সোয়ালো পাখির নীড় (Swallow’s Nest) -শিবাসাকি টমোকা (Shibasaki Tomoka)

    শিবাসাকি টমোকা
    জন্ম ১৯৭৩ সালে জাপানের ওসাকা শহরে। ২০০০ সালে প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস Kyō no dekigoto সারা ফেলে দেয় ও ২০০৩ সালে সিনেমা করেন বিখ্যাত জাপানি নির্দেশক Isao Yukisada। দুটি প্রকাশিত গ্রন্থ।

    জাপানি থেকে ইংরাজি অনুবাদ: লরেল টেলর
    ইংরাজি থেকে বাংলা অনুবাদ: অপরাজিতা

    (সোয়ালো পাখি একধরনের নীল রঙের পাখি যারা সমুদ্রে হাজার হাজার মাইল উড়ে এক দেশ থেকে আর এক দেশে চলে গিয়ে আবার ঘরে বা নীড়ে ফিরে আসে। আগেকার দিনের নাবিকেরা এই সোয়ালো পাখির ট্যাটু বাহুতে লাগাত। নাবিকরাও যখন সমুদ্রে যেত, তাদেরও ঘরে ফেরা ছিল অনিশ্চিত।)

    বাতাসের রং ছিল সাদা। মেঘ,বৃষ্টি ,কুয়াশা, না গাড়ির চাকার টায়ার থেকে ছিটকে  ওঠা জলের কারনে এটা হচ্ছিল সেটা আমি বলতে পারব না।জানলা গুলো বন্ধ থাকার জন্য গাড়ির ভিতরটা হয়ে উঠেছিল ভ্যাপসা গরম। তারও ওপরে আবার উইন্ডশিল্ডটা বারে বারেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
    এইছিল হিমেজি ক্যাসল , দ্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এ যাওয়ার জন্য আমাদের যাত্রাপথের সূচনা ….. ।
    -হাতসু, তুমি কী উইন্ডশিল্ডটা একটু মুছে দেবে?
    -দিচ্ছি।
    বলার সংগে সংগে আমি ড্যাশবোর্ডের ওপরে রাখা কাপড়টা নিয়ে কাচ মুছতে শুরু করে দিলাম। ত্বড়িত্গতিতে আমার হাত চলছিল, আমি সচেতন ছিলাম যাতে মোছার সময়ে কোনও ভাবেই রী-এর সামনের রাস্তা দেখতে কোনও অসুবিধা না হয়।
    আমি কখনই গাড়ি চালাই না, আর প্রত্যেকবারই রী আমাকে উইন্ডশিল্ড পরিষ্কার করে দিতে বলে,আর প্রত্যেকবার ই একটা অস্বস্তির বুদবুদ আমার ভিতরে বুড়বুড়ি কাটে : কাচ মোছার সময় আমার হাত যদি খুব ধীরে চলে, রী যদি সেই সময়টুকুর জন্য রাস্তা দেখতে না পায় এবং আমরা  কোনও দুর্ঘটনায় পড়ে যাই……..

    আমাদের যাত্রা শুরুর পর থেকে সে আমাকে দিয়ে কমপক্ষে বার দশেক জানলা মোছা করিয়েছে ।
    -উফ্ , কী ভ্যাপসা গরম রে বাবা ,
    কথাটা রী এই নিযে সম্ভবত সাতবার বললো ।
    আবারও এয়ারকন্ডিশনের সুইচ অন করল,
    যন্ত্রটির  ছোট্ট গর্তদিয়ে একটি সশব্দ ঝটকার সংগে ঠান্ডা বাতাস ছড়িয়ে পড়লো ।
    একমাত্র সেই ই পারে এই ঠান্ডা করার যন্ত্রটির সুইচ অন করতে। এবং কয়েক মুহূর্ত পরেই সে বলে উঠবে, উফফ- খুব ঠান্ডা ….
    এবং আবার সুইচটি অফ্ করে দেবে।
    এই রকমই সে বার বার করতে থাকবে …..
    এটা সহজেই অনুমেয় যে ভরা বর্ষার প্যাচপেচে গরমে এইটাই সে ক্রমান্বয়ে করতে থাকবে।
    -পরের বার যখন গাড়িটা কোথাও থামাবে, তখন তোমার জায়গায় আমিই গাড়ি চালাব …..
    আকো পিছনের সিট থেকে বলল। সামনের সিটের যে জায়গায় আমি বসেছিলাম সেখান থেকে ওর মুখ দেখা না গেলেও ওর মুখে থাকা সবুজআপেল লজেন্সের হালকা গন্ধ গাড়ির সামনের অংশেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
    -অবশ্যই, রী উত্তর দিল, তবে ফেরার সময়, কারন ততক্ষনে আমার ঘুম পেয়ে যাবে।
    -তোমার কষ্ট হচ্ছে নাতো? হলে কিন্তু সংগে সংগে বলো ….
    গাড়ির বাইরে অবিরত জলছিটকে চলা চাকার শব্দ মিশে যাচ্ছিল গাড়ির ভিতরের  আইপডের এলোপাতারি ভাবে বেজে যাওয়া স্টিরিওফোনিক সাউন্ডের সংগে।
    এখন বাজছে একটি ব্রাজিলিয়ান গান।
    এক্সপ্রেসওয়ের বিপরীতদিকের প্রাচীরের ফাঁক দিয়ে দেখাযাচ্ছিল সাদা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সরে সরে যাওয়া কুবে ডিষ্ট্রিক্টের সানোমিয়া শহরতলির লম্বা লম্বা বাড়ি আর রকো পাহাড়ের চূড়া।

    -তোমার বয়ফ্রেন্ড কেমন আছে ?
    আমি প্রশ্ন করার সংগে সংগে রী উত্তর দিল,ওর একটা ছোট দূর্ঘটনা ঘটেছে।
    -কী করে?
    – ফুটসাল খেলতে গিয়ে। শুধুমাত্র পায়ের একটা আঙুলই ভেঙ্গেছে,সুতরাং তেমন কিছু হয় নি।
    – কোন আঙুল? ডান না বাঁ পায়ের? – আকো পিছন থেকে প্রশ্ন করলো।
    রী স্টিয়ারিংটা শক্ত হাতে ধরে সামনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।তার ভংগি দেখে মনে হল উত্তরটা মনে করতে তাকে যথেষ্ট চিন্তা করতে হচ্ছে।
    – ডান পা। বুড়ো আঙুল বা কড়ে আঙুল নয়, আমার মনে হচ্ছে অন্য কোনও আঙুল।আসলে সব কটা আঙুলই একসংগে প্লাস্টার করা হয়েছে,সেই জন্য আমি ঠিক বলতে পারছি না। না। দাঁড়াও, মনে পড়েছে, সম্ভবত বাঁ পা।
    –    ওর পক্ষে খুবই কষ্টের ….
    আমি একবারই ওর বয়ফ্রেন্ডকে দেখেছিলাম।যে অবয়ব আমার মনে ভেসে উঠল, ঝাঁকড়া ভুরুর মোটাসোটা বেশ শক্তপোক্ত একটা মুখ,খুব ভঙ্গুর ফঙ্গবেনে তো মনে হয়নি।
    -বলছে তো বেশ ভালই আছে। বসে বসে কাজ করছে। তবে আমার একটু খারাপ লাগছে। আমার কাছে আসতে পারছে না।
    -তোমার কি নি:সঙ্গ লাগছে? তুমি তো সবে ওর সংগে ডেটিং শুরু করেছিলে ,তাই না? আকো জিগগেস করলো।
    আকোর সংগে রী-র আজকে নিয়ে এটা তৃতীয় সাক্ষাত।
    আমি যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম আকো সেখানেই চাকরি করে।চার বছর আগে সেই চাকরি আমি ছেড়ে দিয়েছি।রী-র সংগে আমার আলাপ একটা  কাপড়ের দোকানে, আমি সব সময় যে দোকান থেকে আমার কাপড়চোপর কিনতাম রী সেখানে কাজ করতো।

