দূর পাল্লায় দুই নারী

    সমরেশ মজুমদার
    জন্ম ১৯৪২-এর ১০ মার্চ | শৈশব কেটেছে জলপাইগুড়ি জেলার ডুয়ার্সে | স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক | বিখ্যাত অনিমেষ সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস 'কালবেলা'র জন্য ১৯৮৪ সালে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার |

    (গতসংখ্যা পর)
    চোখের সামনে সুদীপাকে মরে যেতে দেখেছিল অয়ন। তিন-তিনজন ডাক্তার একমত হতে পারছিলেন না, ওর ঠিক কী অসুখ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যখন রোগ ধরা পড়ল তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। যতই মনের জোর থাকুক, যতই সুদীপা বাঁচতে চাক, ভুল ওষুধ তাকে বাঁচতে দিল না।…অয়ন মুম্বাইতে সমুদ্রের ওপর পাহাড়ের গায়ে শোভা কানিৎকারেরএকটি পৈতৃক বাংলো ভাড়া নিল।

    এত দ্রুত কাজ শেষ হবে ভাবেনি অয়ন। প্রযুক্তির মাধ্যমে সইসাবুদ, টাকা দেওয়া হয়ে গেল। উইন্ডির রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় যে ব্যাঙ্ক চোখে পড়েছিল সেই ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলে পাঁচ লক্ষ টাকা রেখে দিল অয়ন যাতে ওখানে অসুবিধা না হয়। নিজের ফ্ল্যাটের জন্য বাৎসরিক যা যা দেয় তা দিয়ে দিল সে। বাংলোয় প্রায় সব প্রয়োজনীয় জিনিস আছে। শুধু নিজের জামাকাপড়, বই ইত্যাদি দুটো স্যুটকেসে নিয়ে সে কলকাতা ছেড়ে রওনা হয়ে গেল। তখন সকাল সাড়ে নটা।
    মুম্বাই এয়ারপোর্টে ম্যানেজার গাড়ি নিয়ে চলে এসেছিলেন। যেতে যেতে বললেন, “একটা ভালো খবর আছে। ম্যাডাম যখন আগে ওখানে গিয়ে কিছুদিন থাকতেন তখন এক দম্পতি বাংলোয় কাজ করত। খুব ভালো মানুষ, কাজও ভালো করত। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ওদের একজন আপনার কাজ করতে পারে।”
    “খুব ভালো খবর।” অয়ন খুশি হল।
    “প্রথম দু-একদিন অসুবিধা হতে পারে, তারপর দেখবেন অভ্যেস হয়ে গেছে।”
    “তাই তো হয়।” উদাস গলায় বলল অয়ন।
    ম্যানেজার আর কথা বাড়ালেন না। গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে ম্যানেজার বললেন, “স্যার, আপনি নিশ্চয়ই ব্রেকফাস্ট করে কলকাতা থেকে বের হয়েছেন। আজ বাংলোতে পৌঁছোতে প্রায় বিকেল হয়ে যাবে। তাছাড়া, সেখানে তো লাঞ্চের ব্যবস্থাও নেই। রোডসাইড রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমরে একটা ভালো জায়গায় থামতে পারি।”
    খিদে পাচ্ছিল খুব। সকালে শুধু চা খেতে পেরেছিল সে, তাড়াহুড়োয় ব্রেকফাস্ট হয়নি। ম্যানেজার নিশ্চয়ই ধাবাকেই রোডসাইড রেস্টুরেন্ট বলছেন। সে সম্মতি দিতেই ড্রাইভারকে মারাঠি ভাষায় নির্দেশ দিলেন ম্যানেজার।
    রাস্তার দু’পাশে প্রায়ই এক-একটা বড়ো কারখানা দেখা যাচ্ছে। মহারাষ্ট্র এ ব্যাপারে বেশ এগিয়ে গেছে। ঘণ্টাখানেক পরে ম্যানেজারের ফোন বাজল। মারাঠিতে কথা বলে যন্ত্রটা দিলেন তিনি, “স্যার, ম্যাডাম—।”
    অয়ন হ্যালো বলতেই শুনতে পেল শোভা কানিৎকারের গলা, “ওয়েলকাম, আপনার বিমানযাত্রা নিশ্চয়ই ভালো হয়েছে!”
    “হ্যাঁ। কোনও সমস্যা হয়নি।”
    “আমি আশা করব উইন্ডিতে আপনার কোনও সমস্যা হবে না। এখন থেকে ওই বাংলোটাকে দেখাশোনা করার জন্য একজন কেয়ারটেকার রাখতাম, তাহলে তাকে মাইনে দিতে হত। আর বেশি টাকার লোভে এমন কাউকে ভাড়া দিয়ে যদি দেখতাম সে একগাদা আত্মীয় নিয়ে নয়ছয় করছে, বাংলোর ওপর কোনও মায়া নেই। তাহলে আপশোশে পাঁচ বছর কাটাতে হত।”
    “আমার মনে যে মায়া থাকবে তা বুঝলেন কী করে?”
    হাসলেন ভদ্রমহিলা, “দুরকম ভাবে। আমার স্বামী থাকতেই তাঁর ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। এখন তো একাই দেখি। তাই বোঝার চোখ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়, আমি একজন মহিলা। কখনও কখনও ভুল করলেও মহিলারা অনুভব করতে পারে কার মনে মায়া আছে। ঠিক আছে। যখনই কোনও সমস্যায় পড়বেন আমার ম্যানেজারকে জানাবেন। বাই।”
    ভদ্রমহিলা সরাসরি কথা বলেন, সৌজন্যবোধ আছে। এরকম মানুষের সঙ্গে সহজে সম্পর্ক নষ্ট হয় না। অয়ন দেখল গাড়ি একটা বড়ো ধাবার সামনে দাঁড়াল।
    গাড়ি থেকে নেমে অয়ন দেখল ম্যানেজার চুপচাপ বসে আছেন। সে বলল, “আসুন, আপনি বসে আছেন কেন?”
    “স্যার। আমি আজ ফল ছাড়া রান্না খাবার খাবো না। আমাদের বাড়ির সবাই সপ্তাহের এই দিনটায় ব্রত উদযাপন করি। আমাকে ক্ষমা করুন।”
    মহারাষ্ট্রের মানুষ বাঙালিদের থেকে বেশি ধার্মিক, খানিকটা গোঁড়া হয় বলে শুনেছিল অয়ন। তাই সে জোর করল না। রেস্টুরেন্টের কোণের টেবিলে বসা মাত্র বেয়ারা এল, “প্রথমে কি বিয়ার খাবেন সাব?” মজা লাগল অয়নের। প্রথমে খাবারের অর্ডার দিয়ে একটা ছোটো বিয়ার বলল সে।
    খাওয়া শুরু করেই সে বেয়ারার কাছে জানতে পারল এখানে সব রকম ভালো হুইস্কি পাওয়া যায়। অয়ন উইন্ডি শহরে থাকবে শুনে লোকটা একটা কাগজে টেলিফোন নাম্বার লিখে দিল, “সাব, যখনই দরকার পড়বে, ফোন করে দেবেন, আপনার কাছে মাল পৌঁছে যাবে। ডেলিভারি চার্জ, টেন পার্সেন্ট এক্সট্রা।” কাগজটা পকেটে রাখল অয়ন।
    গাড়ি চলতে শুরু করতেই ম্যানেজার বললেন, “আপনার কাজের লোক এসে গেছে ওখানে।”
    “বাঃ।”
    “লোকটা খুব সিনসিয়ার।” ম্যানেজার একটা চাবির রিং এগিয়ে দিলেন, “ম্যাডাম গাড়ির চাবি দিতে বলেছেন।”
    অয়ন কিছু বলল না। কাজের লোকের ব্যাপারে তার যা অভিজ্ঞতা আছে তাতে চট করে কোনও সিদ্ধান্তে আসতে সে রাজি নয়। গাড়িটা পেয়ে তার খুব সুবিধা হল। ধনুবাদ জানাতে হবে।
    পাঁচটা নাগাদ বাংলোর সামনে পৌঁছে গর্জন শুনতে পেল সে। সমুদ্রের গর্জন। এর আগের দিন যখন এসেছিল তখন এতটা আওয়াজ কানে আসেনি। গেটের ওপাশে বসেছিল লোকটা, গাড়ি দেখে গেট খুলে দিল। বছর চল্লিশের শীর্ণ চেহারার মানুষ। চুল কাঁচা-পাকা। পরনে জিনস এবং কলার তোলা গেঞ্জি। গাড়ি থেকে নেমে ম্যানেজার মারাঠিতে কথা বললে লোকটাও হেসে জবাব দিল।
    ম্যানেজার বললেন, “এই আপনার লোক। ওর নাম লাডু, লাডু গাওনিকার।”
    সঙ্গে সঙ্গে লাডু একবার সেলাম করেই দুটো হাত এক করে নমস্কার জানাল।
    অয়ন জিজ্ঞাসা করল, “তুমি নিশ্চয়ই হিন্দি জানো?”
    “হ্যাঁ সাব। হিন্দি, লিটল লিটল ইংলিশ।” লাডু হাসল। অয়নের মনে হল লোকটা একটু ক্যাবলা ধরনের, প্যাঁচ নেই।
    মালপত্র ভিতরে নিয়ে গেল লাডু। তারপর ম্যানেজারের সামনেই ওর মাইনে এবং কাজের সময় পাকা হয়ে গেল। লাডু আসবে সকাল সাতটায়। সারাদিন কাজ করে ঠিক সন্ধে ছটায় বাড়ি চলে যাবে। তবে কখনও প্রয়োজন হলে সে রাত্রে থেকে যেতে পারে। বাড়িতে লাডুর বউ আছে। তাকে একা রেখে লাডুর পক্ষে বাইরে রাত কাটানো সম্ভব নয়।
    ম্যানেজার বিদায় নিলেন। তাঁকে এখন অনেকটা পথ যেতে হবে।
    অয়ন লাডুকে বলল, “তোমার চলে যাওয়ার সময় তো হয়ে এসেছে। কিন্তু রাত্রে আমার খাওয়ার ব্যবস্থা কী হবে?”
    “আপনি যা খেতে চান তা আমি এখনই দোকান থেকে এনে দিচ্ছি।”
    দুশো টাকা নিয়ে চলে গেল লাডু। বাংলোর পিছনের চাতালে চেয়ার নিয়ে বসল অয়ন। ঢেউগুলো যেন ফুঁসছে। প্রবল বেগে ছুটে আসছে বাংলোর দিকে। এসে আছাড় খেয়ে অনেক ফেনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। শব্দ বেড়েছে ওই কারণে। অয়নের মনে হল সে ঠিক জায়গায় এসেছে। এই যে ঢেউগুলো, কখনও শান্ত, কখনও ভয়ঙ্কর, দেখে মনে হয় ওদেরও প্রাণ আছে। আর মনে হলেই নিজেকে একলা মনে হয় না। অয়ন অনুমান করল এখন জোয়ারের সময়। ঢেউয়ের জল গিয়ে পড়ছে চৌবাচ্চায়। কিন্তু চৌবাচ্চার নীচের কল খোলা না থাকায় জমে বেরিয়ে যাচ্ছে।
    লাডু ফিরে এল খাবারের প্যাকেট নিয়ে। জিজ্ঞাসা করল, “ আপনি ডিনার কখন করবেন সাব?”
    “ন-টা সাড়ে নটায়।”
    “তাহলে আমি ফ্রিজ অন করে খাবার রেখে যাচ্ছি। আপনি যদি গরম করে নেন তাহলে ভালো হয়। সব ব্যবস্থা আছে।” লাডু বলল।
    চলে যাওয়ার আগে লাডু এসে পঞ্চাশ টাকা ফেরত দিল। বলল, “আপনার জন্যে ফ্লাস্কে চা বানিয়ে রেখেছি। যখন ইচ্ছে হবে খেয়ে নেবেন।”
    “এত টাকা ফিরল কী করে?”
    “আমি বড়ো দোকান থেকে আনিনি। এই দোকান ছোটো কিন্তু খাবার ভালো।”
    “এই টাকাটা তুমি রেখে দাও লাডু।”
    “না সাব। এখন আমার লাগবে না।”
    “তোমার পুরো নাম কী?”
    “লাডু গাওনিকার।”
    “তোমার বাড়িতে স্ত্রী ছাড়া কেউ নেই?”
    “না সাব।”
    “তোমার স্ত্রীর নাম কী?”
    “শ্রুতি গাওনিকার।”
    “টাকাটা নিয়ে যাও। তোমরা মিষ্টি কিনে খেও।”
    একটু দ্বিধার সঙ্গে নোটটা নিয়ে লাডু বলল, “সাব, কাল সকালে আসার সময় বাজার করে নিয়ে আসব?”
    “তোমার যদি সুবিধা হয় আনতে পার।”
    “আপনি কি শাকসবজি খান?”
    “আমি সব খাই।”
    “তাহলে যদি পাঁচশো টাকা দেন, তাহলে কয়েকদিন বাজারে যেতে হবে না।”
    টাকাটা দিয়ে অয়ন জিজ্ঞাসা করল, “কিন্তু তেল মশলা কিনতে হবে না?”
    “ও সব কিচেনে আছে। ফুরিয়ে যাওয়ার আগে কিনে নেব। গুড নাইট সাব।”
    লাডু চলে গেলে বাইরের দরজা বন্ধ করল অয়ন। নিশ্চয়ই এখানে চোর-ডাকাতের ভয় নেই। থাকলে তাকে সতর্ক করতেন শোভা কানিৎকার। শোওয়ার ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে দিল সে। কানের কাছে আবহসংগীতের মতো বেজে চলেছে সমুদ্রের গর্জন। অয়ন দেখল লাডু তার বিছানা তৈরি করে গেছে। লোকটাকে ভালো বলে মনে হল।
    পোশাক পালটে স্নান করল অয়ন। আঃ! কী তৃপ্তি! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল এখানে পাঁচ বছরের জন্য থাকার অধিকার পাচ্ছে সে। সময়টা কম নয়। তারপর কী হবে তা নিয়ে এখনই ভাবার কোনও মানে হয় না।
    টেবিলে রাখা ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ঢেলে সোফায় বসে সিগারেট ধরাল সে। আগে মাঝে মাঝে খেত। সুদীপা চলে যাওয়ার পর বেড়ে গেছে। চা খেতে খেতে রিমোট তুলে টিভি অন করল। হিন্দি এবং মারাঠি চ্যানেল। ইংরেজি ছবি ছাড়া অ্যানিম্যাল ওয়ার্ল্ড রয়েছে। কিন্তু কোনও বাংলা চ্যানেল নেই। বাংলা বোঝেন না বলে শোভা কানিৎকারের দরকার হয়নি। অয়ন ঠিক করল এয়ারটেলকে অনুরোধ করবে একটা বাংলা নিউজ চ্যানেল দিতে। দূরে চলে এসেছে বলে কলকাতার খবর একদম রাখবে না, সেটা ঠিক নয়।
    একটা হিন্দি ছবি দেখাচ্ছে। অমিতাভ বচ্চন এবং টাবু। চিনিকম। ছবিটার নাম সে শুনেছে কিন্তু দেখা হয়নি। এখন দেখতে ভালো লাগছে। ছবি শেষ হল। ঘড়িতে এখন রাত সাড়ে আটটা। স্যুটকেস খুলে হুইস্কির বোতল বের করল। ফ্রিজ থেকে বরফ এনে গ্লাসে ঢেলে সে পান করতে করতে চ্যানেল ঘুরিয়ে চলল। দুই পেগ খাওয়ার পর লাডুর কিনে আনা খাবারের প্যাকেট খুলে দেখল এখনও খুব ঠান্ডা হয়নি। মাইক্রোওয়েভে গরম করতেও আলস্য লাগল। চিকেন চাপ আর রুমালি রুটি খেয়ে শুয়ে পড়ল অয়ন। তার নির্জন আবাসে প্রথম রাত কেটে গেল এক ঘুমে।

