কলকাতায় দিন কয়েক

    বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য
    যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরী বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। বাংলা রম্য রচনা লেখেন।

    (১ম পর্ব)
    ডিজিটাল এর যুগ। তথ্য প্রযুক্তি তরতরিয়ে চলেছে। লেখালেখি প্রায় উঠেই গেছে। মোবাইল ফোনে হরেক রকম ইমোশান মজুত, পছন্দ মত ক্লিক কর। কি দেখলে, কি খেলে, কোথায় গেলে ফেসবুকে ছবি ছাপাও। খুঁটিনাটি জানতে চাও তো হোয়াটস্‌আপ, আরে বাবা, SMS পড়বারই সময় নেই তো বই পড়া?!?
    -তবু কিছু লোক লেখে, নিয়ম করে লেখে। মোটা মোটা বই ছাপা হয়, বইমেলা হয়।
    -কেন লেখে বলতো?
    -‘নিজেকে আবিস্কারের জন্য’।পার্থ বলল।-’বই ছাপানো সেটার ভ্যালিডেশন্‌ আর বইমেলা হ’ল সেলিব্রেশন্‌’। পার্থ যদিও আধমিনিট কথা বলে দেড় মিনিট কাশে, কথাটা কিন্তু ঠিকই বলে। আমি আর পার্থ গোলপার্কের কফিশপে বসে আছি। কথাছিল নিরুপম ও আসবে। ঘণ্টা খানেক পেড়িয়ে গেছে, নিরুপম কথা রাখেনি।
    পার্থ বলল – জানিস, সমরেশ বসু দ্বিতীয় বিয়ের পর, নিয়ম করে দশটা পাঁচটা অফিস করার মত লিখত(মৃদু কাশি), আর এক বোতল ওল্ড মঙ্ক খেত (স্মিত হাসি)।
    পার্থ একটা লেখালিখির প্রয়াস চালাচ্ছে সেটা আমি জানি। সাধু প্রচেষ্টায় উৎসাহ দেওয়া উচিত সেটাও মানি, কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ের চেয়ে ওল্ড মঙ্কের প্রস্তাবটাই আমার কাছে সময় উপযোগী মনে হল। কফির বিল মিটিয়ে দুজনে যখন পায়ে পায়ে হেঁটে গড়িয়াহাট মোড়ের মদের দোকানের একদম সামনে, ঠিক তক্ষুনি নিরুপমের ফোন এল;- আমি কফির দোকানে, তোরা কোথায়?
    আমরা মদ কিনতে এসেছি শুনে নিরুপম ভয়ানক রেগে গেল। প্রচন্ড হম্বিতম্বি। এত বকাঝকা আগে কখনও শুনিনি। নিরুপমের আপত্তি শুনে পার্থ রেগে গিয়ে কাশির চোটে কাঁপতে শুরু করল। বলল;- তুই শালা ব্লাড সুগার নিয়ে যখন বিরিয়ানি খাস তখন কি আমি বারন করি? আমার উপর খবরদারি কেন? বল চাঁদু কি খাবি তুই রাম না ভদকা?
    আমার বলতে ইচ্ছা করছিল না, আবার না বললেও নয়, আমি সত্যি সত্যিই আজকাল মদ টদ খাই না। একটু ইতস্তত করে বললাম;-‘নাহ্‌ রে, আমি খাবো না’।ব্যস্‌! নিরুপমের হম্বিতম্বিতে যা হয়নি, আমার ছোট্ট একটা কথায় তাই হ’ল। পার্থ ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল। নো হাসি, নো কাশি। খালি হাতে কফির দোকানে ফিরে এলাম।
    নিরুপম তেরছা চোখে অবিশ্বাসের নজরে অনেক্ষন আমাদের জরিপ করে যখন বুঝল ও সত্যিই জিতে গেছে, তখন চালাক চালাক হেসে বলল;- মদ না হয় কিনিস নি, চাট তো কিনতে পারতি, চিলি চিকেন, ফিস ফ্রাই! এতক্ষন সময় দিলাম করলিটা কি?
    -এই জন্যই লেখা লিখি উঠে যাচ্ছে। নিরুপমের কথা শুনে পার্থ মুখটাকে এতো তেতো করে ফেলল, লিখে বোঝানোই যাবে না, সুতরাং ক্লোজাপে পার্থর মুখ, কাট টু পার্থ রূপ্সার দেড় তলার ছাতের ঘর।
    দেওয়ালে রূপ্সার ছবি। নিরপম খাটের উপর আধশোয়া হয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললঃ ছবিটায় মালা টালা না দিয়ে পার্থ অন্তত একটা বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। আমি বললাম, ঠিক, যে নেই সে নেই, বারেবারে সেটা মনে করিয়ে কি লাভ? নিরুপম হাসল তারপর উদাস হয়ে বললঃ কেউ থাকুক বা না থাকুক পালা পার্বন গুলো ঠিক নিয়ম করে চলে আসে তাই না? উত্তর না দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। তিন দিন বাদে দোল। ঘরের লাগোয়া ছাদটা চাঁদের আলোয়ভেসে গেছে। পার্থ কাঠের সিড়ি বেয়ে ব্যালান্স করে চায়ের কাপ নিয়ে উপরে উঠে আসছে।আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছি। আমি আর পার্থ আগামিকাল শান্তিনিকেতন যাব। নিরুপমকেও শান্তিনিকেতনের টোপ দেওয়া হয়েছিল,গেলে নি।
    এই হ’ল বহুযুগ পরে কলকাতার ঠেকের পটভূমি। আমি হেঁটে হেঁটে রাসবিহারি এ্যাভেনিউ ধরে কালিঘাট থেকে গোলপার্ক এসেছি। মার্চ মাসের গোড়ায় তাপমাত্রা খুব মনোরম তাই হাটাহাটি বেশ আরামদায়ক। লেকমার্কেট ভেঙ্গে নতুন মল হচ্ছে। অনেক পুরানো দোকান টিকে আছে বটে, তবে আগের মত জেল্লা নেই। অনেকেবেমালুম গায়েব। প্রিয়া সিনেমার তলায় টুলু-বুলু পানের দোকান নেই। এখানেই প্রথমইস্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখেছিলাম ‘আপনা দেশ’। ট্র্যায়াঙ্গুলার পার্কে ‘লেডিস ওন’ দোকানটার জৌলুষ গেছে। এই দোকানটায় পাপ্পু বলে একজন ছিল, অবিকল রাজেশ খান্নার মত দেখতে। উল্টোদিকের রাস্তায় আমাদের ইস্কুলের একটা ছেলে বাসে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল। নাম মনে নেই, কিন্তু মুখটা স্পষ্ট মনে আছে। আর ওই যে মহানির্বান মঠ, ঠিক তেমনি আছে যেমন ছিল চল্লিশ বছর আগে। অনি বলেছিল এককালে নাকি এখানে দাড়ালে একডালিয়া পার্কের বাস টার্মিনাস দেখা যেত। একডালিয়া পার্ক! হায় সে পার্কের স্মৃতি খুবই আবছা। সেখানে এখন বিজন সেতু। ইদানিং গড়িয়াহাটের থেকেই বিজন সেতুর ট্রাফিক জট শুরু হয়, আমাদের কলেজ জীবনেও এটাকে ব্যাঙ্গ করে নির্জন সেতু বলা হ’ত। মহানির্বান মঠ থেকে গলি ধরে অল্প ভেতরে ঢুকে অনিদের ভাঙাচোরা বাড়িটা যেন ইয়াদোঁ কা বরাত। এখানে এলেই বঙ্গলিপী খাতায় অনির লেখা নাটকের স্ক্রীপ্ট গুলোযেন জ্যান্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় কান পাতলেই শুনতে পাবো ত্রিকোণ পার্কে দূর্গা পূজার হুল্লোড়।