পদ্যলেখো–গদ্যলেখো

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    (Sept 07 1934-Oct 23 2012)। জন্ম ফরিদপুর জেলায়। রবীন্দ্র উত্তর বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি, গল্পকার, ও উপন্যাসিক। প্রকাশিত বই ২০০-র বেশী।

    (ভিডিও-কাজল মুখোপাধ্যায়,
    (কম্পোস-সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায়)
    (আমেরিকার কর্ণেল ইউনিভার্সিটিতে সেপ্টেম্বর ৫, ২০০৯ সালে উড়ালপুলের আয়োজনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতা ও গদ্য লেখার একটি ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন। আমেরিকা ও কানাডা থেকে স্থানীয় বাঙালি লেখকরা শারীরিকভাবে ও বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে বাঙালি লেখকরা লাইভ ইন্টেরনেটের মাধ্যমে এই ওয়ার্কশপ-এ যোগদান করেছিলেন। এই ওয়ার্কশপ আয়োজনের জন্য কর্ণেল ইউনিভার্সিটির ইকনোমিকস-এর অধ্যাপক কৌশিক বসুকে ধন্যবাদ। সব মিলিয়ে তিন ঘন্টার ওয়ার্কশপ ছিল। ওয়ার্কশপএর শেষে প্রায় একশ জন স্থানীয় বাঙালি মিলে গভীর রাত পর্যন্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর ৭৫তম জন্মদিন উদযাপন করা হয়।)

    কবিতার প্রাথমিক গঠন
    প্রথমেই বলি যে ওয়ার্কশপ করে সাহিত্য রচনা করা যায় এর কোন মানে নেই কিন্তু কবিতা বা সাহিত্য ভাল করে বোঝার জন্য অন্তত এই সব আলোচনার কিছু মূল্য আছে।
    এদেশে মানে অ্যামেরিকাতে আমি রাইটার্স ওয়ার্কশপ এ যোগদান করেছি গত শতাব্দীতে। তাতে আমি দেখেছি যে, কেউ যদি লিখতে নাও পারে কিন্তু লেখার সম্বন্ধে বা সাহিত্য কে ভাল করে বুঝতে চায় এই ওয়ার্কশপ থেকে তার বোঝার সুবিধে হয়।
    সবাই হয়তো লেখে না বা সবার লেখার বা সাহিত্য রচনা করার ইচ্ছেও হয় না।  অনেকের আবার লেখার খুব ইচ্ছে ,কবিতা না লিখে পারেই না, অনেকে আছে কবিতা লেখে- খ্যাতি অর্জনের জন্যে,অনেকে বলে – আমার লেখা ছাপাবার দরকার নেই, আমি লিখি আমার নিজের আনন্দের জন্যে;আবার অনেকে আছে সে কি লিখছে, সেই লেখাটা সম্পর্কে তার নিজের ধারনাটা তৈরি হয় না মানে সে কি লিখছে সেটা ঠিক লেখা হচ্ছে নাকি ভুল লেখা হচ্ছে! সুতরাং এই সব কিছু জানার জন্যে ওয়ার্কশপের কিছুটা উপকারিতা আছে।
    প্রথমে বলি অনেকে ভাবে গদ্য থেকে কবিতা লেখা বুঝি অনেক সহজ কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি গদ্য লেখার থেকে কবিতা লেখা আসলে অনেক শক্ত । আমাকে বললে সকালে ঊঠেই আমি একটা গল্প লিখে দিতে পারি কিন্তু বললেই আমি একটা কবিতা লিখতে পারি না তার জন্যে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়।
