সপ্তর্ষি দারোগার টপ্পা

    0
    242
    আবুল বাশার
    জন্ম ১৯৫১ সালে মুর্শিদাবাদ জেলায় হার্মারপুরের এক মুসলমান পরিবারে। বাংলা গল্প, উপন্যাসের এক সুপরিচিত লেখক। বিশটির ওপর প্রকাশিত গ্রন্থ। আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮৮ সালে।

    এক।
    সপ্তর্ষি দারোগাকে মাঝ রাত্তিরে অনুসরণ করছিল একটি নিশাচর বক। এর নাম কিন্তু ‘অক্‌’। রাতচরা এই ‘অক্‌’-কে ভালভাবেই চেনেন সপ্তর্ষি দিয়াড়ী। উনিই পাকোয়ানপুর থানার বড়ো বাবু।
    আজ থেকে ৫০ বছর আগে দিয়াড়ী বেঁচে ছিলেন এবং থানার বড়ো বাবু ছিলেন। বর্ষাকালে উনি ঘোড়ায় চড়ে গ্রাম শাসন করতে বার হতেন। কাঁচা মাটির পথ, ফলে বর্ষা ছিল দীর্ঘ। তা ছাড়া নদীনালা শোভিত এলাকায় ছিল তাঁর খবরদারি।
    দেবদূতরা চড়ে বেড়ায় এ রকম একটি সাদা মিশরীয় বংশের ঘোড়ায় চড়ে উনি অপরাধী ঢুঁড়তে বার হতেন। বাস্তবিকই মিশরীয় শ্বেতপদ্মের মতো ছিল সুমিষ্ট-সাদা গায়ের রং এই প্রাণীটির। এর নাম ছিল শ্রী চনমন।
    এই ধরনের শিল্পী মনের খেয়ালি, দরাজ গলার গায়ক, কখনও কখনও আত্মমগ্ন চিত্রকর, গ্রন্থসংগ্রাহক, পাঠক, গরিব-দরদি, নিতান্ত সৎ পুলিশ অফিসার সংসারে বিরল।
    তার মানে এই নয় যে তিনি ছিলেন অসতর্ক-অকর্মণ্য কোনও পুলিশ। মোটে সে রকম না।
    সপ্তায় একদিন করে চোর পেটাতেন।
    একেক সপ্তাহে একেক এলাকার চোরেদের ডাক পড়ত। ওই নির্দিষ্ট এলাকার এক নম্বর ওস্তাদ চোরকে প্রথমে পাকড়াও করতেন বড়ো বাবু। তারপর তাকে দিয়ে বাকিদের ডেকে পেটাতেন।
    সবাই এসে জমত লোকেরা।
    চোরেরা এবং লোকেরা।
    তখনকার দিনে চোরেরও একটা স্ট্যান্ডার্ড ছিল। যেমন রেফাত চোর। পরে সে রফা ডাকাত হয়ে ওঠে। ওর সাগরেদ ধলা দাস, গুরুরই মতো তারও একটা স্ট্যান্ডার্ড ছিল। ওরা নিতান্ত গরিব-ঘরে চুরি করত না। কেউ অত্যন্ত ধার্মিক বলে খ্যাতিমান ছিলেন। তার ঘরেও সিঁদ কাটত না রফা-ধলা।
    রফাকে একবার ডাকলেন বড়ো বাবু।
    ডেকে বললেন, ‘শুনলাম তুই সিঁদকাঠি ভৈরবের জলে ফেলে দিয়েছিস? মনস্থ করেছিস হাটমারা ব্যবসা করে সংসার পুষবি। কী রে, কথা কি ঠিক?’
    –    ‘আজ্ঞে কে বললে ই কথা! হাজামপাড়ার তারিণী এই সব সমাচার রাষ্ট্র করে বেড়ায়; হেকিম মোল্লার পরামর্শে বড়ো বাবু! আসলে হয়েছে কি, গত বছরটা অতি ঝরায় ফসল নষ্ট হল আজ্ঞে!’
    –    ‘তো?’
