সুমন ঘোষের মুখোমুখি অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

    অনামিকা বন্দোপাধ্যায়
    লেখক, চলচ্চিত্রকার ও হিউম্যান রাইটস কর্মী। আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র-বিদ্যার অধ্যাপনা করেন। (www.anamikabandopadhyay.com)

    আমি জানি ছবি অনেক দর্শকের জন্যে করতে গেলে কি করতে হয়, তা বলে কি আমি ‘শ্যামলকাকু’ বা ‘পিস হেভেন’ বানাবো না ? শুধু ‘কাদম্বরীর’ মতো হিট ছবি করব?

    ”আমি জীবিকার জন্যে সিনেমা বানানোর অপর নির্ভরশীল নই এবং এটা আমার একটা অ্যাডভান্টেজ, তাই আমি চাইলে ‘শ্যামলকাকু’র  মতো  বা  ‘পিস হেভেন’-এর মতো ছবি বানাতে পারি, আমি জানি তার দর্শক কম… এবং তাতে ক’জন সেটা দেখল তা নিয়ে আমি চিন্তিত না… ”

    — সুমন ঘোষ

    [সুমনের সঙ্গে আমার কথা হয় সকালে আমি ক্লাস নিতে যাওয়ার আগে ও সুমন ক্লাস নিতে যাওয়ার আগে। ঠিক হয় মোটামুটি ভোরবেলা জাতীয় একটা সময়ে কথা বলব উড়ালপুলের জন্যে। সুমন গাড়ি চালাতে চালাতে কথা বলবে, ইউনিভার্সিটি’র পথে। এতে আমার আপত্তি ছিল । সুমনের কথা অনুযায়ী ও হ্যান্ডস-ফ্রি গ্যাজেটে কথা বলবে, এবং প্রায়ই বলে থাকে। এবং  যেহেতু পর দিনই ও ভারতে যাবে, অতএব ওই সময় কথা বলা স্থির হল। তাই এই আলাপে মর্নিং কফি ও মিষ্টির ঘ্রাণ সামান্য হলেও লেগে থাকল।]

    অনামিকা: সুমন, প্রথমে কি বলি, ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে আমরা একটু বরং কথা বলি ? তুমি নানারকম পরীক্ষা বা উদ্যোগ নিচ্ছ আজকাল ডিস্ট্রিবিউশনে। এখন সারা পৃথিবীতেই  সিনেমার ক্ষেত্রে ডিস্ট্রিবিউশনে  আমূল পরিবর্তন আসছে, মূলত নেটফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল  ডিস্ট্রিবিউশন এর হাত ধরে। সেটা তোমার ছবি বা আলাদা করে বাংলা ছবিতে তুমি কতটা দেখতে পাচ্ছ ? যেমন ধরো তুমি অন্যদের ছবি রিলিজ করছ… আদিত্য বিক্রমের  ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ রিলিজ করলে  আবার তোমার শেষ ছবিটা যেটা মায়ামি’তে শ্যুট  করলে… সেখানে একটা নতুন ডিস্ট্রিবিউশন মডেলে কাজ করলে…