    বেল বাজতেই ঘুম ভাঙল। অয়ন ঘড়ির দিকে তাকাল। ঠিক সাতটা। বাইরের ঘরে এসে দরজা খুলে দিতেই দেখল লাডু বাজারের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে। বলল, “সরি সাব। আপনি যে ঘুমোচ্ছিলেন তা বুঝতে পারিনি। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আজ যাওয়ার সময় ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে যাব।”
    “আমার কোনও অসুবিধা হয়নি। তুমি যদি চাবি নিয়ে যেতে চাও নিতে পার।” অয়ন কথাগুলো বলে দরজার বাইরের বারান্দায় চলে এলে লাডু ভিতরে ঢুকে গেল।
    বারান্দাটা সামনের রাস্তার খানিকটা উপরে। মাঝখানের পাঁচ ফুটের দেওয়ালটা বারান্দাকে আলাদা করতে পারেনি। এই সকালবেলায় ছায়ামাখা রাস্তাটা দেখে খুব ভালো লাগল অয়নের। একটি মেয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। দুটো সীগ্যাল মাথার উপরে পাক খাচ্ছে। আহা, এরই নাম শান্তি। কলকাতায় তো ঘুম ভাঙার আগেই বিচিত্র আওয়াজ শুরু হয়ে যায়। গুনগুন করল অয়ন। একটু সুর ভাঁজতেই থেমে গেল সে। এই যে মানুষটা যার নাম রবীন্দ্রনাথ, তিনি কি ঈশ্বরের প্রতিনিধি ছিলেন? নইলে যে-কোনও অনুভূতি নিয়ে গান লিখেছেন কী করে! এই যে গুনগুন করছিল, করতে করতে থেমে গেল, কারণ তাঁর লেখা গান মনে পড়ল। ‘আজ সকালবেলায় গান এল মোর মনে।’
    হঠাৎ গলা খুলে গানটা গাইতে লাগল অয়ন। সুর মাঝে মাঝে লাগছে না, স্কেল ঠিক থাকছে না, তাতে থোড়াই কেয়ার। শ্রোতা যখন নেই তখন যেভাবেই সে গাইবে তাই গান হয়ে যাবে তার কাছে। পুরো গান গেয়ে যখন অয়ন খুশি, ঠিক তখন হাততালির শব্দ হল। চমকে গেল অয়ন। সামনের রাস্তায় কেউ নেই, তাহলে হাততালি দিচ্ছে কে? সে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে বাঁক ঘুরে গেটের দিকে এগোতেই ছেলেটাকে দেখতে পেল। বছর সাত-আট বয়স, হাফপ্যান্ট আর নীল গেঞ্জিশার্ট পরে তার দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ছে।
    অয়ন হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল, “এই তুই তালি বাজিয়েছিস?”
    তিনবার মাথা নীচে নামাল ছেলেটা  যার অর্থ, হ্যাঁ।
    “তুই বাংলা কি বুঝিস? বুঝিস না। তাহলে তালি বাজালি কেন?”
    ছেলেটি হিন্দিতে বলল, “গানের সুর খুব ভালো, তাই।”
    হেসে ফেলল অয়ন। সুদীপা যখন বেঁচেছিল তখন গান গাইলেই হাত জোড় করত। “প্লিজ, তোমার দ্বারা অনেক কিছু হতে পারে কিন্তু গান হবে না, এটা বুঝতে চেষ্টা করো।”
    “তোর ভালো লেগেছে?’ অয়ন জিজ্ঞাসা করল।
    ছেলেটা মাথা নেড়ে প্রথম লাইনটার সুর শোনাল। অয়ন চমৎকৃত। সে ডাকল, “আয় ভিতরে আয়।”
    গেট খুলে ভিতরে ঢুকল ছেলেটা। অয়ন জিজ্ঞাসা করল, “তোর নাম কী?”
    “ওমল।”
    “কোথায় থাকিস?”
    ওমল মাথার উপরে যেভাবে হাত ঘোরাল তার কোনও অর্থ অয়ন বুঝতে পারল না।
    এইসময় দরজায় লাডু এল, “সাব চা রেডি।”
    “লাডু তুমি ওকে চেনো?”
    “হ্যাঁ সাব। ওর মামার বাড়ি পুণেতে। মা-বাবা নেই। মামা খুব মারত বলে পালিয়ে এসেছে। এখানে তো অত ছোট বাচ্চাকে কেউ দোকানের কাজে রাখে না, তাই এর-ওখানে ওর-ওখানে খেয়ে নেয়, লোকে দেয়ও। গণপতি বাপ্পার মন্দিরে শুয়ে থাকে। ওখানেই স্নানটান করে। দুমাস হয়ে গেল ও এখানে এসেছে।” লাডু জানাল।
    “এই তুই বারান্দায় আয়। লাডু ওকে কিছু খেতে দিতে পারো?”
    “বিস্কুট এনেছি আজ। তাই দিচ্ছি। তবে সাব, আমাদের ও যা বলেছে তাই আপনাকে জানালাম। পুণের মামার ব্যাপারটা সত্যি কিনা, তা আমরা জানি না। এই জন্যে কেউ ওকে বাড়িতে থাকতে দেয়নি।” লাডু বলল।
    “কিন্তু ছেলেটা ভালো গাইতে পারে। একবার শুনেই সুর মনে রাখে।”
    “হ্যাঁ, সাব। ও হিন্দি গান ভালো গাইতে পারে।” লাডু চলে গেল।
    ওমল বারান্দায় উঠে এসেছিল। অয়ন বলল, “এই একটা গান শোনা তো।”
    “একটা না, তিনটে গান শোনাব।”
    শুনে মজা লাগল অয়নের, “তিনটে কেন?”
    “তার বদলে দশ টাকা নেব। আমার নাস্তা হয়ে যাবে।”
    “নাস্তায় কী খাবি?”
    “ঘুগনি আর রুটি।”
    “আমি তোকে টাকা দেব না, নাস্তা খাওয়াবো। খুব ভালো খাবার থাকবে নাস্তায়। শুরু কর।”
    “না।” সবেগে মাথা নাড়ল ওমল, “টাকা দিতে হবে।”
    “আরে! তুই দশ টাকায় যা খাবি তার থেকে ভালো খেতে ইচ্ছে করছে না?”
    “না।”
    “তাহলে ভাগ। আমি টাকা দেব না।”
    অয়ন কথাটা বলতেই তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ওমল। অয়ন হতভম্ব। এইরকম অদ্ভুত ছেলে সে কখনও দেখেনি। ভিতরের বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে সে লাডুকে ব্যাপারটা বলল।
    লাডু বলল, “তখন বলার সময় খেয়াল ছিল না সাব। ওকে কেউ খাবার দিতে চাইলে তার বদলে টাকা নেয়। তাতে ওর ক্ষতি হয়, কিন্তু এটাই ওর অভ্যেস। সেই টাকায় ও কী কিনে খায় জানি না। আপনি ওকে বেশি প্রশ্রয় দেবেন না। হয়তো ছেলেটা বাচ্চা, কিন্তু এখন বাচ্চাদেরও বিশ্বাস করা যাচ্ছে না।”
    ব্রেকফাস্ট খেয়ে খুশি হল অয়ন। লাডুর রান্নার হাত বেশ ভালো।
    আজ আকাশে ছেঁড়া মেঘ ঘুরছে। অয়নের মনে হল চারপাশে একটা পাক দিয়ে আসবে। জায়গাটাকে ভালো করে চিনে রাখা উচিত। তারপরেই গাড়িটার কথা মনে এল। বেশি দিন বন্ধ থাকলে ব্যাটারি ডাউন হতেই পারে। কীরকম আছে তা দেখা যেতেই পারে।
    গ্যারাজের চাবি খুলে গাড়িটার পাশে দাঁড়াল অয়ন। সাদা রঙের মারুতি ওমনি। একসময় গাড়িটা খুব ব্যবহৃত হত। এখন পাহাড়ি রাস্তায় যাত্রী বোঝাই করে যাওয়া-আসা করে। দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে চাবি ঘোরাতেই একবারে ইঞ্জিন চালু হয়ে গেল। এটা আশা করেনি অয়ন। সে প্রথম গিয়ারে গিয়ে একসিলিটারে চাপ দিতেই গাড়ি মসৃণ গতিতে এগিয়ে গেল।
    লাডু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল। নেমে এসে গেট বন্ধ করে দিল।
    রাস্তায় এসে সেকেন্ড থেকে থার্ড গিয়ারে নিয়ে গিয়ে অয়ন বুঝল যে গাড়ি ঠিক আছে। খানিক বাদে সে উইন্ডির সেই এলাকায় চলে এল যেখানে রকমারি দোকান এবং রেস্টুরেন্ট রয়েছে। একটা সিনেমা হলও চোখে পড়ল। গাড়ি থামিয়ে সে চারপাশে তাকাল। এখন কিছু ট্যুরিস্ট ছাড়া কেউ রাস্তায় নেই। বেলা না বাড়লে বোধহয় এই তল্লাটে ভিড় হয় না। এক ভদ্রলোককে বাজারের থলি নিয়ে স্কুটারে উঠতে দেখে সে গাড়ি থকে নেমে এগিয়ে গেল, “এক্সকিউজ মি, আপনি বাজার করলেন কোথা থেকে?”
    বেশ ফরসা, পাকা চুল অথচ মেদহীন শরীর ভদ্রলোকের, কিন্তু তাকে মহারাষ্ট্রের লোক বলে মনে হল না অয়নের।
    “আপনি নিশ্চয়ই ট্যুরিস্ট নন, কিন্তু নতুন এসেছেন। তাই তো?”
    “হ্যাঁ। গতকাল বিকেলে এসেছি।”
    ভদ্রলোক গাড়িটার দিকে তাকালেন, ওই গাড়ি নিয়ে এসেছেন?”
    “হ্যাঁ।”
    “তার মানে আপনি কানিৎকার পরিবারের অতিথি?”
    অয়ন হাসল, “না। আমি ওদের বাড়িটা পাঁচ বছরের জন্য ভাড়া নিয়েছি।”
    “আই সি! নাইস টু মিট ইউ।” ভদ্রলোক করমর্দন করলেন, “আপনি খুব ভাগ্যবান মানুষ। কানিৎকাররা ফিলদি রিচ, তাই কাউকে ভাড়া দিত না। আমার নাম ডিসিলভা। রিটায়ার্ড নেভাল অফিসার।”
    “আমি অয়ন। কলকাতায় ভালো লাগছিল না, শান্তিতে থাকব বলে এখানে চলে এসেছি। আলাপ করে ভালো লাগল।”
    “ও হ্যাঁ। আপনি বাজার  খুঁজছিলেন। ওই গলি দিয়ে ভিতরে চলে যান, দেখতে পাবেন। নতুন লোক–জিজ্ঞাসা না করলে হদিশ পায় না। ঠিক আছে। আবার দেখা হবে।” ভদ্রলোক স্কুটারে উঠে চলে গেলেন।
    লোকটি মন্দ নয়। কিন্তু সে বাজার খুঁজছে কেন? যা দরকার তা লাডু নিয়ে এসেছে। তবু কৌতূহল কেন? সে গলিতে ঢুকল।
    একটা দোতলা বাড়ি যার কোনও দেওয়াল নেই। তাই দরজা জানালাও থাকবার কথা নয়। অনেকটা লম্বা একতলায় চার সারিতে বড়ো বড়ো বাক্সের মধ্যে নানান ধরনের শাকসবজি নিয়ে বসে আছেন মহিলা বিক্রেতারা। তাঁদের পোশাকে নানান রঙের বাহার। পরিচিত সবজির বাইরে অনেক কিছু দেখল অয়ন। লোকজন কেনাকাটা করছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অয়ন বুঝতে পারল বাজার থেকে বের হওয়ার আর একটা পথ আছে। সেদিকেই ক্রেতাদের আনাগোনা বেশি।
    ন্যাড়া সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠল সে। এখানে মাছ এবং মাংসের স্টল। রুই, কাতলা ছাড়া প্রচুর সামুদ্রিক মাছ যা কখনও খায়নি অয়ন। তাদের মধ্যে চেনা পমফ্রেটের কালচে চেহারা দেখতে পেল। দাম জানতে চেয়ে শুনল তিনশো টাকা কেজি। এক-একটার ওজন আড়াইশো গ্রাম।
    গাড়িতে ফিরে এল সে। ইঞ্জিন চালু করেই লক্ষ করেছিল সে পাঁচ-ছয় লিটারের বেশি তেল নেই। বেরুবার সময় পার্স নিয়ে আসার কথা খেয়ালে ছিল না। সে গাড়ি ঘুরিয়ে বাংলোয় ফিরে এল। গাড়ি গ্যারাজ করে বেল টিপতেই লাডু দরজা খুলল, “এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন সাব!”
    “বিকেলে বেরুবো।” ভিতরে ঢুকে গেল অয়ন। লাডু লোকটা ভালো, কিন্তু অভিজ্ঞতায় জেনেছে সে, প্রশ্রয় পেলে ভালো লোকও খারাপ হয়ে যায়।
    আজ বাংলোটাকে ভালো করে দেখল সে। যিনি বানিয়েছিলেন তিনি যে অত্যন্ত শৌখিন মানুষ ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। মাথায় সুইমিং পুলের পরিকল্পনা ছিল কিন্তু পাহাড়ের গায়ে সেটা বানানো সম্ভব নয় বলে বিশাল চৌবাচ্চা বানিয়েছেন স্নানের জন্যে, যার ভিতর সমুদ্রের জল ঢোকার ব্যবস্থা করেছেন। অয়ন চৌবাচ্চার কাছে নেমে দেখল ওটা জলে ভরে গেছে, যদিও এখন ভাটার সময়, ঢেউ উপরে আসেনি। বুঝতে পারল এটা লাডুর কৃতিত্ব। বাঁ দিকে পাথরের ধাপ নীচে নেমে গেছে। দুই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সেই পাথরগুলো এমন ভাবে সাজানো যে নেমে যেতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ঘরে ফিরে ফুলপ্যান্ট ছেড়ে বারমুডা পরে নিল সে। উপরে হলুদ গেঞ্জি। তারপর নীচে নেমে পাথরের পাটায় সন্তর্পণে পা রাখল।
    ধীরে ধীরে দশ ধাপ নামার পর বাঁক ঘুরতেই থমকে গেল অয়ন। সামনেই একটা ভারী টিনের গেট। তালা দেওয়া। গেটের দুপাশে পাহাড় থাকায় আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ। উপর দিকে তাকাল সে। সেখানেই পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা প্রকান্ড পাথর আড়াল তৈরি করেছে। অর্থাৎ জেনেশুনেই এই গেট তৈরি করা হয়েছে।
    “সাব।”
    পিছন ফিরে অয়ন দেখল লাডু দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে একটা চাবি। এগিয়ে এসে তালা  খুলে দিল লাডু।
    “এখানে দরজা কেন?”
    “নীচ থেকে যাতে খারাপ লোক উপরে উঠে না আসতে পারে তাই গেট করা হয়েছিল। আপনি নীচে নামবেন জানতে পারলে তখনই চাবির কথা বলতাম।”
    “বাইরে থেকে চাবির ব্যবস্থা আছে?”
    “না সাব। দিনের বেলায় কেউ উঠতে সাহস পাবে না। দরজা খোলা থাক, আপনি ফিরে এলে আবার তালা দিয়ে দেব।” লাডু বলল।
    বাকি ধাপগুলো নামতে নামতে অয়ন দেখল সমুদ্র ক্রমশ কাছে চলে আসছে। তার গর্জন এখন কম। সে বালিতে পা রাখল। সকালে শ্যু পরেনি কিন্তু বাড়ির চটিটা না পরে আসলেই ভালো হত। অয়ন ধীরে ধীরে সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ালো। বহুদূরে কিছু জলে কিছু নৌকা ভাসছে। এখানকার সমুদ্রসৈকতে লোকজন নেই। জোর বাতাস বইছে। খুব ভালো লাগছিল তার। সে বিপরীত দিকে হাঁটতে লাগল। হঠাৎ চোখে পড়ল লোকটাকে, একটা নৌকার পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে। কাছে এসে দেখল নৌকায় ইঞ্জিন লাগানো। লোকটা মাথা তুলছিল না।
    অয়ন ওর পাশে গিয়ে ডাকল, “কী হয়েছে তোমার? এই যে—!”
    কথাগুলো সে হিন্দিতে বলল কিন্তু লোকটা মাথা তুলল না। অয়ন দেখল নৌকার ভিতরে দুটো মাঝারি জাল রাখা আছে। হয় লোকটার শরীর খারাপ, নয় এমন কিছু হয়েছে যে ও ভেঙে পড়েছে।
    এবার লোকটার কাঁধে নীচু হয়ে হাত রাখল অয়ন, “ও ভাই—!”
    স্পর্শ পেয়েই লোকটা মুখ তুলল। এদের মুখ দেখে বয়স বোঝা যায় না। প্রায় দড়ি পাকানো চেহারা, মুখে খোঁচা খোঁচা সাদা-কালো দাড়ি।
    অয়ন জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”
    সঙ্গে সঙ্গে হাত নাড়তে লাগল লোকটা। তার পর অচেনা ভাষায় অনর্গল কথা বলে যেতে লাগল। চুপচাপ সেই অবোধ্য ভাষা শুনে গেল অয়ন। কথা শেষ করে দুই হাতে মাথা চাপড়াতে লগল লোকটা।
    “তুমি হিন্দি জানো না?”
    একটু থেমে লোকটা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ।”
    “আমি তোমার ভাষা বুঝতে পারছি না। হিন্দি বললে পারব।”
    লোকটা এবার ভাঙা হিন্দিতে যা বলল তা অনেকটা এইরকমঃ এই নৌকা ওর প্রাণ। মাঝরাতে ও সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় এই নৌকায়। আর ইঞ্জিন চালাবার জন্যে একটা লোকের সাহায্য নিতে হয়। শর্ত থাকে, সে যা মাছ ধরতে পারবে তা বিক্রি হলে ওকে শতকরা পঁচিশ ভাগ দিতে হবে। কোনও দিন তিনশো আবার কোনও দিন একশো টাকা পেত লোকটা। দুদিন আগে ভরদুপুরে নিজের বিছানায় সাপের কামড়ে মরে যায় লোকটা। সে নিজে মারা গিয়ে যেন তাকেও মেরে গেল লোকটা। লোকটার বউ নেই, ছেলেমেয়েও নেই। কিন্তু বউয়ের ছোটো ভাই তার সঙ্গে থাকে। সে আবার কয়েক মাস হল বিয়ে করেছে। এক পয়সাও রোজগার করে না। তার ঘাড় ভেঙে খায়। লোকটা মরে গেলে সে শালাকে বলেছিল মাছ ধরার সঙ্গী হতে। এত বড়ো ভুল সে জীবনে কখনও করেনি। অনেক কথার পর শালা রাজি হল। কিন্তু কাল রাত্রে নৌকা জলে নামাবার সময় দেখা গেল ইঞ্জিন চলছে না। আজ সকালে মেকানিক এসে পরীক্ষা করে বলল দুটো দামি পার্টস কেউ ইঞ্জিন থেকে খুলে নিয়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তার সন্দেহ হল শালাকে, কিন্তু ততক্ষণে সে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। সারারাত সমুদ্রে থাকতে না চেয়ে ইঞ্জিন খারাপ করে রেখেছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে, শালা বাসে উঠে কোথাও চলে গেছে। আর যাওয়ার সময় তার বাক্স থেকে সব টাকা নিয়ে গেছে।
    কথাগুলো বলে আবার কপাল চাপড়াতে লাগল লোকটা।
    অয়ন বলল, “তুমি এরকম ভেঙে পড়ছ কেন? যে দুটো পার্টস নেই, তা কিনে এনে লাগিয়ে নাও। তাহলেই তো ইঞ্জিন চালু হয়ে যাবে।”
    “চার, চার হাজার টাকা লাগবে। কোথায় পাব আমি? জমানো টাকা ছিল ছয় হাজার। সব নিয়ে গেছে শুয়োরের বাচ্চা। আমি এখন ভিখিরি।” কাঁদতে লাগল লোকটা।
    “মাছ না ধরলে তুমি খাবে কী?”
    “আর মাছ ধরব না। আজ রাত্রে নৌকা নিয়ে মাঝ সমুদ্রে গিয়ে শরীরটাকে জলে ফেলে দেব। ব্যাস।” লোকটা কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল।
    এই সময় দূরে একজনকে দেখা গেল, এদিকে দৌড়ে আসছে। আর একটু আসার পর বোঝা গেল যে আসছে সে মেয়ে। অয়ন লোকটাকে বলল, “কেউ আসছে।”
    লোকটা তাকাল, তারপর বিড়বিড় করে নিজের ভাষায় কিছু বলল।
    মেয়েটি এসেই লোকটির পায়ের উপর মাথা ঠেকিয়ে চিৎকার করতে লাগল। না, কান্না নয়, কথার তেজ দেখে অয়ন বুঝতে পারল মেয়েটা কাউকে গালাগাল দিচ্ছে।
    লোকটা অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি কী করতে পারি বাবু! ওর বর ভেগে গেছে। আমার টাকা চুরি করে গেছে। আমি তো পুলিশের কাছে যাইনি। এর জন্যে তো ওর খুশি হওয়া উচিত।”
    লোকটা হিন্দিতে বলছে শুনে উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটা হিন্দিতে চিৎকার করতে লাগল, “কেন যাওনি? আমি তোমাকে নিষেধ করেছি? পুলিশ ওকে ধরুক, জেলে পুরুক, ফাঁসি দিক, তাহলে আমার হাড় জুড়োবে।”
    লোকটা বলল, “এসব কথা আমাকে শুনিয়ে লাভ নেই। কাল থেকে আমাকে কেউ আর দেখতে পাবে না। আমি মন ঠিক করে ফেলেছি।”
    “তার মানে? তুমিও আমাকে ফেলে হাওয়া হয়ে যাবে?”
    “কাউকে আমি ফেলে যাচ্ছি না। তুই আমার কেউ না। আমার বউয়ের ভাইয়ের বউ, তো আমার কী!”
    “বাঃ আমি কেউ নই? তোমাকে দুবেলা রান্না করে দেয় কে? অসুস্থ হলে ওষুধ এনে দেয় কে?” ফোঁস করে উঠল মেয়েটা, “বেশ তুমি যেখানে যাবে সেখানে আমাকে নিয়ে চলো। আমি এখানে একা থাকতে পারব না।”
    লোকটা হাসল, “আমি আজ রাত্রে সমুদ্রের তলায় যাব। যাবি?”
    “তা তো যাবেই। কীরকম বাবা তুমি? বিয়ের পর তুমি আমাকে তোমার মেয়ে বলেছিলে, মনে আছে? আমাকে ভাসিয়ে তুমি ডুবে মরবে?” মেয়েটি এবার অয়নের দিকে তাকাল, “তুমি ওকে বোঝাও না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী শুনছ?”
    “দ্যাখ কলি, আমার মাছ ধরা ছাড়া রোজগারের কোনও ক্ষমতা নেই। এই ইঞ্জিন আমি সারাতে পারব না। অত টাকা আমার নেই।”
    “ঠিক আছে, আমার কাছে তিনশো টাকা আছে। তাই দিয়ে সারাও।”
    লোকটা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে না পেরে চোখ বন্ধ করে দুলতে লাগল।
    অয়ন মেয়েটার দিকে তাকাল, ছিপছিপে চেহারায় বেশ চটক আছে। সে তাকাচ্ছে দেখে এমনভাবে বুকের উপর আঁচল টানল যে লজ্জা পেল অয়ন। সে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করল। “তোমার নাম কী?”
    “মন্টি।” লোকটা বলল।
    “শোন, আমি ওই উপরের বাংলোতে থাকি। তুমি একটু পরে আমার সঙ্গে দেখা করবে। দেখি কিছু করতে পারি কিনা।” মন্টিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাঁটতে শুরু করল সে। সমুদ্রের দিকে তাকাল। ছেলেবেলায় শুনত, সমুদ্র নাকি কিছুই নেয় না। সব ফিরিয়ে দেয়। বড়ো হয়ে বুঝেছিল সেটা সম্ভব হয় ঢেউ যদি অনুকূলে থাকে। সেই ঢেউ পেরিয়ে মাছ ধরতে যায় এরা। পৃথিবীর তিন ভাগে সমুদ্রের তীর আছে। উইন্ডির এই মন্টির মতো লক্ষ লক্ষ মানুষকে মাছ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে সমুদ্র।
    খানিকটা ঘোরাঘুরি করে বাংলোয় ফিরে এল অয়ন। তাকে ফিরতে দেখেই লাডু নেবে গেল গেটে তালা দিতে।

    দুপুরের খাওয়া হয়ে যাওয়ার এক ঘণ্টা পরে, যখন টিভিতে অয়ন হিন্দি সিরিয়াল দেখছে, তখন লাডু দরজায় এল, “সাব।”
    রিমোটে সায়লেন্ট করে অয়ন তাকাল।
    “রাতের রান্না করে রেখেছি। আপনি যদি মাইক্রোওভেনে গরম করে নেন, তাহলে অসুবিধে হবে না।” লাডু বলল।
    “ঠিক আছে।”
    “সাব, এখন তো আমার কোনও কাজ নেই, আমি কি যেতে পারি?”
    “তোমার তো বিকেল ছটায় যাওয়ার কথা।”
    “হ্যাঁ, সাব।”
    “ঠিক আছে, যাও। তবে এরপর খুব দরকার হলে তবেই যাবে।” অয়ন রিমোটে চাপ দিতেই টিভি থেকে শব্দ বের হল।
    মিনিট দশেক বাদে লাডু আবার এল, “সাব, দরজাটা—!”
    “ও হ্যাঁ।” অয়ন উঠল। লাডু চলে গেলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এই দুপুর থেকে বিকেলে যাওয়া সময়টা আর এমনিতে ভালো লাগে, আর এখানে এমন মিষ্টি হাওয়া বইছে যে ভালো লাগাটা আরও বেড়ে গেল। এই সময়টায় বাড়িতে বসে টিভি দেখার কোনও মানে হয় না। সে গ্যারাজের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে মনে ফুর্তি এল। তৈরি হওয়ার জন্য ভিতরে পা বাড়াতেই মনে হল গেট খুলে কেউ আসছে। অয়ন ঘুরে তাকাতেই মন্টিকে দেখতে পেল। এগিয়ে এসে তাকে দেখে মন্টি কপালে হাত ছোঁয়াল। অয়ন বলল, “এসো।”
    মন্টি বারান্দার নীচের সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ালে সে জিজ্ঞাসা করল, “সারাদিন নৌকাটাকে কোথায় রেখে দাও?”
    “একটু উপরে রাখার জায়গা আছে। বালির উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে হয়।”
    “তোমার শালা কি সেখানে গিয়ে পার্টস চুরি করেছে?’ অয়ন জিজ্ঞাসা করল।
    “হ্যাঁ বাবু। ও আমার শালা বলে পাহারাদার লক্ষ করেনি।”
    এইবার চিন্তা করল অয়ন। এই লোকটা আজ আত্মহত্যা করতে চায়। এখনও ওর মুখে চোখে যে উদাসীনতার ছাপ রয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে সে নিজের বাসনা থেকে সরে আসেনি। অয়ন জিজ্ঞাসা করল, “মাছ ধরে তুমি কত রোজগার করো?”
    “কোনওদিন চারশো, কোনওদিন বেশি। যাই পাই তা থেকে ইঞ্জিন যে চালায় তাকে দিতে হয়। আপনি আমাকে আসতে বললেন তাই এসেছি। আর ভেবে কী হবে?” বড়ো শ্বাস ফেলল মন্টি, “আপনি কি কিছু বলবেন?”
    “তুমি মাছ ধরে যা রোজগার করো তাতে তিন মাসে চার হাজার টাকা ফেরত দিতে পারবে। আমি তোমাকে সাড়ে চার হাজার টাকা দিচ্ছি। তুমি বলেছ পার্টসের দাম চার হাজার, বাকি পাঁচশো নৌকাটাকে সারাইয়ের কাজে লাগিও। তিন মাস পরে টাকাটা দিয়ে যেও।” শান্ত গলায় বলল অয়ন।
    “কেন, আপনি আমাকে টাকা দেবেন বাবু?” মন্টি জিজ্ঞাসা করল।
    হকচকিয়ে গেল অয়ন। এই প্রশ্ন যে মন্টি করবে তা সে ভাবতে পারেনি। একটু হেসে অয়ন জবাব দিল, “আত্মহত্যা কখনওই কোনও সমস্যার সমাধান নয়। মাত্র চার হাজার টাকার জন্য তুমি আত্মহত্যা করতে চাইছ। এই পাপ যাতে তুমি না করো তাই টাকাটা তোমাকে ধার দিতে চাইছি।”
    মাথা নাড়ল মন্টি, “না বাবু। আপনি আমাকে চেনেন না, কোথায় থাকি তাও জানেন না। আমাকে আপনি আগ বাড়িয়ে ধার দিচ্ছেন কেন? এতে তো আমার সন্দেহ আসছে। মনে হচ্ছে আপনার মনে কুমতলব আছে। যেখানে খুব চেনা মানুষও এক পয়সা ধার দেওয়ার আগে তিনবার ভাবে, ধার দিলে সুদ চায় সেখানে আপনি—!” মান্টি মাথা নাড়ল, “আচ্ছা বাবু, আমি যাই—!”
    “দাঁড়াও, তোমাকে খুব ভালো লাগল মন্টি। সত্যি বলছি, ধার দেব বলেছি কিন্তু আমারও মনে দ্বিধা ছিল। যদি টাকাটা তুমি মেরে দাও, যদি শোধ না করো, তাহলে আমি তো কিছুই করতে পারব না। আমি ভেবেছি একজন মানুষের জীবনের চেয়ে চার হাজার টাকা কখনওই দামি হতে পারে না। এখন মনে হচ্ছে, আমি ঠিক মানুষকেই টাকাটা দিতে চেয়েছি।” অয়ন বলল, “তাছাড়া তুমি ভুলে যেও না, শালার বউ তোমার উপর নির্ভর করে আছে। তুমি চলে গেলে ওর কী হবে?”
    “এটাই আমার জ্বালা। ওই মেয়েটার দিকে যুবক ছেলেরা নজর দেয়। এতদিন ওর স্বামী ছিল বলে আমি মাথা ঘামাতাম না। ওকে আগলে রাখতে আমার প্রাণ জেরবার হবে।” মন্টি বলল।
    “সংসারে কিছু না কিছু সমস্যা তো থাকবে মন্টি।”
    একটু চুপ করে থেকে মন্টি জিজ্ঞাসা করল, “আপনি এই বাংলোয় কতদিন থাকবেন বাবু?”
    “অন্তত পাঁচ বছর!” অয়ন বলল, “এই বাংলো আমি ভাড়া করেছি।”
    “আপনার পরিবারও এখানে আছে?”
    “না। আমি একা। আমার স্ত্রীও তোমার স্ত্রীর মতো গত হয়েছেন।”
    “আপনি এত বড়ো বাংলোয় একদম একা থাকবেন?”
    “হ্যাঁ মন্টি। আমি জীবনটাকে ভালোবাসি। এতদিন আমার জীবনে অনেকেই ছিল। এখন একা থাকার জীবনটা কেমন লাগে দেখতে চাই।”
    “বাবু আপনি ধার দিতে চাইছেন, কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”
    “বেশ বলো।”
    “আমি রোজ আপনাকে পঞ্চাশ টাকা আর আপনার খাওয়ার মাছ দিয়ে যাব।”
    “রোজ টাকা দিতে হবে না। মাসে দেড় হাজার টাকাই দিও, পঞ্চাশ টাকা দিনে দিনে দিলে তাই হয়। মাছ দিতে চাইছ, বেশ তো, দিও।”
    “আর একটা কথা, যদি শরীর খারাপ হয়, মাছ ধরতে যেতে না পারি, তাহলে সেই কটা দিন ক্ষমা করে দেবেন।”
    “নিশ্চয়ই, তুমি দাঁড়াও।”
    ভিতরে গিয়ে সাড়ে চার হাজার টাকা নিয়ে এসে মন্টির হাতে দিল অয়ন। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় মাটি পর্যন্ত ঝুঁকে প্রণাম করল মন্টি। তারপর চোখ মুছল।
    “তোমার নৌকা চালু হয়ে যাবে কখন?”
    “বিকেলের আগেই বাবু।”
    “কাল ইঞ্জিনে বসবে কে?”
    “লোক খুঁজতে হবে। মওকা বুঝে সবাই বেশি টাকা চাইছে। দেখি।”
    “তুমি ঠিক কখন জলে নৌকা নামাবে?”
    “সন্ধেবেলায় খেয়েদেয়ে ঘুমাবো। ঠিক একটা নাগাদ ভাটা শুরু হলে বের হব। যে জায়গায় নৌকা দেখে এলেন সেখান থেকেই যাব। আর ফিরে আসতে আসতে সকাল সাতটা। তখন গেলে দেখতে পাবেন। প্রণাম বাবু।” মন্টি চলে গেল।