    –    ‘হয় কি, তোতা মৌলানা এল হুড়সি দোজখপুর, এসে চোর-টিকরির সকল অধিবাসীকে রামু রুইদাসকে দিয়ে ডাকালে!’
    –    ‘রামু তো দোজখপুর চোর-টিকরির দফাদার!’
    –    ‘আজ্ঞে!’
    –    ‘আচ্ছা, তুই কী যেন বললি! অধিবাসী!’
    –    ‘আজ্ঞে বলেছি!’
    –    ‘কী করে বললি!’
    –    ‘কেন?’
    –    ‘এত ভাল ভাষা কী করে বললি!’
    –    ‘আমি ক্লাস থ্রি-র ফার্স্টবয় ছিলাম আইজ্ঞা। কিন্তু বাপটা, নাম তেনার ঘরামি রসুল, মাটির দেওয়াল চাপা পড়ে মারা গেলে আমি ছোটমামুর পাখির ব্যবসায় হিফাজত করব বলে গেলাম নগর গাঁ। ফার্স্টবয় হলে কী হয়! ফের থ্রি-তে ফার্স্ট হই, কম কথা!’
    –    ‘তারপর? দাঁড়া, আগে খোলসা করে বল, বাপটা কী করে মরল!’
    –    ‘ওই তো বললাম, যা শুনলেন তাই। ঘর ছাইতে গেছে বাপ, বর্ষার আগে-আগে, হয় কি ঘরের দেওয়াল বাপের বুকের ওপর ধসে পড়ে বাপকে চেপে দেয়, বাপের জিভ বার হয়ে মুখের ওপর ঝুলে পড়ে, যমে জান ‘কবজ’ করে কেয়ামত করে দেয় বড়ো বাবু। এই রকম অপঘাতে মরণ গরিবের জন্য খোদার বাঁধা জিনিস হুজুর!’
    –    ‘সুতরাং তুই ছোট মামুর পাখির ব্যবসায় হিল্লে নিলি। কেমন চলত ব্যবসা?’
    –    ‘ভাল না বড়বাবু। নিতান্ত খারাপও না। মাঝে-মাঝে ভাল। মাঝে-মাঝে খারাপ। বেশ খারাপ।’
    –    ‘কীই বা ভাল চলে এই দেশে?’
    –    ‘পাখি পোষার শখ ক’টা লোকেরই বা থাকে! মুসলিমরা জোড়া পাখি নিত লড়াই শেখাবে বলে! ভারি অদ্ভুত আওয়াজ করে যুদ্ধ করবার আগে। গলা ফোলায়। তারপর সাংঘাতিক গা কাঁপিয়ে হাহাকার মাখিয়ে দেয়। আর হিন্দুদের কাছে বোতাম তোতা। সবুজ তোতা। তোতাকে ঠাকুর-দেব্‌তার নাম শেখাতে আমারই ডাক পড়ত।’
    –    ‘বলিস কী রেফাত!’
    –    ‘রেফাত চিত্রকর।’
    –    ‘কী বললি!’
    –    ‘আমি হলাম বড়ো বাবু রেফাত চিত্রকর! পুরা মুসলমান নই, পুরা হিন্দুও নই। আধাআধি।’
    –    ‘আচ্ছা!’
    –    ‘সে যাগগে। শিবের ব্যাপারে আমাদের ভক্তি আছে। ই দিয়ে নামাজও পড়ি। ধর্মের ব্যাপারে কতকটা ঘেঁটে গিয়েছি বাবু! যা হোক। তোতাকে ঠাকুর-দেবতার নাম শেখাতে রেফাত চিত্রকরেরই ডাক পড়ত। পরে হেকিম মোল্লার তাড়ায় পুরা মুসলমান হওয়ার রোখে বাপ চিত্রকর পদবি বদলে মন্ডল টাইটেল নেয়। ফলে বলতেই হচ্ছে রফা মন্ডলের ডাক পড়ত তোতাকে হরি-হরি-কেষ্ট-কেষ্ট শেখাতে। আসলে, সবুজ তোতা, বেড়বার সময়ই বলতাম, শেখালে অল্প চেষ্টাতেই ঠাকুর-দেবতার নাম দিব্যি শিখে যায় মা! গিন্নি বলতেন, শিখিয়ে দিবি? বলতাম, যেদিন আসব দিনটা কাবার হয়ে যাবে মা! গিন্নি-মা কথা কয়টি বুঝে গিয়ে বলতেন, ঠিক আছে, দিন কাবারি কত চাস বল!’
