দূর পাল্লায় দুই নারী

    সমরেশ মজুমদার
    জন্ম ১৯৪২-এর ১০ মার্চ | শৈশব কেটেছে জলপাইগুড়ি জেলার ডুয়ার্সে | স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক | বিখ্যাত অনিমেষ সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস 'কালবেলা'র জন্য ১৯৮৪ সালে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার |

    (শব্দ হোক- ভূমিকা)

     

    ইদানিং শরীর ভারি হচ্ছে, বুঝতে পারছি। একটি মর্নিং ওয়াকার কিনে দুবেলা পনেরো মিনিট তাতে চেপে ভাবছি ওজনটা নিশ্চয়ই কমেছে। রোজ আয়নায় নিজেকে দেখে দেখে চোখ এত অসাড় যে চুলের ফাঁক দিয়ে গলে চিকচিকে মাথার চামড়া উঁকি মারছে, তা বুঝতে চেষ্টা করিনি। আমি তো ঠিকই আছি তিরিশ বছর আগে যেমন ছিলাম। আগের মতন চটপট হাঁটার বদলে একটু কায়দা করে এমন ভাবে হাঁটি যেন কিছুই খোয়া যায় নি, দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যেবেলায় ক্লাব গিয়ে গোনাগুনতি চার পেগ গিলে যখন বাড়ি ফিরি তখন একটুও পা টলে না। সেসময় দিব্যি রবীন্দ্রনাথের গান আবৃত্তি করতে পারি। রাত এগারোটায় বিছানায় গিয়ে ভাবি কাল কখন রোদ ফুটবে।

    আমার বয়সে পিতামহ লাঠি নিয়ে হাঁটতেন,  পরনে পাঞ্জাবি ধবধবে সাদা। পিতৃদেবও লাঠি নিয়েছিলেন, তাঁর শার্ট-প্যান্টেও কোন রঙ ছিল না। এখন রঙের ঢেউ না থাকলে পোষাক পরতে ইচ্ছে করে না। লাঠি হাতে তুলে ক্লাব গিয়ে বিলিয়ার্ড খেলার সময়।

    কেবল সকালটা, সেই সাতটা থেকে বারোটা পর্যন্ত টেবিলের ওপর কুঁজো হয়ে ঝুঁকি। আর ভাবি এই যে শব্দ খোঁজার যন্ত্রণা কয়েক দশক ধরে করে যাচ্ছি আগে জানলে কোন শালা করত! আমি গান গাইতে পারতাম, ক্রিকেটটাও মন্দ খেলতাম না, নিদেন পক্ষে তবলচি হতেও তো পারতাম, ওসবও করতেনা পারলে ছবি আঁকতে চেষ্টা করলেও চমৎকার হতো।

    কাল রাত্রে ঘুমের মধ্যে শক্তিদা এসে দাড়িতে আঙুল বুলিয়ে বললেন, ‘ কি ভাবে বাঁচছ বাবু, শেষে চুমু কবে খেয়েছ, মনে পড়ে’?এই বলে তো তিনি চলে গেলেন, তারপর থেকে অঙ্কটা কষে যাচ্ছি। শেষবার কবে? আহা! প্রথমবারের কথা এখনও টাটকা, শেষ কবে গুনতে গুনতে কি রকম ফাঁকা হয়ে গেল মাথার ভেতর। বেশ ক্যাটক্যাটে সাদা।

    তারপর ভাবলাম, না যাওয়ার আগে শেষ চুমু খেয়ে যাব বলার মধ্যে একটা ভিখিরি ভাব আছে। তার চেয়ে, চুল পড়ুক, শরীর ভারি হোক, প্রতিটি রাত্রে ঘুমাবার আগে নিজেকেই চুমু খেয়ে যাব।

    প্রতিটি দিন মনটাকে টাটকা রাখার চমৎকার ওষুধ।

    (আর গৌতম ও উড়ালপুলের জন্য লিখে যাব এই ধারাবাহিক উপন্যাস)

     

     

