মাঝরাতে বন পথে বেহদিশ মালগাড়ি চেপে

    0
    190
    অবন বসু
    জন্ম ১৯৫৪ সাল। দীর্ঘদিন আনন্দ প্রকাশনায় কর্মরত। গল্প ও উপন্যাস লেখেন। প্রকাশিত ১২টি বই। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস "পাতাবাহার"।

    আজকাল আর মালগাড়ি চোখে পড়েনা আমার। সারি সারি লাল ওয়াগন একটার পিছনে একটা পিঁপড়ের মতো মাঠঘাট ফেলে যাচ্ছে নিরলস ভারিক্কি চালে, এই ছবিটাই কোথায় হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, চাঁদনি রাতের জঙ্গল দেখবে বলে ওই পিঁপড়ের পিঠে চেপেই চারশো মাইল পাড়ি দিয়েছিল যে-লোকটা, সে এই আমিই তো?

    আসলে জীবন বোধহয় এমনই। যখন যে-রকম। নইলে সারান্ডার অরণ্যের হাড় হিম-করা শীতে কিরিবুরু থেকে কলকাতা ফেরার সব সহজ অঙ্ক ছেড়ে, নোয়ামুন্ডির আগের স্টেশন ডাঙোয়াপোশিতে এক অবাঙালি গার্ড সাহেবের হাতে-পায়ে ধরে—তার ভাঙাচোরা গার্ড-ভ্যানেই চেপে বসা কেন, সেই কোন ’৭৭-এর ডিসেম্বর-শেষে? সে রাতের সময়ও তো ঠায়ঠিক মনে আছে:  অবিকল ৮টা ১৫ বাজে। কিন্তু তারপর?

    ভাষায় ব্যাখ্যাহীন সে কি কোনও ভাসা না কি ওড়া; না কি স্বপ্নের বিভ্রমেই রাতময় ঘোরা—আজ এত কাল পরেও যেন ঠিক আলাদা করতে পারি না। যে-সব ছোট ছোট স্টেশনের পাশে বর্ষার মেঘের মতন মোষ চরে সারা দিন ধরে, আঁকাবাঁকা টিলায়-দেহাতে—তারা দেখি অবিকল ছবির মতন সেই নির্জন গাঢ় জ্যোৎস্নায় সাদা-কালো ঝিরিকাটা এক ভৌতিক প্রান্তর হয়ে শুয়ে আছে! পাথরের গা বেয়ে নামা যে-সব সামান্য লতাঝোপ সারা দিন অভ্রের মতো জ্বলে, তারাও কীআদিম মন্ত্র পেয়ে আলো-আঁধারির ফাঁকে হিলিবিলি সাপের মতন!

    যে-সব জলার মুখ জন্মে দেখিনি কোনও যাত্রীগাড়ি থেকে চোখ মেলে, তাদেরও আয়না ঘেঁষে যেতে যেতে দেখি : ক্যারক্যার শব্দ তুলে রাতজাগা পাখি ছুটে যায়; হঠাৎ একটি মাছ কবেকার সর-জমা জলে, হিমের পর্দা তুলে ফের ডুব দেয়; কখনও একটু দূরে দেহাতের কাঠ-পাতা জ্বালানো তার ধোঁয়ার গন্ধ দিয়ে মানুষেরবসতি জানায়।

    অথচ তখনও জানি না—বাতাসকে যেমন ধরা যায় না; জলকে চিবোনো যায় না কিছুতেই—তেমনই অসম্ভব এক অবর্ণনীয় দৃশ্য অদূরেই আমার অপেক্ষায় আছে। রাত দুটো কি আড়াইটা হবে তখন…দয়াময় গার্ড সাহেবের সেই ভাঙাচোরা এবং অর্ধেকেরও বেশি ছাদহীন কামরার মেঝেতে একটা পেল্লায় কাঠের বাক্সে বসে, তখন আমি দাঁতে দাঁত লেগে ঠকঠক করে কাঁপছি। রাত্রিদৃশ্য ছাপিয়েও এক কালান্তক রেতো ঠান্ডায়।

    হঠাৎই আমাদের সেই গার্ডভ্যান অর্থাৎ গাড়ির শেষ কামরাটা একটা বাঁকের মুখে আসা মাত্রই আমি একেবারে চমকে উঠেছিলাম; এ কী! কারা বসে এত রাতে…বাইরের এমন হিমঝরা খোলা মাঠেঘাটে! কোন একটা অজানা স্টেশনের ভুতুড়ে খানকয় নিঃঝুম একরত্তি কোয়ার্টার পেরোচ্ছে তখন গাড়ি। তারই সামনের হাতায় একফালি বাঁধানো চাতালে দেখি, বহু উঁচু থেকে একটা ফ্যাকাশে সাদাকেবিন লাইটের বৃত্ত পড়েছে গোল হয়ে আর সেই আলোর মধ্যে দেখি…খুব সাদামাটা পোশাকের এক রোগাভোগা পুরুষ আর নারী এ-ওকে জড়িয়ে ধরে, এক আশ্চর্য ছবির মতো বসে আছে তো আছেই!

