ব্রাত্য বসু : সময়ের অমোঘ আলো

    2
    1448
    পম্পা দেব
    ব্রাত্যজন নাট্টদলের সদস্য। কবিতা লেখেন ও অভিনয় করেন।

    ‘The greatest difference between the artist or poet and the ordinary person it found; as has after been pointed out, delicacy freedom of the connections he is able to make between different elements of his experience’ – I. A. Rechards (The poets experience Principles of literary criticism)

    ‘এটা ব্যক্তি মানুষের সংকট। যেটা থিয়েটারের ক্ষেত্রেও সত্য। যে – আমি কী বলব, কীভাবে বলব, কতটুকু বলব। কেননা – আমার উল্টো দিকে যে অন্ধকার বসে রয়েছে সে তখন সাধারণ মানুষ, জীবন্ত। সমাজ আর রাজনীতির প্রতিভূ হয়ে। সে হয় আমার সমাদর করবে অথবা রক্তচক্ষু দেখাবে। তবু থিয়েটার অবিরত। পথে-ঘাটে, সমুদ্র সৈকতে কিংবা বাড়ির ছাদে থিয়েটার ঘটছেই, ঘটবেও।’ – ব্রাত্য বসু (ব্রাত্যজন নাট্যপত্র নবমসংখ্যা)

    বিপন্নবিস্ময়

    বিপন্নতাই যখন থিয়েটার, বারবার নিজেকে discomfort zone-এ ফেলার যে তাগিদ, যা নিয়তিবাদকেই ভাবায় আর সেই বিপন্নতার অদ্ভুত উল্লাসেই জন্ম নেয় মুহূর্ত, যে মুহূর্তে কিছু হয়ে ওঠা থাকে, তৈরি হয় যে মগ্নচৈতন্যের আলো, গড়ে ওঠে এক নিপুণ নাট্যভাষা, আত্মখননের সুচারু নন্দনতত্ত্ব, সাদাকালোর অন্তর্গত যে ধূসর প্রান্তরেখা তাকে ক্রমশ চিনে নিতে নিতে, আত্মদহনের তীব্রতায় নিজেকে পোড়াতে পোড়াতে যে ছাই, যে ভস্ম পড়ে থাকে, কোনওদিন সেই ভস্মের পরাগরেণু থেকে উঠে আসবে এক মহৎ নির্মাণ। সেই নির্মাণের নাম ব্রাত্য বসু।