    আকোর প্রশ্ন নিয়ে রী কয়েক লহমা চিন্তা করল, তারপর বলল,আমার কাছে অনেক সবজি জমে আছে।
    আর ঠিক একই সময়ে সে আবার এ সি বন্ধ করার বোতামটি টিপল ।
    -সবজি? আকো প্রশ্ন করল।

    মোটামুটি মাস ছয়েক আগে রী অরগানিক সবজি বিক্রির কারবার শুরু করেছিল। কোম্পানিটি এক সপ্তাহের জন্য ধারে সবজি দিলেও তাদের সবচেয়ে কম টাকার যে প্যাকেজ তাতেও অনেকটাই সবজি থাকতো।রী র পক্ষে অত সবজি বিক্রি করা সম্ভব ছিল না।ফলে তার অধিকাংশই নষ্ট হত। যখন গত মাসে তার সংগে দেখা হয়েছিল রী খুব উত্ফুল্ল হয়ে আমাকে বলেছিল যে একজন সিস্টেম ইন্জিনিয়ার;যে মাঝেমধ্যে তার কাপড়জামার দোকানে যেত,  তার সংগে সে ডেটিংএ যেতে শুরু করেছে। এবং একই নি:শ্বাসে সে একথাও জানিয়েছিল যে অবশেষে সে তার বেঁচে যাওয়া সবজিগুলোর ও গতি করতে পেরেছে।
    -এবং তুমি আমাকে এটাও বলেছিলে, কী দারুন ব্যাপার এই রকম কাউকে পাওয়া যে সমস্ত শাক সবজি খায়।
    -হ্যাঁ, শুধু শুকিয়ে যাওয়া জিনিসপত্র বাদে, যেমন ধর, বাঁধাকপির বাইরের পাতা …
    উইন্ডশিল্ডটা আবারও কুয়াশায় ভরেঝাপসা হয়ে গিয়েছিলকিন্তু রী তারমধ্যেও একটি ছোট্ট ফুটোর মতো স্বচ্ছ জায়গা খুঁজে নিয়েছিল যার মধ্যেদিয়ে এক দৃষ্টে যতদূর দেখা যায় দেখার চেষ্টা করতে করতে তার কথা চালিয়ে যেতে লাগল ।
    -মাঝে মাঝে মনে হয় , আমার যদি একটা খরগোশ থাকত…..
    আমি উচ্চৈস্বরে হাসিতে ফেটে পড়লাম। আর আমার হাসি শুরু হওয়ার সংগে
    আকোও একটি ছোট্ট বিস্ময়সূচক শব্দ বের করল। আমি পিছনে ফিরে দেখলাম সে পিছনের সিটের ঠিক মাঝখানে বসে গোল গোল চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
    -তুমি সেই বড় বড় খরগোশগুলো দেখেছ?ওগুলো সত্যিই এত বড় যে আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে ওগুলো সত্যিকারের খরগোশ। ওদের কে দেখে মনে ওরা যেন বিশ্বের দখল নিতে চলেছে ।
    আমি বললাম,খরগোশের চেহারা কিন্তু একটু ভয় লাগানোর মতোই।
    -কেন তোমার এরকম লাগে? রী জিগ্গেস করল।
    -কারন ওদের ঘাড় বলে কিছু নেই।
    -তাহলে তুমি ইঁদুর ও পছন্দ করো না, তাই না, হাসুমি? আকো জিগগেস করল।
    – খরগোশের মাংস কিন্তু খুব সুস্বাদু। রী জানাল।
    রী ওর ব্লগে খাবার নিয়ে লেখে।গত পাঁচ বছরে অন্তত সাতশো রেস্তোরা নিয়ে লিখেছে।
    -রী ,তোমার কী মজা, আকো দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ওই সব সুন্দর রেস্তোরায় গিয়ে খাওয়া …
    – তা সত্ত্বেও সেগুলো খরগোশের মতোই দেখতে লাগে।
    – খেতে কেমন ?
    – দেখো,যখন দেওয়া হয় তখন সেগুলো স্টু এর মতো দেখতে লাগে, সবজির সংগে সেদ্ধ করা। তবে আমার মনে হয়, এর থেকে সাধারন মাংস বেশি ভাল।
    –    যাই ঘটুক না কেন, আমি বাবা কোনও মতেই কুকুর খেতে পারব না। কোনও ভাবেই না।
    আকোর এমন দৃরপ্রতিঞ্জ্ মুখ আমি আগে কখনও দেখি নি।এরপর আমাদের আলোচনা শুরু হল রাতে কী খাওয়া যায় তাই নিয়ে।
    মনে হল আমরা যেন সম্ভবত ভুলেই গিয়েছি যে হিমাজি ক্যাসলই হল সেই জায়গা যেখানে আমাদের সর্বপ্রথম যাওয়ার কথা আর আমরা কেন হিমাজি ক্যাসল এ যাচ্ছিলাম সেটাই ভুলে যেতে বসেছি।

    কোবে-র সিটি সেন্টার ছাড়িয়ে আমরা যেই পাহাড়ের কাছাকাছি যেতে শুরু করেছি , আকো জানাল, তার একবার বাথরুম যাওয়া প্রয়োজন।
    এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা একটা বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা দেখতে পেলাম।
    -কিছু একটা খেয়ে নেওয়া যাক। গাড়ি থামানোর সংগে সংগে রী ঘোষণা করল।
    সেল ফোনের ঘড়ি তে দেখলাম সবেমাত্র দুটো বেজেছে।আমার মোটেই তেমন খিদে পায়নি, গাড়ির দরজা খুলে পিচের রাস্তায় পা রাখার সংগে সংগে  আমি ভাবলাম। গাড়ির দরজা পিঠ দিয়ে ঠেললাম। শব্দ শুনে বুঝলাম যে দরজাটা ঠিক মতো বন্ধ হয়েছে।কিন্তু গাড়ির নিচে আমার চোখে পড়ল সাদা মতো কিছু একটা।
    আরে এটা কী! ভেবে আমিনিচু হয়ে দেখলাম, গাড়ি আর সামনের চাকার  মাঝখানে যে জায়গা সেখান থেকে আবছা সাদা বাস্পর মতো কিছু একটা বেরোচ্ছে।প্রথমে আমার মনে হল ,গরম টায়ারের রাবারে ঘষা লেগে নিশ্চয়ই এটা বেরোচ্ছে। কিন্তু তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম সাদা বাস্পটা ঘন হয়ে যাচ্ছে।এবং টায়ার নয়, তার পিছনে আরও ভিতরের কোনও জায়গা  থেকে এটা বেরচ্ছে।
    আকো গাড়ি থেকে বেরোলো, লম্বা করে হাত পা টানটান করলো এবং টয়লেটের দিকে দৌড় মারলো।বৃষ্টিটা এতো হালকা ঝিরঝিরে, যেন পেঁজা তুলো। এই বৃষ্টিতে ছাতা লাগে না।
    -আমাকেও বাথরুম যেতে হবে, রী গাড়ি থেকে নেমে দরজা বন্ধ করতে করতে বলল । তার সেই ছোট্ট গাড়ির লক করার শব্দ প্রতিধ্বনিত হল গাড়ির ভিতর থেকে। রী আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। আমাদের দুজনের  মাঝখানে গাড়ির চকচকে কালো বনেটের ধার ঘেঁসে উঠে আসতে থাকা ঘন সাদা বাস্প। টায়ারের পিছন থেকে ছড়িয়ে পড়া সেই বাস্পের থেকে এটা আরও বেশি সাদা, দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে এটা বাস্প নয়; ধোঁয়া।
    অনস্বীকার্য : এটা ধোঁয়া, স্বীকার না করে কোনও উপায়ই নেই যে এটা ধোঁয়া।
    -সর্বনাশ, এটা কী? রী র মুখ থেকে ছিটকে বেরোলো।
    -কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে। আমি বললাম।
    -কী? কী? কী? রী উচ্চারিত প্রতিটা ‘কী’ উচ্চ থেকে উচ্চত্বরে যাচ্ছিল। আকো ফিরে এসে পুরো পরিস্হিতি মেপে নিল। রী এর চোখ তার গাড়ি আর আকোর মুখের ওপর ঘোরাফেরা করতে লাগলো,যেন তাদের মধ্যে তুলনা করছে। আর বলতে লাগল – আমরা এখন কী করব?আমরা কী এখন গাড়িটা চালিয়ে গ্যাস স্টেশনে গিয়ে ওদের কে বলব এটার মধ্যে জল ঢালতে?
    সে রাস্তাটা দেখার জন্য ঘুরলো,তার ওপর দিয়ে আমি দেখতে পেলাম সমতল ছাদের একটি গ্যাস স্টেশন ও লোগো সহ তাদের নিদর্শন।
    আকো একদৃষ্টিতে সেই সাদা ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,- না। আমাদের কিছুতেই এটা নড়ানো উচিত নয়। সত্যি বলতে কী,এটা ছোঁয়াও ঠিক হবে না। সব ঠিক আছে। আমি আগে এটা করেছি।
    আকো মাথা নাড়ল। একমাত্র সেই বলল যে ‘ সব ঠিক আছে ‘ তবুও রী বা আমি কেউই বুঝলাম না ‘ঠিক’ কোন জিনিসটা ঠিক আছে।
    রী আকোর দিকে অনুরোধ ভরা চোখে তাকাল, তুমি নিশ্চিত ?তাহলে আমাদের এখন কী করতে হবে?
    -তুমি কি জে এ এফ এর সদস্য?ওরা এই সব ক্ষেত্রে সাহায্য করে। ঠিক আছে?আমরা ওদের ডাকতে পারি ,আর …
    -না,আমি ওদের সদস্য নই।কিন্তু সম্ভবত আমার ইনসোরেন্স কোম্পানি হতে পারে। বলে রী উদ্বিগ্ন ভাবে তার ঢাউস হাতব্যাগে হাত ঢুকিয়ে ততোধিক হৃষ্টপুষ্ট একটি মানি ব্যাগ বের করে, সেটি খুলে  সেখানে রাখা হাজারো কার্ডের মধ্যে থেকে খুঁজে পেতে একটি হালকা নীল রঙের ইনসোরেন্স কার্ড বের করে আকো কে দেখাল ।

