সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: বাবার বন্ধু, আমারও সঙ্গী

    কঙ্কাবতী দত্ত
    বুদ্ধদেব বসুর নাতনি। দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। গল্প, উপন্যাস, ও রম্য রচনা লেখেন।

    কবিতা ভবনের বহুবর্ণিত আড্ডাস্থল দুশো দুই রাসবিহারী অ্যাভিনিউ। এই বাড়িটি ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে আমার বাবা, মা, জ্যোতির্ময় ও মীনাক্ষী দত্ত তাঁদের কবি সাহিত্যিক শিল্পী বন্ধুদের কিছু লিখতে বা আঁকতে বললেন দেয়ালে। জোরে গান গাইছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ভাস্কর রায়চৌধুরী দেয়ালে আঁকছেন। এই সময়ই বাবা ময়দানে একটা ঘটনা ঘটিয়েছিলেন– কবি শিল্পী বন্ধুদের নিয়ে মুক্তমেলা। শীতের সকাল জুড়ে গাছে গাছে ছবির প্রদর্শনী হবে, সকলে খোলা গলায় গান গাইবেন, কবিতা পড়বেন, আড্ডা দেবেন ঘাসে বসে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গাছের নীচে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়েছেন, পুলিশ মেলা তুলে দিতে এলে কবি তুষার রায় বললেন:
    “পুলিশ ওরে পুলিশ
    কবির সামনে কথা বলতে
    টুপিটা তোর খুলিস!”
    হয়তো এই ‘মুক্তমেলা’ থেকেই এসেছে ‘বইমেলা’র কনসেপ্ট। কলকাতা বইমেলা। একটি ছোট মেয়ের চোখে সকলের মাঝে দেখা এই সুনীল: আমার সুনীলমামা, একদিন আমার, একান্ত ব্যক্তিগত বন্ধু হয়ে উঠলেন।
    “তোমার বাবা বা মা বাড়ি নেই?” এই প্রশ্ন সুনীলমামার ঠোঁট থেকে আমার কানে আসার কয়েক মুহূর্ত আগে আমি নিজেই দরজা খুলে দিয়েছি কলিংবেলের আওয়াজ শুনে, আমি হেসে তাকালাম। “তুমি ভেতরে এসে বোসো, ওরা এসে পড়বে। আর যদি মনে করো, ওদের কিছু বলার আছে যে-মেসেজটা আমি দিতে পারি, তাড়া থাকলে সেটাও বলতে পারো আমায়”
    সুনীলমামা আমার হাতে একটা বই দিল। “আমি এই বইটা তোমার বাবা মা’কে উৎসর্গ করেছি। আমার কবিতার বই। এটা দিতে এসেছিলাম।
    বইটা খুললাম। রঙিন প্রচ্ছদে নামটা জ্বলজ্বল করছে: ‘এসেছি দৈব পিকনিকে’ অর্থাৎ এই জীবনটা একটা অপূর্ব পিকনিক– উপভোগ্য চড়ুইভাতি করতে আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি। অনেক পরে বুঝেছি, কাব্যগ্রন্থের এই নামটার মধ্যেই সুনীলের গোটা জীবনদর্শন ধরা যায়। বন্ধুত্ব, প্রেম, সব কিছুর মধ্যে ভাল দিকটাই শুধু দেখতে চাওয়া এই দিয়েই গাঁথা ছিল সুনীলের রঙিন জীবন। প্রত্যেকের সঙ্গে তার মধুর ভালো ব্যবহার অসংখ্য হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে– অসংখ্য বন্ধুবান্ধবকে মিলিয়ে দিয়েছে পিকনিকের মেজাজে।
    যে কোনও আড্ডায় সুনীল আসা মানেই ব্যপারটা দারুণ উপভোগ্য হয়ে ওঠা যেহেতু সে সবাইকে হাসাতে পারে, গান গাইতে প্রবৃত্ত করে, বোর করে না, সাধ্যমতো আত্মীয়র মতো করে গ্রহণ করে, অথচ কাউকেই বেশি আঁকড়াতে যায় না, এক ধরনের উদাসীনতা কিন্তু থাকে প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে বা মেলামেশার মধ্যে। “আমি কিন্তু তোমার একার নই, আমি সকলের।” এই রকম একটা অকথিত, অব্যক্ত উপাদান বা ভাব তার সম্পর্ক, মেলামেশা বা বন্ধুত্বের মধ্যে থাকত। এটা যেমন নারীর ক্ষেত্রে– অর্থাৎ তার মেয়ে বন্ধু, বা বান্ধবীদের ক্ষেত্রে ঘটত, তেমনই সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বাদ যায়নি। “সুনীলদা এবারের উপন্যাস শুধু আনন্দবাজারকেই দেবেন। তার জন্য আপনি যা চান, টাকার যে-কোনও অঙ্ক দেওয়া হবে।” এই প্রস্তাবের উত্তরে সুনীলমামা একটু হেসেছিল। “আমি শুধু আনন্দবাজারের লেখক নই, আমি সারা বাংলার লেখক।” আমাকেও একবার হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “ছোটরা কিন্তু মিথ্যে কথা বলে না। লেখা খারাপ হলে বাচ্চারা মুখের ওপর বলে দেয়, খারাপ হয়েছে তোমার লেখাটা, একদম বাজে, এক্কেবারে ভালো লাগেনি!” পুজোসংখ্যার লেখা ধরার সময় আমি প্রথম যাদের চাহিদা মেটাই তারা হল লিটল ম্যাগাজিন। যারা কষ্ট করে গ্রাম গঞ্জ মফস্বল থেকে বা কলকাতার শহরতলি আর গলির ছেঁড়া পকেটের পুঁজি থেকে নিছক কবিতা বা সৃজনের প্রতি প্রেম থেকে পত্রিকা বার করছে, তার জন্যই লিখি