    সেই নিজস্ব থিয়েটারি ভাবনাকে, চেতনাকে বাংলা নাট্যপরিসরে বিস্তার করার অগ্রণী যিনি হয়ে উঠলেন বাংলা নাট্যইতিহাসে একজন Cult। ট্রেডিশনাল নাটকের বাইরে তাঁর নাটক নিয়ে এল একটা নিজস্ব পরিসর। Anti-establishment-এর জায়গা থেকে decodification জায়গা থেকে, যে  ‘Searching for the refinement of soul’ (তাঁর নিজস্ব বয়ানে) একটা নিজস্ব ভাংচুর, গত শতাব্দীর থিয়েটারিতত্ত্বকে তথাকথিত dice থেকে যা একটা বলিষ্ঠ অতিক্রম। চেকভ, আর্থার মিলার, হেনরিক ইবসেন, রবীন্দ্রনাথের নাট্যে অনুপ্রাণিত ব্রাত্য বসু তৎপর তাঁর নিজস্ব ছন্দে। প্রথাগত থিয়েটারি ভাবনার কালোত্তীর্ণ চিন্তক নিজের ভাবনা-বিশ্বাস-চর্চার মধ্যে এক এলিমেন্ট খুঁজে পাচ্ছেন যা experimental, self-contradictory, spontaneous, instinctive, text যখন তাঁর কাছে পার্সোনাল টক থেকে সোশাল টক থেকে একটা সিন্থেসিসে ট্রানফর্ম করছে, তৈরি হচ্ছে নতুন ভাষ্য। ব্রাত্য বসুর নাটকগুলো একএকটা পার্সপেক্টিভ খুলে যেয় যেখানে প্রতিটা নাটক ডিফারেন্ট ফ্রম ইচ আদার। নাটকের মুখ্য জায়গাগুলো একএকটা নিজস্ব ফর্ম পায়। শিশির ভাদুড়ি, গিরিশচন্দ্র ঘোষ থেকে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, বাদল সরকার হয়ে ব্রাত্য বসু পা রাখলেন সেই সময়ে যখন উঠে আসছে consumer culture, গোষ্ঠী চিন্তা থেকে fundamentalism, power structure থেকে society-র undercurrent-এ, individual existence, deconstruction-ের নানান প্রশ্ন আর তথ্য, সমকালকে চিনে নেবার প্রয়াস, পরিসর। ব্রাত্যর নাটকে সেই প্রশ্নগুলো  একটা Galaxy-র ছুটে বেড়ানো নক্ষত্র, সমাজ ও ব্যক্তির মুখোশ খুলতে খুলতে একটা খাদের ধারে নিয়ে গিয়ে ফেলে। তাঁর নাট্যবিন্যাসে এমনকী characterগুলোয় প্রথম থেকেই কতগুলো লেয়ার (স্তর) থাকে। স্তরীভূত ঘটনা এবং ব্যক্তির যে পারস্পরিক টানাপোড়েন, interaction যে crisis, যে দ্বন্দ্ব যা একটা raw জায়গা থেকে একটা climax-এ পৌঁছোয়। এই জার্নিটাই ব্রাত্যর নাটকের মুখ্য ভার্সন তৈরি করে। মানুষ শেষ অবধি কোথাও অসম্পূর্ণ, অর্ধেক, তার সঙ্গে সমাজ ও গোষ্ঠীর, অন্যান্য চরিত্রগুলোর সমান্তরাল চলন জারি রাখে।

     

    ‘কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়’