একটু এগিয়ে জোছন দোস্তিদারের নাটকের ডেরা অর্কিড। দুষ্টুদের লাল বাড়িটার তলায় দাড়িয়ে ‘বুড়ো’ বলে খুব জোরে হাঁক পারলে একদম ওপরে ছাতের থেকে মুখ বের করে দুষ্টু সাড়া দিত।পাশের ক্যালকাটা কেমিকালের ফ্যাক্টরি থেকে সব সময় সুগন্ধি সাবানের খুশবু ভেসে আসত আর অন্যদিকে সেনবাবুর গ্যারাজ থেকে গাড়ী মেরামতের ঠুকঠাক দমাদম আওয়াজ।          পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। বাসন্তীদেবী কলেজটাকে খুঁজে পেতে বেশ বেগ হ’ল। দোকানের ভীড়ে একদম চাপা পড়ে গেছে। গড়িয়াহাটার মোড়ে যেখানে রন্টু-মন্টু তনোদের ঠেক ছিল, তার থেকে একটু বাঁয়ে এগোতেই শঙ্করদার বই এর স্টল। শঙ্করদার দোকানেই প্রথম ‘অনীক’ পড়েছিলাম।
    আমাদের ডাগর হবার বয়সে, গড়িয়াহাট গোলপার্কে ঘোরাফেরা করে, আলো ঝলমলে দোকানপাট, মানুষজন আর রংবাহারি পসরার সান্নিধ্যে জীবনের উত্তাপ নেবার একটা প্রগতিশীল নাম দেওয়া হয়েছিল,‘মাস-কন্ট্যাক্ট্‌’। আর থিয়েটার ওয়ার্কশপে শিখেছিলাম দর্শকের চোখে চোখ রেখে দ্বিধাহীন ভাবে নিজের সংলাপ বলতে, ‘আই কন্ট্যাক্ট্‌’।স্টেজের উপর লাফালাফির সময় নিজের শরীরের দায়িত্ব সহ অভিনেতাদের হাতে সমর্পণ করার নাম ছিল ‘ট্রাস্ট গেম’। পকেটে রেস্ত প্রায় থাকতই না, তাই বলে ফূর্তির কোন অভাব ছিল না মনে। এমনই কত সন্ধ্যায় ল্যাম্পপোস্টের সাথে আই কন্ট্যাক্ট করে, ধাবমান গাড়ী ঘোড়ার সাথে ট্রাস্ট গেম খেলতে খেলতে,দ্বিধাহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে, যাদবপুর থেকে গোলপার্কে পৌঁছেছি, ‘মাস কন্ট্যাক্ট’ করতে।
    -এত ভীড় ছিল না।
    -এত গাড়ি ও ছিলনা।
    -আর এত ছোটলোক ও ছিল না। আমিতো বাড়ি থেকে বেরনোই বন্ধ করে দিয়েছি।
    চা ভর্তি কাপ তুলতে গিয়ে নিরপমের হাত ছলকে কিছুটা চা পড়ল মাটিতে। পার্থ তাড়াতাড়ি একটা ন্যাকরা এনে জানলার পাল্লা মুছতে মুছতে বলল- ধুলোতে আমার ভীষন ইরিটেশন্‌, একেবারে সহ্য করতে পারিনা।মাটিতে পরা চায়ের দিকে চেয়েও দেখল না। আমি আর নিরুপম ঈষৎ বিস্ময়ে মেঝেতে ছড়িয়ে যাওয়া চায়ের দিকে তখনো তাকিয়ে আছি দেখে পার্থ বলঃ আবে! পাখা চলছে এক্ষুনি শুকিয়ে যাবে। তাছাড়া নিরপমের চায়ে না আছে দুধ না আছে চিনি, চ্যাট চ্যাট ও করবেনা, পিঁপড়েও আসবেনা।                                             বাঃ এই সহজ কথাটা মাথায় আসেনি। চিনি থাকলে তবেই তো পিঁপড়ে, আর পিঁপড়ে মানেই সঞ্চয়। সঞ্চয় মানে বিষয় আশয়, স্বার্থ চিন্তা, কলহ বিবাদ। পার্থ বাউল চর্চা করে একথা শুনেছিলাম, এবারে তার চিন্তার মধ্যে বাউলের বিস্তার দেখে চমৎকৃত হলাম।
    পার্থকে জিজ্ঞেস করলাম,‘নিত্যানন্দ androgenous’? – এটা ওর গবেষণার বিষয়।
    -নিত্যানন্দ নয়, নিমাই এ্যান্ড্রোজেনাস।
    -সব সাধু সন্ন্যাসীরাই এ্যান্ড্রোজেনাস।– নিরুপম বলল। ‘রামকৃষ্ণ, অনুকুল ঠাকুর সব্বাই’!
    -কি করে জানলি?
    -ছবি দেখিস নি? মেয়েদের মত ভারী বুক আবার দাড়ি গোঁফ ও আছে।
    আমার মামা বাড়ির লোকজন খুব রামকৃষ্ণ ভক্ত। দাদুর ঘরে পেল্লায় বড়রামকৃষ্ণের ছবি ঝুলত, তলায় লেখা মাদে-খাদে। আসল কথাটা মা-দেখা দে, বাবা বুঝিয়েছিল। পার্থ একমনে জানলা মুছছিল, কিন্তু নিরপম যখন বলল যে সাইবাবা ও এ্যান্ড্রোজেনাস, তখন ন্যাকরা ট্যাকরা ছুড়ে ফেলে সাংঘাতিক শব্দে কাশতে শুরু করল। আমি সাইবাবার উদোম গায়ের ছবি দেখিনি, তবে কিছুদিন আগে গরমের দুপুরে, কলেজের বন্ধু সন্দীপনের সাথে বিয়ার খেয়েছিলাম। সন্দীপন আজকালসন্ন্যাসী হয়েছে, গরমের চোটে বেচারা খালি গায়ে বসেছিল। ছবিটা চোখে ভাসল। না, সন্দীপন এ্যান্ড্রোজেনাস নয়। নিরুপম ঠিক বলেনি, সব সন্ন্যাসীএ্যান্ড্রোজেনাস হয় না।
    আম্মার ব্যক্তিগত ধারনা, সমস্ত বড় মাপের লিডারদের মধ্যে কিছু মাতৃসুলভ গুণ থাকে। বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ না পেলেও চিন্তায় এবং মননশীলতায় প্রকাশ পায়। পথ দেখানো ছাড়াও লিডারের একটা বড় কাজ হল সবাই কে ধরে রাখা, মানিয়ে নিয়ে একসাথে চলা। এই কাজে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা অনেক পটু অনেক বেশী সহনশীল।
    -তা হ’লে এটাই তোর গল্পের বিষয় বস্তু, being adrogenous?– একটু পাতি নয়?
    -গল্প নয়, উপন্যাস। উপন্যাসের কি কোন নির্দিষ্ট বিষয় থাকে?
    -তা হয়ত থাকে না, কিন্তু একটা সেন্ট্রাল থিম্‌? মূল দর্শন?
    -আমার উপন্যাসের থিম হ’ল ভক্তি।
    -ভক্তিতে মুক্তি?
    -মুক্তি কি না জানিনা, তবে ভক্তির একটা বিশেষ পর্যায়ে তার সাথে যৌনতা মিশে যায়।
    ফ্ল্যাশ ব্যাক … রামকৃষ্ণের ছবি … দাদুর অর্ধনিমীলিত চোখে আবিষ্ট চেয়ে থাকা … ধূপের গন্ধ … মাদে-খাদে … কাট টু আমার স্বগক্তিঃ যৌনতা?
