জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

এত দিন বাদে একটু শান্তি পেলুম। সম্পাদক মশাই খুব খুশি। জীবন বাজি রেখে জঙ্গল থেকে গোরুর মুখের খবর তুলে আনা তো চাড্ডিখানি কথা নয়। তিনি আমাকে বলেছেন, আমি নাকি সাংবাদিকতাতে ক্রমশ সড়গড় হচ্ছি। যে লোকটা কারুর কাজকে কখনও এক ইঞ্চিও ভাল বলেন না, সবাইকেই তার অনুগত টু’য়ে পড়া ছাত্র মনে করেন তার মুখে প্রশংসা আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল। ভাবলুম এবার এমন একটা কাজ করবো যাতে উনি একেবারে হতবাক হয়ে যাবেন। কিন্তু সেটা কী ? বেশ আয়েশ করে টিভির সামনে বসে সেটাই ভাবছিলাম। সামনের স্ক্রিনে তখন সন্ধের সিরিয়ালে কথার ফুলঝুরি ছুটছে। মাঝখানে নায়ক দু’দিকে দুই বউ। একজনের সঙ্গে নায়কের বিয়ে হয়েছে আর একজনকে তিনি বিয়ে করেছেন। তিনজনেই দামি জামাকাপড় পরে একজায়গায় দাঁড়িয়ে একের পর এক সংলাপ বলে যাচ্ছে। ক্যামেরা ঘুরে ঘুরে সবাইকে দেখাচ্ছে। মাঝে মাঝে ক্যামেরা, মিউজিক আর সংলাপের শেষটা একসাথে ঝলসে উঠছে। ব্যাপারটা বেশ মজার মনে হল, একটু মন দিয়ে দেখতে শুরু করলাম বর্তমান বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যমকে। এই ঝগড়া দেখতে দেখতেই একটা আইডিয়া মাথায় এল।

ধরা যাক আজ উত্তম কুমার, ছবি বিশ্বাস, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবীরা খ্যাতির মধ্যগগনে। আজকের এই সান্ধ্য মেগাসিরিয়ালের টানটান চিত্রনাট্যে তারাও উপস্থিত। এই রাজ্য এবং রাজ্যের বাইরে সমস্ত বাংলা ভাষাভাষি মানুষ এই সিরিয়ালটি দেখার জন্য মুখিয়ে থাকে। আটটা থেকে সাড়ে আটটা পশ্চিমবঙ্গে অঘোষিত বন্ধ। এসময় অটো আটকে থাকে, তিনমাসের বাচ্চাটা খিদেতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে, নাপিত দাড়ি কাটে না, চাবালিতে লাগানো সাবান শুকিয়ে যায়, হোটেলে আটটায় চাওয়া ‘পরে ভাত’টা সাড়ে আটটার পরে পাতে আসে। শুনশান রাস্তায় শুধু ল্যাম্প পোস্ট, কুকুর আর পাগলরা রাজত্ব করে। এমনই এক সিরিয়ালের একটি দৃশ্যের চিত্রনাট্য কেমন হতে পারে ? যেখানে ছবি বিশ্বাস বাবা, উত্তমকুমার বাড়ির একমাত্র ছেলে এবং নায়ক, সুপ্রিয়া তার বিয়ে করা বউ আর সুচিত্রা সেনকে উনি নিজে বিয়ে করেছেন। বাড়ির কাজের লোকের চরিত্রে অভিনয় করছেন চিন্ময় এবং সুলতা । এখানে অভিনেতা এবং অভিনীত চরিত্রদের নাম একই। বাড়ির ড্রয়িং রুমের ঘটনা।

আরও পড়ুন:  ৭০ বছরের নেশন এবং ত্র্যহস্পর্শ কম্বিনেশন

টাইটেল সঙ এবং অপ্রয়োজনীয় কিছু অস্পষ্ট নাম দেখানোর পর্ব শেষ হতেই দেখা যায় চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িং রুমে সুপ্রিয়া দাঁড়িয়ে, চোখে জল…ক্যামেরা সুপ্রিয়ার মুখ থেকে জুম আউট করে।

