ ওজন করে সাজানো।

    ‘তার মানে? অরুণার সঙ্গে ওই মেয়েটার কোনও—’ শুভেন্দু কথাটা শেষ করতে পারলেন না, একটা বিকট সন্দেহের ছবি ওঁর মনের পর্দায় ভেসে উঠল। ক্লিনিকে ফেরার পরে উনি কিছুটা অবাক হয়েই জানতে পেরেছেন যে অরুণা অন্য একটা হাসপাতালে কাজ নিয়ে চলে গেছে।

    ‘আসলে কী জানেন ডক্টর, পুরো ব্যাপারটাই বিসমিল্লায় গলদ। আমাদের দেশের ক্রিমিন্যাল জাস্টিস সিস্টেম প্রথম থেকেই ক্ষমতা আর কায়েমি স্বার্থের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে, পাবলিকের অধিকার রক্ষা করা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। আমাদের সিভিল সোসাইটিও সেই রকম ছিল, তাদের অ্যাক্টিভিজমের মধ্যে ড্রাইভার আর পকেটমার ঠ্যাঙানো, বাকি সব কাজ মামা ধরেই হত। আমরা বিশ্বাস করতাম যাদের হাতে ক্ষমতা আছে তারা একটু বেশি খাবে, ওই নিয়ে নালিশ করার কিছু নেই।’

    ‘আপনি কী বলতে চাইছেন বলুন তো!’ শুভেন্দু বিরক্ত হয়ে উঠেছেন এবার, মনের পিছনে অন্য একটা আশঙ্কাও দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এই মহিলার কথাবার্তা পুলিশের বদলে কলেজের অধ্যাপিকার মতন, শুভেন্দুর সঙ্গে প্রথম থেকেই ভাল ব্যবহার করে এসেছেন কিন্তু তার পিছনে কোথায় যেন একটা দেঁতো সারকাজম লুকিয়ে আছে।

    ‘আপনাদের অ্যাকাউন্টেন্ট দে সাহেব কিন্তু একটা ভুল করে ফেলেছিলেন। হিসাবে গোঁজামিলটা ঠিক করে দিতে পারেননি, ফলে আপনার মিসেস ব্যাপারটা জানতে পেরে গেলেন। আপনি উদার প্রকৃতির লোক, এই রকম আগেও অনেকের জন্য করেছেন কিন্তু অরুণার কেসটা কিছু স্পেশাল, আপনার স্ত্রী সেটা ঠিক পছন্দ করেননি। ফলে কৈফিয়ৎ চাওয়া হয়, খিটিমিটি বাঁধে, পুরো ব্যাপারটা আটকে গিয়ে অরুণার কাছে বেইজ্জতি হয় আপনার। আপনি অবশ্য জানতেন না যে শেষ অবধি সুপ্রিয়া ওটা অ্যাপ্রুভ করে দিয়েছেন। তখন আপনি জেল হাজতে, ওইসব খুচরো ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় ছিল না ওঁর।’ রমিতার মুখে এখনও সেই গা জ্বালানো সারক্যাস্টিক হাসি।

    ‘আপনি ভুল করছেন, আমার সঙ্গে অরুণার—’

    ‘না না, ওসব আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, আমি সত্যিই জানতে চাই না।’ রমিতা ওঁকে থামিয়ে দিলেন, ‘তবে প্রথম দিন না বলে দেবার পরে আপনি নিজেই আবার অরুণাকে ডেকে আশ্বাস দিয়েছিলেন। জীবনের নানা এলাকায় আপনার নিজস্ব কিছু ফ্রাস্ট্রেশনের কথাও শেয়ার করেছিলেন, এই ঘরে বসেই তো কথাগুলো হয়েছিল, তাই না? কিন্তু তার পরেই সুপ্রিয়া ব্যাপারটা জানতে পেরেছেন, ঝগড়াঝাঁটিও হয়েছে, টাকার জন্য সুজিতের চিকিৎসা আটকে গেছে। এইরকম লাগাতার চাপের মধ্যে থাকতে থাকতে অরুণাও মরিয়া হয়ে উঠেছেন।’

    ‘আমি চেষ্টা করেছিলাম, আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম আমি।’ শুভেন্দু বিড়বিড় করে বললেন।

    ‘আপনি আরেকটা খবর সবার কাছ থেকে চেপে গেছিলেন। ক্লিনিক থেকে বাড়ি ফেরার সময় নজরুলের ফোনে একটা টাকার ডিম্যান্ড এসেছিল। নজরুলের ফোন নাম্বার তো সকলের জানার কথা নয়। নজরুল ফোনটা আপনাকে দিয়েছিল, আপনি কিছুই না বলে দুম করে লাইন কেটে দিয়েছিলেন। অবশ্য বউকে লুকিয়ে টাকা আপনি দেবেনই বা কোথা থেকে, আপনার পরিবারে টাকাপয়সার ব্যাপারে যেরকম কড়া নজরদারি! আচ্ছা ডক্টর মিত্র, আপনি বোধহয় ভাবেন যে চেপে রাখলে ক্রাইসিসটা আপনা থেকেই কেটে যাবে, তাই না?’