    -‘হয় হয় জানতি পারোনা’। নিরুপম বলল।তাড়াহুড়ো নেই আমি ভাবলাম। শান্তিনিকেতনের শান্ত অবসরে বিশদে বুঝে নেওয়া যাবে। আরো খানিক্ষন বাদে আড্ডা ভেঙ্গে গেল। ঠিক করলাম হেটে হেটেই কালিঘাটে ফিরব। তবে বড় রাস্তা নয়, অলি গলি দিয়ে।
    পার্থদের পাশের গলিতেই সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি ‘সুধর্ম’। Wikipediaবাড়িটাকে বলেছে architectural marvel. সত্যিই সম্ভ্রম আদায় করা স্থাপত্য। ইদানিং কিছুটা জুরে fabindia র দোকানপাট। মৃদু দৃশ্য দূষণ। অল্প কিছুটা হাটবার পর আবিষ্কার করলাম, এই অঞ্চলে গলি বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। সমস্ত গলিই রাস্তায় উত্তীর্ন হয়েছে। সময় থেমে থাকেনা, বর্তমান কে ধরবার আগেই সে বদলে যায়, তবু কলকাতা বললে একটা বিশেষ সময়ের ছবিই চোখে ভাসে। কোন সময়? যে সময় এই শহর আমার প্রথম সবকিছু জেনেছে, সেই সময়।            পন্ডিতিয়ার সুধীরদার থেকে সাইকেল ভাড়া করে এই সব গলিতে চালানো শিখতাম। পেছনে গাড়ী হর্ন দিলে হাত কাঁপত ঠকঠক করে। ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের কাছে কোন এক নিরিবিলি জায়গায় ‘বড়ি’ অলোক পোড্রমের ঠেক চিনিয়েছিল। লেক কালিবাড়ি ভেঙ্গে পেল্লায় মন্দির হচ্ছে। এতদিনে আঞ্চলিক কৌলীন্যের উপযোগী বাসস্থান পেলে মা গো – এবার দেখা দিও। রাদুবাবুর দোকান ঠিক তেমনি যেমন ছিল তিন দশক আগে, মুক্তাঙ্গন ও ঠিকে আছে। দক্ষিন কলকাতার এই কিছুটা অঞ্চল ছাড়া, বাকী কলকাতা আমার কাছে অনাবশ্যক, অর্থহীন। আমার আত্মা এই এক চিলতে জায়গাতেই বাস করে।
    অনেকের আবার কলকেতা ধাতে সয় না। পূর্ববঙ্গ থেকে সদ্য আগত এক অতিথির কথা। আসা ইস্তক যা কিছু দেখে শোনে খালি বলে ‘বাউল’। তা সে ইডেনের ক্রিকেট খেলাই হোক বা ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স। প্রতিবেশী বন্ধুরা হতবাক, অদ্ভূত খাপছাড়া মন্তব্যের মানে ধরতে পারছেনা কেউ। অবশেষে এক ঝানু ভাষাবিদ সূত্র ধরিয়ে দিলেন, বাঙালেরা চাল কে বলে চাউল।                                                            আমিও জীবিকার সূত্রে দেশে বিদেশে অনেক বিখ্যাত শহরের বাসিন্দা হয়েছি। সেখানকার বিচিত্র সম্ভার দেখে বিস্মিত হয়েছি, প্রলুব্ধ হয়েছি, কিন্তু ভালবাসতে পারিনি। একান্ত অবসরে, হোটেলের বন্ধ ঘরে, বিয়ারে চুমুক দিয়ে বারে বার ফিরে গেছি কাকুলিয়ার গলিতে আর মনে মনে চীৎকার করে বলেছি, বাউল! বাউল!
    শান্তিনিকেতনের কাছেই বাউলদের গ্রাম। পার্থর সাথে জনাকয় বাউলের খুব বন্ধুত্ব। সেখানেই যাবো off stageবাউল দেখতে। তাদের ঘর গেরস্থালীর ঘ্রান নিতে। আবরণ আভরণের আড়ম্বর ঘুচিয়ে মানুষকে মানুষের মত করে চিনতে। এই সব কথা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলেছিলাম নিরুপমকে, তবু নিরুপম টোপ গিলল না।দারুন কবিতা লিখত নিরুপম আর কলেজে যখন জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিত, মেয়েরা ভীড় করত শুনতে। সাজিয়ে গুছিয়ে মিষ্টি কথা বলতেও নিরুপমের জুড়ি ছিল না। আদর করে অনেকে বলতো কোকিল। – ঠিক কথা! কোকিল কি  মাছের মত টোপ গেলে?                                          মাত্র পয়ত্রিশ মিনিট হেটেই কালীঘাট পৌঁছে গেলাম। ট্যাক্সি নিলেও একই সময় লাগত তার উপর পঞ্চাশ টাকা ভাড়া।
    -হ্যা, নিরুপম কোকিল সেই আদ্যিকাল থেকেই। বাউলের সাথে কোকিলের মিল এই যে, কেউই প্রথাগত সংসারী নয়, কিন্তু একতারাতে কোকিল বাঁধতে পারবে না। সুর তাল লয় কিচ্ছু মিলবে না। বাউল মেশায় মাটির সাথে প্রান আর কোকিল জাগায় প্রানের মধ্যে গান। সেই গান ছড়িয়ে যায় দূর থেকে দূরান্তরে দেশ থেকে দেশান্তরে। রবীন্দ্রনাথ কি ছিলেন, বাউল না কোকিল? রাতের খাওয়া সেরে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছিলাম। আলো নিভিয়ে দিতেই জানলার ফাঁক দিয়ে নিম গাছের মাথায় ত্রয়োদশীর চাঁদ অদ্ভূত মায়াজাল বিছালো। চেনা জিনিস ও অচেনা লাগতে শুরু করল।                                                           তবু রূপ্সাকে চিনতে অসুবিধা হ’ল না, কিন্তু ওর সঙ্গের ছেলেটাকে চিনতে পারলাম না। সৌম্য দর্শন, দীর্ঘ দেহী, শান্ত কোমল দৃষ্টি। কখন এলি, রূপ্সাকে জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল, আসব কেন এখানেই তো বরাবর ছিলাম। ছেলেটি বললঃ চিন্তায় থাকি, চেতনায় আসি।রূপ্সা বলল: তোর সুবিধার জন্য 3D প্রজেকশন্‌ করালাম। সত্যি আসা বা চিন্তায় আসা, মগজ তো একই ভাষায় কথা বলে মনের সাথে। দেখেতো আসলে মন। চোখ যন্ত্র মাত্র। ছেলেটি কবিত্ব করে বললঃ অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহিরে। চোখের আলোয় – -আমি ভাবলাম ভারি ডেঁপো তো ছোকরা। কোথা থেকে রূপ্সা জুটিয়েছে এটাকে? নির্ঘাত বাংলা ডিপার্টমেন্ট।রূপ্সা হেসে বললঃ বুঝেছি, এঁকে তুই চিনতে পারছিস না। তোর চেহারায় চেনার অভ্যাস, চেতনায় নয়।                                                         ছেলেটি বললঃ ওনার দোষ নেই। চেহারা থেকে চেতনায় উত্তরণে সময় লাগে। তাছাড়া আমার এই চেহারাটাও বেশী প্রজেক্টেড্‌ নয়। এমন সময় বাইরে থেকে একজন হাঁক দিলঃ তাড়াতাড়ি কর, অটোরিক্সার ব্যাটারিতে বেশীক্ষন 3D করা যাবে না।                                                    রূপসা বললঃ চলি রে! শোন, পার্থকে বেশী মদ খেতে দিবিনা। শান্তিনিকেতনেও আমরা কাছাকাছিই থাকব। সময় মত সঙ্কেত দেব চিনে নিস। অটোওয়ালা হন্তদন্ত হয়ে এসে বললঃ আর কতক্ষণ লাগাবে রূপ্সা? তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল – আরে! চাঁদু না? চিনতে পারছ? আমার চেতনা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। – কুটুদা! কতদিন পর তোমায় দেখলাম কুটুদা, তুমি- -!! যাদবপুরের ক্যান্টিন ম্যানেজার কুটুদা, মিচকে হেসে বললঃ শান্তিনিকেতনে দেখা হবে, চিনে নিও।
    হাতল টেনে অটোতে স্টার্ট দিল কুটুদা। পিছনের সিটে রূপ্সার পাশে ছেলেটা বসেছে, একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে, কি আপদ! এভাবে কি ভদ্রমহিলাদের সাথে বসতে হয়? রূপ্সা হঠাত বললঃ এই কুটুদা, যাবার আগে, চাঁদুকে এনার পপুলার প্রজেকশনটা একবার দেখিয়ে দাওনা, প্লীজ্‌!