    – ওদের সংগে কথা বল। মনে হয়, আমার ইনসোরেন্স কোম্পানির থেকে সম্ভবত এরা কিছুটা ভাল হবে । আকো জানাল ।
    – তুমি সিওর তো, তুমি সিওর তো, বলতে বলতে রী ইনসোরেন্স কোম্পানির সঙ্গে কথা বলার জন্য তার সেল ফোনের বোতাম টিপতে লাগল। এই ব্যাপারে আকো নিশ্চিত কিনা জানার জন্য তার স্বর ক্রমশ চড়ছিল।
    আমি তখনও সেই টায়ারটার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম যেখান থেকে প্রথম ধোঁয়া বেরোতে দেখি। বৃষ্টিটা একটু জোরে পড়া শুরু করল।ধীরে ধীরে সেই সাদা ধোঁয়া মিলিয়ে যেতে লাগল।

    একটা চারকোনা বিল্ডিং। সেটাই দোকান আর সাধারন মানের ক্যাফেটেরিয়া । ছাদে লাল হলুদ ডোরাকাটা একটা তাঁবু দোকানের সামনে খাটানো।তাঁবুর নিচে এলোমেলো সারিবদ্ধ রূপালি চেয়ার টেবল রাখা ।দোকান আর ক্যাফেটেরিয়া মোটের ওপর লোকজন ভর্তি। বাইরের যে খাবার জায়গায় আমরা বসলাম সেখানে আর কেউই ছিল না।
    আকো তার গাড়ি নিয়ে ঘটা সমস্যার গল্প বলছিল।
    -আমার গাড়িটা বিগড়েছিল একটা বিতিকিচ্ছিড়ি সময়ে। Akashi Kaikyo  ব্রিজের ওপরে সবে এক কিলোমিটার মতো গিয়েছি ,হঠাৎ দেখি সব কিছু সাদা। আমি একলাই ছিলাম।কারন ,তোমরা তো জান ,আমার দিদিমা Sumoto  তে থাকেন, Awaji Island থেকে একটু গেলেই।আমার পিছনে যে বুড়ো ট্রাক চালিয়ে আসছিল সেই প্রথম খেয়াল করেযতোটা পারে চেঁচিয়ে আমাকে ধোঁয়া বেরোনোর কথা জানিয়েছিল। আর আমার  মনের অবস্থা ছিল; সে তো আমিও জানি, কিন্তু করবো টা কী …
    আমি ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে কোনও রকমে গাড়ি চালিয়ে ব্রিজের শেষে এসে থামলাম।কিন্তু ওই রাস্তা টুকু যাওয়া আগুনে ঘি ফেলার মতো হয়েছিল। আমার ওটা  করা উচিত হয়নি।যাই হোক, তারপর তো মেকানিকের কাছে নিয়ে গেলাম।তারা জানালো, এটা ঠিক করতে লাখ খানেক ইয়েন খরচ হবে,আমি যদি তা করি, তাহলেও অন্য জায়গায় অন্য সমস্যা দেখা দেবে, ভবিষ্যতে আরও বড়ো কিছু বিগড়োনোর আগে আমার উচিত একটা নতুন গাড়ি কিনে নেওয়া।

