বিশ্বনাথ বসু
আজকের সময়ে অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা বিশ্বনাথ | পড়াশোনা আর লেখালেখি বড় প্রিয় আশ্রয় তাঁর কাছে | প্রকাশিত বইয়ের নাম 'চরৈবেতি' | বুকের ভিতর বাঁচিয়ে রেখেছেন বাঙালিয়ানাকে‚ যে বাঙালিয়ানার 'গুরু' উত্তম কুমার | তাঁর কলমে গুরুবন্দনা

বড় হয়ে যখন বুদ্ধি হল, কোন কথার কী মানে, মনে মস্তিষ্কে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম – তখন নিউজ চ্যানেলের কোথাও কার্ফু বা ১৪৪ ধারার বর্ণনা শোনার পর, কোথাও ছোটবেলার পারিবারিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিল পেতাম। দেখেছেন, প্রথমটা পড়েই ভাবছেন লেখাটা আমার পাগলামো। আজ্ঞে বর্ণনাটা শেষ হতে দিন। কার্ফু বা ১৪৪ ধারা মানে এক শুনশান রাস্তাঘাট, দোকানপাট বন্ধ। কেউ কোথাও নেই। দূর থেকে শুধু পুলিশের সাবধান বাণী। এ পরিবেশ আমাদের বাড়িতে ছেলেবেলায় সপ্তাহান্তের পরিচিত দৃশ্য ছিল। প্রথমে শনিবার পাঁচটা থেকে। পরে রবিবার পাঁচটা থেকে। টেলিভিশন তখন বর্ষামুখর সন্ধ্যায় তারা খোঁজার মতো। গ্রাম ঘুরলে পাঁচ কি সাত বাড়ি। আমাদের বাড়িতেও হাজির। টিভি বললে তাকে ভুল হবে। একটা পঁয়ষট্টি লিটারের ফ্রিজ আড়াআড়ি ভাবে রাখা যেন। পিছনে আবার আলো জ্বলত। যাই হোক, টিভির সামনের কাঠের দরজা দুহাতে খোলা হতো ঠিক পাঁচটায়। একে একে জড়ো হতে শুরু করল, পরিবার, প্রতিবেশী। পিছনে ফেলে আসত সারা সপ্তাহের সংসারের জাবর কাটা। সুখ-দুঃখের চর্বিত-চর্বণকে পাশে রেখে, চোখ রাখত। ঘরোয়া ম্যাটিনি শোয়ে তাদের ম্যাটিনি আইডলের মুখোমুখি হতে।

আমি শুধু ছেলেমানুষ মন নিয়ে ভাবতাম বিষয়টা কী? একটাই মানুষ, প্রতি সপ্তাহে টিভির সামনে বসিয়ে রাখছে। আর আমাদের স্বাভাবিক হাঁকডাক পাড়া বাড়িকে মিউট করে দিচ্ছে। সিনেমার শুরুতে সকলে মাথায় হাত ঠেকিয়ে কারেন্ট দেবতার অনুগ্রহ চাইছে। কিন্তু আমরা কিছু চাইতে পারব না। কারণ, বাবা, মা, জ্যাঠা, দিদি তখন তাঁর মহিমা দর্শনে বসেছেন। তিনি আসছেন, মুখে তৃপ্তি, চুকচুক আওয়াজ। তিনি তাকাচ্ছেন, মুখের থেকে অস্ফুট উফস বেরোচ্ছে। তাঁর দুঃখে মায়ের, জেঠিমার চাবি বাঁধা কাপড়ের খুট নাকে, মুখে। চোখে জলের ধারা। তাঁর প্রেমের দৃশ্য দেখে অবিবাহিত দাদা, দিদি, কাকা, মাসি মনে মনে পন আঁটছে, একবার জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী পাই কড়ায় গণ্ডায় উশুল করে নেব। বাড়ির বড়দের, মানে বিবাহিতদের দীর্ঘশ্বাস। মনে ফুটবলার হওয়ার ইচ্ছে ছিল, সংসারের জাঁতাকলে পড়ে তা উধাও। এখন মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গল টিভিতে দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো । কারণ, প্রেম পেলে তো হলো না, পারিপার্শ্বিক সঙ্গ দিতে হবে। টেঁপির জ্বর। নন্তের কান কামড়ানো। বাজার বাড়ন্ত। শাশুড়ি বউ-এর নিত্য চণ্ডীপাঠ সব ছাপিয়ে আর প্রেম করবে কখন। তাই আপনি মানে বাঙালির ম্যাটিনি আইডলই ভরসা। শুধু ম্যাটিনি কেন, ম্যাটিনি, ইভিনিং, নাইট সব সময়ই তো আপনি বিরাজমান সেই পঞ্চাশের দশকের শেষ প্রান্ত থেকে। আপনি যে (কী  উপমা দিই?) … সকল মাঝে উত্তম, শুধু উত্তম। আপনি উত্তমকুমার।