    কবিতা লিখতে অপেক্ষা করতে হয়। কবিতা বুঝতে গেলে বা লিখতে গেলে অবশ্যই জানতে হবে কবিতার শরীরের ব্যাপার। যেমন ডাক্তার হতে গেলে জানতে হবে অ্যানাটমির ব্যাপার,অ্যানাটমি না যেনে তো ডাক্তার হওয়া যায় না এমনকি যারা শিল্পী তাদেরও অ্যানাটমি জানতে হয় । পিকাসো, যার আঁকা দেখলে মনে হয় ভাঙ্গাচোরা মুখ,কিছুই নেই! তিনিওকিন্তু ভালো অ্যানাটমি জানতেন। শোনা যায় তিনি মাত্র সতেরো সেকেন্ডে অবিকল মানুষের মুখ এঁকে দিতে পারতেন। তার মত  লোকও সবকিছু জেনে নিয়ে বুঝে নিয়ে তবেই আঁকতেন। তেমনি কবিতার ক্ষেত্রেও এই যে আঙ্গিক এটা আগে সবাইকে জানতেই হবে এ না জেনে কবিতা লেখা যাবে না।
    অনেকে ভাবে আজকালকার কবিতা, সে তো গদ্য কবিতা,মিল দরকার নেই। এ, না জেনেও লেখা যায়। অনেকে ঠাট্টা করে বলে গদ্য লিখে দুপাশ থেকে লাইন ভেঙ্গে দিলে গদ্য কবিতা হয়ে যায়। কিন্তু হয় না, হয়ত এভাবে অনেক কবিতা লেখা হয় কিন্তু সে সত্যিকারের কবিতা হয় না । সেই জন্যেই কবিতার আঙ্গিকটা একটু আগে বোঝা দরকার।
    সেই কথাই আমি শুরু করছি তবে একটা কথা আগেই বলে রাখি,আমি যা বলব সেটা যে সবাইকেই মানতেই হবে তা কিন্তু নয় আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে লেখার সময় ওটা কিন্তু সবার মাথায় থাকে না যে হাত পা গুলো ঠিক আছে কিনা। আঁকার সময়ও তাই! যারা ছবি আঁকে তাদেরও চিন্তা করতে হয় না এমনিই তাদের ছবি হয়ে যায়। তেমনি ছন্দ মিল এসব যারা একবার শিখে নেয় লেখার সময় তাদের হিসেব করে লিখতে হয় না,এমনিই এসে যায়।আর একটা কথা এসব একদিনে শেখা যায় না, এটা শক্ত বিষয়। তাই আমি সাধারন ভাবে বলব মানে সহজ করে কিন্তু যাদের জানার আগ্রহ আছে তাদের ভবিষ্যতে আরও পড়তে হবে,না হয় আরো ওয়ার্কশপ এ যোগ দিতে হবে।
    কবিতার যে আঙ্গিকের কথা বলছি তার উদাহন হিসেবে আমি রবীন্দ্রনাথের তিনটি কবিতার কিছু লাইন বিশ্লেষণ করব। আমি রবীন্দ্রনাথকে বেছে নিয়েছি এই কারনে হয়ত আধুনিক কালে এই ভাবে আর লেখা হয় না কিন্তু তবুও রবীন্দ্রনাথের মত এ রকম তো, মানে আঙ্গিকে এত বড় প্রতিভা তো দেখা যায়নি, কত রকম পরীক্ষা করেছেন তিনি! কাজেই সেই দিক থেকে আমি তার কিছু লাইন বেছে নিয়েছি। এই লাইন থেকে পড়ে আমি বোঝানোর চেষ্টা করব এগুলো কেন আলাদা এবং এগুলোর মধ্যে আঙ্গিকের কি ব্যাপার আছে,প্রথম কবিতা রবীন্দ্রনাথের মেঘদূত।
    এই আঙ্গিকে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে।ছন্দের বইয়ে এর অন্য নাম আছে,ছন্দের বইয়ে কিন্তু অঙ্কও আছে । সে সব খটমট টেকনিক্যাল ব্যাপারে আমি যাচ্ছি না।এই আঙ্গিকে লেখাকে সাধারন ভাবে ‘পয়ার ছন্দ’ বলে, পয়ার কাকে বলে “আট ছয় আট ছয় পয়ার তাহারে কয়”এটা মনে রাখতে হবে কবিতার প্রত্যেকটি অক্ষরকে আমরা বলি ‘মাত্রা’,আর কবিতার মধ্যে ‘পর্ব’ ভাগ থাকে পড়বার সময় আমরা বুঝতে পারি কোথায় থামতে হবে, এটাকেই বলে পর্ব। এই পয়ার ছন্দতে দুটো পর্ব আছে, একটি আট মাত্রা একটি ছয় মাত্রা। এই জন্যেই বলা হয় “আট ছয় আট ছয়, পয়ার তাহারে কয়”পয়ার মনে রাখার জন্যে আরো একটা সহজ কবিতার লাইন আপনারা মনে রাখতে পারেন।
    “ মহাভারতের কথা অমৃত সমান