প্রথমে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চাদের বা ছোটদের জন্য লেখা দিই। শেষে চাকরিসূত্রে যে সংস্থার সঙ্গে আমি যুক্ত সেই আনন্দবাজার পত্রিকা বা দেশ পত্রিকার লেখাগুলো ধরি। অর্থাৎ সে-সব লেখায় টাকা আসে, অর্থ উপার্জন হয়।” সুনীলমামার সঙ্গে এই সব কথোপকথন অসংখ্য দিনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে, বালিকা থেকে কিশোরী থেকে যুবতী হওয়ার দিনগুলোতে। মেয়েদের বড়ো হওয়ার পথে কিছু একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যা তৈরি হয়, অনেক সময় নিজের বাবা মা’কেও যা বলা সম্ভব না। দেখতে ভালো হলে আরও মুশকিল। বাচ্চা মেয়ের সৌন্দর্য তার বিড়ম্বনাই হয়ে দাঁড়ায়। বেশ অল্প বয়স থেকে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আবিষ্কার করেছি নিজেকে। লাজুক, ইন্ট্রোভার্ট ধরনের ছিলাম, ছেলেদের এই ব্যপারটা ত্রস্তই করত আমাকে। কো-এডুকেশন স্কুলে ছেলে মেয়েরা পরস্পরকে আলাদা চোখে না-দেখার চেষ্টা করে আজকাল। তুই তোকারি করে ইয়ার বন্ধুর মতো। কিন্তু আকস্মিক প্রেম নিবেদন, অনুসরণকারী, প্রেমপত্রটত্র-র সম্মুখীন হলে সলজ্জ সংকোচে এড়িয়ে যেতাম। এখনও মনে পড়ে সেই হ্যান্ডসাম, ধনীপুত্রের কথা, বাবার কাছে তাদের সংবাদপত্রের ব্যাপারে আসাযাওয়া করতে করতে যিনি বলেইছিলেন: “আমি তোমার প্রেমে পড়েছি, তোমার বাড়ি আমার মন্দিরের মতো, এখানে আমার কাছে কেউ কিছু অনুরোধ করলে আমি না করতে পারি না।” এ মন্তব্য করার মুহূর্তে তার চোখ ছলছল করে উঠেছিল অশ্রুতে–যে চোখের জল অনুভূতির তীব্রতায় আসে। এর অল্পদিন পরেই বাবার আমেরিকান ছাত্র কলকাতা ঘুরতে এসে বললেন, আমায় বিয়ে করো, চলো আমেরিকায়। ও দেশেই নাহয় পড়াশোনা শেষ করবে। এ সব কথা কাকে বলা যায়? সুনীলদাকে বলেছি। পুজোসংখ্যার লেখার জন্য নির্ভয়ে কাজ করতে যেখানে সময় কাটাতেন, সেই গোপন জায়গাটিও চিনিয়েছিলেন আমায়। দুজনেই দুজনের জীবনের নানা কথা বলতাম, ডায়রিতে আমি যে পঙক্তিগুলো সবে লিখতে শুরু করেছি, সেই লেখাগুলো সুনীলমামা খুব মন দিয়ে পড়েছে, গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে। কখনও বা আমারা বসেছি চাংওয়াহ রেস্তোরাঁয়।
    সেই দিন বাবা মা’কে বই দিতে আসার মুহূর্ত থেকে যে বন্ধুত্বের সূচনা, সেটাই আমাদের নিয়ে এল বৃষ্টি ভেজা সকালে চাংওয়াহ রেস্তোরাঁতে। এখানে আমার দুজন বিশেষ বন্ধুর সঙ্গে সুনীলমামার আলাপ করাব, এমনটাই কথা ছিল। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে আসছে সুনীল, গায়ে নীল শার্ট, হাতে সিগারেট, ছাতা-টাতার ধার ধারে না। আমার বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় এবং একটু গল্প করে অফিস যাওয়ার কথা।
    বড় হওয়ার পথে আমার যে-কোনও পরামর্শ, গোপন কথা বিনিময়ের পাত্র ছিলেন এই বয়োঃজ্যেষ্ঠ বন্ধুটি, যাকে কখনও মনে হয়নি আমার চেয়ে বয়সে বড় একদম সমবয়সির মতোই মিশেছেন।
    “তোমার জন্মদিন কবে?” আমার এই প্রশ্নে সুনীল হেসে বলেছিলেন, “জন্মদিন? সে তো জানি না! তবে স্বাতী একটা দিন নির্দিষ্ট করেছে আমার জন্মদিন হিসেবে—সাতই সেপ্টেম্বর।“
    আমাদের এই বন্ধুত্বে দু’পক্ষেরই ব্যক্তিগত কথার আদান-প্রদান করার বাঁধ ছিল না। আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসে সুনীল আসতেন বেলার দিকে। অফিসের আগে পরে প্রায়ই কোথাও না কোথাও যেতে হত, তরুণ কবি শিল্পী অনুরাগীদের অনুরোধ রাখতে। “আজ কোথায় যাচ্ছ?” আমার এই জিজ্ঞাসায় সুনীল বলেছিলেন, “আমাদের একটা আড্ডা আছে, এ ই ই আই আলাবের ওপরটায়। সেই গ্রুপে মেয়েদের মধ্যে একজন আমাকে একটু বেশিই পছন্দ করে, তার বর আমার আমার বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও। সবচেয়ে যেটা অসহ্য লাগে, আমার সামনেই স্বাতীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। একদিন আমি ওকে বললাম, তুমি যদি স্বাতীকে কষ্ট দাও, আমার কাছেও কিন্তু একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র আছে, তোমার ওপর প্রয়োগ করব। ও ত্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী সেটা? বললাম, সেই অস্ত্রের নাম উপেক্ষা!”