আরও পড়ুন:  সাত প্যাঁচে বাঁধা

আমার জন্ম যখন, তখন আপনার কেরিয়ারের রোমান্টিক আলো কিঞ্চিৎ ম্রিয়মান। তবে, চারিত্রিক অভিনেতার অভিনয়ের ছটায় তখন আরেক আপনাকে জন্ম দিয়েছেন। আপনাকে দেখা হলো না। কারণ, আপনার চলে যাওয়ার সময় আমার মাত্র দু’বছর বয়স। পরে যখন টিভিতে আপনার চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখেছি, নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। সেই ছোটবেলা থেকে একটা লাইন আমায় খুব ভাবায় – “কতটা পথ পেরোলে তাকে পথিক বলা যায়’। সব দিক থেকে লাইনটা ভাবায় – কতটা জ্ঞান আহরণ করলে তাকে জ্ঞানী বলা যায়। কতোটা গান গাইলে তাকে গায়ক বলা যায়।’ কতটা, ঠিক কতটার পরে একটা বাঙালি ছেলে নিজেকে আপনি করতে পারবে। মানে ‘উত্তমকুমার’। সে শাশ্বত প্রশ্নের রিপ্রেজেনটেটিভ হলেন বসন্ত বিলাপের ‘চিন্ময় রায়’। আমার বাবার যৌবনবেলার এক ছবি আছে। সেটা দেখলে আজ বুঝি, ঘাড়টা স্লাইড কাত করে তোলা। স্টুডিও পাড়ায় বর্ষীয়ান অভিনেতার উইগ বা কিছু অভিনেতার অভিনয়। আপনার ছবি যে শুধু ছবি নয়। ফ্রাঞ্চাইজির সেন্টারও বটে। যা বাঙালি আজও বয়ে চলেছে।

পরে জেনেছি সে পথ অতো সোজা ছিল না। ফ্লপ মাস্টার থেকে ম্যাটিনি আইডল হতে। তবে আমার চোখে আপনি অল টাইম আইডল। আপনাকেও অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে বারংবার। তাই তো অগ্নিপরীক্ষা দিয়েই আপনার সাম্রাজ্যের শুরু। তারপর। বাঙালির হারিয়ে যাওয়া কোন এক সুরকে আপনি মনে ধরিয়ে দিয়েছেন। যখন আপনার ঠোঁট বলেছে যে, ‘সাত সাগর আর তেরো নদীর পারে’। আপনার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে। বাঙালির প্রতি ঘরের বামাকুল আপনার জন্যে আকূল হয়েছে। তাতে গুমরে মরেছে মনে মনে মা, কাকির দল। হ্যাঁ। একশবার সত্য একথা। না হলে আপনার মহাপ্রস্থানের পর থেকে আমার জেঠিকে কেন জ্যাঠামশাইয়ের কাছ থেকে শুনতে হয়, ‘তুমি তো আশি সালেই বিধবা হয়েছো’। আপনার কী জাদু। কী জাদু আপনার আজও খুঁজে চলেছে বাঙালি ও সিনেমা জগতের প্রতি কোণে থাকা সিনেমাপ্রেমী ।