    বিকেল হওয়ার মুখে চা খেয়ে গাড়ি নিয়ে বের হল। লাডুর কাছে জেনে নিয়েছিল পেট্রল পাম্প কোনদিকে গেলে পাবে। সেখানে গিয়ে ট্যাঙ্ক ভরতি করে নিল সে। টাকা দিতে হল না, কার্ডেই কাজ হল। তারপর আবার পিছন ফিরে বাংলো ছাড়িয়ে মাইলখানেক চলে এসে দেখল রাস্তাটা পাহাড় থেকে সমুদ্রের দিকে খানিকটা নেমে শেষ হয়ে গেছে। সেখানে সিমেন্টের বেঞ্চি রয়েছে বসার জন্য। উপরে প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘সি-ভিউ।’
    গাড়ি পার্ক করে বেঞ্চিতে বসল সে। এখনই জোয়ার শুরু হয়েছে। ঢেউ আসছে একের পর এক। আরব সাগরের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল অয়ন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের যে কবিতা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গান করেছিলেন তা মনে এল, ‘ভাবি বলি সাগরের ইচ্ছে, সাদা ফেনা থেকে যেন শাঁখমাজা ডানা মেলে আকাশের তল্লাশ নিচ্ছে।’
    ঢেউ আছড়ে পড়ছে আবার জল হয়ে ফিরে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তার প্রবল আওয়াজ আবহসংগীত তৈরি করছে। প্রচুর সীগ্যাল উড়ছে সামনে। অয়নের মনে হচ্ছিল সমুদ্রের এই বিশাল চেহারার সামনে মানুষ কী অসহায়! কত ক্ষুদ্র। অথচ তা ভুলে গিয়ে মানুষ নিজেদের মধ্যে ঝগড়ায় ব্যস্ত হয়ে থাকে। সে বড়ো শ্বাস নিল। আঃ, এই তো আরাম।
    আজ রাত্রে হুইস্কির গ্লাস নিয়ে ভিতরের চাতালে বসল অয়ন। একটু যেন আলো মেখেছে সাগর। ঢেউগুলো আরও যেন বড়ো হয়েছে। সেই সঙ্গে আওয়াজ বেড়ে গিয়েছে। জোয়ার শেষ হলে সমুদ্র যখন শান্ত হবে তখন মন্টিরা মাছ ধরতে যাবে। আবার ফিরে আসবে সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আগেই। এ যেন অনেকটা কানামাছি খেলার মতো।
    মাথার উপর অজস্র তারা জ্বলছে। হঠাৎ একটা তারা অনেকটা ছুটে গিয়ে মিলিয়ে গেল। হুইস্কি খেতে খেতে হঠাৎ একটা শব্দ শুনতে পেল সে। না, এই শব্দ সমুদ্র থেকে উঠে আসছে না। দু পাশের পাহাড়ে থাকা প্রাণীদের ডাক হতে পারে। অয়নের বেশ রহস্যময় মনে হচ্ছিল।
    আজ লাডু কাজে আসার আগেই ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করে মাইক্রোওয়েভে চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছিল অয়ন। সে যখন বিস্কুট দিয়ে চা খাচ্ছে তখন লাডু এল। অয়নের হাতে চায়ের কাপ দেখে যেন লজ্জা পেল সে, “এ হে, হে। বাজার করতে একটু দেরি হয়ে গেল, নাহলে আমিই চা বানিয়ে দিতাম।”
    “দূর। আমার ইচ্ছা হল তাই বানিয়ে নিলাম।” অয়ন বলল।
    “সাব, পেপারওয়ালা জিজ্ঞাসা করছিল আপনি পেপার নেবেন কিনা। ও সাড়ে সাতটার মধ্যে ইংরেজি পেপার দিতে পারে।”
    অয়নের মনে হল, খবরের কাগজ পড়ে কী হবে। সেই টাকার এ-পিঠ আর ও-পিঠ। তাছাড়া, এখানকার ইংরেজি খবরের কাগজে কলকাতার খবর কম ছাপা হবে। যদি বড়ো কোনও ঘটনা ঘটে, তাহলে গুরুত্ব দেবে। ওখান থেকে এখানে চলে এসে খবরের জন্য তো সে হাপিত্যেশ করে বসে নেই। টিভিতে একবার নিউজ শুনলেই তো ওয়াকিবহাল হওয়া যায়। অয়ন বলল, “না হে! পেপার লাগবে না।”
    লাডু যে একটু অবাক হল, তা ওর মুখ দেখে বোঝা গেল।
    সাদা বারমুডা আর কলার তোলা সাদা গেঞ্জি পরে পাথরের ধাপ বেয়ে নীচে নেমে এল অয়ন। আসার সময় চাবি নিয়ে আসায় দরজা খুলতে সমস্যা হল না। বালির উপর পা রেখে সে দেখল প্রচুর নৌকা সমুদ্রে ভাসছে। ওপাশে কিছু লোক সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে। নৌকাগুলো একে একে তীরে ফিরে আসছে। নৌকা বালিতে পৌঁছোতেই সেটাকে টেনে উপরে নিয়ে আসছে স্থানীয় মানুষ। তারপর নৌকার খোল থেকে মাছ বের করে নীচে স্তূপ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে চলছে বাছাইয়ের কাজ। দুজন মাতব্বর গোছের মানুষ সেই কাজ পরিচালনা করছে। একটু পরেই অয়ন মন্টির নৌকাটাকে দেখতে পেল। সামনে মন্টি বসে আছে। কিন্তু পিছনে ইঞ্জিনের পিছনে ওটা কে? পুরুষ বলে মনে হচ্ছিল না। নৌকা আরও এগিয়ে এলে অয়ন বুঝতে পারল, পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
    নৌকা বালিতে পৌঁছোতেই স্থানীয় লোকগুলো ছুটে আসছিল কিন্তু মন্টি চিৎকার করে তাদের আটকাল। নৌকা থেকে লাফিয়ে বালিতে নেমে দুপাশে হাত ছড়িয়ে বলল, “না। কেউ হাত দেবে না। সব মাছ বিক্রি হয়ে গেছে।”
    ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। সেই মাতব্বরদের একজন জিজ্ঞাসা করল, “অ্যাই মন্টি, কে নিয়েছে?”
    “একটু পরে তোমাকে বলছি।”
    সংলাপগুলো অনুমান করছিল অয়ন। ওরা কথা বলছিল যে-ভাষায় তা তার পক্ষে অবোধ্য। দেখা গেল ভিড় একটু দূরে সরে গেলেও দুজন মজুর গোছের মানুষ দাঁড়িয়ে রইল। মন্টি তাদের কিছু বলতেই তারা হাত লাগাল। নৌকার খোল থেকে মাছ তুলে বালিতে ফেলতে লাগল তারা। প্রথমে গাদা গাদা কুচি মাছ বালিতে পড়ল। সেই সঙ্গে দুটো জেলি ফিশ। তারপরে অনেকগুলো বড়ো পমফ্রেট, ভেটকি, পারশের মতো দেখতে মাছ। আড়াল থেকে সরে গেল অয়ন। তারপর খানিকটা হেঁটে একটা পরিত্যক্ত নৌকার উপর উঠে বসল। ভাঙা নৌকাটা বালির মধ্যে খানিকটা বসে আছে।
    সমুদ্র এখন অনেকটাই শান্ত। মাছ ধরে নৌকাগুলো ফিরে আসছে নিজেদের ডেরায়। সীগ্যাল গুলো ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে    ফেলে দেওয়া মাছগুলো। প্রচুর মাছ থাকে মানুষের অপছন্দের তালিকায়। সেগুলোতে দিব্যি আহার করে পাখিগুলো।
    অয়ন দেখল মন্টির শালার বউ একটা ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এই মেয়ের সাহস আছে। অর্ধেক রাত সমুদ্রে মোটর চালিয়ে নন্দাইকে সাহায্য করে এল। মেয়েটার বালির উপর হেঁতে যাওয়ার একটা ছন্দ আছে। শরীর দুলছে পা ফেলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। এত গরিব ঘরের মেয়ে হয়েও মেয়েটা রুগণ নয়।
    প্রায় তিরিশ গজ দূরত্বে যেতে যেতে মেয়েটা ঘাড় ঘুরিয়ে অয়নকে দেখতে পেল। দেখে দাঁড়াল। তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে এল।
    অয়ন হাসল, “তুমি মোটর চালালে?”
    “চালিয়ে দিলাম।” মেয়েটা হিন্দিতে বলল, “কোনও শক্ত কাজ নয়। আর তার জন্য এর-ওর পা ধরতে হয়।”
    “তোমার স্বামী তো কাজটা করার ভয়ে পালিয়ে গেল!”
    “এই বাবু— !” মেয়েটার মুখ শক্ত হল, “কোনও কথা অর্ধেক জেনে বলবে না। ওই হারামিটাকে আমি স্বামী ভাবি না। ও চলে গেছে বলে আমি বেঁচে গেছি। হঃ।”
    “যাক গে। তুমি কি এই প্রথম মাছ ধরার বোটে সমুদ্রে গেলে?”
    “হ্যাঁ। প্রথম বার মোটর চালালাম।”
    “ভয় করেনি?”
    “করেনি আবার! প্রথমে বুকটা শিরশির করছিল। দাঁতে দাঁত চেপে ছিলাম। মাঝসমুদ্রে যখন বড়ো ঢেউটা এসে নৌকাটাকে প্রায় আছাড় মারল তখন মনে হয়েছিল মরে গেলাম। জলে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছি। উনি তখন এমনভাবে বোঝালেন যে মনে সাহস এল। এখন মনে হচ্ছে, আমার নিজের বাবা নেই, উনিই আমার বাবা। আচ্ছা আপনার নাম কী?”
    “কেন? নাম জেনে কী হবে?”
    “আপনি অতগুলো টাকা দিয়ে আমাদের বাঁচিয়েছেন। নাম জানব না?”
    অয়ন হাসল, জিজ্ঞাসা করল, “তোমার নাম কী?”
    “মধুবালা” বলেই মেয়েটা মুচকি হাসল।
    “বাঃ খুব সুন্দর নাম।”
    “হিন্দি ফিল্মের স্টার। হি হি হি।” হাসিটা আচমকা থামাল, “আপনার নাম?”
    “অয়ন।”
    তিনবার চেষ্টা করল উচ্চারণ করতে। কিন্তু তিনবারই অওন হয়ে গেল। শেষে বিরক্ত হয়ে বলল, “এর চেয়ে অন বলা অনেক ভালো। আচ্ছা চলি। গিয়েই ভাত রাঁধতে হবে।” যেমন এসেছিল, তেমন চলে গেল মধুবালা।
    সাড়ে চার হাজার টাকা অয়নের কাছে কিছুই নয়। গতমাসে সে একটা চশমার পিছনে পাঁচ হাজার খরচ করেছিল। কিন্তু ওই টাকাগতরাতে একটি আত্মহত্যা বন্ধ করেছে, একটি যুবতীকে ভেসে যেতে দেয়নি। উলটে তাকে নতুন করে বাবা পাইয়ে দিয়েছে। এরকম যে হতে পারে তা কোনও দিন চিন্তা করেনি। কলকাতায় কেউ যদি বলত চার হাজার টাকার জন্যে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে, তাহলে তাকে টাকা দেওয়া দূরের কথা বিশ্বাসই করত না। লোকটা তাকে ঠকাতে চায় ভেবে মুখ ঘুরিয়ে নিত। কিন্তু এই বিশাল সমুদ্র, মন্টির আচরণ, পার্টসবিহীন নৌকা দেখে বিশ্বাস্টা কী করে যে জন্মে গেল। এখন মনে হচ্ছিল, ঠিক কাজই করেছে সে। মন্টি যদি টাকা ফেরত দিতে না পারে, তাহলেও তার একটুও আক্ষেপ থাকবে না।
    ঘণ্টা দুয়েক বাদে পাথরের সিঁড়ি ভেঙে বাংলোয় উঠে আসতেই লাডু একটা মাঝারি সাইজের ভেটকি মাছ হাতে নিয়ে সামনে দাঁড়াল, “আমি কিছুই বুঝতেও পারছি না সাব।”
    অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল অয়ন।
    “এখানে একটা লোক আছে যার নাম মন্টি। সাগর থেকে মাছ ধরে এনে বিক্রি করে। কিন্তু ও হঠাৎ আজ এই মাছটা দিয়ে গেল। দাম জিজ্ঞাসা করলে বলল, ‘দাম দিতে হবে না। বাবুর জন্যে দিয়ে গেলাম’।”
    “তাই?”
    “হ্যাঁ সাব। আমি তো ভেবে পাচ্ছি না। এখানে আপনাকে কেউ চেনে না। ওরা তো চিনবেই না। আপনাকে কেন বিনা পয়সায় মাছ দেবে?”
    “এই মাছ বাজারে কত টাকায় বিক্রি হয়?”
    “কম সে কম তিনশো টাকা।”
    “তুমি নিশ্চয়ই বাজার থেকে মাছ কিনে এনেছ?”
    “হ্যাঁ সাব।”
    “ওটা আজ থাক। এটাই রান্না করো। আজ দুবেলা আমরা ভেটকি খাব।” কথাগুলো বলে আওয়াজ শুনে সমুদ্রের দিকে মুখ ঘোরাল অয়ন। বোধহয় জোয়ার আসছে। ওপাশ থেকে লাডু জিজ্ঞাসা করল, “মন্টি ভুল করে এখানে মাছটা দিয়ে যায়নি তো?”
    অয়ন হাসল, “সে তো চলে গেছে। এখন কিছু করার নেই। যদি পরে এসে বলে ভুল হয়ে গেছে, তাহলে তিনশো টাকা দিয়ে দিলেই হবে। খাবার দাও, খুব খিদে পেয়ে গেছে।” অয়ন বাংলোর ভিতরে ঢুকে গেল।

    উইন্ডিতে গাড়ি সারাইয়ের কোনও কারখানা নেই। কিন্তু স্টিয়ারিং থেকে মৃদু আওয়াজ বের হচ্ছে যা হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া গাড়ি সার্ভিসিং বহুদিন করা হয়নি। লাডুর কাছে অয়ন জানতে পারল পুবের রাস্তার মনমাড় নামে একটি শহর পড়বে যা এখান থেকে বেশি দূরে নয়। সেখানে অনেকগুলো গাড়ি সারাইয়ের কারখানা আছে। তাড়াতাড়ি লাঞ্চ খেয়ে বেরিয়ে গেল অয়ন গাড়ি নিয়ে। শব্দটা তেমন জোরালো নয়, কয়েক মাস পরেও সারানো যেত। কিন্তু গাড়ির ব্যাপারে অয়ন খুব খুঁতখুঁতে।
    উইন্ডি থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে পৌঁছে সে পুণের পথ ধরল। ঘণ্টাখানেক যেতেই মনমাড় এসে গেল। শহরটি ছোটো নয়। অনেকেই এই স্টেশনে নেমে সিরধিতে সাঁইবাবার মন্দির দর্শন করতে যায়। গ্যারাজ দেখতে পেয়ে তার সামনে দাঁড়াতেই একজন মেকানিক গোছের লোক এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?” অয়ন তার প্রয়োজনের কথা বলতে লোকটি মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে গাড়ি রেখে যান। খুলে দেখব। কাল ফোন করে জেনে নেবেন কখন গাড়ি পাবেন।”
    কথাগুলি হিন্দিতে হচ্ছিল। পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক ভদ্রলোক, কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেল। অয়ন বলছিল, “আমি গাড়ি দিয়ে গেলে ফিরব কী করে?”
    ভদ্রলোক হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি বাঙালি?”
    ঘাড় ঘুরিয়ে অয়ন জবাব দিল, “হ্যাঁ।”
    “আসুন। ভিতরে আসুন।” এবার বাংলায় বললেন ভদ্রলোক।
    অফিসঘরে যে চেয়ারে ভদ্রলোক বসলেন সেখানে সাধারণত মালিকরা বসেন। অয়ন উলটো দিকে বসলে ভদ্রলোক বললেন, “আপনাকে আগে কখনও দেখিনি। ট্যুরিস্ট?”
    “না। আমি উইন্ডিতে থাকি।”
    “ও। আমার নাম অশোক ঘোষ। এই গ্যারাজ আমার। বলুন, কী হয়েছে?”
    অয়ন বলল, “বলছি, আপনি বাঙালি হয়ে এত দূরে গ্যারাজ করেছেন?”
    “পেটের দায় বড়ো দায়। বারো বছর হয়ে গেল। চলে যাচ্ছে।” অশোক ঘোষ বললেন, “আমি আর বাঙালি নেই। অনেকদিন পর বাঙলায় কথা বলছি।”
    “কেন? আপনার ফ্যামিলি?”
    “ওয়াইফ মহারাষ্ট্রের মেয়ে। ওকে বাংলা শেখাতে গিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছি।”
    অয়ন গাড়ির কথা বলল।
    একটু ভাবলেন অশোক ঘোষ। বললেন, “দুভাবে কাজটা করা যায়। সার্ভিসিং নিয়ে সমস্যা নেই। আজ পরপর গাড়ি আছে। তবু আমি ম্যানেজ করে দিতে পারব। কিন্তু ওই স্টিয়ারিং খুলতে হবে। ভিতরে কোনও গোলমাল আছে কিনা, তা দেখতে সময় লাগবে।থাকলে পার্টস পালটাতে হবে। এই কাজটা এখন শুরু করলে সন্ধের আগে শেষ হবে না। তাই আপনি গাড়িটাকে এখানে রেখে যান। আপনাকে আমি আর একটা গাড়ি দিচ্ছি। তাতে ফিরে যান। স্টিয়ারিং খোলার পর নতুন পার্টস কিনতে হলে আপনাকে জানাব। আপনি অনুমতি দিলে কাজ শেষ করব। তখন আপনি এসে আমার গাড়ি ফেরত দিয়ে নিজেরটা নিয়ে যাবেন। আর দ্বিতীয়টা হল, শুধু সার্ভিসিং করিয়ে নিয়ে যান। আওয়াজ যখন খুব অ্যালার্মিং নয় তখন সময় বুঝে পরে করেবেন।”
    “স্টিয়ারিংয়ের কাজ হলে কীরকম খরচ হবে?”
    “না খুললে বলতে পারব না স্যার।”
    “আমি অয়ন। ঠিক আছে, আপনি দয়া করে এখন সার্ভিসিং করিয়ে দিন।”
    অশোক ঘোষ উঠে গেলেন নির্দেশ দিতে। লোকটাকে ভালো লাগল অয়নের।
    ফিরে এসে অশোক ঘোষ বললেন, “চা চলবে?”
    মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল অয়ন।
    দুটো চায়ের হুকুম দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “বাঙালি হওয়ার জন্যে একটা উটকো সমস্যায় পড়তে হয়েছে আমাকে।”
    “কী রকম?”
    ঘণ্টা দেড়েক আগে থানা থেকে ফোন আসায় যেতে হয়েছিল। আপনি যখন মেকানিকের সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন ওখান থেকে এসেছি। হয়েছে কী, দুজন বাঙালি ভদ্রমহিলা, মা এবং মেয়ে সাঁইবাবার মন্দিরে গিয়েছিলেন। এখানে ট্রেন থেকে নেমে অনেকেই বাবার মন্দির দর্শন করতে যান। ট্যাক্সিওয়ালা যাতায়াতের ভাড়া আগাম নিয়ে নিয়েছিল। অনেকেই সেটা দেয় না, যদি ফেরার সময় ট্যাক্সিওয়ালাকে না পাওয়া যায়। কিন্তু সাঁইবাবার জায়গা বলে এঁরা বিশ্বাস করেছিলেন। দর্শন করে অঁরা ফিরে এসে ট্যাক্সিওয়ালাকে পেয়েও ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ওঁরা আবিষ্কার করেন ওঁদের দুজনের ব্যাগ থেকে সব উধাও হয়ে গেছে। কয়েক হাজার টাকা, ক্রেডিট কার্ড, কাগজপত্র, ট্রেনের টিকিট। ট্যাক্সিওয়ালা ওঁদের থানায় পৌঁছে দিয়ে চলে যায়। বৃদ্ধা হিন্দি বলতে পারেন না। বাংলা ছাড়া কোনও ভাষা জানেন না। বৃদ্ধার মেয়ে ইংরেজি ভাষা বলেন। ওঁরা বাঙালি জেনে অফিসার আমাকে ফোন করেন।” অশোক ঘোষ থামলেন। চা এসেছে। কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “গেলাম। ওদের কাছে একটা টাকাও নেই। ট্রেনের টিকিট থাকলে ফিরতে পারতেন। তাও নেই। কোনও হোটেল ওঁদের জায়গা দেবে না। আমি বাঙালি শুনে আশ্রয় চাইলেন। বললেন ওঁরা কলকাতার সল্টলেকে থাকেন। সেখানে ফোন করে বললে বৃদ্ধার ভাই মানি অর্ডার করে টাকা পাঠাবেন। অথবা চেক বই ক্যুরিয়ারে পাঠাবেন। সেই দুই-তিন দিন যদি একটু থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়। একটা হোটেলে সেটা আমি করেই দিতে পারি। টাকা এলে পেমেন্ট করে দেবেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বৃদ্ধার ভাইকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। ল্যান্ড লাইন বেজে যাচ্ছে, মোবাইল বলছে, আউট অফ রিচ। খুব ভেঙে পড়েছেন ওঁরা।”
    “বৃদ্ধামহিলার মেয়ে তার স্বামীকে ফোন করছেন না কেন?”
    অশোক ঘোষ থানায় গেলেন তাঁর গাড়িতে, কারণ তাকে ফিরতে হবে।
    অফিসার ইন চার্জ বাইরে দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন, অশোক ঘোষ তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। সব শুনে ভদ্রলোক বললেন, “ওঃ বাঁচালেন মশাই। থানার ভিতরে দুজন মহিলাকে বসিয়ে রাখা তো ঠিক নয়। আপনি উইন্ডিতে কার বাড়িতে থাকেন?”
    “মিসেস শোভা কানিৎকারের বাংলোয় থাকি।”
    একটু চোখ ছোটো করে ভেবে নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “সমুদ্রের উপরে বাংলোটা, তাই না? দারুণ বাংলো। আমি বাইরে থেকে যেন দেখেছি।”
    অশোক ঘোষ বললেন, “আমরা ওঁদের সঙ্গে কথা বলি?”
    অফিসার ইন চার্জ বললেন, “প্লিজ।”
    মা এবং মেয়ে একটা বেতের চেয়ারে বসেছিলেন। বৃদ্ধার বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। ছোটোখাটো চেহারা। লাল টুকটুকে গায়ের রঙ। চোখে চশমা। হাতের চামড়া কুঁচকে গেছে, মুখে বয়সের দাগ প্রকট। পরনে সাদা সিল্কের শাড়ি, কনুই অবধি জামা। দেখলেই মনে হবে অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ উনি। তাঁর পাশে চোখ বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে যিনি বসে আছেন তার বয়স তিরিশ পেরিয়েছে। এঁর পরনে পাজামার উপর বাটিকের কাজ করা ফতুয়া। মায়ের রঙ না পেলেও ইনি যথেষ্ট ফরসা। চুলের প্রান্ত কাঁধ পর্যন্ত। মুখ-চোখে পরমা সুন্দরী হতে হতেও হননি। অশোক ঘোষ বললেন, “আপনাদের দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। অনেক কষ্ট করেছেন। এবার চলুন, একটু আরাম করবেন। এই ভদ্রলোকের নাম অয়ন। ইনি থাকেন উইন্ডি নামের একটা জায়গায়, যা এখান থেকে বেশি দূরে নয়। সমুদ্রের উপর এঁর বাংলো। আর এঁদের কথা তো আপনাকে বলেছি। মিসেস সেন, মিসেস সেনের মেয়ে দিতি সেন।” দিতি সেন দাঁড়িয়ে হাত জোড় করতেই অয়ন ওঁদের নমস্কার করল।
    মিসেস সেন জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার কোনও অসুবিধা হবে না তো?”
    অয়ন বলল, “আপনাদের সমস্যার কথা মিঃ ঘোষের কাছে শুনেছি। তারপর ব্যক্তিগত অসুবিধাকে বড়ো করে দেখলে নিজের কাছেই ছোটো হয়ে যাব। কিন্তু আমার বাংলোয় আপনারা স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন কিনা, তা ভেবে দেখুন। আর একটা কথা, বাংলোটা আমার বললাম, কিন্তু ওখানে আমি ভাড়ায় থাকি।”
    দিতি সেন মিসেস সেনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী করবে মা?”
    “একটা কোথাও তো থাকতে হবে। এভাবে থানায় পড়ে থাকতে পারি না। তা, আপনার পরিবারের লোকজন বিশেষ করে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কি কথা বলে নিয়েছেন?” মিসেস সেন ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করলেন।
    অশোক ঘোষ জবাবটা দিলেন, “উনি বিপত্নীক। বাংলোয় একাই থাকেন। আপনারা স্বচ্ছন্দে যেতে পারেন। টাকা পাওয়া মাত্র জানালে আমি টিকিট কেটে রাখব।” পার্স থেকে একটা কার্ড বের করে ভদ্রলোক দিতি সেনকে দিলেন।
    মিসেস সেন বললেন, “এভাবে অপরিচিত মানুষের বাড়িতে কখনও যাইনি। খুব অস্বস্তি হচ্ছে। উপায় তো নেই, চলুন।”
    অয়ন হেসে ফেলল, “কিছু মনে করবেন না। আপনি আমাকে তুমি বলুন। বয়সে আমি অনেক ছোটো। তুমি শুনতেই আমার ভালো লাগবে।”

