লু

    ডাঃ হিমাচল দাশ
    পেশায় কলকাতায় ডাক্তার। দীর্ঘদিন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় গল্প লিখছেন।

    স্কুল থেকে বেরিয়ে ব্যাপারটা আঁচ করে সৃজা। মা ওর বাঁ হাতটা শক্ত মুঠোয় চেপে তাড়াতাড়ি হেঁটে যাচ্ছে রিক্সার দিকে। হাতে বেশ লাগছে। বুঝে নেয় মা’র মন ভালো নেই। নির্ঘাত বাড়িতে কারোর সাথে ঝগড়া হয়েছে। বাড়িতে সৃজা আর তার মা-বাবা। ঠাম্মা-দাদু তো থাকে সেই সোদপুরে। আর দিদান-দাদু বারাসাতে। ও হ্যাঁ, মিনতি মাসি আছে ওদের সাথে। মার সাথে হাতে হাতে কাজ করে। মা-বাবা দুজনেই কাজে বেরিয়ে গেলে ও মিনতি মাসির কাছে থাকে। ঝগড়া হল কার সাথে! আড়চোখে মা’র মুখের দিকে তাকায়। মা গম্ভীর হয়ে রাস্তার পাশের সাইনবোর্ডগুলো দেখছে। রোজ এই রাস্তা দিয়ে ও মা’র সাথে স্কুলে যাতায়াত করে। তবু ঝগড়া হলেই মা আবার সাইনবোর্ডগুলো দেখতে থাকে। একদম কথা বলে না। অন্যদিন স্কুল থেকে বেরোলেই মা’র প্রথম প্রশ্ন –

    – কি রে টিফিন খেয়েছিস।
    ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বলার সাথে সাথেই মার দ্বিতীয় প্রশ্ন-
    – সব বই-খাতা গুছিয়ে এনেছিস তো।
    – এনেছি। তারপরেই সৃজার আবদার –
    – মা ‘চয়েসে’ একটু চল না। একটা ‘ইয়ো ইয়ো’ কিনব।
    – এখন না মা, আমার স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।
    – চল না মা। দু’মিনিট। প্রতীপ এনেছিল।
    – খালি বায়না। একদম দেরি করবি না কিন্তু ওখানে।

    রিক্সা চলতে থাকে। মা শুনতে থাকে মিস্ কি বলল, কি পড়াল। তারপর বাড়িতে খেয়েদেয়ে ও কি কি হোমটাস্ক করে রাখবে তা’ বলে। কথায় কথায় কোনোদিন চয়েসে, কোনোদিন কোল্ডড্রিঙ্কসের দোকানে এট্টুস ঢুঁ মেরে বা কোনদিন একেবারে সোজা সাঁ সাঁ করে বাড়ি চলে আসে। দেখে বাবা অফিস চলে গেছে। মা ওকে বাড়িতে রেখেই ব্যাগ নিয়ে হুস করে সেই রিক্সাতেই বেড়িয়ে যায়।

    আজ কোনোকিছু মা’কে বলতে সাহস হচ্ছে না। মা’র মুখটা দুর্গা ঠাকুরের মত থমথমে। থমথমে মুখের দুর্গা ঠাকুর সৃজার ভালো লাগে না। বাবা বলে- দুর্গা ঠাকুর জগদ্ধাত্রী, জগৎ ধারণ করেন। অসুর হলেও তো সে জীব। অসুরকে দমন করে তাই তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। মা বলে – দুষ্ট দমন করছেন বলে দুর্গা ঠাকুরের মুখ রাগে থমথমে। দু’রকম কথা শুনে সৃজা ঠাম্মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। ঠাম্মা মুচকি হেসে ওর থুতনি নাড়িয়ে বলেছিল –
    – তোমার কি মনে হয় কলা-বৌ!
    – ধ্যাৎ, আমি গণেশকে বিয়ে করব না।
    – ওমা! তাইতো! ঠিক আছে, এবারের পুজোয় দুগ্গাকে বলে রাখব কার্তিকের জন্য।
    – ধ্যাৎ, আমি তাই বলেছি নাকি! আমি বিয়েই করব না।
    – কেন রে সোনা, আমরা ভোজ খাব না।
    – তোমরা তো ভোজ খাবে, আর আমার মা-বাবা যে একা হয়ে যাবে!
    মা-বাবা একা সৃজা ভাবতে পারে না। কষ্ট হয়। সবার সাথে কথা বলে সৃজা এটাই বুঝেছে যে অসুর দুষ্টু। তাই দুর্গার মুখ থমথমে। আজ মা’র কাছে কে দুষ্টু হল কে জানে!