    এক লাখ ইয়েন দিয়ে সেই গাড়ি সারানো বা নতুন গাড়ি কেনা – দুটোর কোনও টা করার মতো টাকাই আমার হাতে তখন ছিল না।সুতরাং আমি গাড়িহীন থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।তবে আমার ধারনা, আমি গাড়িটা কিনেই ছিলাম রদ্দি ।
    –    ওরে বাবা!একলাখ ইয়েন! রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে তখনও তার ডান হাতের মুঠোয় ধরে রাখা ফোনটা খুলে বললো,এখানে খুব খারাপ সিগন্যাল , আমি বরং ওইখানে বসে ওদের কলের জন্য অপেক্ষা করি ।
    –    সেটাই করা উচিত …. বলে আকো আর আমি উঠতে যাওয়ার সংগে সংগে রী আমাদের হাত নেড়ে বারন করে হ্যাঁচকা টানে ওর  ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, -না না,তোমারা এখানেই বসো, ওখানে গেলে বৃষ্টিতে ভিজে যাবে।
    সেল ফোনটা খোলা বন্ধ করতে করতে ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল, হয়তো বা রী যখন হতাশ বা বিক্ষুব্ধ থাকে তখন ওর আশে পাশে কোনও মানুষজন থাকা ও পছন্দ করে না ।
    যেন রী-র জায়গা নেওয়ার জন্যে বাচ্চা সহ এক দম্পতি একটা ছাতার তলায় গাদাগাদি করে টেন্টে ঢুকল।তারা আমাদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সংগে সংগে আকো উঠে দাঁড়াল।
    -যাই, কিছু একটা কিনে আনি, হাসুমি,তুমি কী খাবে?
    উল্টো দিকের তখনও খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে আমি দেখলাম একটা চিহ্ন দিয়ে লেখা আছে, – তাজিমা বিফ স্টেক ও রাইস বোল ।
    এই বাড়িটার সামনেও আরও তিনটে কাঠের কাঠামোর দোকান । একটা “আইসক্রিম ফর সেল”, অন্য যেটা আমাদের খুব কাছে , সেটার উড়ন্ত ব্যানারে লেখা আছে – “ Jumbo Wagyu Grilled on stick”.
    আমি হঠাত প্রচন্ড ক্ষিদে অনুভব করতে শুরু করলাম , কিন্তু……
    –      অতি সাধারন যা হোক কিছু,Udon, Ramen বা ওই ধরনের কিছু ।
    আমার চাহিদায় সম্মতি সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে  দায়িত্বশীল ভংগি করে  দৃপ্ত পায়ে আকো ক্যাফেটারিয়ার দিকে এগোল ।
    প্লাস্টিকতারে মোড়া আ্যলুমিনিয়মের এই চেয়ারগুলোয় এক আরামদায়ক শীতলতার জন্য বেশ সুন্দর। আমার পরেই বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে গাড়ি রাখার জায়গা ।আজ রবিবার হওয়া সত্বেও সেটা অর্ধেকও ভরে নেই,সম্ভবত খারাপ আবহাওয়ার কারনে।
    আমার মাথার ওপরে তাঁবুর ছাদটা সরু হলেও সেটা এই বাড়িটার একধারে যে টয়লেট সেখান পর্যন্ত টানা আছে ।বাড়ি আর তাঁবু কে ভাগ করে যেখানে ময়লা ফেলার জায়গাগুলো রাখা আছে সেখানে দাঁড়িয়ে রী ফোনে কথা বলছে।আমার প্রথমে মনে হল হয়তো বীমা কোম্পানির ফোন,কিন্তু লক্ষণীয় ভাবে তার অস্থির অভিব্যক্তি দেখে বুঝলাম সে চেনাশোনা কারোর সংগে কথা বলছে।আমি ঠিক জানি না,হয়ত তার বয়ফ্রেন্ড, অথবা তার পরিবারের কেউ, কিংবা তার কোনও বন্ধু।রী বেশ লম্বা।আমি ভাবলাম। যেন এই প্রথম তা আমার নজরে পড়ল।
    রী আর আমার মধ্যে জলভরা বাতাস বইছিল।তারই মধ্যে একটা ছোট্ট কালো  ছায়া উড়ে গেল।দ্রুত স্বচ্ছন্দ গতি ছিল সেটার।আমার চোখ এক মুহূর্ত ওর গতিপথ কে দেখল,তারপরই নজর দিল কোথা থেকে সে আসছে দেখার জন্য।উল্টোদিক থেকে আসছিল সেটা।গতিটা সত্যিই খুব দ্রুত ছিল।উল্টোদিকে , যেখানে পথ বন্ধ করে আ্যলুমিনিয়াম চেয়ার গুলো রাখা ছিল সেখানে আমার চোখে পড়লো, একটা কমলা রঙের কোনে পথ নির্দেশিকার ওপরে এক টুকরো কাগজ সাঁটা, তাতে লেখা ‘মাথা সামলিয়ে’, তার ওপরে সোজা তাকাতেই আমি দেখলাম,সোয়ালো পাখীর বাসা।
    লোহার ফ্রেমের ভিতর দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছিল তাঁবুর কাপড়ের উজ্জ্বল কমলা রং। লোহার বারের মধ্যে যে ফাঁক সেখান থেকে উঁকি মারছিল ধূসর আর বাদামি রঙের গোল গোল ডেলা। ছানা গুলো নজর রাখছে, আমি ভাবলাম,যেই  মা কে আসতে দেখছে তাদের কালো কালো মাথা সরিয়ে দিয়ে হলুদ গলা ফাঁক  করে চিত্কার করে কান্না  জুড়ে দিচ্ছেপি পি পি শব্দে। সোয়ালো তার বাসায় ফিরে হলুদ হাঁ করা ছানার মুখে খাবার ঢোকাচ্ছে, আবার উড়ে যাচ্ছে। তাঁবুর ধার ঘেঁসে নেমে, দোকানগুলোর পাশ দিয়ে, একটা কোনের সামনের খুব নিচু রাস্তারপ্রায় ওপর দিয়ে সে উড়েযাচ্ছে পার্কিং লটের উল্টোদিকের একটা ঘন সবুজ সতেজ ঝোঁপের দিকে।
    ওর এই উপবৃত্তাকার যাত্রাপথ অপূর্ব এক সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি করছে।যার উপমা দেওয়া যায় একমাত্র গ্রহদের কক্ষপথের নকশার সংগে।
    – তুমি কী খাবে ? গ্রিন ওনিয়ন রামেন না kitsune udon ?
    প্রশ্ন শুনে আমি মুখ তুলে দেখলাম , আকো আমার সামনে একটা হালকা সবুজ ট্রে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাটির মধ্যে রাখা গরমগরম খাবারের ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে বাতাসের কুয়াশার সংগে।
    -যে কোনও একটা দিলেই হল। তোমার যেটা পছন্দ তুমি নিয়ে নাও।
    – সত্যি !ধন্যবাদ ,প্রাণাধিকে …
    আকো টিভি তে প্রচুর টিভি সিরিয়াল দেখে।ফলে মাঝে মাঝেই তার মুখ থেকে এই ধরনের পুরোনো ধরনের নাটকীয় সংলাপ ভুরভুরি কাটে। সে নিজের জন্য kitsune উডন নিয়ে চেয়ারে বসে রী র দিকে ফিরল ।
    –    কোন ও চিন্তা নেই। ওর গাড়ি আমার গাড়ির থেকে নতুন।আর ও সমস্যাটাও আমার আগে ধরতে পেরেছে।
    আকো বসে থাকা অবস্থাতেই নিজেকে ঘুরিযে রী কে দেখতে থাকল।রী একটা থামে হেলান দিয়ে বসে আছে, কোলের ওপর হাত দুটো আড়াআড়ি ভাবে রাখা। বারে বারেই তার সেল ফোনে নজর রাখছে।বৃষ্টি প্রায় থেমে এসেছেই বলা যায়।কিন্তু কুয়াশা এখনও স্তব্ধ করে রেখেছে সব কিছু।
    তীব্র ঝাঁঝালো পিঁয়াজকলির গন্ধওয়ালা ন্যুড্ল্স টা অবশেষে শেষ করলাম। আকো যেই সশব্দে তার ন্যুডল্স স্যুপে চুমুক দিতে শুরু করলো, সেই ছোট্ট সোয়ালোটা খাবার নিয়ে ফিরে এল, উড়ে গেল, আবার খাবার নিয়ে ফিরে এল , উড়ে গেল …….. এটা সে করতে লাগল, করতেই লাগল, বারংবার ….