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জনপ্রিয় ছিলেন প্রায় ম্যাটিনি আইডলের মতো। চিত্রতারকাদের মধ্যেও সকলের এই রকম ফ্যান ফলোইং হয় না। চেনা অচেনা, অর্ধপরিচিত ছেলে মেয়েরা সুনীলমামার দারুণ ভক্ত হয়ে পড়ত, এবং তার মধ্যে সকলের জন্যই ডালায় করে সাজানো থাকতো সুনীলের মনোযোগ। মেয়েদের জন্য একটু বিশেষই হত তার মনোযোগের অর্ঘ্য।
    “আমি স্বাতীকে গোপন করে কিছুই ঘটতে দেব না আমার জীবনে, কিন্তু প্রত্যেক পুরুষ বা নারীর অভিজ্ঞতাতেই এমন কিছু আছে যা গোপন নয়, ব্যক্তিগত”। গোপন নয়, ব্যক্তিগত—এই কথাটা প্রায় স্লোগানের মতো ঘুরেছে আমার কলেজজীবনের বন্ধুবান্ধবের মধ্যে। বিতর্কিত, আলোচিত হওয়া খ্যাতিরই লক্ষণ। সুনীল ও স্বাতীর বর্ণময় সামাজিক জীবন নিয়ে নানা রকম গুজব রটত—খ্যাতির বিড়ম্বনা। শুধু দেশে নয়, ইওরোপ আমেরিকাতেও সুনীল ও স্বাতী গেলে উৎসব লেগে যেত প্রবাসী বন্ধুবান্ধবের মধ্যে। যাদের স্ত্রীরা বরকে মদ সিগারেট খেতে দিতে চায় না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়য়ের আগমনে সেই সব বন্ধুও ছাড় পেয়ে যায় বিধিনিষেধের ঘেরাটোপ থেকে। কবিতা, গান, আড্ডা, বন্ধুত্ব পার্টির স্রোত ঘোরে সুনীলের ব্যক্তিত্বকে ঘিরে। স্বাতী নাকি নূপুর গাঙ্গুলির হারমোনিয়ামে লাথি মেরেছে—এই গুজব শুনে হেসেছিলাম। যে বলছে সে স্বাতীকে চেনে না নিশ্চয়ই। এমন মধুর স্বভাবের পবিত্র একটি মেয়ে স্বাতী, অথচ তার প্রতি অনেক সুনীল অনুরাগীর কী ঈর্ষা!