    উইন্ডিতে ঢোকার পরেই সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল। যেটা দেখে পিছনে বসা দিতি সেন উচ্ছ্বসিত হয়ে তাঁর মাকে বললেন, “মা দ্যাখো, আমরা সমুদ্রের ধারে চলে এসেছি। এটা আরব সাগর। এই যাঃ আড়ালে চলে গেল।”
    মিসেস সেন বললেন, “চোখের আড়ালে গেলেও কানে তো আওয়াজ শুনছিস। সবই সাঁইবাবার কৃপা। তিনিই বিপদে ফেলেন, তিনিই উদ্ধার করেন।”
    গাড়ি চালাতে চালাতে হাসল অয়ন। মুখে কিছু বলল না। উন্ডির মার্কেটের সামনে এসে সে গাড়ি থামাল, “পাশেই বাজার। আপনাদের যদি পছন্দের কিছু থাকে তাহলে বলুন, কিনে নিয়ে আসি।”
    মিসেস সেন মাথা নাড়লেন, “স্পেশাল কিছু কেনার দরকার নেই।”
    অয়ন তবু ভিতরে গিয়ে একটা বড়ো কেক আর কিছু ফল কিনে নিয়ে এল। লোকালয় পেরিয়ে খানিকটা যেতেই দিতি সেন জিজ্ঞাসা করলেন, “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
    “বাংলোয়।”
    “এত নির্জনে?”
    “নির্জনে থাকতেই তো এসেছি। সারাজীবন এত চিৎকারে থেকেছি যে আর সহ্য হচ্ছিল না। তবে নির্জন বলে ভয় পাবেন না।” অয়ন হাসল।
    রাস্তা থেকে গলিতে নেমে গেটের সামনে দাঁড়াতেই লাড়ু ছুটে এসে ওটা খুলে দিল। আগে নিজে নেমে দরজা খুলে ধরে অয়ন বলল, ‘আসুন, আমরা পৌঁছে গিয়েছি। এই হল সেই বাংলো, আর ওর নাম লাড়ু। আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
    লাড়ু ঝুঁকে নমস্কার করল। মিসেস সেনের নামতে কষ্ট হচ্ছিল, অয়ন তাঁকে ধরে নামিয়ে আনল। অয়ন বলতে লাড়ু ডিকি থেকে মালপত্র বের করে বারান্দায় রাখল। অয়ন দিতি সেনকে বলল, ‘আপনারা এখন একটু ফ্রেশ হয়ে চা খেয়ে নিন।’ তারপর লাড়ুকে বলল, ‘লাড়ু, তুমি এখনই মেমসাহেবদের চা-কেক দেবে। তারপরেই ওঁরা কী ধরনের জলখাবার পছন্দ করেন তা চটপট বানিয়ে দেবে। এখন ওঁদের ও-পাশে বেডরুম দুটোয় নিয়ে যাও।’
    দিতি সেন বললেন, ‘আপনি ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? শুধু চা হলেই চলবে।’
    ‘মাফ করবেন, আমার অনুমান, আজ সকাল থেকে আপনাদের খাওয়া হয়নি। যা টেনশনে ছিলেন তাতে ভয়ঙ্কর টায়ার্ড হওয়ার কথা। এখন কিন্তু খাবার খাওয়া খুব জরুরি।’ অয়ন বলল।
    লাড়ু ওঁদের ভেতরে নিয়ে গেলে অয়ন গাড়ি গ্যারাজ করল। তার ভালোই লাগছিল, হঠাৎ যেন বাংলোর পরিবেশটা বদলে গেল।
    চাতালে এসে চেয়ার টেনে বসল অয়ন। এখনই সূর্য ডুবে যাওয়ার তোড়জোড় আরম্ভ করবে। সাগরের জল এখন বেশ বেড়ে গেছে। প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ঢেউগুলো তীরে আছড়ে পড়ছে। কোনো কোনো ঢেউ এতটা ওপরে ছিটকে উঠে আসছে যে বাংলো থেকে কয়েক ধাপ নামলেই তাদের ছোঁয়া যাবে। মুগ্ধ হয়ে দৃশ্য দেখে যাচ্ছিল সে। একেই বলে বোধহয়, প্রাণের আরাম।
    ‘অপূর্ব!’
    কণ্ঠস্বর শুনে পেছনে তাকাতেই অয়ন দেখল, দিতি সেন চাতালে এসে দাঁড়িয়েছেন। এখন তাঁর পরনে ঘাগরা আর টি-শার্ট।
    ‘এই বাংলোর সন্ধান আপনি কী করে পেলেন?’
    ‘নেট থেকে। অবশ্য সেখানে কোনো ছবি ছিল না, দেখতে এসে আটকে গিয়েছি।’
    ‘যিনি বাংলো বানিয়েছিলেন তিনি খুব শৌখিন মানুষ। এই চাতালে বসেই সারাদিন কাটিয়ে দেওয়া যায়।’ দিতি সেন বললেন।
    লাড়ু অয়নের চা নিয়ে এল। অয়ন হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভুলে গিয়েছিলে?’
    ‘না সাব। ভুল করে কম বানিয়ে ফেলেছিলাম।’
    দিতি সেন বললেন, ‘দোষটা আমাদেরই। ওকে আগে বলা হয়নি, মা দু’কাপ চা খায়। তার ওপর আজ সারাদিন চা খাওয়া হয়নি।’
    ‘মেমসাহেবদের কী জলখাবার দেবে?’
    লাড়ু জবাব দিল, ‘ফিশ ম্যাকুইট। ওই ভেটকি মাছের ফিলেট বানিয়েছিলাম।’
    লাড়ু চলে গেলে দিতি সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি এখানে কতদিন আছেন?’
    ‘এখনও একমাস হতে দেরি আছে।’
    ‘এত সুন্দর জায়গায় আসতে পারব, তা কয়েক ঘণ্টা আগেও ভাবিনি। কী করে যে সর্বস্ব উধাও হয়ে গেল তা ভেবেই পাচ্ছি না।’
    ‘ওহো, আপনারা তখন টেলিফোন লাইন পাননি। আমার মোবাইলটা নিয়ে ট্রাই করে দেখুন, পেয়ে যেতে পারেন।’ নিজের মোবাইল ফোন এগিয়ে দিল অয়ন।
    দিতি সেন যন্ত্রটা নিয়ে নাম্বার টিপলেন। তারপর মাথা নাড়লেন, ‘সুইচ অফ্‌। তখন শুনছিলাম আউট অফ রিচ। এই সময় কেউ মোবাইল বন্ধ রাখে!’ বেশ বিরক্ত হয়ে কথাগুলো বলে যন্ত্রটা ফেরত দিলেন দিতি সেন।
    ‘আপনি বসবেন?’ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল অয়ন।
    ‘না না, আপনি বসুন। দেখি, মায়ের অবস্থা এখন কীরকম!’ দিতি সেন চলে গেলেন।
    সাড়ে ছটা নাগাদ লাড়ু চলে যাওয়ার আগে বলল, ‘দুই মেমসাহেবের খাবার হটবক্সে রেখে দিয়েছি। আপনার খাবার মাইক্রোওয়েভে রেখেছি। খাওয়ার আগে একটু গরম করে নেবেন।’
    ‘ঠিক আছে। সকালে কত টাকার বাজার করেছিলে তা লিখে রেখেছ?’
    ‘হ্যাঁ। খাতায় লিখেছি। পাঁচশো টাকা দিয়েছিলেন, এখনও দুশো চল্লিশ টাকা আছে।’
    ‘বাঃ, তুমি আরও পাঁচশো রাখো। ওঁদের জন্যে ভালো বাজার করে এনো। দুধ নিয়ে এসো। কী রাঁধবে তা ওঁদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করবে।’
    ‘ঠিক আছে সাব। আমি কি মেমসাহেবদের হটবক্সের কথা বলে যাব?’
    ‘হ্যাঁ। বলে যাও’।
    কিন্তু লাড়ু একটু পরেই যাওয়ার আগে জানিয়ে গেল দুই মেমসাব ঘুমোচ্ছেন বলে সে ডাকেনি। দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরে চলে এল অয়ন। সারাদিন অভুক্ত থাকার পর স্নান করে খাবার খাওয়ার পর ঘুম আসাটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই রাত্রে ওঁদের ঘুম ভাঙবে। ডাইনিং টেবিল থেকে হটবক্স এবং জলের বোতল তুলে কোণের বেডরুমের দরজায় গিয়ে দেখল সেটা খোলা। সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকে ওগুলো রেখে চলে এল অয়ন। ঘুম ভাঙলেই ওঁরা দেখতে পাবেন।
    রাত নেমে গেছে। সমুদ্রের আওয়াজ উত্তাল হয়েছে। ঘড়িতে এখন সাতটা বেজে গেছে। এখানে দেরিতে অন্ধকার নামে। কিন্তু নামামাত্র সেটা ঘন হয়ে যায়। টিভি চালু করল। কোনো নতুন খবর নেই। বন্ধ করল ওটা। তারপর হুইস্কির বোতল এনে এক পেগ গ্লাসে ঢালল। জল মিশিয়ে চুমুক দিয়ে মনে হল চাতালে বসে খেলে বেশি ভালো লাগত। কিন্তু আজ সেটা সম্ভব নয়।

    অয়নের ঘুম ভাঙল একটু তাড়াতাড়ি। তাজা হয়ে দরজা খুলতেই দেখল দিতি সেন দাঁড়িয়ে আছেন। ‘গুড মর্নিং।’
    ‘গুড মর্নিং। এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছেন!’ অয়ন বলল।
    ‘কাল অনেক ঘুমিয়েছি। আপনাকে ধন্যবাদ কীভাবে দেব জানি না। খাবারটা আমাদের ঘরে রেখে এসেছেন বলে খুব ভালো লেগেছে।’ বলেই কিচেনে ঢুকে দু’কাপ চা নিয়ে এলেন দিতি সেন, ‘হয়তো অনধিকার চর্চা করলাম। খেয়ে দেখুন, কীরকম হয়েছে!’
    ‘বাঃ! মেঘ না চাইতেই জল। লাড়ু বাজার করে আনে বলে একটু দেরি হয়।’ চায়ে চুমুক দিয়ে অয়ন বলল, ‘চমৎকার।’
    দ্রুত চা খেয়ে দিতি সেন বললেন, ‘আমি একটু হেঁটে আসতে চাইছি।’
    ‘বেশ তো।’
    ‘কোন দিকে গেলে ভালো হয়>;
    ‘যে কোনো দিকে যেতে পারেন।’
    বাইরের দরজা খুলে দিল অয়ন। গেঞ্জি এবং জিনস পরে হাঁটতে বেরিয়ে গেলেন দিতি সেন। অয়নের মনে হল, ভদ্রমহিলা বেশ স্মার্ট।
    মহারাষ্ট্রের এই অঞ্চলগুলোয় ঠান্ডা পড়ে না বললেই হয়। তার ওপর সমুদ্র থাকায় বছরের এই সময়টায় গরম ও ঠান্ডার মাঝামাঝি একটা আবহাওয়া তৈরি হয়। অয়ন দেখল মিসেস সেন গায়ে একটা হালকা চাদর জড়িয়ে টুকটুক করে বেরিয়ে এলেন। সে দ্রুত এগিয়ে গেল, ‘ঘুম হয়েছিল?’
    ‘হ্যাঁ। এত ক্লান্ত ছিলাম যে মড়ার মতো ঘুমিয়েছি।’ বলেই সমুদ্রের দিকে তাকালেন তিনি।
    ‘বাঃ। কী সুন্দর। এর আগে সমুদ্র দেখেছি বিচে গিয়ে। এরকম ওপর থেকে কখনও দেখিনি।’
    ‘আপনি বসুন। আমি চা নিয়ে আসছি।’ চেয়ার এগিয়ে দিয়ে কিচেনে ঢুকল অয়ন। তার কপাল ভালো ছিল। তখনও পটে চায়ের পাতার সঙ্গে খানিকটা জল গরম ছিল। তাই চা তৈরি করে এনে দিতে সহজ হল।
    ‘তোমার বাড়িতে এসে শুধু থাকছি না, তোমাকে দিয়ে চা করিয়ে খাচ্ছি।’ চুমুক দিলেন মিসেস সেন, ভালো হয়েছে। আমি এরকম কড়া-ই খাই।’
    সমুদ্রের গভীরে অনেক নৌকো দেখা যাচ্ছিল। ডান দিকের পাহাড়ের ওপর সীগ্যাল পাক খাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে মিসেস সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাড়ির দু’দিকে পাহাড়?’
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘জন্তু-জানোয়ার নেই তো?’
    ‘থাকলেও তারা দেখা দেয়নি।’
    ‘দিতি কোথায় গেল?’
    ‘উনি মর্নিং ওয়াক করতে গিয়েছেন।’
    ‘এখানে এসেও—! ওর মামাকে ফোন করতে হবে।’
    ‘উনি গতকাল আমার মোবাইল থেকে করেছিলেন। একটু বেলা হোক, করা যাবে।’
    ‘এখনও করতে পারো। আমার ভাই পাঁচটার মধ্যে উঠে পড়ে।’
    ‘ঠিক আছে। লাইন পেলে আপনাকে দিচ্ছি, কথা বলবেন।’
    দিতি সেনের ডায়াল করা নাম্বার টিপল অয়ন। বিপ বিপ করে প্রথমবারে কেটে গেল। কিন্তু দ্বিতীয়বারে রিং শুরু হল। খুশি হয়ে খবরটা দিয়ে কানে চেপে ধরল অয়ন যন্ত্রটাকে। তারপর পুরুষকণ্ঠে ‘হ্যালো’ শুনতে পেয়ে মিসেস সেনকে মোবাইল যন্ত্র দিল।
    ‘হ্যালো! হ্যালো! ঝন্টু বলছিস? হ্যালো, আমি দিদি। হ্যালো!’ তারপর মাথা নেড়ে বললেন, ‘ওর কথা শুনতে পাচ্ছি না। দ্যাখো তো!’
    অয়ন মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে দেখল লাইন কেটে গেছে। সে রিডায়াল করতেই হ্যালো শুনতে পেল। অয়ন বলল, ‘ঝন্টুবাবু বলছেন? আপনার দিদি যিনি সাঁইবাবার আশ্রমে এসেছিলেন, তিনি কথা বলবেন!’
    ‘এখানে টাওয়ার খুব খারাপ। ওঁকে বলুন, আমি এখন পুরীতে এসেছি পুজো দিতে। পরশু কলকাতায় ফিরে ফোন করব। হ্যালো—!’ লাইন আবার কেটে গেল।
    ঝন্টুবাবুর বলা কথা মিসেস সেনকে শোনাতেই তিনি সোজা হয়ে বসলেন। তাঁকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল। নিজের মনেই বললেন, ‘পইপই করে বলে এসেছিলাম আমরা কলকাতায় না ফেরা পর্যন্ত ও যেন বাড়িতেই থাকে। আমার কথা শুনল না। ওর ফোন যখন আউট অফ রিচ বলেছে তখনই সন্দেহ হচ্ছিল। পরশু সে কলকাতায় ফিরে আমাদের সমস্যার কথা শুনবে। তারপর কতদিন লাগাবে কে জানে। তোমার ওপর বোঝা হয়ে থাকতে হবে।’
    ‘বিন্দুমাত্র নয়।’ অয়ন বলল, ‘তাছাড়া পরশু ফিরে এলে আপনাদের সমস্যা সেইদিনই সমাধান হয়ে যেতে পারে। চিন্তা করবেন না।’
    ‘কী করে?’
    ‘ওঁকে আমার ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকাটা অ্যাকাউন্টে জমা করতে বললে এখানে আমি তখনই তুলে নিতে পারব। একটুও সমস্যা হবে না!’ অয়ন বলল।
    ‘সে পুরীতে গিয়েছে। ফিরে আসার পরে তার পকেটে যদি টাকা থাকে তবে তো পাঠাবে! আর অয়ন, তোমাকে একটা অনুরোধ করব, দিতিকে বোলো না ও পুরীতে গিয়েছে।’
    ‘নিশ্চয় বলব না। উনি বোধহয় পুজোটুজো পছন্দ করেন না।’
    একটু ইতস্তত করলেন মিসেস সেন, ‘না। ওর এক্স শ্বশুরবাড়ি পুরীতে। তাদের সঙ্গে ঝন্টুর খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল। দিতির ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পরেও ঝন্টু সম্পর্কটা লুকিয়ে রেখেছিল। নিজের ভাগ্নী সংসার করতে পারল না যে কারণে, সেটা ওর কাছে বড় হল না। কিন্তু ওদের টান বড় হয়ে গেল। আমি অনেক বুঝিয়েছি। বছরখানেক যায়নি ওদিকে। কিন্তু যেই আমরা চলে এসেছি, অমনি ছুটেছে পুরীতে।’
    ‘এরকম সাধারণত দেখা যায় না।’
    ‘কোনো কোনো লোক থাকে যাদের শরীরের বয়স বাড়লেও মনের বয়স বাড়ে না। তারা অপ্রাপ্তবয়স্কই থেকে যায়। সারাজীবন চাকরি করল না। বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে আমার সঙ্গে। বাবার যা ছিল সব ওকেই দিয়েছি। সেসব অবশ্য উড়িয়ে দেয়নি।’ শ্বাস ফেললেন বৃদ্ধা।
    লাড়ু এসে গেল। আজ জ্যান্ত কাতলা পেয়েছে। সঙ্গে অনেক সবজি। ঘড়ি দেখছিল অয়ন। মিসেস সেনকে সে বলল, ‘আপনি এখানে বসেই ওকে নির্দেশ দিন। আমি ততক্ষণে সমুদ্রের ধার থেকে ঘুরে আসি।’
    ‘এসো।’
    সিঁড়ির চাবি খুলে আজ অনেকটা সহজ পায়ে নীচে নেমে এল অয়ন। মাছ ধরে নৌকোগুলো ফিরতে শুরু করেছে। অনেক দেখার পরে সে মন্টির নৌকোটাকে বুঝতে পারল। অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। অন্য নৌকোগুলো থেকে আজ একটু বেশি পরিমাণেই মাছ বের হচ্ছে। ঢেউ-এর সাহায্য নিয়ে মন্টির নৌকো একটু দূরে এনে বালিতে লাগল। অয়ন দেখল আজ মধুবালা মাথায় টুপি করে সমুদ্রে গিয়েছিল।
    যতই চিৎকার করুক, মন্টি ভিড়টাকে বেশি দূরে সরাতে পারল না। ভিড়ের পেছন থেকে অয়ন লক্ষ করছিল। অর্ধেক রাত সমুদ্রে কাটিয়েও এখন মন্টির মুখে হাসি যেন ধরছে না। আজ ওর নৌকো থেকে প্রচুর পার্শে মাছ বের হচ্ছে। ভেটকি বেশ ছোট। অনেকগুলো তপসে একপাশে সরিয়ে রাখল মন্টি। হঠাৎ পিঠে খোঁচা লাগতেই চমকে পেছন ফিরে অয়ন দেখল মধুবালা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটে আঙুল চেপে কথা বলতে নিষেধ করে দ্রুত জলের ধার দিয়ে হেঁটে সেই বালিতে পোঁতা নৌকোর কাছে চলে এল।
    মধুবালা এল খানিকটা পরে। হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘কথা বললেন না কেন?’
    ‘আমি যে মাছ দেখতে এসেছি তা তোমার নন্দাইকে জানাতে চাই না।’
    ‘কেন? জানালে কী হয়েছে? আপনি তো ওর কাছে দেবতা।’
    ‘কাউকে সাহায্য করলে যদি দেবতা হওয়া যায়, তাহলে সবাই দেবতা হতে চাইত। আজ কেমন বোট চালালে?’ অয়ন জিজ্ঞাসা করল।
    ‘কালকের চেয়ে ভালো। জানেন, কাল নন্দাই আমাকে একশো টাকা দিয়েছে।’ সুন্দর হাসল মধুবালা, ‘নিতে চাইনি, জোর করে দিল। বলল, বাইরে থেকে লোক নিলে আরও বেশি দিতে হত।’
    ‘বাঃ। খুব ভালো। শোনো, যখন ইঞ্জিন চালাবে তখন সাবধানে থাকবে। রাত্রে মাঝসমুদ্রে জলে পড়লে বিপদ হবে।’ অয়ন বলল।
    ‘আমি তো একটা পা নৌকোর সঙ্গে বেঁধে রাখি। জলে পড়লে উঠে আসতে পারব। কিন্তু নন্দাই পা বাঁধে না। এই শরীর নিয়েও খাড়া হয়ে হাত ঘুরিয়ে জাল ফেলে। আমি ক’দিন পরে ওর কাছে জাল ফেলার কায়দা শিখে নেব।’
    ‘দয়া করে ওই চেষ্টা করো না। মন্টি তাহলে মাছ ধরা ছেড়ে দেবে আর তোমার স্বামী খবর পেয়ে—!’
    ‘এই বাবু!’ প্রায় চেঁচিয়ে অয়নকে থামিয়ে দিল মধুবালা। ‘খবরদার! আর কখনও যদি ওই লুচ্চার কথা আমাকে বলো, তাহলে তোমাকে দেখলে আমি মুখ ঘুরিয়ে নেব।’ খুব রেগে গিয়েছে মেয়েটা, অয়ন বুঝতে পারল। আর এই রাগের কারণেই সে তাকে আপনি না বলে তুমি বলল।
    ‘তুমি ওকে স্বামী বলে মানো না?’
    ‘না, না, না। ও আমার কাছে মরে গেছে, আমি বিধবা হয়ে আছি।স্বামী! মার লাথি।’ বালির ওপর সজোরে লাথি মেরে মধুবালা ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেল তার বাসার দিকে।
    ওর শরীর পেছন থেকে দেখছিল অয়ন। হাঁটার ভঙ্গিতেও রাগ ফুটে উঠেছে। একটি অশিক্ষিত সমুদ্রে মাছ ধরা পরিবারের বউয়ের আত্মসম্মানবোধ এতটা প্রবল হতে পারে তা জানত না অয়ন। এদেশের মেয়েরা তো স্বামীর যাবতীয় অত্যাচারের সঙ্গে মানিয়ে থাকতে চায় যাতে সংসারটা ভেঙে না যায়। শিক্ষিত এবং চাকরি করা মেয়েরাই মাথা তুলে প্রতিবাদ করছে। শেষ পর্যন্ত আদালতে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু আদালতে যাওয়ার ক্ষমতা মধুবালাদের নেই। আইনের পরোয়াও করে না ওরা। অপমানের শেষ বিন্দুতে পৌঁছে গেলে সম্পর্ক ঝেড়ে ফেলে দেয়।
    অয়ন সমুদ্রের দিকে তাকাল। ঢেউগুলো যেন একটু বেশি গড়িয়ে আসছে। পাহাড়ে গেলে যা মনে হয় না, সমুদ্রের সামনে এলে তা হয়। ফুঁসে উঠছে প্রাণ, পৃথিবীটাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। অনেক চেষ্টার পরও যখন সে শক্তি হারাচ্ছে তখন নেতিয়ে পড়ছে। মাথা নিচু করে নেমে গিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে। এরই নাম জোয়ার এবং ভাটা।
    মুখ ফেরাতেই দিতি সেনকে দেখতে পেল অয়ন। হাঁটুর নীচে প্যান্ট গুটিয়ে সমুদ্রের জলে দাঁড়িয়ে আছেন। ওঁর চকচকে ফর্সা নিটোল পায়ে ঢেউগুলো যেন সেলাম করে ফিরে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা বড় ঢেউকে আসতে দেখে দুদ্দাড় করে পিছিয়ে আসতে চাইলেন দিতি সেন কিন্তু ততক্ষণে ঢেউ তাঁর পোশাকে জল ছিটিয়ে দিয়েছে। অয়ন চিৎকার করল, ‘কেমন লাগছে?’
    দিতি সেন শুকনো বালিতে দাঁড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন অবাক হয়ে। তারপর অয়নকে দেখতে পেয়ে হাসলেন। হেসে হাত তুলে ডাকলেন।
    নৌকো থেকে নেমে কাছে যেতে দিতি সেন বললেন, ‘এ কী! সমুদ্রের কাছে এসে ভাঙা নৌকোয় চুপচাপ বসে আছেন?’
    ‘ভালো নৌকোতে যখন এতবড় সমুদ্র পার হওয়া যাবে না, তখন ভাঙা নৌকোয় স্থির হয়ে বসে ঢেউগুলোর পাগলামি দেখতে মন্দ লাগে না।’ অয়ন হাসল, ‘কতটা হাঁটলেন? কেমন লাগল?’
    ‘সুপার্ব। রাস্তা, বাড়ি এবং প্রকৃতি দেখে মনেই হচ্ছিল না যে ভারতবর্ষে আছি। আমি কয়েক বছর আমেরিকার পিটসবার্গ শহরে ছিলাম। অনেকটা মিল আছে। পিটসবার্গে নদী ছিল, এখানে সমুদ্র। এইটেই তফাত।’ দিতি সেন বললেন।
    ‘সিটিজেনশিপ নিয়েছিলেন?’
    ‘না। তখন যিনি আমার স্বামী ছিলেন তিনি নিয়েছিলেন। আমাকে খুব ইনসিস্ট করেছিলেন কিন্তু কেন জানি না, আমি ভারতের পাসপোর্টটাকেই আঁকড়ে ছিলাম।’
    ‘ওঁর বাড়ি পুরীতে?’
    অবাক হয়ে তাকালেন দিতি সেন, ‘আপনি কী করে জানলেন?’
    হাসল অয়ন, ‘হাঞ্চ বলতে পারেন।’
    ‘পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে পুরীর কথা মনে এল কেন?’
    মুখ ফসকে বলে ফেলে বিপদে পড়ল অয়ন। হাতজোড় করে বলল, ‘আপনি যদি এই প্রশ্নের উত্তর এখনই না জানতে চান, তাহলে কৃতজ্ঞ হব।’
    বড় চোখে অয়নকে দেখে নিয়ে মাথা নাড়লেন দিতি সেন, ‘হ্যাঁ, ওর বাড়ি পুরীতে। জে এন ইউ-তে পড়ার সময় পরিচয় হয়। তারপর ঘনিষ্ঠতা। ও চাকরি নিয়ে আমেরিকায় যায়। দু’বছর পর বিয়ে হল। আমিও গেলাম।’
    ‘চলুন।’ অয়ন বলল, ‘এতক্ষণে ব্রেকফাস্ট রেডি হয়ে গিয়েছে।’ সে বিচ্ছেদের গল্প শুনতে চাইল না।
    পাহাড়ের নীচে এসে অয়ন বলল, ‘পাথরের ধাপে পা ফেলে উঠে আসুন। আপনি আগে যান, আমি পেছনে।’
    ‘কেন?’
    ‘পড়ে গেলে বিপদে পড়বেন না।’
    ‘আপনি তো বিপদ থেকে বাঁচিয়েই যাচ্ছেন।’ দিতি সেন যেন ওপরে উঠতে উঠতে থামলেন, ‘বাঃ, বাংলো থেকে সমুদ্রে নামার এই পথটা তো দারুণ! যিনি বানিয়েছেন তাঁকে বাহবা দিতে হয়।’
    ওপরে ওঠামাত্র মিসেস সেন মেয়েকে বললেন, ‘কখন থেকে ব্রেকফাস্ট নিয়ে বসে আছে লাড়ু, কোথায় গিয়েছিলি?’
    ‘যেতে পারলাম কোথায়, সেই তো ফিরে আসতে হল।’ দিতি সেন ঘরে চলে গেলে লাড়ু একটা বড় সসপ্যান নিয়ে সামনে এল, ‘সাব। এই দেখুন।’
    অয়ন তপসে মাছগুলোকে দেখতে পেল। বেশ ভালো সাইজের গোটা দশেক তপসে।
    লাড়ু বলল, ‘আজও মন্টি এসে এগুলো জোর করে দিয়ে গেল। দাম দিতে চেয়েছিলাম, কিছুতেই নিতে চাইল না। জিজ্ঞাসা করলাম, রোজ রোজ তুমি বিনা পয়সায় মাছ দিয়ে যাচ্ছ কেন? ও বলে গেল, না দিলে পাপ হবে, তাই দিচ্ছি।সাব, ব্যাপারটা আমার একটুও ভালো লাগছে না। হঠাৎ একদিন মোটা টাকা চেয়ে বসবে।’
    ‘টাকা চাইবে কিনা জানি না, কিন্তু দাম না দিয়ে ওর পরিশ্রমের ফসলের ভাগ নেওয়া ঠিক নয়। ওর সঙ্গে কথা বলব আমি।’ অয়ন বলল।
    মিসেস সেন চুপ করে শুনছিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘লোকটা কী করে?’
    ‘সমুদ্রে মাছ ধরে। ওটাই ওর আয়।’
    ‘তাহলে বিনা পয়সায় ওর কাছে মাছ নেওয়া ঠিক নয়। গরিব মানুষ।’
    দিতি সেন পোশাক বদলে এলে লাড়ু ব্রেকফাস্ট টেবিলে খাবার দিল। দিতি সেন অয়নের দিকে হাত বাড়ালেন, ‘একবার মোবাইলটা দেবেন? সকালে যদি লাইন পেয়ে যাই—!’
    মিসেস সেন বললেন, ‘ওহো, তোকে বলা হয়নি। তোর মামার সঙ্গে কথা হয়েছে। সে কলকাতার বাইরে গিয়েছে। ফিরে এসেই টাকা পাঠাবে।’
    ‘সে কী! কলকাতার বাইরে গিয়েছে কেন? ওকে তুমি বাড়িতে থাকতে বলেছিলে!’ দিতি সেন খুব বিরক্ত হলেন মায়ের কথা শুনে।
    ‘কী বলব বল! পরশু ফিরবে।’ মিসেস সেন বললেন।
    ‘কোথায় গিয়েছে?’
    ‘সেটা বলেনি। ওখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক খুব খারাপ।’
    ‘তার মানে পরশু আসবে, কথা হবে। তার পরদিন টাকা বা চেক পাঠালে সেটা পেতে আরও তিনদিন। অয়নবাবু যদি আশ্রয় না দিতেন, তাহলে কী হত তা ভাবলেই শরীর হিম হয়ে যাচ্ছে।’ দিতি সেন বললেন।
    ‘এভাবে বলবেন না।’ আপত্তি করল অয়ন, ‘নির্জন সমুদ্রের গায়ে এই বাংলোয় থাকতে আমার নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগে, কিন্তু আপনারা এখানে আসায় যে বৈচিত্র্ তৈরি হয়েছে সেটাও কম উপভোগ করছি না। আপনারা শুধুই নিচ্ছেন না, দিচ্ছেনও।’
    খাওয়া শেষ হলে দিতি সেন বললেন, ‘পরশু কেন, আজই কলকাতায ফিরে যান মামা। দিন তো ফোনটা, একবার কথা বলব।’ হাত বাড়ালেন তিনি।
    অয়ন তাঁকে মোবাইল ফোন দিলে দিতি সেন নম্বরগুলো টিপলেন। কানে গুঁজে চোখ বন্ধ করে শুনে বললেন, ‘রিং হচ্ছে। ‘হ্যালো, আমি দিতি বলছি। এটা তুমি কী করলে? তোমাকে বলা হয়েছিল আমরা না ফেরা পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে।বলা হয়নি? এখন আমরা ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছি, অথচ তোমার সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি ইমিডিয়েটলি বাড়িতে গিয়ে ফোন করো। শুনতে পাচ্ছ?’ একটু চুপ করে থেকে দিতি সেন বললেন, ‘আজ ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাবে কি না সেটা তোমার প্রবলেম। যাদের কাছে গেছ, তাদের সাহায্য চাও। হ্যালো—, যাঃ, লাইন কেটে গেল।’ ফোন ফেরত দিয়ে দিতি সেন তাঁর মাকে বললেন, ‘কোথায় গেছে বলো তো? ঢেউয়ের শব্দ শুনলাম।’
    মিসেস সেন বললেন, ‘সামনের সমুদ্রে হচ্ছে, তুই ভাবলি ফোনে শুনতে পাচ্ছিস!’ দিতি সেন সমুদ্রের দিকে তাকালেন। বোঝা গেল সন্দেহমুক্ত হতে পারছেন না তিনি।