    ব্রাত্য বসুর নাটকে প্রধান সম্পদ হল তাঁর text তাঁর নাটক রচনা। স্ক্রিপ্ট যা একটা বেসিক স্ট্রাকচার তাকে ধরেই এগোয় বাকি বিন্যাস। তিনি জানেন নাট্যভাষা এবং মঞ্চভাষাকে একত্রে বিন্যাস দেওয়ার শিল্পনৈপুণ্য। যা তীক্ষ্ণ, স্বতঃস্ফূর্ত, demanding আর justified যে সেখান থেকে উঠে আসা সময়, যে সময় কখনও উত্তর-ঔপনিবেশিক, উত্তর-আধুনিক নাট্যপরিসর তৈরি করে। দ্বিতীয়ত বিষয়গত দিক থেকে তাঁর নাট্যগুলি ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের যার ঐতিহাসিক ও ধারাবাহিক ক্রমানুযায়ী বিভিন্ন সময় সমাজ ও ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সম্পর্ক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ঘাতপ্রতিঘাতের নিরিখে উৎঘাটিত হয়। নাট্যবিন্যাস অপূর্ব নিপুণতা নাট্যনির্মাণের যে সূক্ষ্ম নাতি-সূক্ষ্ম প্রয়োগ তা অভাবনীয়। নিরীক্ষার দর্শন থেকে উদ্ভাসিত হয়ে যে স্পেস যে হিরণ্ময় মুহূর্ত যে প্রাঞ্জল বীক্ষণ, তা এক গভীর মগ্নতার দিকে ধাবিত করে। বিপরীত প্রান্তে বসে থাকা অন্ধকারকে। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে। দর্শক পাঠককে ভিড় থেকে নির্জনে এক পরিক্রমণ ঘটায়। যা কিছু আপাত স্থির ঠিকঠাক স্থিতিশীল মনে করা হয় তা আসলে এক বিভ্রম এক বিস্মৃতি, এক ওপিয়ামের মতোই আচ্ছন্ন করে রাখা সময়কে তীব্র ঝাঁকুনি দেয়, আবার সে নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করে যা সে দেখেছে আর যা সে দেখতে পারে তার মধ্যেকার পরিসরের ‘ধূসর গোধূলি’। তাঁর নাটক এক অর্থে স্বাধীনতা বহন করে। অভিনেতার স্বাধীনতা, দর্শকের স্বাধীনতা। Open-endedness। এ কথা অনস্বীকার্য তাঁর নাট্যগুলি কেবল পাঠগত দিক থেকেও এক সূক্ষ্মানুভূতি দেয়। মৌলিক সাহিত্য হিসেবে যা ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত। সময় ও চারপাশের যাবতীয় শব্দ চিৎকার, আর্তনাদ, এমনকী নৈঃশব্দকেও তিনি তাঁর নাট্যনির্মাণে বেঁধে ফেলেন এক অনায়াস সুচারুতায়। নিজের মতো করে ভাবার যে অবকাশ থাকে তা কখনওই আরোপিত নয়। প্রয়োগ নৈপুণ্যের দিক থেকে অতি উচ্চমানের যে নির্মাণ যার অন্তর্বর্তী স্তরগুলো এমনভাবে আসে যাতে according to audience/spectators perception, দর্শকমনে তা বিভিন্ন মাত্রা ছুঁয়ে থাকে। Popular element আবার high art, সাধারণ মেধার দর্শক আবার উচ্চমেধার দর্শক একভাবে নিতে পারেন। থিয়েটার শুধু আর্টই নয় তা এন্টারটেইনমেন্টও বটে। তাঁর নাটকগুলো এক অর্থে পলুলার আবার intellectual অথচ যা presentation-এর দিক থেকে কখনও contradict করে না। Casting-এর দিক থেকে, pattern-এর দিক থেকে, intellect-এর দিক থেকে, sense-এর দিক থেকে যা ইউনিক। পিরিয়ড পিস হিসেবে যে নাট্যগুলির মহৎ নির্মাণ আমরা দেখি আত্মীকরণের দিক থেকে টেক্সচারের দিক থেকে যা ক্ল্যাসিক হয়েও কনটেম্পোরারি, এই উভয় অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। তার (নাট্য) নির্মাণকাল, তার প্রয়োগ, নৈপুণ্য, নাটককার ও নির্দেশকের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, অনুভবের, বীক্ষণের, দর্শনের, লজিকের, ভিস্যুয়ালাইজ করার যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নাট্যভাষা, যে বয়ান তাকে মহৎ নির্মাণের ভেতর প্রতিষ্ঠা প্রদানের মধ্যেই তার বীজবপন, তার উৎকর্ষতা, তার যাবতীয় আদান-প্রদানের ভিত প্রস্তুত হয়। যা একদিক থেকে সাহিত্য, মৌলিক, বৌদ্ধিক, জনপ্রিয়। এই সরলরেখাই তাঁর নাট্যরচনা, নাট্যনির্মাণ ও সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি যা তাঁর নিজস্ব নাট্যকৌশলের উপরেই স্থিত।

    তাঁর প্রতিটি নাটকই নাগরিকজীবনের, ব্যক্তিজীবনের, সমাজজীবনের এবং ব্যক্তি ও সমাজের, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সংকট, টানাপোড়েন, বিপন্নতা, ইনসিকিওরিটি আবার কখনও নির্লিপ্তির মধ্যে একটা বহমানতা থাকে, একটা Jerking থাকে যেটা জানান দিয়ে যায় truth and reality-র এক sub-version।

    তাঁর প্রথম মৌলিক নাটক ‘অশালীন’ communication-gap থেকে যে বোধ যে ভাষা যে অনুসন্ধান করতে চাওয়া বাইরে থেকে যা ঠিক বিন্যস্ত ভিতরে তার উল্টো স্রোতও বইতে পারে। আর তৃতীয় কেউ এসে যখন এই শৃঙ্খলাকে ভেঙে দিতে চায়, সমাজের কাছে কোনটা শালীন আর কোনটা অশালীন এই প্রশ্নের বীজ বপন করে দিয়ে যায় তখনই তৈরি হয় একটা jerking। Postmodern নাটক হিসেবে আদৃত হয় ‘অশালীন, বিতর্ক সমেত।