    “তোমার কী ভাগ্য! দারুণ স্ত্রী পেয়েছ—আমার এই মন্তব্যে সুনীলমামা হাসত। “আমার ভাগ্য মানে—আমি নিজে কি খুব খারাপ?” আমিও হাসতে হাসতে বলতাম, “না, মানে তোমার অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে অনেকেরই কিন্তু এ রকম পত্নীভাগ্য জোটেনি। “কেন তোমার বাবা?” সুনীলের এই প্রশ্ন মেশা মন্তব্যের মধ্যে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যে সময় মরিচঝাঁপির নিরীহ নারী পুরুষ শিশুদের ওপর পুলিশ লাঠি চালিয়েছে ওই ভূমি থেকে তাদের বিতাড়িত করার জন্য। বাবা তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করলেন, কয়েকজন বুধিজীবীকে সংগঠিত করে। উদ্বাস্তুদের সপক্ষে অসংখ্য লেখা খবরের কাগজে লিখলেন। চারদিকে অরণ্য, তাড়া খেয়ে ডাঙা থেকে জল সাঁতরাচ্ছে মেয়েরা, নৌকোর কোনা ধরার জন্য হাত বাড়াতে পুলিশের ডান্ডা সে হাত ভেঙে দিচ্ছে, শিশুদেরও বাড়ি মারতে ছাড়ছে না, এই পরিস্থিতিতে, বাবা সুনীলকে ডাক দিয়েছিলেন আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য। এতগুলো মানুষ যাবে কোথায়? কর্পোরেট সোশাল রেস্পনসিবিলিটির (সি এস আর) টাকা নয়, সরকারি অনুদান তো নয়ই, লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের সংগঠিত করে বাবা তাদের আশ্রয়ের জন্য তৈরি করেন দুটো গ্রাম। যাম নাম দেওয়া হল ‘পথের শুরু’ ও ‘পথের শেষ’—ঘুঁটিয়ারি শরিফের কাছে। অম্লান দত্ত, শিবনারায়ণ রায়, নীলাঞ্জন হালদারের মতো বুদ্ধিজীবীরা সমর্থন করলেন সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে। রাজনীতির মধ্যে সুনীল সাধারণত জড়াতেন না, এ ক্ষেত্রে দল বেঁধে লঞ্চে করে মরিচঝাঁপি গেলেন, ব্যাপারটার সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত হলেন। উদ্বাস্তুদের জমি কেনার জন্য টিকিট বেচে নাটক, গান, টাট্টু ঘোড়ার দৌড়, কবিতাপাঠ, খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হল।
    বিপন্ন শিশু নারী পুরুষদের জন্য গাড়িটি পর্যন্ত বন্ধক দিলেন বাবা। তথাকথিত শুভানুধ্যায়ীদের একজন ওখানে যাওয়ার বিপদগুলো চিহ্নিত করায় হাসতে হাসতে সুনীল বললেন, “জ্যোতি যদি আমাকে বলে নরকে চলো, আমি সেখানেও যেতে রাজি আছি জ্যোতির ডাক শুনে।’’
    অ্যামেরিকায় নিউ ইয়র্কের কাছেই নিউ জার্সি, এখানে আমার বাবা মা থাকেন। সেখানে এক নতুন সংস্থার আয়োজনে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলন হচ্ছিল ২০০৭-এ। আমি নিউ জার্সিতে গেলাম তাদেরই নিমন্ত্রণে সে বছর। পৌঁছনোর দিন কয়েকের মধ্যেই সুনীলমামার ফোন পেলাম। “আরে আমিও তো আছি নিউ জার্সিতে। গৌতম দত্তর বাড়িতে আছি। আমি গৌতমকে বলছি, তোমাকে নিয়ে আসতে। একসঙ্গে খাব, আড্ডা মারা যাবে”।
    টিলা, জঙ্গল, ফুলের বাগানে ভরা নিউ জার্সির সুন্দর নিসর্গ পেরিয়ে গৌতমদা তার হুড খোলা গাড়ি করে আমায় নিয়ে এলেন তাঁর প্রাসাদোপম বিলাসবহুল বাড়ির প্রশস্ত বসার ঘরে। এক দিকে কাচের মধ্য দিয়ে বিশাল বাগান দেখা যাছে। সুনীলমামা হেসে অভ্যর্থনা করলেন। “তোমার অসুবিধা হয়নি তো আসতে?”
    “না না—দারুণ সুন্দর রাস্তা। আমাকে একজন বলল, নিউ জার্সিতে নাকি অনেক বাঘ আছে। এখানে বাঘের ব্রিডিংও নাকি হয়। আমার এই মন্তব্যে সুনীল গৌতমকে জিজ্ঞেস করলেন, তাই গৌতম, এখানে বাঘ বেরোয়?” গৌতম মাথা নাড়লেন, “আমি শুনেছি। হরিণ তো আছেই, সর্বত্র দেখতে পাবেন। বাঘটাঘ দেখিনি। মনে হয় সংরক্ষিত এলাকায় থাকে। যাই হোক, সুনীলদা আপনার অনারে আমি একটা নতুন বার তৈরি করেছি বাড়ির বেসমেন্টে। চলুন সবাই মিলে একটু পানাহার করি। কী খাবে তিতির?”