    –    ‘কত?’
    –    ‘নাওয়া-খাওয়া তো ছিল। তা বাদে চাটাক্কা উসুল। পাখিকে বুলি শেখাবার উসুল!’
    –    ‘তা হলে, ঠিকই তো ছিল!’
    –    ‘ঠিক আর ছিল কোথায় বাবু! স্বভাবটা তো ভাল ছিল না!’
    –    ‘তোর!’
    –    ‘আবার কার!’
    এইভাবে কথা চলত দারোগায় আর চোরে। তখনকার দিনে চোরের স্ট্যান্ডার্ড ছিল আর দারোগারও স্ট্যান্ডার্ড ছিল।
    –    ‘আমি একটুখানি হাত-লপকা ছিলাম আজ্ঞে!’ মাথা নিচু করে সসংকোচে বলে উঠল রফা।
    –    ‘কী ছিলি?’
    –    ‘আজ্ঞে, হাত-লপ্‌কা!’
    –    ‘বুঝলাম না! এমন ছিরির ভাষা বলছিস যে শুনে পিত্ত টকে যাচ্ছে!’
    –    ‘আজ্ঞে, ভাষা তো খুব সহজ; কতকটা ছবি-ছবি, এই যা!’
    –    ‘ছবি-ছবি!’
    –    ‘জি। এই যে কথাটা, লপ্‌কা– যে-হাত অন্যের জিনিস দেখলে তুলে নেবার জন্যে লক্‌পক্‌ করে! বিশেষ করে, ভুঁইয়ের ফসল! লালচ-এ মানে লোভে, লক্‌পক্‌ করা – বুঝলেন না হুজুর! প্রথমে লোভটা থাকে চোখে, তারপর হাতে নেমে আঙুলের ডগা পর্যন্ত চলে যায়! তারপর আঙুলগুলো একটু-একটু করে এগোয়। আঙুল এগোচ্ছে, লোভে একেবারে উলুস-ঝুলুস করছে আইজ্ঞা!’
    –    ‘আচ্ছা!’ বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন বড়ো বাবু।
    তখন আরও একটু উৎসাহিত হয়ে রেফাত বললে, ‘আসলে খোদা-ই মানুষোকে লোভী করেছে বড়ো বাবু!
    –    ‘কী রকম?’
    –    ‘যেমন ধরুন মাঠের ফসল, চালের সবজি, কি ধরুন গাছের ফল-ফকারি এদের কি কোনও পোশাক-পর্দা আছে কিছু! খোদা কী করলেন, দিবি তো দে, একেবারেই ন্যাংটো করে দিলেন! মানুষের বেলায় বোরখা, কিন্তু একটা ক্ষীরে কি খরমুজ কি ধরুন একটা সামান্য নোনা ফল! নোনার খোসা থাকাও যা, না থাকাও তা। আমের খোসাটা যদি পোশাক ধরি, পাকলে কি দাঁড়ায় বলুন তো! আমি তো আবার রানি ভবানি আমতলা দিয়ে যাওয়ার সময় পাকা আমের দিব্যি সুঘ্রাণ পাই। কী করব বলুন! ন্যাংটা ফল কি সবজি, একটা পাকা বহড়া কি, একটা পাকা কদবেল। হাত লক্‌পক্‌ করে!’