    ‘অরণ্যদেব’ নাটক ‘একধরনের রিঅ্যাকশন যা অনেককিছু অ্যাকশনের প্রতিকল্পে নির্মিত’ (তাঁর নিজের কথায়)।

    ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকে সমকালের প্রতিবিম্বে সমকালকে চিনতে না পারার এক অমোঘ সত্যের জন্ম হয়। পিতা-পুত্রের কথোপকথনের ভেতর দিয়ে জন্ম নিচ্ছে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা, সত্যতা।

    ‘কৃষ্ণগহ্বর’ নাটকে সমকামী মানুষের যন্ত্রণা, সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্সের নিরিখে মানবজীবনের অস্তিত্বকে বুঝতে চাওয়া।

    ‘হেমলাট দ্য প্রিন্স অফ গরাণহাটা’ নাটকে গ্লোবাল সময়কে, ক্ল্যাসিক পিরিয়ডকে স্থানীকরণ করে ব্রাত্য বসু নির্মাণ করলেন সেই নাট্য যা এমন এক সময়ে আমাদের নিয়ে ফেলে যেখানে উঠে আসে উত্তর কলকাতা ও তার আশেপাশের মানুষ, তাদের জীবনযাপন, প্রমোটারি রাজ, চরিত্রগুলোর মধ্যেকার বিশ্বাসঘাতকতা, অন্তর্ঘাত, হত্যা, ট্র্যাজেডির যে melancholy, যে মরাল ক্রাইসিস যা বারবার হেমলাটদের হত্যা করতে চায়। এই নাটকে আরও একটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য যে নাটকে হেমলাটের বাবা সেই সময়কার হিট কিছু হিন্দি গানের মধ্যে দিয়ে হেমলাটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়। যা একটা metaphor।

    ‘মুখোমুখি বসিবার’ নাটকটি কবিতার বিন্যাসে এগোয়। এর মধ্য দিয়েই নারীপুরুষের প্রেম ও বিচ্ছেদ আমরা দেখতে পাই।

    ‘পেজ ফোর’ নাটকে আমরা দেখতে পাই ইন্টেলেকচুয়্যাল পাওয়ার সেন্টার কীভাবে প্রয়োগ করে তার অধিকার।

    ‘বাবলি’ নাটকে যেভাবে একটি বহিরাগত ছেলে, সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে যে টেরোরিস্ট হঠাৎ-ই এসে পড়ে ছিমছাম সাজানোগোছানো একটি সংসারে যেখানে বাবলি তার প্রেমিক(রণিত) আর সেই ছেলেটির(কোরক) মাঝখানে একটি নিরপেক্ষ জায়গায় মাঝে মাঝে এসে দাঁড়ায়। তার এই নিরপেক্ষতা একপ্রকার আত্মসমীক্ষা কখনও যা রণিতকে নিয়ে, কখনও কোরককে নিয়ে, কখনও বা পরিবারকে নিয়ে। নাটকে তৈরি হওয়া মুহূর্তগুলোতে বাবলি কতগুলি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। ব্যক্তির ওপর সমাজের, রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া কথা, সংজ্ঞাকে নিজের দেখায় বুঝে নিতে যায় বাবলি। শেষ অবধি এই নাটক এক নির্লিপ্তির দিকে নিয়ে যায়।

    ‘কন্যাদান’ নাটকটি বাবা ও মেয়ের মতাদর্শগত বিরোধে বিন্যস্ত। একটি দলিত মারাঠি ছেলেকে বিয়ে করার ফলে মেয়েটি উপলব্ধি করে যে তার বাবার এতদিনকার আদর্শ আসলে গিমিক। এই নাটকটি সম্পাদনা ও নির্দেশনা করেন ব্রাত্য বসু। মূল নাটক বিজয় টেন্ডুলকার লিখিত।

    ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ সেই অবিস্মরণীয় নাটক যেখানে কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী শ্রী দেবব্রত বিশ্বাস ও সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে কীভাবে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ওপর শিল্পীর ওপর তার অধিকার প্রয়োগ করে এবং সেই প্রেক্ষিতে একজন প্রকৃত আর্টিস্টের যে স্ট্রাগল তাকে তুলে ধরে। সময়ের এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণে এই নাট্যের উত্থান।

    ‘সিনেমার মতো’ নাটকে প্রযুক্তির এক অসাধারণ প্রয়োগ ঘটে, এই নাটকেও প্রোটোগোনিস্ট অভিজিৎ দত্তগুপ্ত আত্মধ্বংসের যে বীজ নিজের মধ্যে বহন করে চলে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে সিনেমার মতো একটা বাণিজ্যকে ফেস করতে হচ্ছে পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে, যখন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটছে, সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে তথাকথিত কমার্শিয়াল সিনেমার, উদ্ভব ঘটছে এক নতুন প্রজন্মের যারা আর্ট ফিল্ম আর কমার্শিয়াল ফিল্মের গুণগত পার্থক্য করছে। পুরো সিস্টেমটাই বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে প্রডিউসারদের প্রেজেন্টেশও এই রকমই এক বদলে যেতে থাকা সময়ের যা পারিবারিকও, মাঝখানে এসে পড়ে অভিজিৎ দত্তগুপ্ত। আর এর সঙ্গে ইন্টেলেকচ্যুয়াল আর নন্‌ইন্টেলেকচুয়াল ক্রাইসিসও ধরা পড়ে।

    ‘কে’ নাটকে মানবসম্পর্ক তার পারস্পরিক সংকট প্রতিফলিত হয়। বিয়ে নামক সামাজিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব আদৌ আছে কিনা থাকলেও তার প্রয়োজনীয়তাই বা কতটুকু সেটাই বুঝে নিতে চাওয়া এই নাটকের মূল বক্তব্য। ৫০ বছর পরেও বিয়ে নামক এই প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞাই হয়তো বদলে যাবে। লক্ষ্যণীয় এই নাটকে ক্রিকেটিও অনুষঙ্গে নাট্যবিন্যাস ঘটে। ব্যক্তির ইগো আর অলটার ইগোর যে আত্মবিরোধ তা এই নাটকের প্রধান উপজীব্য।

    তাঁর সাম্প্রতিকতম নাটক ‘বোমা’ স্বাধীনতাপূর্ব ব্রিটিশ অধ্যুষিত কলকাতার যে ক্রেজি অর্গানাইজেশন তৈরি হয় যাকে Bengal Revolutionary Party বা Secret anarchist সংঘ বলা হত। ঘটনার পরম্পরায় শেষাবধি দেখা যায় এই সংগঠনের ভাঙন, অন্তর্গত বিশ্বাসঘাত, পারস্পরিক সন্দেহ, ঈর্ষা, ক্ষমতালিপ্সা, অধিকারবোধ বা অভিশপ্ত অন্তর্ঘাতে ধ্বংস হয়। নাটকের শেষে অরবিন্দ ঘোষ ও কল্পনার পারস্পরিক বিবৃতির মধ্যে দিয়ে ধরা পড়ে ব্যক্তিসমাজ, ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠানের খণ্ড খণ্ড বীক্ষণ।