    চোখের সামনে সুদীপাকে মরে যেতে দেখেছিল অয়ন। তিন তিনজন ডাক্তার একমত হতে পারছিলেন না ওর ঠিক কী অসুখ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যখন রোগ ধরা পড়ল তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। যতই মনের জোর থাকুক, যতই সুদীপা বাঁচতে চাক, ভুল ওষুধ তাকে বাঁচতে দিল না। বন্ধুরা অয়নকে বলেছিল ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করতে। তিনজনই কলকাতায় ডাক্তার হিসাবে বিখ্যাত কিন্তু তাদের ভুল চিকিৎসা করার প্রমাণ অয়নের হাতে আছে। কিছুদিন আগে এক প্রবাসী ভদ্রলোকের স্ত্রী এইরকম ভুলের ফলে মারা গিয়েছিলেন। ভদ্রলোক মামলা করেছিলেন। বহু বছর ধরে এই আদালত থেকে ওই আদালতে মামলা চলেছিল। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ডাক্তারদের শাস্তি হয়েছে। তাঁদের মোটা টাকার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। প্র্যাকটিস করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

    অয়ন বন্ধুদের উপদেশ গ্রহণ করল না। দীর্ঘদিন ধরে আদালত এবং উকিলদের চেম্বার করে হয়তো শেষ পর্যন্ত মোটা টাকা পাওয়া যাবে কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সে কী করবে? প্রবাসী ভদ্রলোক গরিব মানুষের উপকার করার জন্য টাকাটা দান করেছেন। সেটা অবশ্যই করা যেত। কিন্তু সুদীপাই যখন ফিরে আসবে না তখন অতদিন ধরে মামলার পেছনে লেগে থাকতে সে হয়তো পারবে না। আদালত যদি ডাক্তারদের লাইসেন্স বাতিল করে দেয় তাহলে তো কিছু মানুষের ক্ষতি হবে। এই প্রবীন ডাক্তাররা তো রাতারাতি নাম করেননি। নিশ্চয়ই এর আগে প্রচুর মানুষ ওঁদের কাছে উপকার পেয়েছেন। সুদীপার বেলায় যে ভুল ওঁরা করেছেন তা যদি আগেও করতেন তাহলে অয়ন কিচিকিৎসার জন্য ওঁদের চেম্বারে যেত! আদালতে যায়নি বটে কিন্তু ওই তিনজন খ্যাতনামা চিকিৎসককে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিল যে ভবিষ্যতে অন্য কোনও পেশেন্টের ক্ষেত্রে এই ভুল যেন না হয়।

    সুদীপা চলে যাওয়ার পরে অয়নের মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা ফাঁকা হয়ে গেল। তার আর কোনও আত্মীয় নেই। সুদীপারও সন্তান হয়নি। এই কোলাহল, মানুষের ভিড়, খবরের কাগজের হানাহানির খবর আর সহ্য হচ্ছিল না। একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সে রোজগার এতদিন করেছে তা খুব কম নয়। মনে হচ্ছিল যদি কোনও নির্জন জায়গায় চলে গিয়ে সরল জীবনযাপন করতে করতে তাহলে সুখ হয়তো পেত না কিন্তু স্বস্তি পেত, এই সময় ইন্টারনেটে একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ায় সে উৎসাহিত হল। বিজ্ঞাপন দিয়েছেন একজন মারাঠি মহিলা, নাম শোভা কানিৎকার। মুম্বাইতে থাকেন। সমুদ্রের অপর পাহাড়ের গায়ে তাঁর একটি পৈতৃক বাংলো আছে যা তিনি পাঁচ বছরের জন্য ভাড়া দিতে চাইছেন। আলোচনা সাপেক্ষে ভাড়া ঠিক হবে।