    সপ্তর্ষি দারোগা ছিলেন সহজে বিস্মিত হওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতাবিশিষ্ট মানুষ। তাঁর বিস্ময়বোধে কখনও জরা বা মরচে ধরত না। প্রত্যেক ভোরে তাঁর চোখদুটি সংসারকে নতুন করে দেখবার জন্য বিস্ময় জড়িয়ে নিয়ে নতুন হয়ে উঠত। একটি তুচ্ছ কথার মধ্যেও তিনি দেখবার বা কিছু নতুন রস আবিষ্কার করার মতো আনন্দ খুঁজে পেতেন।
    –    ‘তা হলে বলছিস লোভে পড়ে হাত লক্‌পক্‌? নাকি?’ বলে ওঠেন বড়ো বাবু।
    থানায় মেঝেয় লুঙ্গি পরে গায়ে একটা নীল-রঙা সানফ্রাইজ কাপড়ের বাংলা শার্ট পরে লেটিয়ে বসে রয়েছে রেফাত চিত্রকর; বাস্তবিকই যে পাঠশালায় ফার্স্টবয় ছিল।
    –    ‘লোভটা কিন্তু ফল-ফসল ন্যাংটো বলে হুজুর! তবে বড্ড খিদে বড়ো বাবু। খিদে একটা জিনিস। হাবিয়া-ফাবিয়া কিছু না। মানুষের পেটের চেয়ে বড়ো দোজখ্‌ নাই।’
    –    ‘হ্যাঁ!’
    –    ‘তবে বাবু হাত লকপকানির ব্যাপারে লাল মিঞার একটা ভূমিকা আছে। দোষ বলব না, ভূমিকা বলব!’
    –    ‘তুই ভূমিকা মানে জানিস?’
    –    ‘কেন জানব না? আমি তো হুজুর ক্লাস ফোরেও ফার্স্টবয় ছিলাম!’
    –    ‘তাই?’
    –    ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ছিলাম বইকি!’
    –    ‘তা হলে, পুরোটা বল। কোন ক্লাস পর্যন্ত ফার্স্টবয় ছিলি?’
    –    ‘নাইন পর্যন্ত!’
    –    ‘অদ্ভুত!’
    –    ‘হবে না! বড্ড খিদে আর বড্ড লোভ! বাবা দেওয়াল চাপা পড়ে মরল। ক্ষমা করবেন স্যার! বাপটার জান-কবজ হল। বাপ মালেক-উল-মওতকে দেখে লুঙ্গিতে ভয়ে বাহ্য করে ফেলেছিল। সেই থেকে খোদার ওপর আমার ভক্তি নষ্ট হয়ে যায়!’
    –    ‘হায় ভগবান!’
    রেফাত চিত্রকর একটা ঢোঁক গিলে দেয়ালে টাঙানো মহাত্মা গাঁধীকে একটা চকিতে নমস্কার পেশ করে নিয়ে বলল, ‘আপনি কি দুঃখ পেলেন বাবু?’
    –    ‘কিসে?
    –    ‘এই যে ভগবানে ভক্তি নষ্ট হয়ে গেল শুনে? পেলেন দুঃখ?’
    –    ‘তা ধর পেলাম।’
    –    ‘পাবেন না বাবু!’
    –    ‘কেন রে!’
    –    ‘দেখুন বাবু! আমি মাস্টার নই! ডাক্তার নই! কী ধরুন, আড়তদার কি ডিহিদার নই।’
    –    ‘বেশ! তুই তা হলে নাস্তিক?’
    –    ‘ওই তো বললাম! আমি অমুক নই, আমি তমুক নই। একটা চোর নাস্তিক হলে কার কী এসে যায় যায় বাবু! তা যাক গে। লাল মিঞা জানতেন আমি হাত-লপ্‌কা। কিন্তু লোভে পড়ে কী যে করলাম, বড়ো বাবু!’
    –    ‘কী করলি!’
    –    ‘আপনি তো জানেন, মুর্শিদাবাদ কোয়ালিটি-আমের জায়গা! আর কাঁঠালেরও জায়গা! জাম-লিচুরও জায়গা বটে। তবে আম হচ্ছে রাজা। লাল মিঞার বাগান নামকরা আম্রকানন।’
    –    ‘আম্রকানন!’