    কাশীরাম দাস ভনে শুনে পূন্যবান”।
    এবার একটি টিপিক্যাল পয়ারে লেখা‘মেঘদূত’ কবিতার একটি লাইন …
    “ কবিবর কবে কোন বিস্মৃত বরষে
    কোন পূন্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
    লিখেছিলে মেঘদূত মেঘমন্দ্র শ্লোক
    বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক
    রাখিয়াছে আপণ আঁধার স্তরে স্তরে
    সাধন সঙ্গীর মাঝে পুঞ্জীভূত করে ”
    এর মধ্যে একটা লাইন বাদে অন্য লাইন গুলো আমি স্ক্যান করব। তাহলেই বোঝা যাবে একটা লাইন কবি ইচ্ছে করেই একটু অন্য রকম লিখেছিলেন।
    “কবিবর কবে কোন
    বিস্মৃত বরষে
    কোন পূন্য আষাঢ়ের
    প্রথম দিবসে…”
    অর্থাৎ আমরা যখন এই কবিতাটা পড়ছি আমরা কিন্তু না জেনেই একটা জায়গায় এসে থামছি যেমন …
    “কবিবর কবে কোন
    বিস্মৃত বরষে …”
    আবার
    “কোন পূন্য আষাঢ়ের
    প্রথম দিবসে…”
    তেমনই আবার …
    “লিখেছিলে মেঘদূত
    মেঘমন্দ্র শ্লোক…”
    তাহলে আমরা দেখছি আমরা ঠিক একটা জায়গায় এসে থামছি।
    “বিশ্বের বিরহী যত
    সকলের শোক…”
    গুনে দেখলে দেখা যাবে,ঠিক আটটা অক্ষরের পর আমরা থামছি।এই আটটা অক্ষরকে বলে প্রথম পর্ব । দ্বিতীয় যে ছটা অক্ষর থাকছে তাকে বলে দ্বিতীয় পর্ব। ফলে এভাবেই “আট ছয় আট ছয় পয়ার তাহারে কয়” এই কবিতা লেখার সময় মনে রাখতে হবে এটা চৌদ্দটাঅক্ষরের একটা লাইন বটে কিন্তু আটটা অক্ষরের পরে একটা যতি বা বিরতি তারপর বাকি ছটা অক্ষর। এর ভ্যারিয়েসন আছে এর মধ্যেই একটা লাইন আছে একটু অন্যরকম কিন্তু সেটা পরে বলছি। কিন্তু পয়ারে চৌদ্দটা অক্ষর হতেই হবে,পনেরোটা হলেও হবে না তেরোটা হলেও হবে না, এগারো হলেও হবে না,চৌদ্দটা হতেই হবে বরং এর থেকে বাড়ানো যায়। মানে চৌদ্দটার বেশী হতে পারে সে বড় মজার ব্যাপার ,বলেছিলাম না এ একদিনে বোঝানো যাবে না। চৌদ্দ থেকে যদি বাড়াতে হয় চার মাত্রা বাড়াতে হবে। দুটো দিলে হবে না, ষোল হলে হবে না পনেরো হলে হবে না,আঠেরো মাত্রা হতে হবে। তবে এটা একমাত্র চারটে মাত্রা যোগ করলেই আমরা আঠারো করতে পারব। যেমন
    “সংসারে সবাই যবে সারাক্ষণ শত কর্মে রত” রবীন্দ্রনাথের আর একটা কবিতা এটাও পয়ার,কিন্তু আঠারো মাত্রার পয়ার। এটাতে আমরা কি দেখছি
    “সংসারে সবাই যবে”… আটটা, প্রথম পর্ব।
    “সারাক্ষণ শত কর্মে রত”…দশটা, দ্বিতীয় পর্ব।
    চৌদ্দর পর কিন্তু ষোল হবেনা, পনেরো হবে না যদি বাড়াতেই হয় আঠারোই হতে হবে। আরো বাড়ানো যায় কিন্তু তখনও আরো চার মাত্রাই বাড়াতে হবে মানে বাইশ হতে হবে, কুড়ি হলে হবে না। এখানে আবার একটা কথা মনে রাখতে হবে যে বাংলায় যুক্তাক্ষর আছে। আর বাংলায় যে সব যুক্তাক্ষর আছে তার ব্যাবহার কিন্তু এক একটা কবিতার আঙ্গিকে এক এক রকম।বাংলায় যুক্তাক্ষর সাধারণত দুটো অক্ষরের হয় কিংবা কোন সময় তিন অক্ষরেরও যুক্তাক্ষর হয়। কোথাও কোথাও কোন কোন কবিতায় এই যুক্তাক্ষর’কে দুটো  মাত্রা ধরা হয় আবার কোথাও কোথাও কোন কবিতায় যেমন এইখানে মানে পয়ারে যুক্তাক্ষর’কে একটা মাত্রা ধরা হয়।যেখানে যত যুক্তাক্ষর থাক পয়ারে তাদের এক মাত্রা ধরতে হবে। সেই জন্যে রবীন্দ্রনাথ একটা অদ্ভুত উদাহরন দিয়েছিলেন