    ‘মৃত্যু ঈশ্বর যৌনতা’ এমন একটি নাটক যেখানে জীবনের তিনটি স্তরে আমরা প্রত্যক্ষ করি যে দর্শন তাকে তিনটি সময়ে ভাগ করে নিয়েছেন নাটককার। সকাল : যৌনতা, বিকেল: ঈশ্বর, রাত্রি : মৃত্যু। আত্মজিজ্ঞাসা, অজানাকে জানার, জীবনের এই তিনটি জৈবিক, বৌদ্ধিক, মানসিক স্তরে উপনীত হয়ে আত্মার কাছে নিজের যে স্বীকারোক্তি, যে দার্শনিক নন্দনতত্ত্ব, যে কাব্যময়তা, কখনও পুনর্জন্মের বিশ্বাসে, আকাঙ্ক্ষায় তা শান্ত করে শরীরকে, মনকে, চেতনাকেও। ব্রাত্য বসুর কবিতা এ নাটকের সম্পদ।

    ‘তাঁর অতি সাম্প্রতিক নাট্যনির্দেশন ‘অদ্য শেষ রজনী’। এটিও একটি Biographical journey যা অসীম চক্রবর্তীর ‘Struggle for theatrical existence’-এর ওপর আধারিত ও মঞ্চায়ন। ফিনিক্স পাখির মতোই যার উড়ান।

    ‘মুম্বাই নাইটস’ নাটকেও Shakespearian Comedy-কে এই সময়ের আন্তর্জাতিক নাশকতামূলক সময়ে এনে ফেলেছে। যেখানে মুম্বাই ব্লাস্টে হারিয়ে যাওয়া দুই ভাইবোন কীভাবে শেষমেশ খুঁজে পায় পরস্পরকে এবং ভালোবাসার মানুষকে সেই অনুষঙ্গে এসেছে সমকালীন রাজনীতি কীভাবে নাগরিক জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে তার ছবি।

    ‘মেঘে ঢাকা তারা’ যা ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী সিনেমার মঞ্চনির্মাণ। নিতার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই দেশভাগের যন্ত্রণা, ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষের কলোনিজীবন। গল্পের অনুষঙ্গে নিতার প্রেম, বিচ্ছেদ, বিরহ, তার সংগ্রাম যা শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। এক কাব্যময় করুণ হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। মঞ্চের উপর, মঞ্চের বাইরে। দর্শকমনে। এই নির্মাণে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের এক অসাধারণ মিশ্রচিত্রকল্প।

    ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ নাটকটি অতিসাম্প্রতিক একটি মঞ্চায়ন। উত্তরগঠনবাদীতত্ত্বের যে নান্দনিক প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় সমগ্র প্রযোজনাটিতে তা থেকে উঠে আসে থিয়েটারের এক নতুন ভাষ্য। নিজস্ব স্বর যা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন থিয়েটারসংজ্ঞা নির্মাণ করে। ব্রাত্যের নাটকের প্রধান শর্তই হল তাঁর নিজস্ব নির্বিকল্প শ্রম, মেধা, মনন, দূরদর্শিতা, অনাগত সময়কে এবং তার চারপাশের তদনুরূপ সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি, গোষ্ঠীর অভিযোজনকে সময়ের নিক্তিতে মেপে নিজের জ্ঞানগর্ভে ধারণ করা। ইতিহাস, প্রবন্ধ, তত্ত্ব ও তথ্যের শৈল্পিক মিশ্রণে নির্মিত হয় ব্রাত্য বসুর নাটক। টেক্সট ও টেক্সচারের দিক থেকে। বাঙালি আবার কবে উদ্যোগপতি (entrepreneur) হবে। আবার ঝুঁকি নিতে শিকবে, উঁকি দেবে খাদের ধারে এবং সেখান থেকেই ফিরে আসবে উৎসবে উল্লাসে স্বমহিমায়। এই মূল উপপাদ্যটির ছায়ায় এগিয়ে চলে গল্পের চলন।

    (এখানে তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু নাটকে আলোকপাত করা হল।)

     

    ‘কি এক বোধ কাজ করে’