    –    ‘ক্লাস নাইনেও ফার্স্টবয় ছিলাম বাবু! ভাষার ব্যাপারে আমি চোর নই। শব্দের ঠিক প্রয়োগকে তো চুরি বলে না! যা হোক, অত বড় বাগান! ফল-ফকারি ব্যাপারে লাল মিঞার একটা নীতি ছিল হুজুর!’
    –    ‘তাই নাকি!’
    –    ‘হ্যাঁ। নীতি হচ্ছে, যে-আম লাল মিঞা গাছ থেকে লগি আর জালি দিয়ে না-পেড়ে নামাচ্ছেন, সে-আম তেনার নয়। স্খলিত আম, মাটিতে পড়ে থাকা আম তেনার নয়।’
    –    ‘সে-আম তাহলে কার?’
    থানাটা একটা আম বাগানের মধ্যে। বাগানটা কাঁটাতারের বেড়া কোথাও, কোথাও বা দেড়-মানুষ উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা; দেওয়ালের উপর ভাঙা কাঁচ পোঁতা। থানার যেটা বাড়ি, তার রয়েছে খান চারেক ঘর। ছ’খান গারদ। একখানা ঘর বড়ো বাবু নিজের শোয়া বসার জন্য সাজিয়ে আলাদা করে রেখেছেন।
    এছাড়া বড়ো বাবু একখানা ভাড়া বাড়িতে থাকেন। পাকোয়ানপুর পোস্ট অফিসের দোতলাটি উনি ভাড়া নিয়েছেন। দোতলায় খান তিনেক বড়ো বড়ো ঘর। ড্রয়িং। পায়খানা-বাথরুম। রান্নাঘর। রীতিমতো একটি সংসার তাতে সাঁধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু না, দিয়াড়ী দারোগার কোন সংসারই নেই।
    কেউ তো আছে তাঁর।
    না, কেউ নেই।
    চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়েস। আজও বিয়েশাদি করেননি। করবেন বলেও মনে হয় না।
    –    ‘বল, তা হলে সে আম কার?’
    বড় বাবু তাগিদ দেন।
    রেফাত মহাত্মা গাঁধীর চোখের দিকে চেয়ে বলল, ‘সে আম হুজুর পাবলিকের। গরিবগুর্বো পাবলিকের। সে যা ভাল ভাল নবাবী আম আজ্ঞে।’
    –    ‘লাল মিঞার গাছপাকা আমে হাত দিয়েছিস কখনও? নাকি কুড়িয়ে খেয়েছিস?’
    –    ‘দুইই আজ্ঞে!’
    –    ‘তা হলে নে। হাত পাত।’
    মেঝেয় লেটিয়ে বসে থাকা রেফাত চিত্রকর নির্বিকার ভঙ্গিমায় সপ্তর্ষি ও সি-র সামনে তার ডান হাতের তালু মেলে দেয়। টেবিলের উপর শোয়ানো বেতের ছড়িটা মুহূর্তে টেনে নিয়ে সপাং করে চিত্রকরের তালুতে বসিয়ে দেন বড়ো বাবু।
    তারপর বলে ওঠেন, ‘এই মারে তোর কিছুই হয় না জানি। তবু মারলাম। তুই মিঞা বাড়িতে চুরি করতে পর্যন্ত ঢুকেছিলি!’
    কী মনে করে থেমে গেলেন সপ্তর্ষি।
    বললেন, ‘ঠিক আছে। আপাতত এই পর্যন্ত থাক।’
    –    ‘থাকবে কেন! মারুন। লাল মিঞার বাড়ি চুরি করতে গিয়ে পান্তার সঙ্গে পাকা শাহ্‌দুল্লা আম খেয়ে ঘুম পেয়ে গেল বাবু! বুঝলেন! ভুল করে আমি প্রাচীর টপকে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। দেখি মেঝেয় পাকা আম গড়াগড়ি খাচ্ছে। রান্নাঘরের কোণে একটা টিমটিমে কুপি জ্বলছে। ছুঁচো তাড়াবার জন্যে বাতি দিয়ে রেখেছে! যা হোক পাকা আমের গন্ধে আর ঠিক থাকা গেল না বড়ো বাবু! বটি হাতের কাছেই পেলাম। পাঁচটা আম কেটে তৈরি করে নিয়ে কাঁসার থালায় পান্তা বেড়ে কাঁচালঙ্কা-সরষের তেল-পেঁয়াজ সমেত সড়াৎ-সড়াৎ করে সাবড়াতে লেগে পড়লাম।’
    –    ‘সড়াৎ-সড়াৎ করবার দরকার কী? শুনে ফেলবে তো!’