    বিজ্ঞাপনে এর চেয়ে বেশি কিছু লেখা ছিল না। বাংলোটা ঠিক কোথায় বোঝা যাচ্ছিল না। সমুদ্র তো ভারতবর্ষের অনেক প্রদেশেই রয়েছে। অবশ্য সমুদ্র আর পাহাড় একসঙ্গে বেশি জায়গায় নেই। তাছাড়া ওরকম জায়গায় একটি বাংলোর ভাড়া নিশ্চয়ই অনেক হবে। অয়ন চিন্তা করছিল। মাত্র পাঁচ বছরের জন্য মহিলা ভাড়া দিতে চান। অয়ন কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকে। যদি বাংলো পাওয়া যায় তাহলে ফ্ল্যাটটাকে তালাবন্দি করে যেতে হবে এবং পাঁচ বছর পরে আবার এখানেই ফিরে আসতে হবে। অবশ্য ততদিনে ফ্ল্যাটের দাম নিশ্চয়ই বেড়ে যাবে এবং সেই টাকায় পছন্দের কোনও জায়গায় বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে।

    এইসব ভেবে অয়ন শ্রীযুক্তা শোভা কানিৎকারকে টেলিফোন করল। তখন সকাল এগারোটা। ভদ্রমহিলাই রিসিভার তুললেন। অয়ন নিজের পরিচয় দিল। সে কলকাতা থেকে কথা বলছে, তার প্রফেশন কী তাও জানালো। নেটে বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী হয়েছে বলে সে ফোন করেছে।

    শোভা কানিৎকার জিজ্ঞাসা করলেন, “কিছু মনে করবেন না, আপনার বয়স কত?”

    “পঞ্চাশ।”

    “আপনি এখনও দীর্ঘদিন চাকরি করবেন। বাংলোটা যেখানে, সেখানে যে ছোট্ট জনবসতি আছে সেখানে আপনার চাকরি করার কোনও সুযোগ নেই।”

    “আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। কিছুদিন আগে আমার স্ত্রী মারা গিয়েছেন। আমি আর কলকাতার হইচই সহ্য করতে পারছি না বলে একটা নির্জন জায়গায় চলে যাব ভাবছিলাম। আপনি চিন্তা করবেন না। আমার আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ নয়।” অয়ন বলেছিল।

    “দেখুন, এখন পর্যন্ত আমি সাতটা প্রস্তাব পেয়েছি। সবাই বাংলোটাকে ব্যবহার করতে চাইছে ছুটিতে বেড়াতে যাবে বলে। দু’জন অনুমতি চাইছে ট্যুরিস্টদের ভাড়া দেবে বলে। কিন্তু আমি চাইছি এমন কাউকে ভাড়া দেব যিনি বাংলোটার যত্ন নেবেন। এসব কথা টেলিফোনে বলা সম্ভব নয়। আপনি যদি একবেলার জন্য মুম্বাই আসেন তাহকে আলোচনা করা যাবে।” শোভা কানিৎকার তার ঠিকানা জানিয়ে দিলেন।

    টেলিফোন রেখে দেওয়ার পর অয়নের খেয়াল হল, এত কথা বলা হল কিন্তু সে ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেল ওঁর বাংলোটা ঠিক কোথায়। কিন্তু অয়নের মন বলছিল মুম্বাই যাওয়া উচিত। না-দেখা বাংলোটা তাকে টানছিল।

    ট্রেনের টিকিট চাইলেই পাওয়া যায় না। ভাড়া একটু বেশি হলেও প্লেনেই মুম্বাই গেল। ভদ্রমহিলাকে সে ফোনে জানিয়ে দিয়েছিল তাই এয়ারপোর্ট থেকে সোজা মালাবার হিলসের বাংলোয় পৌঁছে যেতে পারল সকাল এগারোটায়। ছবির মতো বাড়ি। পরিচয় দিতেই তাকে আপ্যায়ন করে বসানো হল। খনিক পরে শোভা কানিৎকার এলেন। সঙ্গে তার পরিচারিকা নিয়ে এল সুদৃশ্য ট্রেতে এক গ্লাস সরবৎ। শোভা বললেন, “অনেক দূর থেকে এসেছেন, গলা ভিজিয়ে নিন।”

    সরবৎ পান করার পর অয়ন বলল, “আমি আপনার বাংলোর ব্যাপারে উৎসাহী।”