    দেখতে দেখতে আমি খেয়াল করলাম পাখিটা কিন্তু মোটের ওপর একই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে।পার্কিং লটের উল্টোদিকে,যেখানে ছোট ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে পাখিটা প্রথম আমার নজরে পড়ছে,সেখান থেকে রী র সামনে দিয়ে এসে সে কমলা রঙের পথ নির্দেশিকার কাছে এসে হঠাৎএকটা বাঁক নিয়ে উড়ে যাচ্ছে তাঁবুর পিছনে, ফেরার সময়ও ও একই ভাবে একই পথ ধরে ফিরছে। যদিও তার এই যাতায়াতের জন্য কোনও রাস্তা করে  দেওয়া নেই, তা সত্ত্বেও এটা এতোটাই যথাযথ যে আমি অবাক হয়ে গেলাম। ত্রুটিহীন একটা নাচের ভংগি দেখে আমি যতোটা আনন্দ পাই,  পাখিটার ওড়ার এই সচ্ছন্দ ভঙ্গি দেখেও আমার সেই আনন্দের অনুভূতি হচ্ছিল।
    রী ফিরে এসে ক্ষমা চাওয়ার সুরে আমাদের পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলল, ওরা আমাকে জানাল যে টো-ট্রাক নিয়ে আসতে ওদের কম বেশি একঘন্টা মতো লাগবে।তারপর ওরা আমাকে সবচেয়ে কাছের গাড়ি সারানোর দোকানে নিয়ে যাবে।ওখানে ওরা আমাকে একটা ভাড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবে।কিন্তু আমরা যদি গাড়ি সারানোর দোকান অবধি যেতে চাই, তাহলে আমি ছাড়া যে কোনও একজন যেতে পারবে।ওরা টো ট্রাকের সংগে আর একটা গাড়ি আর দুজন লোক  পাঠাচ্ছে,ওই লোক দুজন অন্য গাড়িটা নিয়ে এখান থেকে অন্য এক জায়গায় যাবে।আর টো ট্রাকটায় শুধু দুজন বসতে পারবে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।আমি বললাম, আমার গাড়িটায় তো এক জন বসতেই পারে, কিন্তু ওদের বক্তব্য, সেটা বেআইনি।
    রী র কথা থেকে বোঝা গেল, আমাদের এখানে অন্তত ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
    -আমি অপেক্ষা করতে পারি। আমি গাড়ি চালাতে পারি না, ফলে  আমি যদি তোমার সংগে যাই ও মনে হয় না খুব একটা কিছু সাহায্য করতে পারব।
    – না ।না ।তুমি ওর সংগে যাও ,হাসুমি , আমি এখানে অপেক্ষা করব। ঠিক আছে। লাল চেক কাটা ব্যাগপ্যাক থেকে হাসতে হাসতে  হালকা নীল রঙের  নিনটেনডো ভিডিও গেম টা টেনে বের করতে করতে  আকো বলল।
    কে এখানে অপেক্ষা করবে সেই নিয়ে কিছুক্ষন হালকা ভাবে তর্ক করার পর ঠিক হল আকোই অপেক্ষা করবে।
    সবাই মিলে ট্র্যাক স্যুট পরা এক পরিবার সমস্বরে হাসতে হাসতে এসে পাশের টেবিলে বসল।দেখে মনে হল তারা উষ্ণ রৌদ্রোজ্বল  কোনও দেশ থেকে এসেছে। রী তাদেরকে দেখার পর পুরো ক্যাফেটেরিয়ায় চোখ বুলিয়ে জানাল , -আমার ক্ষিদে পেয়েছে।
    -উফ্ উফ্ ,ওই নরম নরম চিজ্ পোটেটো ডাম্পলিংস,আমি ওটা আগেই খেয়াল করেছি,যা লোভ লাগছিল না!
    আমরা উঠে খাবার কেনার লাইনে দাঁড়ালাম।
    আমাদের গোল রুপোলি টেবিলে চলে এল kakiageসোডা, কফি,নরম নরম চিজ পোটেটো ডাম্পলিংস, মেরুন ইয়ামআইসক্রিম আর চকোলেট চিপ কুকিস।
    খাবার গুলো যখন শেষ হচ্ছিল,আমি সোয়ালোটাকে রী র মাথার পিছন দিয়ে উড়তে  দেখলাম।একই রকম ভাবে সেটা উড়ছিল আর খাবার নিয়ে ফিরে আসছিল,আবার উড়ে যাচ্ছিল …. যখনই মা পাখিটাকে দেখা যাচ্ছিল,পাখির বাচ্চাগুলো একই ভাবে কাদঁতে শুরু করছিল, মা পাখিটা যখন আবার উড়ে যাচ্ছিল পাখির বাচ্চা গুলো একই ভাবে চুপ করে যাচ্ছিল।
    ট্র্যাকস্যুট পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছেলেটা আঙুল দিয়ে সোয়ালোটাকে দেখিয়ে এক মহিলাকে কিছু একটা বলল।দেখে মনে হল সম্ভবত তিনি ছেলেটির মা।ছেলেটির ট্র্যাকস্যুটের রং গোলাপি, আর মায়ের ট্র্যাকস্যুটটি গাঢ় গোলাপি।সম্ভবত এদের দেশেও সোয়ালো পাখি আছে। অথবা এমনও হতে পারে, ৠতু পরিবর্তনের সময় এই সোয়ালো গুলোই হয়ত তাদের দেশে উড়ে যায়।
    আমি দেখছিলাম,হয়তো বা স্পষ্টভাবে প্রমান করার জন্যই আমি খেয়াল রাখছিলাম, ওরা যখন ফিরছিল নিশ্চিত ভাবে ওদের ঠোঁটে কিছু আটকানো ছিল, হয় কীট না হয় পতঙ্গ, আমি ঠিক জানি না, কিন্তু প্রত্যেক বার যখন সে ফিরছিল তার ঠোটে আটকে থাকা বস্তুটির আকার এক রকম থাকছিল না। কী করে এ এই সব পোকা মাকড় ধরে?আমি এর আগে কক্ষনও কোনও সোয়ালো পাখি কে শিকার ধরতে দেখি নি।সুতরাং আমার পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব যে এটা কী রকম হতে পারে।ও কী বাতাসের মধ্যে দিয়ে ভেসে গিয়ে ঈগলের মতো ছোঁ মারে নাকি একটা গাছের মধ্যে বসে ঠুকরে ঠুকরে শিকার ধরে ….
    এতো ছোট ছোট জিনিষ ওরা খুঁজে পায় কী করে? এই সবই আমার অজানা।
    ঘন গাছের ঝোপের ঝাঁকড়া পাতার আড়াল দিয়ে পাখিটা যখন উড়ে গেল আমি ভাবলাম আমি ওকে হারিয়ে ফেললাম।কিন্তু কয়েক  মুহূর্তের মধ্যেই ভোজবাজির মতো ও আবার ফিরে এল। পাখিটাকে  দেখে মনে হয় না যে এ পোকামাকড় ধরার জন্য চক্কর কেটে বেড়ায়।আমি কল্পনা করলাম,ওই গাছগুলো পেরিয়ে, নিশ্চয়ই একটা মাঠের মধ্যে ওদের খাদ্য এই কীট পতঙ্গের পাহাড় আছে।এই ছোট্ট সোয়ালো পাখিটি সেখানে যাচ্ছে, ঠোঁটে করে খাবার তুলছে, আর আনছে ….
    কিন্তু আমি এও নিশ্চিত জানি সেখানে এই রকম কিছু নেই।
    এইভাবে অসংখ্যবার যাতায়াতের সময় একবার পাখিটা ফিরল না।কয়েক মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পরেও ও ফিরল না।ঝোপের আড়াল দিয়ে একটুও গতি না কমিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির ইন্জিনের শব্দ,রাস্তার জল ছিটিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির টায়ারের শব্দ আমার কানে এল।আমি লক্ষ্য করলাম ট্র্যাকস্যুট পরা পরিবার তাদের  খাওয়া শেষ করল।আমি চিন্তিত হলাম এই দেখে যে ছোট্ট সোয়ালোটা এখনও ফিরল না। হয়ত এটা  বেশ আশ্চর্যজনক যে আমি পাখিটার জন্য উদ্বিগ্ন হলাম। সোয়ালোটা ফিরুক বা না ফিরুক, আমার তাতে কিছু করার নেই।হয়তো একটু পরে সেটা ভুলেও যাব। যাই হোক, এটা মাত্র লহমার অস্বস্তি।