    ‘ফোনের ওদিকে যে কথা বলছিল সে মেয়েটি মাতাল বা পাগল। ওর একটা কথাও আমি ঠিক করে বুঝতে পারিনি। তাছাড়া আই ওয়াজ আপসেট, আমার মাথা কাজ করছিল না। আপনি বলতে চাইছেন অরুণা এই ব্যাপারে ইনভলভড। সেইজন্য ও আগে চলে গিয়েছিল সেদিন? এই সব কিছু ওর কন্সপিরেসি? আমি ভাবতেও পারছি না যে অরুণা…!’ শুভেন্দুর মুখে যন্ত্রণার ছায়া। জীবনে একটা নতুন আবেশের অঙ্কুর মাথা তোলার আগেই থেঁৎলে গেল, কিম্ভূত আর যন্ত্রণাময় অ্যাবসার্ডিটির লাভাস্রোত এসে পুড়িয়ে খাক করে দিল বনভূমি।

    ‘আমি তো বলেছি যে তদন্ত শেষ, কেস বন্ধ, আমরা আর এই বিষয় নিয়ে বেকার খোঁচাখুঁচি করতে উৎসাহী নই। আপনার বিরুদ্ধে যে মেয়েটি অভিযোগ এনেছিলেন আপাতত তাঁর সাইকিয়াটিক ট্রিটমেন্ট চলছে। অসুখটার বেশ একটা গালভরা নাম— স্কিৎজোঅ্যাফেক্টিভ ডিসর্ডার। আমরা শুধু জানি যে ওই মেয়েটির এবং ওঁর পরিবারের সঙ্গে অরুণার বেশ গভীর রকমের পরিচয় আছে, সে অবশ্য আরেক গল্প। হতেও পারে সবই কাকতালীয়। মোদ্দা কথা দিনের শেষে সবাই যে যার পাওনা বুঝে নিয়েছে, কাজেই এক্ষেত্রে পুলিশ কিংবা সুশীল সমাজ, কারওরই কিছু করবার নেই।’

    রমিতা উঠে পড়লেন। ওঁর মুখে সারক্যাস্টিক হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে কেমন একটা বিষণ্ণতা।

    ‘আসলে কী জানেন ডক্টর, সেক্সুয়াল অ্যাবিউজের আসল ব্যাপারটা হচ্ছে ক্ষমতা দেখানো। বন্দুকের থেকে গুলি আর ক্ষমতার থেকে অত্যাচারকে আলাদা করা কঠিন। সব দেশে সব সময় শিকার করাই ক্ষমতাশালী মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল জানেন তো। ছাত্রী বা নার্স, কাজের লোক কিংবা আই-পি-এস অফিসার সবাই কোনও না কোনও সময়ে তার ভিক্টিম হয়েছে। আবার ক্ষমতার ছক বদলে গেলে তারাই হয়ে উঠছে শিকারী, তারাও সুযোগ নিতে পিছপা হয়নি। এককালে হিসেবটা সোজা ছিল, তাই সুশীল সমাজেও শান্তি ছিল বেশ। এখন কিন্তু খুব কনফিউজিং সময়, কখন যে কার দিকে বন্দুকটা ঘুরে যায় ঠিক নেই। সব কিছুতে স্বচ্ছতা সেইজন্যই জরুরি। আচ্ছা আসি, ভালো থাকবেন।’

    যেমন দুম করে এসেছিলেন তেমনি দুম করেই বেরিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা।

    আমেরিকার টিকিট কাটা হয়ে গেছে। শুভেন্দু এখন টানা এক মাস ছুটি নেবেন। উনি জানেন পরিবারের চেনা হাসিমুখগুলো আবার এক এক করে ফিরে আসবে। সব কিছুর ওপর সময়ের ধুলো জমা হয়। সংসার মানেই তো সেই ধুলোখেলা।

    ক্ষমতা নামক বিচিত্র বস্তুটিকে নিয়ে মানুষের পরীক্ষা চলতে থাকে অনন্তকাল।

    SHARE

    LEAVE A REPLY