    “হুঁ।” শোভা কানিৎকার হাসলেন, “ওই বাংলোটি আমার বাবা কিনেছিলেন পঞ্চাশ বছর আগে। কিনে ভেঙেচুরে নতুন তৈরি করেছিলেন। ওঁর শখের বাংলো ওটা। বাবা চলে যাওয়ার পরে আমরা মাঝে মাঝেই ওখানে গিয়ে থাকতাম। দুই মাসে বড়োজোর সাতদিন। তার বেশি কাজকর্ম ছেড়ে থাকা সম্ভব ছিল না। আবার বাবার স্মৃতি বলেই ওই বাংলো বিক্রি করতে চাইনি। আমার একমাত্র সন্তান মেয়ে। বিয়ের পরে সে এখন ক্যালিফোর্নিয়াতে। ওখানেই সেটলড। হথাৎ আমার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওঁর শরীরের একটা দিক অবশ হয়ে গিয়েছে। ওঁর চিকিৎসা চলছে কিন্তু খুব একটা উন্নতি হয়নি। ওঁকে এখানে ফেলে আমার পক্ষে বাংলোয় যাওয়া সম্ভব নয়। ওঁকে নিয়ে যাওয়ার তো কথাই ওঠে না। তখন আমি ঠিক করলাম বাংলোটা ভাড়া দেব। কেউ বাস না করলে বন্ধ পড়ে থেকে অযত্নে বাংলোটার ক্ষতি হবে। কিন্তু আমি পাঁচ বছরের জন্য ভাড়া দেব। কারণ আমি জানি না ওই সময়ের পরে আমার জীবনে কী ঘটবে। মুশকিল হল, বেশিরভাগ লোক অত অল্প সময়ের জন্য ভাড়া নিতে রাজি হচ্ছেন না। তাঁরা অনেক বেশি ভাড়া দেবেন কিন্তু দশ বছর থাকতে চান। কেউ বাংলোটাকে ট্যুরিস্টদের থাকতে দিয়ে ব্যবসা করতে চান। এটা আমি অ্যালাউ করতে পারি না। আপনার বক্তব্য বলুন।”

    “খুব সাধারণ। আমি একা। কোনও আত্মীয় নেই। আমি এই পাঁচ বছর একটু নিরিবিলিতে থাকতে চাই।”

    অয়ন বলল, “কিন্তু সেটা নির্ভর করছে দুটো তথ্য আমার পছন্দ হলে। এক, আমাকে প্রতিমাসে কত ভাড়া দিতে হবে, দুই, আপনার বাংলোটা নির্জন জায়গায় আছে কি না।”

    “ঠিক কথা।” শোভা কানিৎকার বললেন, “এই দুটো নিয়ে কথা বলা যেতে পারে যখন আপনি নিজের চোখে বাংলো দেখবেন। আপনার হাতে সময় আছে?”

    “আমার কলকাতায় ফেরার ফ্লাইট আজ সন্ধে সাড়ে সাতটায়।”

    অনেক সময় আছে। মুম্বাই থেকে মাত্র আড়াই ঘণ্টার পথ। আমার ম্যানেজার আপনাকে বাংলো দেখিয়ে নিয়ে আসতে পারে। সন্ধে ছটার মধ্যে ফিরে আসবেন আপনি।” শোভা বললেন।

    “কোনও আপত্তি নেই।”

    “আপনি কি লাঞ্চ করে যাবেন?”

    “না। পথেই কিছু খেয়ে নেব।”