    কুটুদা ক্লাচের পাশে একটা সুইচ টিপল আর আস্তে আস্তে ছেলেটার চেহারা বদলাতে লাগল। মুখভর্তি বড়বড় দাড়ি, মাঝখানে সিথি, ঘাড় অবধি চুল! আরে! এ যে রবীন্দ্রনাথ!!
    রবীন্দ্রনাথ বলল;-Bye! শান্তিনিকেতনে দেখা হবে চিনে নিও।
    ওরা চলে গেল। অটোর আওয়াজটা মিলিয়ে যেতেই স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেল। ভোর হ’তে অল্প বাকি। একটা অদ্ভূত আবেশে মজে রইলাম অনেক্ষন।
    ******                  (প্রথম পর্ব শেষ)

    কলকেতায় দিন কয়েক (২য় পর্ব)
    আমি লেখকদের বেশ ভয় পাই। প্রথমে তারা সাধারন মানুষের মতই থাকে, অন্যের কথা টথা শোনে। তারপর গাল গপ্পে আড্ডা যেই জমে ওঠে, শিকার আসে হাতের মুঠোয়, তখন তা্দের রূপ বদলায়। ঝোলা থেকে বের করে পেল্লায় পান্ডুলিপি। কিন্তু ততক্ষণে তুমি অব্লিগেশনে বিকিয়ে গেছ। অন্ততঃ আধ ঘণ্টা ধানাই পানাই না শুনে নিস্তার নেই। ভাগ্য মন্দ হ’লে দেড় দু ঘনটাও চলতে পারে।
    শান্তিনিকেতনের ট্রেনে পার্থর পেট মোটা ব্যাগটা দেখে প্রথম থেকেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তারপরনিরিবিলি কামরায় ও যখন সেটাকে উপর থেকে যত্ন করে নামিয়ে, চেন খুলতে খুলতে সোহাগ মাখা গলায় আমাকে জিজ্ঞেস করল, চা খাবি? ডিম সেদ্ধ? – তখন বিকিয়ে যাবার আগে আমি শেষবারের মত ধাবমান ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্যপট দেখে নিলাম। খসমস আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম ব্যাগ থেকে পান্ডুলিপি বেরচ্ছে। ধপাস করে একগাদা কাগজ আমার কোলের উপর রেখে পার্থ বললঃ আজকের খবরের কাগজ, বাংলা ইংরেজি দুটোই। আমি কৃতজ্ঞতায় স্তব্ধবাক। প্রায় দেবদূতের মতই হাজির হ’ল চা ওয়ালা আর ডিম ওয়ালা। আমি চা খেলাম পার্থ ডিম সেদ্ধ। ব্যাগে পাণ্ডুলিপি নেই, আছে মশারি আর ওল্ডমঙ্ক। ঔঁ শান্তি!!
    কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন যতটা দূরে, খড়গপুরও মোটামুটি ততটাই। তবু কেন জানিনা, শান্তিনিকেতন শুনলেই মনে হয় অনেক দূরের পথ। – ‘লাহাদের থেকে বীরভূমের এই অনুন্নত জায়গাটা মহর্যি খুব সস্তায় কিনেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যখন এখানে আসেন তখন তার বয়স প্রায় চল্লিশ। আসবার বছর দুয়েকের মধ্যেই স্ত্রী বিয়োগ, পর পর দুটো বাচ্চাও মারা যায়’ – ঝমরঝম ট্রেন চলছে, পার্থ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বলছিল। আমি ভাবছিলাম কলকাতা থেকে এতদূরে, শুকনো লাল মাটির দেশে, বিজলি নেই, পরিসেবা নেই, চারদিকে কেবল অনুন্নত সাঁওতালি গ্রাম, খাস কলকাত্তাইয়া বাবু রবীন্দ্রনাথ টিকলো কি করে?
    ‘না টিকে উপায় কি’? পার্থ বলল। ‘রবীন্দ্রনাথের তো কলকাতায় তেমন ঠেক ছিলনা যে, অবনী বাড়ি আছো বলে রাতের বেলা গিয়ে কড়া নাড়বে’?
    -রবীন্দ্রনাথ তেমন ঠেকবাজ টাইপ ছিলও না।
    -ঠেকবাজি শিখবার আগেই তো বাপ বিলেত পাঠিয়ে দিল, ব্যারিস্টারি পড়তে। বছর দুয়েকের বেশী বিলেত সইল না। ব্যাক টু জোড়াসাঁকো। ব্রাহ্ম সমাজের গান লেখা আর টুকটাক সাহিত্য চর্চা, বছর দশেক এই ভাবেই কেটে গেল।
    -পয়সা রোজগারের চাপ ছিল না?
    -সেই জন্যেই তো শিলাইদহে ট্যাক্সোবাবু হয়ে যাওয়া। রবীন্দ্রনাথের জীবনের সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ সময়। এই সময়েই বেশির ভাগ কবিতার বই টই বেরোয়, নাম ডাক হয়। গল্পগুচ্ছের অধিকাংশ গল্পও এই সময়েই লেখা। আরো দশ বছর কেটে গেল।
    -তারপর কলকাতায় না ফিরে, চলে এল শান্তিনিকেতনে?