    সুমন: হ্যাঁ দেখো,  ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে যে দুটো বললে সেগুলো আমার ক্ষেত্রে একটু forced। আমার সিনেমার  ডিস্ট্রিবিউশন এর ব্যবসার দিকে খুব একটা যে interest আছে সেটা বলব না। অনেকটাই অগত্যাই করেছি আর কি। প্রথম হল, আদিত্য ছবিটা রিলিজ করতে পারছিল না কলকাতায়। একটু অফবিট ছবি, আর কলকাতার যে রকম মানসিকতা, ডিস্ট্রিবিউশনের  ক্ষেত্রে সেখানে ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ র মতো একটা ছবি, তার কি  ডিস্ট্রিবিউশন হবে, সেটা খুবই হতাশা জনক একটা অবস্থার মতো। আদিত্য’র ছবিটা যখন আমি দেখি এবং ও আমায় বলে যে, ও অনেকের কাছে গেছিল কিন্তু রিলিজ করতে পারছে না, তখন ওটা…  আই টুক ইট আপন মাইসেলফ… এবং ঠিক করি যে খুব ছোট একটা রিলিজ আমি করব আর রিলিজের পেছনে একটা লজিস্টিকস তো থাকে…  তবে সেটা কিন্তু আদিত্যই করেছিল। কোন হলে রিলিজ হবে, কীভাবে, এই সব। আমি যেটা করেছিলাম, যেহেতু লাস্ট দশ বছর বাংলা ছবি করছি, তাই আমার মিডিয়ার  যোগাযোগ গুলো কাজে লাগিয়েছিলাম, কারণ আদিত্য আগে কখনো ছবি করেনি, তাই বাংলা ছবির হিস্টোরিক perspective এ ছবিটা কতটা জরুরি সেটা সবাইকে  বলা এবং ওই সচেতনটা তৈরি করা, মার্কেটিং প্ল্যান…  মূলত এগুলো।

    :আর ‘Mi Amour’ এর ক্ষেত্রেও তো তাই। তুমি অনলাইন রিলিজ করলে। এটা কেন ভাবলে ?

    সু: ‘Mi Amour’ এর ক্ষেত্রেও বলব যে, অনি শীল মূলত ডিস্ট্রিবিউশনটা ভাবে, তার পর আমি সঞ্জীব চ্যাটার্জি (ইউনিভার্সিটি অফ মায়ামি’র  সিনেমা- বিদ্যার অধ্যাপক) মতো কয়েক জনের সহযোগিতায় ছবিটা করি। অনি শীল কিন্তু, গত সাত-আট বছর ধরে আমাকে বলে আসছিলেন, (অনি শীল, যিনি ডেটা-বাজার এর মালিক ছিলেন ) মানে যখন এই ডিজিটাল distribution এর কথা কেউ তোলেইনি, জানতই না, তখন থেকেই কিন্তু ও আমায় বলছিল যে, ইন্টারনেটই  কিন্তু ফিউচার হতে চলেছে  ডিস্ট্রিবিউশন এর ক্ষেত্রে। সেই ইন্সপিরেশনেই ও ডেটা-বাজার শুরু করেছিল। সে ক্ষেত্রে আমি বলব, আমি ছবিটা শুধু বানাতে চেয়েছিলাম ফিল্মমেকার হিসেবে, সেক্ষেত্রে  এই ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশনের কৃতিত্বটা আমি কিন্তু অনি শীলকেই দেব।

    ইকনমিক্সের অধ্যাপক হিসেবে বলতে পারি, বাংলা ছবির ব্যবসার খুব শোচনীয় অবস্থা। দেয়ার ইজ নো বিজনেস মডেল… বাংলা ছবির ক্ষেত্রে। এমনকি কোন ছবি কত ব্যবসা করল সেটা পর্যন্ত ঠিক করে জানার কোনও উপায় নেই। যে যা বলছে মেনে নিতে হবে এ রকম একটা ব্যাপার। সেখান থেকে এই ধরনের অনলাইন ডিস্ট্রিবিউশন থেকে যাই আসুক, সে পঞ্চাশ -ষাট লাখ যাই আসুক, ইট ক্যান চেঞ্জ দ্য ডাইনামিক্স অফ বেঙ্গলি সিনেমা।  দেখো আমি যা জানি বছরে বোধ হয় দেড়শোটা বাংলা ছবি রিলিজ করে, সেখানে দশ থেকে পনেরোটা বোধহয় টাকা রি-কভার করতে পারে।  সেখানে যদি এই ডিজিটাল প্ল্যান টা  কাজে আসতে পারে তা হলে মনে হয় এই শোচনীয় অবস্থাটা অনেকটা কাটবে। ‘Mi Amour’  প্রাইমারিলি ইংরিজি ছবি, কিছুটা বাংলায় যদিও ডায়ালগ আছে, কিন্তু  খুব কম। তবে হ্যাঁ আমি বাঙালি, বাংলা ছবি করি, পরম-রাইমা…  এরা আছে, তো এটা বাংলা ছবির বাজারের জন্যেই।