    সমুদ্রের জলে মিনি সুইমিং পুল ভরে গিয়েছে। চাতালের চেয়ারে বসে ওখানে কীভাবে জল জমে তা বোঝাচ্ছিল অয়ন।
    ‘কতটা জল আছে ওখানে?’
    ‘ফুট চারেক।’
    ‘আমি তো সাঁতার জানি না, বিপদে পড়ব না তো!’
    ‘আপনি ওখানে স্বচ্ছন্দে স্নান করতে পারেন।’
    ‘মিসেস সেন বললেন, ‘কী দরকার। ভেতরেই তো সুন্দর বাথরুম রয়েছে। আমি উঠছি। পিঠ কনকন করছে। আজকাল বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারি না।’
    ‘পারো। গতকাল কতক্ষণ বসে থাকতে বাধ্য হয়েছিলে, ভেবে দ্যাখো।’ দিতি সেন হেসে বললেন। উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে চলে গেলেন মিসেস সেন। সেদিকে তাকিয়ে দিতি সেন বললেন, ‘মা একসময় দারুণ সুন্দরী ছিলেন।’
    ‘এখনও।’ অয়ন গম্ভীর হয়ে বলল। তারপর উঠে দাঁড়াল, ‘একটু বেরুতে হবে।’
    ‘কোনো জরুরি কাজ?’
    ‘না না। আফটার শেভ লোশন শেষ হয়ে এসেছে। কিনতে যাব।’
    ‘ও। আমি সঙ্গে গেলে অসুবিধে হবে?’
    ‘বিন্দুমাত্র নয়।’

    উইন্ডির মার্কেট প্লেসে এখন ট্যুরিস্টরা ঘুরছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাঁদের দোকানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। আফটার শেভ লোশন কিনে অয়ন জিজ্ঞাসা করল, ‘কফি খাবেন?’ মাথা নাড়লেন দিতি সেন, ‘নাঃ। এই তো চা খেলাম। এখানে ট্যুরিস্টরা এসে কী দ্যাখে? সমুদ্র?’
    ‘বোধহয়।’ অয়ন বলল, ‘চলুন, আমি একটা জায়গা আবিষ্কার করেছি। খুব ভালো লেগেছে। আপনার খারাপ লাগবে বলে মনে হয় না।’
    গাড়ি চালিয়ে গতকালের সেই জায়গায় চলে এল অয়ন। রাস্তা শেষ হয়ে গেছে, অনেকটা নীচে সমুদ্রের ঢেউ। গাড়ি থেকে নেমে দিতি সেন বললেন, ‘বাঃ, কী সুন্দর! আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব!’
    ‘এই বেঞ্চে বসতে পারেন।’
    হালকা রোদ সমুদ্রের শরীরে ছড়ানো। এখানে প্রচুর লম্বাটে গাছ। ওই গাছগুলোর মধ্যে দিয়েই রাস্তাটা এসেছে। বাতাস গাছগুলোর ডাল নিয়ে খেলা করছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজের সঙ্গে ডাল-পাতার শব্দ মিশে এক অদ্ভুত কনসার্ট তৈরি করেছে। দিতি সেন বললেন, ‘আমি এখানে সারাজীবন থেকে যেতে পারি।’
    ‘অনশন করে যতদিন থাকতে পারেন, ততদিন।’
    হেসে ফেললেন দিতি সেন, ‘আপনি একটা যাচ্ছেতাই।’
    বহুদূরে একটা জাহাজ যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে অয়ন জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কতদিন আগে দেশে ফিরে এসেছেন?’
    ‘আড়াই বছর। এক বছরের মাথায় ডিভোর্স পেয়েছিলাম। ও কনটেস্ট করেনি। জানেন, আমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়াঝাঁটি হয়নি। যেদিন বুঝতে পেরেছিলাম ওর সঙ্গে আর থাকতে পারব না, সেদিন ওঁকে বলেছিলাম। শুনে ও মাথা নেড়ে বলেছিল, আমিও এই কথাটা তোমাকে বলব ভাবছিলাম, তুমি বলে কাজটা সহজ করে দিলে।’ দিতি সেন বললেন।
    ‘এরকম সাধারণত হয় না। কিন্তু কেন কথাটা বলতে হল?’ অয়ন জিজ্ঞাসা করল।
    ‘আমার মনে হত ও আমাকে নেগলেক্ট করছে। আমাকে সময় দিচ্ছে না। আমাকে ভালো লাগছে না বলেই বোধহয় বাইরের মেয়েদের সঙ্গে অফিসের পরে বেশি সময় কাটাচ্ছে। আর এই মনে হওয়াটা জোরালো হতেই আমি চাইলাম ওকে নেগলেক্ট করতে। সেটা ও বুঝতে পারত কিন্তু মুখে কিছু বলত না। আমরা এক বাড়িতে যে যার মতো থাকতাম। কিন্তু জঙ্গলে যখন কোনো প্রাণী মারা যায়, তখন বহুদূর আকাশে ওড়া শকুনগুলো ঠিক পচা গন্ধ পেয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পচন ধরলে কোনো কোনো মানুষ-শকুন তা বুঝতে পারে। এরকম দুজন আমার কাছে ঘেঁষতে চাইত। তারা মহাপাত্রেরই বন্ধু। কিন্তু ও যে ভুল করেছে আমি সেই ভুল করতে চাইলাম না। তাই ওকে সরাসরি বললাম, সম্পর্কটা ভেঙে দাও।’ দিতি সেন বললেন, ‘হয়ে গেল।’
    ‘ভালোই করেছেন। জোর করে সম্পর্ক ধরে রাখা যায় না।’
    ‘আচ্ছা, তখন আপনি পুরীর কথা বললেন কেন, সত্যি বলবেন?’
    ‘মিথ্যে বলব না। কিন্তু সত্যিটাও বলতে পারব না।’
    ‘পুরীতে মহাপাত্রের পরিবার থাকেন। আমি দু’বার গিয়েছি। খুব সেকেলে মানুষ ওঁরা। যে ক’দিন ছিলাম অভিনয় করতে হয়েছিল। এখনও ওঁরা বাড়ির বউদের ঘোমটা পরা পছন্দ করেন। মহাপাত্রের উচিত ছিল সেইরকম কাউকে বিয়ে করা। কিন্তু দ্বিতীয়বারও ও ভুল করল। এবারের বউ তো পুরীতে গেলে একটা দিনও থাকবে না।’
    ‘এবারের বউ? উনি কি আবার বিয়ে করেছেন?’
    ‘হ্যাঁ। মেয়েটির নাম সিলা। খুব স্মার্ট। ভারতীয় পোশাক পরে না, ইংরেজি ছাড়া কথা বলে না। এগুলো অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হল, বয়ফ্রেন্ড আর সিগারেট ছাড়া ও পাঁচ মিনিট থাকতে পারে না। মহাপাত্রকে ওর পছন্দ হয়েছে কী কারণে আমি জানি না।’ দিতি সেন বললেন।
    ‘কিছু মনে করবেন না, নিজের জীবনটাকে নতুন করে আবার শুরু করার কথা ভাবেননি?’ অয়ন জিজ্ঞাসা করল।
    ‘হ্যান্ডিক্যাপড ছেলেমেয়েদের জন্য একটা স্কুল করেছিল মা। আমি এসে তার দায়িত্ব নেওয়ায় অন্য চিন্তা করার সময় পাইনি।’ দিতি সেন তাকালেন, ‘আমার কথা তো শুনলেন, আপনার কথা বলুন।’
    একটু সময় নিল অয়ন, ‘আমার জীবনটা একদম সাদাসাপটা। ভুল চিকিৎসার জন্য স্ত্রী মারা গেলেন। মামলা-মোকর্দমা করে সময় কাটাতে পারতাম, করিনি। টাকাপয়সা যা রোজগার করেছি তাতে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া অসম্ভব হবে না বলে আর কাজ করতে ইচ্ছে হল না। নিরিবিলিতে থাকব বলে এখানে চলে এলাম।’
    ‘ছেলে না মেয়ে?’
    ‘কেউ আসেনি। হয়তো আমাকে এক থাকার সুযোগ দিতেই আসেনি।’ অয়ন বলল।
    দিতি সেন সমুদ্রের দিকে মুখ ফেরালেন। কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই সমুদ্রে স্নান করেছেন?’
    ‘না। তেমন ইচ্ছাও নেই।’
    ‘কেন?’
    ‘ওই বিশাল জলরাশির মধ্যে গেলে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র মনে হয়। কী দরকার?’
    শব্দ করে হাসলেন দিতি সেন, ‘তাহলে আবালবৃদ্ধবণিতা হয় একা একা, নয় নুলিয়ার সাহায্য নিয়ে যে সমুদ্রে স্নান করে তারা নিজেদের ক্ষুদ্র ভাবে না?’
    ‘বড়জোর কোমরজল পর্যন্ত ভয়ে ভয়ে গিয়ে দুই-একটা লাফ দিয়ে নাকানিচুবানি খেয়ে পালিয়ে আসে আর ভাবে সমুদ্রে স্নান করে এলাম।’ অয়ন বলল।
    ‘আপনি যা একবার ভাবেন তা থেকে সরে আসেন না, না?’
    ‘কেন নয়? যদি নিজের ভুল বুঝতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই সরে আসি।’
    ‘এই যে আপনি আমাদের চেনেন না, থানায় গিয়ে প্রথম দেখলেন, আমরা যা বলেছি তাই শুনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন, আপনার বাংলোয় থাকতে দিয়েছেন, খেতে দিচ্ছেন, যদি জানতে পারেন আমরা মিথ্যে বলেছি, সহানুভূতি পাওয়ার জন্য গল্প বানিয়ে বলেছি, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের চলে যেতে বলবেন, তাই না?’ দিতি সেন তাকালেন।
    ‘এতগুলো যদি এক হয়, তার পর পরিস্থিতি বুঝে যা বলার বলব।’
    ‘আমাদের কাছে ঠকেছেন বলে আফসোস করবেন না?’
    ‘না। করব না।কারণ আপনারা না এলে এই নির্জনে আমার পাশে বসে কেউ গল্প করত না। আপনারা যদি মিথ্যে বলেন তাহলেও এই ব্যাপারটা তো সত্যি।’ কথাগুলো বলতে বলতে অয়নের চোখ মাঝসমুদ্রের দিকে গিয়েছিল। সে থেমে গেল। মনে হল একটা অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখছে। দিতি সেনেরও নজর সেদিকে গিয়েছিল। অস্ফুট গলায় তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হচ্ছে ওখানে?’
    অনেকখানি জায়গা জুড়ে জল একটু একটু করে উঁচু হতে হতে বড় ঢিবির আকার নিয়ে নিল। তারপর বিশাল কোনো জলজন্তুর শরীরের অংশ সেই ঢিবির ওপর চলকে উঠেই নেমে গেল নীচে আর সঙ্গে সঙ্গে ঢিবি নিচু হয়ে আগের মতো সমান হয়ে গেল। দিতি সেনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘গড্‌জিলা।’
    হেসে ফেলল অয়ন, ‘তিনি কল্পনায় বাস করেন।’
    ‘তাহলে ওটা কী?’
    ‘তিমি জাতীয় কোনো প্রাণী। সচরাচর এই সমুদ্রে ওদের দেখা যায় না। কোনোভাবে চলে এসেছে, যারা মাছ ধরতে সমুদ্রে যায়, তাদের নিশ্চয়ই সাবধান করা হবে। চলুন, এবার ফেরা যাক।’ অয়ন উঠে দাঁড়াল।
    দিতি সেন উঠে দাঁড়িয়ে জায়গাটাকে আবার ভালো করে দেখলেন, ‘সত্যি, এখানে এসে মন ভালো হয়ে গেল। যাওয়ার আগে আর একবার নিয়ে আসবেন?’
    ‘অবশ্যই। যখন ইচ্ছে হবে বলবেন।’
    গাড়িতে উঠে দিতি সেন বললেন, ‘আপনি তো বেশ অদ্ভুত। আমি মিথ্যে গল্প বলতে পারি শুনেও একটুও ঘাবড়ে গেলেন না। সত্যি বলুন তো, যা বলেছি তা মিথ্যে প্রমাণ পেলে আপনি কী করবেন?’
    ‘আর একটা গল্প উপভোগ করব। আপনাদের কিছু চুরি যায়নি। মা-মেয়ের ব্যাগে সব টাকা ঠিকঠাক আছে, ক্রেডিট কার্ড খোয়া যায়নি, ট্রেনের টিকিটও না। একটা নাটক তৈরি করার উদ্দেশ্যে থানায় পৌঁছে গিয়েছেন। টিকিট থাকা সত্ত্বেও ট্রেনে উঠছেন না এবং না উঠে আমার সঙ্গে চলে এলেন। এটা যদি দ্বিতীয় গল্প হয়, তাহলে দারুণ হাততালি দেব।’ অয়ন বলল।
    ‘দূর। ওটা বোকা বোকা গল্প। ট্রেনের টিকিট কনফার্মড অথচ ট্রেনে উঠছি না, এটা হতে পারে না। বড্ড কাঁচা গল্প।’ দিতি সেন বললেন।
    ‘বেশ। পাকা গল্পটা কী হতে পারে?’
    ‘হ্যাঁ। আসুন। আমি আর মা গত একবছর সিরডিতে আছি। সঙ্গে যা টাকাপয়সা ছিল সব ফুরিয়ে গেছে। দু’বেলা সাঁইবাবার মন্দিরে প্রসাদ খেয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু ঘরের ভাড়া বাড়িওয়ালাকে দিতে পারছি না।’ দিতি সেন থামলেন।
    ‘এক বছর এখানে কেন থাকবেন? লজিক কী?’
    ‘ধরে নিন কোনো কারণ। যেমন, ডিভোর্সের পর আমি আর কলকাতায় থাকতে চাইছিলাম না। মা আজীবন সাঁইবাবার ভক্ত। তাই আমাকে নিয়ে চলে এসেছিলেন এখানে। এটা বিশ্বাসযোগ্য তো? গুড। কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার ট্রেনভাড়া নেই। কোনোরকমে বাসে করে স্টেশনে এসেছি। টাকা জোগাড় করতে একটা নাটক করেছি আমরা।’ দিতি সেন থামলেন।
    ‘ওই মামার ফোন?’
    ‘ধরা যাক দুটো গল্পেই মামা একটি জীবিত চরিত্র।’
    ‘নাঃ। এটাও বিশ্বাস করা গেল না।’
    ‘কেন?’
    ‘বলছেন, টাকাপয়সা ফুরিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড অভাবে পড়েছিলেন। কিন্তু অভাব যখন আসে চুপিচুপি আসে না, ডালপালা মেলে আসে। দিনে দিনে তার ছাপ পড়ে পোশাকে, শরীরে। আপনার দামি ঘড়ি অনেকদিন আগে বিক্রি করতেন সত্যিকারের অভাবের সামনে পড়লে। আপনাদের মুখ-চোখে অভাব ছাপ ফেলে দিত। সেসব কিছুই যখন হয়নি, তখন থানায় শোনা গল্পই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে।’ অয়ন বলল।