    “ দুর্দান্ত পাণ্ডিত্য পূর্ণ বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত” বলে একটা কবিতা লিখেছিলেন। এখানে প্রায় প্রত্যেকটা শব্দই যুক্তাক্ষর। এটাও কিন্তু একটা পয়ার
    “দুর্দান্ত পাণ্ডিত্য পূর্ণ”…. আট মাত্রা
    বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত ” …ছয় মাত্রা
    এখানে প্রত্যেকটা যুক্তাক্ষর এক একটা মাত্রা ধরতে হবে।

    কিন্তু এবার আমি আর একটা উদাহরন দিচ্ছি রবীন্দ্রনাথের ‘হোরি খেলা’ নামের কবিতায় …
    “পত্র দিল পাঠান কেসর খাঁ’রে
    কেতুন হতে ভূনাগ রাজার রানী–
    “লড়াই করি আশ মিটেছে মিঞা?
    বসন্ত যায় চোখের উপর দিয়া,
    এসো তোমার পাঠান সৈন্য নিয়া–
    হোরি খেলব আমরা রাজপুতানী।’
    যুদ্ধে হারি কোটা শহর ছাড়ি
    কেতুন হতে পত্র দিল রানী।”
    দেখা যাচ্ছে এখানে কিন্তু কবিতাটার চালটা আরেক রকম।
    “কবিবর কবে কোন
    বিস্মৃত বরষে …” এটা এক রকম আবার
    “পত্র দিল পাঠান কেসর খাঁ’রে
    কেতুন হতে ভূনাগ রাজার রানী—এটায় আরেক রকম চাল এটায় তো পয়ার ছন্দ নেই। সেই নিয়ম তো এখানে খাটলো না!
    এখানে “বসন্ত যায় চোখের উপর দিয়া” র বসন্ত’র ন’য় ত’য় কে কিন্তু দুই মাত্রা ধরা হয়েছে কি ভাবে বলছি। এটাকে আমরা কবিতার ভাষায় বলি ছড়ার ছন্দ। এই ছন্দতেও অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। এই ছন্দে শুধু ছড়া লেখা হয় তা নয় অনেক সিরিয়াস কবিতাও লেখা হয়েছে যেমন ‘হোরি খেলা’ সিরিয়াস কবিতা অনেক মারামারি টারি আছে এই কবিতায় ,কিন্তু এটা ছড়ার ছন্দ আর ছড়ার ছন্দ একটু হালকা ধরনের পয়ারের মত অতো শক্ত না। পয়ার এর মত আট করতে হবে ছয় করতে হবে বা বাড়াতে গেলে চার করতে হবে এত শক্ত নয় এটার মধ্যে অনেকটা স্বাধীনতা আছে। মোটামুটি বলা হচ্ছে প্রথম পাঁচটা অক্ষর নিয়ে এক মাত্রা হবে। সবজায়গায় কিন্তু পাঁচটা হয় না যেমন “পত্র দিল” এখানে পাঁচ কোথায়এখানে তো মনে হচ্ছে চার আবার “পাঠান কেশর” এখানে তো ছয়। পত্র দিল ধরছি ত’এ রফলা আছে মানে যুক্তাক্ষর তাই দুই ধরলাম তাই পাঁচ হল কিন্তু পাঠান কেশর ছয় হল,তাহলে এটা কি করে হচ্ছে ? ও হয়! ছয় হলেও হয়, কেন হবে তার ও নিয়ম আছে। শেষে হসন্ত থাকলে হবে,এখানে কেশর এর শেষে র’ মানে হসন্ত আছে বলে হবে। যেমন এখানে ‘আশ মিটেছে’এটা ছয় অক্ষ হবে না কারন মিটেছে এটায় শেষে ছে’ মানে হসন্ত নেই,তাই এটা ছয় নয়। কাজেই এই ছন্দের বেসিস হছহে পাঁচ মাত্রা কিন্তু কখন চার এও হয় কখন ছয় এও হয়। কিন্তু তার বেশী বা কম এ হবে না । সুতরাং একটু হালকা ,এর বাঁধনটা বেশ আলগা। আরেকটা কবিতা আমি পড়ছি…দেখুন এর চালটা কেমন !