    সুনীল বললেন, “বাঘ দেখতে একবার খবরের কাগজের তরফ থেকে সুন্দরবনে আমায় পাঠানো হয়েছিল রিপোর্টিংয়ে। সুন্দরবনে যে গুনীনরা ছিলেন, তারা নাকি মন্ত্র পড়ে বাঘেদের বশ করতে পারে। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ওদের ওপর আমার লেখা চাওয়া হল। সুন্দরবনে উঠে গুনীনদের খোঁজ করলাম বাংলোতে উঠে। আপনি মন্ত্র পড়ে বাঘ বশ করতে পারেন? আমায় চাক্ষুষ দেখাতে পারবেন? এ পশ্নের উত্তরে গুনীন বলল, আপনি কক্ষনো এই গভীর জঙ্গলে যাবেন না। আপনি বরং আমায় টাকা দিন, আমি বাঘ বশ করে আসছি। আমি বললাম, না না আমি সঙ্গে যাব। আমার সামনে বশ করতে হবে মন্ত্র পড়ে। এ কথা বলায় গুনীন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার পর মাথা চুলকে বলল, একটা ব্যাপার হলে কিন্তু বাঘ বশ হবে না আমার দ্বারা। “সেটা কী” জিগ্যেস করায় বলল, “বাঘের যদি সে দিন জন্মদিন হয়, তা হলে কিন্তু কোনও মন্ত্রই খাটবে না, বাঘ বাঘের মতোই থেকে যাবে—কোনওটা হিংস্র, কোনওটা কম হিংস্র”।
    সুনীলমামার এই গল্পে খুব হাসলাম। রসিকতায়, মজার গল্পে, গানে সুনীল ভরিয়ে দিতেন আড্ডা। সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে অনেকে ঈর্ষা বা বিদ্রুপের সুরে বলেছেন, রসিকতা ও মজার গল্পগুলো সুনীল তৈরি করে আসে, ভালো আড্ডা দেওয়াটা প্র্যাকটিস করে এক ধরনের আড্ডার মতো। জীবনে সব কিছুই যে চর্চার অপেক্ষা রাখে সেটা তাঁরা ভুলে যান। ম্যানার্স, এটিকেট থেকে আর্ট অব কনভারসেশন সবই পাশ্চাত্য সভ্যতায় চর্চার বিষয় হিসেবে শেখানো হয়। কথোপকথন তো বটেই, উচ্চমানের শিল্প বিশেষত ভারতে যেখানে রামায়ণ মহাভারত থেকে শুরু করে শ্লোক ধর্মগ্রন্থ অনেক কিছুই কথ্যভাবে চলে এসেছে। আর Oral Tradition পাশ্চাত্য সভ্যতায়? ম্যানার্স থেকে এথিকস সব কিছু নিয়ে লেখা হয়েছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা, খণ্ডের পর খণ্ড।
    আপাতদৃষ্টিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে হত জীবনকে খেলাচ্ছলে দেখছেন। খুবই হালকা চালে, কেয়ার ফ্রি! মজা, ভোগ, ফুর্তি, ভালোবাসায় কাটাতেই যেন তিনি বিশ্বাসী, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে সুনীলের মধ্যে কঠিন নিয়ম শৃঙ্খলা ডিসিপ্লিন প্রতিটি বিষয়ে চর্চিত পরিশ্রম মনোযোগের চোরাস্রোত লক্ষ করা যেত। কলকাতার লেক ক্লাবে রবিবার রবিবার দুপুরে আড্ডা হত সুনীলকে ঘিরে। সেই দিনটা বাদে কোনও দিনই দিনের বেলা মদ্যপান করতেন না। অথচ নিউ জার্সিতে সে দিন গৌতম বারবারই বলে চলেছে, “সুনীলদা, তিতির চলো আমার ‘বার’-এ। এই পানশালা আমি সুনীলদার জন্য তৈরি করেছি। একটু কিছু খাবে না?” গৌতমদার সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানটিতে যেতে না যেতেই খাদ্য পানীয় এসে গেল। বাহারি ছাউনি দেওয়া, আলঙ্কারিক বিয়ার ব্যারেল, স্টুলে বসা হল। ওয়েস্টার্ন গ্যাংস্টার সিনেমার আদলে সাজানো এই পানশালায় বসে গৌতমদা পরপর পড়তে লাগলেন নিজের কবিতা। সেই সঙ্গে তাঁর প্রিয় সুনীলদাকে ঘিরে নানান স্মৃতিচারণ চলতে লাগল বিয়ার খেতে খেতে। হলদিয়া কবিতা উৎসবে নিজে বেশি কবিতা না পড়ে সুনীল কীভাবে গৌতমকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন কবিতা পড়ার জন্য, প্যারিসে কোনও সাংস্কৃতিক উৎসবে গৌতম প্রথম