    -আরে! শান্তিনিকেতন তখন মোস্ট হ্যাপেনিং প্লেস। সুস্থ সংস্কৃতির নেস্টিং গ্রাউন্ড।রবীন্দ্রনাথ স্বদেশ, স্বরাজ নিয়ে লিখছেন, ভবিষ্যত ভারতের জন্য মডেল বিশ্ববিদ্যালয় বানাচ্ছেন – ইচ্ছা থাকলেও অবনীর খোঁজে যেতে পারবেন না। গান্ধী আর নেহেরুর সাংঘাতিক পিয়র প্রেসর রে ভাই, ব্যাপক চাপ।
    পার্থর দৃষ্টিকোন ভাল লাগল আমার। মানুষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথকে দেখা, ঠাকুর হিসাবে নয়। পরিস্থিতির চাপে ভদ্রলোক স্রেফ পঞ্চাশেই টাইপ কাস্টেড গুরুদেব হয়ে গিয়েছিলেন। চাপ কিছুটা কম থাকলে হয়ত তার সৃজনশীল মন আরো কিছু দুর্লভ মনিরত্ন আহরণের ফুরসৎ পেত।
    *              *               *
    শান্তিনিকেতনের ফুলডাঙায় পার্থদের বাড়িখানা খাসা। পূবে, পশ্চিমে, দক্ষিণে তিন দিকে তিনটে বারান্দা। গাছপালা সমেত বাগান। অনেক আলো হাওয়া। বাড়িতে স্থায়ী ভাবে কেউ থাকেনা বলে, উঠনের দখল নিয়েছে কুকুরের দল।
    বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আমগাছের গুড়ি বেয়ে কাঠবিড়ালির চলাফেরা দেখছি। ডালপালা মুকুলে ছেয়ে গেছে। বাতাসে মিষ্টি গন্ধ। দূরে পলাশ গাছটা ফুলে ফুলে লাল। পড়শিদের সবুজ লনে ছড়িয়ে আছে হলুদ রাধাচূড়া। এঁকেবেকে দাঁড়িয়ে খেজুর গাছটার কাঁটা কাঁটা পাতার পিছনে ঝলমলে নীল আকাশ। দুটো শালিক উড়ে এসে লজ্জাবতীর ঝোপে বসল, মনে মনে বললাম – টু ফর জয়! উঠোনের কুকুরটা কখন আমার ঘনিষ্ট হয়েছে খেয়াল করিনি, আমার পায়ের উপর থাবা রেখে আদুরে গলায় বলল ‘উম্‌ম্‌ম’ তারপর তার দিকে তাকাতেই পরম নিশ্চিন্তে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল আমার পায়ের পাশে মাটিতে। দেখতে দেখতে ঝিম লেগে যায়। মনে হয় বৃথা সব লম্ফ ঝম্ফ তর্জন গর্জন, কাজের দায় মাথায় নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখা সে ও এক উদভ্রান্ত জীবন দর্শন। এই যে ধরণীর চেয়ে বসে থাকা, এর মাধুরী বৃদ্ধিই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। কাট এন্ড ফিজ – ক্যাপশন –‘আনন্দধারা’।
    ঠিক এমন সময় হওয়া ফুঁড়ে হাজির হ’ল এক বাউল। কুকুরটা তাকে দেখে আলহাদে আটখানা। ল্যাজ নেরে লুটোপুটি খেতে লাগল। লোকটার ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, মুখময় কাঁচা পাকা দাড়ি। ‘জয় নিত্যানন্দ’ বলে হাত জড়ো করল সে। আমি ইশারায় ভেতরে আসতে বললাম। সে বললঃ ভেতরেই যদি ঢুকব, তবে বেরোইলাম কেনে? এই বলে বসল গিয়ে বকুল গাছটার তলায়। গুবগুবিটা মাটিতে রেখে, দু হাত উপরে তুলে আবার বলল -‘জয় নিত্যানন্দ’! সঙ্গে সঙ্গে শালিক দুটো উড়ে গিয়ে বসল তার কাঁধে। নাম না জানা আরো কত পাখি চারদিক থেকে এসে বসল তার মাথায়, কোলে পিঠে, খেলা করতে লাগল তার সারা শরীর জুড়ে। পাখি বড় স্পর্শকাতর প্রানী, গোটা আসমান তাদের ঘর, দিগন্ত বিস্তৃত তাদের দৃষ্টির সীমানা। মনের মধ্যে সামান্য কলুষ থাকলেও টের পায়, কাছে আসে না।
    -নে একটু চা খেয়ে নে, গায়ের ব্যাথা মরবে। বড়লোক মানুষ তোরা, ট্রেনে চড়বার অভ্যেস নেই। পার্থর কথায় তন্দ্রাটা কেটে গেল। পায়ের কাছে কুকুরটা তখনও অঘোরে ঘুমাচ্ছে। অনেক মেহনৎ করে লেবু চা বানিয়ে এনেছে পার্থ। ‘বড়লোকের’ খোঁচাটা গায়ে না মেখে বললামঃ রবীন্দ্রনাথের এক আধপাগল দাদা ছিল জানিস, নাম সোমেন্দ্রনাথ। ঠিক এক বছরের বড়। স্নায়ুর ব্যামো ছিল বলে বিয়ে থা হয়নি। বিশেষ কিছু করেননি জীবনে, বিখ্যাতও হননি। কিন্তু তিনি ছিলেন নিখাদ ভালোমানুষ, তার গায়ে পাখি বসত।
    -‘পাখি?’ পার্থ ভুরু কুঁচকে তাকাল আমার দিকে, তারপর চোখ বড় বড় করে বললঃ এমন একটা দাদা পেলে, আমি শালা চুটিয়ে ব্যাবসা করতাম। বার্ড ওয়াচারদের আর বনে বাদারে কষ্ট করে পাখি খুঁজতে যেতে হতনা। বাড়ির বাগানে বা ছাদে দাদাকে বসিয়ে দিতাম আর ইচ্ছে মত পাখি দেখিয়ে নিতাম, পাখি প্রতি দশ পয়সা প্রতি মিনিট আমার কমিশন। হেভি না? নিজের আইডিয়ার অভিনবত্বে পার্থ নিজেই এতই চমৎকৃত হ’ল যে হাসি, কাশি, উল্লাস সমস্ত কিছু একসঙ্গে ওকে পেয়ে বসল আর সেই আবেগের ঠেলা সামলাতে না পেরে হাতের কাপ থেকে গরম চা ছলকে পড়ল পায়ের কাছে ঘুমিয়ে থাকা কুকুরের নাকের উপরে। ব্যাস কুকুরটা আচমকা ছ্যাকা খেয়ে ভীষণ জোরে ডাকতে শুরু করল, সেই শুনে অন্য কুকুরেরা ভৌ ভৌ করে দৌড়ে এল। ব্যাপক হট্টগোলে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।
    দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে এদিক সেদিক ঘুরে দেখলাম। পরশু দোল। শান্তিনিকেতন জুড়ে সাজো সাজো রব। জাপানি আর আফ্রিকান পর্যটকদের ছড়াছড়ি। রামকিঙকরের সাঁওতাল পরিবার, কলাভবন, সিংহসদন এই সব দেখে, ক্যানালের পার ধরে শালবন ছাড়িয়ে আমরা পৌঁছলাম শ্রীনিকেতনে। সেখানে এক অবাক চেহারার সাঁওতালি মহিলা দেখলাম, সে কথা পরে বলব।
    *               *           *
    সন্ধ্যেবেলা মদ্যপান হবে আগেই ঠিক ছিল। কিন্তু শ্রীনিকেতনে যেতে আসতেই দু ঘণ্টা চলে গেল, তাই যখন বোতল খুলে বসলাম তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত্তির। একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে বাতাস মোলায়েম হয়েছে। কাল গোলপার্কের ঠেকে চারপাশে ছিল তুমুল হৈ চৈ আর আজ চারপাশে অদ্ভূত নিস্তব্ধতা। পশ্চিমের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসেছি, সামনে ছোট টেবিলে সাজানো মদের বোতল, কাঁচের গেলাস। চাঁদের আলো ছাড়া অন্য আলো নেই। পার্থ গান ধরতে যাচ্ছিল, আমি জিজ্ঞেস করলাম – সাঁওতালি মেয়েরা কি বয়স হ’লে মারোয়াড়ীদের মত মোটা হয়ে যায়?   কায়দা করে মাথা ঝাঁকিয়ে পার্থ বলল-Nope!শুকিয়ে চিমসে হয়ে যায়। আমি বললাম, আজ শ্রীনিকেতনে একজন বয়স্ক সাঁওতালি মহিলা দেখলাম। খুব মোটা আর নিগ্রোদের মত কালো। পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বয়স হবে। শাড়ী পরেছিল সঙ্গে বুটজুতো! পার্থ বলল – হয়ত আফ্রিকান।
    -একটা ছবি ছিল টাইটেল কৃষ্ণকলি, ভদ্রমহিলা সেটার সামনে দাড়িয়ে নিজের মনে বললেন, ‘কালো, তা সে যতই কালো হোক, actually inferior লোক’। পাশে ছিলাম, স্পষ্ট শুনতে পেলাম।
    -হুম্‌ম্‌ লাইন টা চেনা চেনা লাগছে। বোধহয় শঙ্করলাল ভটচার্জ, আনন্দবাজার।
    -হ’তে পারে, কিন্তু ভদ্রমহিলা এ্যাকচুয়ালি আর ইনফিরিয়র শব্দ দুটো বলল পাক্কা আমেরিকান এ্যাক্সেন্টে। আচ্ছা, শাড়ীর সঙ্গে কেউ কি জুতো পরে?