আরও পড়ুন:  মশাসুর

আমি যখনই কাছে পেয়েছি আপনার সমসাময়িক অভিনেতা, অভিনেত্রী, ক্যামেরাম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট, প্রোডাকশন কাকাদের, প্রশ্ন করলেই হাত মাথায় দিয়ে তবে কথা শুরু। ‘বড়বাবু’ আপনি স্টুডিও মহলে। আজও আলাদা মাত্রা তাদের, যারা শুধু আপনার নায়িকা, কেরিয়ারে হয়ত সেরকম মাইলস্টোন নেই। তবে ওই যে, একটাই নিউক্লিয়ারসম হাতিয়ার আছে। আপনার চলে যাওয়ার পর – ‘আমি উত্তমবাবুর সঙ্গে কাজ করেছি’। অভিনেতা সন্তু মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, আপনার মুখমণ্ডলের চারিপাশে নাকি ঈশ্বরসম গ্ল্যামারের বলয় ছিল। বর্ষীয়ান সাংবাদিক আশিসতরুবাবু বলেছিলেন, আপনি তাকে একদিন উপেক্ষা করে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলেন, আসলে আপনি চরিত্রে মনোনিবেশ করেছিলেন। সে গভীরতা কতো গভীর স্যর। সুপ্রিয়া দেবী বলেছিলেন ‘সন্ন্যাসী রাজা’র সাধু জীবনে প্রবেশের পর বসে থাকাটা আপনি মাসখানেক ধরে অনুধাবন করেছিলেন। মানিকবাবু টিভিতে ‘নায়ক’ দেখে বলেছিলেন তাঁর নির্মাণে ভুল আছে। আপনি নিখুঁত। ‘গুরু’ কথাটার স্রষ্টা আপনি। আমার পরিবারের বাবা, দাদা, কাকারা আজও গুরুভার নিয়ে চলেছে। ‘অগ্নীশ্বর’ আমার সর্বাধিক প্রিয় ছবিটির সম্পর্কে পরিচালক অরবিন্দবাবু বলেছিলেন, ‘এতদিন অভিনেতা উত্তমকুমারের সাথে কাজ করেছেন। আজ সাধক উত্তমকুমারকে দেখছেন। আপনার মহিমা সর্বভারতীয় হওয়াই কাম্য, সে এক অন্ধজনও বলবে। তবে দুর্ভাগ্যজনক রয়ে গেলো আপনার সিনেমার মতো ‘ছোটি সি মুলাকাত’। মুলাকাত যদি দীর্ঘায়িত হতো তাহলে আমাদের জয়ধ্বজা হয়ত আরব সাগরের আরেকটু উঁচুতে পত পত করত।

‘গল্প হলেও সত্যি’ সিনেমার ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় আপনার আবির্ভাবের গল্প শোনানোর মতো শুনতে থাকব আপনার কাহিনী। আপামর বাঙালির কাছে। ম্যাট্রিক পাশের দিন, প্রথম প্রেমের দিন, বিবাহ, সন্তান, পিতৃ মাতৃ বিয়োগের ন্যায় আপনাকে দেখার স্মৃতিটা মনের সুইস ব্যাঙ্কে যত্নে লালিত থাকবে। আমরা আপনার চলে যাওয়ার সাঁইত্রিশ বছর বাদেও খুঁজে যাব আপনাকে। সে ইউ কাটে হোক। ধুতি পাঞ্জাবিতে হোক, স্যুট টাইয়ের বন্ধনিতে হোক বা ঘাড় কাত করাতেই হোক। বাঙালির ‘আপনি’ হওয়ার হাহাকার মিটবে না। থর মরুভূমির জল শূন্যতায় জল চাওয়ার মতো বাঙালির সন্তানরা প্রতি মুখে ফিরে ফিরে গিয়ে কাকুতি মিনতি করে আদায় করতে চাইবে সেই কথা “শুধু। শুধু একবার। শুধুই একবার। Please একবার বলো উত্তমকুমার”।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১৬)

NO COMMENTS