    বাড়ি ফিরেই মা মিনতি মাসিকে ঘরের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে হুস্ করে চলে যায়। বুঝল মিনতি মাসি দুষ্টু নয়। তাহলে মা মিনতি মাসির সাথে কথাই বলত না। সৃজা দৌড়ে জানলার কাছে যায়। রিক্সা হুস্ করে বেরিয়ে গেল। পেছনে পর্দা ফাঁক হয়না। সৃজা জানলায় দাঁড়িয়ে থাকে যতক্ষণ না রিক্সাটা মোড়ের বাঁকে হারিয়ে যায়। অন্যদিকে সৃজা জানলা দিয়ে মা’কে টাটা করে। মা’ও রিক্সার পেছনের পর্দা সরিয়ে টাটা করে। সৃজার মনটা খালি হয়ে গেল। তাহলে সে কি কোনো দুষ্টুমি করেছে! সৃজা ভেবে দেখে সকালে স্কুলে যাবার সময় মা ওর সাথে হাসি হাসি মুখ করে কথা বলেছে। স্কুলের গেটে হাতে চুমু খেয়েছে। খেতে বসে সৃজা অনুমান করে তাহলে বাবাই দুষ্টু। মা-বাবার কাট্টি। বাবাকে দুষ্টু ভাবতে কষ্ট হয়। আবার মার থমথমে মুখেও কষ্ট হয় সৃজার। খেতে ইচ্ছে করে না। বসে ভাত নাড়াচাড়া করে। মিনতি এসে হাত লাগায়। গ্রাসে গ্রাসে ভাত তুলে দেয় মুখে। কিছুক্ষণ বাদে হরহর করে বমি করে দেয় সব। ভীষণ ক্লান্তি লাগে সৃজার। হোমটাস্ক করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে একসময়।

    – অ্যাই ওঠ্। এখনো যে ঘুমুচ্ছিস্।
    মার ডাকে তড়বড় করে উঠে বসে সৃজা। দেখে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। বুঝল সন্ধ্যে হয়ে এল। বাবা আরেকটু পর অফিস থেকে ফিরে আসবে।
    – বসে রইলি যে। ওঠ্। হোমটাস্ক শেষ হয়েছে?
    চুপ করে থাকে সৃজা।
    – হোমটাস্ক না করে শুয়ে পড়েছিস যে বড়। ওঠ্ তাড়াতাড়ি। শেষ কর।
    অন্যদিন হলে মা এসে তার চুলে বিলি কেটে কেটে নরম করে ডেকে ঘুম ভাঙাত। সৃজা উঠে মার হাঁটুতে মাথা রেখে আরেকটু শুয়ে থাকত। একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগত। মা নরম করে বলত –
    – ওঠ্ মা। সন্ধ্যে হয়ে এল। আর শুয়ে থাকে না। ওই দ্যাখ্ শাঁখ বাজছে। সন্ধ্যে বেলায় শাঁখ বাজলে শুতে নেই। অমঙ্গল হয়।

    মনটা ভার হয়ে যায় সৃজার। মুখে জল দিয়ে চুপচাপ হোমটাস্ক নিয়ে বসে। একটু পরে একগ্লাস দুধ নিয়ে মিনতি মাসি আসে। সে জানে আজ মিনতি মাসিই আসবে। অন্যদিন হলে মা এক কাপ কফি নিয়ে তার পাশে এসে বসত। আর লোকাল চ্যানেলে খবর শুনত। সেও মার কাছে বসে টিভি দেখত কিছুক্ষণ। আজ মা টিভির ধারে কাছেই ঘেঁষবে না। খালি কাজ করে যাবে আর তাকে পড়াবে।