    আমার কথা শেষ হবার আগেই পার্থ গান ধরল। ভালোবাসার গান। হয়ত ওর নিজেরই লেখা। প্রচন্ড চড়া স্কেলে চীৎকার করে গাইছে। চাঁদনী রাত, প্রশান্ত পরিবেশে, গানের সাথে ওল্ড মঙ্ক আর কচ্ছপ ধূপের ধোয়া মিলেমিশে বিচিত্র কক্‌টেল।পার্থ হাপাচ্ছিল, গান শেষ করে একটু দম নিয়ে বলল, রূপ্সার প্রিয় গান। একান্ত আপন মুহূর্তে শোনাতে ফরমায়েশ করত, বলত আস্তে গাইবে।
    -তাহলে এত চেঁচালি কেন?
    -সব সময় কি ওর কথা মত চলতে হবে? তাছাড়া মনে হ’ল একটু জোরে গাইলে, হয়ত অনেক দূরে থাকলেও ও ঠিক শুনতে পাবে। দ্যাখ্‌, আমার গান আমি যেমন ইচ্ছে গাইব। কার বাবার কি?
    -ওস্তাদের লেশা হয়েছে!
    পার্থ কিছু বলবার আগেই আমি বললাম, জানি তোর নেশা হয়নি, কিন্তু এইরকম বলতে হয়। তাহলে কেস জমে যায়। এমন অনেক কথা আছে যাদের বিশেষ কোন মানে নেই, কিন্তু বললেই কেস জমে যায়।
    -যেমন?
    -যেমন –‘কি কাকু ঘিনঘিন কাকু’! এর কোন মানে নেই কিন্তু একটা ঝংকার আছে। একটা ইয়ে, মানে কেস আছে।
    -বুঝেছি, যেমন ‘হিং টিং ছট’ অথবা ‘পাগলা তাড়ি খা’।
    -এগজ্যাক্টলি! একেবারে ঠিক ধরেছিস, সাবাস!
    পার্থ খুশি হয়ে আমার দিকে মদের বোতল এগিয়ে দিল। আমি পেগ বানাতে বানাতে বললাম, এবার তোমার ভক্তি আর যৌনতার ব্যাপারটা বোঝাও তো গুরু।
    -‘দ্যাখ’ বলে পার্থ অনেকক্ষণ pauseদিল, তারপর বলল;- রূপ্সা রেড ওয়াইন খেতে খুব ভালবাসত। আমাকে দিত না। কত চাইতাম তবু দিত না, আবার চাইতাম তবুও দিত না, – তুই কি খাচ্ছিস? রাম না ওয়াইন?
    -মিলিয়ে খাচ্ছি, ওয়াইনের মধ্যে রাম।Rum will chase the wine.
    -বাঃ তবে তো ধরেই ফেলেছিস। ভক্তি হোক বা যৌনতা, মেলানোটাই আসল। চেজ্‌ করে যাও, একবার ধরতে পারলে ভক্ত ভগবান একাকার। আসল মিলনটা হ’ল বুদ্ধির সাথে বুদ্ধির, মনের সাথে মনের, আত্মার সাথে আত্মার। Genitals are mere instruments.যৌনতা ব্যাপারটা সাময়িক, আজ আছে কাল নেই, কিন্তু মিলনের ইচ্ছাটা eternal.রবি ঠাকুরের গানে দেখিসনা, প্রেম আর পূজা কেমন মিলে যায় – কি কাকু ঘিনঘিন কাকু!
    -জমিয়ে দিয়েছিস। আমার লেশা হচ্ছে!
    -প্রেম ব্যাপারটাই জমাটি রে পাগলা! নবদ্বীপে এসে নিত্যানন্দের ইন্টিউশন হ’ল এদ্দিনে মনের মানুষের দেখা পাবে। অজ্ঞাত কারনে নিমাই ও উঠল চঞ্চল হয়ে। তিনদিন ধরে নিত্যানন্দ লুকিয়ে লুকিয়ে নিমাইকে দেখল, কিন্তু নিজে দেখা দিল না। নিমাই এর ব্যাকুলতা গেল বেড়ে, আকর্ষণ হ’ল তীব্র। অবশেষে যখন মিলন হ’ল তখন আলিঙ্গনে বাতাস হ’ল মধুময়, চোখের জলে মাটি গেল ভিজে।
    -উঁহু গে-ইস্‌ লাগছে মাইরি। আমার গে এলার্জি আছে। দে আর একটু মাল ঢাল।
    -মিলনই যোগায় নির্মানের শক্তি। চৈতন্য আর নিত্যানন্দের মিলন না হ’লে বৈষ্ণবের নির্মান হ’ত না। আমরা যে বিয়ে করে ঘর বাঁধি, সেখানেও প্রেমের সাথে আসে নির্মান। গড়ে ওঠে একটা আস্ত সংসার। প্রেম একদিন চলে গেলেও, নির্মানটা থেকে যায়।
    -ব্যাপক! কি নামাচ্ছ, boss!
    -আমার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে একটা মেয়ে। নানা ভাবে স্ট্রাগল করছে। প্রত্যেক স্ট্রাগেলে তার ভ্যালু বদলাচ্ছে, evolvedহচ্ছে নতুন মানবীতে। নির্মান!
    -আচ্ছা boss, জুতো পরা ঐ সাঁওতালি – –
    -আবে! সারা শান্তিনিকেতন ঘুরে আর কিছু দেখার জিনিস পেলিনা? কালো মোটা সাঁওতালি আর তার বুটজুতো! অদ্ভূত fetish মাইরি। গল্পটা শোন, – মেয়েটা অনেকগুলো রিলেশনশিপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে একদিন রিয়েলাইজ করল, মিলন থাকলে বিচ্ছেদও অনিবার্য। তবু এক বিচ্ছেদহীন মিলনের খোঁজ তাকে তোলপাড় করে চলল, অবশেষে একদিন সন্ধান পেল ভক্তির। কি রে শুনছিস? এই চাঁদু?
    -হুম্‌ম্‌ম
    -ঘুমিয়ে পরলি নাকি? দাঁড়া তোকে ঠিকমত শোনাই।
    এই বলে পার্থ উঠে গিয়ে সেই পেট মোটা ব্যাগটা নিয়ে এল। ব্যাগ দেখেই আমার ধূমকি কেটে গেল। বললাম, – কাল সকালে শুনলে চলবে না?
    -কি?
    -তোর উপন্যাস।
    -আবে, উপন্যাস কে শোনাবে, তোর ঘুম পেয়েছে তাই মশারি নিয়ে এলাম। টানাতে পারবি?
    -এ্যাঁ, মশারি, ইয়েস ইয়েস, নো প্রবলেম।
    খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে, আরো কিছু মুল্যবান বানী দিয়ে, গুড নাইট বলে পার্থ পাশের ঘরে শুতে চলে গেল। ব্যাগের থেকে মশারিটা বের করলাম। নতুন জায়গায় অচেনা দেওয়ালে মশারি টানানো রিতিমত চ্যালেঞ্জ, কিন্তু টানিয়ে ফেললাম। মদ খাওয়ার অভ্যেস নেই, অনেকটা খেয়ে ফেলেছি আজ। পার্থ বলল ‘শোয়াই’ আর আমি শুনলাম ‘শোনাই’! রাম চেজ্‌ করছে ওয়াইনকে সব মিলে মিশে একাকার! আহা কি সুন্দর চাঁদনী রাত, তবু রাতে কোকিল গায় না। নিরুপম রাতেও বকবক কড়ে, প্রফেসর তো, একদিন বক হয়ে দিগন্তে উড়ে যাবে। উড়ে যাবি যা কিন্তু দূরে যাস না। তবে রাতেও কোকিল গাইবে, খাঁচার মধ্যে পুরে দিলে রাতেও কোকিল গাইবে। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গাইবে।
    -সত্যি, কি জোরে চেঁচাল পার্থ। -রেড ওয়াইনে সিপ্‌ দিয়ে রূপ্সা বলল।
    -তোর জন্যই তো চেঁচাল।
    -মায়াদি সারাক্ষন কানে আঙুল দিয়ে রইলেন, আমি বললাম পরের বার আস্তে গাইবে।
    -মায়া সেন?