    আরেকটু বলি, সেটা হল, হলিস্টিক অর্থে ‘বাংলা  ছবি’ বললে একটা ডিভাইড ও তো মানতে হবে। ইন্ডিপেডেন্ট আর স্টুডিয়ো সিস্টেমের মূল ধারার ছবি… মানে ধরো- ইন্ডিপেডেণ্ট ফিল্মমেকিংয়েরও একটা পরিসর রয়েছে। বিশেষত উইথ দ্য অ্যাডভেন্ট অফ ডিজিট্যাল ফিল্মমেকিং, অনেক ছেলে মেয়েরাই কিন্তু একটা ডিজিট্যাল ক্যামেরা হাতে পেতে পারছে এবং সামান্য কিছু টাকা জোগাড় করে একটা ছবিও বানাচ্ছে, সেখানে তাদের জন্যে এই রকম মডেল বেশি কার্যকর না মূলধারার সিনেমাও এটা অনেকটা অ্যাডাপ্ট করবে?

    শুধু বাংলা না, আমি দুটো উদাহরণ দিচ্ছি – যেমন কিউ। ওর ‘গান্ডু’র কিন্তু কোন থিয়েট্রিক্যাল রিলিজ হয়নি। তখন নেটফ্লিক্স ও সে রকম ভাবে  ছিল না।

    অ: সে ভাবে না

    সু: হ্যাঁ। আর ‘গান্ডু’ কিন্তু ও  ইউটিউবেই ছাড়ে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে ওটা বেশ কিছু বিখ্যত ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখানো হয়। সেটা হয়তো সাহায্য করেছিল। কিন্তু ওই অনলাইনে ছবি দেখানোর সচেতনতাটা কিন্তু কিউ নিয়ে এসেছিল। আরেকটা ছবির কথা বলব- ‘নিউটন’ ছবিটা  যে করেছে…

    অ: অমিত মাসুরকার..

    সু: হ্যাঁ… ওর আগের ছবিটা ‘সুলেমানি কিড়া’, সেটা কিন্তু থিয়েট্রিক্যাল রিলিজ খুব পায়নি। ওটাও অনলাইনে ছাড়া হয় ও সেখান থেকে ছবিটা জনপ্রিয়তা পায় ও কেউ একজন কেনে, যেহেতু অমিত আমার বন্ধু আমি এগুলো জানি…  এবং আমি বলছি, অমিত কিছু দিনের মধ্যেই দেশের সেরা একজন ফিল্মমেকার হয়ে যাবে। এখন প্রশ্নটা হল, অমিত এর মতো ফিল্মমেকার কি আছে আমাদের মধ্যে …  বাংলা সিনেমায় ? যেখান থেকে এরকম সাফল্য আসবে। তবে হ্যাঁ … একটা তো আশার আলো বটেই এই অনলাইন এর প্রমোশনটা… আগে ছবি করে কি করে ডিস্ট্রিবিউট করব সেটা একটা কঠিন ব্যাপার ছিল … আমি তো জানি কি অবস্থা হয়…  সেখান থেকে সবার জন্যেই ভালো-  ইফ ইউ হ্যাভ  আ  রিয়ালি গুড প্রডাক্ট।

    অ: ডিস্ট্রিবিউশন ছাড়া একই সঙ্গে ছবি তৈরি বলতে প্রথমেই হয়তো ফান্ডিং নিয়ে কথা উঠতে চাইবে, টাকা পয়সা নিয়ে কথা তো একটু বললাম, এ বার তাগিদের কাছে, প্যাশনের উৎসের দিকে যাই। তোমার কাজ নিয়ে … বলছি যে, তোমার প্রিপারেশন নিয়ে যদি প্রশ্ন করি, ছবি করার প্রস্তুতি কি করে নিচ্ছিলে ? মানে যে সময় ইনফ্লুয়েন্স আসতে শুরু করে জীবনে, ছবির চোখটা তৈরি হয় বা হচ্ছে, সিনেমার ভাষাটা ধরা দিচ্ছে, সে সময়টা। আমার মনে আছে, হিউস্টনে সেবার তোমার ছবি দেখানো হচ্ছে, তখন গৌতমদা, গৌতম ঘোষ একটা অ্যানেকডোট বলেছিলেন, তুমি বোধহয় কর্নেলে আসার আগে গৌতম দার সাথে দেখা করে বলেছিলে, কর্নেলে যেতে চাও না, কারণ ছবি বানাতে চাও…