    নিজের বাথরুমে স্নান সেরে বেল বাজাল অয়ন। একটু পরে লাড়ু ঘুরে এলে বলল, ‘খাবার রেডি হলে টেবিলে দাও।’
    ‘ছোট মেমসাহেবের স্নান শেষ হয়নি।’ লাড়ু জানাল।
    ‘হয়ে যাবে।’
    ‘উনি অনেকক্ষণ জলে নেমেছেন।’
    অবাক হয়ে তাকাল অয়ন। লাড়ু চলে গেলে একটু ইতস্তত করে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই মনে হল, মিনি সুইমিং পুলেএকটি বড় রাজহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে। দিতি সেনের পরনে সাদা ফ্রকজাতীয় পোশাক যা হাঁটুর ওপর থেমে গেছে। পোশাকটা ভিজে যাওয়ায় শরীরের সঙ্গে মিশে কাপড় আর চামড়ার পার্থক্য রাখছে না। উল্টোদিকে মুখ থাকায় দিতি সেন তাকে দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু একটু পাশ ফিরতেই অয়ন বুঝতে পারল ভদ্রমহিলা অসম্ভব স্বাস্থ্যবতী। শরীরের খাঁজগুলো স্পষ্ট।
    দ্রুত ঘরে ফিরে এল অয়ন। কোনো মহিলার স্নানের দৃশ্য চুরি করে দেখা শোভন নয়।
    দরজা ভেজিয়ে সোফায় বসল বটে কিন্তু অয়নের চোখ থেকে দৃশ্যটা কিছুতেই মুছে যাচ্ছিল না। দিতি সেনের চুল রুমালের আড়ালে। রুমালটাও সাদা। কিন্তু ওঁর ঘাড় এবং কাঁধ থেকে সোনালি রং ঠিকরে বেরুচ্ছিল রোদের ছোঁয়া পেয়ে। এমন রূপ কখনও দ্যাখেনি অয়ন।
    ঘড়িতে আওয়াজ হতেই সম্বিত ফিরল তার। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জিত হল সে। বিপদে পড়ে ওঁরা এখানে আশ্রয় নিয়েছেন আর সে গোপনে মহিলার স্নানদৃশ্য দেখে আপ্লুত হচ্ছে? ছিঃ! একটাই স্বস্তি যে, সে যে দেখছিল তা দিতি সেনের নজর এড়িয়ে গিয়েছে। ভাগ্যিস! নইলে ভদ্রমহিলা তার সম্পর্কে কত কী ভেবে ফেলতেন।
    আজ লাঞ্চের টেবিলে নীল শাড়ি পরে মায়ের পাশে বসেছিলেন দিতি সেন। অয়ন একটু দেরিতে এসে চেয়ার টেনে বসলে মিসেস সেন বললেন, ‘আজ দিতির জন্যে খেতে দেরি হয়ে গেল তোমার। সেই কখন জলে নেমেছিল, উঠতেই চায়নি। বকেঝকে তুললাম।’
    দিতি সেন চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকালেন, ‘ফ্যান্টাস্টিক। আপনার এই ছোট্ট সুইমিং পুলটাতে স্নান করতে খুব মজা লেগেছে।’
    ‘ঘরে ফিরে আবার স্নান করেছেন তো?’ ভাতের থালায় হাত রাখল অয়ন।
    ‘অফকোর্স!’ ওটা যে সমুদ্রের জল তা আমি জানি মশাই।’ দিতি সেন বললেন, ‘তবে সমুদ্রের জলকে সমুদ্রে ভয়ঙ্কর সুন্দর মনে হয়, এখানে পোষা জল বলে বোধ হচ্ছিল। আমার কাছে তাই ভালো। সাঁতার জানি না যে!’
    অয়ন কিছু বলল না। দিতি সেনের মুখের দিকে তাকাতে তার অস্বস্তি হচ্ছিল।
    মিসেস সেন বললেন, ‘শুনলাম, তুমি নাকি ওকে খুব সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলে। গাড়িতেই সরাসরি যাওয়া যায়! আবার কবে যাবে?’
    ‘গেলেই হয়। বেশি দূরে তো নয়।’
    টুকটাক কথার মধ্যেই অয়নের খাওয়া আগেই শেষ হয়ে গেল। সে বলল, ‘যদি কিছু মনে না করেন, আমি উঠতে পারি?’
    ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। নিশ্চয়ই।’ মিসেস সেন বললেন। দিতি সেন তাকালেন, কিছু বললেন না।
    খানিক পরে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে এসে অয়ন দেখল ওঁরা চাতালের চেয়ারে বসে সমুদ্র দেখছেন। সে বলল, ‘আপনারা বিশ্রাম করুন, আমি একটা জরুরি কাজ সেরে আসছি।’
    ‘এসো।’ মিসেস সেন মাথা নাড়লেন।
    গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অয়ন। উইন্ডি শহরটাকে দু’বার পাক মারল। তারপর গাড়ি থামিয়ে মোবাইলের বোতাম টিপল। ওপাশে সাড়া পেয়ে বলল, ‘নমস্কার, উইন্ডি থেকে অয়ন বলছি।’
    অশোক ঘোষ বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওঁদের নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি তো?’
    ‘না। তবে যাঁকে ওঁরা ফোনে খুঁজছিলেন তিনি এখন কলকাতায় নেই। এলে হয়তো টাকা পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন।’
    ‘ও। আমার জন্যে আপনার ওপর প্রেশার পড়ল।’
    ‘সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমি অন্য কথা ভাবছি। এতবড় পৃথিবীতে ভদ্রমহিলার ভাই ছাড়া আর কোনো পরিচিত মানুষ নেই যাকে ফোন করে সাহায্য চাওয়া যায়?’
    ‘এটা একটু অস্বাভাবিক ব্যাপার।’ অশোক ঘোষ বললেন, ‘ওঁদের ব্যবহার কীরকম?’
    ‘খুব ভালো।’
    ‘কবে নাগাদ ওঁরা টাকা এক্সপেক্ট করছেন?’
    ‘আরও দু’দিন তো বটেই। কিন্তু আমাকে তটস্থ হয়ে থাকতে হচ্ছে। একাকিত্ব এনজয় করতে এতদূরে এলাম, রাত্রে যে মনের সুখে ড্রিঙ্ক করব তারও উপায় নেই।’
    ‘কী করবেন বলুন। আর তো দু’দিন। ওঁদের কলকাতার ঠিকানা জেনেছেন?’
    ‘না তো!’
    ‘আমিও জিজ্ঞাসা করিনি। ঠিকানা জানা থাকলে খোঁজখবর করা যেত। দু’দিন থাকার পরে আপনার পক্ষেও এখন ঠিকানা জানতে চাওয়া স্বাভাবিক হবে না।’ বলেই অশোক ঘোষ গলার স্বর বদলালেন, ‘আমার নামে একটা মিথ্যে কথা বলুন? ওঁরা যে ফিরে যাবেন, চাইলেই তো ট্রেনের টিকিট পাবেন না। বলুন, আমার পরিচিত এক ট্রাভেল এজেন্ট টিকিট করিয়ে দিতে পারে। তাকে নাম-ঠিকানা দিতে হবে। টিকিট নেওয়ার সময় টাকা দিলেই চলবে। কথাটা শুনে নিশ্চয়ই ওঁরা ঠিকানা জানাবেন।’
    ‘তারপর?’
    ‘আমার কাকার ছেলে কলকাতা পুলিশে আছে, ওকে জানালে খোঁজখবর নিয়ে যা জানতে চান বলে দেবে।’
    ‘অনেক ধন্যবাদ। রাখছি।’
    উল্টোদিক দিয়ে ঘুরে সমুদ্রের ধারে চলে এল অয়ন গাড়ি নিয়ে। একটা পয়েন্টের পর গাড়ি চালাতে নিষেধ করা হয়েছে। সম্ভবত বালি নরম বলেই এই আদেশ। গাড়িতে বসেই সমুদ্র দেখছিল অয়ন। এখন সমুদ্রতীর একেবারেই ফাঁকা। স্নানের সময় শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। মাছ ধরার নৌকোগুলো বালির ওপরে বিশ্রাম নিচ্ছে। বালিতে, আকাশে এখন শুধু কয়েকশো সীগ্যাল পাক খাচ্ছে। এই সময় মেয়েটাকে দেখতে পেল অয়ন। শাড়ি পরার ধরন, সাজগোজ দেখে প্রথমে ঠাওর করতে পারেনি, কাছে এলে বুঝতে পারল ও মধুবালা। হাতে ব্যাগ নিয়ে মধুবালা শরীর দুলিয়ে বালির উপর দিয়ে হেঁটে আসছে। অয়ন চুপচাপ দেখছিল। মধুবালা যখন গাড়ির পাশ দিয়ে ওপরের দিকে এগোচ্ছে তখন সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
    ‘তোর শ্বশুরবাড়ি। যাবি আমার সঙ্গে?’ রুখে দাঁড়াল মধুবালা। তারপর অয়নকে দেখে একহাত জিভ বের করল। অয়ন হাসল, ‘তোমাকে এখন মা কালীর মতো দেখাচ্ছে।’
    চট করে জিভ ভেতরে ঢুকিয়ে মধুবালা বলল, ‘আমাকে মাপ করে দাও বাবু। লোকে এত বিরক্ত করে, ওই ট্যুরিস্টরাই বেশি, যে মাথা গরম হয়ে যায়। তুমি যে গাড়িতে বসে, তা আমি কী করে জানব।’
    ‘ঠিক আছে। মাপ করে দিলাম। যাচ্ছ কোথায়?’
    ‘বাজারে। ঘরে কোনো সবজি নেই। নন্দাই সবজি খেতে খুব ভালোবাসে।’
    ‘শোনো,তুমি তোমার নন্দাইকে বলবে কাল থেকে আমাকে যেন আর মাছ না দেয়। আমি এখন কয়েকদিন নিরামিষ খাব।’ অয়ন বলল।
    হেসে গড়িয়ে পড়ছিল মধুবালা। বলল, ‘পুরুষমানুষ ব্রত করে নাকি?’
    ‘ব্রত কেন করব! শরীর ঠিক রাখতে মাঝেমাঝে নিরামিষ খেতে হয়।’
    ‘বলে ভালো করলে।’
    ‘কেন?’
    ‘এখন থেকে সবজি বেশি করে কিনব। বিকেলে রান্না করে পাঠিয়ে দেব। তোমার বাংলোতে নিশ্চয়ই ফিরিজ আছে, রেখে দিও। নষ্ট হবে না।’ মধুবালা চোখ ঘুরিয়ে বলল।
    ‘আরে! তুমি সবজি রান্না করে পাঠাবে কেন?’
    ‘আমার ইচ্ছে, তাই। মাছ খাবে না, ভাত কী দিয়ে খাবে?’
    ‘আমার বাংলোয় রান্নার লোক আছে, সে রেঁধে দেবে।’
    ‘লাড়ু?’ আবার হাসল মধুবালা, ‘ও মাছ-মাংস রাঁধতে পারে, নিরামিষ রাঁধলে তুমি খেতেই পারবে না। চলি।’ কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এল মধুবালা। ‘বাবু, তুমি আমাকে এই গাড়িতে করে একটু ঘোরাবে?’
    ‘কোথায় যাবে? বাজার তো কাছেই।’
    ‘কোথাও যাব না। এমনি ঘুরব।’ বলেই মাথা নাড়ল, ‘না, থাক।’
    ‘থাকবে কেন?’
    ‘লোকে বদনাম করবে।’ মধুবালা চলে গেল।
    কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল অয়ন। এই মেয়েটা কী সহজ!

    সন্ধের মুখে বাংলোয় ফিরল অয়ন। দেখল মিসেস সেন একাই বসে আছেন চাতালে। লাড়ুর সঙ্গে কথা বলে তাকে ছেড়ে ভদ্রমহিলার পাশে এসে বসতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাজ হল?’
    ‘হ্যাঁ। আপনি একা বসে আছেন?’
    ‘আর বলো না। অতক্ষণ স্নান করলে যা হয়, মাথা ধরেছে, শরীর ম্যাজম্যাজ করছে বলে তিনি শুয়ে আছেন।’ মিসেস সেন বললেন।
    ‘সেকী! ওষুধ সঙ্গে আছে?’
    ‘হ্যাঁ। সেসব খেয়েছে।’ মিসেস সেন বললেন, ‘আমাদের তো লাড়ু চা দিল, তুমি খাবে না?’
    ‘আমি বাইরে খেয়ে এসেছি।’ সত্যি কথাই বলল অয়ন, ‘ও হ্যাঁ, অশোকবাবুর সঙ্গে কথা হল, ওই, যে ভদ্রলোক আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, বললেন, ট্রেনের টিকিটের তো খুব ক্রাইসিস, এমনিতে পাওয়া যাবে না। তবে ওঁর পরিচিত একজন ট্রাভেল এজেন্ট করে দিতে পারেন। টাকা এলে তাঁকে দিলেই হবে।’
    ‘বাঃ, খুব ভালো।’
    ‘উনি আপনাদের পুরো নাম, ঠিকানা চেয়েছেন। ফর্ম ভর্তি করতে লাগবে।’
    ‘এখনই বলব?’
    ‘না না। লিখে রাখবেন। কাল ওঁকে জানিয়ে দেব।’ অয়ন বলল, ‘কাল তো আপনার ভাইয়ের কলকাতায় ফিরে আসার কথা।’
    ‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি ভয়ে-ভয়ে আছি। ওরা যদি ওকে পুরী থেকে অন্য কোথাও বেড়াতে নিয়ে যায়, তাহলে ঠিক চলে যাবে। কোনো কাজ দায়িত্ব নিয়ে কখনও করেনি ও।’
    অয়ন না বলে পারল না, ‘কিছু মনে করবেন না, এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের ওপর বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে বেরিয়েছিলেন কেন? ওঁর কথা তো জানতেন!’
    মিসেস সেন জবাব দিলেন না। একটু অপেক্ষা করে অয়ন বলল, আপনি কাল ফোন করে দেখুন। নিশ্চয়ই উনি কলকাতায় ফিরে আসবেন। আচ্ছা, আমি উঠছি।’
    ‘আবার বের হচ্ছ?’
    ‘না না। কিছু ব্যক্তিগত কাজ জমে গেছে। ওগুলো শেষ করতে অনেক রাত হয়ে যাবে। আপনাদের খাবার লাড়ু নিশ্চয়ই দিয়ে গেছে। কাল সকালে দেখা হবে।’ অয়ন চলে এল তার ঘরে। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে স্নানের ঘরে ঢুকল।
    জল বেশ ঠান্ডা, তবু আরাম হল স্নান করে। ইস্ত্রিকরা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে সে পাশের জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। এই ঘর থেকে সমুদ্রের একটা অংশ দেখা যায়। অন্ধকার নেমে গেছে পৃথিবীতে। সমুদ্রের ঢেউগুলোকে আন্দাজ করা যাচ্ছে তাদের ফসফরাসের জন্য। ঝিলিক দিয়ে উঠছে ঢেউগুলো। দিয়েই নিভে যাচ্ছে। দেখতে বেশ ভালো লাগছিল।

    সবে প্রথম পেগ গ্লাসে ঢেলে জল মিশিয়েছে অয়ন, বেলের শব্দ শুনতে পেল। বাইরের দজার বেল কেউ বাজাচ্ছে। ঘড়ি দেখল সে। এখন সন্ধে সাড়ে সাতটা। উইন্ডির কোনো মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে না। তবু মনে হল, গিয়ে দেখা যাক। অয়ন দ্বিতীয়বার বেলের শব্দ শুনতে চাইল। কিন্তু যে এসেছিল সে বেল বাজাল না। স্বস্তিতে বেশ বড় চুমুক দিল অয়ন। আঃ, কী আরাম! কী শান্তি! সে চোখ বন্ধ করল।
    আর বন্ধ করতেই দিতি সেনের সোনালি ঘাড়, বুকের খানিকটা দেখতে পেল অয়ন। যেন এতটা সময় মনের গভীরে চাপা পড়েছিল, আরাম পেতেই ভুস করে ওপরে উঠে এসেছে বলেই দেখতে পেল সে। চোখ খুলল অয়ন। জানলার বাইরে একটানা গর্জন করে চলেছে সমুদ্র। সেই পৃথিবীর প্রথম দিন থেকে সমুদ্র তার ঢেউগুলোকে পাঠাচ্ছে স্থলভূমির দখল নিতে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছে ঢেউগুলো। আফসোসের আওয়াজ তীব্র হচ্ছে। পাওয়া যাবে না জেনেও চাওয়ার কোনো ঘাটতি নেই।
    দ্বিতীয়বার গ্লাসে হুইস্কি ঢালতেই মনে হল একটু গান শোনা যাক। উঠে সিডি চালাতে ইচ্ছে করল না বলে টিভির রিমোট টেনে নিল। হয় হিন্দি সিরিয়াল নয় খবর। একটা গানের চ্যানেল কেউ খোলে না কেন? হঠাৎ বাংলা সংলাপ শুনতে পেয়ে আগের চ্যানেলে ফিরে গেল অয়ন। ঝাপসা ঝাপসা লাগছে ছবিটা। বোধহয় ভালো প্রিন্ট নয়। কিছু কথা বুঝতে পারল সে। তারপরেই সুচিত্রা সেনকে দেখতে পেল। এবার অনেক স্পষ্ট। অনেক পুরনো ছবি। কী ছবি যেন? তারপরেই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান গাইতে লাগলেন সুচিত্রা সেন, ‘জানি না ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া।’ শোনা মাত্র বাইরের আরব সাগরটা যেন ছুটে এসে অয়নের বুকের ভেতর ঢুকে পড়ল। সমস্ত শরীরে যেন কাঁটা ফুটল। ওঃ, সেই কিশোরবেলায় সে এই গান শুনেছে। চোখ বন্ধ করতেই এই ঝাপসা ছবির বদলে স্মৃতি নিয়ে এল ঝকঝকে সুচিত্রা সেনকেই, ‘ছলছল আঁখি মোর জলভরা মেঘে যেন ছাওয়া।’
    শব্দ হল। বিরক্ত অয়ন চোখ খুলল। তার ঘরের বন্ধ দরজায় কেউ নক্‌ করছে। ‘ছুটে যাই দ্বারে। ভুল ভেঙে যায়, আমারে কাঁদায়ে যেন খেলা করে হাওয়া।’ সন্ধ্যা মুখার্জি গেয়ে চলেছেন। একরাশ বিরক্তি নিয়ে অয়ন উঠে এল, দরজা খুলল।
    দরজার ওপাশে দিতি সেন দাঁড়িয়ে আছেন। এখন তাঁর পরনে নীল রঙের হাতকাটা রাতপোশাক। অয়নকে দেখে বলল, ‘এটা আপনার জন্য দিয়ে গেল।’
    অবাক হল অয়ন। একটা মুখবন্ধ কৌটো। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী এটা?’
    ‘জানি না। বলল, বাবু যেন খান।’ দিতি সেন হাসলেন, ‘নাম বলল, মধুবালা।’
    ‘ও।’ হাত বাড়িয়ে কৌটো নিয়ে ঢাকনা খুলে দেখল তাতে অনেকটা তরকারি রয়েছে। সে হেসে ফেলল।
    ‘মধুবালা নামটা সিনেমার বাইরে প্রথম শুনলাম। মেয়েটি আপনাকে খাওয়াতে এই রাত্রে খাবার দিয়ে গেল, সত্যি আপনি ভাগ্যবান।’ হাসলেন দিতি সেন।
    কথার জবাব না দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে একটা প্লেটে খানিকটা সবজি ঢেলে চামচে তুলে মুখে দিল অয়ন। দিয়েই বুঝল, চমৎকার রান্না হয়েছে। সবজিগুলোর নাম রান্নার পরে তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হল না। কৌটো থেকে আর কিছুটা সবজি প্লেটে ঢেলে নিল অয়ন। কৌটোটাকে ফ্রিজের ভেতর রাখতে গিয়েও মত পাল্টাল। তার রাতের খাবার যে হটবক্সে লাড়ু রেখেছিল, তার পাশে রেখে বেরিয়ে এল।
    দরজার সামনে দিতি সেন নেই। অর্থাৎ তিনি তাঁর কর্তব্য করে নিজের ঘরে চলে গেছেন। দরজা বন্ধ করে জানলার পাশের চেয়ারে বসে গ্লাসের পাশে প্লেট রেখে এক চামচ তরকারি মুখে দিয়ে অয়ন বুঝতে পারল এরা পেঁয়াজ-রসুনের ব্যবহার একটু বেশি করে থাকে। কিন্তু স্বাদ এত ভালো হল কী করে! সে গ্লাসে চুমুক দিতেই দিতি সেনের গলা শুনতে পেল, ‘এটা কি ঠিক হচ্ছে?’
    চমকে পিছন ফিরে তাকাল অয়ন। দরজা বন্ধ করে নিজের চেয়ারে বসার সময় সে লক্ষই করেনি দিতি সেন খাটের ওপাশের চেয়ারে বসে আছেন।
    ‘আপনি!’ হেসে ফেলল অয়ন, ‘বুঝতে পারিনি।’
    ‘কী করে পারবেন! তরকারি দেখে এত মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন যে কোনোদিকে নজর ছিল না।’ দিতি সেন বললেন, ‘খেতে নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগছে?’
    ‘খুব ভালো। খাবেন?’
    ‘সরি।’ মাথা নাড়লেন দিতি সেন। তারপর হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই তাহলে আপনার ব্যক্তিগত কাজ?’
    ‘ব্যক্তিগত নয়?’
    ‘ভাবলেই ব্যক্তিগত, নইলে নয়।’
    অয়ন বলল, ‘মাথা ধরা কমেছে?’
    ‘ওষুধ তার কাজ করেছে।’
    অয়ন গ্লাসে চুমুক দিল, তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কি কিছু বলবেন?’
    ‘না, দেখছি!’
    অয়নের খটকা লাগল। তারপর বিনীত গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি কি আপনাকে অফার করতে পারি?’
    ‘ধন্যবাদ। আচ্ছা, আমি উঠি। মায়ের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।’ দিতি সেন চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ভদ্রমহিলাকে এখন রহস্যময়ী বলে মনে হল অয়নের।