    ম্যানেজারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন শোভা। সত্তরের ওপর বয়স কিন্তু এখনও বেশ শক্ত আছেন।শোভা কানিৎকারের গাড়িতে রওনা হল ওরা। ম্যানেজার ড্রাইভারের পাশে বসলেন। মুম্বাই থেকে পুণের পথে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি অন্য রাস্তা ধরল। আরও আধ ঘণ্টা চলার পর যা জায়গায় গাড়ি চলে এল সেটাকে পাহাড়ি এলাকা বললেও অয়নের পাহাড় বলে মনে হচ্ছিল না। পুরুলিয়া, বিহারে এরকম প্রচুর টিলা আছে। একটা গঞ্জ পেরিয়ে গেল গাড়ি। তারপর রাস্তার পাশে সমুদ্র দেখা গেল। তারপরে ছোট্ট জনপদ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল অয়ন। বিদেশি ছবিতে এরকম জায়গা দেখা যায়। সুন্দর ছোটো ছোটো বাংলো, সুদৃশ্য কয়েকটি দোকান, একটা বড়ো সুপার মার্কেট, কিছু মানুষ রাস্তায় যাদের দেখে ট্যুরিস্ট বলেই মনে হল। ম্যানেজার বললেন, “এই শহরের নাম উইন্ডি। সারাক্ষণ জোরালো বাতাস বয়ে যায় বলেই বোধহয় এই নাম রাখা হয়েছিল।”

    জনপদ ছাড়িয়ে সিকি মাইল যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল ওরা পৃথিবীর শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। রাস্তায় কোনও মানুষ চোখে পড়ছে না। ম্যানেজার বললেন, “এখন দুপুর তাই মানুষ দেখতে পাচ্ছেন না। সকালে এবং বিকেলে মাঝে মাঝে স্কুটিতে দেখতে পাবেন।”

    একটা বাঁক ঘুরতেই ম্যানেজার বললেন, “ওই যে বাংলো।”

    অয়ন দেখলো টিলার অপর বাংলোটার গেট। দু’পাশে পাহাড় রেখে বড়ো রাস্তা থেকে একটা প্যাসেজ উঠে গেছে গেট পর্যন্ত। ম্যানেজার বললেন, “গেট খুলে গাড়ি ভেতরে নিয়ে যাওয়া যায়। আমরা তো এখনই ফিরে যাব, গাড়িটা এখানেই থাক, অসুবিধা হবে?”

    “বিন্দুমাত্র না।” গাড়ি থেকে নামল অয়ন।

    মিনিট দুয়েক হেঁটে গেট খুলে ভেতরে গেল ওরা। বাংলোটি অভিনব। সামনে মাত্র একটি ঘর এবং বারান্দা। কিন্তু পেছন দিকটা নেমে গিয়েছে নীচে। সেটা দোতলা। নীচের ঘরের সামনে বড়ো চাতাল, চাতালের নীচে সমুদ্রের ঢেউ ধাক্কা খাচ্ছে। ম্যানেজারের সঙ্গে চাবি ছিল। তিনিই সব ঘুরিয়ে দেখালেন। ডাইনিং রুম ছাড়া তিনিটি শোওয়ার ঘর রয়েছে। একটি ঘরে প্রচুর ইংরেজি বই। দুটো টয়লেট এবং একটি কিচেন। কিচেনের যাবতীয় সামগ্রীর সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডারও রয়েছে। ম্যানেজার বললেন, “ম্যাডাম দিন দশেক আগে এসে সব পরিস্কার করিয়ে গিয়েছিলেন।” হঠৎ একটা অভিনব চৌবাচ্চা চোখে পড়ল অয়নের। লম্বায় অন্তত কুড়ি ফুট, চওড়ায় দশ। এখন চৌবাচ্চা জলশূন্য। জিজ্ঞাসা করাতে ম্যানেজার বললেন, “চৌবাচ্চার ওপাশে হ্যান্ডেল ঘোরালে সমুদ্রের জল ঢুকে পড়ে ভেতরে। এখানে স্নান করা যায়। আবার এপাশের হ্যান্ডেল ঘোরালে সেই জল নীচে বেরিয়ে যায়। অনেকদিন ব্যবহার করা না হলেও মনে হয় ব্যবস্থাটা ঠিকই আছে।”

    অয়ন চাতালে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখল। আরব সাগর। প্রচুর সীগ্যাল উড়ছে। ছোটো ছোটো সাদা ঢেউ ভাঙছে আর গড়ছে। সমুদ্র এখানে উত্তাল নয়। ম্যানেজার বললেন, “জোয়ারের সময় জল ওপরে উঠে আসে কিন্তু চৌবাচ্চা পর্যন্ত পৌঁছোয় না। তখনই হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে জল ভরে নিতে হয়। ভাটার সময় জল নীচে নেমে গেল স্নান করা জল বের করে দিতে সুবিধে হয়।”

    অয়নের এসব কথায় মন ছিল না। এরকম একটা নির্জন জায়গার কথা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। কিন্তু এত ঘর, এত আধুনিক ব্যবস্থা চারধারে। এই বাংলোর ভাড়া কত হতে পারে সে আন্দাজ করতে পারছিল না। সে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করল, “এর বাংলো ভাড়া দেওয়া হয়েছিল?”