    সু: হ্যাঁ… হ্যাঁ… গৌতমদা তখন আমায় দারুণ বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন, যদিও  আমার তখন গৌতমদার ওপর খুব রাগ হয়েছিল

    অ: কেন ? না, আচ্ছা কি রকম ?

    সু: মানে গৌতমদা বলেছিল, তুমি কর্নেল ছেড়ে ছবি বানাবে? সেটা মোটেও ঠিক না। ছাত্ররা এই কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে বলে পাগল হয়ে যায়। আর তুমি ফিল্ম বানানোর জন্যে যাবে না? ছবি তো পরেও বানাতে পারবে। তো, তখন আমার মনে হয়েছিল, গৌতমদা আমায় সাপোর্ট দিল না, নিজে এত বড় ফিল্মমেকার আর আমাকে এসব বুঝিয়ে দিল। পরে বুঝেছি যে দ্যাট ওয়জ ওয়ান অফ দ্য বেস্ট অ্যাডভাইজ।

    তো, তোমার প্রশ্নের উত্তর-  কর্নেল আমাকে সিনেমার প্রস্তুতিতে অনেক সাহায্য করেছে। আমার যে ফেলোশিপ টা ছিল , তাতে আমি যে কোন কোর্স নিতে পারতাম। আমি নানা ডিপার্টমেন্টে গিয়ে কোর্স নিতে শুরু করলাম… যেমন যেখানে ফিল্ম থিওরির ক্লাস করানো হয়, সে সব জায়গায়…। আমরা সত্যজিৎ রায় দেখে বড় হয়েছি। এখানে এসে ওই কোর্স গুলোতে নিকলাস রোগ, হিচককের ছবি… এইসব দেখানো হোল। তা ছাড়া আরেকটা ক্লাস হত এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মের… সেখানে স্টান ব্রাখাজ, মায়া ডেরেন এসব দেখানো হত। এই সব দেখতে দেখতে আমার মনে হল, ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজটা নিয়ে আমার অনেক কিছু শেখার আছে, অন্য ভাবে দেখার একটা চোখ বা ভিশন আমাকে দিল। এটা কর্নেল আমায় দিল, যেগুলো হয়তো আমি এই কোর্সগুলো না নিলে জানতেই পারতাম না যে এ রকম ছবি হয়। দেখো, ছবি করতে গেলে, একজন ফিল্মমেকার হিসেবে যেটা মনে হয়, সেটা হোল যে, এক দিকে টেকনিক্যাল অ্যাসপেক্ট- সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, সাউন্ড এ সব তো আছেই কিন্তু তার থেকেও বড় ব্যাপার হোল-  টু ডেভেলপ আ ভিশন;  টু ইম্বাইব লাইফ।

    অ: অ্যাবসোলিঊটলি-

    সু: আর ছিল বই। জানোই তো আমেরিকায় তো এইটা আছে, সারা পৃথিবীর বইয়ের সম্ভার তুমি পেতে পারো লাইব্রেরি তে। তো… পড়তে থাকা…  লিটারেচার ও আরও অনেক কিছু।  শুধু বই না, মিউজিক নিয়ে ভাবা, ডান্স ও তার  ফর্ম নিয়ে ভাবা…  একটা পরিপূর্ণতা…  পরিপূর্ণতা দিলো বলব না,  সে  পেতে  গেলে আরও পঞ্চাশ  বছর লাগবে।