    টুং করে ডোরবেল বাজল। বাবা এল। মা যায় না। মিনতি মাসি দুধ রেখে দরজা খুলতে যায়। সৃজা দেখে বাবার মুখ গম্ভীর। বুঝল বাবা-মায়ের কাট্টি নিশ্চিত। ফেলে রাখা দুধটা ঢকঢক করে খেয়ে নেয়। মিনতি মাসি এখন আর আসবে না। মিনতি মাসিই বসার ঘরে বাবাকে চা দেবে। টিফিন দেবে। কাপড়-জামা ছেড়ে বাবা পাশের ঘরেই বসে থাকবে। বাবাও টিভি খুলবে না। পড়ার শেষে বাবার সাথে আজ ‘টম অ্যান্ড জেরি’ দেখা যাবে না। একমন দিয়ে বাবা খবরের কাগজ পড়ে যাবে সেই রাত সাড়ে ন’টা পর্যন্ত। এমনিতে বাবা কম কথা বলে। তবে আজ বাবা যে ঘরে আছে তা বোঝা আরও মুশকিল হয়ে পড়বে। মিনতি মাসিই বাবাকে রাতের খাবারের জন্য ডাকবে। তারা তিনজনে টেবিলে বসে খাবার খাবে। শুধু বাসনপত্রের আওয়াজ আর জল খাবার শব্দ শোনা যাবে। কোনো গল্প হবে না। কান্না পাবে সৃজার। কাঁদতে পারবে না। দম বন্ধ হয়ে আসবে তখন।
    – কি রে চুপ করে বসে কেন। বই খোল্।
    দেখে মা ঘরে আসে হাত মুছতে মুছতে। আজ পড়ায় ভুল হবে সৃজার। মা আরও রাগ করবে। জোরে জোরে বকবে। ভাবতে ভাবতেই শোনে মা বলছে-

    – মনটা থাকে কোথায় অ্যাঁ! ভাগটা আবার কর। হাজার কাজ ঠেলে আবার এই ঘষটানো আর ভালো লাগে না। দূর দূর।

    সৃজা কাঁপতে থাকে। কাঁপা আঙুলে কর গুনে গুনে ভাগটা করার চেষ্টা করে। তবে পারে না। টসটস করে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
    – কাঁদছিস কেন। এটাতো ক্লাস ওয়ানের অংক। ফ্যাঁচ্ কাঁদুনি ছাড়্। মেয়ে হয়ে জন্মেছ, অনেক সইতে হবে—-
    – সৃজা – আ—আ। বসার ঘর থেকে বাবার ডাক ভেসে আসে। মা চুপ করে যায়। সৃজা ধীরে ধীরে বাবার কাছে যায়।

    – মিনতি মাসি কে বল না মা, অ্যাসট্রেটা দিয়ে যেতে।
    – সৃজা– আ– আ। মার ডাক – মিনতি মাসি রান্নাঘরে। এদিকে শোন্। পেন্সিলবক্স থেকে পেন্সিলগুলো রাখলি কোথায়!

    সৃজা তাড়াতাড়ি এসে পেন্সিল খুঁজতে থাকে। পেন্সিলটা টেবিলের তলা থেকে খুঁজে পায়। হোমটাস্ক করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ার সময় হাত থেকে ফস্কে গিয়েছিল। এত ঘুম পেয়েছিল যে ওটা তোলার কথা তখন মাথায় ছিল না।

    – বড় হয়েছ। নিজের জিনিস নিজে গুছিয়ে রাখতে শিখবে কবে।
    আবার অংক করতে বসে সৃজা। বাবা এসে অ্যাসট্রে নিয়ে যায়।
    – সৃজা–আ–আ। আবার বাবার ডাক। মা চুপ করে থাকে।

    সৃজা জানে এখন তাকে খালি মা আর বাবার মাঝে বারবার দৌড়তে হবে।
    – সৃজা–আ–আ। মার ডাক। মার কাছে আসে।
    – তুই কি এখন খাবি। মাথা ধরেছে আজ। তাড়াতাড়ি খেয়ে নেব।

    সৃজা আস্তে আস্তে বাবার ঘরে যায়।
    – বাবা তুমি কি এখন খাবে।

    বাবা মাথা কাত করে।

    সৃজা মার কাছে এসে বলে-
    – খাবে।

    -অ্যাই সৃজা ওঠ্ শিগ্গির।

    ঝপ্ করে সৃজার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খুলে মাকে দেখে। মা মাথার পাশে দাঁড়িয়ে। সবে ঘুম থেকে উঠেছে। চোখের পাতা দুটো ভারী। আর চোখ মুখ কেমন ফোলা ফোলা! বাবা তখনো ঘুমিয়ে।

    – ক্লাস থ্রি হয়ে গেল, এখনো বিছানা ভেজাচ্ছিস্। ছিঃ। কারো কোনো হুস নেই। হইহই করে মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে —- পাগলের মত আমি চেঁচাই শুধু —–