    যে কয়েনএজ-এর জন্ম তিনি দিয়েছেন অর্থাৎ থিয়েটারে Producer Director অর্থাৎ alternative theater space and economy যা জারিত থাকে সেই পদ্ধতির নির্মিতির পথে যেখান থেকে উদ্ভাবিত হয় নিজস্ব নাট্যস্বর ‘কোম্পানী থিয়েটার’। শিল্প(আর্ট) আর বাণিজ্য(কমার্স) যেখানে হাত ধরাধরি করে চলে। এক দার্শনিক প্রজ্ঞা, মেধা, প্যাশন, সংরাগ মিশ্রিত এক উচ্চকিত আলোকবিন্দু যা তার সংস্কৃতির অতীত ঐতিহ্যকে ধারণ করে সমকালের চিন্তায় নির্মাণ করেছে এমন এক বিস্ময়, এক ইস্তেহার এক ইতিহাস ও প্রবন্ধ সমৃদ্ধ নিটোল গদ্য, যার অন্তঃস্থল থেকে কবিতার নির্যাস গায়ে মেখে জন্ম নেয় থিয়েটার নামক প্রান্তিক এক শিল্পের অভিজাত শ্বেদবিন্দু। তিনি প্রথম এক প্রসেনিয়ামে, এক ছাতার তলায় এমন এক উদ্যোগ নিতে প্রয়াসী হলেন যেখানে অনেকগুলি দল(গ্রুপ) ক্রমানুযায়ী কাজ করবে অর্থাৎ আপাত স্থিতিশীল একটা সময় নির্ঘন্ট।

    তাঁর প্রথম রূপান্তরিত নাটক ‘ওরা পাঁচজন’ (Five Men Army), নাট্যদল গণকৃষ্টি। তাঁর প্রথম অভিনয় ‘মান্যবর ভুল করছেন’ (Twelve Angry Men), রূপান্তর ব্রাত্য বসুর বাবা ডঃ বিষ্ণু বসু। পারিবারিক সূত্রে ডঃ বিষ্ণু বসু, ডঃ নীতিকা বসুর পুত্র ব্রাত্য অর্জন করেছেন এক অধিকার। সাহিত্যচর্চার, নাট্যচর্চার, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্মিলিত সংস্কৃতিকে লালন করার। নিজস্ব ঘরানার বেড়ে ওঠা যে কৈশোর, যে তারুণ্য তাঁর মধ্যে গ্রোথিত করেছে এক বিশ্বজগত(Universe)। বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাসে, ক্ষমতাকেন্দ্রগুলির অবদান যে সীমিত ও কৃপণ স্বভাবের, তা নিয়েও তিনি বিচলিত, অনুভব করলেন নিয়তিতে তাঁর থিয়েটার, বুঝলেন বাংলা নাটকের সীমাবদ্ধতা। দায়িত্ব থেকে অনুপ্রেরণা যা আসলে অন্তর্নিহিত প্রতিভারই এক সুচারু বিস্ফোরণ। মোহিত চট্টোপাধ্যায় ব্যতিরেকে সেই সময়ের যে নাটক, যা নাট্যকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিলক্ষিত হয় যে টেক্সট হিসেবে বা মৌলিক নাটক হিসেবে নাটকের জায়গাটা শূন্য। তাঁর নিজের কথায়, ‘তার বাইরে যেগুলি রয়ে গেছে এক ধরনের কোট-আনকোট সোকলড পলিটিক্যালাইজেশন, যেগুলিকে আসলে পলিটিক্যাল নাটক না বলে সমসাময়িক কিছু প্রোপাগান্ডা, কিছু স্টেটমেন্ট, নাটককারের রায় – সেগুলোও এক অর্থে আমার কাছে ট্র্যাডিশনাল… নতুন যেগুলো এখনও হতে পারে, ১০০ বছর আগেও হতে পারে, সেগুলোই ট্র্যাডিশনাল এবং ভালো নয়। এই অর্থে আমি বলতে চাইছি।’