    আচ্ছা, যদি পাখিটাকে কোনও ট্রাক ধাক্কা মারে আর সোয়ালোটা কোনও দিনও ফিরতে না পারে!তার ছানা গুলোও কী তাদের মাথা প্রায় অর্ধেক ফাঁক করে হলুদ গলা বের করে পি পি পি শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে মরে যাবে …..রী, আকো তোমাদের কী মনে হয়? আমি ভাবলাম ঠিকই, কিন্তু ওদের সেটা জিজ্ঞেস করতে আমার একটুও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমার মনে বিস্ময় জাগলো, আচ্ছা আমি যদি সোয়ালো ছানা হয়ে জন্মাতাম, আর আমার বাবা মা খাবার আনতে গিয়ে আর ফিরে না আসতেন …… তাহলে তো  আসলে কী ঘটেছে তা  না জেনেই আমি না খেয়ে মরে যেতাম! তাহলে কী হত?

    যতক্ষন আমি এই সব হাবি জাবি চিন্তা করছিলাম তারমধ্যেই প্রত্যাশিত ভাবে তাকে আবার দেখা গেল। মসৃণ ভাবে তার সেই কক্ষপথে আবর্তিত হয়ে   সোয়ালো তার দায়িত্ব পালন করতে লাগল।
    চিজ আর আলু দিয়ে তৈরি ফুলোফুলো ডাম্পলিংগুলো তেল জবজবে ছিল, এক দমই ভাল ছিল না।অবশেষে বৃষ্টিটাও থামল।
    মেকানিকের পোশাক পরা শক্তপোক্ত চেহারার একজন ‘ঠিক আছে, ‘ঠিক আছে’ বলে চিৎকার করে পথ দেখাতে দেখাতে টো ট্রাক নিয়ে ঢুকলো। এর আগে আমি শহরের রাস্তায় বেআইনি ভাবে গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেরকম টো ট্রাক দেখেছি এটা সেরকম নয়। এটার পিছনে একটা ট্রেলার আছেএরা গাড়ি টেনে নয়,উঠিয়ে নিয়ে যায়।যে তিনজন এল তাদের পরনে একই রকম গাঢ় সবুজ পোশাক। টোট্রাক চালকের আসনে একটি অসম্ভব রকমের বাচ্চা চেহারা ছোটখাট মানুষ বসে। একজন কাঁচাপাকা চুলের বয়স্ক মিশুকে স্বভাবের মানুষের কাছে রী কাগজপত্র সই করতে লাগল। তাদের দেখে বোঝা যাচ্ছিল এই কাজে তাদের যথেষ্ট দখল আছে। অত্যন্ত দক্ষতার সংগে তারা সকলে মিলে রী র গাড়ি ট্রেলরে তুলে দিল।
    আকো আর আমি একটু দূরে ঝোপের ধারে একটা বেড়ার ওপর বসে এদের কাজকর্ম দেখছিলাম। রী এসে বলল,ওরা বলছে আমরা যদি কাউকে না বলি তাহলে ট্রেলরে তোলা আমার গাড়িতে চড়ে যে কোনও একজন যেতে পারি।যদিও নিয়ম অনুযায়ী এটা করা যায় না, কিন্তু ওদের  আপত্তি নেই।
    আকো আমার সংগে চোখ চাওয়া চাওয়ি করে বলল, ভগবান রক্ষা করেছেন, আমার ডিভাইসে মাত্র একটা খেলাই ছিল, যাতে হাতের লেখা ভাল করা যায়! আমার হাতের লেখা কিছুটা ভাল করা যেত হয়ত, কিন্তু ….

    -মনে রেখ, আমার গাড়িটা এমনিতেই উঁচু, তার ওপর আবার এটা ট্রেলরের ওপরে রয়েছে,চলার সময় খুব ঝাঁকুনি হবে কিন্তু।আমার মনে আছে, গাড়ি চললে অল্পকিছুতেই তোমার শরীর খারাপ লাগে ।তাই না, হাত্সু?
    রী আমাকে করা তার প্রশ্ন শেষ করার আগেই আকো বলতে শুরু করল, না , না, আমি ওটার ওপর চড়তে  চাই, আমাকে চড়তে দাও।আমি এই রকম থ্রিল খুব পছন্দ করি,আমার মনে হয় না এই ভাবে যাওয়ার সুযোগ আমি খুব বেশিবার পাব।
    উত্তেজনায় আকোর চোখ চকচক করছিল । দুটো বড়ো বড়ো ট্যুর বাস পার্কিং লটে ঢুকে কাছেই পার্ক করল।