    আজ সকালে একটু দেরিতে সমুদ্রের ধারে পৌঁছে অয়ন দেখল বেশিরভাগ নৌকোই মাছ নিয়ে ফিরেছে। কিন্তু কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারল আজ প্রত্যেকের জালেই বেশ কম মাছ উঠেছে। অন্য সকালে খানিকটা আড়ালে থেকে দেখেছে, আজ অয়ন মন্টির নৌকোর পাশে চলে এল। বেশ কম মাছ, যা উঠেছে তা খুবই ছোট। শুধু একটা বড় পমফ্রেট দেখতে পেল। মন্টি মাছ আলাদা করছিল, মধুবালা তাকে সাহায্য করছে। দেখতে পেয়ে মধুবালা হাসল, ‘আজ কপাল খারাপ।’
    অয়ন বলল, ‘আজ খারাপ হল, কাল ভালো হবে।’
    মন্টি তাকে দেখে উঠে দাঁড়াল, ‘দুটো জাহাজ সর্বনাশ করে গেল। দেড়শো টাকার বেশি এই মাছ বিক্রি করে পাওয়া যাবে না।’
    ‘এখানকার দাম জানি না। তবে কলকাতায় অত বড় পমফ্রেট একশো টাকায় পাওয়া যেত না।’
    মাথা নাড়ল মন্টি, ‘না বাবু, পমফ্রেট বিক্রির জন্য দেব না। ওটা আপনার মাছ।’
    ‘এই কথাটাই বলতে এলাম মন্টি। তুমি রোজ যে পরিমাণ মাছ দিচ্ছ তাতে এক মাসেই টাকাটা শোধ হয়ে যাবে। তাই তোমার কাছ থেকে নগদ টাকা ফেরত নিতে পারব না। আমি তো লাভ করব বলে তোমাকে টাকা দিইনি।’ অয়ন বলল।
    ‘এ কী বলছেন বাবু! আপনাকে তো টাকাটা ফেরত নিতেই হবে।’
    ‘তাহলে তোমাকে মাছ দেওয়াও বন্ধ করতে হবে।’
    ‘না বাবু, তা হয় না। আমার পাপ হবে।’ মন্টি বারংবার মাথা নাড়তে লাগল।
    ‘টাকা ধার দিয়ে লাভ করলে আমারও তো পাপ হবে।’ অয়ন মধুবালার দিকে তাকাল, ‘খুব ভালো হয়েছে রান্না। আমি সবটাই খেয়েছি।’
    মধুবালা খুশি হল। মন্টি বলল, ‘ও ভালো রান্না করে। কপাল খারাপ না হলে এরকম স্বামী পায়! ও রাজি হলে আমি আবার ওর বিয়ে দিতাম।’
    ‘কী কথা!’ মধুবালা আঁচল কোমরে গুঁজতে গুঁজতে উঠে দাঁড়াল, ‘আগুনে জ্বলে পুড়তে পুড়তে কোনোরকমে বেরিয়ে এসেছি, আবার উনি আগুনে ঝাঁপ দিতে বলছেন! পাগল!’
    ‘বোঝে না বাবু। একদম বোঝে না। আমি মরে গেলে ওর কী হবে!’
    ‘আগে মরো, তারপর দেখা যাবে।’ মধুবালা মুখ ঘোরাল।
    অয়ন কথা শেষ করল, ‘ওই কথা রইল। যদি মাছ দাও তবে টাকা নেব না।’ তারপর ধীরে ধীরে বালিতে আটকে থাকা নৌকোর ওপর গিয়ে বসল। একটু পরে মাছ নিয়ে মন্টি বাজারের উদ্দেশে চলে গেলে মধুবালা ঝুড়ি নিয়ে বাড়ির পথ ধরতেই এদিকে চলে এল, ‘তুমি একা খেলে কেন? কম ছিল? তোমার বাংলোয় তো লোক এসেছে।’
    ‘এত ভালো হয়েছিল যে কাউকে ভাগ বসাতে দিইনি।’ অয়ন হাসল।
    ‘মধুবালা অবাক হয়ে তাকাল, ‘ভালো লাগলে ভাগ দাও না বুঝি?’
    ‘হুঁ।’
    ‘পাগল।’ হেসে ফেলে চলে গেল মধুবালা।
    অয়নের মনে হল, এরা যে জীবনযাপন করে তাতে কোনো জটিলতা নেই। শালা জীবিত থাকা সত্ত্বেও নন্দাই তার বউকে বিয়ের প্রস্তাব সহজ গলায় দেয়। নিজের জ্বালার কথা স্মরণ করে বউ বিয়ে করবে না বলে জানায়। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হল কি হল না, তা নিয়ে একটুও মাথা ঘামায় না!
    কিন্তু শহরের সংবেদনশীল মানুষ এদের এই সারল্যে মুগ্ধ হবে সাময়িকভাবে। যে জটিল জীবনের আবর্তে তারা এতদিন আবর্তিত হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে এই সারল্যের সঙ্গে বেশিদিন জীবনযাপন করতে হলে তাদের মনে হবে জীবনটাই আলুনি হয়ে গেল।
    ‘এই যে মশাই, আপনি এখানে?’ দিতি সেন চিৎকার করে বললেন।
    নৌকো থেকে নেমে এল অয়ন, ‘মর্নিং ওয়াক?’
    ‘হ্যাঁ। আজ অনেকটা হেঁটেছি।’ কাছে এলেন দিতি সেন, আজ তাঁর পরনে হাঁটার পোশাক। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি এখানে বসে কী দ্যাখেন?’
    ‘সমুদ্র।’
    ‘দারুণ, না? আমি তো জায়গাটাকে ভালোবেসে ফেললাম।’
    ‘স্বাভাবিক।’
    ‘আচ্ছা, আপনি কখনও নৌকোয় চেপে সমুদ্রের গভীরে গিয়েছেন?’
    মাথা নাড়ল অয়ন, ‘না।’
    ‘যেতে ইচ্ছে করে না?’
    ‘ডুবে গেলে ফিরে আসতে পারব না।’
    ‘আমি কিন্তু ডুবতে রাজি আছি।’ হাসলেন দিতি সেন, ‘আপনি ব্যবস্থা করে দিন না। আপনার অনুরোধে জেলেরা রাজি হয়ে যেতে পারে।’
    ‘ঠিক আছে, জিজ্ঞাসা করে দেখব।’
    হঠাৎ কপালে ভাঁজ ফেলে দিতি সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে?’
    ‘মানে?’
    ‘এমন কাঠ কাঠ কথা বলছেন, কিছু হয়েছে? আই মিন, আমার ব্যবহার কি আপনাকে আহত করেছে?’
    ‘আপনি এমন কোনো ব্যবহার করেননি যে, আমি আহত হতে পারি!’
    ‘করেছি, আপনাকে না জানিয়ে কাল রাত্রে আপনার ঘরে গিয়ে বসা ঠিক হয়নি।’ দিতি সেন বললেন, ‘আই অ্যাম সরি।’
    ‘দূর! তার জন্যে আমি আহত হব কেন!’
    ‘তাহলে ঠিক আছে।’ হাসলেন দিতি সেন, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ হল, খুব আড্ডা মারলাম। এখন তো ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আচ্ছা, এই যে আমরা প্রায় গায়ে পড়ে আপনার কাছে এসে ক’দিন থাকলাম, খেলাম, জ্বালালাম, চলে যাওয়ার পরে আমাদের কতদিন মনে রাখবেন?’
    ‘যতদিন মন চাইবে। এখন থেকে কী করে বলি, বলুন!’ অয়ন বলল, ‘চলুন। লাড়ু ব্রেকফাস্ট রেডি করে ফেলেছে নিশ্চয়ই।’
    ‘আর একটু থাকুন না—! ওই দেখুন, একটা বড় নৌকো ফিরে আসছে। চলুন, ওদের সঙ্গে কথা বলি।’
    ‘আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমি কথা বলে নেব। চলুন।’
    ‘আপনার কিছু হয়েছে। একটু যেন বদলে গিয়েছেন।’ দিতি সেন বললেন, ‘চলুন।’ পাথরের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এল ওরা।

    ব্রেকফাস্টের পর একটি তরুণ সাইকেলে চড়ে বাংলোয় এসে লাড়ুকে খবর দিল, গ্রাম থেকে খবর এসেছে, লাড়ুকে এখনই সেখানে যেতে বলেছে কারণ লাড়ুর মামা গুরুতর অসুস্থ। খবরটা শোনা মাত্র লাড়ু অসহায় চোখে তাকাল অয়নের দিকে। তাকে ওই মামাই বড় করেছে। মা-বাবা চলে যাওয়ার পর ওই মামাই তাদের অভাব বুঝতে দেয়নি— এসব কথা বলে মাথা চাপড়াতে লাগল।
    অয়ন জিজ্ঞাসা করল, ‘গ্রামে যেতে কত সময় লাগে?’
    লাড়ু জানাল এখন গেলে বিকেলে পৌঁছবে। কিন্তু সে যাবে কী করে? সাহেবের গেস্টরা আছেন, সে চলে গেলে ওঁরা খাওয়া-দাওয়া করবেন কী করে! আর যদি সে যায়, তাহলে ফিরতে ফিরতে কাল বিকেল হবে। আর মামা যদি চলে যায়, তাহলে কবে ফিরবে তা এখন বলবে কী করে!
    দিতি সেন এবং তাঁর মা সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। মিসেস সেন বললেন, ‘এ কী কথা! আমাদের জন্যে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমরা ম্যানেজ করে নেব।’
    দিতি সেন তাঁর মাকে সমর্থন করলেন, ‘হ্যাঁ। অয়ন, আপনার যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে আমি রান্নার দায়িত্ব নিচ্ছি। বেচারা গ্রাম থেকে ঘুরে আসুক। অবশ্য আমার রান্না যদি অপছন্দ হয়, তাহলে একটু কষ্ট করে খাবেন।’
    অয়ন পার্স বের করে দুটো পাঁচশো টাকার নোট লাড়ুর হাতে দিল, ‘যাও, দেরি কোরো না। প্রার্থনা করো, যেন তোমার মামা বেঁচে থাকেন।’
    লাড়ু প্রায় উল্কার বেগে বেরিয়ে গেল ছেলেটির সঙ্গে।

    দিতি সেন ঘড়ি দেখলেন। তারপর বললেন, ‘আমি রান্নাঘর থেকে ঘুরে আসছি।’
    ‘তার দরকার নেই।’ অয়ন বলল, ‘দুপুরে আমরা কোনো হোটেলে গিয়ে লাঞ্চ করতেই পারি। রাত্রের খাবার বাংলোয় আনিয়ে নিলেই হবে।’
    চোখ বড় করলেন দিতি সেন। তারপর হনহনিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। মিনিট দুই পরে ফিরে এসে বললেন, ‘লাড়ু তো অর্ধেক কাজ করেই গেছে। হোটেলে খেতে গেলে বাড়ির খাবার নষ্ট হবে। আপনার দেখছি আমার ওপর কোনো ভরসা নেই। আচ্ছা, মাকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, আমি কেমন রাঁধি।’
    ‘ঠিক আছে, আপনি যা ইচ্ছে তাই করুন, আমি মেনে নিচ্ছি।’ অয়ন বলল।
    নিজের ঘরে বসে অয়ন টের পাচ্ছিল, আজ বাংলোর চেহারা অন্যরকম। বেশ হৈচৈ করে রান্না করছেন দিতি সেন। মাঝে একবার বেশ জোরে মাকে জিজ্ঞাসা করলেন ভেন্ডি-চিকেনের রেসিপি কী কী হতে পারে! বেলা সাড়ে এগারোটায় দরজায় এসে দাঁড়ালেন দিতি সেন, ‘এই যে মশাই, কফি চলবে?’
    ‘নাঃ।’ অয়ন বলল, ‘আজকের লাঞ্চ মনে হচ্ছে ফাটাফাটি হবে, কফি খেয়ে খিদে নষ্ট করতে চাই না।’
    ‘যা ইচ্ছে। আপনি কখন খাবেন?’
    ‘এখনই নিশ্চয়ই নয়।’
    ‘তাহলে মাকে লাঞ্চ দিয়ে দিচ্ছি। ওঁর স্নান হয়ে গেছে।’
    ‘অবশ্যই।’ অয়ন মাথা নাড়ল।
    দিতি সেন চলে যেতেই ফোন বাজল। বোতাম টিপে ‘হ্যালো’ বলতেই শোভা কানিৎকারের গলা কানে এল, ‘গুড মর্নিং। শোভা বলছি।’
    ‘গুড মর্নিং। কীরকম আছেন আপনি?’ অয়ন জিজ্ঞাসা করল।
    ‘ভালো। আপনি কেমন আছেন? অনেকদিন আপনার খবর নেওয়া হয়নি। নতুন জায়গা, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?’ শোভার গলায় আন্তরিকতা স্পষ্ট।
    ‘না। একটুও নয়।’
    ‘কোনো অসুবিধে হলে আমাকে জানাবেন। প্লিজ! আচ্ছা।’ ফোন রেখে দিলেন ভদ্রমহিলা। অয়নের মনে হল, শোভা একজন টিপিক্যাল বাড়িওয়ালির মতো আচরণ করলেন না। ভদ্রমহিলার এই ব্যবহার তার বেশ ভালো লাগল।
    হঠাৎ অয়নের ইচ্ছে হল একটা বিয়ার খেতে। বিয়ার খেয়ে স্নান করলে খিদেটা বেশ জোরালো হয়। কিন্তু তার কাছে বিয়ার নেই, উইন্ডির ওয়াইন শপে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ইতস্তত ভাবটা কাটিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। তারপর ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতেই মোবাইল বেজে উঠল। নাম্বারটা প্রথমে বুঝতে পারেনি সে। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কেউ বলল, ‘আপনি কে বলছেন মশাই? বাঙালি তো?’
    অবাক হল অয়ন। হেসে বলল, ‘আপনি কাকে চাইছেন?’
    ‘ও, বাঙালি। আমাকে এই নাম্বার থেকে ফোন করা হয়েছিল।’
    ‘বুঝতে পেরেছি। আপনি আপনার দিদির সঙ্গে কথা বলবেন তো—!’
    ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান। ওরা কি আশেপাশে আছে?’
    ‘অন্য ঘরে আছে। আমি ফোনটা দিচ্ছি!’
    ‘ওঃ, দাঁড়ান না! এই জায়গাটা কোথায়? মহারাষ্ট্রে?’
    ‘হ্যাঁ। জায়গাটার নাম উইন্ডি। সমুদ্রের ধারে।’
    ‘যাচ্চলে! ওরা তো গিয়েছিল সাঁইবাবার কাছে। ওখানে সমুদ্র নেই বলে জানি।’
    ‘শুনুন। আপনাকে ওঁদের খুব প্রয়োজন। আপনি একটু ধরে থাকুন।’
    ঘরের বাইরে এসে ওঁদের কাউকে দেখতে না পেয়ে মিসেস সেনের ভেজানো দরজায় নক্‌ করতেই দিতি সেনের গলা কানে এল, ‘ইয়েস! কে?’
    ‘আমি অয়ন। আপনাদের ফোন এসেছে।’ দরজার বাইরে থেকে বলল সে।
    ভেজানো দরজা খুলে দিতি সেন বললেন, ‘আসুন।’
    ভেতরে ঢুকে অয়ন দেখল মিসেস সেন বিছানায় বসে আছেন। ফোনটা তাঁর হাতে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, দিতি সেন বললেন, ‘আরে! যাচ্ছেন কেন? বসুন!’
    মিসেস সেন হ্যালো বললেন। তারপর ওপাশের কথা শুনে বললেন, ‘আমাদের সর্বস্ব হারিয়ে গেছে। টাকা, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, ট্রেনের টিকিট। এখনই আমার ঘরে গিয়ে ডানদিকের ড্রয়ার খুলে চেকবই বের করে প্রথম দুটো পাতা ছিঁড়ে ক্যুরিয়ার করে দে। এস বি আই-এর চেকবই থেকে পাতা দুটো নিবি। ঝন্টু, একটুও দেরি করবি না। দাঁড়া, কোন ঠিকানায় পাঠাবি বলে দিচ্ছি।’ অয়নের কাছ থেকে ঠিকানা জেনে মিসেস সেন তাঁর ভাইকে জানিয়ে দিলেন। ওপাশ থেকে কিছু বলছিলেন ভদ্রলোক, মিসেস সেন বললেন, ‘ঝন্টু, তুই কি চিরকাল নাবালক থাকবি? ওদের গল্প আমরা শুনতে চাই না, তা তুই জানিস না? বলা নেই কওয়া নেই দুম করে পুরী চলে গেলি? যা বললাম সেটা এখনই কর।’
    দিতি সেন এগিয়ে এলেন, ‘মা, আমাকে ফোনটা দাও তো!’
    মাথা নাড়লেন মিসেস সেন, ‘না। যা বলার কলকাতায় গিয়ে বলিস। ভালোয় ভালোয় চেকের পাতা দুটো ক্যুরিয়ার করে দিলেই বাঁচি।’ লাইন কেটে দিয়েছিলেন বৃদ্ধা।
    চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল অয়ন। তার দিকে তাকিয়ে দিতি সেন বললেন, ‘এই ভদ্রলোক আমার মামা। ষাট পেরিয়ে গেছেন অনেকদিন, কিন্তু এখনও শিশুর মতো মস্তিষ্ক।’
    ‘ও।’
    ‘কিন্তু শিশুরা সরল হয়, ইনি তা নন।’ দিতি সেন বললেন, ‘ওঁর এখনও ধারণা, স্বামী-স্ত্রীর একবার বিয়ে হলে কখনওই বিচ্ছেদ হয় না। অতএব আমারও হয়নি। পুরীতে আমার এক্স হাজব্যান্ডের বাড়িটা তাই ওঁর আত্মীয়ের বাড়ি। ভাবুন তো!’
    মিসেস সেন বললেন, ‘ছাড় ওর কথা। আচ্ছা, কলকাতা থেকে ক্যুরিয়ারে খাম পাঠালে এখানে আসতে কত সময় লাগবে?’
    ‘আজ যদি উনি পাঠান, তাহলে পরশুর মধ্যে পেয়ে যাবেন। কাল বিকেলেও পেতে পারেন।’
    ‘তাহলে যে ট্রাভেল এজেন্ট টিকিটের কথা বলছিলেন—!’
    ‘না মা।’ আপত্তি জানালেন দিতি সেন, ‘আর ট্রেনে অতটা সময় বসে থাকতে পারব না। লাড়ুর মুখে শুনেছি মুম্বই খুব বেশি দূরে নয়। ওখান থেকে প্লেনে ফিরে যাব।’
    অয়ন হেসে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
    বিয়ার কিনতে যাওয়ার ইচ্ছেটা আচমকা চলে গেল। নিজের ঘরে ফিরে এল সে। যদি কাল চেকের পাতা পেয়ে যান ওঁরা, তাহলে স্টেট ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে পরশুর ফ্লাইট ধরা অসম্ভব হবে না। নইলে পরশুর বদলে তরশু। একটু একটু করে খারাপ লাগা তৈরি হল অয়নের মনে। ক’টা দিন বাংলোতে বেশ সাংসারিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ওঁরা চলে যাওয়া মাত্র সেটা শেষ হয়ে যাবে। ওঁরা যদি পরশু চলে যান আর লাড়ু না ফিরে আসে, তাহলে বাংলোতে কথা বলার মানুষ পাওয়া যাবে না।
    কিন্তু এটাই তো সে চেয়েছিল। নির্জনতম জায়গায় একাকী থাকা। সেই চাওয়াটার সঙ্গে এই সমুদ্রতীরের বাংলো চমৎকার মিলে গিয়েছিল। তাহলে আজ মন খারাপ হচ্ছে কেন? সুদীপার চলে যাওয়ার মতো বিশাল ঘটনার ধাক্কাও তো সে একসময় সামলে উঠতে পেরেছে। কথাটা অত্যন্ত সত্যি, সময় হল সবচেয়ে বড় ওষুধ। এঁরা চলে যাওয়ার পরে একটু একটু করে আবার জীবন স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
    আধঘণ্টা পরে চিৎকারটা কানে এল। না, কেউ আতঙ্কে চিৎকার করছে না। এই শব্দ আনন্দে মানুষের গলা থেকে বেরিয়ে আসে। অয়ন চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে আসতেই দৃশ্যটা দেখতে পেল। মিনি সুইমিং পুলে জলপরীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন দিতি সেন। মাথার চুল কাপড়ে বাঁধা, পরনে সংক্ষিপ্ত পোশাক। আগের দিনের মতো পিঠ, কাঁধ থেকে সোনা ছিটকে বের হচ্ছে। মহিলা যেই বাংলোর দিকে ফিরে দাঁড়ালেন, চোখ বন্ধ করে ডুব দিতে যাবেন, অমনি তাঁর ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত হল। সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে গেল অয়নের। মারমেডের ছবি দেখেছিল সে, কিন্তু এই দৃশ্য সেই ছবিকেও হার মানাচ্ছে। জলে ডুবে গিয়ে একটু দিশেহারা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন দিতি সেন। তারপর ঝুঁকে পাড়ে রাখা তোয়ালে টেনে নিয়ে বুকের ওপর আড়াল তৈরি করলেন। অয়নের মনে হচ্ছিল তার পায়ে এক ফোঁটা শক্তি নেই। সে নড়তে পারছে না।
    দ্বিতীয় তোয়ালে দিয়ে শরীর জড়িয়ে ওপরে উঠে এসে অয়নকে দেখতে পেলেন দিতি সেন। চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। তারপর দ্রুত ভেতরে চলে গেলেন।
    নিজের ওপর খুব রাগ হল অয়নের। এইরকম বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয়? হঠাৎ শরীর ওরকম হয়ে গেল? সে ধীরে ধীরে ঘরে এল। দিতি সেনের শরীরটা ঈশ্বর তাঁর সমস্ত শিল্পনৈপুণ্য ব্যবহার করে তৈরি করেছেন। ওঁর স্বামী কি মূর্খ? নাহলে এই রকম মহিলার সঙ্গ ত্যাগ করে? অবশ্য এসব চিন্তা করার কোনো মানে হয় না। নিজেকে ব্যস্ত রাখতেই অয়ন স্নানঘরে ঢুকল। শাওয়ার থেকে জল পড়ছে শরীরে। শরীর জুড়িয়ে যাক।

    লাঞ্চ টেবিলে দিতি সেন আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। এখন তাঁর পরনে হলদে পাজামা এবং শার্ট। অয়ন লক্ষ করল শার্টের দ্বিতীয় বোতাম খোলা থাকায় বুকের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পরিবেশন করতে করতে দিতি সেন হাসলেন, ‘দেখুন খাওয়া যায় কিনা।’
    চার রকমের পদ ছাড়া ডাল এবং ভাত। অয়ন বলল, ‘এত করেছেন কেন?’
    ‘চান্স নিলাম না। একটা ভালো না হলে আর একটা ভালো হতে পারে।’
    খাবার পেয়ে অস্বস্তিটা কমে গেল অয়নের। প্রতিটি রান্নাই খুব ভালো হয়েছে। বারংবার প্রশংসা করতে করতে সবগুলোই খেয়ে ফেলল সে। খেতে খেতে দিতি সেন বললেন, ‘আপনাকে এইভাবে খেতে  দেখিনি ক’দিন।’
    ‘অসভ্যের মতো খেলাম, না?’
    ‘উঁহু। প্রিটেন্ড না করে খেলেন।’
    ‘মা খেয়ে কী বললেন?’
    ‘আমি যা করি তা-ই মায়ের ভালো লাগে। এখন ঘুমিয়ে পড়েছেন।’
    দুজনের খাওয়া শেষ হতেই সমুদ্রের দিক থেকে মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। চাতালে এসে অয়ন দেখল কিছু মানুষ দৌড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে। কেউ কেউ জলে নেমে পড়েছে। নিশ্চয়ই কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। সে দিতি সেনকে বলল, ‘আপনি বিশ্রাম করুন। আমি একটু দেখে আসছি।’
    জবাবের অপেক্ষা না করে সে পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে তালা খুলে নীচে চলে এল। এরই মধ্যে সমুদ্রের ধারে জলের গায়ে ভিড় জমে গেছে। অয়ন শুনতে পেল, একটি মৃতদেহ ভাসতে দেখা গেছে। তাকে পাড়ে নিয়ে আসতে কয়েকজন সাঁতরে গেছে। ঢেউয়ের ওঠানামার মধ্যে দিয়ে সাঁতারুদের দেখা যাচ্ছিল। ওদের একজন মৃতদেহটাকে ধরে ফেলেছে। কিন্তু একটা বিশাল ঢেউ এসে যাওয়ায় আড়ালে চলে গেল। ঢেউ চলে গেলে দেখা গেল সাঁতারু একা। মৃতদেহ তার হাতছাড়া হয়ে গেছে।
    অয়ন মন্টিকে দেখতে পেল। কৌতূহলী চোখে দেখছে। সে ওর পাশে যেতেই মন্টি বলল, ‘খুন হতে পারে বাবু। অনেক সময় জাহাজ থেকে খুন করে জলে ফেলে দেয়। যদি এখানকার কেউ হত, তাহলে তার খোঁজ পড়ে যেত।’ ঠিক কথা।
    সাঁতারুরা ফিরে আসছিল। মৃতদেহ সমুদ্রের গভীরে এগিয়ে গেছে। এখন জোয়ার শুরু হবে। নৌকো নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। লোকগুলো বালিতে এসে বসতেই সবাই তাদের ঘিরে ধরল। ‘চিনতে পারলে? আমাদের কোনো চেনা মানুষ?’ সবাই মাথা নেড়ে  ‘না’ বললেও একজন, যে মৃতদেহটাকে ধরতে পেরেছিল, সে শুধু মুখ নিচু করে বসে থাকল। একজন সাঁতারু বলল, ‘যা ঢেউ, স্রোতের যা জোর, দেখব কী করে! তারপর বডিটা উপুড় হয়ে ভাসছিল যে। টোনি গিয়ে বডির হাত ধরেছিল, দেখলে ওরই দেখার কথা।’
    ‘ও টোনি, কাকে দেখলে? চেনা কেউ?’ এক বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করল।
    ‘আমি জানি না।’ মুখ তুলে থুতু ফেলল টোনি, ‘একবার মনে হল—!’
    ‘কী মনে হল?’
    ‘আরে, আমার তো ভুলও হতে পারে।’
    ‘আচ্ছা, তা তো হতেই পারে। অত জল, ঢেউয়ের মধ্যে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু দেখে কারও কথা মনে পড়ল?’
    ‘হ্যাঁ, মানে, অনেকটা গজাননের মতো।’
    ‘গজানন!’ সবক’টা মুখ ঘুরে গেল মন্টির দিকে। দূরে বসা মন্টির কানে কথাটা গিয়েছিল। জিজ্ঞাসা করল, ‘ঠিক দেখেছিস?’
    ‘মাইরি বলছি, মুখটার একটুখানি জলের ওপর উঠেছিল। কিন্তু ভুল হতে পারে।’ টোনি মাথা নাড়ল। সেই বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, ‘ও মন্টি, তোমার শালা কি ফিরে এসেছিল?’
    ‘না। সে মুম্বই গিয়ে ফুর্তি করছে, এখানকার জলে ভাসবে কোন্‌ দুঃখে?’ মন্টি উঠে দাঁড়াল, ‘এরকম কপাল যদি আমার হত, তাহলে অনেক আগেই হয়ে যেত। সমুদ্র আর লোক পেল না যে, ওই হারামজাদাকে গিলবে! এই ব্যাটা কী দেখতে কী দেখেছে!’
    সবাই মাথা নাড়ল, ‘ঠিক ঠিক। গজানন ভালো সাঁতার জানত। জলে ডুবে মরার কথা তার নয়। তবু সেই বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, ‘বডি যে শার্ট পরেছিল তা কি তোর চেনা?’
    টোনি মাথা নাড়ল, ‘না। লাল গেঞ্জি পরে ছিল।’
    গজাননকে লাল গেঞ্জি পরতে এই সমুদ্রতটের মানুষগুলো কখনও দ্যাখেনি।
    ধীরে ধীরে ভিড় পাতলা হয়ে গেল। অয়নমন্টির পাশে গিয়ে দাঁড়াল, ‘লোকটা তো বলছে ভুল দেখতে পারে, তার ওপর তোমার শালা লাল গেঞ্জি পরত না। তাই বোঝাই যাচ্ছে তোমার শালার কিচ্ছু হয়নি।’
    লোকজন পাশে ছিল না। মন্টি উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘কিন্তু বাবু, ওই লাশটা যদি গজাননের হত, তাহলে আমি নিশ্চিন্ত হতাম। আর যাই হোক মধুবালাকে সে বিরক্ত করতে আসবে না। এই যে সে মুম্বই চলে গেল, কেউ যদি বলে আর ফিরে আসবে না, আমি একদম বিশ্বাস করি না। যেই টাকা ফুরিয়ে যাবে, অমনি সুড়সুড় করে এসে বউয়ের সামনে হাত পেতে দাঁড়াবে। যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন মেয়েটাকে একটুও সুখে থাকতে দেবে না। তাই ওই ডেডবডি যদি গজাননের হয়, তাহলে বুঝব ভগবান আছেন! কিন্তু আমি কতকাল মেয়েটাকে আগলে রাখব!’
    এ এক অদ্ভুত সমস্যা। অয়ন একটা হাত মন্টির কাঁধে রাখল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘মধুবালা কোথায়?’
    ‘ঘরে। ঘুমাচ্ছে। এখন তিনদিন ওকে নিয়ে সমুদ্রে যাওয়া যাবে না। ওর শরীর খারাপ, এই সময় সমুদ্রে যেতে নেই। দেখি, অন্য কাউকে যদি খুঁজে পাই।’ মন্টি বলল।