    –    ‘আজ্ঞে ফেলবে বইকি। বাড়ির কিষেণ, মূলত পেটভাতা; মাইনে ১০ টাকা; শুনে ফেললে। নাক ডাকাচ্ছিল। ও লোক আধ-চেতন থেকে নাক ডাকায়। নাকডাকা হঠাৎ গেল থেমে। বাইরে মাচার উপর ঘুমাচ্ছিল। ধড়ফড় করে উঠে বসল আজ্ঞে। অদ্ভুত সড়াৎ শব্দে ঘাবড়ে গিয়ে হাঁকলে, কে, কেডা বটে! আমানি খায়! জবাব দে! মানুষ না আর কিছু! আরে! জবাব দিতে আটকায় কিসে! শুনে আমি তো প্রথমে চুপ। তারপর বিনা সাড়ে সব পান্তা শেষ করতে না করতে ঘুম পেয়ে গেল! ভোররাতে আমি ঘুমন্ত অবস্থায় জুলুর চিৎকারে গোঁ-গোঁ করে উঠলাম। কাঁসার বাসনগুলান আর চোট করতে পারলাম না। ধরা পড়ে গেলাম বাবু!’
    –    ‘লাল মিঞা তোকে মারধর করলেন?’
    –    ‘না। একদম না!’
    –    ‘কী করলেন?’
    –    ‘কাঁদো-কাঁদো গলায় বললাম, খিদের হাবিয়ায় পুড়ছি বড়ো মিঞা, আমভাত খেয়ে একেবারে ‘বটে’ (বসে) গেলাম যে! থানায় দিতে হয় দেন। শুনেটুনে লাল মিঞা জুলুকে বললেন, সামনে ঈদ। রফাকে লুঙ্গি-গামছা-গেঞ্জি দিবি। আর দিবি ছোট এক খুতি(বস্তা) আম। যা, বিদেয় কর।’
    এবার অনেক ক্ষণ রেফাতের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন ও সি। তাঁর চোখ দুটি ধীরে ধীরে কঠিন-কুটিল হয়ে উঠল। সেই দৃষ্টির প্রখরতার দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে দেখতে পারল না রফা; চোখ নামিয়ে নিল।
    অধোমুখে রফা বলে উঠল, ‘আমাকে কি আর কিছু বলবেন বড়ো বাবু!’
    –    ‘শোন্‌ রফা! শুনেছি, তুই ঘোড়ায় চড়তে পারিস। দুলু সদ্দারের বাড়ি এক্ষুনি চলে যা। দুলুই চনমনকে পালে, জানিস তো! এক লাইন লিখে দিচ্ছি, দুলু তোকে ঘোড়া সাজিয়ে হাতে দেবে, তুই তারপর উড়ে যাবি।’
    –    ‘কোথায় হুজুর!’
    –    ‘যেখানে সারা কাজীকে রেখেছিস, সেখানে।’
    –    ‘আমি কী করে এনে দেব হুজুর!’
    –    ‘তা হলে কে এনে দেবে বল!’
    –    ‘আমি তো বড়ো বাবু মানুষ চুরি কস্মিনকালে করি নাই। আজও করি নাই! হাত-লপকা থেকে চোর হয়েছি। ডাকাত হওয়ার শখ আছে তাই বলে নাবালক চুরি করে, বিশেষ করে মেয়ে-বাচ্চা চুরি করে কলকাতার বে-পাড়ায় দিয়ে আসতে পারব না। এ ব্যাপারে মুর্শিদাবাদের খুব বদনাম আছে বলে শুনেছি।’
    –    ‘তুই শুনেছিস? কোথায় শুনেছিস?’