    “নিরুদ্দেশ যাত্রা’ / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে
    হে সুন্দরী?
    বলো  কোন্‌পারভিড়িবেতোমার
    সোনার তরী।
    যখনি শুধাই, ওগো বিদেশিনী,
    তুমি হাস শুধু, মধুরহাসিনী–
    বুঝিতে না পারি, কী জানি কী আছে
    তোমার মনে।
    নীরবে দেখাও অঙ্গুলি তুলি
    অকূল সিন্ধু উঠিছে আকুলি,
    দূরে পশ্চিমে ডুবিছে তপন
    গগনকোণে।
    এর ছন্দ কেমন! এতো পয়ার নয় এতো ছড়ার ছন্দও নয়।এটা তবে আর একটা ছন্দ।এটায় দেখা যাচ্ছে  প্রত্যেকটা লাইনে ছয় মাত্রা আছে। কিন্তু লাইনের শেষের দিকটা পাঁচ । এটা ইচ্ছা করলে তিন বা চার হতে পারে,পাঁচ হতে পারে কিন্তু শুরুর লাইন সবসময় স্ট্রিক্টলিছয় হতে হবে। আর যুক্তাক্ষর গুলোকে ভেঙ্গে দু অক্ষর ধরতে হবে। যেমন …
    ‘আর কত দূরে’…ছয় মাত্রা
    ‘নিয়ে যাবে মোরে’…ছয় মাত্রা
    কিন্তু ‘হে সুন্দরী’ পাঁচ মাত্রা মানে এখানে সুন্দরীতে ন’এ দ’এ আছে সুতরাং এটা যুক্তাক্ষর। এইখানে যুক্তাক্ষর আছে তাই দুটো মাত্রা ধরা হবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রত্যেকটি শুরুর লাইনে ছয় মাত্রা আছে । শেষের লাইনে কোন কোন যায়গায় পাঁচ মাত্রা আছে। এই ছন্দকে তবে আমরা ছয় মাত্রার ছন্দ বলতে পারি। এর অন্য নামও আছে সে বড় খটমট মনে থাকবে না। তাই এটুকু জানলেই হবে।
    এবার দেখা যাচ্ছে পয়ার এ হবে আট ছয় ছন্দ যেমন ‘মেঘদূত’ এ দেখলাম, বাড়াতে গেলে চার মাত্রা। ছড়ায় পাঁচ পাঁচ ছন্দ যেমন ‘হোরি খেলা’য় কিংবা ছয় ছয় ছন্দ যেমন ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’য় দেখলাম।এই তিনটে হচ্ছে বাংলা কবিতায় প্রধাণ তিনটি ছন্দ। এই তিনটে ছন্দতেই এখনও বাংলা কবিতা লেখা হয়। এর মধ্যে পয়ার টা বেশী চালু কারন এটা খানিকটামুখের ভাষার মত মানে আমরা যেমন কথা বলি তারসাথে মিল আছে। বাংলা কবিতার অনেক বিবর্তন হয়েছে, অনেক পথ ঘুরে ঘুরে এখন চেষ্টা করা হচ্ছে কবিতা কে মুখের ভাষার মত করে লেখার। তার মধ্যে উপমা আসতে পারে রূপক আসতে পারে কিন্তু শব্দের ব্যাবহার যেন মুখের ভাষার মত হয়।
    এর পর আসে মিল এর কথা , আমি দেখেছি অনেকের কাছে ছন্দ ও মিল ধারনাটা ঠিক পরিষ্কার না। অনেকের কাছে ছন্দ মানে লাইনের শেষের মিল। তা কিন্তু নয়। লাইনের শেষের মিল কে ইংরেজীতে বলে রাইমিং। বাংলায় আমরা তাকেই বলি অন্ত্যমিল। আর ছন্দর কথা আমি আগেই বলেছি। কবিতার মিল দেওয়া কিন্তু সোজা কথা না। মিল দেওয়া খুব গণ্ডগোলের মিল দিতে গিয়ে অনেকে ভাবে