    অ: এই জায়গাটা এসে যেতে আমার পরের প্রশ্নে যেতে অবধারিত ভাবে যেটা  আসছে তা’ হল এই যে, ধরো ফিল্ম স্কুলে আমাদের ছাত্ররা যখন অনুশীলন করেন, আমরা তাদের নানারকম এক্সারসাইজও  দিয়ে থাকি… একটা অ্যানালজি উঠে এল তোমার সঙ্গে বলতে বলতে, তুমি বললে লিটারেচার এর  কথা, লিটারেচার আর সিনেমা… ধরো গল্পের ভুবনের সাথে তার কি যোগ…  মানে অ্যাডাপ্টেশন  ও এসে যাচ্ছে, তুমি অবশ্য অন্যের থেকে অ্যাডাপ্টেশন সে ভাবে কর না, তোমার স্ক্রিপ্ট নিজেরই লেখা, মূলত…

    সু: হ্যাঁ … হ্যাঁ …

    অ: তো এই যে গল্প তুমি লিখছ, তার থেকে তুমি সিনেমার ল্যাঙ্গুয়েজে  তাকে ট্রান্সলেট করছ যখন, তখন তোমার কাছে মাধ্যমটা কীভাবে স্পষ্ট হচ্ছে, দুটো মাধ্যমের আলাদা ভাষা… আমি বলতে চাইছি, হোয়াট আর দ্য সিনেমাটিক ফোর্সেস- কম্পোনেন্টস  রাদার যেটা তোমাকে ড্রাইভ করছে… আমার শৈলীটা কী হতে যাচ্ছে… এটা আমার ছাত্ররা আমায় যেমন প্রশ্ন করেন আমিও তাদের থেকে বের করার জন্যে পাল্টা প্রশ্ন করি… শৈলী কে পাচ্ছি কোথায় ও কীভাবে ?

    সু: হ্যাঁ আমার তো অ্যাডাপ্টেশন সে রকম থাকে না, মূলত অরিজিনাল স্ক্রিপ্ট। কাদম্বরী ছাড়া। যেটা অনেকটাই সুনীল গাঙ্গুলির ‘প্রথম আলো’ থেকে অনুপ্রাণিত, আর তোমার …

    অ: মল্লিকাদির বই থেকে

    সু: হ্যাঁ মল্লিকাদির বইটা- তোমার প্রশ্নের উত্তর হল- দুটো ভাবে উত্তর দিই- ধরো আমাকে একটা আইডিয়া স্ট্রাইক করল, আমার মনে হল এইটা হল বীজটা যেটা ফ্লেশ আউট করলে একটা ন্যারেটিভ তৈরি হবে। যেমন শ্যামল কাকুর গল্পটা একটা কনভারসেশন থেকে শুরু…

    অ: আমি ওটা সিলেবাসে রেখেছিলাম, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমা পড়ানোর সময়

    সু: হ্যাঁ… হ্যাঁ … শ্যামলকাকু একদিন আমায় এই রাস্তায় আলো নেভানো নিয়ে তার চিন্তাটা আমায় বললেন। আমি তখন এই সাধারণ গল্পটার মধ্যে একটা বড় পার্সপেক্টিভ দেখতে পেলাম। এও ভাবলাম, ইফ আই স্পেন্ড ইম্পরট্যান্ট সিক্স মান্থস অফ মাই লাইফ অন দিস… সেখানে লার্জার ইস্যুটা কি? তখন মনে হল এই ছোট্ট ঘটনার মধ্যে দিয়ে আই ক্যান আড্রেস সো মেনি ইস্যুস। এটা গ্লোবালাইজেশন এরও গল্প হতে পারে।  শ্যামল কাকু একজন মার্ক্সিস্ট ছিলেন।  লাইট ইজ এ মেটাফর অফ গ্লোবালাইজেশন। মানে যেটা  উনি নিভিয়ে দিতে চান আরকি । এই ভাবে আস্তে আস্তে একটা ন্যারেটিভ তৈরি হয় আমার মাথায়। ‘শ্যামল আঙ্কল…’ বলো বা ‘পিস হাভেন’ বলো, ‘নোবেল চোর’ বা  ‘পদক্ষেপ’,  সবগুলোই এই ভাবেই এসেছে। তারপর তার ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার। তিন-চার মাস যেতে আস্তে আস্তে সেই ন্যারেটিভ স্ট্রাকচারটা গজায়। এইযে নোবেল চোর নিয়ে এত জল্পনা করি আমরা, যে নোবেলটা কোথায় গেলো? ধর আমি হলাম সেই চাষাটা যে নোবেলটা পেলো… এর পর সে কোথায় যাবে, কি ভাববে ? এইভাবে এগোতে থাকে। এগুলো আমি সিনেমার ল্যাঙ্গুয়েজেই ভাবি।  মানে সাহিত্যে যদি হয়- কেউ লিখলেন ‘ মনটা  ভাল লাগছে না’… সেটা আমি সিনেমার ক্ষেত্রে ভিস্যুয়ালে আনব।