    -না রে, মায়া এঞ্জেলিউ। তোর দেখা কালোপানা জুতোপরা সাওতালি। – নাম শুনিস নি মনে হচ্ছে?
    -পার্থর কায়দায় মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম –nope!
    -বই পড়া তো ছেড়েছিস, খবরের কাগজও পড়িস না? Maya Angelouনামটা শুনিস নি? কবি গৌতম দত্ত তোকে disown করবে। নাঃ তোর ওয়াইন খাব না, থুঃ থুঃ থুঃ।
    ধমক খেয়ে নেশাটা অল্প কাটল। নামটা চেনা চেনা লাগছে, কোথায় যেন দেখেছি বা শুনেছি – ইয়েস! আমার মেয়ের বইয়ের তাকে। ‘I know why the caged bird sings ’আকাশি নীল মলাটে সাদা কালিতে এঁকেবেঁকে লেখা বই এর নাম। উপরে কালো বোল্ড অক্ষরে MAYA ANGELOU তলায় ঝুঁটি বাঁধা নিগ্রো বালিকার মুখের সিলুয়েট। আমেরিকান নিগ্রো লেখিকা, ঠিক সেই বয়স্ক সাঁওতালি।
    আমি বললাম, দিদি বলছিস কিরে, তোর দিদিমার বয়সি। নিদেন মা তো বটেই।
    -সময় আপেক্ষিক, চেতনায় দেখতে শেখ। নিরুপম কে বলিস তো মায়াদির কয়েকটা কবিতা বাংলায় অনুবাদ করতে।
    -ভদ্রমহিলা কবিতা লিখেছেন বুঝি? খাঁচার পাখির গান কি কবিতা?
    -একটু কষ্ট করে মেয়ের থেকে বইটা নিয়ে পড়। কলকাতার গলি ঘুপচি থেকে বেড়িয়ে দুনিয়াটকে দেখতে শেখ। চললাম, একটু ওয়াইন নিয়ে গেলাম, মায়দির জন্য।
    রূপ্সা চলে গেল। এই যা্ঃ, আসল কথাটাই জানা হ’ল না, মায়াদি বুট জুতো পরে এসেছিল কেন?
    -অনেকটা যাবে বলে আমার পা দুটো ধার চাইল।– গেলাসে রাম ঢেলে কুটুদা বললঃ চীয়র্স!-তা আমি তখন অটোটা গ্যারেজে ঢুকিয়ে সবে ঘরের দরজায় – বললাম, নিয়ে যান। তাড়াতাড়িতে জুতোটা খুলতে ভুলে গেছিলাম। তুমি ঠিক দেখেছ মাইরি এ্যাঁ – চীয়র্স!
    যাক এবার নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব। জুতোর ব্যপারটা তখন থেকে মনের মধ্যে খোঁচা দিচ্ছিল। গুড নাইট কুটুদা।
    *             *            *
    একটি মনোরম প্রভাত। নাটকের সূত্রধরের মত বললে – মজুমদার নিবাস, একটি মনোরম রাত্রির পর একটি মনোরম প্রভাত। পয়ত্রিশ বছর আগে আমরা দল বেঁধে কলেজে স্পার্টাকুস নাটক করেছিলাম। বাদল সরকারের স্পার্টাকুস। আমাদের ছাত্র জীবনের খুব গুরুত্ব পূর্ণ ঘটনা। নাটকের ওয়ার্কশপে শেখা শরীরী ভাষার ব্যবহার আমূলে বদলে দিয়েছিল দেখার চোখ আর চিন্তা ভাবনা। এরপরে স্পার্টাকুসের আদলে কিছু নাটকীয় সংলাপ চেষ্টা করেও চিন্তা থেকে বাদ দেওয়া গেল না।
    -আমি পার্থর সঙ্গে একমত, একটা কোকিলের বদলে চারটে বাউলকে স্টেজে তুললে অনেক বেশি গান পাওয়া যায়।
    -তাছাড়া কোকিলদের এমন কোন সাম্রাজ্য নেই যেখান থেকে অনেক কোকিল একসঙ্গে ধরে এনে বাউল মেলার মত কোকিল মেলা করা যায়।
    -আচ্ছা, বাউল ছাড়া কি অন্য কোন কথা নেই আমাদের?
    আরে বাবা, এসে থেকে অন্য কথাই তো হচ্ছে। শুধুই বাওয়াল হচ্ছে, বাউল হচ্ছে না। বলি ও পার্থদা বাউল দেখতে যাবার কিছু বন্দবস্ত হ’ল?
    -হবে হবে। বিশ্বনাথ দা ফোন ধরছে না। এই দ্যাখ্‌ কাল থেকে পনেরো বার কল করেছি। নো রেসপন্স।
    -বিশ্বনাথ ছাড়া কি আর বাউল নেই?
