কল(কাতা)গার্ল

    0
    1031
    অময় দেব রায়
    নিয়মিত আনন্দবাজার সহ বিভিন্ন খবরের কাগজ ও পত্র পত্রিকায় বিশেষ রচনা লেখেন।

    বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি। রেস্টুরেন্টের জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু জল। স্ট্রীটলাইটের আলোয় সন্ধ্যে নামা বর্ষণ ধুইয়ে দিচ্ছে শহর কলকাতার ক্লেদ। তানিয়া আমার উল্টোদিকের চেয়ারে। জানিনা বাবা মায়ের দেওয়া নাম কিনা। ওরা ঘন্টায় ঘন্টায় নাম বদলায়! তরলে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরালো তানিয়া। অনেক তালবাহানার পর অবশেষে তাকে রাজি করানো গেছে। শুরু হল আড্ডা।

    উচ্চবিত্ত পরিবার। সল্টলেকে বিলাসবহুল বাড়ি। বয়স মাত্র ছ বছর। বাবা মার সেপারেশান হয়ে যায়। তারপর বাবার কাছেই মানুষ। মানুষ বলতে সপ্তাহে খুব বেশী হলে দেখা হত মাত্র দুদিন । “ছোটোবেলায় স্কুল ছুটির সময় সবার বাবা মা নিতে আসত। আমার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হত। ড্রাইভার কাকুর সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতাম। তখন থেকেই একা একা ব্যাগ গুছিয়েছি, হোমওয়ার্ক করেছি, রাতে বিশাল একটা বিছানায় একসময় ঘুমিয়েও পড়েছি। ছোটো বয়সেই কিভাবে যেন অনেকটা বড় হয়ে গেলাম। বেশ মারকুটে ছিলাম। মেয়েরা তেমন একটা মিশত না। ছেলেবন্ধুর সংখ্যাই ছিল বেশী। ক্লাস সেভেন এইট থেকেই মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখা আর বিগ বাজারে শপিং আমার নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়ালো। পড়াশুনো লাটে তুলে দিলাম। দেবদান নামের একটি ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হল। দুজনে দীঘা বেড়াতে গেলাম। বাবা তখন বিজনেস ট্যুরে ব্যাংকক। জানতেই পারল না। সেই প্রথম শরীরী সম্পর্কের অনুভূতি। কিন্তু বন্ধুত্বটা বেশীদিন টেকেনি। তারপর আরও দুজন এলো। সেগুলোও বড্ড ক্ষণস্থায়ী। ইতিমধ্যে ব্লু ফিল্মের নেশা চেপে বসল। তখন নিয়মিত তান্ত্রায় যেতাম। গাঁজা আর সেক্স আমার অবসেশন হয়ে দাঁড়ালো। বন্ধুর বন্ধু কিম্বা বন্ধুর দাদা, এভাবে ক্রমশ নেটওয়ার্ক বাড়তে শুরু করল। প্রথমে ছিল ওনলি ফর প্লেজার। একসময় বুঝলাম, ছেলেরা টাকা ঢালার জন্য মুখিয়ে আছে। এভাবেই একদিন এটা পেশায় পরিণত হল।”

    তানিয়া এখন কলকাতার প্রথম সারির কলগার্লদের মধ্যে অন্যতম। মাঝেমধ্যেই ডাক আসে বিদেশ থেকে। উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এক-দু’রাতের জন্য। মেলে প্রভূত অর্থ, সঙ্গে হরেক কিসিমের গিফট। কলকাতার বহু নামী-দামী পাবলিক ফিগারদেরও প্রথম পছন্দ তানিয়া।

    শম্পার প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। বাড়ির অমতে পালিয়ে বিয়ে। প্রথমদিকে বেশ ভালোই কাটছিলো। বছর তিনেকের মাথায় হাজব্যান্ডের চাকরিটা যেতেই সব এলোমেলো হয়ে যায়। “ও সারাক্ষণ মদের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতো। প্রায় দিনই রাতে বাড়ি ফিরতো না। আর ফিরলেও বেধড়ক মারধোর। বুঝলাম, এভাবে চলতে থাকলে, মেয়েটাকে নিয়ে পথে বসতে হবে। বাড়ি ছাড়লাম। বাবা মার কাছে ফেরার পথও বন্ধ। যে করে হোক তখন আমার কিছু টাকার দরকার। হঠাৎ পুরোনো এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা। ও আমাকে এই গোপন লাইনের খোঁজ দিলো। তখন ভেবেচিন্তে কাজ করার মত পরিস্থিতি ছিলো না। প্রথম রাতের কথা ভাবলে এখনও শিউরে উঠি। একটা পঞ্চাশোর্ধ লোক সারারাত ধরে আমাকে ধর্ষণ করল। সে-রাতের পর আমি বহুদিন ঘুমোতে পারিনি। ভাবলাম, সুইসাইড করি। কিন্তু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে পারলাম না। আর এখন আমি এ-লাইনের পাক্কা খেলাড়ি। কিভাবে খদ্দের ধরতে হয়, কিভাবে রেট বাড়াতে হয়, সব নখদর্পণে। ভাবলে অবাক লাগে। মাঝেমধ্যে নিজেকেও চিনতে পারিনা!”