লাইনের শেষে ‘খেলা’আছে পরের লাইনে আমি একটা ল’ দিয়ে শব্দ দিলেই মিল হয়ে যাবে। তা কিন্তু না এরও অনেক নিয়ম আছে। এর একটা মজার উদাহরণও আছে যেমন           “ তৃষ্ণার্ত হইয়া আমি চাহিলাম জল, কোথা হতে এনে দিলে আধখানা বেল” শেষে কিন্তু ল’ আছে। মজাটা হল বেল খেলে যেমন তৃষ্ণা মেটে না তেমনি জলের সাথে বেলের মিলও ঘটেনা। কেন মিল হবে না? কারন শেষের শব্দ শুধু মিললে হবে না এখানে আবার একটা সুক্ষ্য ব্যাপার আছে ,শেষ অক্ষরের আগে যে স্বরবর্ণ তার সাথেও মিলও থাকতে হবে। যেমন খেলা’র সাথে বেলা’র মিল হবে। কিন্তু জল’ এরসাথে বেল’ এর মিল হবে না। কাজেই মিল দিতে গেলে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে শুধু একটা ল’ এর সাথে ল’ হলেই হবে না আসলে সাউন্ড এর দিক থেকে আগের শব্দটা যেমন শোনাচ্ছে পরের শব্দটাও তেমনি শোনাতে হবে। তাই মিল দেওয়াটাও সহজ না।
    আজকাল কবিতায় মিল থাকে না। মিল না দিয়েও কবিতা লেখা যায়। অনেক সংস্কৃত কবিতাতেও মিল নেই। সংস্কৃত ভাষা থেকেই বেশীর ভাগ ভারতীয় ভাষা এসেছে আর এই সংস্কৃত ভাষার কবিতায় তো মিল নেই।তাহলে মিল আমরা পেলাম কোথায়! ইংরেজি থেকে মিল এসেছে না তাতো নয় কারন তার আগে কাশীরাম দাস মিল দিয়ে লিখে গেছেন তবে কোথা থেকে এলো ? অনেকে বলেন ফার্সি কবিতায় মিল আছে। আরবরা যখন আমাদের দেশে আসে তখন তারা কবিতায় মিল জিনিষটা নিয়ে আসে তাদের থেকে আমরা শিখি।এটা একটা থিয়োরি। কাজেই সংস্কৃত থেকে মিল আমরা পাই নি। মাঝখানে কোন সময় এই মিল ব্যাপারটা এসেছে আবার চলেও গেছে। আজকাল মিল তেমন দেখা যায় না। শুধু বাংলা নয় পৃথিবীর বহু ভাষাতেই মিল আর দেখা যায়না। কারন মিলটাকে মনে হয় একটু কৃত্রিম। জোর করে আমাকে চিন্তাটাকে ঘুরিয়ে কোথায় কোন শব্দটাকে দিলে ওখানে মানায় সে ব্যাপারে ভাবতে হবে। হয়ত এভাবে না ভাবলে আমার চিন্তাটা আরো একটু পরিষ্কার হতে পারত আরো সহজ হতে পারত! সেই জন্য অনেকে আর মিল দিচ্ছে না। তবে কোন কোন ভাষার একটা বিশেষত্ব থাকে যেমন আমাদের এই বাংলা ভাষায় মিলটা বেশ খাটে ,খেয়ে যায় ভালো। আর মিল টা দেবার আরেকটা সুবিধে হচ্ছে কি!মিলটা দিলে লাইন গুলো মনে থাকে সহজে, মিল থাকলে কবিতা মুখস্ত করা সম্ভব, মিল না থাকলে মুখস্ত করা কঠিন হয়ে যায়। ইংরেজি ভাষায় মিল অনেক আগে ঊঠে গেছে কিন্তু আবার ফিরেও এসেছে, রিসেন্ট কিছু কবিতায় আবার মিল দেখা যাচ্ছে।পুলিৎযারপাওয়া কিছু কবি তারা দেখছি আবার মিল দিয়ে লিখছেন।
    (চলবে)

    SHARE

    LEAVE A REPLY