    “না। কখনও না।” ম্যানেজার বললেন, “আপনার যদি কিছু জানার থাকে তাহলে ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।” ভদ্রলোক মোবাইল ফোন বের করতে অয়ন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

    মারাঠি ভাষায় কিছু বলে ফোনটা এগিয়ে দিলেন ম্যানেজার। অয়ন “হ্যালো” বলতেই শোভা কানিৎকার জিজ্ঞাসা করলেন, “জায়গা পছন্দ হয়েছে?”

    “খুউব। কিন্তু মনে হচ্ছে এখানকার ভাড়া আমার সাধ্যের বাইরে।” অয়ন বলল।

    “আপনার বাজেট কত?”

    “খুব বেশি হলে মাসে কুড়ি হাজার টাকা।”

    অয়নের কথা শুনে খানিকটা চুপ করে থাকলেন শোভা কানিৎকার। তারপর বললেন, “এর পরে ওখানে থাকতে গেলে আপনাকে কাজের লোক রাখতে হবে। আপনি নিজে রাঁধেন কিনা জানি না, সচরাচর ছেলেরা প্রফেশ্যনাল কুক না হলে কিচেনে ঢোকে না, সেক্ষেত্রে রান্নার লোক রাখতে হবে। সপ্তাহে একদিন বাড়ি পরিস্কার করাতে হবে। ওখানে কম মাইনেতে লোক পাওয়া মুশকিল। তাহলে আপনাকে ভাড়া সমেত চল্লিশ হাজার খরচ করতে হবে।”

    ঢোক গিলল অয়ন। “আমি একটু ভেবে দেখি।”

    “হ্যাঁ। আপনি ভাবুন। আমিও একটু ভাবছি। আপনি যা বলছেন তার অনেকগুন বেশি আমি অফার পেয়েছি। ঠিক আছে, ভাবতে দিন। ম্যানেজার কাছে আছেন?”

    “হ্যাঁ।” ফোনটা ভদ্রলোককে দিল অয়ন। উনি মারাঠি ভাষায় কথা বলতে লাগলেন যার বেশিরভাগ শব্দই অয়নের কাছে অবোধ্য।

    বাংলো বন্ধ করার আগে ম্যানেজার গ্যারাজ দেখালেন। গেট পেরিয়ে একেবারে বাংলোর শেষে রয়েছে গ্যারাজ। বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ফাঁক থাকায় বোঝা যাচ্ছিল ভেতরে একটা গাড়ি রয়েছে যার রং সাদা। জিজ্ঞাসা করলে ম্যানেজার বললেন, “ম্যাডামের গাড়ি ওটা। এখানে এলে চালাতেন। বেশি দূরে ওটাকে নিয়ে যেতে ভরসা পেতেন না বলে এখানেই রেখে গেছেন।”

    হাতে সময় আছে বলে উইন্ডির একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল অয়ন। ম্যানেজার কিছুতেই খেতে চাইলেন না। বললেন, “স্যার আমি যা ব্রেকফাস্ট খাই তাতে বিকেলের আগে খিদে পায় না। আপনি সংকোচ না করে খেয়ে নিন।”

    মেনুকার্ড দেখে অয়ন বুঝতে পারল এই রেস্টুরেন্ট ট্যুরিস্টদের জন্য। সবই বিদেশি খাবার। সামুদ্রিক মাছ হরেকরকম। তার দামও নাগালছাড়া। এই রেস্টুরেন্টে নিশ্চয়ই উইন্ডির অর্থনৈতিক মান নির্ধারণ করে না। মধ্যবিত্তরা নিশ্চয়ই এখানে বাস করেন। চারশো টাকার ফ্রায়েড্র রাইস খেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে।