আলাপ করায় সুনীল কতখানি উষ্ণতা, বন্ধুত্ব দেখিয়েছিলেন সেই গল্প চলাকালীন আরেক ভদ্রলোক এসে যোগ দিলেন আড্ডায়। উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে গৌতমদা একটু বেশি পান করে ফেলেছেন। অথচ মদ্যপান করে গাড়ি চালানোয় নিষেধ আছে আমেরিকায়। ড্রাইভিং হোওয়াইল ড্রিংকিং একেবারেই বেআইনি করে দিয়েছে ও দেশের সরকার। একবার এই ব্যাপারে ধরা পড়ায় গৌতমদা নাকি বলেছিলেন “আমাদের হিন্দু ধর্মে সোমরস পান করাটা ধর্মীয় রীতি। আমি মন্দিরে যাচ্ছি। এ দেশে সব ধর্মকে নিরপেক্ষ ও সমান চোখে দেখার নিয়ম। এ ব্যাপারে বাধা দিতে এলে কিন্তু রিলিজিয়াস ডিস্ক্রিমেনশানের কেস করে দিতে পারি। অর্থাৎ ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ আনব”। দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হয়ে এল। শেষমেশ ওই তৃতীয় ব্যক্তি যিনি পরে এসে আড্ডায় যোগ দিয়েছিলেন সেই ভদ্রলোকই বাড়ি পৌঁছে দিলেন আমায়। তিনি আবার রাস্তা ভাল চেনেন না। অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলায় ঘুরপাক খেতে খেতে বেশ রাত হল ফিরতে। এর দিন কয়েক পরেই আমার জন্মদিন উপলক্ষে দু’রকম পার্টি হল। দুপুরের লাঞ্চ পার্টিতে মা বাবা যাদের নেমন্তন্ন করেছিল তাদের মধ্যে গৌতমদা আর সুনীলমামা তো ছিলেনই। দুজনের হাতেই ছিল সুন্দর সুন্দর উপহার—দামি সুগন্ধের পারফিউম। সেই সঙ্গে গৌতমদা একটা বার্থডে কার্ডও এনেছিলেন যাতে লেখা ছিল “তিতির, এই জন্মদিনটা ভুলো না।” আমেরিকার এই শহরে সুনীলের অজস্র বন্ধু ভক্ত অনুরাগী ছড়িয়ে আছে। একা গৌতম নয়, নূপুর, ধৃতি, সুছন্দা, কার্ল অনেকরই দারুণ ইচ্ছে, সুনীলদা তাদের সঙ্গে, তাদের বাড়িতে কাটিয়ে যান কয়েকটা দিন— দু-একদিনও যদি থাকেন, সেই সময়টুকু অমূল্য হয়ে থাকবে তাদের মননে, স্মৃতিতে। বাবা মা’র বাড়ির সুইমিং পুলের ধারে দুটো নারীকণ্ঠ ভেসে এল। “সুনীলদা গৌতমকে এত পাত্তা, এত প্রেফারেন্স দেয় কেন রে?” “জানি না। আমরা কলকাতায় গেলে সুনীলদা যা সময় দেন, গৌতমদা তাঁর চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ পায় সুনীলদার। দারুণ প্রিয়পাত্র”। এই কথার উত্তরে প্রথম মহিলা টিপ্পনী কাটার ভঙ্গিতে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলেন। “আমি শুধু ভাবছি, আজকের এই পার্টি থেকে কার গাড়িতে ফিরবে সুনীলদা?’’
    “কেন গৌতমের সঙ্গেই তো এসেছেন”। এ মন্তব্য শুনে প্রথমজন গলা নামিয়ে বললেন “এখানে একজন সুন্দরী এসেছেন, তিনি একাই থাকেন—ডিভোর্সি। পেশায় ডাক্তার, টাকার শেষ নেই কিন্তু নিঃসঙ্গতায় ভোগেন, অনুভূতিপ্রবণ বলে। সাহিত্যপ্রিয়—লেখার শখ আছে”। এই উক্তিতে দ্বিতীয়জন হেসে ঘাড় ঘোরালেন। “তুমি কার কথা বলছ আমি বুঝতে পেরে গেছি”। এ কথাটা বলায় প্রথম জন বললেন, “শুধু সুনীলদাকে নিয়ে ফিরবে বলে একটা নতুন গাড়ি কিনেছে ও। হুড খোলা গাড়ি, ও নিজেই চালায়। গাড়িতে মাত্র দুটোই সিট—টু সিটার গাড়ি—দুজনের বেশি বসা যায় না। মহিলার পরিকল্পনা হল পৌঁছে দেওয়ার নাম করে সুনীলদাকে সোজা নিয়ে যাবে নিজের বাড়ি। সেখানেই আজ রাতটা সুনীলদা থাকবেন আশা করে ও সেরা হুইস্কি রেখেছে, সুনীলদার প্রিয় ব্র্যান্ড। মোমবাতি জ্বালিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা করেছে।’’
    তাই নাকি?