    টো-ট্রাকের সেই ছোটখাট চালকটি গাড়ি থেকে নেমে একের পর এক আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল ,তোমরা পারবে তো? প্রচন্ড ঝাঁকুনি হবে কিন্তু। কোনও অসুবিধা হলে আমাদের ডাকতে পারবে তো?
    তার সমস্ত কান জুড়ে রূপোর ছোট ছোট রিং এমন ভাবে পরা যে সেটা একটা মেশিনের মতো লাগছে।
    -আমার সেল ফোন আছে, আকো  হাতে ধরা  সেল ফোন টা তার সামনে নাচাল।কেউ তাকে বলল না যে এতক্ষন ধরে সে এটা দিয়েই গাড়ির ভিতরের ছবি তোলাল চেষ্টা চালাচ্ছিল।
    রী কিন্তু চিন্তিত ছিল। এমন কী ট্রেলরের ওপরে রাখা গাড়িতে বিজয়গর্বে চড়ে আকো যখন স্মারকচিত্র তুলছিল, তখনও রী এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছিল,তোমার একটু শরীর খারাপ লাগলেই কিন্তু তুমি সংগে সংগে আমাদের জানাবে। জানাবে কিন্তু, একটুও দেরি করবে না, কেমন …..
    পেশিবহুল মানুষটিকে নিয়ে বয়স্ক সহৃদয় মানুষটি তাদের গাড়ি নিয়ে অন্য দিকে চলে গেল।
    আমি আর রী চালকের পাশের আসনে গাদাগাদি করে বসলাম।এই ট্রাকের বসার জায়গাটা বেশ উঁচু,ফলে এখানে বসে বাইরের দৃশ্যটা অন্য রকম লাগছিল।অটো শপটা মনে হয় যথেষ্ট দূরে।আমাদের যাত্রা শুরু হল সেই দিকে যেদিকে  আমাদের নিয়ে রী  আসছিল।আমার ধারনা ছিল খুব তাড়াতাড়িই আমরা এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে যাব।মিনিট দশেক চলার পরেও সেখান থেকে নামার কোনও চিহ্ন আমার নজরে পড়ল না। আর যখন ই আমি ভাবতে শুরু করলাম  হিমাজি ক্যসলের পথে আমাদের নিয়ে যাওয়ার কথা ওকে বলা উচিত হবে কিনা  তক্ষুনি একটা  টোলবুথ পড়ল আর তার একটু পরে আমরা ইউ টার্ণ নিলাম।
    এবার আমরা যাচ্ছি উল্টোদিকে। একই গতিতে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে গাড়ি চলছে। আমি বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম ধূসর গার্ডরেলের ভিতর আর বাইরের গাছের সবুজের বৈচিত্র্য ।আমি অনুভব করছিলাম গাড়ির ঝাঁকুনির থেকে ট্রাকের ঝাঁকুনি কত আলাদা। আমি যখন এইসব ভাবছিলাম রী তখন চালককের কাছে জানতে চাইছিল তার গাড়িটা সারাতে মোটামুটি কত খরচ হতে পারে।
    সে বলল, গাড়িটা সম্ভবত বেশি গরম হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কত খরচ হতে পারে সেটা কিছুতেই বলা যাবে না যতক্ষন না সেটা কারখানা নিয়ে গিয়ে খুলে না দেখা হচ্ছে। রী তার কাছে বারে বারে জানতে চাইছিল, গাড়িটা সারাতে কত টাকা লাগতে পারে। সে শুধু বলল,গাড়ির ভিতর না দেখে কিছুই বলা সম্ভব নয়।
    রী কে  দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে বেশ অস্বস্তি বোধ করছে।তারপর ছেলেটি  বিপদ চিহ্নের এক লম্বা ফর্দ  তাকে বলতে  শুরু করল,যা দেখে সে ভবিষ্যতে বুঝতে পারবে যে গাড়িটি খারাপ হতে চলেছে। রী গভীর মনোযোগ দিয়ে তা শুনতে লাগল।
    আমি কোনও দিন গাড়ি চালাই নি, আর ভবিষ্যতে চালাব ও না – ওদের কথা শুনতে শুনতে আমি একবার ভেবে নিলাম।
    রী র গাড়ি নিয়ে চলা সেই ট্রাক অবশেষে এক্সপ্রেসওয়ে ছেড়ে তীব্রগতিতে পাহাড়িপথে নামল মেয়ে নিয়ে সস্তায় রাত কাটানো যায় এমন একটি হলুদ রঙের সরাইখানার পাশ দিয়ে।দুপাশে ক্ষেত নিয়ে এগিয়ে চলা একটা পথ ধরল। পথটা সোজা উত্তর দিকে গেছে। বড় ছড়ানোবিতরন কেন্দ্রের মতো দেখতে একটা কারখানা পেরিয়ে ট্রাকটা এমন জায়গায় ঢুকল যেখানে বাড়ির সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। মাঝে মাঝে ক্ষেতে চোখে পড়ছে।বীজ থেকে উঠা সারি বদ্ধ সবুজ চারা গুলোর মাঝে যে জল উপচে পড়ছে দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন সারা দিনের জলভরা বাতাসকে সাহায্য করার জন্য আছে।
    রী তার হাতব্যাগ থেকে সেল ফোন বের করল। আকো কল করেছে।
    –    হ্যালো , তুমি ঠিক আছো?
    আমার ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখলাম ,আকো দুবার কল করেছিল।আমি লক্ষ্য করলাম যে আমি সেগুলো খেয়ালই করি নি।
    রী র কানে লাগানো ফোনের মধ্যে থেকে আমি আকোর গলা শুনতে পেলাম , আমি ভাল আছি,কী মজা,এটা দুর্দান্ত !
    আমি দেখলাম ছোটখাট সেই লোকটি গাড়ি চালাতে চালাতে অল্প অল্প হাসছে। সে বলল ,ওখানে থাকাটা কিন্তু বেশ কষ্টকর,আমি এটা করেছি। এর অর্ধেক পথ আমাকে যেতে হয়েছিল।
    -মনে হচ্ছে আকো সত্যিই থ্রিল রাইড ভালবাসে, ও মজাই পাচ্ছে। আমার এই কথা শুনে চালকটি শুধু ‘হুমম ‘ বলল।ওর উত্তর শুনে আমি বুঝতে পারলাম না ,আমার কথা সে আদৌ বুঝল ,না বুঝতে পারল না। রী ওর ফোন আমার হাতে দিল,ওপার থেকে আনন্দ উত্ফুল্ল স্বরে আকো আমাকে জানাল এই ভাবে গাড়িতে চড়ে আসার একটা ভিডিও ও তুলেছে যেটা পরে আমাকে দেখাবে।
    আমরা একটা বড় কংক্রিটের ব্রিজ পেরোলাম,ব্রিজের নিচে বয়ে চলা নদীটায় জল প্রায় নেই বললেই চলে , তারপরই আমরা শহরে ঢুকলাম।
    পথের ধারে একই চিহ্ন ,একই খাবারের দোকান যা সারা রাজ্য জুড়ে দেখা যায়। আমি সাধারনত এই ধরনের দৃশ্য দেখতে খুব একটা অভ্যস্হ নই, তাই যে ফ্যামিলি রেস্তোরায় আমি কোনও দিন ঢুকিনি সে গুলি আমাকে কৌতুহলী করে তুলল।
    রী  একবার  বাইরেটা দেখে চালকের উপর ঝুঁকে পরে জিগগেস করল , তুমি যে এই ধরনের কাজ কর, তুমি নিশ্চয়ই গাড়ি ভালবাস?
    -তা বাসি, আমার মনে হয়, তুমি বলতে পার, এটা আমার একটা শখ।
    -তোমার নিশ্চয়ই একটা সত্যিকারের ভাল গাড়ি আছে?
    -গাড়িটার বডি মার্সেডিজ টু এর। আমার বাবাও সেটা চালায়।কিন্তু আমি আমার সমস্ত জীবন এর ইন্জিন ঠিক করতেই লাগিয়ে দিলাম,বললাম বটে জীবন, কিন্তু আসলে বলতে চেয়েছি টাকা।
    -কত?
    -কমবেশি এককোটি ইয়েন -দশ মিলিয়ন ইয়েন ।
    -কী? ও বাবা!
    আমার আর রী র মুখ দিয়ে এই বিস্ময়সূচক শব্দ একই সংগে বের হল।
    -আমি গাড়ির ভিতরটা পাল্টেছি। তার বলার ভঙ্গীতে একটু অহংকার থাকলেও স্বরের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল,-কিন্ত রঙের কাজটা আমাকে পেয়ে বসেছে।
    – কী রঙ?
    -রূপালি, অথবা, আমার মনে হয়,এক ধরনের কালচে রূপালি।
    সে নিস্পৃহ স্বরে এটা জানাল। কিন্তু তার চেপ্টা নাক আর ছেলে মানু়ষের মতো চেহারায় একই সংগে একটা গর্ব ফুটে উঠল।
    আমি নিশ্চিত যে সে আমাদের থেকে অনেকটাই ছোট।
    সে গাড়িটা এমনভাবে চালাচ্ছিল যে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এই পথ সে এমন ভাবে চেনে যে চোখ বন্ধ করেও গাড়ি নিয়ে যেতে পারবে।
    একটা বাড়ি আর গার্ডেন সেন্টারের পরে বাঁক নিয়ে সে একটি সরু এবড়ো খেবড়ো রাস্তা ধরে আমাদের দিকে ফিরে জানাল যে ও কোথায় এই বাঁকটা নিল সেটা যেন আমরা মনে রাখি। তখন আমি উপলব্ধি করলাম,গাড়ি সারানোর পর রী যখন কালকে ওর গাড়ি নিতে আসবে,তখন ওকে  এই পথ ধরেই আসতে হবে।
    একটা চারমাথার মোড়ে পথচারী, গাড়ি কিছু না থাকলেও লাল সিগন্যাল ছিল,  আমাদের যখন সেখানে একটু থামতে হল, সে বলল, এই ধরনের  চাকরির, মূল কাজ হচ্ছে অপেক্ষা করা। তোমাকে ততোক্ষন বসে থাকতে হবে, যতক্ষন কোনও মক্কেলের কাছ থেকে ডাক না আসে।তাই যতোক্ষন  ডাক না আসে আমরা গাড়ির সংগে খেলাধুলো করেই কাটাই।
    -তুমি মাঝেসাঝে গাড়ি চালিয়ে বেরোও?
    -না, আমি সে রকম বেশি গাড়ি চালাই না।কারন গাড়িতে দাগ ফেলতে আমার মোটেও ভাল লাগে না। আমি যদি কোনও সাধারন জায়গায় গাড়ি রাখতে যাই তাহলে কারবোরেটরের নিচে ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা থাকে।
    – তাই!

    আমার হঠাত নিচু গাড়ির আকারের কথা মনে পড়ে গেল। পাহাড়ের ওপর কার রেসিং নিয়ে করা একটা মুভি আমি বহুদিন আগে দেখেছিলাম, সেখানে এই রকম গাড়ি ছিল।সেই মুভিটা দেখার সময় আমার যে অনুভূতি হয়েছিল সেটা আমার ভাবনায় এল।মনে হল ,ফেরারি বা ল্যামবরগিনির মতো অতো দামি স্পোর্টস কার একবার চালিয়ে দেখলে হয়।
    আমাদের গন্তব্যের  বোধহয় তখনও কিছুটা দেরি ছিল ,কারন ছেলেটি তখনও কথা চালিয়ে যাচ্ছিল – সেই জন্য আমি যখন বাড়ির কাছাকাছি দোকান বাজার করতে যাই, তখন আমি আমার বৌ এর গাড়ি নিয়ে যাই। তবে সেটাও ভাগ্যের ভরসায়।