    তাঁর নিজের নাটক নির্মাণ ক্ষেত্রে কোনও সোশ্যাল বা পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট জোর করে সংলাপে বা বিন্যাসে গুঁজে দেওয়া নয় বরং তা স্বাভাবিক অমোঘ নিয়মেই উঠে আসে। কোনওরকম ইজম্‌ বা গিমিকে নির্ভর করে নয়। বরং দেশীয় সীমাবদ্ধতা থেকে আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠাই ব্রাত্য বসু। বিপজ্জনকভাবে বাঁচার শর্তটাই প্রধান হয়ে ওঠে। নিজের নাট্যভাবনাকে সেই মহৎ, নিষ্ঠুর, সূখম রসিকতার মধ্যে ধারণ করার স্পর্ধাই ব্রাত্যের নাটকের আশ্চর্য আকর্ষণ। ‘আমি সেই সমস্ত নির্যাতিতদের পক্ষ থেকে লিখতে চাই ডাইসে যাদের মেলানো যায়নি, থিওরির মধ্যে যাদের আঁটা যায়নি, কোনও নির্দিষ্ট কাঠামো বা ছাঁচের মধ্যে ফেলা যায়নি অথচ যারা অস্বস্তি তৈরি করেছে, ডিস্টার্ব করেছে – তাদের হয়ে লিখতে চাই। তারা হয়তো আমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, তাদের হয়তো মেরে ফেলা হয়েছে, সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, হ্যাঁ – আমি তাদের হয়ে লিখতে চাই। এবং লিখে যদি আমাকে বেঁচে থাকার ফ্রেমে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হয় তাতেও কোনও আক্ষেপ থাকবে না।’ ‘একটি ব্যতিক্রমী স্বর’, এই চিন্তক আদতে সৃষ্টিশীল একটি আগ্নেয়গিরি হাজার হাজার বছরের অন্তঃস্থ যা কিছু নষ্ট সময় সেসব ভেঙেচুরে উৎখাত করে জন্ম দিচ্ছে নিজস্ব ভাষ্য। নতুন ইস্তেহার। সময় গরলকে উপেক্ষা করে নির্মাণ করছেন নিজস্ব discourse বহন করে চলেছেন এক অ্যাটলাস। অগস্ত বোয়াল বলেছিলেন ‘থিয়েটারের অপর নাম আবিষ্কার’। এই শতাব্দীর থিয়েটারের আবিষ্কারের অপর নাম ব্রাত্য বসু।

     

    SHARE

    2 COMMENTS

    1. স্বল্পপরিসরে গবেষণা মূলক একটি লেখা পড়ে ঋদ্ধ হলাম , ব্রাত্য বসু সম্পর্কে এতো কথা কজনে জানে জানি না , আমি তো জানতাম না ¦
      অভিনন্দন জানাই পম্পা দেব কে ¦

    2. অনুমতি না নিয়েই ‘তুমি’ সম্বোধন করেছি তোমার fb wall -এ গতকালের post-এ ¦ কারন তুমি আমার থেকে বয়সে অনেক ছোটো এবং এটা আমার মনে হয়েছে তুমি আমার এই সম্বোধন অন্য ভাবে নেবে না ¦

      এবার বলি একজন মানুষকে দেখে কিন্তু মানুষটি সম্পর্কে বিশেষ ভাবে বোঝা যায় না ¦ তোমাকে আমি বেশ কয়েকটা কবিতা আসরে দেখেছি কিন্তু পরিচিত হলাম ‘এপার ওপার সাহিত্য উত্সব’-এ ¦ অবাক হলাম তোমার পোস্ট-এর সাথে ছবির সংক্ষিপ্ত বিবরণ পড়ে, বিস্মিত হলাম ব্রাত্য বসুর উপর তোমার লেখা পড়ে ‘উড়ালপুল’-এ ¦ অসাধরন লেখা ¦ আমার মত সাধারন মানুষ ঋদ্ধ হলো তোমার ওই লেখা পড়ে ¦ ভালো থেকো ¦

    LEAVE A REPLY