    “তোমার সিঁথির বীথিপথ ধরে
    সোজা ড্রাইভ করে যাব আমি
    বাঘের যোগ্যা তুমি
    আমি বাঘিনীর রোমাঞ্চ শরীরে মেখে শুয়ে থাকতে চাই”।
    “এটা কার লেখা”
    “তৃষ্ণা রায়।’’
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই উদ্দাম, দিলখোলা জনপ্রিয়তাকে তীর্যক বিদ্রুপের দৃষ্টিতে অনেকে দেখেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী লেখকদের মধ্যে। বইমেলায় দাঁড়িয়ে একজন আঙুল তুলে তাচ্ছিল্যের সুরে নিন্দে করেছিলেন—“ওই দ্যাখ সুনীল স্টলে স্টলে যাচ্ছে। যে যেখানে ডাকে, চলে যায়।” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বভাবের এই দিকটির তাৎপর্য তখন বুঝিনি। এখন মনে হয়, যিশু খ্রিস্টের বাণী হিসেবে যা প্রচারিত সেই “লাভ দাই নেইবার” অর্থাৎ প্রতিবেশীকে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবিই যেন দেখেছি সুনীলমামার জীবনদর্শনের মধ্যে, বাঁচার ধারায়। নারী-পুরুষের ঘনিষ্ঠ প্রেমের দৃশ্য সেন্সরবোর্ড বাতিল করে দেওয়ায় লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন: “এরা ঘৃণাকে খারাপ বলছে না, রক্তারক্তি, মারামারি, খুনোখুনিকেও নয়, যা অশ্লীল বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তা হল ভালোবাসা—যে ভালোবাসার মন্ত্র ছাড়া জীবন শুকনো, নিষ্ঠুর, অর্থহীন মরুভূমির মতো।’’ সকলের মাঝে সহজে মিশতে পারা, কাউকে তাচ্ছিল্য না করা, যত সামান্যই হোক, প্রত্যেকের প্রয়াসকে মনোযোগ গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া যে কত বড় গুণ, সুনীলের চরিত্রদর্পণ নিয়ে ভাবতে বসলে আজ তা উপলব্ধি হয় প্রিজমের মতো বিচ্ছুরণে, স্মৃতির আলপথ ধরে যা নিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে।
    এক সময় জীবনে এমন একজনকে পেলাম, আমাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা, আমাকে বোঝার চেষ্টা যার জীবনের ব্রত ছিল। যে আমাকে জিগ্যেস করত আমার ছোটবেলার কথা, আমার অনুভূতির কথা, আমার স্বপ্ন, ইচ্ছে অনিচ্ছে ভাল লাগা খারাপ লাগা যার কাছে ছিল সবচেয়ে জরুরি।
    কল্যাণ। কল্যাণের প্রেরণায় এগিয়ে নিয়ে গেলাম সাহিত্যসৃষ্টি। সুনীলমামা আমার গল্প উপন্যাস পড়তেন, লেখাগুলোর প্রশংসা করতেন, কিন্তু এও বলতেন ‘তিতির, এখন আর আমার কথা খুব একটা মানছে না পত্রিকার দপ্তর। তোমার লেখা ছাপার ব্যাপারে কতটুকু সাহায্য করতে পারব জানি না। হয়তো পারব না’।
    “পারতে হবে না! তোমার কাছে তো লেখা ছাপার ব্যাপারে আসিনি! তুমি আমার লেখা এত মন দিয়ে পড়েছ, সেটাই আমার পুরস্কার, আমার উপহার”।
    সেই সময়ই আমি এবং সুনীলমামা দুজনেই পেলাম ছোটগল্পের জন্য পুরস্কার। পুরস্কারটার নাম: স্নো সেম আনন্দ পুরস্কার।
    খোলা দরজা। সুনীল-স্বাতীর বাড়িতে সকলের ছিল অবারিত দ্বার। বাড়ির পরিবেশটা যেন ‘জগতে আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’-এর কলি। সেখানে আমিও নিয়মিত অতিথি ছিলাম। কখনও বাবা-মা’র সঙ্গে, কখনও বা নিজে নিজে একা।
    আমার, স্বাতীমামীর এবং সুনীলমামার একটা নিজস্ব আড্ডা ছিল সকালবেলা, ব্রেক ফাস্টের সময়টা। সুনীলমামার প্লেটে নানা রকম ফল থাকত—এক টুকরো জামরুল, একটু পেয়ারা, গোলাপজাম, পেঁপের টুকরো, আপেলটাপেল তো থাকতই। একটা হাফ বয়েলড ডিম অনেক সময়ই, একটা মাখন টোস্ট। সুনীলের ডাক্তার বন্ধু ভূমেন্দ্র গুহ নাকি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, যেগুলো চড়ে বেড়ায় সেগুলো খেয়ো না, (অর্থাৎ গাধা,গরু,শুয়োর ধরনের প্রাণী) যেগুলো সাঁতরে বেড়ায় তাদের ব্যাপারটা (যেমন মাছ)দেখো। সে সময় দেশ পত্রিকার দপ্তরে কাজ করতেন সুনীল। পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সাগরময় ঘোষ, তাঁর চেম্বারটি অন্য সব কর্মচারীদের চেয়ে বড়ো, ঝকঝকে। সম্পাদকের ঘরের পাশেই লাগোয়া কিউবিকলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কাজ করতেন একটি টেবিলে বসে। “দেশ”-এর পাতায় পরপর উপন্যাস,গল্প, কবিতা, নিবন্ধ ইত্যাদি নানা রকম লেখা বেরুচ্ছে