     

    মুম্বাই-পুণে রাস্তায় একটা বড়োসড়ো দুর্ঘটনা ঘটায় গাড়ির গতি কমে গিয়েছিল। ঘড়ি দেখল অয়ন। এই রকম গতিতে আর বেশিক্ষণ চললে ফ্লাইট মিস করতে পারে। সে ভেবেছিল কলকাতায় ফিরে যাওয়ার আগে শোভা কানিৎকারের সঙ্গে দেখা করে ধন্যবাদ জানিয়ে যাবে। ওই বাংলোতে থাকতে হলে খাওয়া-দাওয়া ধরলে মাসে ষাট-পঁয়ষট্টি হাজার খরচ হবে। ওটা সে এখন করতে পারে কিন্তু পাঁচ বছরে তো অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। তাই বাধ্য হয়ে সে সরে দাঁড়াচ্ছে, কথাটা জানিয়ে যাওয়া উচিত বলে মনে হয়েছিল তার। কিন্তু যে গতিতে গাড়ি যাচ্ছে তাতে শোভা কানিৎকারের বাড়ি হয়ে গেলে ফ্লাইট মিস করতে বাধ্য। সবার সব সয় না। কী আর করা যাবে!

    হঠৎ ম্যানেজারের ফোন বেজে উঠল। একটু কথা বলে তিনি ফোনটা পেছনের সিটে বসা অয়নকে দিলেন, “স্যার, আপনার ফোন।”

    অয়ন বলল, “ম্যাডাম রাস্তায় অ্যাকসিডেন্ট হওয়ায় গাড়ির সংখ্যা বেড়ে গিয়ে গতি কমে গেছে। ভেবেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাব—।”

    “না না। আপনি ফ্লাইট পাবেন না।” শোভা বললেন, “আপনি কিছু ভেবেছেন কিনা জানতে আমি ফোন করলাম।”

    নিতে পারব না বলতে গিয়েও বলতে পারল না অয়ন। বলল, “আপনার বাংলো আমার এত পছন্দ হয়েছে যে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমাকে যদি একটা দিন সময় দেন, কলকাতায় ফিরে গিয়ে সব দেখেশুনে আপনাকে জানাতে পারব।”

    শোভা কানিৎকার হাসলেন, “তার দরকার নেই। আমি ভেবে দেখলাম আপনার তিনজন লোক রাখার দরকার নেই। একজন কুক কাম সার্ভেন্ট রাখলেই হবে। ওখানে দশ হাজারে পেয়ে যাবেন। আপনাকে ইলেকট্রিক এবং জলের বিল দিতে হবে। আপনি যদি ছেড়ে দেন অথবা আমার যদি প্রয়োজন হয় তাহলে দুজনকেই তিনমাসের নোটিশ দিতে হবে। কন্ট্র্যাক্ট সই করার সময় তিনমাসের ভাড়া অ্যাডভান্স দেবেন, ঠিক আছে?”

    “একদম ঠিক। কিন্তু ভাড়াটা কি কুড়ি হাজারই নেবেন?”

    “হ্যাঁ। আমি চাইব বাংলোটা প্রপার কেয়ারে থাকুক।”

    “আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো জানি না।”

    ওটা জানানো দরকার নেই। আপনার ই-মেল নাম্বার ম্যানেজারকে দিয়ে দিন। আমি কন্ট্র্যাক্ট পেপার পাঠিয়ে দেব। আপনি সই করে ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট করে দেবেন। যেদিন বাংলোতে থাকতে আসবেন সেদিন আমার ম্যানেজার আপনাকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করে উইন্ডিতে পৌঁছে দেবে। ও কে? হ্যাভ এ নাইস ফ্লাইট।” শোভা কানিৎকার ফোন রাখলেন।

     

    চলবে

    SHARE

    LEAVE A REPLY