    রঞ্জনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো শম্পা । একসময় স্কুলের ফার্স্ট গার্ল। আইসিএসসি বোর্ডের র‍্যাঙ্ক করা ছাত্রী। কলেজে উঠে মডেলিং এর নেশা চেপে বসল। “ফ্যামিলি ভীষণ কনজারভেটিভ। আমিও ঠিক করলাম, ছেড়ে কথা বলব না। তুমুল ঝগড়া। রেগেমেগে বন্ধুর বাড়িতে চলে এলাম। বন্ধুটি পরিচিত এক ফোটোগ্রাফারকে দিয়ে পোর্টফোলিও বানিয়ে দিলো। বহু জায়গায় সিভি পাঠালাম। পাঠালে কি হবে, সব নো-রেসপন্স। বাড়ি ছেড়ে এসেছি। আমি তখন মরিয়া। যে-কোনো মূল্যে নিজেকে প্রমাণ করতে প্রস্তুত। কিছুদিন বাদে বুঝলাম, পা হড়কে যাচ্ছে। মডেলিং থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসছি। একসময় কর্পোরেট বসদের সঙ্গে বেড শেয়ার আমার রোজ রাতের রুটিন হয়ে গেল”।

    কথা বলতে বলতে গলা ভারী হয়ে এলো। মোটা ফ্রেমের সানগ্লাস ভেদ করে ধরা পড়ল চোখে জল। আর কোনো ভান নেই রঞ্জনার মধ্যে। খোলা পাতার মত মেলে ধরেছে জীবন-কাহিনি। “জানেন, সমস্ত অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট পুড়িয়ে ফেলেছি। কি হবে ওসব রেখে? এখন তো সবই মূল্যহীন। এক-একজন ক্লায়েন্টের এমন সব বিকৃতির কবলে পড়েছি, ভাবলে গা শিউরে ওঠে। একবার গ্রুপ সেক্সের নাম করে দু’জন ক্লায়েন্ট এলো। ওদের পশু বললেও কম বলা হয়। সেদিন রাতে আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। লোক দু’টো ভয়ে পালিয়ে যায়। সকালবেলা হোটেলের বয় এসে আমাকে উদ্ধার করে। হসপিটাল থেকে বেরিয়ে ভেবেছিলাম, সব ছেড়ে দেবো। তখন ফেরার সমস্ত পথ বন্ধ”।

    ইতিহাসে ফেরা যাক। সময়টা ১৯২০। তখনও টেলিফোন বস্তুটির আবির্ভাব হয়নি। ব্রিটেনে কিছু কল-হাউস গড়ে ওঠে। এগুলি ঠিক নিয়মিত গণিকালয় ছিলো না। খদ্দেররা সরাসরি মালকিনের কাছে যেতো। মালকিন লোক পাঠিয়ে চাহিদা অনুযায়ী মেয়ে ডেকে আনত। ১৯৪০ সাল নাগাদ টেলিফোনের প্রসার। অনুচরের বদলে টেলিফোন মারফৎ সংবাদ আদান-প্রদান শুরু। এভাবেই কল গার্ল শব্দটির প্রচলন। তবে, শুধুই দূরভাষ নয়, এর সঙ্গে জুড়ে আছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক  অবস্থান। নিতান্ত ব্যতিক্রম ছাড়া কলগার্লরা কেউ যৌনপল্লীর বাসিন্দা নয়। তাদের উপার্জনও অনেক বেশী। অনেক সময় মাসে লক্ষাধিক পর্যন্ত। কম-বেশী প্রত্যেকেই ইংরেজি শিক্ষিত। একজন সাধারণ যৌনকর্মীর সঙ্গে রুচি, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দৈহিক সৌন্দর্যের বিস্তর ফারাক। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যৌনপল্লীর কর্মীরা নারীপাচার চক্রের শিকার। অনেকের ক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই তাদের এই পেশায় আসা। যদিও এখন কলকাতার সোনাগাছিতে অনেক মেয়েরাই স্বেচ্ছায় বাসা নেন। তুলনায়, কলগার্লরা কিছুটা হলেও স্বাধীন।

    বর্তমানে অন্তর্জাল কলগার্লদের ব্যাপক বিস্তার দিয়েছে। নেট ঘাঁটলেই মিলবে হাজারও এসকর্ট এজেন্সির বিজ্ঞাপন। কলগার্লরা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। তবে মজার বিষয়, সাইবার আইনের মারপ্যাঁচ থেকে বাঁচতে এসকর্ট এজেন্সি গুলো বিশেষ কিছু জার্গন ব্যবহার করে। যার অর্থ না জানলে রূপসীদের নাগাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এই যেমন একটি-

    “True GFE with DDGG, CIM/CIF/COB, 69, No Greek”

    আপাত অর্থে জিবারিশ বলে মনে হলেও এই জার্গানের আড়ালেই লুকিয়ে আছে রহস্যময়ীদের হাতছানি। একটু তলিয়ে দেখলেই মিলবে হদিস-

    “True Girlfriend Experience (GFE) with a drop dead gorgeous girl (DDGG), who allow cum in mouth (CIM), cum in face (CIF), cum on body (COB) and ready to do simultaneous oral sex (69), but no anal sex (no greek)”

    অন্তর্জাল বদলে দিয়েছে অনেক কিছু। কলকাতার কল গার্লরাও তার সদ্ব্যবহার করছে পুরদমে। তৈরি হচ্ছে সেক্সচুয়াল ভ্যারাইটি। আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে পছন্দ মত যৌন সঙ্গী নির্বাচনের অধীকারও এক অর্থে নারী স্বাধীনতার উদযাপন!
    (পরের সংখ্যায় অময় লিখবেন কলকাতার ট্রানসেক্সুয়াল ও হিজরাদের নিয়ে)

    SHARE

    LEAVE A REPLY