    সৃজা ধড়ফড় করে উঠে পড়ে। প্যান্ট আর বিছানার খানিকটা ভিজে গেছে। ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়।

    – দাঁড়িয়ে রইলি যে। যা। প্যান্ট ছেড়ে মুখ-চোখ ধুয়ে নে। সাড়ে ছ’টা বাজে। স্কুলে যেতে হবে তো।

    স্কুলে যেতে আজ একদম ইচ্ছে করছে না সৃজার। আজ একদম পড়ার মুড নেই। মাকে বলা যাবে না। আরো বকবে। আজ স্কুলে অনেক কিছুই ভুল হয়ে যাবে। অন্য দিন সে সব ঠিক করে। এই দিনগুলোয় তার সব তালগোল পাকিয়ে যায়। মিস্ বলে –

    – সৃজা তোমার শরীর খারাপ।

    সৃজা মাথা নাড়ে। কি করে বলবে সৃজার শরীর নয় মন খারাপ। তাহলেই মিস্ জিজ্ঞেস করবে মন খারাপ কেন। আর তখনই মা-বাবার কাট্টির কথা বলতে হবে। তাই মনোযোগ বাড়াতে তখন আরো বেশি মনোযোগী হয়।
    দেহটা টানতে টানতে মার সাথে সৃজা রিক্সায় উঠে বসে।

    স্কুল ছুটির সময় মাকে দেখে বুঝল কাট্টি এখনো চলছে। আরো একদিন। বড় লম্বা মনে হয় সৃজার। আজ বাড়ি ফিরে জানলার ধারে যায় না সৃজা। জানে মা আজও রিক্সার পেছনের পর্দা সরাবে না। তবে মিনতি মাসির সাথে জেদ করে অল্প খায়। তারপর অনেক কষ্ট করে হোমটাস্কগুলো করে রাখে।

    তবু সন্ধ্যে বেলায় মা দেখায় হোমটাস্কে কতগুলো ভুল ছিল। ক্লাসের খাতায়ও অনেক লালদাগ। প্রতিটি ভুল আর লাল দাগের জন্য মার কাছে অনেক বকা শোনে। বাবা ঘর অন্ধকার করে চুপচাপ আই-পডে গান শুনছে। একবার ভাবে বাবাকে গিয়ে বলে ভাব করে নিতে। আবার ভাবে মা’র কাছে যাবে! তাদের ক্লাসে সপ্তর্ষি খুব দুষ্টু। সবার সাথে ঝগড়া করে। আড়ি হয়। আবার ভাবও হয়ে যায়। আর বাবা মা দুজনেই তো ভালো। তবে এদের কেন ঝগড়া হয়! আর একটু ঝগড়া হলেই বা! সপ্তর্ষি তো দু’মিনিটেই ভাব করে নেয়। এতদিন কেন লাগে বাবা-মার ভাব হতে। স্কুলের বন্ধুদের একদিন গল্প করতে করতে একদিন সৃজা ঠাম্মাকে বলেছিল –

    – আচ্ছা বল তো, বন্ধুদের মধ্যে কেন আড়ি-ভাব হয়। দিদান বলেছিল –
    – বন্ধু বলেই! সূর্য যখন মধ্য গগনে তখন তার আলোর কোনো ছায়া থাকে না। আবার যখন পূব বা পশ্চিমে হেলে থাকেন তখন তাঁর আলোয় ছায়া থাকে।

    সৃজা দেখেছে ঠিক দুপুরে রোদে তার কোনো ছায়া পড়ে না। তবে দাদুর কথা একদম বোঝে না সৃজা-
    – ইঁট জুড়ে জুড়ে বাড়ি হয়। ইঁট জুড়তে লাগে সিমেন্ট। আর সিমেন্ট জমতে তো একটু সময় লাগবে! বন্ধুত্ব একটা বিশাল মজবুত বাড়ি।

    ইঁট, বাড়ি, সিমেন্ট আর বন্ধুত্বের সম্পর্কের থই পায় না সৃজা। সে রাগ করে দাদুকে বলে-
    – তুমিও বাবার মত কঠিন কঠিন কবিতা লেখ।

