ইতি দ্রৌপদী

    0
    493
    সুবোধ সরকার
    জন্ম নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে‚ ১৯৫৮ | ইংরাজী সাহিত্যের অধ্যাপক | 'দ্বৈপায়ন হ্রদের ধারে' এনে দিয়েছে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার‚ ২০১৩ সালে |
    Subodh Sarkar Poem

    আমি তোমাকে এত দিন বাদে
    এতগুলো চৈত্রমাস বাদে
    এতগুলো পতনের পরে
    এতগুলো উত্থানের পরে
    আমি তোমাকে আজ চিঠি লিখছি
    এতগুলো একশো বছর বাদে
    এতগুলো হাজার বছর বাদে
    আমি তোমাকে আজ ই-মেল লিখছি…

    আমি ইতিহাসে প্রথম
    আমি ইতিহাসে প্রথম লজ্জা
    আমি ইতিহাসে প্রথম লজ্জা রজস্বলা
    আমি ইতিহাসে প্রথম লজ্জা রজস্বলা প্রথম শ্লীলতাহানি
    এত দিন বাদে তোমাকে লিখছি
    তোমার আর একটু সচেতন হওয়া উচিত ছিল
    তুমি আমাকে লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছিলে
    কিন্তু তুমি আমাকে লজ্জা থেকে বাঁচাতেও পারিনি।

    আমি সেদিন ঘরে ছিলাম
    আমি সেদিন এক পাত্র জলে পাপড়ি ছড়িয়ে
    পা ডুবিয়ে বসে ছিলাম
    মাসে তিনদিন আমি পায়ে ফুল লাগাই
    মাসে তিনদিন আমি পা ডুবিয়ে পা ডুবিয়ে
    মানস সরোবরে চলে যাই
    সাঁতার কেটে আমি এক অনন্ত দুই অনন্ত তিন অনন্ত
    পার হয়ে বাবার কাছে ঘুরে
    মায়ের কাছে ঘুরে আসি
    ছোটবেলার উঠোনে গিয়ে শিউলি কুড়িয়ে আনি।

    আমি সেদিন ঘরে ছিলাম, তোমরা আমাকে
    রাজসভায় ডেকে আনলে
    ওটাকে ডেকে আনা বলে না
    ধরে আনা বলে
    রাজসভায় ডেকে এনে পরিকল্পনা করে
    একটা মেয়েকে তোমরা নগ্ন করে দেখতে চাইলে?
    আমি বলেছিলাম আমার শরীর ভাল নেই
    একটা সুন্দর সুস্থ মেয়ে যখন বলে
    আমার শরীর ভাল নেই
    তার মানে তোমরা জানো না?
    কিন্তু আমি প্রতিটি চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম
    পুরুষের চোখ আমি চিনি
    কোন চোখে ফাল্গুন
    কোন চোখে বৈশাখ, সেটা সব চেয়ে ভাল বোঝে
    একটা মেয়ে।

    তুমি আমাকে রক্ষা করেছিলে
    তুমি আমাকে ঠিক কতটা রক্ষা করেছিলে কৃষ্ণ?
    সাগরের জলে ডুবতে ডুবতে জল খেতে খেতে
    কেউ যখন পারে উঠে আসে
    তখন তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেই হয় না
    এতক্ষণ তুমি তার নাকানি-চোবানি দেখলে?
    তোমার হাত কেন আর একটু আগে এগিয়ে এল না?
    আমি যখন প্রায় বিবস্ত্র হয়ে এসেছি
    তখন তুমি শাড়ি পাঠালে আমায়?
    তোমার যখন এত শাড়ি এত লম্বা শাড়ি
    যা দিয়ে একটা গোটা আকাশ ঢেকে দিতে পারো
    সেটা তুমি অত দেরি করে আমাকে পাঠালে?
    ততক্ষণে আমার যা হবার হয়ে গেছে
    ততক্ষণে আমার লজ্জা
    আমার অপমান হয়ে গেছে
    পিতামহদের চোখের সামনে
    সন্তান তুল্য বালকের সামনে আমার অসম্মান
    ঘটে গেছে।

    তুমি আমাকে ভালবেসেছিলে কৃষ্ণ
    নাকি তুমি তোমার রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখাতে চেয়েছিলে?
    ক্ষমতা একটা নেশা
    যে নেশা করে না তাকেও ধরাতে হয়?
    ক্ষমতা একটা চড়
    সেটা দুর্বলের গালেও মারতে হয়
    বীরের গালেও মারতে হয়
    ক্ষমতা একটা দড়ি
    সেই দড়িতে অন্যের ছেলেকে জড়াতে হয়
    নিজের ছেলেকেও জড়াতে হয়।
    কৃষ্ণ তুমি যাকে ভালবাসো
    তাকেও কি গর্তে ফেলে দেখতে চেয়েছিলে?
    অসম্মানের গর্তে?
    বিদ্রুপের গর্তে?
    তুমি কী বোঝাতে চেয়েছিলে প্রতিটি পুরুষ আসলে পুরুষ
    পুরুষের কোনও কন্যা নেই
    ধাত্রী নেই
    মা নেই
    স্ত্রী নেই
    তার চোখের ভেতরে একটা চোখ আছে
    সেই চোখ দেখতে চায় একটা শরীর।

    সেদিন যখন ঘরে ফিরে এলাম
    তখন সূর্যের আলো শুয়ে ছিল আমার ঘরে
    সেই আলো আমাকে জড়িয়ে ধরল
    সেই অপরাহ্ন আমাকে জড়িয়ে ধরল
    আমি আলো থেকে অপরাহ্ন থেকে
    নিজেকে সরিয়ে নিয়ে দাঁড়ালাম।
    আমার ঘরের মাঝখানে দাঁড়ালাম।

    যেভাবে সেদিন দাঁড়িয়েছিলাম
    নিজের ঘরে
    একটা একটা করে পোশাক খুলে দাঁড়িয়েছিলাম।

    একশো বছর
    এক হাজার বছর বাদে দু’হাজার বছর তিন হাজার বছর
    আমি ঠিক ওই ভাবে দাঁড়িয়ে আছি
    আমার শরীরে কোনও কাপড় নেই
    কোনও সুতো নেই
    কেন আমি ওই ভাবে দাঁড়িয়ে আছি
    সবাই জানে
    তবু এক্ষুনি একটা সিদ্ধান্ত হবে
    আর একটি রাজসভায়
    সেখানে বাবা-কাকারা সমবেত হবেন
    গুরুজনেরা সমবেত হবেন
    বুদ্ধিজীবীরা সমবেত হবেন
    পুত্রসম বালকেরা সমবেত হবেন
    সবার সামনে আবার আমাকে বিবস্ত্র করা হবে।

    SHARE

    LEAVE A REPLY