    –    ‘আজ্ঞে পড়েছি। পেপারে পড়েছি।’
    –    ‘কোন পেপারে পড়েছিস, কবে?’
    –    ‘জেলার একখানা সাপ্তাহিকে, গত বছর সমীক্ষা করে লিখেছিল, নারী পাচারে এই জেলা পহেলা নম্বরে উঠেছে, কলকাতার বে-পাড়ার হিসেব বলছে, এই জেলা সেখানেও এক নম্বরে!’
    –    ‘যা তা হলে, সেখানে পৌঁছনোর আগে সারাকে ছিনিয়ে নিয়ে আয়। সারা লাল মিঞার বড়ো মেয়ের ছোট মেয়ে। সদর ঘাটের হাইস্কুল থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল, সেই সময় স্কুটারে করে বোরখাপরা একজন সারাকে ‘এসো’ বলে তুলে নেয়। এই ঘটনার মানে কী?’
    এই অবদি শুনে ধীরে ধীরে রেফাতের মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল। ভগবান ওকে নিতান্ত সুপুরুষ করে গড়েছিলেন; আশ্চর্য রূপবান সে। তাকে দেখে কোনও কালে কারও বিশ্বাসই হয় না, সে একটা হাত-লপকা চোর।
    তাকে আসলে কেউই বোধহয় বিশ্বাস করে না; হয়ত বড়ো বাবুও করেন না। এই যে সে ক্লাস থেকে নাইন অবদি ক্লাসে ফার্স্ট হত, এ কথা সপ্তর্ষি ও সি বিশ্বাস করতে যাবেন কোন দুঃখে! তবে সে কোনও কথা নয়। চোর আশা করে না, কেউ তাকে বিশ্বাস করুক।
    কিন্তু কেন যেন তার আজ এক ধরনের অব্যক্ত কষ্ট হচ্ছিল। কাজী লাল মিঞার নাতনিটা চুরি হয়ে গেল! সে বিড়বিড় করে বার কতক বলে উঠল, ‘জয় ভোলা, জত মহেশ্বর! জয় মহাদেব! হাঁ রসুল-আল্লাহ! আমারে পথ দেখাও হে জ্যোতির্ময়!’
    এই সব আপন মনে বলতে বলতে দুলাল(দুলু) সদ্দারের বাড়ি এল রফা। চনমনের পিঠে চড়তে তার ভয় করছিল। তবু সে চড়ে বসল। ঘোড়ার পিঠে গদি-আঁটা। গদির উপর বসে রফার মনে হল, ‘এই ঘোড়াটাকে চুরি করলে কেমন হয়!’
    ঘোড়া কিন্তু রফাকে পিঠে করে তার মালিকের কাছে ছুটে এল। এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
    সপ্তর্ষি গলা ছেড়ে চনমনকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনালেন।
    তারপর বললেন, ‘শোন্‌ চনমন, রফাকে কাজে পাঠাচ্ছি, ওকে ফেলে দিস না। যেমন-যেমন রফা বলবে তেমন-তেমন করবি। যদ্দূর যেতে চাইবে নিয়ে যাবি। ১০টা বাজে। বিকেল নাগাদ ফিরে আসবি। তোর খিদে পাবে বাছা! রফারও পাবে। শ’দুই টাকা দিলাম। ওই দিকের ঘোড়াঅলার বাড়ি টাকা দিয়ে খুরাকির ব্যবস্থা করবি রেফাত। বাজারে নিজেও কিছু খেয়ে নিবি। মোটর-বাইকে যে এসেছিল, সন্দেহ হচ্ছে ওটা মেয়ে নয়। পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো পরেছিল। মেয়েরা ক্যাম্বিসের জুতো পরে না। একটা বেঁটে চোরের সন্ধান করবি রেফাত। যা চলে যা।’ (চলবে)

    SHARE

    LEAVE A REPLY