    মা থালা বাসন গুছিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় আসতে দেরী হয়। বাবা সিগারেট জ্বালিয়ে ঘন্টা খানেক ছাদে ঘোরে। তারপর নিচে এসে দাঁত মেজে বিছানায় আসে। তাই সৃজা কমিকসের বই নিয়ে বিছানায় যায়। আর তা’ পড়তে পড়তে একসময় চোখ জুড়ে ঘুম আসে।আজ বিছানায় কমিকসের বই পাশে রেখে দেয়। লিখতে বসে সৃজা। অনেক- অনেক কথা। লেখা শেষ হয়ে যায় একসময়। চোখ জ্বালা করছে। কোলবালিশটা জোর করে জড়িয়ে তাই ঘুমোতে চেষ্টা করে।

    অমৃতা শোবার ঘরে এসে দেখে কোল বালিশটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে সৃজা ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘামে গা সপসপ করছে। কমিকস বইয়ের সাথে রুল টানা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে সৃজার চিঠি চোখে পড়ে অমৃতার। এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলে চিঠিটা। বুক ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসতে চায় অমৃতার। শব্দ করে না, পাছে সৃজার ঘুম ভেঙে যায়। লাভা কান্না চাপা আর্তনাদে গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।

    সেই সময় ঘরে ঢোকে সায়ন। দেখে অমৃতা একটা রুল টানা কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে। চোখ থেকে গাল বেয়ে টসটস করে জল গড়িয়ে পড়ছে। রুলটানা কাগজ! এ তো সৃজার কাগজ। কি লিখেছে সৃজা! ছড়া! মেয়েটা টুকুস টুকুস করে ভালো ছড়া লেখে। তবে অমৃতার চোখে জল কেন! অমৃতার পেছন থেকে সায়ন দেখে সৃজার চিঠি-

    ঠাম্মা-দাদু,

    মা-বাবা আবার কাট্টি করেছে। মা-বাবা কাট্টি করলে আমি কার দলে যাব বল তো। মা দুর্গার মত। বাবা কি করে দুষ্টু হবে! দুষ্টু তো অসুর। অসুরের সাথে কি দুর্গার বিয়ে হয়। ওরা কাট্টি করলেই আমার খেতে ইচ্ছে করেনা। বমি হয়। পড়ায় ভুল হয়ে যায়। রাতে ভুত-রাক্ষসের স্বপ্ন দেখি খালি। ভয়ে আমার প্যান্টি ভিজে যায়। বলতো আমি কি ইচ্ছে করে করি। আমি বড় হয়েছি না। বড়রা কি বিছানায় হিসি করে? মন আরো খারাপ হয়। তোমাদের কঠিন কঠিন কথা আমি কিচ্ছু বুঝিনা। তোমরা আসো শিগগির। মা-বাবাকে বকে দিয়ে যাও।যদি না আসো, তবে আমি তোমাদের ওখানে চলে যাব। মা-বাবা কাট্টি করলেই চলে যাব। কাট্টি শেষ হলে মা-বাবা দুজনে গিয়ে আমায় নিয়ে আসবে। ফোন করলে মা-বাবা শুনতে পাবে। তাই চুপিচুপি চিঠি লিখছি। কাল দুপুরে পিওন কাকু আসলে দিয়ে দেব। চিঠি পেয়েই আসবে কিন্তু। নইলে কাট্টি—কাট্টি—কাট্টি।

    সৃজা

    সায়ন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে হয় তার হার্টটাকে কে যেন খুবলে বাইরে বার করে নিচ্ছে। একটা চাপা আওয়াজ বেরোয় তার মুখ থেকে-

    – মা—আ—আ রে—রে—রে।

    অমৃতা আস্তে করে সায়নের ঠোঁটে আঙুল চাপা দেয়। হিসহিস করে বলে –

    – ঘুম ভেঙে যাবে—। তারপর দু’হাতে সায়নের মাথার দু’পাশের চুল মুঠি করে চেপে সায়নের মুখের কাছে মুখ নিয়ে বৃষ্টি- ভেজা চোখে বলে-

    – কিছু বলো সায়ন—- নইলে সৃজাকে রাক্ষস-খোক্কশের হাত থেকে বাঁচাবে কি করে। বল – বল— বল—–

    দুহাত মুঠো করে ছোট ছোট ঘুষি মারতে থাকে অমৃতা সায়নের বুকে। সায়ন খুবলে নেওয়া বুকটা তুলে ধরে অমৃতার কাছে। বুঝতে পারে ঘুষিগুলো তার খুবলে নেওয়া বুকটাকে একটু একটু করে মেরামত করছে এক দৃঢ় ইমারতের জন্যে।

    SHARE

    LEAVE A REPLY