    বর্ণনাটা পুরোপুরি দেওয়া আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। সব কিছুই এত তাড়াতাড়ি ঘটছিল যে, আমি ঠিক আমার মধ্যে ছিলাম না। শুধু এটুকু মনে আছে, অত আপাতনিরীহ দৃশ্যও ওই রাতে… ওই নিঝুম পরিবেশে আমায় কেমন হতভম্ব উন্মাদ করে দিয়েছিল এক লহমায়! যেন কী এক অচেনা আবেগমাখা তীব্র কোনও দেড়হাতি সুঁচ আমার একেবারে বুকের ভিতরে বিঁধে যাচ্ছিল! তাঁরই ধাক্কায় শালীনতার সবটুকু গোল্লায় দিয়েও কখন ‘এ-ই-ই-ই’ বলে চেঁচিয়েও উঠেছিলাম সেই অন্ধকার গাড়ির দরজা থেকে জিরাফের মতন মুখ বাড়িয়ে! কিন্তু সেই চিত্রার্পিত যুগলের কানেও গেল না সেই শব্দ! আমি পাগলের মতো হাত নাড়ছিলাম… হাত খসে যাওয়ার মতো হল ঠান্ডায়… কিন্তু তারা নিজেদের ওই ময়াল-আলিঙ্গন ছেড়ে কিছুতেই মুখ ফেরাল না! তার পর এক সময় ওই আলোর নীচেই দুটি স্থির বিন্দুর মতো সেই মান্ধাতার আদম ও ইভ ক্রমশ আবছা হয়ে কোথায় হারিয়ে গেল!

    আর আমার জ্যোৎস্না দেখার অবস্থা ছিল না সে-রাতে! কেননা আমি খুব ভেরে গিয়েছিলাম; কেননা আমি বাজ-পড়া মানুষের মতো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম; কেননা আমি একেবারে বিনা কারণেই ক’বার চোখ মুছেছিলাম। আসলে আমি ভেতরে ভেতরে খুব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলাম এটা ভেবেই যে, ওরা অমন বাইরে ছিল কেন; আদিবাসী রমণী নিয়ে এ অঞ্চলের প্রচলিত কেচ্ছার মতো বাজে কিছুও যদি হয়—তা হলেও এই কাকচক্ষু রাত্রির সমস্ত গোপন আড়াল ফেলে ওরা অমন আলোর বৃত্তে বসতে যাবে কেন? কেন, কেন, কেন?আর ওই জ্বরের কাঁথার মতো প্রাণপণে এ-ওকে জড়িয়ে রাখা! যেন হাত ছাড়লেইদুটি ক্ষীণকায় তারার মতোই তারাবিচ্ছিন্ন খসে যাবে আকাশের বহু লক্ষকোটি আলোকবর্ষ দূরের দুই ছায়াপথে—সেই ভয়েতেই লগ্ন তারা শ্বাসপ্রশ্বাসও বন্ধ রেখে—বড়জোর কিছু তপ্ত অশ্রুজলে এ-ওকে ভাসিয়ে! সেই অলৌকিক মায়া ঘেরা আতঙ্ক কি এই পৃথিবীর নয়?

    নাঃ, আজ তিরিশ বছর পরেও এই ধাঁধা আমি মেলাতে পারিনি। মাঝখান থেকে এই মাঝবুড়ো বয়সে এসেও কোনও কাগজে-ক্যালেন্ডারে কি রদ্দিমারা ম্যাগাজিনের কোনও সস্তা ফটোগ্রাফে রেলের পাতের ’পরে দৈবাৎ কোনওলালরঙা যান্ত্রিক লাল-পিঁপড়ের সারি দেখলেই আমার ভিতরে এক বাইশ না কি তেইশের যুবক এসে থমকে দাঁড়ায়— আর আমি স্তম্ভিত কোনও চন্দ্রাহতের মতোই বাক্যহীন দেখি, সেই অলৌকিক ছবিখানা তাকে একই ভাবে নিঃস্ব করে যায়!

    SHARE

    LEAVE A REPLY