    গাড়িতে নয়, বিচ থেকে হেঁটে উইন্ডির মার্কেট চত্বরে চলে এল অয়ন। মোটামুটি কয়েকজন দোকানদারের সঙ্গে তার মুখচেনা হয়ে গিয়েছে। এই লোকগুলোকেই কলকাতায় গোয়ানিজ বলা হয়ে থাকে। আজ কেনাকাটা নেই, অয়ন উইন্ডোশপিং করছিল। দোকানগুলো সুন্দর সাজানো।
    ‘ইয়েস ম্যান, আই থট ইউ কেম হিয়ার অ্যাজ এ ট্যুরিস্ট, বাট ট্যুরিস্ট নেভার স্টেজ সো লং।’ এক বৃদ্ধ, পুরোদস্তুর টাই-কোট পরা, তার দিকে তাকিয়ে বললেন।
    অয়ন ইংরেজিতে বলল, ‘ঠিকই বলেছেন। আমি এখানে কয়েক বছর থাকতে এসেছি।’
    ‘কয়েক বছর?’ চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রলোক, ‘তোমার বয়স যা, তাতে তো অবসর নেওয়ার সময় হয়নি!’
    ‘ওটা কি সবসময় বয়সের ওপর নির্ভর করে?’
    ‘তা অবশ্য ঠিক। আমার নাম ফ্রান্সিস। এই উইন্ডিতে অনেক বছর ধরে আছি। চারটে দোকান ভাড়া দিয়ে চলে যাচ্ছে। ওই যে টিলা দেখতে পাচ্ছ, ওই টিলার ওপর আমার ছোট্ট বাড়ি। তুমি কানিৎকারদের বাংলোয় আছ এটা জানি।’
    ‘আমার নাম অয়ন। নির্জনে শান্তিতে থাকব বলে এখানে এসেছি।’
    ‘ভগবান তোমার ইচ্ছে পূর্ণ করুন। আমি এখন পঁচাত্তর। এই বয়সে এসে তোমাকে একটা খবর দিতে পারি। ওই ভগবান ভদ্রলোক মানুষকে সব দিতে পারেন, কিন্তু একটা ব্যাপারে তাঁর কোনো ক্ষমতা নেই। সেটা হল শান্তি—।’ হাত বাড়িয়ে হাত মেলালেন ফ্রান্সিস, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল হে।’
    ‘আমারও। একদিন চলে আসুন, কফি খেয়ে যাবেন।’ অয়ন বলল।
    ‘নিশ্চয়ই যাব। তুমিও পারলে ওই টিলায় চলে এসো।’
    ফ্রান্সিসকে ছেড়ে কিছুটা যেতেই অয়নের মোবাইল জানান দিল। পকেট থেকে বের করে যন্ত্রটা চালু করতেই ভদ্রলোকের গলা শুনতে পেল, ‘হ্যালো। কলকাতা থেকে বলছি। দিদিকে ফোন দিন।’
    ‘আমি এখন বাংলোর বাইরে, রাস্তায়। ফিরে গিয়ে বলব আপনাকে ফোন করতে।’
    ‘অ। বাংলো মানে? দিদিরা কি বাংলোতে আছে?’
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘এই যে বলল টাকাপয়সা, কার্ড চুরি হয়ে গিয়েছে, তাহলে বাংলোতে থাকছে কী করে? কেউ তো ওদের মুখ দেখে বাংলোতে থাকতে দেবে না!’
    ‘কেউ কেউ দিতে পারে। দিয়েছে বলেই ওঁরা আছেন।’
    ‘আপনি কে মশাই?’
    ‘ওই বাংলোটা এখন আমার ভাড়া নেওয়া।’
    ‘ও। তা এসব কাণ্ড না করে ওদের কিছু টাকা দিতে পারলেন না?ওরা তাই দিয়ে টিকিট কেটে ফিরে আসত। আমাকে ক্যুরিয়ার করতে হত না।’
    অয়ন বলে, ‘বাঃ, আপনি দেখছি বেশ বুদ্ধিমান। ক্যুরিয়ার করেছেন?’
    ‘নিশ্চয়ই। রসিদ রেখে দিয়েছি।’
    আর কথা না বলে লাইন কেটে দিল অয়ন। অদ্ভুত লোক। মিসেস সেনের সঙ্গে ওঁর ভাইয়ের কথাবার্তার কোনো মিল নেই। অয়ন ঠিক করল এই কথাগুলো ওঁদের জানাবে না।

    ফেরার সময় কনফেকশনারি থেকে বিকেলের জলখাবার কিনে এনেছিল অয়ন। তাই দিয়ে ওরা চাতালে বসে চা খেল। মিসেস সেন বললেন, ‘আমি আজ রাত্রে কিছু খাব না।’
    দিতি সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন? শরীর ঠিক নেই?’
    ‘নারে। দুপুরে ঠিক হজম হয়নি। তারপর এইসব খাচ্ছি, পেটটার বিশ্রাম দরকার।’
    অয়ন জিজ্ঞাসা করল, ‘হজমের ওষুধ খাবেন?’
    ‘না না। তাড়াতাড়ি ঘুমালেই হবে। সেই কবে থেকে বাইরে বাইরে ঘুরছি। বয়স তো হয়েছে।’ মিসেস সেন বললেন, ‘ও ক্যুরিয়ার করেছে কিনা তাও জানাল না।’
    হঠাৎ অয়নের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘হ্যাঁ করেছেন। আমি যখন বাইরে ছিলাম, তখন ফোন এসেছিল। মনে হয় কাল সকালেই পেয়ে যাবেন।’
    দিতি সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তখন সমুদ্রের ধারে গোলমাল হচ্ছিল কেন?’
    ‘একটি অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহকে সমুদ্রের অনেকটা ভেতরে ভাসতে দেখেছিল। ওরা সাঁতরে কাছে গিয়ে পাড়ে আনতে পারেনি। তবে লোক্যাল কোনো মানুষের মৃতদেহ নয়।’
    মিসেস সেন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার শরীর, জানাই গেল না?’
    ‘না। সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। জলচর প্রাণীদের পেটে যাবে।’
    ‘ইস্‌।’ মিসেস সেন চোখ বন্ধ করলেন।

    এখন রাত আটটা। বাংলো এখন চুপচাপ। সন্ধের মুখে দিতি সেন রান্নাঘরে ঢুকেছিলেন। রাতের খাবার তৈরি করে বলেছিলেন, ‘আপনার খাবার হটবক্সে রেখে দিয়েছি। ওই প্যাটিস এবং পেস্ট্রি খেয়ে পেট ভরে গেছে। যদি ইচ্ছে হয় খেয়ে নেব।’ অয়ন কথা বাড়ায়নি।
    জানালা খুলে সমুদ্রের দিকে তাকাতেই মনে হল ঘরের মতো আলো ছড়িয়ে আছে জলের ওপরে। ঢেউগুলো যে ফসফরাস জ্বালছে, তা আজ স্পষ্ট। এখনও জোয়ার চলছে। সে কারণে গর্জন বেশ বেশি। লম্বা সোফায় বসে সে গ্লাসে হুইস্কি ঢালল।
    আধগ্লাস খাওয়া হয়েছে কি হয়নি, দরজায় শব্দ হল, ‘আসতে পারি?’
    ‘আসুন, আসুন।’ অয়ন উঠতে গিয়েও উঠল না।
    দিতি সেন এলেন। তাঁর পরনে সমুদ্রনীল রাতপোশাক। হাতকাটা। আলো পড়ায় তাদের সৌন্দর্য বেড়ে গেছে। অয়ন জিজ্ঞাসা করল, ‘কিছু বলবেন?’
    ‘না। মা ঘুমিয়ে পড়েছে। একা থাকতে ভালো লাগছিল না। বসতে পারি?’
    ‘শিওর।’ সোফার অন্য প্রান্তে অয়ন সরে গেলে দিতি সেন বসলেন।
    অয়ন বলল, ‘তাহলে কাল অথবা পরশু আপনারা ফিরে যাচ্ছেন?’
    ‘হুঁ। বোঝা হয়ে ছিলাম, হালকা হবেন।’
    ‘যে স্বেচ্ছায় বোঝা নেয়, সে কি হালকা হতে চায়?’
    দিতি সেন তাকালেন। তারপর হেসে বললেন, ‘আমাকে এক পেগ দেবেন?’
    সোজা হল অয়ন, ‘আপনি শিওর?’
    ‘হ্যাঁ। কিছুই যখন ভালো লাগছে না, তখন একটু খেয়ে দেখি।’
    সযত্ন আর একটি গ্লাস এনে দামি হুইস্কি ঢেলে বরফ মিশিয়ে দিতি সেনের সামনে রাখল অয়ন। গ্লাস তুলে দিতি সেন বললেন, ‘কী যেন বলে সবাই! আনন্দ? চিয়ার্স অথবা উল্লাস? সবগুলোই বললাম।’ সন্তর্পণে একটা চুমুক দিলেন দিতি সেন, ‘বাঃ, বেশ নরম।’ অয়ন কথা বলল না। গ্লাস হাতে জানলার গায়ে উঠে গেলেন দিতি সেন। মুগ্ধ হয়ে কিছু সময় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘সাঁইবাবার কাছে না এলে আমি এখানে আসতে পারতাম না।’
    ‘এইভাবেই তো যোগাযোগ হয়ে যায়।’ অয়ন বলল।
    ‘আচ্ছা, সত্যি আপনি এখানে পাঁচ বছর থাকবেন?’
    ‘সেরকমই ইচ্ছে আছে।’
    ‘তারপর?’
    ‘যদি আর ভাড়া না দেয়, তখন অন্য কোথাও খুঁজতে হবে।’
    ‘এইরকম একা থাকতে পারবেন?’
    উত্তর দিল না অয়ন। হেসে গ্লাসে আবার কিছুটা হুইস্কি ঢালল। দ্রুত নিজের গ্লাস শেষ করে ফিরে এসে ওটা এগিয়ে দিলেন দিতি সেন।
    ‘একটু ধীরে ধীরে।’ নিচু গলায় বলল অয়ন।
    ‘কেন? নেশা হয়ে যাবে?’
    ‘সেটাই স্বাভাবিক।’
    বেশ জোরে হেসে উঠলেন দিতি সেন। ‘হোক। কোনোদিন তো হয়নি। এখানে হোক।’ অয়ন লক্ষ করছিল, ধীরে ধীরে দিতি সেনের কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। তৃতীয় বারের শেষে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘ডিনার করবেন না?’
    ‘নাঃ।’ চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়লেন দিতি সেন অয়নের পাশে বসে।
    ‘তাহলে এবার আপনার শুয়ে পড়া দরকার।’
    ‘আপনি?’
    ‘আর একটু রাত হোক।’
    ‘অ। যাচ্ছি।’ দিতি সেন সোফা থেকে উঠে দাঁড়াতেই টলে গেলেন। অয়ন দ্রুত তাঁকে না ধরলে বিপদ ঘটত। অয়ন বলল, ‘সাবধান।’
    দিতি সেন অয়নকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আমার মাথা কেমন করছে, দাঁড়াতে পারছি না।’ অয়ন তাকাল। দিতি সেনের শরীর তার দুই হাতের মধ্যে, চোখ বন্ধ, ঠোঁট ঈষৎ খোলা। আজ দুপুরে এই শরীরের অংশবিশেষ তাকে যে রকম উত্তেজিত করেছিল, এখন সেটা স্মরণে আসতেই সে মুখ নামাল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন দিতি সেন। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল অয়নের। সে ধীরে ধীরে খাটের পাশে দিতি সেনকে নিয়ে গেল। তারপর বিছানার ওপর ওঁর শরীরটাকে তুলে দিতেই দিতি সেন পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে অয়ন বুঝতে পারল, দিতি সেন ঘুমিয়ে পড়েছেন।
    সোফায় ফিরে গেল সে। একটা বাসনা তীব্র হচ্ছে। কিন্তু যেই সে মহিলার মুখের দিকে তাকাচ্ছে অমনি তার তীব্রতা হ্রাস পাচ্ছে। এখন ওঁকে ঘুমন্ত বালিকার মতো মনে হচ্ছে। এই অবস্থায় বাসনা পূর্ণ করার কথা সে কিছুতেই ভাবতে পারে না। সোফায় ফিরে মাথা নামিয়ে চোখ বন্ধ করল অয়ন। কখন রাত বেড়ে গেল সে টের পায়নি। তন্দ্রা ভাঙতেই দেখল দিতি সেন সেইরকম ভঙ্গিতেই ঘুমিয়ে আছেন। ঘর থেকে বের হল সে। চাতালে আসতেই দৃশ্যটা দেখতে পেল। আলো জ্বলছে, টিমটিমে আলো। মাছ ধরার নৌকোগুলো সমুদ্রে যাচ্ছে। আলোগুলো নৌকোর ব্লকের হ্যারিকেনের। ধীরে ধীরে সমুদ্রে অন্ধকার নামল। হঠাৎ কেউ চেঁচিয়ে উঠল। সমুদ্র থেকে চিৎকারটা মুখ থেকে ঘুরে তীরের দিকে চলে আসছিল। কিছু লোক, এত রাত্রেও সমুদ্রের ধারে থেকে গিয়েছিল মাছ-ধরিয়েদের বিদায় দেওয়ার পর। সেই চিৎকার শুনে হৈ-হৈ করে উঠল।
    নেশা এখন অনেক কম, কৌতূহল বাড়তেই অয়ন পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নামল। মাঝখানের গেটে তালা লাগানো হয়নি। সাধারণত যাওয়ার আগে লাড়ু এসব দেখে যায়।
    সে লোকগুলোর কাছে গিয়ে জানতে পারল একটা নৌকো থেকে মানুষ জলে পড়ে ভেসে গেছে বলে সন্দেহ করছে ওরা। হাওয়া ও সমুদ্রের গর্জনের কারণে জল থেকে ভেসে আসা চিৎকারটার সঠিক অর্থ বোঝা যাচ্ছে না। তবে এর আগে কেউ ডুবে গেলে মাছ-ধরিয়েরা এইরকম চিৎকার করে তীরে খবর পাঠায়।
    ক্রমশ অন্ধকার পাতলা হল। মাছ-ধরিয়েদের নৌকোগুলো এক এক করে দেখা গেল। প্রথম নৌকো পাড়ে আসামাত্র সবাই জানতে চাইল কী হয়েছে। পরের নৌকোর সঙ্গে একটি খালি নৌকো বাঁধা রয়েছে। ঘটনাটা শুনল অয়ন।
    মাছ ধরতে গিয়েছিল মন্টি। ইঞ্জিনে ছিল মধুবালা। তীর থেকে অনেকটা ভেতরে আগ বাড়িয়ে চলে গিয়েছিল তারা। তারপর হঠাৎ মধুবালা নৌকো ছেড়ে জলে ঝাঁপ দেয়। তাকে ঝাঁপ দিতে পেছনের নৌকোর লোকজন দেখেছে। মন্টি চিৎকার করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার শালাজকে উদ্ধার করতে। কিন্তু ভাটার স্রোত দুজনকেই মাঝসমুদ্রে টেনে নিয়ে যায় যেখান থেকে বেঁচে ফেরা মুশকিল।
    স্তম্ভিত হয়ে গেল অয়ন। মধুবালা আচমকা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল কেন? সে শুনল, কাল মৃতদেহের কথা শোনার পর থেকে মধুবালা নাকি পাথরের মতো বসেছিল। কারও সঙ্গে কথা বলতে চায়নি। মন্টি তাই দেখে ভেবেছিল, রাতে আর মাছ ধরতে যাবে না। কিন্তু মধুবালা তাকে জোর করে নিয়ে গেছে। এখন সবার মনে হচ্ছে, মন্টি স্বীকার না করুক, মধুবালা বুঝেছিল তার স্বামী মারা গিয়েছে। কিন্তু যে স্বামী সম্পর্কে অত কটু কথা বলেছে, সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছে বলে দাবি করেছে, সে কেন মৃত্যুসংবাদ বিশ্বাস করে আত্মহত্যা করবে? তার মানে কি মধুবালার রাগ দেখানোটা বানানো ছিল? সমুদ্রের দিকে তাকাল অয়ন। ভোরের সমুদ্র অনেকটাই শান্ত।
    দুটো মানুষ চলে গেল। মধুবালা স্বামী-সম্পর্কে যা বলত তা যে ভাবত না অয়ন নাহয় বুঝতে পারেনি, মন্টিও পারেনি? নাকি পেরেছিল বলেই মৃতদেহটা শালার বলে মানতে চায়নি? শালা বেঁচে আছে বলে মধুবালাকে ভোলাতে চেয়েছিল কি? মাথার ভেতরে এলোপাথাড়ি ভাবনা এত প্রবল হয়ে উঠছিল যে, কতক্ষণ সমুদ্রের ধারে বসে আছে ঠাওর করতে পারেনি। যখন পারল তখন সূর্য অনেকটাই ওপরে, রোদ্দুর কড়া হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে বাংলোয় ফিরে এল।
    মিসেস সেন এগিয়ে এলেন, ‘এইমাত্র ক্যুরিয়ার কম্পানি খামটা দিয়ে গেল। দুটো চেকই পাঠিয়েছে। এখানকার স্টেট ব্যাঙ্ক কখন খোলে?’
    ‘এখন ক’টা বাজে?’
    ‘পৌনে দশটা।’ মিসেস সেন বললেন।
    ‘তৈরি হন, আমি গাড়ি বের করছি।’ নিজের ঘরে এসে চাবি নিল অয়ন। ঘরে কেউ নেই।বিছানা পরিপাটি করে গোছানো।
    গাড়ি বের করলে মিসেস সেন ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলেন, ‘দিতি তো ঘুমাচ্ছে। বলছে খুব মাথাব্যথা করছে। দরজাটা বন্ধ করে দেব?’
    ‘দিন। আমার কাছে চাবি আছে।’
    মিসেস সেনকে নিয়ে ব্যাঙ্কে পৌঁছে গেল অয়ন। সবে ব্যাঙ্ক খুললেও কর্মচারীরা যে যাঁর জায়গায় এসে গেছেন। চেকে সই করে চল্লিশ হাজার টাকা তুললেন ভদ্রমহিলা। কয়েক বছর আগে যা সম্ভব হত না, কম্প্যুটার তা করে দিয়েছে।
    টাকা নিয়ে গাড়িতে বসে মিসেস সেন বললেন, ‘তোমার ঋণ জীবনে শোধ করতে পারব না। কিন্তু তোমার কী হয়েছে বলো তো?’
    অয়ন হাসার চেষ্টা করল, ‘কই, কিছু হয়নি তো!’
    ‘এখান থেকে মুম্বই গাড়িতে কতক্ষণ লাগবে?’
    ‘খুব বেশি হলে ঘণ্টা তিনেক। যদি রাস্তা ঠিক থাকে।’
    ‘তাহলে একটা গাড়ি ভাড়া করে দাও। আমরা যদি তিনটের মধ্যে পৌঁছাতে পারি, তা হলে মুম্বই এয়ারপোর্ট থেকে কলকাতার ফ্লাইট ধরতে পারব।’
    ‘বেশ তো।’
    উইন্ডিতে একটা ট্রাভেল কম্পানির অফিস দেখেছিল অয়ন। সেখানে গিয়ে জানা গেল শুধু গাড়ি পাওয়া যাবে তা-ই নয়, ওরা নেটে প্লেনের টিকিটও কেটে দিতে পারে। মিসেস সেন সুযোগটা ছাড়লেন না। অয়ন জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা লাঞ্চ না করে যাবেন? সেটা কি ঠিক হবে?’
    ‘লাঞ্চ করলে চারটের ফ্লাইট পাব না।’ মিসেস সেন বললেন।

    মালপত্র ট্যাক্সিওয়ালাই গাড়িতে তুলছিল। মিসেস সেন অয়নের হাত ধরলেন, ‘ঠিকানা, ফোন নাম্বার দিয়ে গেলাম। কলকাতায় গেলে অবশ্যই আমার ওখানে আসবে।’
    অয়ন হাসল।
    দিতি সেন তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলে দেখা গেল তাঁর মুখচোখ ফোলা। অয়ন বলল, ‘আপনাকে তো সুস্থ মনে হচ্ছে না। ওষুধ খেয়েছেন?’
    মিসেস সেন জবাব দিলেন, ‘খেতে চাইছিল না। জোর করে খাইয়ে দিয়েছি।’
    মিসেস সেন গাড়িতে আগে উঠলেন। উঠতে যাওয়ার আগে ঘুরে দাঁড়ালেন দিতি সেন, নিচু গলায় বললেন, ‘আসছি।’
    ‘আসুন।’ অয়ন বলল।
    ‘কথাটা যেন মনে রাখবেন।’ গাড়িতে উঠে গেলেন দিতি সেন।

    এখন রাত। সমুদ্রের গায়ে চাঁদের আলো আজ আরও মায়াময়। হু হু বাতাস বইছে। চাতালে চুপচাপ বসেছিল অয়ন। একটা রাতপাখি চিৎকার করে উড়ে গেল। এই সমুদ্রের জলে ডুবে রয়েছে মধুবালা, তার স্বামী এবং মন্টি। কী ভয়ানক শূন্য মনে হচ্ছে চারধার। ওপরের আকাশে একটি প্লেন উড়ে যাচ্ছে, তার আলো দপদপ করছে। এই সময় মোবাইল বেজে উঠল। ওটা শোওয়ার ঘরে রেখে এসেছিল অয়ন। এখন চাতাল থেকে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। মোবাইলটা বেজে বেজে থেমে গেল। তারপর আবার বাজতে লাগল। কালের ঘণ্টার মতো।

    SHARE

    LEAVE A REPLY