    অ: অ্যাবসোলিউটলি

    সু: তো সেটাই তাই একটা চ্যালেঞ্জ। যেমন ‘প্রথম আলো’ থেকে সুনীল গাঙ্গুলির লেখা পড়ে যখন কাদম্বরীর ভাবনাটা করছি…  অবশ্য আমি বলব, সুনীল গাঙ্গুলি’র লেখা এতো ভিস্যুয়ালি রিচ যে ভাবাটা সহজ হয়ে যায়। যেমন সত্যজিৎ বলেছিলেন, বিভূতিভূষণের ক্ষেত্রে, অপু ট্রিলজি’র কথাই বলছি, উনি বলেছিলেন যে ওনার ( বিভূতিভূষণের )  ভাষাই এত ভিস্যুয়াল যে স্ক্রিপ্ট করার সময় সমস্যা হয় না। সেটা আমার সুনীল গাঙ্গুলির ক্ষেত্রেও মনে হয় ।

    অ: তোমার প্রথম কাজ ছিল অমর্ত্য সেন কে নিয়ে তথ্যচিত্র। এই মাত্র কিছু দিন আগেও আবার দেখলাম তুমি ওঁকে নিয়ে আবার ছবি করছ… এটা কি ..

    সু: না, অমর্ত্য সেন কে নিয়ে আমি ২০০২ তে যখন করেছিলাম, তখন সেভাবে সিনেমার কিছুই করিনা। তারপর এখন এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতে এবং আমেরিকা দু’ জায়গাতেই, আমার মনে হোল… একটু ধরে রাখা যাক এদের মত মানুষের দর্শন । আর আগে ২০০২ তে তেমন করে আমি ছবিটা দেখাতে বা ডিস্ট্রিবিউট করতে পারিনি বড় স্কেলে, তাই সেই পুরনো ছবি থেকেও অনেক কিছু নিয়ে একটা নতুন ভাবে, যে আই অ্যাম ফলোইং হিম আফটার ফিফটিন ইয়ার্স।

    অ: এ বার শেষে পর পর দুটো যে প্রশ্ন করব, সেটা শুনে তুমি কি উত্তর দেবে তা তুমি জানো, শুধু পরে উস্কানোর গালাগালি করবে না। এক তোমার ছবি কারা দেখে ? যারা সৃজিতের ছবি দেখে তারা না যারা কিউয়ের ছবি দেখে তারা ?
    আরেকটা হল বাঙালি মোটামুটি বাইনারি তে ভাবে। এখন বাংলা ছবি মোটামুটি গোয়েন্দা অধ্যুষিত। তো সেই বাজারে কিউ সম্প্রতি ‘ফাক মানিক’ বলেছে। আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কিছু দিন আগে ঋত্বিককে আক্রমণ করেছিলেন। তাতেও সেম বাইনারি তৈরি হয়েছিল। এতে যা হয় বাঙালি ঋত্বিক-সত্যজিৎ ইত্যাদি নানারূপ করে থাকে। তুমি সেইখানটা কীভাবে দেখতে চাও…