তাঁর, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার চূড়ায় প্রতিস্থিত, অথচ নতুন লেখক লেখিকা, হবু সাহিত্যিক কবি, যশোপ্রার্থীরা এলে সুনীলের বিনয়ী, মধুর, উষ্ণ ব্যাবহার রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। পত্রিকার অন্যান্য কর্মচারী বা বিভাগীয় প্রধানরা যেখানে নতুন লেখকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন, পাত্তা তো দিতেনই না, একেক সময় অপমানজনক কথা বলে কবিদের তাড়িয়ে দিতেন, নিজেদের প্রতাপ জাহির করতেন, সুনীল বাড়িয়ে দিতেন বন্ধুত্বের হাত। তা ছাড়া তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের টানেও তরুণ তরুণীরা তাঁকে ঘিরে থাকতেন। এটা অনেকের চোখে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াত। দীর্ঘদিন সম্পাদকের দপ্তরে সাগরময় ঘোষের সহকারী হিসেবে কাজের তালিম নেওয়ার পর সুনীল সম্পাদক হবেন স্বাভাবিক নিয়মে, এটা একবার এক সাক্ষাৎকারে সুনীলকে জিজ্ঞেস করা হয় তাঁর ‘হবি’ বা ‘শখের’ কথা। “সুনীলদা আপনার কোনও হবি আছে?” “হবি!” “লেখা ছাড়া অন্য কোনো শখ যেমন ধরুন, কেউ হয়তো পুরনো স্ট্যাম্প জমাত, কেউ হয়তো বাগান করে ফুল ফোটাতে ভালোবাসে’’— সাংবাদিকের এই কথাটা শুনে সুনীলদা হাসলেন, “আমি হাসি ফোটাতে ভালোবাসি। হ্যাঁ, আমার স্ত্রী পুত্র তো বটেই, তারও বাইরে বৃহত্তর পৃথিবী, সমাজ, সবাইকে আমার পরিবারের মতো মনে হয়। কোনও সদ্যপরিচিতা নারী বা নবাগত কবি বা যুবকের চোখে খুশির ঝিলিক দেখলে আনন্দ পাই। আমার কোনও ব্যাবহারে যদি কারও মুখে হাসি ফোটে, সে ব্যাপারটা আমার শখ মেটায় বলতে পারো।’’
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই মন্তব্যটিকে নিয়েও নিন্দে করতে ছাড়েনি ঈর্ষাপরায়ণ সমসাময়িকরা। একজন সমালোচনা করেছিলেন “হাসি ফোটাতে গিয়ে পত্রিকাটির তো বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। প্রিয় পাত্র প্রিয় পাত্রীদের আজেবাজে কবিতা ছাপাবার জন্য পাতাগুলো ভরে যাচ্ছে নিম্নমানের লেখায়।’’ এ রকমই এক ঈর্ষাকাতর সমসাময়িক লেখক সুনীলের দারুণ নিন্দা করে একটা মস্ত বড় লেখা ছাপলেন। সুনীল অফিসে ঢোকার আগেই চুপিচুপি এসে তাঁর টেবিলে রেখে গেলেন, যাতে কোনওমতেই নজর না এড়ায়। এর উত্তরে প্রতিবেদন লিখে সুনীল মন্তব্য করেছিলেন “আমাকে নিয়ে এতটা ভাবনাচিন্তা যে ব্যক্তি করেছে, এতটা সময়, এতটা মনোযোগ পরিশ্রম যার গেছে আমার পেছনে, সেই মানুষটির ভালো হোক, সোনার দোয়াত-কলম হোক।’’
    এ ব্যপারটা উল্লেখ করতে গিয়ে আমার মনে আসে যিশু খ্রিস্টের বাণী: ‘‘ক্ষমা কোরো! ওরা জানে না, ওরা কী করছে। লাভ দাই নেবার— তোমার প্রতিবেশীকে ভালবাসার দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করো।’’ আসলে নিখুঁত কেউ হয় না। ভালবাসার চেয়ে বড় ধর্ম নেই।
    একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল কি? বড্ড অতিকথন মনে হচ্ছে, না? যাই হোক, নানা বিতর্ক সমালোচনার জেরেই বোধহয় শেষ পর্যন্ত ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক অন্য কাউকে করার সিধান্ত নিলেন আনন্দবাজার কর্তৃপক্ষ। সুনীলকে নয়।
    একদিন আমরা গল্প করছিলাম, এই বিষয়টি উঠে এলো কথোপকথনে। সুনীলমামা সিগারেট ধরিয়ে আমার দিকে তাকালেন, “আমায় সম্পাদক করা হল না তো, আমি ‘দেশ’ পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দেব।“
    “সে কি? কেন?”
    “আমার চেয়ে কনিষ্ঠ কারও সম্পাদনায় আমি কাজ করব না।“ এই সিধান্ত শুনে আমি অনেক বোঝালাম, যাতে সুনীল না ছেড়ে দেন ওই সংস্থা। শেষে বললাম “এটা তোমায় মানায় না!”
    “কেন”?
    “এ রকম করলে মনে হবে, সম্পাদক হওয়া না-হওয়াটাকে তুমি বড্ড বেশি গুরুত্ব দিচ্ছ। ওই পদটাকে এত পাত্তা দিয়ো না। তুমিই তো বলেছিলে, আমি আনন্দবাজারের লেখক নই, আমি বাংলা ভাষার লেখক”। তুমি কবি, তোমার ভূমিকা সম্পাদকের ওই চেয়ারটার চেয়ে অনেক বড়। চাকরি ছাড়ার কোনও দরকার নেই— যে যা করছে করুক, তুমি লিখে যাও। আমার এই কথাগুলো শুনেছিলেন সুনীল। হ্যাঁ, কথা রেখেছিলেনও।

    SHARE

    LEAVE A REPLY