    -তোমার বৌ ও গাড়ি ভালবাসে?
    – অন্য ভাবে। সে মিনি ভালবাসে। সে রী আর আমার দিকে তাকাল।তার মুখে দেঁতো হাসি, তার মিকি পছন্দ নয়, শুধু মিনি।যদিও আমি তাদের মধ্যে কোনও পার্থক্য খুঁজে পাই না।সে একটা সাধারন নিশান মার্চ চালায়।আর তার মধ্যে অন্তত একশোটা মিনি রয়েছে।
    একশোটা মিনি মাউস নিয়ে একটা মার্চ ।আমি ভাবলাম ,যদি এটা কোনও পার্কিং লটে পার্ক করা থাকে ,আমি অবশ্যই তার মধ্যে একবার উঁকি মারব। রী ও বোধহয় তাই করবে ।
    -আমার মনে হয় বিশ্বে কতো ধরনের মানুষ আছে। আমি একদম ই গাড়ি চালাই না।
    -ওই যে অন্য লোকটা ছিল না, লম্বা চওড়া। ও আমাদের মালিক ।
    লোকটাকে দেখে মনে হয়েছিল ও একটা টো ট্রাকের মধ্যে একশ কিলোমিটার ও ঘেষাঘেষি করে যায়, তবুও সমস্ত পথে সে একটি কথাও আমাদের সংগে বলবে না।
    -ওর একটা হোন্ডা স্টেপওয়াগন আছে।তুমি জান সেগুলো কী রকম? টায়ারের পিছনে একটা  ধরনের জিনিস আছে , সেটা যখন ওঠে তখন ‘গাকুন ‘’গাকুন’ শব্দ হয়।
    -আমি ওটা টিভি তে দেখেছি।
    -পিছনের বসার জায়গার অর্ধেকটা স্পিকারে ভর্তি।
    -ইচিরোর মতো, আমি বললাম।
    রী আমার দিকে তাকিয়ে জিগগেস করল, কেন এটা ইচিরোর মতো?
    –    ইচিরোর গাড়ি নিশান মার্চের।কিন্তু সেটা টু সিটার, দাম মোটামুটি কুড়ি মিলিয়ন ইয়েন।আমি একটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় এটা দেখেছি।যদিও আমি নিশ্চিত যে ও এখন বিদেশি গাড়ি চড়ে।
    –    তুমি নিশ্চয়ই নিশান পছন্দ কর।
    ছেলেটা মুখে হাসি নিয়ে আমাকে এটা বলাতে আমি বেশ খুশি হলাম।
    -উমম, রী ওর মখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না যে তুমি কানসাই এর লোক ।
    -আমি কানাগোয়ার।
    -আরে, সত্যি!আমিও কানাগোয়ার।কী আশ্চর্য না,কানাগোয়ার কারোর সংগে এখানে দেখা হওয়া ….
    -আমার বৌ এর সংগে আমার দেখা হয়েছিল  ওকিনাওয়া তে।কিন্তু ও আসলে এখানকার বাসিন্দা।ওদের পারিবারিক গাড়ির ব্যবসা।তাই আমি যখন ওকে বিয়ে করলাম, ওরা আমাকে জিগগেস করেছিল ,আমি ওদের পারিবারিক ব্যবসায় কোনও দিন ঢুকতে চাই কিনা ।যদিও ওরা বারে বারে আমার চুলে সোনালি রং করাটা বন্ধ করতে বলে।
    -কোথায় ? কানাগোয়ার কোন অঞ্চল ?
    -ফুজিকাওয়া ।
    -কী! সত্যি? আমি আফুনার ।ঈসস, আমরা কতো কাছের।তুমি কোন স্কুলে পড়েছো?

    রী র উত্তেজনাছেলেটিকে বেশ বিভ্রান্ত করে তুললো। সে তার হাইস্কুলের নাম বলল।তার উত্তর রী কে আরও প্রাণবন্ত করে তুলল, তাহলে তুমি নিশ্চয়ই য়াজিমাকুন, য়াজিমা কেজি কে চেন। না না ,ওরা বোধ হয় তোমার থেকে একটু বড়।আচ্ছা ,তোমার মিডল স্কুলটার নাম কী?
    তার পর বেশ কিছুক্ষন ধরে রী র মুখ থেকে বিশেষ্য পদের প্রপার নাউনের ফর্দ বেরল। আমরা সবুজ ছাউনি দেওয়া অটোশপে পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গে অবশেষে একটা মিষ্টির দোকান পাওয়া গেল যেটা তারা দুজনেই চেনে।
    অটোশপের একাংশে যখন আমার প্রথম চোখ পড়েছিল আমি ভেবেছিলাম এটা বোধহয় কোনও ব্যবহৃত গাড়ি রাখার জায়গা।তারপর আমি উপলব্ধি করলাম,  এখানে পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত আমি কল্পনা করছিলাম, যে জায়গাটা দেখতে হবে  গাড়ি তৈরির একটা বিশাল কারখানার মতো; যেরকম আমি দেখেছিলাম প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় একবার স্কুলট্রিপে গিয়ে। নিজের বোকামিতে হাসি পেল।
    আকো মুখ ভর্তি উজ্জ্বল হাসি নিয়ে ট্রেলার থেকে লাফিয়ে নেমে বলল, খুব মজা লেগেছে।

    ভাড়ার গাড়িটা ছিল ছোট, গোল আর লাল।
    এমন কী অটো শপেও আমাদের জানানো হল,তারা এখনই আমাদের বলতে পারছেনা যে গাড়িটা  সারাতে কতো লাগতে পারে ।এটা খুলে ঠিক করে তবেই বলা যাবে, যে কতো খরচ হল ।তবে সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনার কথা ধরে বলা যেতে পারে যে লাখখানেকের ও বেশি ইয়েন,যা শুনে রী এর মুখ শুকিয়ে গেল।
    সাজসজ্জাহীন সাদামাটা সেই ভাড়ার গাড়িতে উঠে আমরা ঠিক করলাম ওসাকা ফিরে যাব।যদিও  সুমা আ্যাকোয়ালাইফ পার্কে ডলফিন শো দেখার জন্য আমরা থেমেছিলাম। কোবের কাছাকাছি পৌঁছনোর পর আকোর বন্ধুরা ফোন করে আমাদের উমেদায় গিয়ে দারু পানের নেমতন্ন করল।
    আকোর এই পুরুষবন্ধুটি গত মে মাসের ছুটিতে হানিয়ানে সী সারফিং করতে গিয়েছিল।সেখানে অন্য একজনের সার্ফিং বোর্ড তার মাথায় এত জোড়ে আঘাত করে যে পনেরোটা সেলাই দিতে হয়েছিল। এখন অবশ্য সে সম্পূর্ন সুস্থ। অন্য আরেক জন যে এসেছিল সে বেচারা গত রাতের খোওয়া যাওয়া দশ হাজার ইয়েনের কথা কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছিল না।গ্রিল করা চর্বিওয়ালা শুয়োরের মাংস টা লেটুস পাতায় মুড়তে মুড়তে রী বলল,-জান, আমি যখন প্রথম আমার গাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখলাম,আমি ভাবছিলাম তোমাদের গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়ে,গাড়িটা একলা চালিয়ে পার্কিং লটের ধার পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে লাফ দিয়ে নেমে যাই। আর  তারপর গাড়িটা ভীষণ শব্দ করে ফেটে গিয়ে পাহাড়ের ধার থেকে খাদে পড়ে যাক।বিশ্বাস কর ।
    তারপর ছেলেগুলোকে বিদায় সম্ভাষন জানিয়ে আমরা টোল পার্কিং লটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তা টা খুব সরু, চারদিকে ভাঙাচোরা বাড়ি।একদম শেষ প্রান্তে আমাদের লাল গাড়িটা কোনও রকমে ঢোকানো ছিল।
    -অন্য কোনও সময়ে আবার হিমেজি ক্যাসলে আসা যাবে, রী বলল।
    – এটা বিশ্বের ঐতিহ্যপূ্র্ণ জায়গাগুলোর মধ্যে একটা, আকো তন্দ্রাচ্ছন্ন গলায় বলল।
    সম্ভবত ওই প্রথম যে ওখানে যেতে চেয়েছিল।
    আমার এত খারাপ লাগছে, এই ছুটিটা বার করার জন্য তোমাদের কত কষ্ট করতে হয়েছিল, রী র কথায় ক্ষমা চাওয়ার সুর।
    –    ঠিকই আছে। এটা ও একটা অভিঞ্জতা। আমার বলা শব্দ গুলো আমার কানে পৌঁছোতেই আমি অনুভব করলাম কথাগুলো বড্ড রূঢ় হয়ে গেছে।শব্দের তীব্র অভিঘাতে আকো চোখের ঘুম সরিয়ে ফেলে আমার দিকে তাকাল।
    রী পার্কিং মিটারে একটা হাজার ইয়েন নোট ঢোকাচ্ছিল।
    “আমার মনে হয় না এটার মূল্য সত্যিই একশ হাজার …..” সে বলল।

    SHARE