    সু: এক… আমার অডিয়েন্সকে … তুমি যদি দেখো যে আমি যে ছটা বা সাতটা ছবি করেছি, সেগুলো সবই বিভিন্ন জ্যঁর এর, আমি বলব যে ‘নোবেল চোর’ বা ‘কাদম্বরী’র মতো ছবি অনেকটা বৃহৎ অডিয়েন্সের জন্যে, আবার শ্যামলকাকু… এক্সট্রিমলি এসোটেরিক একটা ছবি, আমি সে ভাবে দর্শক ভেবে বলতে গেলে… আমি জানি ছবি অনেক দর্শকের জন্যে করতে গেলে কি করতে হয়, তা বলে কি আমি ‘শ্যামলকাকু’ বা ‘পিস হেভেন’ বানাবো না ? শুধু ‘কাদম্বরীর’ মতো হিট ছবি করব? আরেকটা হল … যেহেতু আমি জীবিকার জন্যে সিনেমা বানানোর ওপর নির্ভরশীল নই এবং এটা একটা অ্যাডভান্টেজ যে আমি চাইলে শ্যামলকাকুর মতো বা ‘পিস হেভেনে’র মতো ছবি বানাতে পারি, আমি জানি তার দর্শক কম… এবং তাতে ক’জন সেটা দেখল তা নিয়ে আমি চিন্তিত না …

    সেকেন্ড প্রশ্ন টা নিয়ে আমার খুব কিছু বলার নেই… আমি তখন কলকাতায় ছিলাম যখন কিউ এই মন্তব্যটা করে… আমার যেটা হাসি পেয়েছিল দেখে যে এটা নিয়ে একটা লিডিং সংবাদপত্র একটা বড় ফ্রন্ট পেজ স্টোরি করে… এটা একটা লেভেল অফ জার্নালিজম যদি হয়… দেখো কিউ এর সত্যজিতের ছবি ভাল নাই লাগতে পারে, সেটা বিষয় নয়… আমি সেটাতে কোন গণ্ডগোল ও দেখি না… তবে কিউ এর মধ্যে একটা অহেতুক সেন্সেশনালিজমের প্রবণতা তো আছেই ফর শিওর… এবং যেটা বলছি আমার কিন্তু রিয়ালি এটা মনে হয় যে… হি অ্যাজ এ পারসন, যার সেই আর্টিস্টিক ভিশন টা আছে, যা খুব রেয়ার এই কলকাতা ফিল্মমেকার দের মধ্যে। সেটা আমি আদিত্য বিক্রমের বিষয়ে বলতে পারি আর কিউয়ের সম্পর্কেও, মানে আমি যাদের চিনি আরকি। সেখানে দাঁড়িয়ে আমার কিউ এর এই অহেতুক সেন্সেশনালিজমটা একটু ইম্মাচিওর লাগে। আর এই ইম্মাচিওরিটিকে আমি খুব একটা পাত্তাও দিতে চাই না… মানে ওর এই কমেন্টটাকে…
    • আর সৌমিত্র চ্যাটার্জির কমেন্টটা অন ঋত্বিক ঘটক… আমি পার্সোনালি ওঁকে চিনি… ওনার কিন্তু ঋত্বিকের প্রতি গভীর রেস্পেক্ট আছে। যদিও আমি জানি… ব্যক্তিগত ভাবে উনি সত্যজিৎকে ভাবেন এ বেটার ফিল্মমেকার দ্যান ঋত্বিক ঘটক। এই রকম বাইনারিতে অত কিছু সমস্যাও নেই… আবার একই কথা বলছি, কে কি ভেবে কখন একটা বলেছে, সে নিয়ে আমি অত পাত্তাও দিতে চাই না।

    অনামিকা: ধন্যবাদ সুমন, আশাকরি পৌঁছে গেছ এতক্ষণে। আবার কথা হবে।

    SHARE