    -আছে, কিন্তু তারা কেউ বিশ্বনাথের মত নয়।
    -ওসব জানি না, আমাকে বাউল দেখাতে নিয়ে চলো। বিশ্বনাথ গাভাস্কার না হোক, যে কোন বাউল হলেই চলবে।
    সকালবেলা রোডসাইড দোকানে কচুরি জিলিপি খেয়ে আমরা প্রান্তিক স্টেশনের কাছে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এমন সময়ে পার্থর মোবাইল হঠাত বেজে উঠল। স্ক্রীনে দেখাচ্ছে মন্টু কলিং। মন্টু আমাদের ড্রাইভার। – ‘নির্ঘাত ঝুলিয়েছে শালা’ এই বলে পার্থ ফোন নিয়ে রাস্তার একধারে সরে গিয়ে কথা বলতে থাকল। আমি একটু এগিয়ে গিয়ে মানুষজন, দোকানপাটদেখতে লাগলাম। কাল দোল, টুরিস্ট দের ভীড় উপচে পড়ছে। খানিক্ষনের মধ্যেই পার্থ কাশতে কাশতে হাজির।                                                      গুরুতর কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু পার্থ কাশি থামিয়ে পুরো কথাটা বলতেই পারছে না। অবশেষে বুঝলাম মন্টু গাড়ী নিয়ে অন্য কোথাও ভাড়া খাটতে গেছে আর বিশ্বনাথ নো পাত্তা। পার্থ রাগের চোটে কাঁপতে কাঁপতে বলল,শুধু নিরুপমই নয় কোন শালাই কথা রাখে না। আমি বললাম, চিন্তা নেই, অন্য কোন বাউলের বাড়ি নিয়ে চল। মন্টু নেই তো বয়েই গেল, রিকশা নিয়ে যাবো আর যাবার পথে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে কলকাতা ফিরবার গাড়ি বায়না করে দেবো। তবু পার্থর রাগ পড়লনা, পড়ল বাড়ি ফিরে আধ বোতল বিয়ার খেয়ে। আমিও আদ্দেক খেলাম, তারপর রিকশা চেপে চললাম বাউল গ্রাম।
    অনেকক্ষণ হ’ল চলেছি। বোলপুর কখন ছাড়িয়ে গেছে তবু ঘিঞ্জি বসতি শেষ হয় না। মনের মধ্যে উঁকি দেয় গ্রাম ছাড়া রাঙা মাটির পথ। স্টেজ আর নেপথ্য ঠিক মত তৈরী হ’লে নাটক আপনি আপ সৃষ্ট হয়। সেই কোন ছেলেবেলায় ইস্কুলে নাটক করেছিলাম ‘অমল ও দই ওয়ালা’ অমল দই ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করছে তাদের গ্রামের কথা, তারপর নিজের কল্পনা উজার করে দিচ্ছে – খুব বড় বড় গাছের তলায় সেই গ্রাম, লাল রঙের রাস্তার ধারে। পাহারের গায়ে গরু চড়ছে। মেয়েরা নদী থেকে কলসি করে জল তুলে নিয়ে যাচ্ছে। দই ওয়ালা অবাক হয়ে বলছে,– ঠিক বলেছ বাবা! তুমি পাহাড় তলায় গিয়েছ কোনদিন?অমলের সাথে একাত্ম হয়ে যেতাম, বলতাম – কখনোযাইনি দইওয়ালা। এই কাকুলিয়ার গলির বাইরে যেতেই পারিনা আমি, কিন্তু কল্পনায় যে কতবার গেছি তার ইয়ত্তা নেই। ঘর বন্দী অমলকে বাউল এসে শুনিয়ে যায় গান। সে গানে মিশে যায় পাঁচমুড়া পাহাড়, শ্যামলী নদী, একাকার হয়ে যায় নাদের আলির তিন প্রহরের বিল, যেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে।
    কোথায় এলাম আমরা? একেবারে ঠিক বলেছে পার্থ, শুধু নিরুপম, মন্টু আর বিশ্বনাথ নয়, কোন শালাই কথা রাখে না।
    নইলে বাউলদের গ্রামের নাম কখনও শুড়িখানা হয়? সেখানকার ঘিঞ্জি বাড়িঘর যেন হাওড়া পঞ্চানন তলার গলি। একফালি সরু রাস্তায় অটোরিকশা-মোষ আর মোটর গাড়ির গুঁতোগুঁতি। তার মধ্যেই মোড়ে মোড়ে জটলা করে ক্যারাম খেলছে ছেলের দল। মহিলারা পুকুর পাড়ে গলা ফুলিয়ে ঝগড়া করছে। আমরা পথ হারালাম বটে কিন্তু সেই সুবাদে প্রায় গোটা গ্রামটাই ঘুড়ে দেখা হয়ে গেল। অবশেষে যে ভদ্রলোক বাইকে চেপে এসে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন তার নাম উত্তম। বছর তিরিশেক বয়স, পার্থর সঙ্গে খুব খাতির। এরা বংশানুক্রমিক বাউল। উত্তমের বাবা দেবদাস বাউল সাদরে নিয়ে গেলেন তাদের বাড়ীর লাগোয়া আটচালায়, বাউলদের স্টুডিয়ো।এক সঙ্গে তিন জেনারেশন বাউল দেখলাম, বাবা-ছেলে-নাতি। তারপর গপ্প হ’ল, গান হ’ল বাউল পলিটিক্স হ’ল। উঁহু সেসব কথা এখানে নয়। বাউল বৃত্তান্ত শোনাতে হ’বে কোকিল নিরুপমকে, তৃতীয় পর্বে।

    পরিশিষ্ট–
    টা টা শান্তিনিকেতন। পার্থর থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চরলাম। এখন দুপুর দুটো। সন্ধ্যে নামার আগেই কলকাতা পৌঁছে যাব। শান্তিনিকেতন ছাড়িয়ে গাড়ি হাইওয়ে ধরল। দু পাশে ধূ ধূ সবুজ ক্ষেত, দিগন্তে নীল আকাশ। মোবাইল ফোনে ছবি তুললাম। গত দু দিনে আরো অনেক ছবি তুলেছি, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলাম। ঘর ছাড়বার যেমন নেশা, ঘরে ফিরবারও তেমনি তাগিদ। চেনা ডেরায় পুরানো অভ্যাসে ফিরে যাবার টান।
    কি চায় মানুষ? অজানা পথে চলার রোমাঞ্চ, না নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়? নিরাপত্তা আপনি আসেনা, তাকে অর্জন করতে হয়। সেই জন্যই পথ চলা। এই ভাবে চলতে চলতে জীবন একদিন ফুরিয়ে যায় তবু পথ ফুরায় না।‘I know why the caged bird sings’খাঁচার পাখি গারদের ভেতর নিশ্চিন্ত নিরাপদ, তবু দাসত্বের যন্ত্রণা বিদ্ধ করে তাকে। মুক্তি চাই – স্বাধীনতা! নিজের ইচ্ছায় বেঁচে থাকা।
    স্পার্টাকুস নাটকে ক্রীতদাসেরা স্বাধীনতা চাইছে শুনে রোমান সেনেট্‌র অবাক হয়ে জানতে চানঃ কিসের স্বাধীনতা! উপোষ করে মরবার স্বাধীনতা? লাঙল টেনে গলায় রক্ত উঠাবার স্বাধীনতা? ক্রীতদাসেরা ঘিরে ধরে স্পার্টাকুসকে, তারা জানতে চায় –
    -স্পার্টাকুস মানুষ জন্মায় কেন বলতে পারো?
    -মানুষ জন্মায় বাঁচতে। বাঁচে যতদিন না মরে।
    -কিন্তু আমাদের বাঁচতে হয় ইচ্ছেগুলোকে হত্যা করে!
    -তবু বাঁচতে হয়।
    -বাঁচার কি অর্থ স্পার্টাকুস?
    -তা বলতে পারবনা। আমি বলতে পারি যুদ্ধের কথা, রক্তের কথা, হিংসা, ভালোবাসা, যৌনতা, বঞ্চনা, ব্যভিচার, মৃত্যুর কথা।
    -এ সবই তো জীবনের উপাদান, এর টানাপড়েনেই তো বেঁচে থাকা। কিন্তু জীবন কি শুধু বঞ্চনা আর ভালবাসা, লাভ আর লোকসানের হিসাব? কেন বেঁচে থাকা স্পার্টাকুস?
    -এর উত্তর আমার জানা নেই। এর উত্তর পেতে তোমাদের যেতে হবে কবির কাছে, বাউলের কাছে অথবা নিরুপমের কাছে। যারা প্রাজ্ঞতর, তাঁরা তাঁদের দেখা দিয়ে কিভাবে এসব দেখেছেন বুঝেছেন তা বুঝতে। আমি শুধু বাঁচার শর্ত বলতে পারি অর্থ নয়।
    এইখানে নাট্যকার মঞ্চে ছুটে আসবে, না ধোঁয়ার মধ্য থেকে নিরুপম আবির্ভুত হবে, কোনটা যথাযথ সেই চিন্তাটা থিতু হবার আগেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ড্রাইভারের কথায়ঃ শক্তিগড়ে থামব স্যর, ল্যাংচা নেবেন? বিরক্ত হয়ে বললাম – না কোথাও থামবেনা, সিঁধে কলকাতা। তারপর আবার পরলাম ঘুমিয়ে। ঘুম ভাঙল ঠিক কলকাতায় ঢুকবার আগে।
    চোখ মেললুম আকাশে, জ্বলে উঠল আলো পূবে পশ্চিমে – বিদ্যাসাগর সেতুর দুই প্রান্তে। ফিরে এলাম কাকুলিয়ার নিরাপদ নিশ্চিন্ত চেনা আশ্রয়ে। সামনে বস্তির মাঠে বুড়ির ঘর পুড়ছে, পূব আকাশে তামাটে রঙের চতুর্দশীর চাঁদ। কাল দোল পূর্নিমা। বসন্ত এসে গেছে।

    SHARE

    LEAVE A REPLY