সুপ্রিয়া – সুলতা, আমাকে ঘুমের ওষুধ দে।

সুলতা –কোনমতেই দেব না বৌদিমনি। তোমাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে আবার ফাঁসবো নাকি ? সন্ন্যাসী রাজা রিলিজ করার পর আমি দু’মাস ঘর থেকে বেরোতে পারি নি, আমাকে দেখলেই সবার কী গালাগাল…।

সুপ্রিয়া –যাহোক কিছু একটা দে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।

সুলতা – পিৎজা খাবে ? ফোন করে বলবো ? বাড়িতে দিয়ে যাবে…   

উত্তম ফ্রেম ইন করে।  সুলতা চলে যায়।

উত্তম – একি, তুমি এখানে, এই ড্রয়িং রুমে ? আমাকে ডাকলেই তো আমি তোমার ঘরে চলে যেতাম। তুমি জান না চৌধুরী বাড়ির বউদের এভাবে বাইরের ঘরে আসতে নেই ।

ক্যমেরা তিরিশ সেকেন্ড ধরে মন দিয়ে সবার রিঅ্যাকশন দেখায় (সঙ্গে ঝ্যাং ঝ্যাং আওয়াজ)।

সুপ্রিয়া – তোমার সঙ্গে তো আমার দেখাই হয় না, আমার একটা কথা আছে – তোমাকে কিন্তু রাখতে হবে।

উত্তম –কী কথা ? বলো, নিশ্চই রাখবো।

সুপ্রিয়া – আমি বাপের বাড়ি যাব, তুমি আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও।

উত্তম সুপ্রিয়ার কাছে এগিয়ে যায়

উত্তম –  এমন কথা কেন বলছ ? আজ আমাদের বিয়ের তারিখ, শাস্ত্রে বলেছে এই দিনটা স্বামী স্ত্রীকে একসাথে থাকতে হয়।

সুপ্রিয়া – প্রতিবারই তুমি একই কথা বলো আর প্রতিবারই তুমি এই রাতটা ওর ঘরে কাটাও।

উত্তম – না, না, এবার তা হবে না। তুমি দেখে নিও এবারে ঠিক তোমার কাছে থাকবো।

সুচিত্রা ছুটতে ছুটতে আসে, হাতে ফুল ।    

সুচিত্রা – তুমি…তুমি… মস্ত বড় প্রোমোটার হবে, তুমি মস্ত বড় প্রোমোটার হবে…( উত্তমকে জড়িয়ে ধরে)

সুপ্রিয়া – সুলতা কোথায় গেলি… আমাকে ঘুমের বড়ি দে…

আরও পড়ুন:  ৭০ বছরের নেশন এবং ত্র্যহস্পর্শ কম্বিনেশন

বলতে বলতে ভিতরের ঘরে চলে যায়।

উত্তম – কী করে ?

 সুচিত্রা –দক্ষিনপাড়ার খেলার মাঠের যে জমিটা নিয়ে কেস চলছিল, তুমি বলেছিলে তুমিই জিতবে… কোর্ট আজ ওখানে কমপ্লেক্স করার অনুমতি দিয়েছে।

ছবি আসেন।

ছবি – কিসের অনুমতি ? কোর্টের অনুমতি নয় পেলে কিন্তু মন ? মনের অনুমতি কি পেয়েছো ?

তোমার থেকে জীবন আমি বেশি দেখেছি, জেনে রেখো আজ যে সুন্দরের স্বপ্ন তুমি দেখছো বাস্তবের আঘাত যেদিন আসবে সেদিন এই আনন্দ দুঃখ হয়ে আছড়ে পড়বে।

সুচিত্রা – প্রকৃত ভালবাসা দুঃখকে ভয় করে না। এক অজানা আশঙ্কাকে ভয় করে ওই খেলার মাঠ আমরা ছাড়তে পারবো না।

উত্তম – বাবা, আমরা ওখানকার ক্লাবের ছেলেদের টাকা অফার করবো, তাতে যদি ওরা না মানে তাহলে…

চিন্ময় ঢোকে  

চিন্ময় –একটা ছোট্ট ক্লাবের ছেলেদের তোলার জন্য মিটিং, কনফারেন্স… চুলের মুঠি ধরে এক ঘুষি মারলেই…

সুচিত্রা – চোপ… একদম চোপ…

চিন্ময় কেঁপে ওঠে…

চিন্ময় – আপনি না বলে দুম করে ওরকম বকবেন না… আমার বুকে লাগে।

সুচিত্রা – (ছবি বিশ্বাসের কাছে এগিয়ে যায়) এই কমপ্লেক্সটা হয়ে গেলেই আমরা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব,  আপনার সবকিছু ফিরিয়ে দেব।

ছবি – ফিরিয়ে দেবে ? আমার সবকিছু ফিরিয়ে দেবে ? দাও, ফিরিয়ে দাও চৌধুরীবাড়ির সুখ, আনন্দ… ফিরিয়ে দাও আমার হারিয়ে যাওয়া দশটা বছর… ফিরিয়ে দাও আমার সন্তানকে…

সুচিত্রা – আপনার সন্তানকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারি তবে একটা শর্তে…

ছবি – শর্ত !

সুচিত্রা – হ্যাঁ , ও সুপ্রিয়াকে টাচ করবে না…

সবার রিঅ্যাকশন (সঙ্গে ঝ্যাং ঝ্যাং আওয়াজ)।

চিন্ময় – যা… টাচ না করে সংসার করবে কী করে ?

সুচিত্রা – আবার তুই কথা বলছিস ? যা…যা এখান থেকে…

চিন্ময় চলে যায়। 

উত্তম – তোমরা আমাকে নিয়ে লড়াই করছো কিন্তু বিশ্বাস করো স্বামী সাজতে আমি আর চাই না। আমার সব কিছু আমি তোমাদেরই দিয়ে এখান থেকে চলে যেতে চাই।

আরও পড়ুন:  ৭০ বছরের নেশন এবং ত্র্যহস্পর্শ কম্বিনেশন

বাবা, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, রিয়েল এস্টেট সম্পর্কে তোমার ধারনা ভুল।

ছবি – ভুল !

উত্তম – হ্যাঁ, ভুল। সারা জীবনটা মাছি মারা কেরানি হয়ে কাটিয়ে দিয়েছো । প্রোমোটিং এর তুমি  কী বুঝবে ?

ছবি – রিয়েলি ! তা এই কেরানির শেল্টারটি ছেড়ে নিজে কিছু করে তারপর প্রোমোটিং নিয়ে বড় বড় কথা বললে ভাল হয় না কি ?

উত্তম – তার মানে তুমি বলতে চাও প্রোমোটিং করলে তোমার শেল্টারে থাকা চলবে না ?

ছবি – বলতে চাই নয়, বলছি।

উত্তম – বেশ, তাই হোক।

উত্তম চলে যেতে যায়, সুচিত্রা আটকায়।

সুচিত্রা – প্লিস, মাথা গরম কোরো না, বাবার বয়স হয়েছে…কী বলতে কী বলেছেন… তুমি আমার কথা শোনো…

উত্তম – না, ছাড়ো আমাকে,  এ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপমান। এ অপমান সহ্য করে আমি এখানে থাকতে পারব না।

উত্তম বেরিয়ে যায়। ক্যামেরা সবার রিঅ্যাকশন দেখায় (সঙ্গে ঝ্যাং ঝ্যাং আওয়াজ)।

এই পর্যন্ত একটা দৃশ্য ভেবে নিজেই শিউরে উঠলাম। সত্যিই আজ যদি কালের নিয়মে ওই মানুষগুলোকে মেগা সিরিয়াল করতে হত, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ড্রয়িং রুমের বোকা বাক্সের স্ক্রিনে তাদের দেখা যেত, শুনতে পেতাম তাদের বিখ্যাত সব ডায়ালগ, দেখতে পেতাম তাদের অসাধারণ সেই অভিনয় দক্ষতা… তাহলে কেমন হত ? থাকত কি মহানায়কের এই ইমেজ ? সুপ্রিয়া বা সুচিত্রা সেনের অসাধারণ সেই আকর্ষণ ক্ষমতা ? ছবি বিশ্বাস বা অন্যান্য চরিত্রাভিনেতাদের এই জনপ্রিয়তা, এই সম্মান ? জানি না, তবে রবি ঠাকুরের একটা কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি… ‘ বিধাতার রাজ্যে ভাল জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভাল, নাহলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি’ ।    

Sponsored
loading...

2 COMMENTS

  1. খুব ভালো লাগলো লেখাটি পড়ে। আরও চাই ।